ফন্ট সাইজ:
থিম:
আসবো ফিরে আবারো

৮৯তম পর্ব

লেখক: সুরভী আক্তার

#আসবো_ফিরে_আবারো

#পর্ব_৮৮

#সুরভী_আক্তার

( অনুমতি ব্যতীত কপি করা নিষেধ ❌ )

এক রাশ বিরক্তি নিয়ে দরজার দিকে এগোলো মেহের । চোখে মুখে রাগ ফুটিয়ে খট করে দরজা খুললো । কপাট আলগা হওয়া মাত্রই হুমড়ি খেয়ে ভেতরে ঢোকে কেউ । আঁতকে ওঠে মেহের । চেহারা দেখে ভড়কে যায় আরো বেশি ।

সেই জনা তড়তড়িয়ে ভেতরে ঢুকেই থামলো না । গোটা লিভিংয়ে উদ্বিগ্ন নজর বুলিয়ে ত্রম্ভ কদমে ছুটলো সিঁড়ি ডিঙিয়ে ‌। রুবিনা কাবির, শাহিনা কাবির করিডোরে বেরিয়েছিলেন, তারাও দেখলেন ।

চাপানো দরজা বিকট শব্দে ঠাস করে খুলে যেতেই চমকে ওঠে শাফাহ্ , সাথে সায়ান । ওরা দু'জনেই দাঁড়িয়ে যায় সহসা । তড়াক দৃষ্টি ছিটকে পড়ে দরজার দিকে ‌।

অমনি আঁতকে ওঠে চঞ্চলার কোমল হৃদয় । কাঁপে কোমলাঙ্গ । বৃহৎ হয় দৃষ্টি জোড়া । দুহাত মুঠিয়ে খুবলে ধরে পড়নের জামার একাংশ । সায়ানের দৃষ্টি কুঁচকানো ।

সামনে স্বয়ং ইয়াশ । মুখশ্রী বিভৎস নিরেট । এলোমেলো তার অবস্থা । ঠিক নেই চেহারার হাল । দেখতে অগোছালো উদ্ভট সে ।

তপ্ত যুবকের কঠিন দৃষ্টিতে ছেদ ঘটেছে শাফাহ্'র পাশে সায়ান কে দেখে । চাপানো দরজা আর চার দেয়ালের মাঝে এরা একসাথে কেনো ? সে একদৃষ্টে শাফাহ্ কে দেখে ।

বিভ্রান্তি ছুড়ে ফেলে মাড়ি খিচে তেড়ে যায় ! ছ্যাত করে ওঠে চঞ্চলা । পলক ফেলে পেছাতে গিয়ে ঠাস করে পড়ে যায় সোফায় । ইয়াশ ঝড়ের বেগে ছুটে গিয়ে হামলে পড়লো ওর উপর । সোফায় হাঁটু গেড়ে ঝুঁকে মেয়েটার নরম চোয়াল শক্ত করে চেপে ধরলো ডান হাতে । হিসহিসিয়ে উঠলো প্রচন্ড ক্রোধে.....

" ইউ স্টুপিড গার্ল,, ফোন কোথায় তোর, হ্যাঁ ? হাজার বার ফোন করেছি কাল থেকে, ধরিস নি কেনো বল ? পাগল পেয়েছিস আমায়, মাথা খারাপ করে দিয়েছিস পুরো ! কি পাঠিয়েছিস আমায় ? কি ওটা ? ফোন কোথায় তোর ?

সায়ান হতভম্ব হয়ে চেয়ে রয় । ব্যাথা গিলে ঝেড়ে ওঠে শাফাহ্....

" ছাড়ুন আমায়,,, দূরে যান । ছোবেন না খবরদার ‌। ফেলে দিয়েছি আমি আপনার কিনে দেওয়া ফোন !

তড়তড়ে মেজাজ আরো বেশি বিগড়ে যায় তপ্ত যুবকের । ক্রোধে রিতিমত কাঁপছে । চোখ রক্তিম । ঘেমেছে খানিক । কপালের শিরা উপশিরা ফুলে দৃশ্যমান ।

এবারে মেয়েটার কনুই চেপে হেঁচকা টানে তুলে দাঁড় করালো । কিছু বুঝে ওঠার আগেই ক্ষোভ ঝেড়ে সপাটে এক থাপ্পর বসালো গালে ।

শাফাহ্ টাল সামলাতে না পেরে ছিটকে পড়লো সোফার উপর । দরজার দাঁড়িয়ে তাৎক্ষণিক মুখে হাত চেপে ধরলেন শাহিনা কাবির । ঘরে নিমিষেই বাড়ির সবাই উপস্থিত হয়েছেন । শুভ্র আরো সেকেন্ড কয়েক বাদ আসলো ।

শাফাহ্ তাজ্জব । গালে হাত চেপে ধরে ছলছল চোখে ইয়াশের দিকে ফিরলো মেয়েটা ‌।

ইয়াশ আবার টেনে দাঁড় করায় ওকে । কনুই চেপে ধরতেই পাশ হতে সায়ান শাফাহ্কে নিজের দিকে টেনে নিয়ে গর্জে ওঠে ইয়াশের উপর.....

" হাউ ডেয়ার ইউ টু স্ল্যাপ হার ?

ইয়াশ ভ্রু গুটায় । তাকায় শাফাহ্'র হাতের দিকে । সায়ান ধরে আছে ওকে ‌ । দাঁত খিচে পাল্টা গর্জায় যুবক....

" হাউ ডেয়ার ইউ টু টাচ্ হার ? সি ইজ মাই ওয়াইফ ।

ধ্যান ফেরে সায়ানের । তড়াক করে হাতখানা আলগা করে । এবারে তেড়ে আসে শুভ্র । শাফাহ্ কে পেছনে ঠেলে ইয়াশের মুখোমুখি দাঁড়ায় দাম্ভিকতায় । দৃঢ় জবানে বুলি ফুটায়......

" গলা নামিয়ে কথা বলো ইয়াশ । ওয়াইফ আর থাকবে না ও তোমার । এসেছো ভালো হয়েছে । ঝামেলা কমেছে আমাদের । জানিয়ে রাখছি তোমায়,, তোমাদের সম্পর্কটা আর এগোবে না । আমার বোনকে বাড়ি থেকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে গিয়ে বিয়ে করেছো তুমি ‌‌। নিজের কাছে ধরে বেঁধে আটকে রেখেছিলে বহুদিন । এখন আমাদের বাড়ির মেয়ে বাড়িতে ফিরে এসেছে । তোমার জবরদস্তি চলবে না আর ‌। বিয়ে যেহেতু করেই ফেলেছো, তাই এখন চুপচাপ সেই বিয়ের বাঁধন থেকে আমার বোনকে মুক্ত করবে তুমি ।

" হোয়াট !

" ইয়াহ্,, ডিভোর্স দেবে তুমি আমার বোনকে । পেপারস রেডি, দু একদিনের মধ্যে পাঠিয়েও দিতাম তোমার কাছে । ভালো হয়েছে নিজে থেকে এসেছো । এক পাক্ষিক সাক্ষর হয়ে গেছে । এবার তুমিও সাইন করে দিও । অতঃপর চলে যেও আমার বোনের জীবন থেকে ।

খিচে রাখা চোয়াল ভেঙে আসে তপ্ত যুবকের । পরিষ্কার বোঝে না কিছুই । চোখ কুঁচকে আওড়ায়.....

" সাক্ষর হয়ে গেছে মানে ? কি বলছেন এসব ?

" যা শুনছো তাই । আমার বোন ডিভোর্স দেবে তোমাকে । ও সাইন করে দিয়েছে । ওয়েট, পেপার্স দেখাচ্ছি ।

হনহনিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে আসলো শুভ্র ।

শাফাহ্ তখনো নতজানু হয়ে গাল চেপে ধরে দাঁড়িয়ে আছে । সায়ান বললো নরম গলায়....

" শাফাহ্,, বস তুই ।

ইয়াশের ধ্যান ফেরে । সায়ান আর শাফাহ্ কে দেখে নেয় । মনে পড়ে, খানিক আগে এরা দুজন এক ঘরে ছিলো , কি করছিলো ? আবারো চোয়াল খিচে নেয় সে । একটানে নমনীয় মেয়েটাকে কাছে আনে....

" এই ছেলেটার সাথে এক ঘরে কি করছিলে তুমি ? হ্যাঁ ? কি দরকার ওর সাথে ? পরপর উত্তর দাও ! কি পাঠিয়েছো কাল আমায় ? তোমার ভাইয়া এসব কি বলছে ? কিসের ডিভোর্স ?

আদ্র ছিলো না বাড়িতে । ফিরেই ঘরের সামনে শোরগোল দেখে তড়িঘড়ি করে এসেছে । শাফাহ্ কে থাপ্পর মারতে দেখেনি সে ‌। কানে পড়েছে শুভ্রর শেষ কথা গুলো । এখন সে সাফাই গাইলো মাঝে.....

" ইয়াশ,,, কাম ডাউন । শান্ত হও আগে । এসবে কান দিও না । আমরা বসে কথা বলবো ‌। তুমি স্থির থাকো একটু ।

আদ্রের সব কথা শেষ হওয়ার আগেই শুভ্রর আগমন । হাতে কতকগুলো কাগজ নিয়ে এসে ইয়াশের হাতে ধরিয়ে দিলো সে ।

হতবাক যুবক শাফাহ্'র হাত চেপে ধরেই কাগজগুলো উল্টে পাল্টে দেখে ।

Divorce লেখাটা দেখা মাত্রই ছলকে ওঠে অন্তরাত্মা । তার নিচে শাফাহ্'র সাক্ষর জ্বলজ্বল করছে ।

এক মুহুর্তে দম হারালেও পরক্ষণে হিতাহিত জ্ঞান হারালো যুবক । চতুর্থ বার শাফাহ্'র কনুইয়ে হেঁচকা টান মেরে সন্নিকটে এনে ফেললো । বাড়ি কাঁপিয়ে চেঁচিয়ে উঠলো....

" এইইই,,,,, কি হচ্ছে এসব ? কিসের ডিভোর্স পেপার এটা ? তোর সাইন কেনো এখানে ? কোন সাহসে ডিভোর্স পেপারে সাইন করেছিস তুই ?

তাকায় রমনী । কেউ কিছু বলার আগেই সাহস দেখায়...

" আপনার থেকে মুক্তি চাই আমার । তাই সাইন করেছি ডিভোর্স পেপারে । আপনিও সাইন করে দিন । গত আড়াই মাস ধরে যে কাহিনী করে আসছেন,, এখানেই শেষ হোক সেই কাহিনী ।

মেয়েটার ধরা কথা শেষ হলো কি হলো না । দ্বিতীয় বার সপাটে আরো একটা থাপ্পর আছড়ে পড়লো তার গালে । এবারে শক্ত মেঝেতে উপুড় হয়ে পড়লো চঞ্চলা তনু খানি । ফিকড়ে উঠলো ব্যাথায় । চমকান সকলে ‌। সায়ান আঁতকে উঠে এক কদম বাড়ালেও দ্বিতীয় কদম আর বাড়াতে পারলো না । রাগে চোয়াল খিচে হাত মুঠিয়ে নিলো । ইয়াশ আর শাফাহ্'র মাঝে তার যাওয়ার অধিকার নেই । সে বাইরের লোক । কিন্তু শাফাহ্'র গালে পড়া পরপর থাপ্পর গুলো মোটেও সহ্য করতে পারলো না যুবক । ক্রোধে লাল হয়ে কাঁপলো শরীর । বহুকষ্টে সংযত রাখলো নিজেকে ।

আদ্র আর শুভ্র থামলো না । আদ্র শাফাহ্ কে ধরলেও শুভ্র তেড়ে গেলো ইয়াশের দিকে....

" তোমার সাহস কি করে হয় আমার বোনের গায়ে হাত তোলার ?

" খবরদার আমাদের মাঝে আসবেন না । ও আপনার বোন হতে পারে,, কিন্তু এখনো ও আমার স্ত্রী । বিয়ে করেছি আমি ওকে । ওর সাহস কি করে হয় আমাদের সম্পর্কে ছেদ ঘটানোর !

থেমে বলে চঞ্চলার উদ্দেশ্যে.....

" এইইইই,, জানে মেরে ফেলবো একদম । মুক্তি চাস আমার থেকে, তুই চাইলেই মুক্তি দেবো তোকে ? মুক্তি দেওয়ার জন্য বিয়ে করেছি আমি ? স্টুপিড গার্ল । এতো বড় সাহস, আমাকে না জানিয়ে ডিভোর্স পেপারে সাইন করিস তুই ! ভয় দেখাস আমায় ? কি ভেবেছিস ভয় পাই আমি তোকে ? ছাড়বো আমি তোকে ? তুই সাইন করলেই হয়ে গেলো ? মুক্ত হয়ে গেলি আমার থেকে ? এতো সহজ ? এই পেপারে সাইন করেছিস তাইতো ? থাকবে না এই পেপার.....

হাঁসফাঁস করে শাফাহ্'র দিকে কথাগুলো ছুড়ে একটানে হাতের পেপার গুলো ছিড়ে টুকরো করলো তপ্ত যুবক । উড়িয়ে দিলো হাওয়ায় । শুভ্রকে টপকে হাঁটু মুড়িয়ে শাফাহ্'র সামনে বসলো সে । মেয়েটার সরু দুই বাহু শক্ত করে চেপে ধরলো । চোখ রাঙিয়ে চাপা ক্রোধে বললো...

" দেখ, ছিড়ে ফেলেছি তোর ডিভোর্স পেপার । এবার দে আমায় ডিভোর্স ।

ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায় । শুভ্র হাত সংযত রেখে তিক্ত স্বরে বলে....

" দেবে ও তোমায় ডিভোর্স ! একটা পেপার ছিঁড়েছো তো কি হয়েছে ? কটা ছিড়বে ? আইন আছে দেশে । ও থাকতে চায়না তোমার সাথে । তুমি জোর করে আটকাতে পারবে না । সরে এসো আমার বোনের কাছ থেকে....!

তৌসিফ কাবির এতক্ষণ নীরব থাকলেও এবারে ক্ষুব্ধতা সমেত মুখ খুললেন.....

" শুভ্র, থামো তুমি । অনেক হয়েছে ।

ইয়াশ, ওঠো । স্থির হও । তুমিও বাড়াবাড়ি করে ফেলেছো অনেক । আমার মেয়েকে আমাদের সামনে মেরেছো তুমি । এটা দেখার পর তোমার প্রতিবিম্ব টা আমাদের কাছে কতটা নিচে নামলো ভেবে দেখেছো ?

" আ'ম স্যরি আঙ্কেল । বাট এখন আমাদের মাঝে আসবেন না প্লিজ । যেভাবেই হোক না কেনো, আমি বিয়ে করেছি ওকে । স্ত্রী ও আমার । আমি এখন শুধু টুকটুকির সাথে কথা বলবো ।

এইইইই ,, তাকাও আমার দিকে ।

মেয়েটার মুখ আজলে ধরে উঁচু করে যুবক । ভেজা দৃষ্টি নত রমনীর । চোখ বেয়ে বিরতিহীন বারিধারা নেমেছে । শব্দহীন তার যন্ত্রণা ।

ইয়াশ ওর ফর্সা গালে নজর রাখে । লাল হয়ে আঙ্গুলের দাগ ফুটেছে । যুবকের ভেতর কাঁপলো তা দেখে । ঝাপসা চোখ অস্পষ্ট হলো আরো বেশি । ঠান্ডা হয়ে ধরে আসলো জবান.....

" টুকটুকি,,, তাকাও বলছি ।

ডিভোর্স পেপারে সাইন করেছো কেনো তুমি ? আমাকে ডিভোর্স দিতে চাও ? হ্যাঁ, বলো !

মেয়েটা তাকালো এক পলকের জন্য । যুবক থামতেই নিস্তব্ধ হলো গোটা ঘর । শাফাহ্ তাকিয়ে দৃষ্টি সরিয়ে নেয় ।

ইয়াশ ওকে টেনে তুলে সোফায় বসায় । নিজে হাঁটু গেড়ে মেয়েটার মুখোমুখি বসে । পরোয়া করে না কারোর উপস্থিতি । দুহাত আঁকড়ে ধরে বলতে শুরু করে.....

" ডিভোর্স দেবে আমায় ? আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলো । বিচ্ছেদ চাও আমার থেকে ? বিচ্ছেদের পর আমার কি হবে, ভাববে না ? আমি যে নিঃস্ব এখন । আর কেউ নেই আমার । ছোট বেলায় মা বাবাকে হারিয়েছি । বোনকে সামলে একা একা বড় হয়েছি । দুজন বন্ধু ছিলো জীবনে, তাদের কেও হারিয়েছি একসময় । একটা বোন ছিলো, আমার রক্ত, আমার একমাত্র আপনজন , সেও নেই এখন । আমি খুঁজে পাইনি ওকে । এতো দিন তন্ন তন্ন করে খুঁজেছি, তবুও পাইনি । আমার মেঘা হারিয়ে গেছে টুকটুকি । আমার আর কেউ নেই । শুধু তুমি আছো ! তুমিও আমাকে ছেড়ে দেবে ? কেনো ? এতো দিন খোঁজ নেই নি , তাই ? অভিমান হয়েছে ? আচ্ছা স্যরি । ভুল হয়ে গেছে । বিশ্বাস করো, আমিও ভালো ছিলাম না । তোমাকে জড়িয়ে নিজেকে দূর্বল করতে চাইনি আরো । তাই কথা বলিনি । তোমার প্রত্যেকটা ফোনকল দেখেছি আমি । ইচ্ছে করে রিসিভ করিনি । তার জন্য স্যরি টুকটুকি, আ'ম রিয়েলি স্যরি । এই কদিনে দূরত্বে আমিও বুঝে গেছি, আই কান্ট ব্রিদ উইদাউট ইউ । তোমাকে প্রয়োজন আমার । প্লিজ সব ভুলে ফিরে চলো । আমার জীবনে কি কষ্ট কম আছে নাকি, যে তোমাকে হারিয়ে আবার একটা কষ্ট পাবো ? পারবো না আর সইতে । মরে যাবো তো তোমাকে হারালে । তুমি ছাড়া আর কেউ নেই আমার । নিজেকে বাঁচানোর জন্য হলেও তোমাকে প্রয়োজন, প্লিজ ফিরে চলো জানননন....

লোকটা কাঁদছে । তাজ্জব বনে দেখছেন সকলে ।

কেবলই সায়ান হতবুদ্ধ । দৃষ্টি ভেজা তারও । তবে ইয়াশের জন্য নয় । নিজের ভাগ্যের পরিহাসের জন্য ।

শাফাহ্ তাকাচ্ছে না তবুও । নিঃশব্দে পানি ঝরাচ্ছে চোখ থেকে । চিবুক গলায় মেশানো ।

ইয়াশ ঢোক গেলে । নিজের চোখ মুছে মেয়েটার মুখ আগলে ধরে আবার । এবারে সে কিছু বলার আগেই শুভ্র বললো থেমে থেমে....

" ও আর যাবে না ইয়াশ । ডিসিশন ফাইনাল,, ও ডিভোর্স দেবে তোমায় !

" না,,, ও যাবে আমার সাথে । ডিভোর্স দেবে না আমাকে । টুকটুকি, বলো তুমি,,,, তুমি যাবে আমার সাথে তাই তো ? বলো সবাইকে ।

আচ্ছা শোনো,, আজ থেকে আমি একলা সব রান্না করবো প্রমিস ! তুমি যা বলবে তাই শুনবো । ঘরভর্তি শপিং করিয়ে দেবো । ঐ হসপিটালের জবটাও ছেড়ে দেবো । তবুও ফিরে চলো । আমার আর কেউ নেই তুমি ছাড়া, তোমাকে লাগবে আমার । তোমার সংস্পর্শ ছাড়া থাকতে পারবো না আমি । এইইই তাকাচ্ছো না কেনো আমার দিকে ? তাকিয়ে দেখো,, আমার যন্ত্রণা লাগছে । কষ্ট হচ্ছে জানননন ।

আচ্ছা, মেরেছি বলে রেগে আছো ? তাই তাকাচ্ছো না আমার দিকে ? লেগেছে খুব ? আ'ম স্যরি । আর কক্ষনো মারবো না । ভুলেও রেগে যাবো না । এই দেখো কান ধরে ওঠবস করছি সবার সামনে । আর কোনদিন আঘাত করবো না তোমায় ।

কথা শেষ করে সত্যি সত্যিই লোকটা সবার সামনে বাচ্চাদের মতো কান ধরে ওঠবস করতে শুরু করলো ।

আড়চোখে তা দেখে এবারে পূর্ণ দৃষ্টিপাত করলো মেয়েটা । অপ্রস্তুত হলো কিছুটা ।

ভরা চোখ সমেত শিশির আর আদ্র মৃদু হাসে । ছেলেটার এমন পাগলামো দেখে ওপাশে বোধহয় তৌসিফ কাবির ও হাসলেন এক পশলা । ইয়াশ কে খুব কাছ থেকে চেনা হয়নি । এরকম অবস্থায় দেখা তো অভাবনীয় সবার কাছে । শক্তপোক্ত, কঠিন স্বভাবের ছেলেটা কেমন করে কাঁদছে অগোছালো ভঙ্গিতে । এলোমেলো সে । শুভ্র নিজেও স্তব্ধ হলো । চেয়ে রইলো নিগুড় লোচনে ।

বেশ কবার কান ধরে ওঠবস করে থামে যুবক ।

ফের হুড়মুড়িয়ে বসে রমনীর সামনে । মেয়েটার খোলা চুল গুলো দুই কানের পাশে গুছিয়ে দিয়ে দুগালের লালচে দাগের উপর টুপটাপ চুমু আঁকে সবার সামনেই । শব্দযুক্ত দুটো পরশ বুলিয়ে সরে আসে ।

শাফাহ্ চোখ বুজে নেয় লজ্জা আর সুপ্ত অনুভূতিতে ।

বাকিরা থতমত খান । দৃষ্টি নত করেন তড়িতে । এদিকে এমন দৃশ্যে সায়ানের সর্বাঙ্গ কেঁপে ওঠে । ভারী হয়ে ধড়ফড়িয়ে ওঠে বক্ষস্থল । যেনো কেউ হাতুড়ি পেটাচ্ছে হৃদযন্ত্রে । সেই হাতুড়ির আঘাতে দ্বিখণ্ডিত হলো তার হৃৎপিণ্ড । ভীষণ যন্ত্রণায় মুচড়ে উঠলো ভেতরটা । সে সহসা চোখ নামিয়ে বুক চেপে ধরে । বোধহয় শ্বাস বন্ধ হয়ে গেছে গলায় ।

ছেলেটা আর পারলো না এসব দেখতে । এক মুহুর্ত বিলম্ব না করে নড়বড়ে কদম বাড়ালো কোনো রকমে । টলে টলে দরজার দিকে এগোতেই পেছনে ছ্যাঁত করে ওঠে শুভ্র । ডাকে অস্ফুটে....

" সায়ান ।

আবেশিত সংবেদনে চোখ বুজে নেওয়া চঞ্চলা তড়িতে চোখ মেলে চায় । ছুটে যায় শুভ্র । সায়ান তখন দরজার কাছে । তৌসিফ কাবির আটকেছেন ওকে । যুবক কারোর বাঁধা মানলো না । শুভ্র টেনে ধরতেই পিছু ফিরলো আরেকবার । ঝাপসা চোখে চোখাচোখি হলো রমনীর সাথে । অমনি স্বভাবের বশে হাসলো যুবক ‌। মেয়েটার চোখ দুটোও জবজবে । তবে এই কান্নার মাঝে কোথায় একটা খুশি লুকিয়ে আছে বোধহয় । সব কান্না কষ্টের হয় , এটা কে বলে ? আবার সব হাসি সুখের হয়, এটাই বা কে বলে ? শাফাহ্ কাঁদছে হয়তো সুখে । আবার বিপরীতে চোখে পানি নিয়ে সায়ান হাসছে হয়তো ভীষণ দুঃখে । সে শেষবারের মতো চোখ ভরে শাফাহ্ কে দেখে নেয় । এরপর হয়তো ইয়াশ নিয়ে যাবে ওকে ‌। আর দেখা হবে না । ওষ্ঠপূটে দুঃখের হাসি ঝুলিয়েই মনে মনে বিড়বিড় করে ছেলেটা,,,

" ইশশ্ কিউটিপাই,,, বি হ্যাপি, ইউ টু পাখি ।

তুই এখন অন্য কারোর । কান্নার মাঝে হাসছিস তার পাশে বসে ! এতো করে চেয়েও কেনো পেলাম না তোকে ? আমি কি পারতাম না তোকে হাসাতে ? বিশ্বাস কর, তুই যদি আমার হতি তাহলে আমার আর কিচ্ছু লাগতো না । এখনও আর কিচ্ছু লাগবে না । সুখি হ জান ।

মনের কথা মনেই চেপে চোখ ফিরিয়ে এলোমেলো কদমে বেরিয়ে গেলো যুবক । তড়িতে পিছু ছুটলো শুভ্র ।

শাফাহ্ হকচকিয়ে যায় । এলোমেলো হয়ে যায় মস্তিষ্ক । মেয়েটা আকস্মিকই উঠে দাঁড়ায় । তাদের পিছু নিয়ে হন্নে হয়ে ছুটতে চায় বাইরের দিকে । অমনি খপ করে ওর হাত চেপে ধরে ইয়াশ । বলে....

" শেষ বার স্যরি বলছি,,,

আর বলবো না কিন্তু । যদি এরপরও জেদ ধরে বসে থাকো, তাহলে পানি ভর্তি পুলে ফেলে দেবো সেদিনের মতো । মনে রেখো, সাঁতার জানো না তুমি,, আমিও আর বাঁচাবো না বলে রাখলাম ।

বাঁধা পেয়ে শাফাহ্ হাঁটু ভেঙ্গে পড়লো মেঝেতে । ওষ্ঠ কামড়ে ফিকড়ে উঠলো । ফুঁপিয়ে উঠলো শব্দ করে ।

ঝটকা মেরে ছাড়িয়ে নিলো নিজেকে । দুহাতে ঢেকে নিলো মুখখানি । গলা চড়িয়ে বুলি ফুটালো....

" যাবো না আমি আপনার সাথে । কেনো ফিরে আসলেন আপনি আবার । বারবার কেনো ভেঙ্গে দেন সব ? চলে যান আপনি । আমি ফিরবো না আপনার সাথে ।

ওদের মাঝে থাকাটা ঠিক হবে না । একে একে ঘর ফাঁকা করে সবাই প্রস্থান করলেন । আদ্র বেরোনোর আগে চাপিয়ে দিলো দরজাটা ।

সবাই চলে যেতেই ইয়াশ শাফাহ্কে টেনে নিকটে আনলো । বসালো নিজের উরুর উপর । জড়িয়ে নিয়ে বললো ভেজা গলায়.....

" বারবার স্যরি বলছি ! আর কি করবো ? বললাম তো,, ভুলেও আর কখনো মারবো না । আর একলা ছাড়বো না এভাবে ! ভুল হয়ে গেছে বড্ড ।

শাফাহ্ আবারো ফুঁপিয়ে ওঠে । ভেজা চোখের পাতায় সায়ানের মুখখানা ভেসে উঠতেই দুমড়েমুচড়ে যায় ভেতরটা । হু হু কেঁদে ওঠে রমনী । তিক্ত ক্ষোভে তাৎক্ষণিক সর্বশক্তি দিয়ে কামড় বসায় তপ্ত যুবকের কাঁধের নিকট । রমনীর আকস্মিক এমন কান্ডে কিঞ্চিত ব্যাথায় অগত্যা চোখ খিচে নেয় ইয়াশ । দাঁতের আঘাত দৃঢ় হতেই আরো শক্ত করে জড়িয়ে নেয় মেয়েটাকে । বাঁধা দেয়না তবুও । শাফাহ্ সরে আসে নিজে থেকেই । ছোড়াছুড়ি করে এলোপাথাড়ি মারতে শুরু করে ইয়াশের প্রকান্ড বুকে ।

" আপনি খুব খারাপ, রাক্ষস একটা । কেনো ফিরে আসলেন আবার । চলে যান,,, আমি আর চাই না আপনাকে ‌। আপনার জন্য আবার সব এলোমেলো হয়ে গেছে । কষ্ট পেয়েছে ও । চলে যান আপনি ।

" বোকা হরিণী,,, এখন চলে যেতে বলছো কেনো ? ফিরিয়ে এনেছো তো নিজেই । আমাকে ঘায়েল করার ভালোই পথ বেছেছো । তুমি খুব ভালো করেই জানতে,,, ডিভোর্স পেপারের ছবি পাঠালে আমি আর ঠিক থাকতে পারবো না । তাই ছবি পাঠিয়েছো, তাই না ? শেয়ানা হয়েছো খুব ? নাটক সাজিয়েছো ?

" মোটেও না । আমি সত্যি সত্যিই ডিভোর্স দিয়েছি আপনাকে ।

" আমি তো দেইনি । তুমি দিলেই হলো ?

" হ্যাঁ, হলো । আমি সাইন করে দিয়েছি । ছাড়ুন আমায় । আমার উপর আর কোনো অধিকার নেই আপনার । আমার তরফ থেকে ডিভোর্স হয়ে গেছে ।

ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসে যুবক । মেয়েটার চোয়াল আলগোছে দাবিয়ে ধরে কাছে টেনে আনে । ভেজা ভেজা অধরে ছোট্ট চুমু খেয়ে বলে হিসহিসিয়ে.....

" আমার অধিকার আমাকে শেখাতে এসো না স্টুপিড । ছিড়ে ফেলেছি তোমার ঐ ডিভোর্স পেপার ।

কথা টুকু বলেই আবারো ঝুকলো দ্বিতীয় বার চুম্বনের আকাঙ্ক্ষায় । ঠোঁটে ঠোঁট ছোঁয়ানোর পূর্বেই পিছিয়ে গেলো রমনী । শুধিয়ে বসলো.....

" ভালোবাসেন আমায় ?

যুবক থমকায় । কপালে পড়ে ভাঁজের স্তর । নিরুত্তর রয় সে । মেয়েটা নাক টেনে আবার শুধোয়....

" কি হলো বলুন, ভালোবাসেন ?

" শুনতে হবে না ।

" শুনবো আমি । আমি শুনতে চাই আপনার মুখে । শুধু একটাবার বলুন, আপনি আমায় ভালোবাসেন !

নাছোড়বান্দা যুবক দেখলো না রমনীর আকাঙ্ক্ষা । ভেজা চোখ দুটো থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে মেয়েটার গলার নিকট নাক ঘষলো । বললো হাস্কি টোনে...

" উঁহু,, বাসিনা । আই হেইট ইউ,, আই হেইট ইউ জানননননন । মাই জানননন । মাই টকেটিভ লেডি,, আই হেইট ইউ । ডিপলি হেইট ইউ জানননন !

,,,

হনহনিয়ে সদর মাড়িয়ে গেইট পেরোনোর আগেই সায়ানের হাত টেনে ধরে শুভ্র । ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ে....

" সায়ান,,, কোথায় যাচ্ছিস তুই ?

ভেতরকার যন্ত্রণাদায়ক উচাটন চেপে পিছু ফিরলো সায়ান । ঠোঁট ঠেলে চমৎকার হাসলো । ফুরফুরে স্বরে বললো....

" বাড়ি যাচ্ছি । অনেকক্ষণ হলো এসেছি । দেরি হয়ে যাচ্ছে । দশটা পেরিয়েছে বোধহয় ।

শুভ্রর নয়ন কাঁপে । কাঁপে জবান......

" কোথাও যাবি না তুই । ভেতরে চল । কথা আছে । এতো সহজে হার মানছিস কেনো তুই ?

" হার ? যেখানে আমি জিততেই চাই না, সেখানে হার মানা না মানার কি আছে ? বাড়াবাড়ি করবি না শুভ্র । অনেক হয়েছে । সব ভুলে যা । গত ক'দিনে তোর বোনের সাথে যা যা করেছিস, সব শেষ করে স্বাভাবিক হ এবার । আমাকেও একটু স্বাভাবিক থাকতে দে । চললাম , হাত ছাড় ।

" সায়ান,,

" তাড়াতাড়ি বল । দেরি হয়ে যাচ্ছে আমার ।

" তুই ভেতরে চল । আমি ইয়াশের সাথে যেতে দেবো না টুকটুকিকে ! আমাকে একটু সময় দে । সব ঠিক করে দেবো আমি । একটু অপেক্ষা কর শুধু ।

" তোর বোনকে আটকাবি কার জন্য ? আমার ?

উঁহু,,, তোর বোন অন্যকারোর । আমি আর চাইনা তাকে । আমি নেই ওর অপেক্ষায় । করবো না অপেক্ষা । লাভ নেই,, কারণ তোর বোনের জন্য শুধু এক জনম কেনো, পরবর্তী সাত জনম অপেক্ষা করলেও ওকে আর পাবো না আমি । আমার অপেক্ষাটা কেবল চিরন্তন রইলো,, তোর বোনকে আর পাওয়া হলো না । হবেও না পাওয়া ।

শুভ্রর জেদ....

" হবে ।

" হবে না । পাগলামি করবি না শুভ্র । যা হয়েছে মেনে নে ।

" তুই মানতে পেরেছিস ?

" আমাকে দেখে কোনো ভাবে মনে হচ্ছে,,, যে আমি এসব মানিনি ?

শুভ্র চেয়ে থাকে অবাক লোচনে ।

শুষ্ক ঢোক গেলে । মৃদু হেসে বলে সায়ান.....

" কি ভেবেছিস, আমি তোর বোনের আশায় ছিলাম । উঁহু,, আশা তো সেদিনই ছেড়েছি, যেদিন শুনেছি ও সুখে আছে । আমার কাছে ওর সুখটাই আগে । আর কিচ্ছু না ।

" তোর, আমার, সবার সামনে ইয়াশ ওর গায়ে হাত তুললো । আর তুই বলছিস ও সুখে আছে ?

" ইয়াশের আঘাতটাই দেখলি শুধু ?

আমি তো অন্যকিছু দেখলাম ওর চোখে । চিন্তা করিস না, তোর বোন ভালো থাগবে ‌। সায়ান ভাইয়াকে আর প্রয়োজন হবে না তার ।

" আর তুই,, তুই ভালো থাকবি ?

" চেষ্টা করবো । আসি এখন.....

দেরি হয়ে যাচ্ছে । দেরি করা উচিত না । কখনো দেরি করা উচিত না । কোনো ক্ষেত্রেই না ।

যুবক নিজের হাত ছাড়িয়ে নেয় আলগোছে । গেইট পেরিয়ে নিজের গাড়িতে উঠে বসে । ইঞ্জিন চালু করে । গাড়ি এগোতেই জানালার কাঁচ ভেদে দমকা হাওয়া ছুটে এসে এলোমেলো করে দেয় যুবকের গোছানো চুল গুলো ।

শুভ্র চেয়ে থাকার মাঝেই গাড়িটা চোখের আড়াল হয় । বুক চিরে তপ্ত শ্বাস পড়ে যুবকের । গাল ছাপিয়ে পানিও গড়ায় ‌হতাশার । কাঁধে কারোর হাতের স্পর্শ পেতেই হকচকিয়ে ফিরে চায় সে । মেহের দাঁড়িয়ে চোখে টলমলে পানি নিয়ে । শুভ্র তড়াক করে ফিরেই শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো স্ত্রীকে ।

এদিকে সায়ান অনেকটা পথ অতিক্রম করে কোনো এক ফাঁকা জায়গায় এসে গাড়িতে ব্রেক ধরে ।

তখনো স্থির সে ‌। ভেতরে ঝড় বইছে, তবুও স্বাভাবিক বাইরে থেকে । স্টিয়ারিং চেপে ধরেই মাথা নামিয়ে কপাল ঠেকালো সেখানে । ঝরঝরিয়ে পানি গড়ালো বন্ধ চোখের পাপড়ি ভেদ করে ।

চোখে স্পষ্ট ভাসলো সেই মুহুর্ত টুকু,,, যেখানে ইয়াশ শাফাহ্'র দুগালে চুমু আঁকছে ।

মনে পড়া মাত্রই বুকে যন্ত্রণা অনুভব করলো আবার । পুড়ছে ভেতরঘর । সে আর্তনাদ করে ওঠে হঠাৎ । গাড়ির সব জানালার কাঁচ ওঠানো । বদ্ধ গাড়ির ভেতর চিৎকার করে কাঁদে যুবক ।

ছিঁড়ে যায় মস্তিষ্কের শিরা উপশিরা ।

মাথা পিছিয়ে স্টিয়ারিংয়ে শক্ত করে বারি মারে । মুহুর্তেই কপাল কেটে ফিনকি দিয়ে বেরিয়ে আসে লাল তরল । গড়িয়ে পড়ে তা কপালের ধার ঘেঁষে ।

সে গাড়ি থেকে নামে । খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে গলা চিরে চিৎকার করে আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে । দমে যায় এক পর্যায়ে । পিচঢালা রাস্তায় লুটিয়ে পড়ে তার সুঠাম দেহ খানা । হাত পা ছড়িয়ে রাস্তায় পড়ে রয় যুবক ‌। অনবরত পানি ঝরে কার্নিশ ভিজে একাকার ‌। রক্ত ও ঝরছে কপাল হতে । চোখের কার্নিশ গলিয়ে পড়া নোনা জল গুলো রাস্তার অতৃপ্ত পিচ শুষে নিচ্ছে আরামে ।

সে শুয়েই রয় একলা একা । কেউ নেই । তারও কেউ নেই । সে নিঃস্ব । শূন্য সে । রিক্ত যুবক খোলা আকাশের পানে চেয়ে আরো একবার কেঁদে ওঠে । বহু কষ্টে আহাজারি করে আওড়ায়.....

" আই লাভ ইউ কিউটিপাই । কেনো তোকে আমার ভাগ্যে লেখা হলো না ? কেনো, কেনো, কেনো ? আমি যে মরে যাচ্ছি । তোকে না পাওয়ার যন্ত্রণা ছিঁড়ে ফেলছে আমায় । আমায় কেউ বুঝলো না । আমার শ্বাস বন্ধ হয়ে আসে তোর বিরহে । কলিজা ছিঁড়ে টুকরো হয় । কি ভীষণ যন্ত্রণা, আমার স্বপ্ন গুলো সত্য হলো না । তুই আমার হলি না জান । আমার জান তুই, বাঁচবো কি করে আমি আমার জানকে ছাড়া । জান রে,, আই লাভ ইউ । আমি ভালোবাসি তোকে,, ভীষণ ভালোবাসি । গোপনে ভালোবাসি । বেসেই যাবো । তোকেই ভালোবাসবো শুধু ।

ফাঁকা রাস্তায় তার আহাজারি শোনে না কেউ । যুবকের আর্তনাদ তার কাছেই মিলিয়ে যায় ।

,,,,,

কেটেছে দুটো দিন ।

রৌদ্রের হাত চেপে ধরে বসে আছে ইয়াশ । সব মান অভিমানের পালা চুকিয়ে আজ সে শাফাহ্ কে নিয়ে ফিরে যাচ্ছে । সন্ধ্যা সাতটায় আমেরিকার ফ্লাইট । ওরা সোজা ক্যালিফোর্নিয়ায় যাবে । সুইজারল্যান্ডে ফিরবে না আর । কি হবে সেখানে গিয়ে ? মাসের পর মাস খোঁজ চালানোর পরও যেখানে মেঘার বিন্দুমাত্র অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় নি ‌। সেখানে আর কিসের আশায় ফিরবে ?

রৌদ্র তো এখনো নিথর । ইয়াশ দীর্ঘ সময় ধরে ওর কাছে বসে আছে । এখন পেরিয়ে যাচ্ছে সময় । বেরোতে হবে ওদের । উঠে দাঁড়িয়ে নিস্পন্দ যুবকের মাথায় একবার হাত বুলিয়ে দিলো সে । এই বেপরোয়া ছেলেটাকে কখনো এভাবে দেখতে হবে, তা কভুও কল্পনায় ছিলো নাকি ? তাও আবার নিজের কোনো এক শত্রুর বোনকে ভালোবেসে আজ এই অবাধ্য, বেপরোয়া রুডভিক কাবির রৌদ্রের এই দশা ! মানা বড্ড কঠিন । ইয়াশ ও মানতে পারে না ।

ছলছলে চোখ মুছে নেয় অবাধ্য হওয়ার আগেই । বিড়বিড় করে অপরাধ বোধে.....

" আ'ম স্যরি রুডি । তোর ইভারা কে আমিও খুঁজে পাইনি । পারলে ক্ষমা করে দিস । তবে আমার চেষ্টা থেমে থাকবে না । অব্যাহত থাকবে তোর জন্য হলেও । ওকে খুঁজবো আমি । অন্তত তোর কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য হলেও ওকে খুঁজবো ।

কথা শেষ করে আবারো চোখ মুছলো সে । অনেকক্ষণ আগেই দরজার কাছে এসে দাঁড়িয়েছে শাফাহ্ । মন ভার রমনীর । একেই সবাইকে ছেড়ে যাচ্ছে, তার উপর রৌদ্রের এই অবস্থা দেখে বুক ফেটে কান্না আসছে বারংবার ‌। ইয়াশ এগিয়ে এসে ওর হাত ধরলো । হাসার চেষ্টা করে বললো....

" চলো !

ওষ্ঠ উল্টায় মেয়েটা । রৌদ্রকে দেখে নেয় আরো এক‌ ঝলক । ইয়াশ বুঝতে পারে ওর অবস্থা । শান্তনা দেয় মোলায়েম কন্ঠে.....

" আবার আসবো তো জান । ডোন্ট ওয়ারি,,, রৌদ্র ও খুব তাড়াতাড়ি ঠিক হয়ে যাবে । চলো এখন । যেতে হবে আমাদের ।

এ বাড়ি থেকে একটা সুতোও নিয়ে যাচ্ছে না ওরা । এক কাপড়ে বেরোবে । আদ্র পৌঁছে দেবে এয়ার পোর্ট পর্যন্ত ।

শাফাহ্ নতজানু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সিঁড়ির নিচে । কান্না চেপে রেখেছে বহু কষ্টে । চোখের কোণ চিকচিক করছে । শাহিনা কাবির ডাইনিংয়ের কাছে দাঁড়িয়ে উল্টো ফিরে আঁচলে মুখ চেপে ধরে রেখেছেন । শাফাহ্ গুটিগুটি পায়ে এগোলো মায়ের দিকে । বললো ধরা গলায়.....

" আমি আসছি আম্মু ।

অমনি হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন ভদ্রমহিলা । ফিরেই জড়িয়ে ধরলেন মেয়েকে । দূরদেশে চলে গেলে আবার কবে আসবে জানা নেই । গা জুড়োবে না মায়ের । যখন তখন দেখতে পাবেন না তার মেয়েটাকে ।

শাফাহ্ কাঁদে না । ঠোঁট কামড়ে সংযত করে নিজেকে । গুটিয়ে থাকে মায়ের বুকে ।

ইয়াশ একপাশে দাঁড়িয়ে । তৌসিফ কাবির বলেন তার উদ্দেশ্যে....

" আমার মেয়েটাকে কষ্ট দিও না ইয়াশ ‌। কেনো জানি ভরসা পাই তোমার উপর । তাই এতো কিছুর পরও আমার মেয়েকে তুলে দিচ্ছি তোমার হাতে । ওকে যত্ন করো । ও খুব নরম । আমাদের কাছে থাকতে কখনো ফুলের টোকাও পড়তে দেইনি ওর শরীরে । তুমিও আগলে রেখো এবার থেকে । অনেক দূরে যাচ্ছো । একলা থাকবে আমার মেয়েটা । ওকে দেখে রেখো একটু ।

ইয়াশ আশ্বাস দেয় । মায়ের কাছ থেকে সরে এসে রুবিনা কাবির কে একবার জড়িয়ে ধরে শাফাহ্ । ভদ্রমহিলা মেয়েটার মাথায় স্নেহের হাত বুলিয়ে দেন ।

শিশির আর মেহেরকে দেখে মুচকি হাসে রমনী ।

" শিশির,, আসছি আমি । আদ্র ভাইয়ার সাথে অনেক ভালো থাক । মাঝে মাঝে ফোন করবি কিন্তু আমায় ।

মেহের আপু,, আমি আসছি.....

মেহের ভেজা চোখ নিয়ে মৃদু হাসে ।

সব ভুলে বুকে টেনে নেয় মেয়েটাকে । সোফার এককোণে বসে আছে শুভ্র । হাতে ফোন । ব্যস্ত ভীষণ । এসবে মনযোগ নেই তার । শাফাহ্ পিটপিট করে এগোলো ভাইয়ার দিকে । সামনে দাঁড়িয়ে আলতো স্বরে ডাকলো....

" ভাইয়া.....

ডাক কানে পড়তেই উঠে দাঁড়ায় যুবক । গুরুগম্ভীর সে । চোখ তুলেও তাকায় না । গটগটিয়ে সিঁড়ির দিকে এগোয় । এতক্ষণ চোখের পানি ধরে রাখতে পারলেও এবারে আর পারলো না রমনী । গাল ভিজে এলো ভাইয়ার উপেক্ষায় । ফুঁপিয়ে উঠলো । এই কদিনে শুভ্র ফিরেও তাকায় নি ওর দিকে । মেয়েটা শুভ্র কে যেতে দেখে তাৎক্ষণিক চোখ মুছে গলা তুললো থেমে থেমে.....

" ভাইয়া আমি চলে যাচ্ছি,, অনেক দিন দেখা হবে না আমাদের । তুমি কিন্তু রোজ ফোন করবে আমায় । আমি কথা বলবো তোমার সাথে ।

তার ভাইয়া শুনলো । তবে ফিরেও তাকালো না । ভেজা দৃষ্টি অগোচরে রেখেই তিক্ততা দেখিয়ে চোখের আড়াল হয়ে ঘরে ঢুকলো সে ।

শাফাহ্ কেঁদে ওঠে । মেহের বলে এগিয়ে.....

" আমি ফোন করবো রোজ । কাঁদিস না । দেরি হয়ে যাচ্ছে তোদের । অপেক্ষা করছে ওরা...

শেষবার আব্বু কে জড়িয়ে ধরলো মেয়েটা ।

অতঃপর সবার থেকে বিদায় নিয়ে সদরের চৌকাঠ মাড়ালো । গেইট পেরিয়ে উঠলো গাড়িতে । পেছনে ফেলে গেলো সব আপনজনের । যারা ভরা চোখে চাতকের ন্যায় চেয়ে রইলো তাদের আদরের মেয়ের চলে যাওয়ার পথের পানে । কেউ দেখলো না ,, দোতলায় দাঁড়িয়ে আরো এক জোড়া ভেজা দৃষ্টিও তাদের দৃষ্টির সাথে চেয়ে রয়েছে । কেউ জানলো না এটা ।

#চলবে............

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৮৯তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন