#আসবো_ফিরে_আবারো
#পর্ব_৭৭
#সুরভী_আক্তার
( অনুমতি ব্যতীত কপি করা নিষেধ ❌ )
লোকটার কথাতেও ভেতরকার উচাটন সামলে শান্ত হয়ে বসে রয় রমনী । জোহান খানিক নড়চড়ে বলে আবার....
" ভালো আছেন মিসেস ? ভালো না থাকলেও সমস্যা নেই । আমার জীবনে এসে গেছেন তো । এখন থেকে আপনাকে ভালো রাখার দায়িত্ব আমার । এবার আমার দিকে তাকান,,, একটু দেখি ।
সারা কিংকর্তব্য বিমূঢ় হয়ে বসেই রইলো । পারছে না চোখ তুলে তাকাতে । কেমন অস্থির লাগছে । হীম হয়ে যাচ্ছে শরীর । জোহান ওর অবস্থা বুঝে বলে.....
" এতোটা লাজুক আপনি ? অবশ্য,, লজ্জা নারীর ভূষণ । পেতেই পারেন । ভালো লাগে লজ্জাবতীকে দেখতে । এবার চলুন , আগে পরিচিত হই আমরা । আপনি তো বোধহয় আমাকে আগে দেখেন নি । জানেন না আমার বিষয়ে । তবে আমি আপনার বিষয়ে কিছুটা জানি ।
বি নরমাল সারা,, এতোটা অস্বস্তি পেতে হবে না । উই আর হাসবেন্ড ওয়াইফ । মানছি আমরা একে অপরের কাছে অচেনা, আমার দিক থেকে খুব সহজ হলেও আপনার দিক থেকে নয় । তবে সহজ তো করে নিতে হবে, তাই না ?
আমাদের চেনা জানাটা আগে থাকলে আপনি কম্ফোর্টেবল হতেন । বাট, আগে তো আমাদের মাঝে কথা হয় নি । আমি আপনাকে দুদিন ফোন করেছিলাম, আপনি ধরেন নি । তাই আর ডিস্টার্ব করিনি ।
এবারে চকিতে চাইলো সারা । বললো হকচকিয়ে....
" ফোন করেছিলেন ?
" হু,, আমাদের বিয়ে ঠিক হওয়ার পর দুদিন ফোন করেছিলাম ।
" ওও সরি ,,, আননোন নাম্বার খুব একটা রিসিভ করা হয় না । আমাকে তো আগে থেকে কেউ বলেনি, যে আপনি ফোন করবেন ।
" ইটস্ ওকে । এবার বলুন,, কেমন লাগলো আপনার এই অপরিচিত অর্ধাঙ্গ কে ? পছন্দ হয়েছে ? অন্যরা তো পছন্দ করার পর বিয়ে করে,, আপনি বলুন.... বিয়ে করার পর কি পছন্দ হলো আমায় ? আমি কিন্তু খারাপ না !
লোকটার কন্ঠে কেমন কৌতুক । সারা ঠোঁট ঠেলে মৃদু হাসে । জোহান হাসিতে তাল মিলিয়ে বলে দীর্ঘ শ্বাস ফেলে......
" ইউ নো,,, আপনার পিছে আমাকে ছয় মাস ঘুরতে হয়েছে । যে ওয়াদিন জোহান কোনো মেয়ের দিকে চোখ তুলে তাকায় নি কখনো,, সেই ওয়াদিন জোহান আপনার পিছে ছয় মাস ঘুরেছে, ব্যাপারটা ইন্টারেস্টিং না ?
সারা আশ্চর্য বনে যায় । সে জানে, এই বিয়ের সম্বন্ধ টা ছয় মাস ধরে ঝুলে ছিলো । এর বাইরে আর কিছু জানা নেই তার । সে সব কুন্ঠা ভুলে অবাক স্বরে শুধোয়.....
" তাহলে শুনি,,, ওয়াদিন জোহান আমার পিছে ছয় মাস কেনো ঘুরেছিলেন ?
" কারন আপনার দিকে চোখ তুলে তাকিয়েছিলাম, তাই ।
" বাকিদের ফেলে শুধু আমার দিকেই চোখ তুলে তাকালেন কেনো ?
" আমার মায়ের জন্য ।
" মায়ের জন্য ?
" হু, আমার মা । আর আপনার শাশুড়ি মা । আমার ফ্যামিলিতে এখন আপনি সহ আমরা তিনজন । আপনি, আমি আর আমার মা । আমার বাবা নেই । অনেক আগেই মারা গেছেন । ছোট বেলা থেকে মা একা হাতে বড় করেছে আমায় । ছোট বেলায় মা যেমন আমার সব আবদার পূরণ করতো, ঠিক তেমনি বড় হওয়ার পর আমি আমার মায়ের প্রতিটা আবদার পূরণ করার চেষ্টা করতাম ।
ঠিক সেরকমই একটা আবদার ছিলো আমার মায়ের, সেটা হলো আপনাকে তার ছেলের বউ করা ।
সারা আশ্চর্যান্বিত হলো । চোখ গোল করে আগ্রহী হয়ে জানতে চাইলো.....
" আন্টির আবদার পূরণে ?
" উঁহু,,, আন্টি নয় , মা বলুন সারা । মা বলতে হয় ।
লোকটার ভীষণ ঠান্ডা কন্ঠ ।
সারা মৃদু শিহরিত হয় । কেঁপে দৃষ্টি নামায় ।
" সরি !
" ইটস্ ওকে,,, অভ্যাস হয়ে যাবে । মা বলবেন, ওকে ?
মেয়েটা ঘাড় ঝাঁকায় আলতো করে । জোহান বড্ড শান্তশিষ্ট, একজন কোমল সুপুরুষ বটে । তার ঠান্ডা চরিত্রে এই ক্ষণিকেই বড্ড মুগ্ধ হচ্ছে সারা । লোকটা বলে....
" মা বোধহয় আপনাকে ভার্সিটিতে দেখেছিলো । আমার মা কিন্তু আপনার ভার্সিটির বাংলা লেকচারার ছিলেন । কোনো এক অছিলায় ভার্সিটিতে গিয়ে আপনাকে দেখেছে সেখানে । আর ফিরে এসেই তার আবদার জুড়ে বসেছেন । আপনাকে তার একমাত্র ছেলের বউ হিসেবে চাই । মায়ের কথাতে আমিও আপনাকে দেখতে গেছিলাম, সেবার ভার্সিটির গেইটের সামনে আপনাকে দেখলাম । ভালো লাগলো । তার পরদিনই মায়ের কথা শুনে বিয়ের প্রস্তাব পাঠালাম আপনাদের বাড়িতে ।
দু'দিন পর না দেখেই প্রত্যাখ্যান করলেন আপনি আমায় । শুনলাম মেয়ে নাকি এখন বিয়ে করবে না । মাকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম, মা বুঝলেন না । আপনার ফ্যামিলি রাজি ছিলো, তাই পরপর নির্লজ্জের মতো ঘুরতে থাকলাম আপনার পিছে । আপনি তো ভারী কঠোর ছিলেন সারা, বুঝলেন না আমায় ।
না বুঝেই ছয় মাস পার করলেন । অতঃপর সদয় হলেন ।
জোহান দীর্ঘ শ্বাস ফেললো সব বলার পর । সারা কিছু মুহূর্ত থম মেরে বসে থাকে ।
" তারমানে, মায়ের পছন্দে বিয়ে করেছেন আমায় ?
" মায়ের পাশাপাশি নিজের পছন্দে । আপনি সুন্দর সারা,, পছন্দ হওয়ার মতোই অমায়িক সুন্দর ।
মেয়েটা লজ্জা পায় । লাজুক হেসে চোখ নামায় । জোহান চেয়ে থেকে স্মিথ হাসে । এগিয়ে গিয়ে রমনীর হাঁটুতে মাথা কাত করে রাখে । বলে লাজুক লতার মুখপানে চেয়ে......
" কিছু কিছু ফুলে আমার এলার্জি আছে । তাই কোনো ফুল দিয়েই ঘর সাজানো হয় নি । মন খারাপ করেছেন ?
দুদিকে মাথা নাড়ায় মেয়েটা । জোহান দূরত্ব বাড়ায় । পাঞ্জাবির পকেট থেকে কিছু একটা বের করে । অতঃপর রমনীর বাম হাত টেনে অনামিকা আঙ্গুলে একখানা রিং পড়িয়ে দেয় সযত্নে । হাতের উল্টো পিঠে পরম আবেশে ঠোঁট ছুঁইয়ে বলে ফিসফিস করে...
" আপনার গিফট !
" থ্যাংক ইউ ।
" শুধু থ্যাংক ইউ ? রিটার্ন দেবেন না ?
" কিছু আনিনি তো ।
" কে বললো আনেন নি ? এইতো গোটা আপনি টাই এসেছেন, আমার সবচেয়ে বড় উপহার । আপনাকে হলেই দিব্যি চলবে !
মেয়েটা মিইয়ে যায় পুরো ।
লাল হয়ে ওঠে । গলা শুকিয়ে আসে । পেট ও খালি । ঢোক গেলে লাগাতার । নিজের হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বিছানা থেকে নামতে নামতে বলে চোখ চুরিয়ে......
" পানি খাবো !
জোহান ও নামলো পিছু পিছু ।
" পানি খেয়ে বসুন, আমি আসছি ।
সে বেরিয়ে গেছে বাইরে । ফিরে আসলো মিনিট পাঁচেকের মাথায় । হাতে খাবারের প্লেট । নিয়ে এসে পূর্বের অবস্থানে বসতে বসতে বলল.....
" পাগল মেয়ে,, খিদে পেয়েছে তো ? শুধু পানি খেলে পেট
ভরবে ? খেয়ে নিন ঝটপট ।
সারা পূণরায় আশ্চর্য বনে যায় ।
" এতো রাতে খাবার পেলেন কোথায় ?
" ফ্রিজে ছিলো । গরম করে নিয়ে আসলাম ।
" কিন্তু আমার তো খিদে পায় নি ।
" উঁহু, মিথ্যে বলতে নেই, সারা । আসার আগে তো কিছু খাননি । কখন খেয়েছেন কে জানে । খেয়ে নিন এখন ।
মেয়েটা মুগ্ধ হয় আবারো । আসলেই খিদে পেয়েছে । কথাই বের হচ্ছিলো না মুখ দিয়ে । সে ঢোক গিললো । হাতের দিকে তাকালো অসহায় চোখে । দু'হাতের দশ আঙুলে বড় বড় ফেইক নেইলস লাগানো । এগুলো ওঠানো হয় নি এখনো ।
হাতের দিক থেকে রমনীর নত দৃষ্টি উঁচু হওয়ার আগেই লোকটা লোকমা বাড়িয়ে বলে উঠলো.....
" দেখি, হা করুন ।
ছলকে তাকায় মেয়েটা ।
" কি হলো,,, নেইলস ফ্যাক্ট তাই তো ? ডোন্ট ওয়ারি , আমি খাইয়ে দিচ্ছি !
" আ...আমি পারবো খেয়ে নিতে । আমায় দিন ।
" উমমম, অবাধ্য হতে নেই । হাঁ করুন ।
অগত্যা হাঁ করলো রমনী । মুখে খাবার তোলার সাথে সাথে টুপ করে পানি ঝড়লো বাঁ চোখের কার্নিশ ঘেঁষে । সবটা এখনো ঘোর লাগছে তার কাছে । সত্যিই তার জীবনে এমন কেউ এসেছে ? জোহান লোকটা এতোটা ভালো বুঝি ? তার দিকে তাকিয়ে থাকতেও প্রশান্তি লাগছে এখন । তার কথা, আচরণ, মিষ্টি চাহনি, টুকটাক স্পর্শ, সবটাই কেমন উথাল পাতাল তান্ডব চালাচ্ছে রমনীর হৃদ কোঠরে । সে তো অন্য কাউকে চাইতো এই স্থানে, কিন্তু এসেছে অন্য কেউ । যে এসেছে, সে অমায়িক । তাকে কল্পনাও করে নি কখনো । কি ভাবলো আর কি হলো ? যদি এই স্থানে ইয়াশ থাকতো, তাহলে কি এভাবেই সারার যত্ন নিতো ? মানিয়ে নিতো কি ? হয়তো নিতো না, নিতো না বলেই তিনি এই স্থলে নেই । যার থাকার, সেই আছে ।
সারার নসীব সুন্দর,,, যে নসিবে এমন কেউ আছে , সে নসিব সুন্দর না হয়ে যায় কোথায় ?
,,,,,,,
মাঝে কেটেছে গোটা দিন ।
হসপিটালে নিজের কেবিনে বসে দাঁতে দাঁত পিষে রাগে ফুঁসছে ইয়াশ । ফর্সা মুখাবয়ব তামাটে বর্ন ধারন করেছে অত্যাধিক রাগে । পরিপাটি ছেলেটা অগোছালো কিছুটা । এলোমেলো মাথার চুল । রাগের দরুন ফুলে উঠেছে কপালের শিরা উপশিরা ।
সে একটা কলম নিজের হাতের মুঠোয় চেপে ধরে বসে আছে নিজের ডেস্কে ।
কানে বাজছে ইংরেজি আর বাংলার মিশেলে জগাখিচুড়ী পাকানো ভাঙ্গা ভাঙ্গা মেয়েলি কন্ঠ.....
" হোয়াট রাবিশ ইয়াশ । টুমি হামাকে রিজেক্ট করছো ? বাট হোয়াই ? ইউ নো হু আই এম ? আই এম #এভলিন_টেইলর । ইউ কান্ট ইমাজিন, আমি কি কি খরটে পারি !
ইয়াশ রাগ সামলে খুব স্বাভাবিক কন্ঠে বললো....
" ডু হোয়াটএভার ইউ ওয়ান্ট ।
এভলিন যেনো জ্বলে উঠলো তেলে বেগুনে । কাঁপতে কাঁপতে গিজগিজ করে উঠলো । ধবল শরীর খানা লাল হয়ে উঠেছে তার । ফুঁসছে রাগে । লস অ্যাঞ্জেলেসের এই বিখ্যাত প্রাইভেট হসপিটাল প্রোপাইটরের একমাত্র মেয়ে সে । মোটামুটি উশৃঙ্খল । সেই বছর তিনেক ধরে ইয়াশের পেছনে পড়ে আছে । এর মধ্যেই ইয়াশের পাত্তা না পেয়ে জড়িয়েছে হাজারটা সম্পর্কে । তবে ইয়াশ তার জেদ । সে তার জেদকে হাসিল করতে চায় । সে যে করেই হোক ।
ইয়াশ বরাবর রিজেক্ট করেছে ওকে । এমনকি চোখ তুলে তাকানোর অভিরুচি দেখায় নি কখনো । মেয়েটা উপেক্ষিত হয়েছে বারংবার । এতেই যেনো জেদ বেড়েছে আরো বেশি । আজকেও নানান টাল বাহানায় ফাঁকা কেবিনে ইয়াশের কাছাকাছি আসার চেষ্টা করেছে । তবে লাভ হয়নি । কদিন একটু শান্তিতে ছিলো ইয়াশ । দেশ থেকে ফেরার পর এই মেয়েটাকে দেখে নি । আজ হঠাৎ উদয় হয়েছে । চরম বিরক্ত তপ্ত যুবক ।
এভলিন হিসহিসিয়ে উঠলো.....
" ইউ উইল লস ইয়োর জব ইফ ইউ রিজেক্ট মি ।
তার হুমকিতে শব্দ করে হাসলো ইয়াশ । তাকালো এবারে । তবে তাকিয়ে থাকার রুচি কুলালো না । এক পলকেই দৃষ্টি সরিয়ে ব্যাঙ্গ করে বললো.....
" ইউ নো,,, বাংলায় একটা প্রবাদ আছে - ভাত ছেটালে কাকের অভাব পড়ে না । বুঝলে কি বললাম ? না বুঝলে ট্রান্সলেট করে নিও । ডক্টর ইয়াশের কম্পিটেন্স আছে । আই ডিডন্ট আস্ক ফর দিস জব, ইয়োর ফাদার ফোর্সড আস টু টেক ইট । সো,,, নিজের বাপের কাছে যাও । ইফ ইউ ডিস্টার্ব মি এগেইন, দ্যা কনসিকুয়েন্সেস উইল বি ব্যাড । মাইন্ড ইট....
এভলিন ফোঁস করে ওঠে । রাগে ক্ষোভে হিসহিসিয়ে কেবিন থেকে বেরিয়ে আসতে চায় । মাড়ি খিচে আওড়ায় হুমকি স্বরূপ.....
" আই ওয়ান্ট স্পেয়ার ইউ ,, ইয়াশ ।
তার কথার পিছে তাৎক্ষণিক ডাকে তপ্ত যুবক....
" ধরতে দিলে তবেই না ছাড়বি । অ্যান্ড বাই দ্য ওয়ে, স্টপ সেন্ডিং ফ্লাওয়ার্স আউটসাইড মাই হাউস ফ্রম নাও অন ।
এভলিন থামে । ঘাড় ঘুরিয়ে অবাক হওয়ার মতো করে বলে......
" হোয়াট ?
বিড়বিড় করে ইয়াশ.....
" ইংরেজের বাচ্চা দেখি ইংরেজি বোঝে না । উফফফ, ডিসগাস্টিং ।
এই শোনো,,, নেক্সট টাইম থেকে আমাকে ইমপ্রেস করার চেষ্টাও করবে না ভুলে । ফুল পাঠাবে না আমার বাড়িতে ।
মেয়েটা টুকটাক বুঝলো.....
" হোয়াট আর ইউ টকিং অ্যাবাউট ? হোয়াট ফ্লাওয়ার্স ? হু সেন্ডস দেম ?
" স্টপ ড্রামা হিয়ার । আই সেইড আউট অফ মাই কেবিন ।
এভলিন বেরিয়ে যায় । তার পরপরই বেরিয়ে আসে ইয়াশ ও ।
,,,,
হসপিটাল থেকে বেরিয়ে সোজা অ্যাপার্টমেন্টে ফিরেছে সে । তখনো রাগ লাগছে তার । ঐ মেয়েটাকে সে মোটেও সহ্য করতে পারে না । ভিন্নধর্মী উশৃঙ্খল এক মেয়ে । সেই শুরু থেকেই ওর উপর অতিষ্ঠ হয়ে আসছে ইয়াশ । হসপিটাল থেকে রেজিগনেশন নিতেও চেয়েছিলো । পারেনি কেবল এভলিনের বাবার জন্য । ইয়াশের মতো অল্প সময়ে অনেকটা এক্সপার্ট হয়ে যাওয়া ডক্টর কে হাত ছাড়া করতে চাইবে কোনো বলদ ?
বাড়ি ফিরেই নিজেকে ধাতস্থ করতে প্রথমেই লম্বা শাওয়ার নিয়েছে ইয়াশ । অতঃপর বেরিয়েছে ঘর থেকে । টুকটুকি নিশ্চয়ই রুমে । ইয়াশের ফেরার আভাস পেয়েও বেরোয়নি রুম থেকে । আজকাল মেয়েটা খুশি থাকে বেশ । ভয় পায় না । আগে যখন বাড়িটা অন্ধকার ছিলো, তখন রাত নামতেই গুটিয়ে যেতো । ভয় পেতো ।
এখন সন্ধ্যা । ইয়াশ নিজের জন্য এক কাপ কফি বানাতে কিচেনে যায় । সকালে বাইরে থেকে খাবার এসেছিলো । কেবিনেটের উপর প্রত্যেকটা খাবারের বাটি ঢেকে রাখা । কৌতূহল বশত ঢাকনা সরিয়ে দেখতেই কপাল কুঁচকে আসে যুবকের । খাবারে নড়চড় হয় নি একটুও । ঐ মেয়েটা কি খায় নি ?
ইয়াশ দ্রুত এক কাপ কফি বানিয়ে পাশের রুমে যায় । নিঃশব্দে দরজা ঠেলে ভেতরে ঢোকে । বিছানার উপর নজর পড়তেই আরো বেশি কুঁচকে যায় কপাল । জড়োসড়ো হয়ে কোমর অবধি চাদর টেনে একেবারে কুঁকড়ে শুয়ে আছে শাফাহ্ ।
ইয়াশ না ভেবে এগোলো মগে চুমুক বসাতে বসাতে ।
ডাকলো পাশে দাঁড়িয়ে......
" টুকটুকি ?
মেয়েটার সাঁড়া নেই । মাথার চুল এলোমেলো হয়ে ছড়িয়ে আছে মুখের উপর । বোধহয় ঘুমিয়েছে । কিন্তু এই ভর সন্ধ্যায় ঘুমোবে কেনো ?
ইয়াশ আলগোছে পাশে বসলো । কফির মগ রেখে হাত বাড়িয়ে রমনীর মুখের উপর ছড়ানো খুচরো চুল গুলো সরিয়ে দিয়ে স্পষ্ট করলো মুখখানা । মেয়েটা ওষ্ঠ উল্টে ঘুমোচ্ছে । ইয়াশ আনমনে মৃদু হাসলো । ডাকলো ঝাঁকিয়ে.....
" এইই টুকটুকি,,, ওঠো ?
বেশ কবার ডাকার পর রমনী নড়েচড়ে ওঠে । পিটপিট করে চোখ খোলে । তবে নিস্তেজ তার শরীর । অন্য সময় হলে ইয়াশ কে কাছে দেখে ধড়ফড়িয়ে উঠে বসতো । এখন তেমন কিছুই করলো না । চোখ মেলে তাকালো কোনো রকমে । পরক্ষণে অবিলম্বে চোখ বুজলো আবার ।
ইয়াশ ওর অবস্থা ঠাহর করতে না পেরে চোখ সরু করে । গুরুভার কন্ঠে শুধোয়.....
" কি হয়েছে ? এভাবে অসময়ে ঘুমাচ্ছো কেনো ?
মেয়েটা কেবলই দুদিকে মাথা নাড়ালো ।
ইয়াশ বুঝলো না ওর হাবভাব ।
" এইই মেয়ে,,, ওঠো বলছি । খাও নি এখনো ? কি হয়েছে বলবে তো ?
" কিছু না । আপনি যান ।
" যাবো মানে,, কোথায় যাবো ? এমন করছো কেনো ? কি হয়েছে ?
শাফাহ্ ধীরে ধীরে উঠে বসে । এক হাতে পেট চেপে ধরে রাখা । দৃষ্টি তুললো না মেয়েটা । যেনো ভীষণ আড়ষ্ট সে । ঠোঁট ভিজিয়ে কেঁপে কেঁপে বললো.....
" কিছু হয় নি । আপনি এখান থেকে যান প্লিজ ।
ইয়াশ রেগে তাকালো এবার । অসন্তোষ প্রকাশ করে ধমকালো.....
" কিছু হয়নি তাহলে অসময়ে শুয়ে আছো কেনো, স্টুপিড ? চলো কিচেনে, রাতের রান্না করবে তুমি আজ । অনেক হয়েছে তোমার ফাঁকিবাজি ! সেদিন রান্নার কথা বলে ভুলে গেছো ? আজ থেকে রান্না শিখবে তুমি । আমি ফ্রি আছি । চলো ।
শাফাহ্ চমকায় । মিনমিন করে.....
" আজ না ।
" কেনো ? আজ কি প্রবলেম ?
" এমনি । আই হ্যাভ অ্যা স্টামাক-এইক ।
" বাহানা দিচ্ছো ?
" না , সত্যি । আপনি যান প্লিজ । আমার ভালো লাগছে না কিছু । কাল রান্না শিখবো প্রমিস ।
মেয়েটার কেমন কাতর চাহনি । সাথে ধরা কন্ঠ । মুখ খানাও মলিন । দেবে গেছে চোখের নিচ । শুষ্ক ওষ্ঠ জোড়া । ইয়াশ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ওকে আগাগোড়া পরখ করে । মেয়েটা ওর সম্মুখে টিকে থাকতে পারে না । তীব্র অস্বস্তিতে পাশ ফিরে শুয়ে চাদর টেনে নেয় গায়ে ।
ইয়াশ তখনো বিষ্ময় নিয়ে মেয়েটাকে পরখ করতে ব্যস্ত । আকস্মিক মাথা চাড়া দিয়ে উঠলো তার । কুঁচকানো মুখাবয়বে কিঞ্চিত বদল আসলো ।
তড়িঘড়ি করে মনে করার চেষ্টা করলো । আজ আঠারো তারিখ । ওরা আমেরিকায় এসেছে প্রায় এক মাস হতে চললো ।
হিসেব কষলো সে । মেয়েটার অবস্থা সাপেক্ষে কিছু একটা আন্দাজে আসতেই ফের কুঁচকে ফেললো মুখখানা । শ্বাস ফেললো ফোঁস করে । আর কথা বাড়ালো না । উঠে দাঁড়িয়ে গটগট পায়ে বেরিয়ে আসলো । শুধু রুম থেকেই নয়, বেরিয়ে গেলো বাড়ি থেকেই ।
সে অ্যাপার্টমেন্টে ফেরে বিশ মিনিটের মধ্যেই ।
তবে তার শান্ত মুখাবয়ব বিগড়ে যায় দরজার সামনে ফুলের বুকে দেখা মাত্রই । তড়তড়ে হয়ে যায় মেজাজ । আজও ফুল এসেছে । এভলিন তো বললো সে ফুল দেয়নি কোনো । ইনফ্যাক্ট এতো দিন সে নিজেও আমেরিকায় ছিলো না । তাহলে রোজ রোজ এই ফুল কে দিচ্ছে ওদের দরজায় ? নাকি ভুল ঠিকানায় চলে আসছে এই বুকে গুলো ?
ইয়াশ থম মেরে দাঁড়িয়ে দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে রয় ফুলের বুকের দিকে । তার মাথায় বিন্দুমাত্র ধারনা আসে না এই নিয়ে ।
এই মুহূর্তে সে এসব ভাবতেও চায় না । ফুল গুলো ইগনোর করে বাড়ির ভেতর ঢোকে । হাতে বেশ কতকগুলো শপিং ব্যাগ । সব হাতে নিয়েই সে সোজা রুমের দরজায় কড়া নাড়ে । ঠান্ডা মৃদু স্বরে অনুমতি চায়.....
" টুকটুকি ,, আসবো ?
বিছানার একপাশে গুটিসুটি মেরে বসে ছিলো শাফাহ্ । ইয়াশের কথায় আকস্মিক চমকে আড়মোড়া ভেঙে সোজা হয়ে বসলো । মুখাবয়বের ব্যাথিত ছাপ ঠেলে স্বাভাবিক করলো ।
" অনুমতি নিচ্ছেন কেনো হঠাৎ ?
ইয়াশ ভেতরে ঢোকে । বিনা বাক্যে হাতের সবগুলো প্যাকেট বিছানার উপর রাখে । অতঃপর তাকায় মেয়েটার মলিন মুখ পানে ! শাফাহ্ বুঝতে না পেরে জানতে চায়.....
" এগুলো কি ?
ইয়াশ নাক ফুলিয়ে বিড়বিড় করলো......
" স্টুপিড কোথাকার ।
কিছু বললো না আর । বড় বড় পা ফেলে দ্রুত বেরিয়ে আসলো রুম থেকে ।
তার এমন অদ্ভুত ব্যাবহারে আশ্চর্য বনে যায় শাফাহ্ । ঘাড় উঁচিয়ে ওষ্ঠ উল্টায় । লোকটা অদ্ভুত ।
তবে সে আগ্রহ দমিয়ে রাখতে পারে না । হামলে পড়ে ব্যাগ গুলোর উপর । মোটে চারটে ব্যাগ ।
প্রথম ব্যাগ গোটাটাই চিপসের প্যাকেটে ভরা । দ্বিতীয় টায় ওর পছন্দ মতো বিভিন্ন ধরনের পেস্ট্রি আর চকলেট আইটেম । শাফাহ্ হা বনে যায় এসব দেখে । আরো বেশি নুইয়ে যায় , তৃতীয় এবং চতুর্থ ব্যাগের মেনস্ট্রুয়াল প্রোডাক্টস গুলো দেখা মাত্রই । হট ওয়াটার ব্যাগ থেকে শুরু করে প্রয়োজনীয় সবকিছু আছে ।
শাফাহ্ আহম্মক বনলো এসব দেখে । ঝিমঝিম করে উঠলো মাথাটা । লোকটা কি এনেছে এগুলো ? বুঝলোই বা কি করে ? মেয়েটা আকস্মিকই অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে । কেমন রাঙা হয়ে ওঠে লাজে । উষ্ণ ধোঁয়া ছাড়ে দু কান ।
ইশ্, কি বিড়ম্বনায় পড়লো । থ বনে বেশ কয়েক মিনিট বসে রইলো সব কিছু সামনে নিয়ে ।
ফের ইয়াশ আসলো ঘরে । পায়ের শব্দ পেতেই থতমত খেলো মেয়েটা । দ্রুত চোখ মুখ নামিয়ে সিটিয়ে বসলো । ইয়াশ রুমে এসে একটা হট ওয়াটার ব্যাগ এগিয়ে দেয় শাফাহ্'র দিকে । ভারিক্কি কন্ঠে বলে.....
" এমনি সময় তো পকর পকর করো ,, অথচ দরকারের সময় চুপ করে বসে ছিলে, স্টুপিড একটা ।
কোনো জিনিস প্রয়োজন হলে বলতে হয় । এখানে আমি ছাড়া আর কেউ নেই তোমার ! অতো হেজিটেট করতে হবে না । ইটস আ ভেরি কমন থিং । শুধু এসব কেনো , তোমার বিষয়ে আরো অনেক কিছু জানার অধিকার রাখি আমি । নো নিড টু বি সো শাই অ্যারাউন্ড মি ।
ইয়াশের একটানা কথায় শাফাহ্ খচখচ করলো । কাঁচুমাচু দৃষ্টি তুললো ধীরে । অমনি চোখাচোখি হলো ইয়াশের সাথে । মেয়েটা আবার তড়িতে চোখ নামিয়ে নেয় আড়ষ্টতায় । ইয়াশ পাশে বসে । এ বেলায় নরম হয়ে আসে যুবক । তর্জনী দিয়ে আলগোছে রমনীর চিবুক উঁচিয়ে ধরে শুধোয় মোলায়েম কন্ঠে.....
" খুব বেশি পেইন হচ্ছে ?
শাফাহ্ দুদিকে মাথা নাড়ায় বাধ্য হয়ে । স্বাভাবিক হলেও অদ্ভুত ভাবে ভীষণ অস্বস্তি লাগে তার । শরীরে মৃদু কম্পন বয় । কথা ফোটে না জবানে ।
ইয়াশ বলে ওর অপ্রস্তুত অবস্থা বুঝে.....
" ইটস্ ওকে । সেরে যাবে । চকলেট, চিপস, সব এনেছি । আর কি খাবে বলো ?
শাফাহ্ ইয়াশের এমন অভাবনীয় ব্যাবহার দেখে বোকার ন্যায় মুখ ফসকে বলে বসলো.....
" আপনি এতো ভালো হলেন কি করে ?
তাৎক্ষণিক আঁখি লতা কুঁচকে আসে ইয়াশের.....
" আমি খারাপ ?
" না,, এতো কেয়ারিং ও তো নন । আজ একটু বেশিই করে ফেলছেন না ?
" আমি কতটুকু কেয়ারিং, তা তুমি আন্দাজ ও করতে পারবে না । বলো, আর কি লাগবে ?
" আমাকে একটা ফোন কিনে দেবেন ? সারাদিন একলা থাকি , ভালো লাগে না । অভ্যাস নেই একলা থাকার ।
" বোর হও ?
রমনী উপর নিচ মাথা নাড়ায় । ইয়াশ বলে.....
" সারাদিন একলা থাকো, খুব বেশি খারাপ লাগে ?
" আপনি থাকলে লাগে না ।
" কিন্তু আমি তো থাকিই না । হসপিটালে যেতে হয় আমাকে ।
" যতক্ষণ থাকেন, ততক্ষণ স্বস্তি লাগে । না থাকলে এই গোটা বাড়িতে একলা ভয় লাগে আমার । সময় কাটতেই চায় না । বাড়িতেও কারোর সাথে কথা বলতে পারি না । আপনি কথা বলতেও দেন না । নিজেও কথা বলেন না আমার সাথে । উল্টে আমি কথা বলতে গেলে ধমক দিয়ে চুপ করিয়ে রাখেন ।
মেয়েটার কন্ঠ রোধ হয়ে এসেছে । শেষ পর্যায়ে থামলো । বোধহয় আরো কিছু বলার ছিলো । বললো না । ছলছল চোখ জোড়া নামিয়ে নিলো ।
ইয়াশ কেমন অদ্ভুত ঘোর লাগা দৃষ্টিতে পরখ করলো ওকে । রমনীর চোখের ভেজা কার্নিশ দেখা মাত্রই কেমন ধড়ফড় লাগলো তার ।
" আচ্ছা,,, ফোন কিনে দেবো । ওকে ?
মেয়েটা নাক টেনে বলে......
" শপিং ? এসব পড়ে থাকবো সারাজীবন ?
" হু ,, ভালো লাগে তো এসবেও !
" উদ্ভট লাগে ।
" উঁহু, সুন্দর লাগে ।
" সুন্দর বলছেন আমায় ?
ইয়াশ ঘাড় উঁচায় । দায়সারা বলে.....
" অসুন্দর নও । সুইট তুমি !
শাফাহ্ ছলছল চোখ সমেত হেসে উঠলো মুখ টিপে । এই প্রথম দু'জনের মধ্যে এমন রসিয়ে রসিয়ে আলাপন হচ্ছে । বেশ অবিশ্বাস্য । সে সন্দিহান হয়েই বললো ঠোঁট টিপে......
" আপনাকে ভূতে ধরেছে ?
" কেনো ?
" এতো মিষ্টি মিষ্টি কথা বলছেন ! মনে হচ্ছে স্বপ্ন দেখছি আমি ।
ইয়াশ উঠে আসলো । পেছন দিকে পা বাড়িয়ে ঘর থেকে বেরোতে বেরোতে বললো.....
" ভূতে নয়,,, টুকটুকি ধরেছে আমায় ।
,,,,,,
আজ উনিশ তারিখ । রৌদ্র আর মেঘা সুইজারল্যান্ডে এসেছে বেশ কদিন হলো । এর মধ্যে রৌদ্র প্রথম দিন ব্যাতীত খুব একটা বাইরে বেরোয়নি আর । অফিসের কাজ বাড়িতে বসেই করেছে । মেঘার মনে খচখচানি বাড়তে দেয় নি সে । যথেষ্ট সময় দিয়েছে মেঘাকে । সদ্য জন্মানো ভুল ধারনার বীজ উপড়ে ফেলার জন্য যথেষ্ট কসরত করেছে রৌদ্র ।
মেঘা ওকে ভুল বোঝার সুযোগ পায় নি আর । বরং রৌদ্রের সম্বন্ধে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জেনেছে আরো অনেক কিছু । লোকটা এতো বড় ইন্ডাস্ট্রির সিইও, অথচ কেউ জানেই না । তাকে নিয়ে কতই না ভুল ধারনা সবার মনে ।
মেঘা বাড়িতে সবকিছু জানাতে চেয়েছিলো । রৌদ্র জানাতে দেয়নি । তোফায়েল কাবির কোনো একদিন রৌদ্র কে তিরস্কার করেছিলেন । সেকথা ভোলেনি রৌদ্র । ছেলের মদ গেলা , বেপরোয়া স্বভাব তার অপছন্দ ছিলো বরাবর । পছন্দ ছিলো কেবলই বাধ্য সন্তান আদ্র'কে ।
বাপ ছেলের মাঝে ভুল বোঝাবুঝি আছে এই নিয়ে ।
রৌদ্র তার সামনে অপরিবর্তনীয়ই থাকবে সবসময় । সে তার পছন্দের তালিকায় যেতে চায় না ।
মদ গেলার জন্য অপছন্দ ছিলো, এখন নিশ্চয়ই নামধাম জানার পর ছেলেকে নিয়ে গর্ব করবেন তিনি ।
কিন্তু সেটা চায় না তার বেপরোয়া ছেলে । বাপের উপর তার বিরাট অভিমান । সে সারাজীবন নিজেকে এক ভাবেই পেশ করতে চায় । সে বেপরোয়া, পরোয়া নেই কারোর । একমাত্র ইভারা ব্যাতীত ।
এখন স্বাভাবিক ভাবেই চলছে ওরা দুজন ।
তবে আজ সকাল সকাল তৈরি হতে লেগে পড়েছে রৌদ্র । অফিসে বেরোবে । ওকে কখনো ফর্মাল ড্রেসআপে দেখেনি মেঘা । এখানে এসেই প্রথম দেখেছে । লোকটা বেশ ম্যাচিউর । অথচ ভান ধরে মাতালের । সবার চোখে বেপরোয়া, ছন্নছাড়া, বদমেজাজি হয়েই রইলো ।
রৌদ্র কে তৈরি হতে দেখে সুযোগ পায় মেঘা । লুফে নেয় তৎক্ষণাৎ.....
" কোথাও যাবেন ?
" উমম সুইটহার্ট,, অফিসে ।
" আমিও যাবো । সেই এসেছি থেকে ঘরবন্দি হয়ে আছি । কোথাও নিয়ে যাচ্ছেন না আমায় ।
রৌদ্র মেঘার দিকে ঘোরে, রমনীর কাছে এসে এক গুচ্ছ কুন্তল টেনে নাক ডুবিয়ে বললো শান্ত হয়ে....
" বাইরের পরিস্থিতি খুব একটা ভালো নয় ইভারা । সামনে জেনারেল ইলেকশন । যেকোনো সময় যেকোনো জায়গায় ঝামেলা বাঁধতে পারে । বাইরে বেরোনো ঠিক হবে না । ইয়োর সেফটি ইজ মাই টপ প্রায়োরিটি । ঝামেলা শেষ হোক,,, গোটা দুনিয়া ঘোরাবো আমি তোমায় ।
" আপনি সাথে থাকলে আলাদা করে আমার সেফটির প্রয়োজন পড়বে না । অফিসেই তো যাচ্ছেন । সেখানে তো যেতেই পারি আপনার সাথে । আমিও যাবো । দেখবো আপনার অফিস । আর বাকিদের কেও ।
রৌদ্র বোধহয় বেকায়দায় পড়লো । তবে স্বাভাবিক রাখলো নিজেকে । মেঘা কে কিছু বুঝতে না দিয়ে খানিক ভেবে বললো.....
" ওকে সানি,,, গেট রেডি ।
সম্মতি পেয়ে চিকচিক করে ওঠে একবিংশী । দীর্ঘ হাঁফ ছাড়ে ।
রৌদ্র যেমন ওকে কিছুই বুঝতে দিচ্ছে না, ঠিক তেমনি মেঘাও রৌদ্র কে কিছু বুঝতে দিচ্ছে না ।
তৈরি হওয়ার জন্য লেগে পড়ে মেঘা । ততক্ষণে ফোন বের করে মাহিরের কাছে কিছু একটা বার্তা পাঠায় রৌদ্র ।
,,,,,
বাড়ি থেকে অফিসের পথ হাঁটার পথে পাঁচ মিনিট নয়, দশ মিনিট হবে প্রায় । তবে গাড়িতে যেতে বেশিক্ষণ সময় লাগে না । এই মিনিট দুয়েক । সচরাচর রৌদ্রের গাড়ির পিছে আরো দুটো গাড়ি থাকে প্রটেকশন এর জন্য ।
রৌদ্রের আলাদাই ভাবমূর্তি এখানে । মেঘা এই কদিনে বুঝে গেছে । মানিয়ে নিয়েছে । তবে এখনো ঘোর লাগে তার । ক্ষণে ক্ষণে আপ্লুত বনে চেয়ে রয় রৌদ্রের পানে । তার গাড়ির দরজা খুলে দেওয়ার জন্যেও লোক আছে আলাদা । এই বেপরোয়া লোকটা এতো ইনফ্লুয়েনশিয়াল ? অথচ তার সম্বন্ধে কতই না ভুল ধারনা করে সবাই ।
অফিসের সামনে গাড়ি থামে । আকাশচুম্বী বহুতলা ভবন । মেঘা গাড়ি থেকে নেমে নিচে দাঁড়িয়ে মাথা উঁচিয়ে তাকায় । মুখ ফাঁক হয়ে আসে তার । রৌদ্র পাশে দাঁড়িয়ে মুচকি হেসে বলে.....
" লেটস গো MP ।
ভেতরে ঢোকে ওরা । আশপাশ না তাকিয়ে সোজা লিফটে ওঠে । লিফট থামে দশ তলায় । রৌদ্রের হেড অফিস দশ তলাতেই । মেঘার হাত চেপে ধরে কোনো দিকে না তাকিয়ে মাথা নিচু করে সবাইকে টপকে সোজা নিজের কেবিনে ঢুকে গেলো সে । তার উপস্থিতির আভাস পেয়েই দাঁড়িয়ে গেছেন সব কর্মীরা ।
রৌদ্রের সাথে ওভাবে একটা মেয়েকে দেখে অবাকই হয়েছেন সকলে । তবে বেপরোয়া যুবক কাউকেই তোয়াক্কা করলো না । গটগটিয়ে সোজা ঢুকে গেলো অফিস রুমে । কাঁচের দরজা ভেদে উঁকি ঝুঁকি হলো পেছন থেকে ।
নিজেদের গুরুগম্ভীর বসের সাথে একটা মেয়েকে দেখে হৈচৈ পড়লো মুহুর্তেই । শুরু হলো কানাঘুষো ।
কেবিনে ঢোকা মাত্রই মেঘা তিতি বিরক্তি থেকে তেঁতে ওঠে.....
" এভাবে গটগটিয়ে নিয়ে আসলেন কেনো ? কাউকেই তো দেখতে পেলাম না !
" কাকে দেখার ইচ্ছে ছিলো ?
" সুন্দরী সুন্দরী মেয়েদের,,, যাদের সাথে কাজ করেন তাদের ।
" আমি ওদের সাথে কাজ করি না,,, ওরা আমার আন্ডারে কাজ করে । ওদের দেখে লাভ নেই জান পাখি ।
মেঘা জিদ্দি খেয়ে বললো.....
" আমি দেখবো ।
" ওকে ! মাহির, এক কাজ করো,,,, অফিসের প্রত্যেকটা স্টাফকে আমার কেবিনে হাজির করাও । এক্ষুনি ।
মাহির বাইরে ছিলো । ডাক পেয়ে ভেতরে এসে আদেশ পাওয়া মাত্রই তাৎক্ষণিক আদেশ তামিল করলো । মেঘার চোখের পলকে মুহুর্তেই ভরে গেলো পুরো কেবিন । একে একে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ালেন অফিসের প্রত্যেকটা স্টাফ । একদিকে মেয়ে, অন্যদিকে ছেলে ।
মেঘা আহম্মক বনলো । তবুও খুঁতখুঁতুনি গেলো না তার । তীব্র সন্দেহ নিয়ে চোখ সরু করে একে একে প্রত্যেকটা মেয়েকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগলো । মেয়েগুলো সবাই সুন্দর ।
ডেস্কের সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ঠোঁট টিপে মেঘার কান্ড বেশ আয়েশি হয়ে অবলোকন করছে রৌদ্র । দুহাত পকেটে তার । মেঘা পিছু ফিরে গাল ফুলিয়ে রৌদ্রের দিকে তাকালো । গটগটিয়ে এগিয়ে গিয়ে বললো চড়া কন্ঠে...
" এখানে এদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সুন্দর কে ?
" তুমি !
রৌদ্রের গা ছাড়া জবাব । মাহির ঠোঁট টিপে হাসে । বাকিরা বোঝে না বাংলা ।
মেঘা ফোঁস করে উঠলো......
" ঢং করবেন না রাইনো মুখো ! ওদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সুন্দর কে,, দেখে বলুন ?
" তুমি সামনে থাকলে অন্য কাউকে দেখার ফুরসৎ নেই আমার । তুমি ছাড়া আমার চোখে এই জগত সংসারে আর কাউকেই সুন্দর লাগে না, সুইটহার্ট । আমার চোখে সবচেয়ে বেশি সুন্দর তুমি, সুন্দরের থেকেও সুন্দর ।
" ওরা বিবাহিত ?
পাশ থেকে উত্তর করে মাহির.....
" সবাই না ।
" বেবি আছে ওদের ? কার কার বেবি আছে ?
মেঘার তীক্ষ্ণ কন্ঠে বেবির কথা শুনে নড়েচড়ে ওঠে রৌদ্র । সোজা হয়ে দাঁড়ায় । চোয়াল শক্ত করে । ঠোঁট ভিজিয়ে আকস্মিক রেগে যায় । সারিবদ্ধ ভাবে দাঁড়ানো প্রত্যেক টা মেইল স্টাফের উদ্দেশ্যে বজ্র ধমক দেয়.....
" হেয়য়য়, আইস ডাউন । সি ইজ মাই প্রপার্টি ।
মেইল স্টাফের মধ্যে ছোকরা ছেলে আছে কতকগুলো । তাদের মধ্যে কজন এতক্ষণ ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে ছিলো মেঘার পানে । রৌদ্রের এমন রণমূর্ত ধমকে চমকে উঠলো সকলে । সাথে মেঘাও । ছেলে গুলো ধড়ফড় করে দৃষ্টি নামালো ।
" স....সরি স্যার ।
" আউট !
মুহুর্তেই খালি হলো পুরো কেবিন । হুড়হুড় করে বেরিয়ে গেলো সকলে । মেঘা থতমত খেয়ে গেছে আকস্মিক ।
মেঘার মন ঘোরাতে রৌদ্রের আকস্মিক এই পরিবর্তন । রমনী ধরতে পারলো না তার চাল । শান্ত হয়ে বললো.....
" কি হলো,,,, হঠাৎ রেগে গেলেন কেনো ?
" নাথিং ।
,,,,,,
আজ বিয়ের তিন দিনের মাথায় শিকদার বাড়িতে ফিরবে সারা আর জোহান । বেরোবে বিকেলের পর , আর এখন বাজে সাড়ে তিনটে । হুট করেই অফিস থেকে ডাক পড়েছে । এই মুহূর্তে অফিসে যেতে হবে ওকে । ফিরেই সারা কে নিয়ে বেরোবে ।
মিররের সামনে দাঁড়িয়ে গলার টাই বাঁধছে সে ।
বিছানার পাশে মলিন মুখে ওকে পরখ করছে সারা । জোহান আড়চোখে ওকে দেখে বললো......
" মুখখানা অমন কালো করে রেখেছেন কেনো, সারা ?
মেয়েটা উত্তর করলো না । ওর উদাসীনতা দেখে জোহান এগিয়ে আসলো । হাতের কাজ শেষ না করে পেছনে হাত গুটিয়ে বললো.....
" টাই টা বেঁধে দিন তো ?
মেয়েটা বীনা বাক্যে কথা শুনলো । জোহান ওর ভার মুখখানা দেখে বললো.....
" আরে পাগল,, অফিস থেকে ফিরেই তো নিয়ে যাবো । এতে মন খারাপ করার কি আছে ? কাজ পড়ে গেছে । যেতে তো হবে, তাই না ?
" তো যান । আমি কি বাঁধা দিয়েছি নাকি ?
" এভাবে মুখ ভার করে রেখে তো বাঁধাই দিচ্ছেন এক প্রকার । আমি কি বুঝি না ?
" বাঁধা মানবেন না,,, তো বুঝে লাভ কি ?
মেয়েটা টাই বেঁধে দিয়ে সরে আসলো ।
এমন সময় ঘরে আসলেন জহরা বেগম । জোহান কে তৈরি হতে দেখে কপাল কুঁচকে বললেন.....
" এ কি,,, কোথায় যাচ্ছিস এখন ?
" অফিসে বেরোবো মা ।
" অফিসে মানে ? একটু পর না ও বাড়িতে যাওয়ার কথা ।
" ফিরে এসে যাবো ।
জহরা বেগম একটু রাগি গলায় বললেন আদেশের সুরে....
" অফিসে গেলে তোর মনে আর কিছুই থাকে না । আজ এই অসময়ে আর কোথাও যেতে না । সারা কে নিয়ে ডিরেক্ট ও বাড়িতে যাবি । অফিসের ব্যাপার অন্য কাউকে ম্যানেজ করে নিতে বল । নতুন বিয়ে হয়েছে, ছুটি নেই তোর ?
জোহান একটু ভাবলো । আড়চোখে সারা কে দেখে বললো.....
" আচ্ছা, আমি ম্যানেজ করছি । যাবো না কোথাও । হয়েছে এবার ?
স্মিথ হাসলেন ভদ্রমহিলা । সারাকে নিজের ঘরে আসার কথ বলে বেরিয়ে গেলেন ।
সারা রুম থেকে বের হতে গেলে পেছন থেকে জোহান ডাকে.....
" এই যে বউ, যাচ্ছি না আমি কোথাও । এবার একটু খুশি হতে পারেন ।
সারা পিছু ফিরলো । হাঁফ ছেড়ে বললো.....
" যেইনা মা বারন করলো , সেই এখন আর যাচ্ছেন না । তাই তো ? আপনি আপনার মায়ের বাধ্যগত সন্তান হয়েছেন একদম !
আলতো হাসে জোহান । স্ত্রীর দিকে কদম বাড়িয়ে বলে...
" হু, তা ঠিক । তবে বউ যদি চায় , তাহলে বউয়ের বাধ্যগত স্বামী হতেও রাজি আছি আমি । কিন্তু হ্যাঁ,, আমার বউটার উচিত আমার মাকে নিজের মায়ের মতো শ্রদ্ধা করা । বুঝেছেন বউ, আমার মা'কে একটু ভালোবাসবেন শুধু । বিনিময়ে আপনাকে অনেক অনেক গুণ বেশি ভালোবাসবো আমি । পুরো মাথায় তুলে রাখবো ।
সারাও স্বভাব সুলভ মুচকি হাসে । ছেলেটা মা ভক্ত । এই কদিনে বুঝেছে বেশ ।
#চলবে..........