ফন্ট সাইজ:
থিম:
আসবো ফিরে আবারো

৮3তম পর্ব

লেখক: সুরভী আক্তার

#আসবো_ফিরে_আবারো

#পর্ব_৮৩
#সুরভী_আক্তার
( অনুমতি ব্যতীত কপি করা নিষেধ ❌ ) 
সোফার উপর ফোন রেখে ভিডিও কলে গত রাতে রৌদ্রের দেওয়া গিফট গুলো একে একে সবাইকে দেখাচ্ছিলো মেঘা । ফোনের ওপাড়ে রুবিনা কাবির, শাহিনা কাবির, শিশির, আদ্র, সবাই আছে । তোফায়েল কাবির ও আছেন একপাশে বসে । তিনি স্তব্ধ হয়ে নিঃশব্দে দেখছেন কেবলই । মেঘা খুশি মনে শাড়ি গুলো গায়ে ধরে ধরে দেখাচ্ছিলো । 
এমতসময় রৌদ্রের অমন ভড়কানো গলা বেজে আসতেই হকচকিয়ে পিছু ফিরলো রমনী । 
কিছু বুঝে ওঠার আগেই রৌদ্র তেড়ে এসে ভীষণ শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো ওকে । রমনীকে ভীষণ ভাবে মিশিয়ে নিলো বাহুডোরে । ফোনের ওপাড়ে বসেই রৌদ্রের আকস্মিক এমন কান্ডে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলেন বাড়ির সকলে । 
মেঘা তব্দা খেয়ে দ্রুত বলে......
" এ কি রৌদ্র, আপনি ফিরে আসলেন কেনো আবার ? 
রৌদ্র কিছু বলে না । অজ্ঞাত কারণে তোলপাড় চলে হৃদয়ে । ঘেমে নেয়ে একাকার । শ্বাস ফেলছে ঘনঘন । মেঘা ওর বুকের তীব্র ওঠানামা ঠাহর করলো চকিতে । 
রৌদ্র কে নিজের থেকে আলগা করে চোয়ালে হাত তুলে শান্ত কন্ঠে বললো....
" কি হয়েছে ? 
" আই ডোন্ট নো ! আমার কেমন একটা লাগছে । অদ্ভুত লাগছে ‌। ভেতর পুড়ে যাচ্ছে মনে হচ্ছে । ইভারা,, আমাকে একটু শক্ত করে জড়িয়ে ধরবে প্লিজ ? 
মেঘা ওর হন্তদন্ত ঘামে ভেজা মুখশ্রী দেখে আঁতকে ওঠে । দ্রুত জড়িয়ে ধরে কথা মতো । পিঠে হাত বুলিয়ে বলে আদুরে গলায়.....
" রৌদ্র,, শরীর খারাপ লাগছে আপনার ? কেমন লাগছে বলুন ? ডক্টর ডাকবো ? 
" উঁহু, তুমি হলেই চলবে । জড়িয়ে রাখো, শান্তি পাচ্ছি । 
ফোনের ওপাশে দৃষ্টি নামিয়েছেন সকলে । আদ্র আর শিশির বড়দের মাঝে পড়েছে বিপাকে । ওরা একে অপরের দিকে তাকালো । পিটপিট করে দৃষ্টি নামিয়ে প্রস্থান করলো গুটি গুটি পায়ে । 
রুবিনা কাবির তড়িঘড়ি করে ফোন উল্টো করলেন । কল কাটলেন খানিক বাদ । 
এদিকে ভিডিও কলের কথা মনে পড়তেই ছ্যাঁত করে ওঠে মেঘা । দ্রুত রৌদ্রকে সরিয়ে দেয় । ফোনের দিকে তাকাতেই হাঁফ ছাড়ে । সে রৌদ্র কে টেনে বসায় সোফায় । মুখের চিকচিকে ঘাম টুকু আজলে মুছিয়ে দিয়ে ঠান্ডা স্বরে বলে....
" ঠিক আছেন এখন ? পানি দেবো ? 
না বোধক মাথা নাড়ায় যুবক । রমনীর দুহাত আঁকড়ে নিয়ে অসংখ্য চুম্বন আঁকে হাতের পিঠে । কাতর নয়নে চেয়ে আহত স্বরে বলে....
" আই রিয়েলি লাভ ইউ । 
মিষ্টি করে হাসলো মেঘা । 
" বারবার এক কথা বলছেন কেনো ? 
" তুমি তো জানো আমি তোমাকে ভালোবাসি, তাই না ? তবুও আমার ভয় হচ্ছে কেনো ? কেমন যন্ত্রণা লাগছে আমার, আই ডোন্ট নো এ কেমন অনুভূতি । ব্যাথা হচ্ছে বুকে । ইভারা, আমি কিন্তু সত্যিই ভালোবাসি তোমায় । প্লিজ ট্রাস্ট মি, ভুল বুঝবে না কখনো । 
" আপনি বারবার ভুল বোঝার কথা কেনো বলছেন বলুন তো ? 
" কারন তুমি সবসময় আমাকে ভুল বোঝো ‌।
" মিটে গেছে তো সব । আর ভুল বোঝাবুঝি আসবে কোথা থেকে ? 
" ইভারা,,, আমাকে বিশ্বাস করো ? 
" খুব ! 
" এটা মানো, যে আমি তোমায় ভালোবাসি ? 
" ভীষণ ! 
" তাহলে ঐ বিশ্বাস টাকে ধরে রেখো । জেনে রাখো, আমি শুধু তোমাকেই ভালোবাসি । তুমি ব্যাতীত আমার জীবনে কক্ষনো কেউ ছিলো না । কিছু দায়িত্ব , আর তোমাকে হারানোর ভয়ে আমি কিছু একটা জানাই নি তোমায় ‌। তবে আজ জানাবো । কারোর সাথে দেখা করাবো তোমায় ! 
মেঘা বুঝলো না । অবুঝের মতো চোখ কুঁচকে শুধালো....
" কার সাথে ? 
রৌদ্র উঠে দাঁড়ায় । চোখ মুখ মুছে নেয় । লম্বা লম্বা শ্বাস টেনে স্বাভাবিক করে নিজেকে । দুহাত তুলে মেঘার মুখখানা আগলে নিয়ে গাল ঠেলে হাসে । 
" অফিস থেকে ফিরে আসি, তারপর দেখতেই পাবে । আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে এখন । আসছি, হ্যাঁ ? টেক কেয়ার ,জান । 
" তাড়াতাড়ি আসবেন কিন্তু, একলা ভালো লাগে না আমার । আমি অপেক্ষা করবো । সন্ধ্যার আগেই ফিরবেন প্লিজ । 
" উমমম, ওকে সুইটহার্ট । লাভ ইউ ! 
" লাভ ইউ ঠু রাইনো মুখো । 
মুচকি হাসে যুবক । এতক্ষণে হালকা হয় বক্ষস্থল । চলে যাওয়ার আগে রমনীর কপালের মাঝ বরাবর একটা ছোট্ট পরশ বোলাতে ভুললো না সে । 
অতঃপর বেরিয়ে গেলো । মেঘা পিছু না নিয়ে দাঁড়ালো বারান্দায় । রৌদ্র বাড়ির নিচে নেমেও বারবার উপর পানে ফিরে চায় চাতকের ন্যায় । মেঘা হাত নাড়িয়ে বিদায় দেয় তাকে । নিজের মনেও কেমন অদ্ভুত অনুভূতি জাগে । রৌদ্র এমন করলো কেনো ? ভুল বোঝাবুঝি, বারবার কিসের ভুল বোঝাবুঝির কথা বলে সে ? আর কার সাথেই বা দেখা করাবে আজ ? 
,,,,,, 
ক্যালিফোর্নিয়ায় সকাল তখন আটটা । ধরনী চিরে উদিত হয়েছে দিবাকর । নতুন এক সকাল । আজকের এ সকাল টা একটু অন্যরকম । ভিন্ন অনুভুতির মিশেলে অদ্ভুত লাগছে আজ । চোখে ঘুম নেই । গোটা রাত কেটেছে নির্ঘুমে । তপ্ত যুবক নির্বিঘ্নে আঁখি মেলে চেয়ে রয়েছে এখনো । উদ্যম বুকে তার লেপ্টে রয়েছে এক ছিপছিপে ঘুমন্ত নারী । সে নারীর হালকা শরীর খানা ভার খুইয়ে গুঁড়িয়ে পড়ে আছে তার দেহের উপর ‌। সে এখন সম্পুর্না । উষ্ণ ভালোবাসার চাদরে সিক্ত তার দেহের প্রতিটি খাঁজ । সব আদরের পরশ সয়ে নিয়ে আয়েশে চোখ বুজে ঘুমোচ্ছে দেখো । ঘুমিয়েছেই খানিক আগে । 
তবে ইয়াশ ঘুমোয় নি । মেয়েটাকে জড়িয়ে নিয়ে তার চুলের ভাঁজে আলতো করে আঙ্গুল চালাচ্ছে । সিলিংয়ের দিকে দৃষ্টি তার ‌। সেই দৃষ্টি দিক পরিবর্তন করে ক্ষণে ক্ষণে আছড়ে পড়ছে রমনীর লালিত মুখাবয়বের উপর । 
ঘুমন্ত রমনীকে দেখে সে হাসছে মিটিমিটি । এক পর্যায়ে দৃষ্টি গাঢ় হলো তার । মাথা তুলে ভেজা চুমু আঁকলো রমনীর কপালে । আলগোছে ছাড়তে গেলো, ইচ্ছে হলো না ছাড়ার । ফের জড়িয়ে নিলো নিবিড় ভাবে । 
শাফাহ্ গভীর ঘুমে তলাতে পারছে না, আরাম হচ্ছে না তার । ইয়াশ শক্ত করে জড়িয়ে নিতেই খচখচ করলো মেয়েটা ‌। আঁকুপাঁকু করলো নিজেকে ছাড়াতে । ইয়াশ তাৎক্ষণিক মনযোগ ফেরায় । বাঁধন আলগা করতেই ঘুমের ঘোরে মাথা তোলে শাফাহ্ । ভার পাপড়ি যুগল ফাঁক করে পিটপিট করে চায় । নিভু চোখের সামনে খুব ঘনিষ্ঠে ইয়াশের মুখাবয়ব দেখে আঁতকে ওঠে রমনী । নিমিষেই বৃহৎ হয় তার আঁখি যুগল । তড়াক করে পেছাতে গিয়েও আটকে যায় । গত সময়ের কিছু ফুটেজ চোখের সামনে ভাসতেই এক রাশ লজ্জায় মিইয়ে যায় রমনী । মুখে হাত চেপে ধরে তৎক্ষণাৎ । দৃষ্টি তখনও নিষ্পলক । 
ইয়াশ তার অবস্থা বুঝে ঠোঁট টিপে হাসে । ভ্রু নাচিয়ে বলে সাবলীল ভাবে....
" হোয়াট ? এনি প্রবলেম ? 
ব্যাস, গলে পড়লো রমনী । দ্রুত বেগে নিজেকে গুটিয়ে নিলো । তপ্ত যুবকের গলায় মুখ গুজে আড়াল করলো লাজে রাঙা মুখাবয়ব । চাদর টেনে নিজেকে লুকাতে গিয়েও লাভ হলো না । সাথে রয়েই গেলো তপ্ত যুবক । দুজনাই একসাথে মিশে রইলো হালকা চাদরের তলে । শাফাহ্ ছটফট করলো সেখানেই । 
ইয়াশ হেসে ফেলে ওর কান্ডে । মেয়েটার কাঁধে নাক ঘষে বিড়বিড় করে.....
" আরো ঘুমাবে ? 
উত্তর করলো না শাফাহ্ । তীব্র উচাটন রুখতে দাঁতে দাঁত চেপে খামচে ধরলো যুবকের বাহু । ইয়াশ কিঞ্চিত ব্যাথায় চোখ খিচে নেয় । 
" আর কত খামচাবে, ইয়ার ? লাগে তো ! দাগ বসিয়ে ফেলেছো জায়গায় জায়গায় । নখ কাটো না, স্টুপিড ? কেটে দেবো আজ ! 
তবুও মেয়েটার কন্ঠে কথা বাজে না । ইয়াশ গলা ঝাড়ে ‌। ডাকে মিহি আওয়াজে....
" মেঘার ননদ, শুনছো ? 
শাফাহ্'র তরফ থেকে উত্তর পাওয়া গেলো না এবারেও । মেয়েটা আরো বেশি লুকিয়ে নিলো নিজেকে । 
" টকেটিভ লেডি, আর ইউ ফিলিং শাই ? ওঠো,, তাকাও আমার দিকে । 
এবারে থেমে থেমে বাজখাঁই গলা ভেসে আসলো......
" পারবো না ! নির্লজ্জ কোথাকার । আপনি একটা রাক্ষস । আর কোনো দিন ছোঁবেন না আমায় । 
" বাহ্ ! আমার বুকে লুকিয়ে থেকে আমাকেই বলছো, যেনো কোনো দিন না ছুঁই তোমায় ! 
" জড়িয়ে ধরেছেন তো আপনি ! 
" নিজেকে সঁপে দিয়েছো তো তুমি । আই ডিডেন্ট ফোর্স ইউ !
শাফাহ্ মাড়ি খিচলো । তপ্ত যুবকের বাহুতে আঘাত করে বললো....
" চুপ করুন বেহায়া পুরুষ । কথা বলবেন না আমার সাথে ‌। ছাড়ুন....
ছাড়া তো দূর, বরং যুবক তাকে আরো বেশি আঁকড়ে ধরে দুহাতে । বলে গলা নামিয়ে.....
" ছাড়লে লজ্জা লুকোবে কোথায় ? হায়া লুকানোর জন্য বেহায়া পুরুষের এই প্রশস্ত বুকখানা প্রয়োজন তোমার । আর আমার প্রয়োজন টুকটাক বাহানা । বাহানা করে হলেও এই বুকে নিও ঠাঁই, কারন আজকের পর থেকে আমি ছাড়া তোমার আর কোনো গতি নাই । 
মেয়েটা আনচান করে । জোড়ালো হয় শ্বাস । পড়নের টি শার্টের ফাঁক গলিয়ে ইয়াশের হাত পৌঁছেছে রমনীর উন্মুক্ত কটিদেশে । হাতের বিচরন অবাধ্য হতেই শাফাহ্ আলতো করে কামড় বসালো তার গলার ভাঁজে । ফের খামচি কাটলো শক্ত বাহুতে । রগরগে স্বরে বললো....
" খবরদার, বাড়াবাড়ি করবেন না আর ! 
" বাড়াবাড়ি করার বাকি আছে কি ? আরেকটু বাড়াবাড়ি করলে মন্দ হয় না । কালকের বাড়াবাড়ির জন্য স্যরি মেঘার ননদ ! ও ব্যাপারে আমি কিছু জানি না । ভুল করে ভুল হয়ে গেছে । সব তোমার দোষ । আশকারা তুমিই দিয়েছো । 
" এহহ্ ,, মোটেও না । 
" তবে,,, জবরদস্তি করেছি ? 
শাফাহ্ উত্তর করলো না আর । ইয়াশ ঠোঁট চেপে ধরে । অনুমান করে ললিতাঙ্গের মৃদু কম্পন । বলে মিটমিটে হেসে.....
" সকাল হয়ে গেছে । হসপিটালে যেতে হবে আমায় । দেরি হয়ে যাচ্ছে । যদি এভাবেই লেপ্টে থাকো, তাহলে বাড়াবাড়ি করতে ইচ্ছে করবে আরো বেশি । আমি কিন্তু ভালো ছেলে । আশকারা দিও না আবার । উঠতে দাও এখন ‌। 
আলগোছে মাথা তুললো রমনী । সরু চোখে চাইলো । যদিও বা চাইতে গেলে অস্বস্তি হচ্ছে বড্ড । ধক্ ধক্ করছে বুক খানি ।
ইয়াশ ওর কুন্ঠিত মুখাবয়বে নজর বোলায় ‌। মেয়েটার কপালের পাশে লুটিয়ে পড়া খুচরো চুল গুলো আলগোছে ঠেলে কানের ধারে গুঁজে দেয় । 
এবেলায় নজর পড়ে লাবণ্যময়ীর ফর্সাটে গ্রীবার নিকট । তপ্ত যুবকের উন্মাতাল পরশের তোপে সুক্ষ্ম সুক্ষ্ম দাগ ফুটেছে সেথায় । লালচে তা ‌। ফুটে উঠেছে নির্মল ত্বকে । 
ইয়াশ বেশ সূচালো দৃষ্টিতে চেয়ে দেখলো । মাথা তুলে বার কয়েক ঠোঁট ছোঁয়ালো দাগের উপর । বিড়বিড় করলো ঠোঁট নাড়িয়ে.....
“ স্যরি ! 
শাফাহ্ শ্বাস রুখে নেয় ‌। লোকটার একেকটা স্পর্শ বিদ্যুতের শকের জ্বালা দেয় তাকে । সে সরে আসে । গুটিয়ে নেয় নিজেকে । কম্ফোর্টার জড়িয়ে বিছানার এক কোণে পাশ ফিরে শোয় । ঢেকে নেয় শরীর । 
ইয়াশ চেয়ে থেকে উঠে বসলো । অস্বস্তি বাড়ালো না রমনীর । বালিশের নিচ থেকে ফোন বের করলো । মুখো ভঙ্গিমা বদলে এবারে সোজাসুজি কল লাগালো মেঘার নাম্বারে । রিং হচ্ছে । তার শব্দে পাশ ফিরে চাইলো শাফাহ্ । ইয়াশ কে গুরুভার হয়ে বসে থাকতে দেখে নিজেও উঠে বসলো তড়িতে । তিন থেকে চার বার ফোন করে ইয়াশ । ওপাশ থেকে রিসিভ হয় না । কপালে ভাঁজ পড়ে যুবকের । পঞ্চম বার কল লাগায় । এবার ও হয় না রিসিভ । 
পাশ থেকে আধো স্বরে প্রশ্ন করলো শাফাহ্.....
" মেঘাকে ফোন করছেন ? 
চাইলো যুবক.....
" হুম । ধরছে না । 
" রৌদ্র ভাইয়া কে একবার ফোন করে দেখুন । 
ইয়াশ অধরের কোণে দাঁত বসায় ‌। রৌদ্রের সাথেও কথা বলে নি আর । সব মিটমাট হলেও কোথাও একটা অসন্তোষ অবশিষ্ট আছে এখনো । 
তবুও আজ ভুললো সব । না চাইতেও রৌদ্রের নাম্বারে ডায়াল করলো ‌। এ যাত্রায় ফোন বন্ধ রৌদ্রের । 
বিব্রত হয় ইয়াশ । 
কি হয়েছে ওদের দুটোর ? একজন ফোন ধরছে না, আর একজনের ফোন বন্ধ ! 
খানিক রাগলো যুবক । কান থেকে ফোন নামিয়ে পাশে রাখলো । মেঘার সাথে কথা বলার জন্য আঁকুপাঁকু করছে মন । কেমন অস্থির লাগছে বোনের জন্য । মেয়েটার অভিমান ভাঙাতে হবে এবার । কিন্তু কি করে ? ছয় তারিখ গড়িয়ে যাচ্ছে । আরো দেরি করলে মেঘা আরো বেশি অভিমান করবে । 
বসে থেকেই দুহাতে মাথা চেপে ধরলো ইয়াশ । শ্বাস ফেললো মুখ গোল করে । ঠোঁট ভিজিয়ে নিজেকে সামলে পাশে তাকালো । জড়োসড়ো রমনীকে দেখে হাসলো এক পশলা । ডান হাত বাড়িয়ে রমনীর গালে রাখলো.....
" ঘুম হয়নি তো রাতে । ঘুমাও এখন । ঘুম কম হলে চোখে ডার্ক সার্কেল পড়ে যাবে । আমাকে বেরোতে হবে । ফ্রেশ হয়ে আসি, ওকে ! 
শাফাহ্'র থেকে প্রত্যুত্তর না শুনে ওয়াশ রুমে যায় ইয়াশ । ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে বিছানায় নজর পড়তেই গুটিয়ে আসে কপাল । এক অবস্থায় ঝিম ধরে বসে আছে শাফাহ্ । মুখ মলিন । গুটানো তন্বী ‌। ইয়াশ কিছু একটা ভেবে তড়তড়িয়ে এগিয়ে গেলো । মেয়েটার গালে কপালে হাত ছুঁইয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে শুধালো একটু ঝুঁকে.....
" টুকটুকি,,, আর ইউ ওকে ? প্রবলেম হচ্ছে কোনো ? 
শাফাহ্ তাকালো নির্বিকার । ইয়াশ আর কিছু জিজ্ঞেস করে না । ড্রয়ার থেকে ফাস্ট এইড বক্স বের করে একটা ঔষধ খুঁজে নেয় । 
" এটা খেয়ে নাও । 
শাফাহ্ খেয়ে নিলো বীনা বাক্যে । ইয়াশ খানিক দূর্বল হয়ে বলে.....
" আ'ম স্যরি । 
কুন্ঠায় চিবুক নত করে রমনী । বলে দোনামোনা করে......
" একটা কথা রাখবেন ? 
" বলো ! 
" আগে বলুন, আমার কথাটা রাখবেন ! কথা দিন ! 
" কি কথা, সেটা তো বলো ? 
" ঐ হসপিটাল থেকে রেজিগনেশন নিয়ে নিন আপনি ! 
" বাট হোয়াই ? 
" ওখানে থাকলে সবসময় আপনি ঐ মেয়েটার কাছাকাছি থাকবেন । ও দেখবে আপনাকে, আর আপনি ওকে । ও যদি আপনাকে পছন্দ করেই থাকে, তাহলে আপনাকে দেখলে কষ্ট হবে ওর । আর সবটা জেনে ওর সামনে আপনি অকোয়ার্ড ফিল করবেন । কাছাকাছি থাকতে গিয়ে মায়া লাগবে একসময় । তেমন কিছু না হোক । তার আগেই আপনি বেরিয়ে আসুন ওখান থেকে । 
ইয়াশ উঠে দাঁড়ালো....
" এটা হয় না । জাস্ট একটা মেয়ের জন্য চাকরি ছাড়বো আমি ? নেভার ! ওর জন্য বেরিয়ে আসার হলে অনেক আগেই বেরিয়ে আসতাম । এখন বেরিয়ে আসার কোনো প্রশ্নই ওঠে না ! আর মায়া ? তাও আবার ওর প্রতি ? হাউ ফানি । 
ইয়াশ ব্যাপার টা গায়ে মাখলো না খুব একটা । শাফাহ্ যা বোঝাতে চাইলো, তা বুঝলো না সে । 
,,,,,,,, 
মিনির চেকআপ শেষে বিকেল সাড়ে চারটার দিকে অফিসে এসেছে রৌদ্র । রিসা আর মিনিও এসেছে । রৌদ্র কম্পানির সিইও হলেও রিসার মতামত ব্যতীত কোনো কিছুই করে না সে । রিসাকে জানায় সবটা । 
আজও একটা বড় প্রজেক্টের সাইনিং ছিলো । সেই কারনেই হসপিটাল থেকে সোজা অফিসে এসেছে । কাজ শেষ হলে মিনি আর রিসা কে নিয়ে এখান থেকে সোজা মেঘার কাছে যাবে । এটাই তার প্লানিং । আজ সবকিছুর অবসান ঘটিয়ে দীর্ঘ এক হাঁফ ছাড়বে রৌদ্র । ঝেড়ে ফেলবে সব জটিলতা । মেঘাকে সবটা জানাতে পারলেই প্রাণ ফিরবে তার । 
মিনির হাঁটা চলা বারন আপাতত । হুইলচেয়ারে চলাফেরা করছে । রৌদ্রের কেবিনে মা মেয়ে দুজনেই রয়েছে । গ্রাউন্ড ফ্লোর হতে মিটিং শেষ করে উপরে উঠলো রৌদ্র । কেবিনে ঢোকা মাত্রই হাসি ভিড় জমালো ওষ্ঠপূটে । হুইল চেয়ার থেকে নেমে রৌদ্রের বরাদ্দকৃত বড় ইজি চেয়ারটায় বসেছে মিনি । সামনে ডেস্কে কতকগুলো ফাইল মেলে রাখা । কেবিনে রেখে যাওয়া রৌদ্রের কালো চশমাটা চোখে লাগিয়েছে বাচ্চাটা । বড়দের মতো গুরুগম্ভীর হাবভাব করে বসে আছে । যেনো সেই বস এই অফিসের । ডেস্কের সামনে কোমরে হাত ঠেসে ধারালো দৃষ্টিতে ওর দিকেই তাকিয়ে আছে রিসা । মিনি মায়ের রাগান্বিত দৃষ্টি দেখে চতুর্থ বারের মতো আদেশ ছুড়লো......
" হোয়াট হ্যাপেন্ড, মাম্মা ? ওয়াই আর ইউ লুকিং অ্যাট মি লাইক দ্যাট ? মিনি বলেছে, মিনি এখন আইসক্রিম খাবে । আইসক্রিম নিয়ে এসো মিনির জন্য । 
রিসা নিচু স্বরে ধমকায়.....
" মিনি,, বলেছি না আইসক্রিম খাওয়া হবে না । উইনটার শেষে সিজন চেঞ্জে ঠান্ডা লেগে যাবে । নেমে এসো বলছি । আদেশ করছো আমায় ? 
" ইয়াহ্ ,, মিনি ইজ কমান্ডিং ইউ । ইউ নো, তুমি এখন আমার পাপার অফিসে দাঁড়িয়ে আছো । এই অফিস আমার পাপার । আর আমার ও । আমি যা চাইবো তাই হবে এখানে । আমার কথা না শুনলে পাপা অ্যাংগ্রি হয়ে যাবে । আমার আইসক্রিম চাই এক্ষুনি । 
" মিনি ! 
রিসা গলা উঁচু করে । 
দরজার আড়াল থেকে মিনির এহেন খবরদারি দেখে ফিক করে হাসে রৌদ্র । একজন স্টাফ কে ডেকে কিছু একটা বলে । অতঃপর ঢোকে ভেতরে । ডাকে সুরেলা কণ্ঠে...
" মাম্মা । কি চাই আমার মাম্মার ? 
চিকচিক করে ওঠে মিনি । চলার শক্তি থাকলে ধড়ফড়িয়ে ছুটে যেতো । এখন পারলো না । সশব্দে ডেকে উঠলো.....
" পাপা ! 
" ইয়াহ মাম্মা । 
রৌদ্র এগিয়ে গিয়ে আমুদে হয়ে কোলে তুললো মিনিকে । শব্দ করে চুমু খেলো দু গালে । বুকের মাঝে চেপে ধরে বললো.....
" ইয়াহ মাম্মা । কি চাই আমার মায়ের ? 
" আইসক্রিম । মিনি মাম্মা কে কখন থেকে বলছে, কিন্তু মাম্মা মিনির কথা শোনে না । মিনি আইসক্রিম খাবে পাপা । এক্ষুনি খাবে ! 
" ব্যাস, শুধু আইসক্রিম ? ওকে ! এক্ষুনি চলে আসবে । হ্যাপি নাউ ? 
খুশিতে গদগদ হয়ে উঠলো নিষ্পাপ একটি প্রাণ । দুহাতে জাপটে ধরলো রৌদ্র কে......
" মিনির পাপা ইজ দ্যা বেস্ট । মাম্মা গুড, বাট পাপা ইজ বেস্ট ! পাপা, মিনি গেমস খেলবে ফোনে ‌। ফোন দাও....
" পাপার ফোনে তো চার্জ নেই মাম্মা ‌। অফ হয়ে গেছে । মাম্মার ফোনে গেমস খেলো, ওকে ? রিসা, তোমার ফোন দাও । 
রিসা লম্বা শ্বাস ফেললো । 
" রৌদ্র, আশকারা দিচ্ছো ওকে তুমি । 
" ওর খুশিটা দেখেছো ? এমন খুশি দেখার জন্য একটু আধটু আশকারা দিলে ক্ষতি কিসে ? আর তুমি সবসময় ওকে বকাবকি করো । দিস ইজ নট ফেয়ার রিসা । মিনি গুড গার্ল । রাইট মাম্মা ? 
" ইয়াহ পাপা । মাম্মা ইজ গুড, মিনি ইজ বেটার, এন্ড পাপা ইজ দ্যা বেস্ট । আই লাভ ইউ পাপা । 
" লাভ ইউ ঠু মাম্মা । 
দরজায় খট করে শব্দ হলো এ বেলায় । উচ্ছ্বাস মাখা হাসির মাঝেই চকিতে দরজার দিকে তাকালো তিন জোড়া দৃষ্টি । কেউ নেই । চোখ সরু করে রৌদ্র । খুব একটা তোয়াক্কা করে না । মিনিকে ডেস্কের উপর বসায় । আলগোছে তার মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে বলে.....
" মাম্মা, পাপা তোমাকে একটা জায়গায় নিয়ে যাবে ? যাবে তুমি ? 
মিনি উত্তর করার আগেই রিসা এগিয়ে আসলো । রৌদ্রের পাশাপাশি দাঁড়িয়ে বুকে দম নিয়ে কাঁপা স্বরে বললো....
" মিনি,,, মাম্মা যদি তোমাকে কিছু সত্য কথা বলে, তাহলে কষ্ট পাবে তুমি ? 
মিনি বুঝলো না কথার অর্থ । পিটপিট করে চাইলো । রিসা একটু থেমেই টলমল নয়নে মেয়ের দিকে তাকিয়ে বলে....
" মিনি, রৌদ্র তোমার পাপা ন.....
" রিসা,,, স্টপিড । পাগল হয়ে গেছো ! মিনি এখনো টোটালি সুস্থ নয় । মাথা খারাপ হয়ে গেছে তোমার ? 
রিসা কে কথার মাঝে থামিয়ে চাপা ধমক দিলো রৌদ্র । 
সহসা চোখ নামিয়ে থেমে যায় রিসা । মেয়ের থেকে আড়াল করে দৃষ্টি । 
মিনিট বিশেকের মাথায় মিনিকে সামলে নিয়ে ওরা রওনা দেয় রৌদ্রের এপার্টমেন্টের উদ্দেশ্যে । 
সামনেই ইলেকশন । জায়গায় জায়গায় রাস্তা অবরোধ করা হয়েছে । জানজট বেড়েছে ইদানিং । অফিস থেকে বাড়ি ফেরার সোজা পথ ধরা গেলো না । একটু ঘুরিয়ে ফিরতে হবে । শর্টকাট ছেড়ে হাইওয়ের পথে ফিরতে হচ্ছে এখন । এদিক দিয়ে বাড়ি পৌঁছাতে গেলে সময় লাগবে মিনিট দশেক । মিনির আবদারে ফ্রন্ট সিটে মিনিকে কোলে নিয়ে বসেছে রৌদ্র । পেছনে রিসা । ড্রাইভার ড্রাইভিং করছে আপন মনে । চলন্ত গাড়িতে জানালা ভেদে বাইরে তাকানো মাত্রই হাইওয়ের পাশে একটা জটলা দেখে ভ্রু কুঁচকে আসে রৌদ্রের । সন্ধ্যা গড়াচ্ছে, আধার নামতেই আবছা হয়ে এসেছে আশপাশ । ল্যাম্পপোস্টের আলোয় রাইট লেনে দূরে কিছু জনসমাগম দেখা যাচ্ছে । কিছু গাড়ি আটকে আছে সেখানে । বড় একটা বাস ও নজরে পড়লো । পুলিশের জিপ ও রয়েছে বোধহয় । রৌদ্র কেমন আঁতকে ওঠে আচমকা । ধক্ করে শ্বাস টানে । সেদিকে তাকিয়েই ড্রাইভারের উদ্দেশ্যে শুধোয় কপাল গুটিয়ে....
" ওখানে কি হয়েছে ? 
ড্রাইভার তাকালো । চোখ ফিরিয়ে দীর্ঘ শ্বাসে উত্তর করলো....
" ওখানে ? ওখানে তো বাসের সংঘর্ষে এক্সিডেন্ট হয়েছে, বস ! দশ মিনিট আগেই এক্সিডেন্ট হলো । একটা পথচারী মেয়ে স্পট ডেড । পুলিশ এসেই রাস্তা সিল করে দিয়েছে । লেফট লেনে গাড়ি চলছে শুধু । তাই জানজট বেড়েছে ওদিকে । 
রৌদ্র পুনরায় ছলকে ওঠে । বুকের বা পাশে চিনচিনে ব্যথা অনুভব হয় তার । 
তড়াক করে দৃষ্টি সরিয়ে আনে । মিনিকেও ফেরায় অন্যপাশে । শ্বাস নিতে নিতে বলে অস্ফুটে...
" ওও । 
ওরা এপার্টমেন্টে পৌঁছায় । 
মিনিকে কোলে নিয়ে সদরের সামনে থমকে দাঁড়ায় রৌদ্র । ভয় লাগে তার । ধড়ফড় করে বুক । 
চোখ নিভিয়ে এলোমেলো শ্বাস নিতে থাকে বুকে । রিসা ওর অবস্থা বুঝে পাশ থেকে শান্তনা দিলো......
" রৌদ্র, প্যানিক করছো কেনো এভাবে ? ভেতরে চলো । আমি আছি তো । 
রৌদ্র মুচকি হাসার চেষ্টা করলো । দরজা খুলে ঢুকলো ভেতরে । 
স্টাফরা লিভিং রুমে নেই । বেপরোয়া যুবক এপাশ ওপাশ এলোমেলো ভঙ্গিতে নজর বোলায় । পুরো বাড়ি ফাঁকা । মেঘা নিশ্চয়ই উপরে আছে । মিনিকে কোল থেকে নামিয়ে সোফায় বসালো রৌদ্র । ধীরে বললো.....
" রিসা, এখানে থাকো । আমি ইভারা কে দেখে আসছি । ও রুমে বোধহয় । 
রৌদ্র কম্পিত কদম বাড়িয়ে উপরে ওঠে । দরজা ঠেলে ঢোকে ঘরের ভেতর । সন্ধ্যা গড়িয়েছে । রুমে অন্ধকার । লাইট জ্বালানো হয় নি এখনো । আপনা আপনি কপাল কুঁচকে আসলো বেপরোয়া যুবকের । সুইচ বোর্ডে হাত চালিয়ে ডাকলো মোলায়েম কন্ঠে.....
" জানেমান ! 
তার কন্ঠ উঁচু হয় না খুব একটা । কেঁপে কেঁপে ধরে আসে । 
রুমে কেউ নেই । বিছানার উপর বেগুনি রঙের শাড়িটা ভাঁজ করে রাখা । শাড়ির উপর দেনমোহর হিসেবে দেওয়া রৌদ্রের সেই ফ্লাওয়ার ব্রোঞ্জ টাও আছে । 
এসব এখনো ক্লজেটে তুলে রাখেনি মেঘা । ভাঁজ করে এখানেই রেখেছে । ফোনটাও পড়ে আছে একপাশে । রৌদ্র এপাশ ওপাশ তাকালো । মেঘাকে না পেয়ে এবার গলা উঁচালো.....
" ইভারা ! কোথায় তুমি ? 
অন্ধকার দেখেই ঠাহর করতে পেরেছে, মেঘা ঘরে নেই । রৌদ্র বেরিয়ে আসলো । ভাবলো হয়তো স্টাফদের সাথে আছে । দোতলার বাকি ঘর গুলোতেও দেখলো । পাওয়া গেলো না । এই ভর সন্ধ্যায় ছাদে উঠবে না রমনী । 
রৌদ্র বেশ স্বাভাবিক হয়েই নিচে নামে । এতক্ষণে বাড়ির সব স্টাফ হাজির হয়েছেন লিভিং রুমে । রিসা আর মিনিকে অবাক লোচনে দেখছেন তারা । 
রৌদ্র নিচে নেমেই শুধালো চড়া কন্ঠে.....
" মোহনা আন্টি,,, ইভারা কোথায় ? 
ভদ্রমহিলা যেনো চমকে উঠলেন রৌদ্রের কথায় । তড়াক করে নিজেদের মাঝে চাওয়া চাওয়ি করলেন তারা । শুষ্ক ঢোক গিললেন ভদ্রমহিলা । 
ধীরুজ স্বরে মুখ খুললেন.....
" স্যরি স্যার, কি বললেন ? 
" আপনারা সবাই এখানে, তাহলে ইভারা কোথায় ? রুমে নেই কেনো ? 
" ইভারা ম্যাম কোথায়, সেটা আপনি জানেন না ? 
" স্ট্রেন্জ,,, আমি অফিসে ছিলাম । জানবো কি করে ? আর আমতা আমতা করছেন কেনো আপনারা ? ইভারা কোথায় ? 
ভদ্রমহিলা সিটিয়ে গেলেন এবারে । চিবুক নামিয়ে নত করলেন । রৌদ্রের ভেতরে উত্তাল ঝড় বইছে । তবুও নিজেকে যথা সম্ভব ধাতস্থ রাখছে সে । এ বেলায় আর সহ্য হলো না । ঝেড়ে উঠলো......
" আজব ! কথা ফুটছে না কেনো কারোর মুখে ? কোথায় আমার ইভারা ? 
" স্যরি স্যার । ম্যাম তো আপনার অফিসের উদ্দেশ্যে বেরিয়েছিল । অফিসে যায় নি ? 
তিন বাক্যেই আকাশ ভেঙ্গে পড়লো রৌদ্রের মাথায় । দুলে উঠলো তার সুঠাম দেহখানা । কুঁচকানো কপাল অস্বাভাবিক ভাবে শিথিল হলো । 
বিশ্বাস করলো না সে....
" শাট আপ । বাজে ইয়ার্কি করবেন না একদম । ইভারা কোথায় ? কোথায় লুকিয়ে মজা করছে আমার সাথে ? ইভারা ? জান, প্লিজ মজা করো না । আমি এখন সেই মুডে নেই । বেরিয়ে এসো প্লিজ । 
রৌদ্র চেঁচায় । 
ভদ্রমহিলা অবাক হয়ে দেখেন । 
" স্যার, মজা করছি না আমরা ! সত্যিই বলছি,,, ইভারা ম্যাম সত্যিই আপনার অফিসের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে গেছেন । প্রায় এক‌ ঘন্টা হতে চললো । 
পূণরায় বাজখাঁই গলায় ঝেড়ে উঠলো রৌদ্র....
" ওও শাট আপ । জাস্ট কিপ ইউর মাউথ শাট ! 
ইভারা বেরিয়ে গেছে মানে ? কোথায় বেরিয়ে গেছে ? নাটক শুরু করেছেন ? বলছি না আমি এখন ইয়ার্কি নেওয়ার মুডে নেই ‌। ইভারা কোথায় বলুন । ইভারা.....
সবাই চমকে পিছিয়ে যান । 
আকস্মিক রৌদ্রের এমন রণমূর্ত ধমকে সিটিয়ে যায় মিনি । আগে কখনো রৌদ্র কে এভাবে দেখেনি সে । খানিক ভয়ে রিসাকে জাপটে ধরলো বাচ্চাটা । 
রৌদ্রের হুশ জ্ঞান নেই । মাথা ফেটে যাচ্ছে তার । ঘামছে দড়দড়িয়ে । পড়নের ব্লেজার খুলে ছুড়ে মারলো সে । বজ্র কন্ঠে হুংকার ছাড়লো.....
" আবার চুপ করে আছেন কেনো সবাই ? সত্যিটা বলুন । কোথায় আমার ইভারা ? 
" আমরা সত্যিই বলছি স্যার । ইভারা ম্যাম বেরিয়ে গেছেন ‌। ম্যাম কে আটকাতে চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু পারিনি । তিনি আজ আমাদের কোনো বারন শোনেননি । ড্রাইভার আসেনি আজ । কোনো গার্ডের বাধাও মানেননি ম্যাম । একলা বেরিয়ে গেছেন । বলে গেছেন আপনাকে আগে থেকে না জানাতে । অফিসে গিয়ে আপনাকে চমকে দিতে চেয়েছিলেন তিনি । আমরা এর চেয়ে বেশি আর কিছু জানি না, স্যার । বিশ্বাস করুন, আমরা মিথ্যে বলছি না । ম্যাম বেরিয়ে যাওয়ার এক ঘন্টা হতে চললো । 
বেপরোয়া যুবক পিছিয়ে যায় টাল হারিয়ে । চোখে পড়ে এলোমেলো পলক । পেছাতে গিয়ে সিঁড়ির কাছে হুবড়ি খেয়ে পড়ে যায় সে । এদিকে চেঁচিয়ে ওঠে মিনি.....
" পাপা ! 
রৌদ্রের কাছে সব গুলিয়ে যায় । এলোমেলো হয়ে যায় মস্তিষ্ক । এক ঘন্টা ? মেঘা নেই বাড়িতে ! এক ঘন্টা আগে বেরিয়ে গেছে মানে ! অফিসে তো আসেনি, তাহলে কোথায় ? 
ভাবতে পারে না সে । ছিঁড়ে যায় মস্তিষ্কের শিরা উপশিরা গুলি ‌। তীব্র যন্ত্রণায় চটের বস্তার ন্যায় চিরে যায় বুক । আওড়ায়...
" সুইটহার্ট ! 
দমে না আর । 
উঠে দাঁড়িয়ে ছোটে টালমাটাল পায়ে । রিসা ওর অবস্থা বুঝে ছলকে গিয়ে ডাকে....
" রৌদ্র,, কোথায় যাচ্ছো ? প্লিজ রিল্যাক্স হও আগে । সবটা বোঝো । এমন পাগলের মতো করো না প্লিজ । রৌদ্র.....
তাকে রুখতে পারে কে ? 
কে পারে আটকাতে ? দম হীন ধড়ফড়ে বুক নিয়ে ছুটলো বেপরোয়া যুবক । এলোমেলো তার পায়ের তাল । শূন্য মস্তিষ্ক । 
,,,, 
অফিস জুড়ে বেপরোয়া যুবকের তোলপাড় কান্ড । আটটার দিকে বন্ধ হবে অফিস । এখনো সব কর্মচারীরা আছেন । রৌদ্র হাঁসফাঁস করে সাইরেন বাজিয়ে দোতলায় জড়ো করে সবাইকে । তবে কিছু বলতে পারছে না । জবানে বুলি নেই । কেবলই ছটফট করে কাতরাচ্ছে । চোখে পানি নিয়ে থেমে থেমে আওড়াচ্ছে এক নাম.....
" আমার ইভারা...
আর কিছু বলতে পারছে না । 
অ্যাপার্টমেন্টে থেকেই মাহির কে ফোন করেছিলো রিসা । গত রাত থেকেই খানিক জ্বর তার । আজ অফিসে আসেনি তাই । ফোন পেয়েই তেড়ে এসেছে এখন । দোতলায় রৌদ্রের অমন অবস্থা দেখে আঁতকে ওঠে সে । রিসার মুখে শুনেছে সব । সে দৌড়ে আসলো । 
" বস ! 
সুপরিচিত আশাবাদী কারোর কন্ঠে স্থির হয় রৌদ্র । চকিতে দৃষ্টি তুলতেই মাহির ছুটে যায় । এলোমেলো রৌদ্রের দু বাহু আঁকড়ে ধরে......
" বস,,, রিল্যাক্স । হাইপার হবেন না প্লিজ । আ'ম হেয়ার । কিচ্ছু হবে না ইভারা ম্যামের । আমি দেখছি সবটা । ডোন্ট প্যানিক প্লিজ । আমি শুনেছি সব । ম্যাম বাড়ি থেকে বেরিয়ে অফিসে এসেছেন, তাই তো ? আমি বাড়ির সিসিটিভি ফুটেজ দেখেছি । ম্যাম সত্যিই বাড়ি থেকে বেরিয়েছেন । অফিসে এসেছেন কি না সেটা এক্ষুনি জানতে পারবো আমরা । আপনি শান্ত হোন বস । 
রৌদ্র কে সামলে মাহির সবার উদ্দেশ্যে শুধোয় ইংরেজি বাক্যে....
" এভরিওন,, ইভারা ম্যাম, আই মিন বসের ওয়াইফ । সবাই চেনেন তাকে, তিনি অফিসে এসেছিলেন ? কেউ দেখেছেন ম্যামকে ? 
সবাই একে অপরের দিকে চাওয়া চাওয়ি করে । কাজের ফাঁকে সেভাবে নজর বোলানো হয়নি । সবার মধ্য থেকে বেশ কজন মাথা নাড়ালেন । মুখ খুললেন একজন..
" দেখেছি তো । মিটিং শেষে বস যখন কেবিনে গেলেন, তখন ম্যাম এসেছিলেন । দেখেছি উপরে যেতে । কিন্তু মিনিট কয়েকের মাথায় তিনি আবার ছুটে নিচে নেমে এসেছিলেন । খুব একটা লক্ষ্য করা হয়নি আর । 
মাহির চায় রৌদ্রের দিকে । রৌদ্র শোনে সব । মিটিং শেষে তো কেবিনে গেছিলো সে । আর সেখানে রিসা আর মিনিই ছিলো । মেঘা তো ঢোকেনি কেবিনে । 
মাহির রৌদ্রের হাত টেনে ডেস্কের সামনে দাঁড়ায় । ল্যাপটপে সিসিটিভি ফুটেজ বের করতে করতে বলে....
" ডোন্ট ওয়ারি বস, আমরা সিসি টিভি ফুটেজে দেখে নিচ্ছি । তাহলে বুঝতে পারবো । 
বিকেল পাঁচটার পরের ফুটেজ চালানো হয় । রৌদ্রের কেবিনের বাইরের সিসিটিভি ওপেন করতেই থমকে যায় দুজনায় । ‌
রৌদ্র যে মুহুর্তে কেবিনের ভেতরে ঢোকে । ঠিক সেই মুহূর্তেই মেঘার উপস্থিতি ঘটে দরজার নিকট । মেয়েটা পা টিপে টিপে এগোচ্ছে । মুখে ঝলমলে প্রাণোচ্ছল হাসি তার । রৌদ্র কে চমকে দেওয়াটাই ছিলো রমনীর উদ্দেশ্য । 
রৌদ্র দরজা মাড়াতেই মেঘাও পিছু নিতে গেলো । তবে চৌকাঠ মারানোর আগে সে স্তব্ধ হলো দরজার কাছেই , যখন তার দৃষ্টি পড়লো ভেতরে । 
থমকালো সে । নিমিষেই উধাও হলো মুখাবয়বের প্রাণোচ্ছ্বলতা ‌। 
মিনিট পেরোয় , রমনী দাঁড়িয়ে রয় এক ভাবেই । ভেতরে যা যা হয় সব দেখে, নিশ্চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে কান পেতে শোনে । এক পর্যায়ে হেলে পড়ে দরজায় ‌। 
তাৎক্ষণিক আঁতকে ওঠে রৌদ্র । 
মনে পড়ে, কেবিনের ভেতরে থাকাকালীন শব্দ শুনেছিলো ওরা । কিন্তু সে পাত্তা দেয় নি । শব্দের উৎপত্তিস্থলে মেঘা ছিলো তখন ? 
ভেতরে তো মিনি আর রিসা ছিলো রৌদ্রের সাথে । এর মানে মেঘা ওদের একসাথে দেখে ফেলেছে । ওদের মাঝের সব কথোপকথন শুনে ফেলেছে । 
মিনি আর রৌদ্রের মধ্যকার কথাগুলোও শুনেছে দ্বাবিংশী । সবটা পরিষ্কার হওয়া মাত্রই রৌদ্র এক কদম পিছিয়ে যায় । ঝাপসা চোখে শেষ অবধি চেয়ে রয় ল্যাপটপের পানে । ঠিক পরক্ষনেই দ্বাবিংশী রমনীকে ছুটতে দেখা যায় ত্রম্ভ কদমে । মুখে হাত চেপে ধরে এক ছুটে সিঁড়ির দিকে এগোয় রমনী । 
মাহির এবারে এক ধাক্কায় গেটের বাইরের সিসিটিভি ফুটেজ বের করলো । 
সেখানে দেখা গেলো, মেয়েটা থামে নি । ক্লান্ত হয় নি সিঁড়ি বেয়ে নেমেও । একেবারে ছুটে গেইট পেরিয়ে গেছে । ওদিকে আর কিছু দেখা যায় না । বিলীন হয় রমনীর অবয়ব । 
মাহির পিছু ফেরে এবার । ততক্ষণে রৌদ্র পেছাতে পেছাতে দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়েছে । পা ছড়িয়ে বসেছে মেঝেতে ‌। একস্থির টলটলে দৃষ্টি তখনো ল্যাপটপের । 
মাহির হাত তুলে ইশারা করতেই ফাঁকা হয় গোটা ফ্লোর । সবাই চলে যেতেই ভয়ে ভয়ে এগোয় সে ! রৌদ্রের মুখোমুখি বসে যুবকের ডান কাঁধে হাত রাখে.....
" বস ! আর ইউ ওকে ? ম্যাম অফিসে এসেছিলেন ! কেবিনে রিসা ম্যাম আর আরিসা ছিলো তখন ? ম্যাম আপনাদের একসাথে দেখে ফেলেছে, বস । 
রৌদ্রের শরীর কেঁপে ওঠে । হাঁ হয়ে মুখ গোল করে ধক্ করে শ্বাস টানে সে । আকস্মিক তার শরীর কাঁপতে শুরু করে । থরথর করে কাঁপে পুরুষালি শক্ত পোক্ত সুঠাম দেহখানা । 
ওর কাধে রাখা মাহিরের হাতটাও কেঁপে ওঠে কেমন । চমকায় মাহির । দ্রুত দুহাতে যুবকের দুই কাঁধ চেপে ধরে । চোখের দিকে তাকায় ‌। আপনা আপনি পানি গড়িয়ে পড়ে রৌদ্রের চোখের কার্নিশ ঘেঁষে । 
মাহির চেঁচিয়ে ওঠে দেয়াল কাঁপিয়ে.....
" বস ! 
কাঁপতে কাঁপতে দেয়াল ঘেঁষেই টলে পড়ে রৌদ্র । কাত হয়ে লুটিয়ে যায় মেঝেতে । অসার হয় তার সুঠাম দেহ । আঁখি যুগল নিভে আসে স্বয়ংক্রিয়ভাবে । চোখ বুজে আসতে আসতে শেষ মুহূর্তে অস্ফুটে বিড়বিড় করে ঠোঁট নাড়িয়ে.....
" মাহির,,, আই উইল ডাই । আমার ইভারা কে খুঁজে আনো প্লিজ । ওর ক্ষতি হয়ে যাবে । ওকে ফিরিয়ে আনো । ও আবার আমাকে ভুল বুঝলো, বুঝলো না কেবল আমায় ‌। 
ওকে খুঁজে বের করো মাহিরররর....
আই লাভ হার । ইভারা ইজ মাই লাইফফফফ.....
🛑 আজকের এই পর্ব পড়ার পর যারা ওভার থিংকিং করবেন, তাদের উদ্দেশ্যে বলি, গল্পটার নাম মাথায় রাখবেন ‌। নামের সাথে সঙ্গত রেখেই ঘটবে কিছু একটা । তাই বেশি ভাববেন না । এবারে রৌদ্রের পাগলামো দেখার জন্য প্রস্তুত হোন । ওর উন্মাদনা দেখবেন এবার । মেঘার প্রতি ওর ভালোবাসার তীব্রতা দেখবেন । 
তবে সেসব দেখার জন্য আগে রেসপন্স করুন, হুহহহ্ 😒 । একেক দিন একেক রেসপন্স করে, ইডিয়টের দল । 🛑
#চলবে.........
           

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৮3তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন