ফন্ট সাইজ:
থিম:
আসবো ফিরে আবারো

৪০তম পর্ব

লেখক: সুরভী আক্তার

#আসবো_ফিরে_আবারো

#পর্ব_৪০

#সুরভী_আক্তার

( অনুমতি ব্যতীত কপি করা নিষেধ ❌ )

ভদ্রলোকের কথা শেষ হতে সময় লাগলো , পেছন থেকে অপ্রত্যাশিত একটা শান্ত কন্ঠ ভেসে আসতে সময়ে লাগলো না....

" হেয়য়য়,, আমি বলি ?

চকিতে ঘাড় ঘোরালেন সকলে । রৌদ্র দৃঢ় পায়ে সদর পেরিয়ে ভেতরে এসে থেমেছে । চোয়াল বিভৎস নিরেট । দাঁত খিচে রেখেও নিজেকে ধাতস্থ দেখাচ্ছে । ব্লেজার জ্যাকেট ঝুলছে বাম কাঁধে । এলোমেলো সে । ভাঁজ পড়া কপাল ঢেকে আছে খুচরো চুলের আড়ালে ।

মেঘা ওকে দেখা মাত্রই ছলকে উঠলো । ঢোক গিলে সিঁড়ির রেলিং চেপে ধরলো ।

সবার দৃষ্টি এখন বেপরোয়া ছেলের দিকেই । রৌদ্র কতটুকু কি শুনেছে আন্দাজে নেই । কি বলবে এই ছেলে ? দেখে তো মনে হচ্ছে না রেগে আছে !

সবার স্থবিরতা কে তাজ্জব বনিয়ে মুচকি হাসলো রৌদ্র । সোজাসুজি দৃষ্টি তাক করলো অতিথি ভদ্রলোকের দিকে ।

" ওওও ডুগডুগি আংকেল !!

বয়স তো কম হলো না । জানেনই যখন হুটহাট এসব প্রস্তাব দেওয়া টা ভালো দেখাচ্ছে না, তখন খারাপ দেখাতে জান কেনো ? ইউ নো , এ বাড়ির অতিথি হিসেবে এখানে বসে আছেন এখনো ,, এটা আপনার সাত কপালের সৌভাগ্য । নতুবা আমার প্রপার্টির দিকে নজর দেওয়ার জন্য নজর টাই থাকতো না আর ।

ভদ্রলোক ভ্যাবাচ্যাকা খান । বুঝে পান না কিছু । অবাকের ভঙ্গিতে তাকিয়েই রন । রৌদ্র কে চিনলেন ও না তিনি । তোফায়েল কাবির ছেলের ঔদ্ধত্যতা দেখে গলা ঝেড়ে মুখ খুললেন.....

" এখান থেকে যাও রৌদ্র । বিজনেস নিয়ে কথা হচ্ছে এখানে । বাড়তি কথা বলার প্রয়োজন নেই ।

রৌদ্র কানালো না । দাম্ভিক ভঙ্গিতে বুকে হাত গুটিয়ে চোয়াল খিচে ভদ্রলোক কে পরখ করছে এখনো । ইচ্ছে করছে গিলে খেতে । বাপের বয়সী না হলে এতক্ষণে নুন,হলুদ মাখিয়ে ফ্রাই করে ফেলতো অগ্নি চক্ষুর দ্বারা । তার উপর কানে পড়েছে , ইনি নাকি নতুন বিজনেস পার্টনার । এ কারনে রাগ সংবরণ করলো সে । রেগে গেলেও প্রকাশ করলো না । শান্ত রইলো । তবে রাগ শুধু জবানের বেলাতেই স্থবির রইলো , অন্যদিকে দৃষ্টি জোড়াতে প্রকাশ পেলো আগ্নেয়গিরির ন্যায় ।

ভদ্রলোক রৌদ্রের এমন অগ্নি চক্ষু দেখে তব্দা খেলেন । দৃষ্টি নামিয়ে ঢোক গিললেন । জিজ্ঞেস করলেন ভেজা গলায়....

" ও‌ কে ? ওকে তো ঠিক চিনলাম না !

" এ বাড়ির ছোট ছেলে , রুডভিক কাবির রৌদ্র ।

উত্তর তৌসিফ কাবিরের । রৌদ্র কথা টেনে পূরু কন্ঠে বললো মাড়ি খিচে....

" ইয়াহহ , আ'ম রুডভিক কাবির রৌদ্র ।

অর....

থামলো । পিছু ফিরলো । ঘাড় উঁচিয়ে তাকালো সিঁড়ির উপরে ‌। মেঘা দাঁড়িয়ে । রৌদ্র ওর দিকে তাকিয়ে দৃষ্টি ক্ষুব্ধ করলো আরো । ঐ ইডিয়টের জন্য বিয়ের প্রস্তাব উত্থাপন করছে এই লোক ? কেনো ? ওকে দেখে কি মনে হয় না ও বিবাহিত ? কোনো একজনের বিবাহিত স্ত্রী সে । পাঁচ বছর হলো সেই বিয়ের । বিবাহিত ও । আর একজন বিবাহিতের জন্য বিয়ের প্রস্তাব আসছে ? তাও ওর নিজের বাড়িতেই ? বেপারটা অন্যদের কাছে কৌতুকের হলেও রৌদ্রের কাছে ক্ষুব্ধতার । ক্ষিপ্ততা দমে রাখতে না পেরে গজগজ করে উপরে উঠে গেলো রৌদ্র । মেঘা দুই সিঁড়ি নিচে দাঁড়িয়ে । শাফাহ্ মেয়েটাকে নিয়ে একটু উপরে উঠেছে ।

মেঘা বরাবর দাঁড়ালো সে । রাগে কটমট করে তাকালো । চোখ রক্তিম । নিরেট চোয়াল । কিছুটা ভয় পায় মেঘা । পিটপিট করে তাকিয়ে ঢোক গেলে । রৌদ্র ওর চোখে চোখ রেখে কন্ঠ চিপে অধিকার দেখিয়ে সবাইকে শোনায়.....

" অর , সি ইজ মাই লেডি । মাই সানি , মাই সুইটহার্ট অর মাই লাভ ‌। মাই ওয়াইফি...

পেছায় মেঘা । কোমর ঠেকে সিঁড়ির রেলিংয়ে । এই লোক এক্ষুনি কোনো অঘটন ঘটিয়ে না ফেলে । আতঙ্কে বুক দুরু দুরু রমনীর । অতিথি ভদ্রলোক ভদ্রমহিলা চোখ সরু করলেন । রৌদ্র মেঘার দিক থেকে দৃষ্টি নামিয়ে ভদ্রলোকের দিকে তাকালো । রাশভারী গলায় বলতে আড়ম্ভ করলো...

" হেয়য় ডুগডুগি আংকেল ,, আপনার মিসেস এর ভাইয়ের ছেলের বউ করবেন ওকে ? উপসস্ , ব্যাড লাক ! সি ইজ অলরেডি সামওয়ান'স ওয়াইফ । রুডডিক কাবির রৌদ্রের ওয়াইফ । লেটস সি... আমার সাথে ওকে পারফেক্ট মানায় তাই না ? অবশ্য জিজ্ঞেস করছি বা কেনো ? উই আর মেড ফর ইচ আদার । ওকে যদি কারোর সাথে মানায় , সেটা কেবল মাত্র আমিই । ইউ নো , আমি ছেলে খুব ভালো । সুইজারল্যান্ডে সেটল । কাজ বাজ করি । যা করি , তাতে কাবির ইন্ডাস্ট্রির মতো বিজনেস ইন্ডাস্ট্রি দিনে দশবার কেনার ক্ষমতা রাখি আমি । ইটস্ মাই পাওয়ার । আপনাদের বলে লাভ নেই । শুনেও লাভ নেই । কেবল শুনে রাখুন , সি ইজ মাই পার্টনার । ওর দিকে তাকালে চোখ উপড়ে নেবো বলে রাখলাম । বি কেয়ারফুল ফর নেক্সট টাইম । না জেনে না বুঝে বাড়িতে বসে আছেন , তাই বাড়াবাড়ি করলাম না ।

শেষের কথা গুলো দিয়ে শ্বাশালো বোধহয় । আর বিলম্ব করলো না । ফের মেঘার দিকে ফিরে মাড়ি খিচে কিড়মিড় করলো । ঝুঁকে এসে হাত মুঠো করে খিচে নিলো । ক্ষুব্ধ কন্ঠে চাপা ধমক দিলো....

" ইউ ইডিয়ট ,, মার খাবি ? গাল চুলকাচ্ছে থাপ্পর খাওয়ার জন্য ? নিচে নেমেছিস কেনো ইডিয়ট ?

" বাবা ডেকেছিলেন !

" ডেকেছিলো দেখে নিচে নামবি ? নিচের নামার আগে পারমিশন নিয়েছিস আমার থেকে ?

" আপনার থেকে পারমিশন কেনো নিতে যাবো আমি ? সরুন সামনে থেকে । সিনক্রিয়েট করবেন না । মেহমান এনারা সকলে !

দাঁত খিচে নেয় রৌদ্র । চোখ জোড়া বিভৎস রক্তিম । যেনো ভস্ম করে দেবে ।

" পা ভেঙ্গে ঘরে বসিয়ে রাখবো ইডিয়ট । মুখ ও ভেঙে দেবো যদি আর একটা কথা বলিস ! বিয়ে করা বউ তুই আমার । আর তোর জন্য বিয়ের প্রপোজাল আসবে ? বিবাহিত তুই , কোনো চিহ্ন নেই কেনো তোর শরীরে ? বিয়ে হয়েছে তোর , সেটা কেউ কেনো বুঝবে না তোকে দেখে ? বল...? নিজেকে অবিবাহিতের মতো প্রেজেন্ট করিস ,, স্টুপিড ?

মেঘা চড়া ধমকে ভয়ে সিটিয়ে যায় । সবাই তাজ্জব বনে রৌদ্রের কথা শুনছে । মেঘার চোখের ছলছল ভয় টুকু অবলোকন করলো রৌদ্র । সবাইকে আরো তাজ্জব বানিয়ে আকস্মিক ওষ্ঠ নামিয়ে হুট করে সবার সামনেই টুপ করে একটুখানি পরশ আঁকলো রমনীর ললটে । বিস্ময়ে হতবাক সকলে । বেপরোয়া ছেলের শেষের কান্ডে বাক্ হারালেন । চোখ জোড়া হয়ে আসলো বৃহৎ । কাউকে কথা বলার ফুরসৎ না দিয়ে শক্ত করে মেঘার হাত চেপে ধরলো রৌদ্র । টেনে নিচে নামাতে গেলে মেঘা পরশের টাল সামলে কম্পিত ক্ষিণ স্বরে বাঁধা দেয়...

" কি করছেন ?

অগত্যা থেমে সবার সামনেই বজ্র কন্ঠে ধমকালো রৌদ্র.....

" শাট আপ ইডিয়ট । একটা কথা বলবি তো জবান টেনে ছিঁড়ে ফেলবো । চল আমার সাথে...

এই বলে টেনে নামায় ওকে । এগোয় বাড়ির বাইরের দিকে ।

" কোথায় নিয়ে যাচ্ছো ওকে ?

প্রশ্ন তোফায়েল কাবিরের । তৎক্ষণাৎ চড়া উত্তর বেপরোয়া ছেলের....

" বউ ও আমার । ও যে আমার বউ , এটারই প্রমাণ ওর শরীরে ফুটিয়ে তুলবো আজ । মেয়ে নয় ও এ বাড়ির । বউ ও । আমার বউ ‌। আর আজ সেই বউ হওয়ার চিহ্নই ধরাবো ওর মাঝে ।

রৌদ্র আর থামে নি । কারোর পরোয়া না করে সবাইকে উপেক্ষা করে টেনে হিচড়ে মেঘা কে নিয়ে বেরিয়ে গেছে বাইরে ।

★

সেই তখনের পর এখন রাত্রি দশটা পেরিয়েছে ।

গাড়ি আটকে রয়েছে ব্যাস্ত রাস্তার মাঝে । রেড সিগন্যালে থেমেছে । সামনে বহুত যানজট । নতুন বছর উপলক্ষে সেজে উঠেছে পুরো শহর । রং বেরঙের ফেইরি লাইট এধার ওধার ভরে উঠেছে । মানুষের আনাগোনা রাত্রির এই প্রহরেও বেশি বই কম নয় । আজ যেনো সবার ব্যাস্ততা একটু বেশি ।

রৌদ্র নিজেও ব্যাস্ত সময় কাটিয়েছে গত ঘন্টা চারেক । পুরো শহরে গাড়ি ছুটিয়ে বেরানো শেষ । বাড়ি থেকে বেরিয়েই প্রথমে একটা রাজ কার্য সম্পাদন করেছে । যার পর থেকেই একবিংশীর মুখ ভার । কালো করে রেখেছে শুভ্র মুখখানা ।

এখনো টু শব্দও উচ্চারণ করে নি মুখে । মাঝে মাঝে নাক টানছে । রৌদ্র ওকে পাশে বসিয়ে কেবল ড্রাইভ করেই যাচ্ছে । কথা বলে নি নিজেও । দু একবার চেষ্টা করেছে , রমনীর মুখ বেজার দেখে নিজেও মুখে কুলুপ এঁটে নিয়েছে এখন ‌। তবে আর পারলো না । সেই থেকে এই মেয়ে ওর দিকে একবারও তাকায় নি । জানালা ভেদে যানজট পূর্ণ রাস্তার মানুষজন দেখছে বেকার বেকার । অথচ এদিকে যে তার সুদর্শন স্বামী বসে আছে , তার খেয়াল কি রাখে এই ইডিয়ট ? মেঘা কে বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে রৌদ্র জানালার কাঁচ তুলে দিলো ।

বিঘ্ন পেয়ে বিরক্ত হলো মেঘা । ঝট করে তাকালো রৌদ্রের দিকে । গ্রিন সিগন্যাল দেখা দিয়েছে । রমনীর ক্ষেত্রেও , আর ট্রাফিকের ক্ষেত্রেও । রৌদ্র গাড়ি স্টার্ট করে বলে....

" গাল ফুলিয়ে বসে আছিস কেনো ইডিয়ট ?

মেঘা জবাব দিলো না । ফোঁস করে শ্বাস ফেললো রাগে গজগজ করে । গাল ফুলিয়ে মুখ ফিরিয়ে নিলো । সে কিছুতেই তাকাবে না এই অসভ্য লোকের দিকে । উত্তর না পেয়ে রৌদ্র নিজে থেকে আবার বলে....

" অবশ্য দেখতে ভালোই লাগছে । বেশ আদুরে । ইচ্ছে করছে টুপটাপ এলোপাথাড়ি কয়েকটা আদর বসিয়ে দেই মুখ জুড়ে । দেই সুইটহার্ট ? ইচ্ছে দমিয়ে রাখতে নেই । ভুল করে মরে গেলে ইচ্ছেরা পূর্ণতা পাবে না । সেই অপূর্ণতায় মরেও শান্তি পাবো না আমি...

" ইউ রাইনো ,, বাজে কথা বলবেন না । চুপচাপ বসে থাকুন !

" ব্যাথা পেয়েছিলি ?

মেঘা নাক টানলো । তাকালো না । গাড়ি একপাশ করে পার্ক করলো রৌদ্র । নির্জনে থেমে পুরোপুরি মনযোগ দিলো মেঘার দিকে । শরীর ঘুরিয়ে মেঘার বাহু টেনে নিজের দিকে ফেরালো । অমনি চোখে পড়লো মেয়েটার ভেজা মুখখানা । বিস্তর অভিভান সেই মুখখানায় । রমনী চোখ তুললো না । রৌদ্র ওর নাকের কাছটায় নজর দিলো । সিট বেল্ট খুলে চেপে বসলো মেঘার দিকে ।

সূক্ষ্ম দৃষ্টিপাত করা মাত্রই বুঝলো , রমনীর চিকন নাকের ডগা রক্তিম হয়ে উঠেছে । যেনো রক্ত জমাট বেঁধেছে সেখানে । একেই মেয়েটা টুকটুকে ফর্সা । টোকা দিলেই রক্ত গলিয়ে বেরোবে ।

রৌদ্র আরো লক্ষ্য করে দেখলো রমনীর নাকের বাম পার্শ্বে চিকচিকে একখানা নোজপিন । জ্বলজ্বল করে উজ্জ্বলতা ছড়াচ্ছে । মেয়েটার সৌন্দর্য সাত গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে এই নাক ফুলের পূর্ণতায় ‌। আগে তো ছিলো না এটা । রৌদ্র দীর্ঘক্ষণ চেয়ে দেখলো তৃষ্ণার্ত লোচনে ।

বাড়ি থেকে বেরিয়েই এই মেয়ে কে নিয়ে পার্লারে গেছিলো । কত কসরত করে ধরে বেঁধে নাক ফুটো করে নাক ফুল পড়ানো হয়েছে এই মেয়েকে । ব্যাথা পেয়েছে বোধহয় । এটুকু পাওয়ারই ছিলো ।

বিয়ের পর একটা মেয়েকে আলাদা করে চেনার জন্য তার হাতে দুখানা চুরি থাকে, নাকে থাকে নাকফুল । যা একটা মেয়ের বিবাহিত হাওয়ার নিদর্শন বহন করে । কিন্তু এই ইডিয়টের তো কিছুই ছিলো না ।

লোকে বুঝবে কি করে ও বিবাহিত ? ওর বাড়িতেই কিনা ওর বউয়ের জন্য বিয়ের প্রস্তাব আসছে ! এটা রৌদ্র মেনে নেবে ?

একটা মেয়ে যে বিবাহিত , এটা তাকে দেখে বোঝার উপায় কি ? রৌদ্র তো জানে না । বাড়ি থেকে বেরিয়েই মাথা চুলকে বোকার ন্যায় গুগল সার্চ করেছিলো প্রথমে ।

সেখানে জানতে চাইলো....

“ আচ্ছা , একটা বিবাহিত মেয়ের নিদর্শন কি কি ? একটা মেয়েকে দেখে লোকে বুঝবে কি করে , যে তার বিয়ে হয়ে গেছে ?

গুগল হতচ্ছাড়া ইউটিউবে নিয়ে কত উল্টো পাল্টা কিছু দেখালো , বোঝালো । আহম্মক বনে শেষে বিরক্ত হয়ে ফোন রেখেছে রৌদ্র । সবটাই করেছে মেঘা কে পাশে বসিয়ে রেখে ।

পরে নিজে নিজে ভাবতে লাগলো । মেহের আর সিরাতের পরিবর্তন নিয়ে ভাবলো । ওরা বিয়ের আগে এক ছিলো , বিয়ের পর অন্যরকম হয়ে গেছে । প্রথমেই নজরের সম্মুখ হলো ,, ওরা এখন হাতে চুরি পড়ে । আগে তো পড়তো না । মম , মনি ওদের হাতেও চুরি দেখে রৌদ্র । তার মানে এটা একটা চিহ্ন । বাকি আরেকটা নাকফুল । ভেবেচিন্তে এ দুটোই পেয়েছে সে ।

মেঘার নাকে ফুটো ছিলো না । পার্লার গিয়ে ঐ মেয়ে কে চেপে ধরে সেটাই করিয়েছে আগে ।

রমনীর নাকের পাতলা লতায় এখন একটা ডায়ামন্ড ঠাই পেয়েছে । জ্বলছে চিকচিক করে ।

তবে লালচে হয়ে আছে পুরো নাকটা । নিশ্চয়ই খুব ব্যাথা পেয়েছে এই ইডিয়ট ।

রৌদ্র ওকে পরখ করে মোলায়েম কন্ঠে জানতে চাইলো পূণরায়...

" ব্যাথা পেয়েছিস ? এটুকুতে কে ব্যাথা পায় ?

" আপনার মতো রাইনো নই আমি , যে ব্যাথা পাবো না । নাকটা পুরো থেতলে গেছে আমার । ঠিক মতো শ্বাস ও নিতে পারছি না । কত ব্যথা করছে আপনি জানেন ?

" দেখি , কোথায় ব্যথা পেয়েছিস ?

মেঘার ঘাড় চেপে অবলোকনের জন্য নিজের দিকে টেনে আনলো সে । রমনী নির্বোধের ন্যায় নিজের ব্যাথা দেখাতে গিয়ে বোকা বনলো । পরখ করতে গিয়ে নিমিষেই টুপ করে ওর নাক ফুলটায় চুমু খেলো রৌদ্র । মেঘা কে প্রতিক্রিয়া দেখাতে না দিয়েই দূরত্ব বাড়িয়ে মুখোমুখি হয়ে বললো...

" সরি সুইটহার্ট ! আই নো ব্যাথা পেয়েছিস । বাট দেখ , কি সুন্দর লাগছে তোকে । এবার লাগছে তো আমার বউ বউ । রুডভিক কাবির রৌদ্রের বউ....। আমার নামের এই নাক ফুলে তোকে কতটা আমার আমার লাগছে , তুই জানিস ? এমনিতেও পুরোটাই তুই আমার । এবার মনে হচ্ছে তুই আমার থেকেও আমার । কেবলই আমার । এটা সবাই জানুক , সবাই দেখুক তুই কেউ একজনের নামে দলিল হয়ে গেছিস । কেউ তোকে চাওয়ার সাহস না করুক । সবাই জানুক তুই আমার ।

মুখ বাঁকিয়ে রৌদ্র কে ঠেলে সরালো মেঘা । জানালার দিকে চেপে বসলো । রাগ দেখিয়ে বললো....

" নই আমি আপনার !

" আচ্ছা , তাহলে কার ?

" আমি কেবলই আমার ।

" তুই তোর , আর তুইইই আমার ।

মনে মনে ভেংচি কাটে মেঘা । রৌদ্র তাকায় ওর হাতের দিকে । দু খানা চুড়ি ও আছে এখন ।

হেসে মেঘার হাত টেনে ধরলো সে । খানিক আগে চুরি দুটো আলগোছে পড়িয়ে দিয়েছে যত্ন নিয়ে ।

মেঘা কেবলই দেখে যাচ্ছে । আজ আর তার বাঁধা দেওয়ার ঔদ্ধত্যতা নেই । কেমন নিশ্চুপে সায় দিচ্ছে কেবল ।

তাকিয়ে দেখছে অপলক । লোকটা কি অদ্ভুত । ওকে বউ মানে না , জোর করে বিয়ে করে ফেলে রেখে চলে গেলো । পাঁচ পাঁচটা বছর কোনো হোদিশ করলো না । খবর নিলো না , মেঘা বেঁচে আছে নাকি মরে গেছে শুনলো না কত বছর । নেশার ঘোরে কাকে বিয়ে করে ফেলে রেখে চলে গেছে , তাও জানলো না । জানার চেষ্টাও করলো না ।

আর এখন , হঠাৎ করে ফিরে এসে এতোটা বদলে গেলো ? ফিরে তো মেঘার জন্য আসে নি । এসেছে সিরাত আপুর কথা রাখতে । মেঘা কে দেখলো হুট করে ।

আর এখন এসব অধিকার দেখাচ্ছে কাকে ? এতো এতো জোর দেখাচ্ছে কাকে ? মেঘা তার বউ ?

টান দিয়ে নিজের হাত ছাড়িয়ে নিলো মেঘা । পূণরায় ফিরে আসলো জেদি রুপে । খড়খড়ে গলায় বললো.....

" বাড়ি যাবো আমি , বাড়ি নিয়ে চলুন ।

" ওয়েট , এতো তাড়া কিসের ? আরো একটা জিনিস কমতি আছে । চুরি আর নাকফুল তো বাহ্যিক ভাবে তোকে কারোর বউ হিসেবে ফুটিয়ে তুলবে ।

এবার তুই কবে সত্যি সত্যিই নিজেকে আমার বউ হিসেবে সপে দিবি বল ? নতুন বছর আসছে,, নতুন বছর টা নতুন করে শুরু করি ? চল‌ না বউ , ত্যাড়ামি ছাড় । এবার সত্যি সত্যিই বউ হয়ে যা আমার । নিয়ে নে তোর অধিকার । আমি দিতে ব্যাকুল ।

" বাজে ইয়ার্কি করবেন না রাইনো মুখো । শুনতে বড্ড বাজে লাগে ।

" ইভারা , রাগাবি না । আ'ম সিরিয়াস । ট্রাস্ট মি , অনেক ধৈর্য্য ধরেছি । ধৈর্য হারাবো জেনে তোর সামনে আসিনি । তোকে দেখিনি । বাট নাউ , আই কান্ট !

মেঘা কথা কাটাতে বলে.....

" কি করেন আপনি ?

" এইইই তো তোকে চাই !

" চুপ করুন রাইনো মুখো । বাড়িতে খুব বড় মুখ করলেন । কাবির ইন্ডাস্ট্রির মতো বিজনেস ইন্ডাস্ট্রি দিনে দশবার কেনার ক্ষমতা রাখেন আপনি ! তো কি এমন করেন , যে দশবার কেনার ক্ষমতা রাখেন !

" ওও সেটার কথা বলছিস ? ও তো চাপাবাজি ! চাপাবাজি করি । চাপাবাজি না করলে জীবন চলে না সুইটহার্ট ।

" বিদেশে কি করেন ?

" চায়ের দোকান খুলেছি !

" ইরিটেটিং ম্যান , কথা পেঁচাবেন না ?

" ইডিয়ট , তুই কথা ঘোরাচ্ছিস কেন ? তোকে চাই আমার ! সেটার উত্তর দে ! কবে হবি বল ?

" জীবনেও না । আই হেইট ইউ রাইনো মুখো । বাড়িতে নিয়ে চলুন আমায় । অসভ্যতা করে এসেছেন সেখানে ।

" সভ্য থাকতে দিস তুই আমায় ? ইডিয়ট.....

★

ওরা বাড়ি ফিরতে ফিরতে বারোটার দোরে পৌঁছেছে ঘন্টার কাঁটা । চাবি ঘুরিয়ে দরজা খুললো রৌদ্র । মেঘা গটগটিয়ে প্রথমে ঢুকলো । ড্রইং রুমের আলো জ্বলছে । এতক্ষণে সবার ঘুমিয়ে যাওয়ার কথা । মেঘা কোনো দিকে না তাকিয়ে সিঁড়ির দিকে পা বাড়ায় । তৎক্ষণাৎ ভেসে আসে তোফায়েল কাবিরের রাশভারী কন্ঠ.....

" দাঁড়াও মেঘা !

ধক্ করে ওঠে একবিংশী । ছলাৎ করে পিছু ফেরে । সোফায় সটান বসে তোফায়েল কাবির । তৌসিফ কাবির ও আছেন । বাকিরা জেগে থাকলেও নিচে আসার অনুমতি নেই কারোর । দুই কর্তা কে এই অসময়ে দেখে কলিজা শুকিয়ে আসে মেঘার । এক রাশ জড়তায় মাথা নুইয়ে ফেলে । ততক্ষণে রৌদ্র সদর লাগিয়ে এসেছে ।

বাবা আর বাবাই কে দেখেও গ্রাহ্য করলো না । গাড়ির চাবি হাতে ছিলো । তর্জনীর ডগায় চাবি ঘোরাতে ঘোরাতে মেঘার পাশাপাশি এসে থামলো । দুজনকে দেখিয়েই বললো.....

" হোয়াট সুইটহার্ট , থেমে গেলি কেনো ? ঘুমাবি না ? লেটস গো.....

তোফায়েল কাবির রাগ সংবরণ করে তৌসিফ কাবিরের দিকে তাকান । মুখ খোলেন তৌসিফ কাবির...

" তুমি রুমে যাও রৌদ্র , মেঘার সাথে আমাদের কথা আছে !

রৌদ্র পরোয়া করলো না । বেখেয়ালে উঠে গেলো সিঁড়ি ডিঙ্গিয়ে । মেঘা চিবুক নামিয়ে জড়ো সড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে ।ওকে পরখ করে চড়া আদেশ করেন তোফায়েল কাবির....

" এদিকে এসো ‌‌।

বাধ্যের ন্যায় এগোয় রমনী । দুহাতে দুখানা চুরি , আর নাকের নাক ফুলটা দুই কর্তার নজর এড়ালো না । সময় নেন তারা । রয়ে সয়ে জবান নামিয়ে সোজাসাপ্টা প্রশ্ন করেন ছোট কর্তা...

" এসব কি হচ্ছে মেঘা ? সাফ সাফ উত্তর করবে । তুমি কি চাইছো ? তুমি কি কোনো ভাবে এই সম্পর্কে থাকতে চাইছো ? ক্লিয়ারলি বলবে আজ ! আমি জানতে চাই তোমার থেকে !

মেঘা শ্বাস আটকে নেয় । চিবুক নামায় আরো বেশি ।

উত্তর করে না সহজে !

" কি হলো , বলো ? আমি জানতে চাইছি কিছু !

" তেমন কিছু না বাবা । উনি শুধু আমাকে পার্লার নিয়ে গেছিলেন । আর তেমন কিছু.....

" তেমন কিছু হয় কি না , সেটা আমাদের বোঝাতে এসো না । তুমি শুধু উত্তর দাও । তুমি থাকতে চাও এই সম্পর্কে ?

মেঘা নিরুত্তর । ঢিপঢিপ করছে বুক । ও জানতো , খুব শীঘ্রই ওকে এই প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হবে । এবার কি উত্তর করবে ও ? যে উত্তর গত পাঁচ বছর ধরে করে এসেছে , সেটার পূনরাবৃত্তি করবে ? নাকি নতুন উত্তর আমদানি করবে ‌‌। উত্তর হ্যাঁ অথবা না । কোন শব্দটা উচ্চারণ করবে সে ? ওর নীরবতা বুঝে হাঁফ ছাড়েন তোফায়েল কাবির । বলেন নিজে থেকেই....

" থাকতে দেবে তোমায় ? তুমি তো জানো মা , তোমার কেউ নেই । তোমার উপর জোর করারও কোনো অধিকার নেই আমাদের । আমরা কেবল আমাদের অকাতে রয়েছি । যদি তোমাকে থাকতে না দেয় , যদি তুমি নিজে থেকেই থাকতে না চাও । তাহলে রৌদ্র কে এভাবে আশকারা দিচ্ছো কেনো তুমি ? রৌদ্র বেপরোয়া, ওকে রুখতে পারবে না পরে । দমাতে পারবে না ওকে । আশকারা দিও না । কথা হয়েছে , #ইয়াশ আসবে ফেব্রুয়ারি তে । তুমি জানো নিশ্চয়ই । আমাদের আগে তোমার জানার কথা ।

ও এসে সবটা ধুয়ে মুছে তোমাকে নিয়ে যাবে । তোমাদের ডিভোর্স পেপার ও নিজে তৈরি করাবে ! আমরা বাঁধা দেবো না । দেওয়ার অধিকার রাখবো না ।

তুমি চলে যাবে । যাওয়ার আগে রৌদ্র কে মাত্রাতিরিক্ত অবাধ্য বানিও না । দূরে থাকো ওর থেকে ।

থামেন ভদ্রলোক । ঢোক গিলে বলেন.....

" ঘরে যাও এখন । কি বলেছি , আর কেনো বলেছি তা বোঝার ক্ষমতা আছে তোমার । বুঝেও অবুঝ থেকো না । যেটা হওয়ার নয় , সেটার প্রতি দূর্বলতা বাড়িও না । রৌদ্র কে এড়িয়ে চলো ।

মেঘার পা কাঁপে । জড়তা, ইতস্ততায় কোনো রকমে পা ফিরিয়ে উপরে উঠে যায় । যাওয়ার পথে টুপ করে পানি গড়ায় গাল বেয়ে । সত্যিই তো , ও কতটা বেহায়া হয়ে গেছে । সত্যিই আশকারা দিচ্ছে রৌদ্র কে । এটা তো হওয়ার কথা ছিলো না । সে তো শক্ত ছিলো । নরম হলো কবে থেকে ? লোকটা কবে ওর শক্ত আবরণ টাকে ভেঙে গুড়িয়ে দিলো ?

#চলবে…………

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৪০তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন