ফন্ট সাইজ:
থিম:
আসবো ফিরে আবারো

৮৭তম পর্ব

লেখক: সুরভী আক্তার

#আসবো_ফিরে_আবারো

#পর্ব_৮৬

#সুরভী_আক্তার

( অনুমতি ব্যতীত কপি করা নিষেধ ❌ )

★★

সিরাতের বাচ্চাটা অনেকটা বড় হয়েছে ‌। বসে বসে হামাগুড়ি দিয়ে এগোতে পারে । প্রায় হাঁটা শেখার উপক্রম । ধরলে পা বাড়াতে পারে, কদিন পেরোলেই ঠিকঠাক ভাবে হাঁটাও শিখে যাবে বোধহয় । ডাকও শিখেছে বেশ কয়েক । “মা-বাববা-তাতা-নাননা” এসব বলে বলে মুখে ফেনা তোলে সবসময় ।

আজ বিকেলের দিকে সিরাতেরা কাবির ম্যানশনে এসেছে রামিশা কে নিয়ে । এখন সন্ধ্যা সাতটা । রাতের খাবার তৈরির প্রস্তুতি চলছে কিচেনে । ড্রইং রুমে সোফায় চুপচাপ হাঁটু জড়িয়ে বসে আছে শাফাহ্ । মাথা কাত করে রাখা হাঁটুর ভাঁজে । একই সোফায় ওর ভরসায় পাশেই রামিশা কে বসিয়ে রেখে কিচেনে ঢুকেছে সিরাত ।

হাতে কিছু টয়েস দিয়েছে খেলার জন্য । বাচ্চাটা বসে থেকে হাত নাড়িয়ে নাড়িয়ে খেলচে আর বকবক করছে আপন ভাষায় ।

শাফাহ্'র মনযোগ নেই । শুনশান হয়ে স্থির দৃষ্টিতে মেঝের পানে চেয়ে আছে আপন খেয়ালে ।

ভারাক্রান্ত মনে ভাবছে কতকিছু ।

আকস্মিক পুরো ড্রইং রুম কাঁপিয়ে রামিশা কেঁদে উঠলো ! এতে হকচকিয়ে যায় শাফাহ্ । দ্রুত পাশ ফিরতেই বাচ্চাটাকে মেঝেতে লুটিয়ে থাকতে দেখে । হামাগুড়ি দিতে গিয়ে সোফা হতে পড়ে গেছে । ব্যাথা পেয়ে কেঁদে উঠেছে অমনি ।

শাফাহ্ হিতাহিত জ্ঞান শূন্য থেকেও ধড়ফড়িয়ে উঠলো । হাত বাড়িয়ে রামিশা কে টেনে কোলে নেওয়ার আগেই কোথা থেকে ছুটে আসলো শুভ্র । বাচ্চা টাকে আগলে নিলো সে ।

কোলে তুলে সামাল দিতে দিতে গলা টাটিয়ে ধমক ছুড়লো শাফাহ্'র উদ্দেশ্যে.......

" ইউ ননসেন্স,, বাচ্চা টা পড়ে গিয়ে কাঁদছে । দেখতে পারছিস না ?

চমকে ওঠে শাফাহ্ । কেঁপে ওঠে শরীর । অগত্যা এক কদম পিছিয়ে যায় মেয়েটা । নিমিষেই ড্রইং রুমে হাজির হন সবাই । সিরাত দৌড়ে এসে রামিসা কে কোলে টেনে নেয় ‌। অবাক হয়ে বলে.....

" কি হয়েছে শুভ্র ? রামিসা কাঁদছে কেনো ? আর তুই বা ধমকাচ্ছিস কেনো টুকটুকিকে ?

" ধমকাবো না, তো তুলোধুনো করবো ওকে ? ননসেন্স তৈরি হয়েছে একটা । কার দায়িত্বে রেখে গেছো মেয়েকে ? রামিসা সোফা থেকে পড়ে গিয়ে কাঁদছে । আর ও ড্যাপ ড্যাপ করে দেখছে বসে বসে ।

তাৎক্ষণিক দুদিকে মাথা নাড়ায় শাফাহ্.....

" না ভাইয়া,, আমি ওকে কোলে নিতেই যাচ্ছিলাম । তার আগেই তুমি এসে গেছো । ও কিভাবে পড়ে গেলো, খেয়াল করিনি আমি ।

চোয়াল খিচে মুখ ফিরিয়ে নেয় শুভ্র ।

" নিজের মেয়েকে সামলাও আপু । নেক্সট টাইম থেকে যার তার দায়িত্বে বাচ্চাকে দেওয়ার আগে অন্তত একবার হলেও ভেবে নিও ।

সিরাতের উদ্দেশ্যে তপ্ত স্বরে কথাগুলো ছুড়ে হনহনিয়ে গিয়ে সোফার একপাশে বসলো সে ।

রামিসা চুপ হয়ে গেছে মাকে পেয়ে । ফোপাচ্ছে এখনো । শাফাহ্ সিরাতের দিকে ফিরে মাথা নত করে । অসহায় কন্ঠে বলে.....

" আ'ম স্যরি আপু । বিশ্বাস করো,,, রামিসা কি করে পড়ে গেলো, আমি বুঝতে পারি নি । খেলছিলোই তো, আমি একটু বেখেয়ালে হয়ে গেছিলাম । আ'ম রিয়েলি স্যরি ।

" ইটস্ ওকে টুকটুকি । চুপ হয়ে গেছে এখন । বাচ্চা তো,, অল্প ব্যাথাতেই কেঁদে উঠছিলো ।

শাফাহ্ আহত দৃষ্টি ভাইয়ার দিকে তাক করে ।

হাসার চেষ্টা করে বলে একটু এগিয়ে....

" আ'ম স্যরি ভাইয়া । তুমি ঠিক বলেছো, আমি আসলেই একটা ননসেন্স...

কথাটুকুনি আওড়িয়ে তড়তড়িয়ে উপরে উঠতে লাগলো মেয়েটা । সিঁড়ির মাথায় করিডোরে আদ্র দাঁড়িয়ে । শাফাহ্ দৃষ্টি না তুলে পাশ কাটিয়ে চলে গেলো । সোজা ঢুকলো রৌদ্রের রুমে । রোজ এই সময়ে রৌদ্রের কাছে আসাটা অভ্যাস হয়ে গেছে ওর ।

ঘরে ঢুকেই প্রথমে দরজার পাশের ক্যালেন্ডারে নজর দিলো রমনী । ক্যালেন্ডারে জুন মাস চলে । আজ ত্রিশ তারিখ । দেখতে দেখতেই মাঝে দুই মাসের অধিক সময় কেটে গেছে । কাল হতে জুলাই শুরু ।

ক্যালেন্ডারের তারিখ গুলোতে প্রত্যেক দিন মার্কার দিয়ে গোল মার্ক করে রাখে শাফাহ্ । আজকেও ৩০ সংখ্যা টাকে সার্কেল মার্কে আবদ্ধ করালো । অতঃপর এক দিন আগেই উল্টিয়ে দিলো পাতা ।

জুলাই এলো দ্বারে । রমনী মাসটা দেখে বুক চিরে হাসে আলতো করে । স্বল্প ভেজা চোখ মুছে নেয় ।

অতঃপর পিছু ফিরে এগোয় বিছানার দিকে ।

সাদাটে বিছানায় নিথর হয়ে পড়ে আছে রুডভিক কাবির রৌদ্র । কোমর অবধি চাদর টানা । সেই কবে থেকে এভাবে নিস্পন্দ হয়ে পড়ে আছে বেপরোয়া যুবক । না চোখ মেলে তাকায়, না নড়চড় করে, আর না কারোর ডাকে সাড়া দেয় । বাহ্যিক কোনো কিছুই প্রভাব ফেলে না তার মাঝে ।

সে নিস্পৃহ , জীবিত লাশ । কেবলই ভেতর ঘরে হৃৎপিণ্ড টা স্পন্দিত হচ্ছে ।

শাফাহ্ এগিয়ে গেলো । বিছানার এক পাশে বসলো । রৌদ্রের ডান হাতটা টেনে মুঠোবন্দী করে মুচকি হেসে বলতে লাগলো থেমে থেমে.....

" রৌদ্র ভাইয়া,,, আই মিস ইউ ‌।

তুমি সুস্থ হবে কবে বলো তো ? চোখ মেলে দেখবে না আমাদের ? জানো, বাড়িটা আর আগের মতো নেই । কেউ আর হাসে না এ বাড়িতে । বাড়তি কথা বলে না কেউ ‌। কেমন বদলে গেছে সবাই । সবাই তোমার অপেক্ষায় আছে ভাইয়া । প্লিজ তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে যাও ।

একটু থেমে হাতের উল্টো পিঠে গাল মুছে আবার বলতে লাগলো.....

" আচ্ছা ভাইয়া, আমার কথা গুলো শোনো না তুমি ? শুনতে পাও ? ওও ভাইয়া,,, প্লিজ তাড়াতাড়ি ঠিক হয়ে যাও । তুমি ছাড়া মেঘাকে আর কেউ খুঁজে পাবে না ! মেঘা নেই ভাইয়া ! মেঘার ভাইয়াও নেই । আমাদের কাছে ওরা ধরা দেয় না আর ।

মেয়েটা আনমনে কথা আওড়াতে আওড়াতে বিছানায় মাথা নামিয়ে রাখলো । ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো ।

গুনে গুনে কতকগুলো দিন পেরিয়েছে । না মেঘার খোঁজ আছে, আর না ইয়াশের । নিশ্চয়তা খুঁজে রোজ একবার করে ইয়াশের ফোনে কল লাগায় শাফাহ্ । লাভ হয় না । ওপাশ থেকে ফোনটা বেজে বেজে কেটে যায় । রিসিভ করে না তপ্ত যুবক ।

কেনো করে না, তা শাফাহ্ জানে না । ইয়াশ বলেছিলো সে আসবে , মেঘাকে খুঁজে বের করবে ।

মেঘাকে এখনো পাওয়া যায়নি । সুইজারল্যান্ডে এখনো পুলিশের তল্লাশি চলে । মাহির পুরোদমে চেষ্টা চালায় । কিন্তু কেউই সফল হয় না ।

ইয়াশ কোথায়, কে জানে ! লোকটা ফোন ধরে না কেনো ? তিনি তো কথা দিয়েছিলেন, তিনি আসবেন । তাহলে আসেন না কেনো ? শাফাহ্ কে ভুলে গেলেন তিনি ?

মেয়েটা এসব ভাবতে গিয়ে চোখ বুজে নেয় যন্ত্রণায় । এ বাড়িতে আসলেই তার দম রুদ্ধ হয়ে আসে । এখন তো যন্ত্রণা বেড়েছে দ্বিগুণ ।

শুভ্রর অবহেলা নিয়ে তিনগুণ । ভাইয়ার অমন অবহেলা সইতে পারে না মেয়েটা । শুভ্রর অমন তপ্ত ঝাড়ি, খড়খড়ে গলায় কথা বলা, এসব নমনীয় রমনীর বুকে আঘাত হানে । এতো দিনেও আজ অবধি শুভ্র নিজে থেকে শাফাহ্'র সাথে কথা বলে নি । শাফাহ্ আগ বাড়িয়ে বলতে গেলেও এড়িয়ে গেছে ।

কথা বলে না ঠিকি, তবে যখন তখন ধমকায় । ছোট খাটো সব কারনেই রাগ ঝাড়ে । এক কথায় এখন আর শাফাহ্ কে সহ্য করতে পারে না সে । কারনটা শাফাহ্ জানে । আর জানে বলেই ভাইয়ার সব রাগ মুখ বুজে হাসি মুখে সয়ে নেয় ‌। এদিকে হাসি মুখের আড়ালে দগ্ধ হয় ভেতর ।

শাফাহ্ চুপ করতেই ঘরে নীরবতা ছেয়ে গেছিলো । বেশ কিছুক্ষণ পর নীরবতা ভেঙে আদুরে ডাক পেলো কানে....

" টুকটুকির বাচ্চাআআ !

চট করে চোখ খোলে শাফাহ্ । কেঁপে ওঠে বক্ষস্থল । সামনে আদ্র দাঁড়িয়ে । ওকে দেখেই দৃষ্টি তড়াক হয় রমনীর ‌ । আদ্র গাল ঠেলে হাসে । বসে মুখোমুখি । বলে নরম কন্ঠে.....

" অনেক গুলো চকলেট এনেছি তোর জন্য, সব ফেভারিট সব কিছু আছে । রুমে রেখে এসেছি । গিয়ে দেখ....

তড়াক দৃষ্টি ব্যাতীত শাফাহ্'র মাঝে খুব একটা রুপান্তর দেখা গেলো না । আদ্র বুঝলো ওর মনের অবস্থা,, কন্ঠ আরো নরম করলো....

" টুকটুকি, মন খারাপ তোর ? বাইরে ঘুরতে নিয়ে যাবো ? কোথায় যবি বল ?

শাফাহ্ মাথা নাড়ায়....

" কোথায় যাবো না ভাইয়া । মন খারাপ নেই আমার ।

" মন ভালোও নেই । আগের মতো চঞ্চলতা নেই তোর মাঝে । কি হয়েছে ওখানে গিয়ে ? ইয়াশ তোর সাথে.....

" উনি খুব ভালো, আদ্র ভাইয়া । ওনাকে নিয়ে খারাপ কিছু ভেবো না ।

" খারাপ কিছু ভাবিও না । আমি জানি ইয়াশ কেমন ! তোর সাথে ওর কন্টাক্ট হচ্ছে না এখন, সেটাও জানি আমি । দেখ টুকটুকি, পরিস্থিতি কেমন তা তুই জানিস তো । মেঘের খোঁজ নেই এখনো অবধি । এখানে রুডির এই অবস্থা । বাড়িতে কেউ নরমাল নয় । শুভ্র ভাইয়া তোর সাথে একটু চটচটে হয়ে কথা বলে । আই নো, মন খারাপ হয় তোর । ভাইয়া ডিস্টার্ব কিছু একটা নিয়ে । ভাইয়াকে একটু সময় দে, সব ঠিক হয়ে যাবে ধীরে ধীরে ।

শাফাহ্ মুচকি হাসলো....

" ভাইয়ার রাগে আমার একটুও মন খারাপ হয় না ।

আমার তো কষ্ট হয় রৌদ্র ভাইয়াকে এভাবে দেখলে । ভাইয়া কবে ঠিক হবে, আদ্র ভাইয়া ?

আদ্র রৌদ্রের দিকে তাকায় । বুক চিরে দীর্ঘ শ্বাস ফেলে । শান্তনা দেয়....

" ইনশাআল্লাহ, খুব তাড়াতাড়ি ঠিক হয়ে যাবে ।

মন খারাপ করতে হবে না অতো । একেই বাড়িটা স্তব্ধ হয়ে গেছে । তার উপর তোকে এমন দেখলে ভালো লাগে না মোটেও । অচেনা লাগে তোকে । তুই অন্তত নরমাল থাক একটু ।

শাফাহ্ মুচকি হাসলো পূণরায় ।

" চকলেটের জন্য থ্যাংক ইউ ভাইয়া ।

হাসে আদ্র ।

ওদের দুজনের কথার মাঝে শিশিরের আগমন ।

সিরাতেরা চলে যাচ্ছে । কোনো কারণে আহিয়ান আদ্র'কে ডাকছে নিচে ।

শিশির ঘরে ঢুকেই আলতো স্বরে ডেকে বললো...

" স্যার,,, আপনাকে নিচে ডাকছে ।

উঠে দাঁড়ায় আদ্র ।

" কে ?

" আহিয়ান ভাইয়া !

ফের শাফাহ্'র দিকে ফিরলো আদ্র । শিশির ততক্ষণে পাশে এসে দাঁড়িয়েছে । মেয়েটা আপ্লুত চোখে দুজনকে দেখলো চোখ ভরে । ফিক করে হেসে উঠলো হুট করেই । চোখ মুছে বললো....

" তোমাদের দুজনকে খুব সুন্দর মানিয়েছে ভাইয়া !

ওর এহেন কথায় কপাল গুটায় আদ্র । আকস্মিক মেয়েটাকে হাসতে দেখে আনন্দ লাগে । সায় দিয়ে শিশিরের কাঁধ জড়িয়ে চট করে বলে......

" আই নো,, উই আর মেইড ফর ইচ আদার । অ্যাম আই রাইট , ভেজা বেড়াল ?

শিশির অপ্রস্তুত হয় কিছুটা । আদ্র কে ঠেলতে গেলে ওকে আরো চেপে ধরে যুবক.....

" হোয়াট ? টুকটুকির সামনে লজ্জা কিসের ? তুমি না ওর বেস্ট ফ্রেন্ড । বেস্ট ফ্রেন্ডের সামনে হাজবেন্ড কে স্পর্শ করতে ইতস্ততা কিসে বলতো ? ইউ আর সো আন রোমান্টিক,, বেয়াদব ! টুকটুকি,, ওকে একটু রোমান্টিকতা শিখিয়ে দিস তো । সারা জীবন শুধু বইয়ের ভাঁজে মুখ ডুবিয়ে রেখেই দিন পার করেছে । বেয়াদব.....

" ও না হয় আমার বেস্ট ফ্রেন্ড । কিন্তু আপনার তো ছোট বোন । ছোট বোনের সামনে বউকে চেপে ধরছেন, লজ্জা করে না ? এখানে বেয়াদব টা কে হলো শুনি ?

শিশিরের স্পষ্ট বাক্যে আদ্র এক ভ্রু উচায় । ওষ্ঠপূটে দাঁত বসিয়ে চট করে ঠোঁট নামিয়ে টুপ করে চুমু খায় ললিতার বাম গালে । আহম্মক বনে যায় শিশির । আদ্র চোখ টিপে সরে আসতে আসতে গলা বাড়িয়ে বলে.....

" তুমিই বেয়াদব ! আমার বেয়াদব ।

শিশির নিজেকে সামলে অপ্রস্তুত দৃষ্টি ফেরায় শাফাহ্'র দিকে । তাৎক্ষণিক মুখ টিপে শব্দ করে হেসে ওঠে চঞ্চলা । অপর দিকে কুন্ঠায় চিবুক নত করে শ্যামলিনী ।

,,,,,,,

আজ শুক্রবার । সকাল দশটা পেরিয়েছে ।

দেরিতে ঘুম থেকে উঠে সবে ব্রেকফাস্টে বসেছে শাফাহ্ । সবার খাওয়া শেষ ইতোমধ্যে ।

গোটা টেবিলে একলা বসে বসে আপন মনে খাচ্ছে মেয়েটা । আকস্মিক দরজার বেল বাজে । শাফাহ্ ধ্যান দেয় না । শিশির ছিলো লিভিংয়ে । সে পা চালিয়ে গিয়ে দরজা খুলে দিলো ‌।

দরজার ওপাড়ের জনকে দেখে খানিক অপ্রস্তুত হলো শ্যামলিনী । চোখ নামিয়ে সরে দাঁড়ালো ।

ভেতরে পা রাখতে রাখতে শুধালো সেই জনা....

" শুভ্র কোথায় ?

খানিক উঁচু ছিলো গলার স্বর । শাফাহ্'র কানে পৌঁছাতেই আঁতকে উঠলো মেয়েটা । মুখের খাবার গলায় আটকালো সহসা । রমনী শ্বাস আটকে কেশে উঠলো শুকনো ।

ওদিকে তার কাশির শব্দে ধক্ করে ওঠে সায়ান । শিশিরের থেকে উত্তর নেওয়ার আগেই তড়াক বেগে দৃষ্টি তাক করে ডাইনিংয়ের দিকে ।

কন্ঠ অনুসারে কাঙ্ক্ষিত জনকে দেখেই ধ্যান জ্ঞান খুইয়ে ছুটে আসে এলোমেলো কদমে ।

মেয়েটা তখনও কেশেই যাচ্ছে । সায়ান জোর কদমে এগিয়ে এক গ্লাস পানি ঢেলে তড়িতে বাড়িয়ে দিলো শাফাহ্'র দিকে । বিচলিত হয়ে বললো.....

" কিউটিপাই,,, পানি খা ফাস্ট । দেখে খাবি তো না-কি ? গলায় আটকেছে ?

শাফাহ্ কাশি আটকে নেয় । চিবানো খাবার গিলে গ্লাস ধরে পানি খায় দু ঢোক । অতঃপর নিজেকে ধাতস্থ করে ধীরে ধীরে পাশ ফিরে চায় । নজরে পড়ে সায়াহ্ন নামক যুবকের সেই চিরচেনা নিখাদ মুখখানা । যে মুখে এখন একরাশ উদ্বিগ্নতা । চোখে অস্থিরতা । শাফাহ্'র সাথে চোখাচোখি হতেই শুধালো ব্যস্ত হয়ে.....

" ঠিক আছিস এখন ?

শাফাহ্ চেয়েই রয় ।

বাড়িতে ফিরেছে থেকে এ অবধি সে সায়ানের মুখোমুখি হয় নি । জ্বালা বাড়াতে চায়নি যুবকের মনে । হাজার বাহানায় নিজেকে লুকিয়ে রেখেছে তাই । যখনই সায়ান এ বাড়িতে এসেছে, তখনই নিজেকে ঘরে বন্দি করে নিয়েছে শাফাহ্ । সে ধরা দেয় নি, আসে নি যুবকের সামনে । তবে আজ অভাবনীয় ভাবে এসেই গেলো । সময় তাদের ঠিক মুখোমুখি দাঁড় করালো । এই অসময়ে সায়ান এ বাড়িতে আসবে, তা কভুও জানা ছিলো না রমনীর । জানা থাকলে সে নিজেকে গুটিয়ে নিতো । যেভাবে আগের দিন গুলোতে নিয়েছে ।

এমনিতেই সায়ান ছলে কৌশলে এ বাড়িতে আসে সময়ে অসময়ে । কেবলই একটা পলকের জন্য শাফাহ্ কে দেখার বাসনায় । কিন্তু তার কিউটিপাই তার সামনে ধরা দেয়নি ফেরার পর থেকে । সেও খুব একটা প্রচেষ্টা করেনি । লাভ কি প্রচেষ্টা করে ? লাভ নেই, তবুও মন মানতো না । উচাটন জাগতো ভেতর ঘরে । চোখ দুটি বেপরোয়া হয়ে উঠতো ।

আজ বহুদিন পর সায়ানের মুখ দেখলো শাফাহ্ । অমনি ছলকে উঠলো দৃষ্টি জোড়া । ধীরে ধীরে কাতর হলো চাহনি । এটা সায়ান ? কি অবস্থা হয়েছে চেহারার ! আগের মতো উজ্জ্বলতা নেই বোধহয় ! কেমন ঝিমিয়ে গেছে যুবক । চোখ দুটোতে তবুও মেয়েটার জন্য উৎকণ্ঠা উপচে পড়ছে । শাফাহ্ চোখ সরিয়ে নেয় । মৃদু হেসে উত্তর করে.....

" আমি ঠিক আছি, বাডি !

একটু থেমে শুধালো.....

" তুমি,,, তুমি ভালো আছো ?

প্রশ্নের বিপরীতে সায়ান দীর্ঘ পলকে পরখ করলো তার কিউটিপাইকে । কতদিন পর বোধহয় স্থির হলো চোখজোড়া । আকুল নয়নে বড্ড তৃষ্ণা তার । বড্ড ব্যাকুলতা বুকে । চোখের এ তৃষ্ণা মিটবার নয় ! তৃপ্ত হওয়ার নয় এ দৃষ্টি । তবুও সে চেয়ে রয় অতৃপ্তের ন্যায় । দৃষ্টিতে পলক নেই ।

শাফাহ্ অপ্রস্তুত হয় তার দৃষ্টিতে ।

" সায়ান ভাইয়া,, কি দেখছো ?

নড়েচড়ে ওঠে শান্ত যুবক । দৃষ্টিতে পলক ফেলে পরক্ষণে চোখ বুজে নেয় যাতনায় । ঠোঁট ভেজায় ‌। ধরে আসা কন্ঠ তুলে শুধায়.....

" আমাকে ভাইয়া বলিস কবে থেকে ? তোর মুখে ভাইয়া শুনতে ভালো লাগে না, কিউটিপাই । আগেও লাগতো না ।

আর কি জিজ্ঞেস করলি যেনো, কেমন আছি আমি ? প্রায় তিন মাস হতে চললো দেশে ফিরেছিস, একদিন ও জানতে ইচ্ছে হয়নি কেমন আছি ? আমাকে দেখতে ইচ্ছে হয় নি ? মনে পড়েনি আমার কথা ? এতো বড় হয়ে গেলি কবে থেকে ? এতো তাড়াতাড়ি ভুলে গেলি আমায় ?

" না বাডি, তোমাকে ভুলবো কি করে ?

" মনে রেখেছিস তাহলে ?

" রেখেছি বলেই তো জানতে চাইছি, ভালো আছো তাই না ?

সায়ান লম্বা শ্বাস ফেলে, দীর্ঘ স্বরে উচ্চারণ করে....

" আছি হয়তো !

আর কিছু বলার আগেই সিঁড়ি হতে খড়খড়ে তপ্ত গলায় ডেকে উঠলো শুভ্র.....

" সায়ান,,, ওখানে কি করছিস ? আমি তোকে ডিরেক্ট আমার রুমে আসতে বলেছিলাম ‌।

চকিতে ফিরে চাইলো দু'জনেই ।

" যা , আসছি আমি ।

" আসছি না, এক্ষুনি আসবি ! অন্য কোথাও টাইম ওয়েস্ট করতে হবে না । অলরেডি অনেক টাইম ওয়েস্ট করে ফেলেছিস । বছরের পর বছর ওয়েস্ট করেছিস । শিক্ষা হয়নি তবুও ?

" শুভ্র,,, ভেবে কথা বল ।

" ভেবেই বলছি । ইম্পর্ট্যান্ট কথা আছে তোর সাথে । রুমে আয় আমার ।

" বললাম তো আসছি, যা তুই !

দুজনের কথা কাটাকাটির মাঝে শাফাহ্ ধীরে বলে......

" যাও বাডি, ভাইয়া ডাকছে ।

সায়ান শুনলো না । আলগোছে রমনীর সামনে বসলো । মুখখানাতে চোখ বুলিয়ে খুব স্বাভাবিক ভাবে বললো....

" আজ ফুল আনতে ভুলে গেছি কিউটিপাই ! রাগ করেছিস ? ইউ নো,, সেদিন আমি ফুল নিয়ে এসেছিলাম । কিন্তু তোকে পাইনি । অবশ্য তোকে এখন ফুল দেওয়ার লোক হয়ে গেছে, তাই না ?

শাফাহ্ কাষ্ট হাসে.....

" হয়েছে তো । কিন্তু তোমার মতো কেউ হয়না, বাডি ।

" তোর মতোও কেউ হবে না কোনো দিন । তুই নেই তাই, আমারও আর ফুল দেওয়া হবে না কাউকে ।

,,,,,

প্রত্যেক সপ্তাহে একবার করে দেশে আসে মাহির । জন্মের পর সেই যে সুইজারল্যান্ডে সেটেল হয়েছে পরিবার নিয়ে, দেশ মুখো হয়নি পরবর্তীতে আর । তবে এখন হয়েছে । গত আড়াই মাস ধরে প্রত্যেক সপ্তাহে রৌদ্রের কাছে আসে সে । কেবলই এক পলক করে দেখার জন্য ।

সুদূর দূরত্বে থেকে ঘন্টার পর ঘন্টা পেরিয়ে আসে, আবার ক্ষণকালের মধ্যেই চলে যায় ‌।

এই যেমন আজ এসেছে ।

এ বাড়ির সবাই এখন চেনে ওকে । কাবির ম্যানশনে পা রেখেই সে সোজা রৌদ্রের কাছে যায় ।

বরাবর একই ভাবে আবিষ্কার করে বেপরোয়া যুবককে । সেই একই ভাবে নিস্তেজ হয়ে পড়ে আছে বেডের উপর । রৌদ্রেকে ওভাবে দেখলেই বুক চিরে যায় ‌।

মাহির গুটি গুটি ধাপে খাটের পাশে একটা চেয়ার টেনে বসে । রৌদ্র কে ডেকে লাভ নেই, অযথা কানের কাছে বকবক করেও লাভ নেই । সে ডাকে সাড়া দেবে না , হয়তো বকবক গুলোও শুনবে না ।

মাহির প্রথমেই ডাকলো না আজ । পকেট থেকে ফোন বের করলো । কল লাগালো কারোর নাম্বারে । রিসিভ হতেই জোর পূর্বক হাসলো এক পশলা.....

" আরিসা,,,

ফোনের ওপাড়ে রিসা আর মিনি । ভিডিও কলে যুক্ত । মিনির মুখের সামনে ফোনটা এগিয়ে দিলো রিসা । বাচ্চাটা মুখ নামিয়ে বসে আছে । তাকালোও না ।

মাহির ডাকে আবার....

" ওন্ট ইউ সি ইউর পাপা, আরিসা ? লুক, হেয়ার ইজ ইউর পাপা !

ক্যামেরা ব্যাকে নিয়ে রৌদ্র কে দেখায় সে ।

মিনি তাকায় না তবুও । বাচ্চাটা কষ্ট চেপে আরো বেশি চোখ নামিয়ে নেয় । প্রত্যেক সপ্তাহে এই এক কাহিনী । রৌদ্র কে ওভাবে স্পন্দন হীন অবস্থায় দেখতে হয় । মাহির ফোন করে দেখায় এক ঝলক করে ।

মিনি মানতে পারে না এসব । সে বুঝতে চায় না । এরমধ্যেই ঠান্ডা মাথায় রিসা অনেক কিছু বুঝিয়েছে ওকে । জানিয়েছে অনেক সত্য । গত কদিনে ছোট্ট মস্তিষ্কের উপর দিয়ে প্রচন্ড চাপ বয়ে গেছে বাচ্চাটার । লাস্ট এক মাস ধরে সেও নিশ্চুপ হয়ে গেছে পুরো । কথা বলে না, বায়না করে না, ঠিকমতো তাকায় না কারোর দিকে ।

আগে যে মিনি রৌদ্র কে দেখার জন্য মরিয়া হয়ে উঠতো, সেই মিনি এখন ফিরেও তাকালো না রৌদ্রের দিকে ।

তার ছোট্ট হৃদয়ে সংশয় হাজার । সৃষ্টি হয়েছে ক্ষত । সে শুনেছে, রৌদ্র তার পাপা নয় । তার পাপা নেই । কোথাও নেই ।

সেসব কতটুকু বুঝেছে জানা নেই । তবে রৌদ্রের এই অবস্থাটা সে মানতে পারে না ।

রিসা ঝাকালো ওকে...

" মিনি,,, মাম্মা দেখো । মাহির আঙ্কেল রৌদ্র কে দেখাচ্ছে ! দেখবে না ? পাপা ঘুমিয়ে আছে ! দেখো....

মিনির মন ফেরানোর চেষ্টা করে রিসা । তবুও তাকালো না মিনি ‌। মুখ ফিরিয়ে নিলো । বুকে জড়ানো পুতুলটাকে আকড়ে ধরলো আরো বেশি । ছোট্ট মুখখানা কাতর । আধো উল্টানো ওষ্ঠ জোড়া । বাচ্চা মনে কি চলছে, তা কেবল সেই জানে ।

মেয়ের এমন অবস্থা দেখে রিসা ঠোঁট কামড়ে কান্না সংবরণ করে । বলে ভেজা গলায়....

" মাম্মা,, দেখো । কিছু বলো প্লিজ । পাপা কে ডাকো একবার !

অপর দিকে মুখ ফিরিয়ে বসা থেকে উঠে যায় মিনি । গুটি গুটি পায়ে ডিভান থেকে খাটে গিয়ে বসে ।

রিসা কেবলই চেয়ে দেখে ভেজা চোখে । বুক মুচড়ে ওঠে, পানি গড়িয়ে গাল ভেজে তার । সে চোখ মুছে ফোন কেটে দেয় ।

এদিকে মাহির হাঁফ ছাড়ে দীর্ঘ । ফোন রেখে রৌদ্রের দিকে তাকায় পুনরায় । মুচকি হাসে । চেয়ার টেনে আরেকটু কাছে চেপে বসে । রৌদ্রের একহাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বলে.....

" দেখেছেন বস,,, আপনি যে যে ভয় পেতেন, সেই সেই ভয় গুলোই ফলে গেছে । ইউর মিনি ইজ ট্রমাটাইজড । প্লিজ বস ফিরে আসুন, আপনি ফিরে আসলে সব ঠিক হয়ে যাবে । আমি আর একলা পারছি না কোনো কিছু । সব আমার উপর চাপিয়ে দিয়ে নিজে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন ? কেনো বস ? আমরা তো একসাথে ম্যাম কে খুঁজতে পারতাম ! কেনো অস্থির হলেন এতোটা ? আপনাকে এভাবে দেখে অভ্যস্ত নই বস । আই কান্ট বেয়ার টু সি ইউ লাইক দিস ।

সে থামলো । গলা নেমে এসেছে । পানি জমেছে আঁখি কোটরে । চিনচিনে যন্ত্রণা হচ্ছে বুকে । অথচ রৌদ্র তার আপন কেউ নয় । তবুও রৌদ্র কে এভাবে দেখলে সহ্য হয় না কেনো ? এ কেমন অনুভূতি ? যন্ত্রণা হয় কেনো এতো ? কিসের টান রৌদ্রের প্রতি । প্রত্যেক সপ্তাহে ঠিক এভাবেই রৌদ্রকে নিথর অবস্থায় দেখতে পায় সে । আর এভাবে দেখার জন্যই ঘন্টার পর ঘন্টা পাড়ি জমিয়ে ছুটে আসে কিয়ৎ কালের জন্য ।

মাহির রৌদ্রের হাত ছেড়ে বেডে কনুই ঠেসে দুহাতে মুখ ঢেকে নেয় ‌। মনে পড়ে সেরাতের কথা । সেই রাতেও স্বাভাবিক ছিলো রৌদ্র । কতই না খুশি ছিলো । মনে পড়তেই ছটফট করে উঠলো যুবক । চোখ মুছে আবার বিলাপ করলো.....

" বস , আমার বিয়ে দেবেন না ? আপনি না বলেছিলেন, আগামী এক মাসের মধ্যে আমার বিয়ে দেবেন । ভুলে গেলেন ? দেখুন, আড়াই মাস পেরিয়ে গেছে । অতিরিক্ত দেড় মাস বয়ে গেছে ‌। কবে ফিরবেন বস ? আপনার দায়িত্ব কিন্তু আপনাকেই পালন করতে হবে । আমি অপেক্ষা করবো আপনার জন্য । তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে যান প্লিজ । আপনার জন্য অনেক কিছু থেমে আছে বস ।

ছেলেটার বিলাপের মাঝে এবারে ঘরে ঢুকলেন রুবিনা কাবির ।

ট্রেতে করে মাহিরের জন্য কিছু নাস্তা সাজিয়ে এনেছেন ভদ্রমহিলা । ছেলেটাকে এই কদিনে চেনা হয়ে গেছে । মায়া জমেছে । রৌদ্রের প্রতি এই ছেলের উদ্বিগ্নতা দেখে অবাক হন এবার বাড়ির সবাই । অদ্ভুত ভাবে রৌদ্রের জন্য কাঁদে এই ছেলেটা ।

প্রত্যেক বারের মতো আজকেও ঘরে ঢুকে মাহিরের ভেজা ভেজা চোখ দুটি দেখতে পেলেন রুবিনা কাবির ‌। অমনি মাতৃ হৃদয় মুচড়ে এলো তার । নিজেকে ধাতস্থ করে এগিয়ে নাস্তার ট্রে পাশে রাখলেন ।

" প্রত্যেক সপ্তাহে এভাবে ক্ষণকালের জন্য এসে কি পাও বাবা ? থাকতে বলি, থাকোও না একটা রাত ‌। অতদূর জার্নি করে আসা যাওয়াতে কষ্ট হয় তো ।

মাহির ভালোমতো চোখ মুখ মুছে মৃদু হাসলো.....

" কষ্ট আর কোথায় আন্টি ? বসকে এক পলক দেখার ইচ্ছে হয় । তাই আসি ।

" আজ না হয় থেকে যাও এ বাড়িতে ।

" সম্ভব না আন্টি,,, ওখানে অনেক কাজ আমার ।

" মেঘার খোঁজ পাওনি একটুও ? কোনো খবর মেলেনি ?

ভদ্রমহিলার ভেজা করুন প্রশ্ন ‌। বিপরীতে মাহিরের দীর্ঘ শ্বাস.....

" আমাদের প্রচেষ্টায় খামতি নেই,,, তবুও বারবার বিফল হচ্ছি । বসকে ছাড়া হাত পা চলে না আমার । তিনি পাশে থাকলে জোর পেতাম । তাও পাই না । আর কি করবো বলুন তো ? বসের কন্ডিশন ও এক । কোনো পরিবর্তন নেই । আর কতদিন পড়ে থাকবে এভাবে ?

রুবিনা কাবির ছলছল চোখে ছেলের দিকে তাকান । বারংবার ভেতর ফেটে কান্না আসে ছেলেকে দেখলেই । এটা বুঝি তার ছেলে ? সেই বেপরোয়া, ছন্নছাড়া, বদমেজাজি রুডভিক কাবির রৌদ্র ? একি অবস্থা তার ? একটা মেয়ের জন্য আজ সে জীবিত লাশ ।

কিছু বলেন না ভদ্রমহিলা । গলায় দলা পাকিয়ে নিঃশ্বাস আটকে আসে । রুদ্ধ হয়ে জবান ।

মাহির মুখ গোল করে শ্বাস ফেলে বলে.....

" আই উইশ, ম্যাম যেনো সুস্থ থাকেন । সুরক্ষিত থাকেন । আই ডোন্ট নো, কি অবস্থায় আছেন তিনি । যেই অবস্থায় থাকুক না কেন, শুধু একবার খুঁজে পেতে চাই তাকে । অন্তত বসের জন্য । রিকভারি করার পর ম্যামকে দেখতে না পেলে অন্য কিছুও ঘটে যেতে পারে । তেমন কিছু না হোক আর । তার অগেই যেনো ইভারা ম্যাম কে খুঁজে পাওয়া যায় ।

রুবিনা কাবির ওর মাথায় হাত রাখলেন । স্নেহের সহিত হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন....

" খেয়ে নাও বাবা । অনেকটা পথ পেরিয়ে এসেছো । রান্না হচ্ছে, খাবার খেয়ে তবেই যাবে কিন্তু ।

মাহির হাসলো এক গাল ।

সন্ধ্যার আগে আগে মাহির বেরিয়ে গেছে । ফ্লাইট ছিলো আটটায় ।

আজ রাতের ডিনারে সবাই একসাথে বসেছেন । কেবল শাফাহ্ নেই । শিশির সহ খাবার সার্ভ করতে করতে মেহের বারবার উপরের দিকে তাকাচ্ছে ।

এবারে ধৈর্য হারিয়ে বলেই বসলো.....

" শিশির,, টুকটুকি কে ডেকে দাওনা একটু । সবার খাওয়া হয়ে যাচ্ছে তো । ও নামছে না কেনো এখনো ?

" শাফাহ্ তো সন্ধ্যার পর ঘুমিয়েছে আপু । এখনো ঘুমোচ্ছে, ডাকিনি তাই ।

" সে কি,,, সন্ধ্যা থেকে ঘুমোচ্ছে ? খিদে পেয়েছে নিশ্চয়ই ? এখন খাবে না ?

তাৎক্ষণিক শুভ্রর জবাব.....

" সেটা তোকে ভাবতে হবে না । খাবার সার্ভ করা হয়ে গেছে, এবার দু'জনে খেতে বস । যখন যার পেটে টান পড়বে, তখন সে নিজেরটা নিয়ে নিয়ে খাবে ।

তার তপ্ত চড়া কথার অর্থে মুখ কুঁচকে ফেলেন উপস্থিত সবাই ‌। শাহিনা কাবির বলেন সহসা....

" এটা কি ধরনের কথা শুভ্র ? বোন হয় ও তোর ! ইদানিং দেখছি, ওকে একদম সহ্য করতে পারিস না তুই ।

" এক্সাটলি ! ভাইয়া, তুমি এবার একটু বাড়াবাড়ি করছো ! টুকটুকির তো দোষ নেই কোনো কিছুতে । ওকে এভাবে হেও করছো কেনো ? একেই মেয়েটা একের পর এক অনেক কিছু সহ্য করে গেছে ! ওর দিকটা ভাবছো না কেনো তুমি ? কি পরিস্থিতিতে ছিলো ও , জানতে চেয়েছো একবারও ? ঠিকমতো তাকিয়ে দেখেছো বোনটার দিকে ? চেহারা দেখেছো ওর ?

আদ্রের কথায় শুভ্রর স্পষ্ট জবাব.....

" দেখেছি,,, আর এটাও বুঝেছি ভালো করে, নিজের অবস্থার জন্য ও নিজেই দায়ী । আমি এবার একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি । আব্বু আম্মু, সবাইকে একটা কথা বলার আছে আমার ।

সে থামলো । খাওয়া ফেলে সাবলীল ভঙ্গিতে প্রশ্ন সূচক দৃষ্টিতে তাকালেন সকলে । শুভ্র একে একে দেখে নেয় সবাইকে । বলে দৃঢ় স্বরে.....

" সব রেডি,,, তোমাদের মেয়ে আর তার সো কল্ড হাসবেন্ড,, ওদের ডিভোর্সের ব্যবস্থা করেছি আমি । পেপারস রেডি ।

ডাইনিংয়ে উপস্থিত সবার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ে ‌। খাওয়া থামিয়ে আঁতকে তাকান সকলে । সহসা মেহেরের মুখ ফসকায়...

" কি বলছো এসব ?

" যা শুনেছিস, তাই ! সবার উদ্দেশ্যেই বলেছি । আবারো বলছি পরিষ্কার ভাবে,,, পেপারস রেডি । এখন শুধু সাইন করার অপেক্ষা ।

" শুভ্র,,, মাথা খারাপ হয়ে গেছে তোমার ? ওদের বিয়ে হয়ে গেছে, তুমি কে ওদের ডিভোর্স করানোর ?

তৌসিফ কাবিরের শক্ত বাক্য । শুভ্র গলা নামায়.....

" ওদের বিয়েটাকে ঠিক বিয়ে বলে না আব্বু । আর যখন বিয়ে হয়েই গেছে, তখন ওকে এখানে ফেলে রেখেছে কেনো ? এতো দিন কেটে গেলো, একটা বারও খোঁজ নিলো না ‌। আর না খোঁজ দিলো । কতটা ব্যস্ত সে, যার কারণে নিজের বউকে ভুলে গেলো ? ইয়াশ কেবলই রৌদ্রের থেকে রিভেঞ্জ নিতে চেয়েছিলো ‌। তাই তোমাদের মেয়েকে খুটি করেছে । আর তোমাদের মেয়ে, সে নিজ হাতে নিজের জীবনটা নষ্ট করেছে । ও অনেক ভালো একটা লাইফ পেতে পারতো সায়ানের সাথে । কিন্তু না, ও বোঝেনি । তোমরা সায়ান কে চেনো সবাই । খুব ভালো করেই জানো ও টুকটুকিকে কতটা ভালোবাসে, তার প্রমাণ ও পেয়েছো । সায়ান কে আর কষ্ট পেতে দেখতে পারবো না আমি । এবারে টুকটুকির সাথে সায়ানের বিয়ে হবে । এটাই ফাইনাল ।

আদ্র বলে ওঠে কথার মাঝে.....

" ভাইয়া,,, বাড়াবাড়ি করবে না । ইয়াশ আর টুকটুকি লিগ্যালি হাসবেন্ড ওয়াইফ । ওদের ডিভোর্স করানোতে তুমি অ্যাকশন নিতে পারো না । ইয়াশ ফিরবে ।

" কবে ফিরবে ? আড়াই মাস পেরিয়ে গেছে, আর কবে ? যদি ফেরারই থাকতো , তাহলে এতো দিন একটা বারের জন্য হলেও টুকটুকির খোঁজ নিতো । ওভাবে হুট করে পাসপোর্ট হাতে ধরিয়ে দিয়ে পালাতে পারতো না । ঝামেলা মুক্ত হয়ে গেছে ও । টুকটুকির আর প্রয়োজন নেই ওর । যদি প্রয়োজন থাকতো, তাহলে মেয়েটাকে এভাবে হেলাফেলা করতে পারতো না ।

আর তোর কি হয়েছে বলতো ! ইয়াশের হয়ে সাফাই গাইছিস কেনো এতো ? কতটুকু চিনিস ওকে ?

" আমি ওকে যতটুকু চিনেছি, তাতে খুব ভালো করেই বুঝতে পারছি,, ইয়াশ শাফাহ্ কে কষ্টে রাখেনি এতদিন । কষ্টে রাখলে শাফাহ্ ওর অপেক্ষা করতো না । ইয়াশ যথেষ্ট ম্যাচিউর ‌। অন্তত টুকটুকির মতো ইম-ম্যাচিউর মেয়েকে সামলানোর জন্য পারফেক্ট ।

" ওর থেকেও বেশি পারফেক্ট সায়ান । আমাকে রাগাস না আদ্র । আমি যা বলেছি তাই হবে । আর কারোর কথা শুনতে চাই না আমি । ওদের দুজনের ডিভোর্স.....

শুভ্র পুরো কথা শেষ করতে পারলো না । তার আগেই ওর কাঁধে হাত চেপে থামিয়ে দিলো মেহের । শাফাহ্ নামছে সিঁড়ি বেয়ে । হয়তো শোনেনি কিছু ।

মেয়েটা টলতে টলতে এসে বসলো চেয়ার টেনে । প্লেট উল্টিয়ে নিজ হাতে খাবার বেড়ে নিলো । কারোর দিকে চোখ তুলেও তাকালো না ।

উপস্থিত সবাই সরু চোখে পরখ করলেন তাদের বোকাসোকা শাফাহ্ কে । মেয়েটা বদলে গেছে । যে মেয়ে এক গ্লাস পানি গড়িয়ে খায়নি কখনো, সে এখন নির্দ্বিধায় খাবার বেড়ে খায় রোজ । তেমন একটা কথা বলে না কারোর সাথে । চুপচাপ থাকে সবসময় ।

চোখে চোখ রাখে না কারোর ।

তৌসিফ কাবির মেয়েকে দেখে দীর্ঘ শ্বাস ফেললেন । সবার সামনেই শুধালেন.....

" শাফাহ্,, ইয়াশের সাথে কথা হয়েছে তোমার ?

মেয়েটা সবে এক লোকমা মুখে তুলতে যাচ্ছিলো । থমকালো তাৎক্ষণিক । খাবার টুকু মুখে উঠলো না আর । সে নরম দৃষ্টিতে বাবার দিকে তাকালো ।

উত্তরে না বোধক মাথা নাড়ালো দুদিকে । চোখ নামিয়ে নিলো পরক্ষণে ।

তৌসিফ কাবিরের পরের প্রশ্ন.....

" সে কি আসবে না আর ?

উত্তরে দ্বিধাগ্রস্ত রমনী । চিবুক আরো বেশি নত করলো সে । উত্তর আসতে দেরি হওয়ায় রগরগে গলায় ঝাড়ি মারে শুভ্র....

" চুপ করে আছিস কেনো ! বল....

চমকে ওঠে শাফাহ্ । কেঁপে সিটিয়ে বসে । জবাব দেয় মুখ ফসকে....

" জানি না ।

ব্যস,,, এটুকুই যথেষ্ট । আর খাওয়া হলো না । কালকের জন্য ফেলে রাখা কাজটা আজকেই সম্পাদন করতে লেগে পড়লো শুভ্র । হাত ধুয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো । খপ করে চেপে ধরলো বোনের হাতের চিকন কব্জি । এক টানে তুলে দাঁড় করালো মেয়েটাকে । হিড়হিড়িয়ে টেনে নিতে নিতে বললো......

" চল আমার সাথে ।

উঠে দাঁড়ালেন বাকি সবাই । শাহিনা কাবির আঁতকে প্রশ্ন ছোড়েন.....

" শুভ্র,, ওকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছিস তুই ?

ডাকে বাকিরাও । শুভ্র শোনে না ।

হেঁচকা টানে ব্যাথা পায় শাফাহ্ । কেঁপে কেঁপে বলে ব্যাথাতুর কন্ঠে.....

" ভাইয়া,,, লাগছে আমার !

আকস্মিক থামলো যুবক । ঢোক গিলে হাতের বাঁধন আলগা করলো কিছুটা । তবুও ছাড়লো না । আলগোছে টেনে নিয়ে গেলো নিজের ঘরে । মাঝ বরাবর দাঁড় করিয়ে কাবাড থেকে কিছু কাগজপত্র বের করলো ।

ইতোমধ্যে ঘরে উপস্থিত সবাই । একে একে প্রশ্ন করছেন । শুভ্র কারোর তোয়াক্কা করলো না । শাফাহ্ কে টেনে বসালো সোফায় । হাতে কলম ধরিয়ে দিয়ে সামনে কাগজ রাখলো । বললো তপ্ত তিরিক্ষি স্বরে.....

" সাইন কর এই কাগজে !

শাফাহ্ বুঝতে পারে না । আদ্র চাপা স্বরে শুভ্রর উদ্দেশ্যে বলে.....

" ভাইয়া,,, প্লিজ ডোন্ট ডু দিস ।

" সাইন কর টুকটুকি ।

" কেনো ভাইয়া ! কিসের কাগজ এগুলো ?

মেয়েটার মৃদু কোমল স্বর । শুভ্রর ভনিতা হীন উত্তর.....

" ডিভোর্সের কাগজ ।

রমনীর শক্তি হীন শরীর দুলে ওঠে এহেন কথায় । জবান খসে বেরিয়ে আসে অস্ফুটে......

" হ্যাঁ ?

" হ্যাঁ । ডিভোর্সের পেপার রেডি । চুপচাপ সাইন কর ।

" ভাইয়া ! কি বলছো এসব ? কিসের ডিভোর্স পেপার ? সাইন করবো কেনো আমি ?

" ইয়াশের থেকে মুক্তির জন্য ডিভোর্স পেপারে সাইন করবি তুই । এক্ষুনি সাইন করবি । আজ সাইন করবি, আর আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে সায়ানের সাথে এনগেজমেন্ট হবে তোর । আর পরের পাঁচ মাসের মধ্যে বিয়ে ।

কেঁপে ওঠে রমনী । ভরা চোখ হতে টুপ করে পানি ঝড়ে । হঠাৎ এ কি বলছে শুভ্র ? কিসের ডিভোর্স ? আর কিসেরই বা এনগেজমেন্ট ?

#চলবে.........

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৮৭তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন