ফন্ট সাইজ:
থিম:
আসবো ফিরে আবারো

২৩তম পর্ব

লেখক: সুরভী আক্তার

#আসবো_ফিরে_আবারো

#পর্ব_২৩

#সুরভী_আক্তার

( অনুমতি ব্যতীত কপি করা নিষেধ ❌ )

রাত্রি বারোটা পেরিয়ে চল্লিশ মিনিট । কাবির ম্যানসন আজ পুরোপুরি শান্ত , গুমোট । অবশ্য রাত সাড়ে দশটা হতে না হতেই এমনটাই নিস্তব্ধ হয়ে যায় পুরো বাড়ি । জেগে বসে থাকে না কেউ । এখন তো প্রায় একটা বাজতে চললো । সেই তুলনায় অনেক রাত । রৌদ্র বাড়িতে ডিনার করে না কোনো কালেই । ভুলবশত দু একদিন উল্টো দিকে চাঁদ উঠলে তখন খাবারের টেবিলে দেখা মেলে তার ।

আজ সে বাড়িতে ফিরেছে বারোটা বিশ নাগাদ । শাওয়ার নিয়েছে হালকা পাতলা । খিদে পেয়েছে , বাইরে খাওয়া হয় নি আজ । রৌদ্র শাওয়ার নিয়েই উদ্দাম শরীরে ঘর ছাড়লো ।

নিচে নামলো প্রথমে । প্রচন্ড খিদে পেলেও এই রাতে ভারী খাবার গলা দিয়ে নামবে না । মদ গিলেছে , অর্ধেক পেট অ্যালকোহলে টইটুম্বুর ।

কফি বানাতে পারে সে । গত বছর গুলোতে বাইরে থাকতে থাকতে টুকটাক রান্না ও করতে শিখে ফেলেছে । এই খবর রুবিনা কাবিরের কানে পৌঁছালে আকাশ থেকে পড়বেন তিনি । তার যেই ছেলে এক গ্লাস পানি নিজ হাতে গড়িয়ে খায় নি কভু , তার সেই ছেলে রান্না শিখেছে । অবশ্য সার্ভেন্ট ছিলো সে দেশে ।

রৌদ্র চুলায় কফি বসায় । ফ্রিজ ঘেঁটে একটা আপেল খুঁজে নেয় । সেটাতে দু কামড় বসিয়ে ছুড়ে ফেলে ডাস্টবিনে । মগে কফি ঢেলে চুমুক বসাতে বসাতে উঠে আসে উপরে ।

বাড়িটা কেমন শ্বাস রুদ্ধ লাগছে । মনে হচ্ছে শূন্য শূন্য পুরো বাড়ি । ঠিক শান্তি অনুভব হচ্ছে না অপরাপর গুমোট রাত গুলোর । এই রাতে কেউ জেগে নেই । সেজন্যই হয়তো । রৌদ্র নিজের ঘরের পথে এগোলো না । থামলো মাঝপথে । করিডোরের মাঝে মেঘার ঘর , তার এক পাশে শুভ্র অন্য পাশে আদ্রের ঘর , আদ্রের পাশে সিরাতের , অতঃপর রৌদ্রের ঘর শেষের প্রান্তে ।

মেঘার ঘর হতে দুটো ঘর পেরোলেই ওর ঘর । রৌদ্র রোজকার ন্যায় থামে মেঘার ঘরের সামনে । বেখেয়ালি হয়েই কফিতে চুমুক বসিয়ে চাপ প্রয়োগ করে দরজায় । ঐ ইডিয়ট অবাধ্য হলেও এবেলায় বাধ্যতা দেখিয়েছে । এই নিয়ে বেশ প্রসন্ন রৌদ্র । এক কথায় মেঘার দরজা খোলা রেখে ঘুমানোটা বেশ মনে ধরেছে ওর ।

দরজা ঠেললেও আজ সাথ সাথ দরজা খুললো না । কপাল কুঁচকে ফেললো রৌদ্র । নজর বাইরের ছিটকিনির দিকে যাওয়া মাত্রই কুঁচকানো কপাল তীক্ষ্ণ হলো । বাইরে থেকে ছিটকিনি লাগানো কেনো ? ওরা দুটোতে ভেতরে , তাহলে বাইরে থেকে দরজা আটকালো কে ?

রৌদ্র ভেবে পায় না ।

কফির মগ করিডোরের একটা ফুলদানির পাশে রেখে দ্রুত হাতে খোলে দরজার ছিটকিনি । ভেতরে ঢোকে হুড়মুড়িয়ে । ঘর ঘুটঘুটে অন্ধকার । অন্য দিন ডিম লাইট জ্বলে । আজ ভিন্ন । বাম হাত সুইচ বোর্ড খুঁজে লাইট অন করলো সে । অন্ধকার কাটিয়ে ছলাৎ করে আলো জ্বলে উঠতেই ফাঁকা ঘরটা চোখে পড়লো । কেউ নেই ঘরে । না টুকটুকি আর না মেঘা ।

রৌদ্র এপাশ ওপাশ তাকায় । এই রাতে এ দুটো ঘরে নেই কেনো ? আদ্র ? আদ্রের কথা মনে উঠতেই খিচে আসে চোয়াল । হাত মুঠিয়ে নেয় সে ! আদ্রের ঘরে নেই তো ওরা ?

রৌদ্র দাঁত পিষলো । এ ঘর হতে বেরিয়ে পাশের ঘরের দরজার সামনে দাঁড়ালো । অবাক হলো আরো বেশি । আদ্রের ঘরের দরজাও লক বাইরে থেকে ।

চোখ মুখ একসাথে জড়ো করে ফেললো । মাথায় কিছুই ডুকছে না । আদ্র ও নেই ? কোথায় এরা তিনটে ? সন্দেহ কাটাতে বাকি ঘরগুলো দেখলো সে । শুভ্রের ঘরের ও একই হাল । সিরাতের ঘরের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ ।

তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে সবকিছু । রৌদ্র বেশি ভেবে মাথা নষ্ট করলো না । আগ পিছ না ভেবেই এই একটার সময় সোজা গিয়ে কড়া নাড়লো বাপ মায়ের দরজায় । ডাকলো ভনিতা হীন উচ্চ স্বরে......

" মম !

দুবার ডেকেছে সে । রুবিনা কাবির তাতেই দরজা খুলে দিয়েছেন । ঘুম ভাঙ্গার রেশে নিভু চোখে ছেলেকে দেখে থমকালেন , বললেন....

" রৌদ্র , কি হয়েছে বাবা ? কখন এসেছিস ? কিছু দরকার আছে ?

" বাড়ির সবাই কোথায় মম ?

" সবাই মানে ?

" মানে , বাড়িতে কেউ নেই কেনো ?

শুভ্র ভাইয়া , মেহের , টুকটুকি , কোথায় ওরা সবে ?

" ওরা তো সিরাজগঞ্জ গেছে বিকেলে । শুভ্রর নানুর গ্রামে । আদ্র ও গেছে । কেনো ? তুই হঠাৎ খোঁজ নিচ্ছিস যে ?

রৌদ্রের ভাবমূর্তি চড়াও হয়েছে ‌। মস্তিষ্ক বিপাকে পড়ে ঝিমঝিম করে উঠলো ওর ।

গ্রামে গেছে ওরা সবাই , মেঘাও ? তাই কেউ নেই ঘরে ! ইভারা গেছে, আর সাথে আদ্র ও আছে , সবটা মানলেও এটা সহ্য করতে পারলো না বেপরোয়া ছেলেটা । দৃষ্টি নামিয়ে ক্ষুব্ধতা লুকালো মায়ের থেকে । ছেলের উদ্বেগ না দেখে রুবিনা কাবির আবার বললেন....

" কি হলো ? ওরা গ্রামে গেছে ! তুই এই রাতে ওদের খোঁজ নিচ্ছিস কেনো ?

" রাতের বেলা ভাই বোনদের খোঁজ না নিয়ে ঘুমাও গিয়ে । ঘুম প্রয়োজন এসময় । ভাই বোনদের নয় ।

তোফায়েল কাবিরের চড়া কন্ঠ । পেছনে হাত গুটিয়ে গুরুভার হয়ে সামনে এসে দাঁড়ালেন তিনি । রৌদ্র চোখ তুলে তাকায় । বাপকে দেখে এক ঝলক ।

মাথা এখন বিদ্বেষের অনলে বিষাক্ত ।

ফুঁসছে ভেতর ভেতর । আর এক মুহূর্ত ও দাঁড়ালো না সে । গজগজ করে ঘরের সামনে থেকে সরে আসলো দ্রুত ।

তোফায়েল কাবির চক্ষু আড়াল না হওয়া অবধি ছেলেকে পরখ করলেন । হাঁফ ছেড়ে বললেন....

" তোমার ছেলের বুক ফাটবে তবুও মুখ ফুটবে না । না ফুটুক, বুক ও না ফাটুক আর । তাই এই আয়োজন ।

রুবিনা কাবির বুঝলেন না এতোসব মারপ্যাঁচ কথার অর্থ । বললেন....

" কিসব বলছেন ? আর বারবার শুধু তোমার ছেলে , তোমার ছেলে , করবেন না । সে শুধু আমার একার ছেলে নয় ।

★

নব্য ভোরের সূচনা ।

গ্রামের সকাল টা অন্যরকম । শহরের তুলনায় একেবারে আলাদা । যেখানে শহরের সকাল শুরু হয় , গাড়ি বাড়ির যান্ত্রিক ব্যাস্ততা নিয়ে ।‌ সেখানে গ্রামের সকাল শুরু হয় প্রকৃতির কোলাহলে ।

গ্রামে ভোর ভোর ঘুম থেকে উঠে পড়ে সবাই ।

শুভ্রর নানু বাড়িটা গ্রামের ঠিক মাঝামাঝি । ওর নানু ছিলেন এ গ্রামের চেয়ারম্যান । সেই থেকে এ বাড়িটা চেয়ারম্যান বাড়ি নামেই পরিচিত । নানু নানি অনেক কাল আগেই গত হয়েছেন । একটাই মামা ওর ।

একতলা ছাদ বিশিষ্ট একটা নীড় ‌। ছোট পরিবার তাদের । বাড়িতে মোটে চারজন সদস্য । শুভ্রর মামা - শাহিন আলম , মামি - আনতারা বেগম , ওনাদের একমাত্র মেয়ে সাবা আর একটা ছেলে আয়াজ । এই নিয়ে তাদের সুখি পরিবার ।

সাবার পরীক্ষা শুরু হয়েছে আজ থেকেই । সেই ভোর ছয়টার আগে ঘুম থেকে উঠে পড়েছে মেয়েটা । তখন থেকে লাগাতার পড়ছে । পরীক্ষা শুরু নয়টার দিকে ।

রাতে মেঘা ,শাফাহ্ আর সাবা একসাথে এক বিছানায় ঘুমিয়েছিলো । সাবা কে বিড়বিড় করে পড়তে শুনে মেঘার ঘুম ছুটে যায় । তার উপর পাখির কলকাকলি কানে ধরছে ভীষণ । ঘরের পিছনেই বাগান , পাখপাখালি বেহিসেবি । তারাও প্রভাত কে গ্রহণ করছে সাদরে ।

সব মিলিয়ে ঘুম ছুটে গেছে মেঘার । শরীর মুড়িয়ে উঠে বসে সে । নতুন জায়গা হওয়ায় রাতের ঘুমটা আরাম হয় নি কাল । তার উপর এক বিছানায় তিন জন । শুভ্র আর মেহের কে একটা ঘর দেওয়া হয়েছে । আদ্র কে দেওয়া হয়েছে আয়াজের ঘরে ‌। আর বাকি ওরা তিনটে একসাথে শুয়েছে ।

বিছানা ছাড়ে মেঘা । টেবিলের কাছাকাছি যেতেই সাবা পাশ ফিরে চায় । পড়া রেখে মুচকি হেসে বলে.....

" গুড মর্নিং আপু !

" গুড মর্নিং । আজ তোমার কি পরীক্ষা আছে ?

" প্রথম দিন তো , বাংলা ! কিন্তু তুমি এতো তাড়াতাড়ি উঠেছো কেনো ? সবে তো সাড়ে ছয়টা বাজে । পড়ছি বলে ডিস্টার্ব হলো ? তুমি ঘুমাও আপু , আমি বসার ঘরে যাচ্ছি ।

" আরে না । তোমাকে যেতে হবে না । আমার ঘুম ভেঙ্গে গেছে, আর ঘুম হবে না । তুমি পড়ো আমি বাইরে যাচ্ছি ।

" আম্মু আছে বাইরে । তবুও কিছু প্রয়োজন হলে আমাকে বলবে কিন্তু । আসলে এ ঘরে তো এ্যাটাস্ট ওয়াশ রুম নেই । শুভ্র ভাইয়ার ঘরটায় আছে । বাইরে আলাদা ওয়াশ রুম আছে দেখেছোই তো । ওখানে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নাও ।

মেঘা মুচকি হাসলো ওর কথায় । সাবা মেয়েটা বড্ড মিষ্টি । বেশ ভালো লাগে ওর কাছে ।

ঘর থেকে বেরিয়ে আসলো সে । আনতারা বেগম এই ভোর বেলাতেই সকালের রান্নার আয়োজন শুরু করে দিয়েছেন । তিনি ব্যাতীত এখনো অবধি কেউ ওঠেনি ঘুম থেকে । মেঘা কিচেনে ঠুকঠাক আওয়াজ পেয়ে হাই তুলে চোখ মুখ ডলে সেদিকে এগোলো । আনতারা বেগম পরোটা বেলছেন নাস্তার জন্য । সবজি বসিয়েছেন চুলায় । মেঘা এগিয়ে গিয়ে মৃদু স্বরে বলল তাকে দেখে....

" একা একা সব করছেন মামি ? আমি সাহায্য করি একটু ?

আনতারা বেগম মুহুর্তেই চটপট করে বাঁধা দিলেন.....

" আরে মেঘা , তুমি উঠে পড়েছো এতো সকালে ?

আর কি সাহায্য করবে আমায় ? কিচ্ছু করতে হবে না । আজ অবধি শশুর ঘরে কুটুটি নাড়ো নি । কেউ কিচ্ছু করতে দেয় নি তোমায় । এখন দুদিনের জন্য আমার বাড়িতে ঘুরতে এসেছো , আর আমি তোমাকে দিয়ে কাজ করাবো ? পাগল মেয়ে ।

হাসির মাত্রা কমে আসে ঠোঁট থেকে । এ বেলায় জোর পূর্বক কৃত্রিম হাসে মেয়েটা । বলে....

" আমি সব পারি মামি ! আপনাকে হাতে হাতে একটু সাহায্য করতে পারবো । বলুন কি করতে হবে ?

" কিচ্ছু করতে হবে না তোমায় । তুমি গিয়ে হাত মুখ ধুয়ে নাও । আমি সবটা করে নিতে পারবো । হয়েই এসেছে সবটা । পরোটা ভাজা বাকি শুধু । সবাই উঠে গেলে ব্রেকফাস্ট করবে । তুমি বরং আগে ফ্রেশ হয়ে নাও ।

মেঘা কথা বাড়ালো না ।

ফ্রেশ হতে হতে সাতটা বেজে গেছে । ততক্ষণে মেহের আর শুভ্র উঠে পড়েছে । মেহের ঘর ছেড়ে বেরিয়েছে বাইরে । ওকেও কোনো কিছুতে হাত লাগাতে দেননি আনতারা বেগম । শুভ্র এখনো ঘরে , কাবির বাড়ির নিয়ম মোতাবেক ব্রেকফাস্টের সময় হয় নি এখনো । এই সকালে খাবার তৈরি হলেও অভ্যাস বশত গলা দিয়ে নামবে না সময়ের আগে ।

কফি বসালেন আনতারা বেগম ।

হয়ে এলে দুকাপ কফি ঢাললেন । এক কাপ মেহেরের হাতে দিয়ে ওকে ঘরে পাঠালেন শুভ্রর কাছে । মেঘা বসার ঘরে বসে আছে একা একা নিজ মনে । আনতারা বেগম কিচেন থেকে বেরিয়ে এসে অন্য কাপ কফি মেঘার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন....

" মেঘা , তুমি বরং কফিটা রৌদ্রের ঘরে গিয়ে দিয়ে এসো । আগে দেখো উঠেছে কিনা ।

ধক্ করে ওঠে মেঘা । রৌদ্র নামটা কর্নকুহরে প্রবেশ মাত্রই একবিংশীর শরীরে শিহরণ বয় । নড়েচড়ে বসে সে । আনতারা বেগম গুলিয়ে ফেলেছেন হয়তো । আদ্রের কথা বলছেন নিশ্চয়ই । নতুবা রৌদ্র আসবে কোথা থেকে ? আদ্র কে দিয়ে আসতে বলেছেন বোধহয় ।

আদ্র তো এখনো ওঠেনি ঘুম থেকে । বেড টি দিতে হবে । মেঘা আন্দাজ কে ধরে রেখে নিজেকে স্বাভাবিক করে মগটা হাতে নিয়ে বলতে নিলো...

" মামি , ঘরে আদ্র....

কথা শেষ করার আগেই আনতারা বেগম দুলাইন বেশি বুঝে নিলেন । আঙ্গুল ইশারা করে বাম কর্ণারের একটা ঘর ইশারা করে বললেন তাগাদা দিয়ে....

" ঐ ঘরে শুয়েছে রৌদ্র । ছেলেটা জার্নি করেছে । নিশ্চয়ই ক্লান্ত খুব । তুমি বরং আগে ওকেই দিয়ে এসো । ঘুমোচ্ছে এখনো । না উঠলে ডেকো না বেশি । ঘুমোতে দিও...

আর থামলেন না ভদ্রমহিলা । মেঘা কে রেখেই ঢুকলেন কিচেনে । মেঘা ভ্যাট ভ্যাট করে তাকিয়ে রয় আহম্মক বনে । রৌদ্র আর আদ্রের নামের তফাৎ জানেন না এই ভদ্রমহিলা ? নাকি গুলিয়ে ফেলেছেন ?

জমজ ওরা , চেহারা আর চরিত্রে ভিন্নতা থাকলেও নামের উচ্চারণ ঐ একই তো । হয়তো তালগোল পাকিয়ে গেছে । মেঘা ঘাটলো না বেশি । দুদিকে মাথা ঝাঁকিয়ে মুখ গোল করে শ্বাস ফেললো ।

ইশারা করে দেখানো ঘরটার দিকে এগোলো । আদ্র কাল এ ঘরে শুয়েছে ? জানা নেই তো ।

দরজা খোলা ঘরের । হালকা চাপানো । মেঘা দুবার টোকা মারে দরজায় । অতঃপর ঘরে ঢোকে সাড়াশব্দ না পেয়ে । বিছানায় বেঢাল হয়ে পড়ে আছে দুর্মদ তরুণ । উবু হয়ে ঘুমোচ্ছে । কোমর অবধি সাদা কম্ফোর্টার টেনে রাখা । পেটানো শরীর উন্মুক্ত । দুহাত মাথার দুপাশে বালিশ জড়িয়ে রেখেছে । সুঠাম বাহু পেশি দৃশ্যমান । বলিষ্ঠ বাহু ভেদে মাংস পেশী ঠিকড়ে বেরোনোর দশা । উবু হয়ে মুখ ফিরিয়ে শুয়ে থাকায় মুখশ্রী বোঝার জোঁ নেই ।

মেঘা ঘরের ভেতর পা বাড়িয়েই থমকেছে আকস্মিক । আদ্র কে সে বরাবর ভাইয়া হিসেবেই দেখে এসেছে । আজ আকস্মিক কেমন অদ্ভুত লাগলো ।

দ্রুত নিজের অবাধ্য চোখ সামলে নিলো সে ।

নিজেকে ধিক্কার জানিয়ে জিভে কামড় বসালো । এগিয়ে গিয়ে কফির মগ রাখলো বেড সাইড টেবিলের উপর । ডাকলো....

" ভাইয়া , কফি এনেছি ! উঠবে না ?

সাতটা পেরিয়ে গেছে । ওঠো এবার ।

শুয়ে থাকা লোকটা নীরব । নড়লো না । মেঘা আবার ডাকে....

" ভাইয়া ওঠো । ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে কফি ।

সেই জন অনড় । আনতারা বেগম জোর পূর্বক ডাকতে নিষেধ করেছেন । মেঘা তাই মানলো । এমনিতেও এতো সকালে উঠেই বা কি করবে ? ও নিজেও বোর হচ্ছে এই সকালে একা একা !

মেঘা আর ডাকলো না । সরে আসতে আসতে বললো...

" আচ্ছা উঠতে হবে না , ঘুমাও ।

মেয়েটা সবে এক কদম বাড়িয়েছে । দ্বিতীয় কদম বাড়ানোর আগেই বাম হাতের কব্জিতে খড়খড়ে একটা হাতের বাঁধন কনুভব করলো । টান পড়লো হাতে । পুরুষালি স্পর্শে আচমকাই ঝাঁকুনি দিয়ে ওঠে একবিংশীর অনুচ্চ তনু । ঝট করে পিছু ফিরে চায় মেঘা । কম্পিত গলায় বুলি ফুটানোর আগেই ঘুমন্ত যুবকের নড়চড় ঠাহরে আসে । মাথাটা একটু তুলে ডান দিক থেকে বাম দিকে মুখ ফেরায় যুবক । অমনি বিশাল ঝটকা খায় মেঘা ।

সামনের জন অনাকাঙ্ক্ষিত , অপ্রত্যাশিত । চেনা ,, তবে বড্ড অচেনা । মেঘার শরীরে এক মুহুর্তেই বিদ্যুৎ বয়ে যায় । আদ্রের জায়গায় সেই বেপরোয়া অবাধ্য লোকটাকে দেখে জমে যায় মেয়েটা । থমকায় শ্বাস ।

মূক বনে চেয়ে রয় অবিশ্বাস্য নয়নে । কিছু মুহুর্ত পর রৌদ্র ঘুমে কাতর অক্ষি যুগল‌‌‌ পিটপিট করে তাকানো মাত্রই মেঘা পলক ফেলে । সকাল সকাল চোখ মেলেই মুখ সম্মুখে আপন রমনীর নির্ভেজাল গাঠনিক সৌন্দর্য নজরে পড়তেই ওষ্ঠ পিষে ফিচেল হাসে রৌদ্র ।

চোখ নেভায় অবসন্নতায় । সেকেন্ড দুয়েক বাদ পাপড়ি মেলে ঘুমের ঘোরে হাস্কি টোনে বলে.....

" গুড মর্নিং সানি ।

লোকটার কন্ঠে পুরোপুরি সম্বিত ফিরে পায় মেঘা ।

ঘন পলক ফেলে অবিশ্বাস দূর করে । এটা ভ্রোম নয় ।

কিন্তু বাস্তব হলো কি করে ? কখন আসলো এই লোক ? আদ্রের জায়গায় ইনি কেনো ?

এজন্যই তাহলে আনতারা বেগম রৌদ্রের নাম নিয়েছিলেন । তার মানে তালগোল তিনি পাকান নি । পাকিয়েছে মেঘা নিজেই ।

ঢোক গেলে মেয়েটা । অধর ভিজিয়ে হাত মুচড়ে মিনমিন করে....

" আ...আপনি এখানে ?

" হু.... তোর কাছে ।

" কিন্তু , আপনি এখানে কি করে ? ক.. কখন ?

" মাথায় একটু হাত বুলিয়ে দিবি ? আরাম পাচ্ছি না ! ঘুম হয় নি সারা রাত । চোখে ঘুম থাকলেও কিছুতেই ঘুমাতে পারছি না । তোর স্পর্শে ঘুমাবো এখন একটু । অল্প করে হলেও সযত্নে হাত বুলিয়ে দে চুলের ভাঁজে ।

মেঘার প্রশ্নের বিপরীতে রৌদ্রের ক্লান্ত শীতল চাহনা । কোমল সুরে তাহার প্রথম আবদার । মেঘা কেমন কাঁপে বারংবার । সবটা গুলিয়ে যাচ্ছে আবার । লোকটা চোখ বুজে নিয়েছে । ঘুমে তলিয়ে যেতে চাইছে বোধহয় । চোখ খুলে রাখতে পারছে না । তবে মেঘার হাতটা ঠিক শক্ত করে ধরে রেখেছে । মেঘা টানা কয়েক মুহূর্ত চেয়ে দেখে সুক্ষ্ম নেত্রে । লোকটার চোখে মুখে একরাশ অবসাদ । তবুও টেনে হিচড়ে ভেজা গলা শক্ত করে মেঘা....

" হাত ছাড়ুন আমার ।

" ইভারা অবাধ্য হোস না । এই মুহূর্তে শক্তি নেই তোর উপর জোর খাটিয়ে তোকে বাধ্য করার । যা বলছি তাই কর ।

" নিজে অবাধ্য হয়ে আমাকে বাধ্য করতে চাইছেন কোন লজ্জায় ?

রৌদ্রের হাসি শোনা যায় । মেঘা তাকায় কপাল গুটিয়ে । লোকটা সেই পরিশ্রান্তিতে চোখ বুজেই রয়েছে । যেন কত স্থির নিষ্পাপ লাগছে এবেলায় ।

" অবাধ্য ছেলের অবাধ্য বউ , ব্যাপারটা মন্দ নয় ।

এটুকুনি বলেই মেঘা কে বিস্মিত করে ওর হাত ছাড়লো রৌদ্র । ফের আগের মতো মাথা ডান কাত করে মুখ ফিরিয়ে দীর্ঘ শ্বাসে উচ্চারণ করলো মৃদুমন্দ স্বরে....

" যা , ক্লান্তিতে সুখানুভুতি দিতে না পারলে উপস্থিতিতে উচাটনের সৃষ্টি করবি না এই অবাধ্য হৃদয়ে ‌। বড্ড জ্বালাচ্ছিস একেই । ডিস্টার্ব করবি না এখন আর । ঘুমাবো আমি ।

মেঘা রুদ্ধ গলায় ঢোক গেলে পরপর । কিছুক্ষণ মুখ ফিরিয়ে থাকা লোকটার পানে তাকিয়ে থেকে নিজেও উল্টো দিকে মুখ ফিরিয়ে নেয় । উপেক্ষা করে চলে যাওয়ার জন্য পা উদ্যত হয় না উদ্যমী রমনীর । পিছুটানে চিপকে রয় পদযুগল । দোটানায় পিছু ফেরে পুনরায় । পিটপিট করে চায় লোকটার পানে ।

জেদি রমনীর ঔদ্ধত্যা গুড়িয়ে গেছে আজ । শক্ত হতে গিয়েও পারলো না । রৌদ্রের কথা মোতাবেক আসলেই অবাধ্য হলো সে । তবে রৌদ্রের উপর নয় । নিজেই নিজের উপর । কিয়ৎ কাল ঠায় দাঁড়িয়ে থেকে বিছানার দিকে এগোয় । বেঘোরে বসে লোকটার শিয়রের নিকট । সময় নেয় কিছুটা । অতঃপর কম্পিত হাত তুলে আচমকাই আঙুল ডুবিয়ে দেয় চুলের ভাঁজে । যেন নিজের উপর নিজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে সে ‌।

রৌদ্র রমনীর শিরশির স্পর্শ পেয়ে মৃদু হাসে ঠোঁট প্রসারিত করে । আয়েশ অনুভুত হয় তার । চোখ মেলার শক্তি কুলোয় না । বরং আয়েশে পাপড়ি যুগল জমে আসে আরো । সেভাবেই চোখ নিভিয়ে তৃপ্ত তায় হাসে বেপরোয়া যুবক । একটু খানি নড়েচড়ে মেঘার কোলের কাছ ঘেঁষে মাথা রাখে । মেঘা চুলের ভাঁজে ধীরে হাত চালায় ।

তবে বেশিক্ষণ নিজেকে ধরে রাখতে পারে না । রৌদ্রের তৃষ্ণা তৃপ্ত হওয়ার আগেই অবাধ্য রমনী এক ঝটকায় উঠে দাঁড়ায় । এক ছুটে বেরিয়ে আসে ঘর থেকে । এক মুহুর্ত যে খেয়ালে ডুবেছিলো , সে খেয়াল উড়িয়ে দেয় নিজের বিরুদ্ধে গিয়ে ।

শূন্য অচল মস্তিষ্কে ওর চলে যাওয়া ঠাহর হওয়া মাত্রই মিলিয়ে যায় রৌদ্রের তৃপ্ততা । বিড়বিড় করে উচ্চারণ করে সে...

" ইডিয়ট ! শান্তিও দিস , আবার কেড়েও নিস । শুধু বাড়িয়ে দিয়ে যাস যন্ত্রণা ।

★

আটটা বেজে গেছে ।

শাহিন আলমের সাথে তড়িঘড়ি করে কলেজের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে গেলো সাবা ।

এখন ব্রেকফাস্ট করতে বসবে বাকিরা ।

আনতারা বেগম টেবিলে নাস্তা রেডি করে সবাইকে ডাকলেন । আদ্র উঠে পড়েছে এর মধ্যেই । একসাথে খেতে বসতেই আনতারা বেগম মুখ খুললেন মেঘার উদ্দেশ্যে......

" মেঘা , রৌদ্র উঠবে না ? খাবে না এখন ? এখনো ঘুমোচ্ছে ?

চকিতে চাইলো বাকিরা । মেঘা চোখ নামিয়ে রেখেছে । রৌদ্রের আসার ব্যাপারে এখনো কেউ অবগত নয় । শুভ্র না বুঝে শুধালো....

" রৌদ্র মানে ?

" রৌদ্রের কথা বলছি ।

" রৌদ্র এসেছে ?

আদ্রের সন্দিহান হতবাক প্রশ্ন...

" হ্যাঁ । ছেলেটা মাঝরাতে এসেছে । ওকে রেখে এসেছিলে কেনো তোমরা ? সেই সাড়ে তিনটের সময় এতোটা পথ পেরিয়ে বাইকে করে এসেছে ও । কতটা রাত হয়েছিলো বলো তখন ? ঐ রাতেই একা একা এসেছে ছেলেটা । আমি তো ওকে দেখে অবাক ।

আদ্র, শুভ্র একে অপরের দিকে চাওয়া চাওয়ি করে । মেঘা কথা এড়িয়ে খাচ্ছে । আদ্র সম্পুর্ন দৃষ্টিতে তাকালো মেঘার দিকে । মেঘাও জানে ?

চোখ সরু করে ওকে পরখ করে বললো....

" মেঘ , রুডি কখন এসেছে জানিস তুই ?

" না না , মেঘাও তো জানতো না । তোমরা ঘুমোচ্ছিলে দেখে ডাকি নি সেসময় । আজ সকালে মেঘা কফি দিতে গিয়ে রৌদ্র কে দেখেছে ।

আনতারা বেগম এটুকুনি বলে কিচেনের দিকে এগোলেন । শাফাহ্ পরোটা চিবিয়ে বলে....

" রৌদ্র ভাইয়া সত্যি সত্যিই এসেছে !

এটাকে বরং আসবো ফিরে আবারো না বলে, আসবো ফিরে বারবার বললে বেশ ভালো হবে । তাই না মেঘা....

মেঘা কটমট করে তাকালো । অমনি চুপসে গেলো বেচারি । ফোনের রিংটোন নিয়ে বারবার মেঘা কে খোঁচাচ্ছে ও ।

দুপুর গড়িয়েছে । রোদের ঝলকানি বেশ প্রখর । গরম ও প্রচন্ড , তবে রাত করে ঠান্ডা নামে ।

চেয়ারম্যান বাড়িটা পুরোপুরি গাছ গাছালিতে ঘেরা । বিশাল এরিয়া জুড়ে ছাদ পেটানো ছোট একটা বাড়ি । বাড়ির উপর বিশাল বিশাল গাছ । পেছনের দিকটায় বাগান । নানান গাছ সেখানেও । গরম পড়লেও এতো সব গাছের ছায়ায় বাড়িটা বেশ‌ শীতল । উষ্ণতা বোঝার জোঁ নেই । তীব্র সূর্যা দহনকে রুখে দিয়েছে গাছ গুলো ।

বাড়ির ডান পাশে প্রাচিরের বাইরে বিশাল পুকুর । শান বাঁধিয়ে ঘাট করা হয়েছে । ঘাটের দুপাশে দুটো বড় বড় আম গাছ । যার ছায়ায় ঘাটটা আবৃত ।

সাবা পরীক্ষা দিয়ে ফিরেছে সবে । ওকে ডিস্টার্ব না করে মেঘা আর শাফাহ্ মেহের কে নিয়ে তিন জনায় বসেছে পুকুর পাড়ে । শুভ্র আর আদ্রও বেরিয়েছিল , ওরা গেছে বাম দিকটায় । ছোট বেলায় ছুটি পেলেই আসা হতো এ গ্রামে । পুরো গ্রাম নখদর্পণে আছে । এখন আর আসা হয় না , যে যার জীবন , কাজ বাজ নিয়ে ব্যস্ত এখন ।

দিগন্তরেখা ছুঁয়ে সূর্যের তীর্যক রশ্মি গাছের পাতার ফাঁক গলিয়ে এসে পড়েছে পুকুরের পানির উপর । হাওয়া বইছে মিঠে শিরশিরে ।

কোলাহল নেই কোনো । নিস্তব্ধ আশপাশ । মাঝে মাঝে পাখির ডাক কানে বাজছে । শাফাহ্ গল্প শোনাচ্ছে মেঘা আর মেহের কে । ছোট বেলায় এ বাড়িতে এসে কি করতো না করতো সব বলছে ।

আনমনে শুনছে মেঘা । মেহের ও অনাগ্রহী । তেমন একটা ভালো লাগছে না এখানে এসে ।

তার উপর শুভ্র ও নেই এই সময় । কোথায় গেলো কে জানে ।

রৌদ্র ঘুমোচ্ছে এখনো । ওকে ঘুমন্ত রেখেই ওরা বাইরে বেরিয়েছিল । এখন উঠে পড়েছে সে ।

🟥 বেশি লিখতে পারি নি । ইডিট ও করি নি । একটু ফ্রি হলে ইডিট করে দেবো । আর পরবর্তী পর্বে বর্ননা পাবেন । 🟥

#চলবে…………

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২৩তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন