ফন্ট সাইজ:
থিম:
আসবো ফিরে আবারো

৯৪তম পর্ব

লেখক: সুরভী আক্তার

#আসবো_ফিরে_আবারো

#পর্ব_৯৩

#সুরভী_আক্তার

( অনুমতি ব্যতীত কপি করা নিষেধ ❌ )

আজ ত্রিশ আগস্ট ।

বাজে বিকেল চারটে । কক্সবাজার থেকে সবাই ঢাকায় ফিরেছেন সেই সাড়ে এগারোটা নাগাদ ।

সাড়ে তিন বছরের অধিক সময় কাটানোর পর মেঘা আর বাচ্চাদের অনেক অনেক স্মৃতি জমেছিলো সেথায় । সব ঘুচিয়ে এখন তারা ফিরেছে আপন নীড়ে । সেখানে কাটানো সময় গুলো মেঘার কাছে ভালো ছিলো না খুব একটা । আবার খুব বেশি খারাপ ছিলো, তাও নয় ।

ওখানে টিকে থাকতে হয়েছিলো একলা লড়াই আর পরিশ্রম করে । বাচ্চাদের মানুষ করতে হয়েছে একা হাতে । ডরমেটরিতে অনেক পরিবার আছে আরো ।‌ তবে মেঘার সাথে কারোর বনিবনা ছিলো না ।

কেবল উৎসের পরিবার ব্যাতীত । উৎসের ঘরেও বউ বাচ্চা আছে । শুধুমাত্র ওদের সাথেই মিশতো মেঘা । অনটনে , অসময়ে ওদের থেকে সাহায্য পেয়েছে অনেক । বাচ্চাদের সামলানোর ক্ষেত্রেও হাত বাড়িয়েছিলো একমাত্র ওরাই ।

মেঘার গায়ে কাঁটা দেয় নিজের গর্ভাবস্থার কথা মনে পড়লে । কি অসহনীয় মুহুর্ত পার করেছে মাসের পর মাস ।

বাচ্চারা জন্মানোর পাঁচ মাস পর ট্রমা থেকে মুক্ত হয়েছে সে । অতঃপর জীবনটা একটু স্বাভাবিক হয়েছে বাচ্চাদের সঙ্গে । মানিয়ে নিয়েছিলো সন্তানদের নিয়ে ।

একলা মা হিসেবে নিজের সন্তানদের চাওয়া, পাওয়া, আদরে কখনো কমতি রাখতে দেয় নি রমনী ।

নিজের উপর দিয়ে যাওয়া শত যন্ত্রণার বিন্দুমাত্র আঁচ বাচ্চাদের উপর আসতে দেয় নি ।

এখন বোধহয় সব শেষ হলো । যাতনার প্রহর ফুরলো ।

কাবির ম্যানশনের হাল বদলেছে এই চার বছরে । রং পাল্টেছে দেয়ালের ।

সদর বরাবর সামনের দেয়ালে যে বড় ফ্যামিলি ফটোটা ছিলো, সেটা আর নেই । রৌদ্রের পাগলামোর জন্য অনেক বছর আগেই সরিয়ে দেওয়া হয়েছে ।

দোতলায় রৌদ্রের ঘর নেই । ওর ঘর এখন গ্রাউন্ড ফ্লোরে । বাড়ি ফেরার পর থেকেই এসব খুঁটিনাটি অবলোকন করে যাচ্ছে রমনী । বাড়ির সব ব্যস্ততা এখন শিশির আর মেহেরের কাঁধে পড়েছে । রুবিনা কাবির আর শাহিনা কাবির প্রায় হাল ছেড়েছেন এসবের ।

এখন বিকেলে ড্রইং রুমে বসে আছেন সবাই । মেঘা নেই কেবল । একলা রমনী এসেছে থেকেই ঘরবন্দি হয়ে রয়েছে । রৌদ্র নিজেও বাইরে । মেয়েকে নিয়ে মত্ত সে ।

এদিকে মেঘা আড়ষ্ট । নিজের করা ভুলের কারনে কারোর সামনে দাঁড়ানোর মুখ নেই । সে সবার চোখে অপরাধী । যতটা সম্ভব নিজেকে আড়াল রাখার চেষ্টা করছে রমনী । চোখ চুরিয়ে নিচ্ছে সবার থেকে । রৌদ্র ব্যাতীত ঠিকভাবে কথাও বলছে না কারোর সাথে । কেমন অস্বস্তি হচ্ছে ।

রৌদ্রের ঘরের বারান্দায় একলা বসে শূন্য চোখে কোন এক দিকে চেয়ে রয়েছে রৌদ্রময়ী । ধ্যানে মগ্ন সে । হুট করেই ধ্যানে বিঘ্ন ঘটলো চিকন কন্ঠে.....

" মেঘা,,, তুই ঘরে একলা কি করছিস ? বসার ঘরে সবাই আছে । ডাকছে তোকে !

নড়েচড়ে চকিতে ঘাড় ফেরালো রমনী । শিশির দাঁড়িয়ে দরজার কাছে ।

সেখানে আর দাঁড়িয়ে না থেকে এগিয়ে গিয়ে মেঘার পাশে থামলো । রয়ে সয়ে বললো মুচকি হেসে.....

" রৌদ্র ভাইয়া কখন থেকে তোর কথা বলছে । খুঁজছে তোকে । বাইরে চল । চা খাচ্ছে সবাই,, বাচ্চারাও আছে ।

মেঘা চোখ নামালো ।

" সবার সামনে যেতে আমার বড্ড অস্বস্তি হচ্ছে শিশির । কারোর চোখে চোখ রাখার দম নেই আমার । সবাই আমাকে ভুল বুঝে বসে আছে, তাই না ?

ওর কথায় নিঃশব্দে হাঁফ ছাড়লো শিশির । বসলো মুখোমুখি । মেঘার মুখ পানে তাকিয়ে চমৎকার ভাবে দৃঢ় কন্ঠে বললো.....

" সবার চোখে চোখ রাখতে কে বলেছে তোকে । যার চোখে তোর জন্য অগাধ বিশ্বাস আর ভালোবাসা রয়েছে, তার চোখে চোখ রেখে শান্তিতে দম নিতে পারলেই ঢের ।

একটু থেমে রমনীর পুরো মুখে নজর বুলিয়ে বললো আবার....

" একটা সত্য কথা শুনবি মেঘা ? তুই জানিস,,, তুই খুব লাকি ! আমার দেখা সবচেয়ে ভাগ্যবতী নারী তুই । যাকে কোনো এক পুরুষ এতোটা বেশি ভালোবাসে । তুই জাস্ট কানে শুনে কল্পনাও করতে পারবি না, রৌদ্র ভাইয়ার কি অবস্থা হয়েছিলো তোকে হারিয়ে ।

আমি তো দেখেছি,,, চার বছর ধরে নিজ চোখে ওনার পাগলামো দেখেছি তোর জন্য । লোকটার ছটফটানি দেখেছি । ক্ষণে ক্ষণে যন্ত্রণায় কাতরাতো । বাড়ির কেউ সামলাতে পারতো না । ভাইয়ার শরীরের অবস্থা দেখেছিস, কতটা শুকিয়ে গেছে । হাত গুলোতে খেয়াল করে দেখবি, ইনজেকশন পুশ করতে করতে কালচে দাগ বসে গেছে ।

ভাইয়ার অবস্থা তো খুব ভালো ছিলো না । পরিবারের সবাই একটা খারাপ সময় কাটিয়ে এসেছে এতদিন ।

অনেক সময় কেটেছে । জানি,, তোর মাঝেও দ্বিধা আছে । কিন্তু সেই দ্বিধা তো কাটাতে হবে এখন । এরা সবাই তোর আপন ! কেউ ভুল বোঝেনি তোকে । কাউকে নিয়ে ভুল ধারণা করিস না ।

বাইরে চল,, ভাইয়া অনেকক্ষণ ধরে তোকে ডাকার কথা বলছিলো । বাচ্চারাও খুঁজছিলো তোকে । চল এখন,,,

বুক ফুলিয়ে লম্বা শ্বাস ফেললো মেঘা । অতঃপর শিশিরের সাথে পা মিলিয়ে ঘর‌ থেকে বেরিয়ে আসলো । ড্রইং রুমে হাট বসেছে সবার । বিকেলে টুকটাক চা নাস্তা খাচ্ছেন সবাই । সিরাত ফেরেনি এখনো । বাড়িটা যেনো জমজমাট সবার উপস্থিতিতে । মুখোর সকলে ।

অনেক বছর পর ঠান্ডা হয়েছে প্রত্যেকের অন্তঃস্থল ।

সোফার একপাশে রৌদ্র বসে । ওর কোলে রোশ্ । বাপ মেয়ে নিজেদের মাঝে চুপিসারে কি বলাবলি করছে কে জানে । রৌদ্রের কথায় রোশ্ শব্দ তুলে খিলখিল করে হাসছে ক্ষণে ক্ষণে । বাকিরা আপ্লুত হয়ে সেই বাবা মেয়েকে দেখছে । বহু বছর পর ছেলের এহেন খুশিতে বারবার চোখ ভিজে আসছে রুবিনা কাবিরের । দৃষ্টি সরাচ্ছেন না তিনি ।

মেঝেতে খেলনা ছড়ানো ছিটানো । রামিসা আর আদ্রিজা খেলছে দু'জনে ।

মেঘা ছেলেকে না দেখে এপাশ ওপাশ তাকায় । এগিয়ে যেতেই ওর পানে দৃষ্টি ফেরায় রৌদ্র । কারোর উপস্থিতি গ্রাহ্য না করে হতচকিত হয়ে ডাকে....

" ইভারা,,, কোথায় ছিলে এতক্ষণ ? কাছে এসো, দেখো হাসছে আমাদের মেয়ে । সি ইজ সো প্রিটি, জান । একদম তোমার মতো । এসো না কাছে.....

রোশ্ ফিরে তাকিয়ে মেঘাকে দেখে ছটফট করে উঠলো....

" মাম্মা ! মাম্মা দাবো.....

রৌদ্র আটকে রাখে মেয়েকে.....

" না মা,,, পাপ্পার কাছে থাকো ।

" পাপ্পা কুই ?

" এইযে এটা !

নিজের নিজের দিকে তর্জনী তাক করে দেখায় ‌রৌদ্র । ছোট ছোট চোখে ওর পানে চেয়ে রয় রোশ্ । অবুঝের মতো বলে....

" এতা আঙ্কেন !

" উঁহু,,, এটা পাপ্পা !

মেঘার চোখ ছেলেকে খুঁজছে তখনো । সে নিচু স্বরে শুধালো নিজেকে না দমিয়ে....

" ইবাদ কোথায়, মা ?

" ওকে তো শুভ্র নিয়ে বেরিয়েছে । জ্বালাচ্ছিলো খুব । একটু আগেই নিয়ে বেরোলো । কোথায় গেলো কে জানে !

শাহিনা কাবিরের উত্তর ।

মেঘা চিন্তিত হয়ে পড়ে । ঐ ছেলেকে সামলানো মুশকিল । শুভ্র কে নাকানিচোবানি খাইয়ে ছাড়বে ।

যা ভাবনা, তাই হলো । মিনিটের মাথায় সদর মাড়িয়ে গলা তুলে ভেতরে ঢুকলো শুভ্র । একপ্রকার চেংদোলা করে ইবাদ কে সামলে ধরেছে কোনো রকম । সে বড্ড নাজেহাল গলায় বলতে বলতে এগোলো....

" মেঘা, তোর ছেলেকে সামলা প্লিজ । আমি আর পারছি না ওকে ধরে রাখতে । আমাকে এই কয়েক মিনিটে নাস্তানাবুদ করে ছাড়লো এই তিরপিন্ডে ।

বলতে বলতে মেঘার সামনে এসে নামিয়ে দিলো ওকে । কোমরে হাত ঠেসে দীর্ঘ এক শ্বাস ফেললো ।

ইবাদ মুখ খিচে রেখেছে । সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বুকে দুহাত গুটিয়ে গাল ফুলিয়ে নিলো । ফোঁস ফোঁস করে ফুলে উঠছে নাকের নরম পাটা । মেঘা ছেলেকে টেনে ফিরিয়ে বসলো হাঁটু মুড়ে......

" কি হয়েছে ইবাদ ! আঙ্কেলকে জ্বালাতন করেছো কেনো ? তোমাকে ঘুরতে নিয়ে গেছিলো তো ! মুখ ভার করে আছো কেনো এভাবে ?

ইবাদ তাকালো না মায়ের দিকে । ফোঁস করে অন্যদিকে ফিরলো । মেঘা মাথা তুলে শুভ্রর দিকে তাকায় । শুভ্র মাথা নাড়ে দুটিকে.....

" তুই ওকে সামলাস কি করে বলতো ?

ভাবলাম একটু ঘুরিয়ে আনি ওকে । বেরিয়েছিলাম গাড়ি নিয়ে । কোলে না নিয়ে দুই মিনিটের জন্য সিট বেল্ট বেঁধে পাশের সিটে বসিয়ে ছিলাম তোর ছেলেকে । ও কি করেছে জানিস ? টানতে টানতে সিট বেল্ট টাই ছিড়ে দিয়েছে । বলে কিনা ও গাড়ি চালাবে । ড্রাইভিংয়ের সময় যেই কোলে নিলাম, এমন ছটফটানি শুরু করলো, ব্যালেন্স হারিয়ে অল্পের জন্য এক্সিডেন্ট হতে হতে বেঁচে গেছি । একটু গলা তুলে কথা বলতে গেছিলাম, তারপর কি বললো জানিস....

“তুমাকে পুলিচের কাচে দিয়ে দেবো, ব্যাদ ম্যান ।

হাহহহ, তোর এই হাফ ব্যাটারি তার বড় আব্বুকে পুলিশের ভয় দেখাচ্ছে । বলছে কিনা আমি ব্যাড ম্যান ! ভাবতে পারছিস ?

কথা শেষ করে হেসে ওঠে শুভ্র ।

মেঘা চিবুক নামিয়ে মৃদু হাসে তাল মিলিয়ে । ইবাদ বড্ড ছটফটে । ওকে সামলানো যার তার পক্ষে সম্ভব নয় ।

বাকিরাও হাসলেন মজার ছলে ।

রুষ্ট ইবাদ মেঝের পানে তাকায় । রামিশা আর আদ্রিজা কে দেখে গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে গিয়ে বসে ওদের কাছে ।

এক ঝলক করে দুজনকেই দেখে নেয় । রামিশার হাতে একটা বড় টেডি ‌। অন্যদিকে আদ্রিজার হাতে টেক্সচারের একটা ছোট্ট ‌পুতুল ।

ইবাদ মুখ খিচে নিলো পূনরায় । রামিসা বড়,, মনে মনে বুঝলো ওর সাথে পারা যাবে না ।

কি একটা ভেবে একটানে ছোট্ট আদ্রিজার হাত থেকে ছিনিয়ে নিলো পুতুলটা ।

ঝটকা খেয়ে তাৎক্ষণিক কেঁদে উঠলো বাচ্চাটা ।

মেঘা চমকায় । তেড়ে গিয়ে হাঁটু মুড়ে বসে.....

" ইবাদ,, কি করছো ? সিস কে কাঁদাতে নেই বাবা ? বোনের পুতুল নিলে কেনো ? দিয়ে দাও ।

ইবাদ মুখ বাঁকায়.....

" মাই সিস,,, রোশ্ ।

" এটাও তোমার সিস । সিস কাঁদছে পুতুল দিয়ে দাও । একসাথে খেলো ওদের সাথে ।

জেদি ছেলেটা শুনলো না । ফোঁস করে উঠে দাঁড়ালো পুতুলটা চেপে ধরে । সে এখন এটা রোশ্ কে দেবে ।

এদিকে ছেলের অবাধ্যতায় আর জোর খাটালো না রমনী । আদ্রিজার কান্না থামাতে তড়িঘড়ি করে ওকে কোলে তুলে নিলো ।

" কাঁদে না সোনা,, আরেকটা পুতুল নেবে তুমি ? ওয়েট আমি দিচ্ছি ।

বলতে বলতে আরেকটা পুতুল হাতে নিয়ে দেখালো বাচ্চাটাকে । কান্না থামিয়ে ফিকড়ে ফিকড়ে উঠছে আদ্রিজা ।

এদিকে মেঘার ঠোঁটে স্মিত হাসি আর কোলে আদ্রিজাকে দেখে ছোট্ট মেজাজ বিগড়ে যায় ইবাদের । খিটখিট করে ওঠে.....

" এতা আমাল মাম্মা,,, মাম্মার কোলে ইবাদ উতবে । ব্যাদ গাল নামো তুমি ।

কথা টুকু বলতে বলতে গজগজ করে হাত বাড়িয়ে শক্ত করে খামচি বসালো আদ্রিজার নরম হাতে । মেঘা ধ্যান ফেরানোর আগে ঘটে গেলো এই অঘটন । নখ বসে যেতেই চোখ বন্ধ করে পূণরায় চিৎকার জুড়ে কেঁদে উঠলো আদ্রিজা ।

চমকে গেলো মেঘা সহ বাকিরা ।

দ্রুত ইবাদ কে ঠেলে আদ্রিজা কে পাশ ফিরিয়ে ডান কাঁখে নিলো মেঘা । শ্বাস রুখে কেঁদে উঠেছে মেয়েটা । মেঘা ভড়কে যায় ‌।

তেড়ে আসে শিশির আর আদ্র । ছটফট করে মেয়েকে নিজের কোলে টেনে নেয় শিশির । ব্যাথা পেয়ে ঝাই ধরে কান্না জুড়েছে এর মধ্যেই ।

মেঘা পরিস্থিতি বুঝে ধমকে উঠলো ছেলেকে.....

" ইবাদ,,, এটা কি ধরনের বেয়াদবি ? বোনের হাতে খামচি দিলে কেনো তুমি ?

ধমক পেয়ে ওষ্ঠ উল্টায় ইবাদ ।

" ও ইবাদেল মাম্মাল কোলে উতেচে কেনো ? মাম্মা ইবাদ কে নেবে ।

" তাই বলে বোনকে চিমটি কাটবে তুমি ? বোন ব্যাথা পায়, সেটা বোঝো না ?

" ও ইবাদেল বোন নয় । মাই সিস অনলি রোশ্ ।

মেঘা চোখ রাঙানি দেয় ।

ওদিকে আদ্রিজা কেঁদেই যাচ্ছে ।

শিশিরের কোল থেকে নিয়ে আদ্র থামাতে পারলো না ওকে । রৌদ্র এতক্ষণ নীরবে দেখলো সব । রোশ্ কে কোল থেকে নামিয়ে পাশে বসালো । উঠে দাঁড়ালো আলগোছে । দম্ভভরে পা চালাতে পারছে না এখনো ।

শক্তি নেই । অসার হাঁটুতে বল আসছে না খুব একটা । অত্যন্ত ধীর কদম বাড়াতে পারছে কেবল । তাও বহু কসরতে ।

সে উঠে দাঁড়িয়ে হাত বাড়িয়ে বললো.....

" আদ্র, ওকে আমার কাছে নিয়ে আয় ।

তাৎক্ষণিক মান্য হলো ।

আদ্রিজা কে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হিমশিম খেয়ে যায় রৌদ্র । বসে আগের জায়গায় ।

বাচ্চাটাকে বুকে জড়িয়ে চুমু খায় কপালে । ফুঁপিয়ে কাঁদছে মেয়েটা ।

এ বেলায় রৌদ্রের কোলে অন্য বাচ্চাকে দেখে মুখ খানি চুপসে যায় রোশের । অভিমান নিয়ে নাক টেনে আদুরে হয়ে বলে....

" আঙ্কেন,,, আমি কুলে উতবো । আমাতে নাও...

ফিরে চায় রৌদ্র । মুচকি হেসে হাত বাড়িয়ে দেওয়ার আগেই ছোঁ মেরে রোশ্ কে নিজের কোলে টেনে নিলো শুভ্র ‌। বাচ্চাটাকে কাঁধে তুলে বাইরের দিকে যেতে যেতে বললো....

" চলো মাম্মা,, আমরা বাইরে থেকে ঘুরে আসি ।

একটু থেমে ঘাড় ফিরিয়ে ডাকলো.....

" রামিসা,,, যাবে তুমিও ? চলে এসো মা ! আমরা ঘুরতে যাবো !

ছটফট করে উঠে দাঁড়িয়ে শুভ্রর পিছে ছুটলো রামিসা । ওদের দুটোকে নিয়ে সদর পেরিয়ে গেলো শুভ্র ।

মেহের ছিলো ডাইনিং টেবিলের কাছে দাঁড়িয়ে । শুভ্রকে ওভাবে বাচ্চাদের সাথে দেখে চিবুক নামিয়ে কাষ্ট হাসলো রমনী । জ্বালা পোড়া লাগলো বুকে । শ্বাস নিতে কষ্ট হলো । একটু থেমে থেকে ধীরে পা বাড়ালো সিঁড়ির দিকে । অমনি ডাক পড়লো সদরের কাছ থেকে....

" মেহের,,, তুই ও চলে আয় ।

চকিতে চায় রমনী ।

ততক্ষণে শুভ্র তেড়ে এসেছে কাছে । এসেই হাত চেপে ধরলো । বাচ্চাদের গাড়িতে বসিয়ে এসেছে, তাগাদা দিয়ে বললো বাকিদের উদ্দেশ্যে....

" আমরা একটু বাইরে থেকে ঘুরে আসছি । মেহের কেও সাথে নিলাম ! বায়....

,,,,

আটটার দিকে ডিনার শেষ হয়েছে সবার ।

আজ সন্ধ্যায় রোশ্ আর ইবাদ ঘুমিয়েছিলো । উঠলো আটটার পর । বাকি অর্ধেক রাত পর্যন্ত না ঘুমিয়ে জ্বালিয়ে মারবে এখন ।

ঘরে ওদের রাতের খাবার খাওয়াচ্ছে মেঘা । খেতে গিয়েও টালবাহানা করে হাজার । ধৈর্য সহকারে মানিয়ে গুছিয়ে সময় নিয়ে খাওয়াতে হয় ।

দুটোতে মিলে গোটা ঘরে ছোটাছুটি করছে । পিছু পিছু ছুটে ভুলিয়ে ভালিয়ে ওদের মুখে খাবার তুলে দিচ্ছে মেঘা । রৌদ্র বিছানায় উবু হয়ে শোয়া । চোখ দুটি একস্থির স্ত্রী - সন্তানদের পানে ।

ইশশ্, ওর বাচ্চারা জন্মেছে,, শরীর বেড়েছে, কথা বলা শিখেছে, পা বাড়িয়ে হাঁটাও শিখেছে, ছোটাছুটি করতেও শিখেছে,, কিন্তু রৌদ্র কোনো কিছুই যথাসময়ে নিজ চোখে অবলোকন করতে পারে নি । বাচ্চাদের জন্মের সময় পাশে থাকতে পারে নি । ফুটফুটে নবজাতকদের দেখতে পারেনি, ছুঁতে পারেনি তাদের কোমলাঙ্গ ।

কোলে নিয়ে চুমু এঁকে আদর করতে পারেনি । তার আগেই ওর বাচ্চারা বড় হয়ে গেছে । বাবা কে চেনেনি ওরা । বাবা কি তাই জানে না । কেবল মেঘাকে ঘিরে ওদের সমস্ত দুনিয়া গড়ে উঠেছে ।

রৌদ্র বঞ্চিত হয়েছে সব থেকে । পায়নি সেই সময় গুলো, যখন মেঘা গর্ভবতী ছিলো । ওর বর্ধিত উদর ছুঁয়ে দেখতে পারেনি যুবক । হাত রেখে, কান পেতে বাচ্চাদের অনুভব করতে পারেনি । গর্ভাবস্থার সময় মেঘার মাঝে আসা বদল গুলো দেখতে পারেনি ।

এ ভীষণ আফসোস তার । তবে এই আফসোস প্রকাশ করলে অভিযোগ করা হবে মেঘার উপর । রৌদ্র তা করতে চায় না । ভেতর দুমড়ে মুচড়ে উঠছে এসব ভাবতে গিয়ে । চোখের কার্নিশ ভিজে আসছে আপনা আপনি ।

অনেক চেষ্টার পর বাচ্চাদের খাওয়াতে সক্ষম হলো মেঘা । মুখ গোল করে হাঁফ ছাড়লো ।

হাত ধুয়ে এবারে তাকালো রৌদ্রের দিকে,, মুখ খুলতে খুলতে পা বাড়ালো.....

" দেখেছেন, আপনার ছেলে মেয়েরা কতটা.....

বলতে বলতে ধক্ করে উঠলো রমনী । রৌদ্রের ভেজা চোখ দেখে আঁতকে উঠে ধড়ফড়িয়ে পাশে বসলো ।

" রৌদ্র,, কি হয়েছে ? চোখ ভেজা কেনো ?

রৌদ্র অশ্রুসজল নয়ন সমেত মুচকি হাসে । মাথা তুলে রমনীর কোলে রেখে উরুসন্ধি পেঁচিয়ে নেয় । ভীষণ ক্ষিণ গলায় শুধোয়.....

" প্রেগন্যান্সি পিরিয়ডে তোমার অনেক কষ্ট হয়েছে,, তাই না জান ? ওদের একা সামলেছো,, এতো বড় করেছো, জ্বালাতন সহ্য করেছো, পেরেছো কি করে এতো কিছু ? আর ডেলিভারি পেইন,, সহ্য করেছো কি করে ? সে সময় কে ছিলো তোমার সাথে ? যদি খারাপ কিছু ঘটে যেতো ?একলা একা এতো কিছু কেনো সাফার করলে সুইটহার্ট ? খুব কষ্ট হয়েছিলো তাই না ?

মেঘা আশ্চর্য হয় । থমকায় ।

রৌদ্রের গলা রুদ্ধ । পৃষ্ঠে জোর পূর্বক হাসলো রমনী । কম যন্ত্রণা তো সহ্য করেনি সে । তবুও রৌদ্রকে বুঝতে দিলো না । নরম সুরে বললো....

" সে সময় টা পেরিয়ে গেছে,, ওসব নিয়ে আর ভাবতে হবে না । ঠিক ছিলাম আমি ।

" সেই সময়টায় তোমার সাথে থাকার ইচ্ছে ছিলো বড্ড ।

" স্যরি রৌদ্র,,, সব আমার ভুলের জন্য হয়েছে ।

" উঁহু,,, ভুলের সূচনা আমার থেকে । আ'ম স্যরি জান ।

উঠে বসলো যুবক ।

চোখ মুছে বাচ্চাদের দিকে তাকিয়ে হেসে বললো রমনীর কাঁধে মাথা নামিয়ে....

" ওরা আমাকে পাপ্পা ডাকবে কবে ? ওদের মুখে এই ডাক শোনার জন্য ব্যাকুল হয়ে যাচ্ছি । ডাকছে না কেনো ওরা আমায় ?

মেঘা বাচ্চাদের কাছে ডাকলো ।

ছোটাছুটি থামিয়ে এক ডাকেই ছুটে আসলো ওরা । ওদের কেও বিছানায় তুললো রমনী । রৌদ্র সোজা হয়ে রোশ্ কে কোলে নেয়, মেঘা নেয় ইবাদ কে । বাচ্চাদের বোঝানোর স্বরে বলে মোলায়েম কন্ঠে.....

" রোশ্, ইবাদ, তোমরা জানো ইনি কে ?

দু'জনেই তাকায় রৌদ্রের দিকে । নির্বোধ চাহনি ওদের । মেঘা বলে ভেজা গলায়....

" সোনা,, ইনি তোমাদের পাপ্পা । আমি মাম্মা,, আর উনি পাপ্পা হন । আঙ্কেল নয় । পাপ্পা বলবে ওনাকে ! বুঝেছো ? বলো, উনি কি হন ?

রোশ্ নরম দৃষ্টিতে রৌদ্রের দিকে তাকালেও ইবাদের চাহনি রুষ্ট । ভেংচি কাটলো সে । রোশ্ উত্তর করে ঝট করে....

" আঙ্কেন ।

" না মা,, পাপ্পা বলো । উনি পাপ্পা তো ।

পিটপিট করে তাকায় বাচ্চাটা । এতো বছর এই ডাক ও লোক, কোনটার সাথেই পরিচয় ছিলো না । হঠাৎ করে এক বলাতে বাচ্চা মন দ্বিধায় পড়েছে । বুঝে উঠছে না কিছু ।

ইবাদ এসব শুনলো না । রোশ্ কে রৌদ্রের কোলে দেখে তেতে উঠলো । টেনে ধরলো বোনের হাত.....

" আমাল সিস,,, চালোওও ।

" তোমার সিস আমার প্রিন্সেস । আর তোমার মাম্মা আমার সুইটহার্ট ! বুঝলে, মাই বয় ?

কথা টুকু আওড়িয়ে মেঘার কাঁধে পূণরায় মাথা নামিয়ে রাখলো সে । ইবাদ যেনো তেলে বেগুনে জ্বলে ওঠে । উঁচু হয়ে ঠেলে সরাতে চায় রৌদ্রকে । ছটফট করে চিৎকার করে....

" নাআআ, এতা আমাল মাম্মা ! চালো তুমি, ব্যাদ ম্যান ।

রৌদ্র ফিক করে হাসে । মেঘা বলে....

" জানেন রাইনো মুখো,, আমার ছেলে একদম আপনার মতো জেদি, একরোখা আর অবাধ্য, হয়েছে ।

" আর আমার মেয়ে একদম তোমার মতো কিউট, আদুরে আর অভিমানী হয়েছে, সুইটহার্ট ! দেখলে না, তখন আদ্রিজা কে কোলে নিতেই কেমন গাল ফুলিয়ে বসে ছিলো । তোমার মতো বড্ড অভিমানী আমার প্রিন্সেস ।

মেঘা মলিন হয়ে প্রত্যুত্তর করে....

" উঁহু,, ও আমার মতো অভিমানী না হোক ।

" উঁহু,, ও তোমার মতোই অভিমানী হোক । আই উইশ,, প্রত্যেকটা ছেলের কপালে তোমার মতো একটা আদুরে আর অভিমানী বউ জুটুক ‌। বউদের অভিমান না থাকলে চলে নাকি ?

ফিরে তাকিয়ে এক পশলা হাসে রমনী ।

যুবকের চুলের ভাঁজে হাত ডুবিয়ে বলে.....

" আর আমি কি চাই জানেন,, বেপরোয়া পুরুষদের ভালোবাসায় যদি এতোটা প্রখরতা থেকে থাকে, তাহলে আই উইশ,, দুনিয়ার প্রত্যেকটা নারীর কপালে আপনার মতো একজন বেপরোয়া স্বামী জুটুক । যে তাকে বেপরোয়া হয়েই ভালোবাসুক ।

আমার মেয়ের জীবনেও এমন কেউ আসুক । তবে আমার মেয়ে আমার মতো ভুল না করুক ।

রমনীর কন্ঠে আক্ষেপ । রৌদ্র বলে....

" ভালোবাসায় কোনো কিছুর পরোয়া থাকতে নেই,, সানি ।

ভুলে যাও সব ‌। শুধু মনে রাখো, আমি তোমাকে ভালোবাসি । বেপরোয়া ভাবে ভালোবাসি ।

কথা টুকু বলেই ঠোঁট তুলে মেঘার নাকের ডগায় চুমু খেলো রৌদ্র । ইবাদের চোখে এই দৃশ্য পড়া মাত্রই চোয়াল ঝুলে মুখ গোল হয়ে আসলো বাচ্চাটার । মুহুর্তেই স্বভাব সুলভ চিৎকার করে উঠলো......

" ইউ ব্যাদ ম্যান,,, এতা আমাল মাম্মা । আমি তুমু কাবো । তুমি নাআআআআ....

আকস্মিক ওর চিৎকারে হকচকিয়ে যায় রৌদ্র । একটু সরে আসতেই রমনীর মুখে ঝাঁপিয়ে পড়ে ইবাদ । ঠোঁট, গাল, কপালে, এলোমেলো চুমু খেতে লাগে । হতবিহ্বল হয়ে যায় বেপরোয়া যুবক । আশ্চর্য লোচনে চেয়ে দেখে ইবাদ কে ।

বেশ কতকগুলো চুমু এঁকে সরে আসে বাচ্চাটা । মেঘা ফিক করে হাসে । রৌদ্র বলে গলা তুলে....

" এইই ,,, তুমি আমার বউকে চুমু খেলে কেনো ?

" বউ ?

" হ্যাঁ, এটা আমার বউ ।

মেঘার কাঁধ জড়িয়ে নিলো সে । ইবাদ ওষ্ঠ উল্টায় ।

এই লোকটার কাছে নিজের মাম্মা কে সহ্য হচ্ছে না তার । ইনি কি আবার চুমু খাবেন মাম্মা কে ?

এই ভাবনা আসতেই ফের আগের ন্যায় হামলে পড়লো বাচ্চাটা । রৌদ্রের মুখ ঠেলে ধরে ওকে দূরে সরানোর চেষ্টা করতে করতে এলোপাথাড়ি চুমু খেতে লাগলো মায়ের মুখ জুড়ে ।

রৌদ্র আশ্চর্যের চরম পর্যায়ে পৌঁছায় । রোশ্ কে কোল থেকে নামিয়ে একটানে ইবাদ কে সরিয়ে আনে মেঘার থেকে । ওর ছোট্ট ছোট্ট হাত দুখানি একসাথে মুঠোবন্দী করে দাঁত খিচে ধমকের সুরে বলে....

" বাপের বউকে চুমু খেতে নেই, বাপ । বড় হও, বিয়ে দিয়ে বউমা ঘরে আনবো । এখন, আমার বউয়ের কাছে ঘেঁষবে না একদম ।

বলেই পিছিয়ে এসে মেঘার কাঁধ জড়িয়ে নিলো আবার । রমনী ওদের কান্ড দেখছিলো আশ্চর্য হয়ে । বললো মাথা নাড়িয়ে....

" আপনারা বাপ ছেলে দুটোই পাগল ।

তোয়াক্কা করলো না রৌদ্র । আর না বিলম্ব করলো ।

এ বেলায় রমনীর ঠোঁটের ডান কোণে শক্ত করে ঠোঁট বসালো । সরে আসার আগেই গলা তুলে তী‌ব্র চিৎকার করে উঠলো ইবাদ....

" আআআআআআআ.....ব্যাদ ম্যান.....

আমাল মাম্মা কে চালোওওওও....

চিৎকারে ঘাবড়ে যায় রৌদ্র ।

দ্রুত ছিটকে পিছিয়ে আসে । মেঘা নিজেও ভীত চকিত হয়ে পড়ে । ইবাদ চিৎকার করেই থামলো না । কান্না আটকে উঠে দাঁড়িয়ে তেড়ে গেলো । দৈবাৎ খামচে মুঠোতে চেপে ধরলো রৌদ্রের মাথার চুলগুলি ।

দ্বিতীয় বার ভ্যাবাচ্যাকা খায় মেঘা আর রৌদ্র । ছেলেকে সরানোর জন্য দ্রুত ওকে টেনে ধরে হতচেতন রমনী । ততক্ষণে কেঁদে উঠেছে ইবাদ । মাকে অন্য কেউ চুমু দেবে, এটা কিছুতেই সহ্য হয় নি তার ।

ইবাদের চিৎকার ঘর ছাপিয়ে বাইরে বেরিয়েছে । মিনিটের মাথায় ঘরে হানা দিলেন রুবিনা কাবির, পিছু পিছু তোফায়েল কাবির । একে একে বাকিরাও । সবার আগমনে ভরে উঠলো গোটা ঘর ।

ইবাদ ঝাই ধরে কান্না জুড়েছে । থামছে না আর । সবার উপস্থিতিতে থতমত খায় মেঘা । দ্রুত ছেলেকে কোলে নিয়ে নেমে দাঁড়ায় । হকচকিয়ে শুধোন রুবিনা কাবির......

" মেঘা, কি হয়েছে ? ও এভাবে কেঁদে উঠলো কেনো ?

কি উত্তর দেবে বুঝতে পারে না রমনী । ঢোক গেলে কেবল । শুভ্র এগিয়ে গিয়ে ইবাদ কে টেনে নেয় কোলে । আলগোছে ঝাঁকিয়ে জানতে চায় নরম গলায়.....

" কি হয়েছে বাবা, কাঁদছো কেনো ? কে কি বলেছে তোমায় ?

ইবাদ কান্না করতে করতে রৌদ্রের দিকে তাকায় ।

গোটা বাড়ির সবার সামনে ফিকড়ে ফিকড়ে আওড়ায় ওর দিকে আঙুল তাক করে.....

" উনি আমাল মাম্মা কে তুমু কেয়েতে !

সত্য উত্তরে অকস্মাৎ ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায় শুভ্র । বাড়ির বড়রা উপস্থিত ‌। হতভম্ব হলেন তারা । ঝট করে তাকালেন রৌদ্রের দিকে । বেপরোয়া যুবকের চুল গুলি উশকো খুশকো । হা বনে ছেলেকেই দেখছে সে । কি জোচ্চুর ছেলেরে বাবা !

রৌদ্রের এমন হতবুদ্ধতা দেখে খুক খুক করে কেশে ওঠে শুভ্র । ঠোঁট চেপে হাসি সংবরণ করে । বাকিরা এখনো অপ্রস্তুত । মেঘা পড়েছে চরম কুন্ঠায় ‌। ছোট বাচ্চা, সবাই জানে মিথ্যে বলবে না সে । ইশশ্, কি লজ্জা বড়দের সামনে ! সবাই কি ভাবছে কে জানে ।

মেঘা আড়ষ্ট হলেও রৌদ্রের মাঝে বিন্দুমাত্র ইতস্ততা নেই । ছেলের কথাটাকে টেনে নিয়ে সে ঝেড়ে উঠলো...

" আর তুমি যে আমার বউকে চুমু খেলে, তার বেলা ? বাপের বউকে চুমু খেয়ে বাপের হৃদয়ে ফুটো করতে লজ্জা করে না ?

আরো বেশি তাজ্জব বনে গেলেন সকলে ।

হা বনে হতবাক হয়ে তাকালেন রৌদ্রের দিকে । সে ছেলে নিজের ছেলের পানে তাকিয়ে ফোঁস ফোঁস করে করছে । যেনো জ্বলছে অনলে ।

সবটা আন্দাজ করা মাত্রই এ বেলায় শব্দ করে হেসে ওঠে আদ্র । ওর হাসিতে সবাই ওর দিকে তাকাতেই ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে মুখ চেপে ধরে । রৌদ্র বেশ সিরিয়াস হয়ে তপ্ত গলায় বললো রুবিনা কাবিরের উদ্দেশ্যে....

" মম, তোমার এই নাতিকে সামলাও । গত সাত মিনিটে ও আমার বউকে ঊনত্রিশ টা চুমু খেয়েছে । দিস ইজ নট

ফেয়ার ! আমার কিন্তু মোটেও ভালো লাগে না এসব...

এহেন কথায় পাল্টা ঝেড়ে ওঠে শুভ্র....

" আরে ভাই,, ও বাচ্চা । ছেলে ও তোর !

" তাতে কি ? আমি আমার বউকে মাত্র দুটো চুমু খে.....

কথা শেষ হওয়ার আগেই গলা খাঁকারি দিয়ে ধমকে ওঠে আদ্র....

" রুডি,, শাট আপ । বড়রা আছেন এখানে ! মুখের লাগাম কি চুমুর সাথে গিলে নিয়েছিস ?

একে একে ঝটকা খেয়ে এ যাত্রায় ওর দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকালেন সবাই । মুখ ফুসকে কি বলে ফেলেছে , ঠিক খেয়াল করতে পারলো না আদ্র । সবার দৃষ্টি নিজের দিকে দেখে থতমত খেলো । মাড়ি খিচে ধমকে উঠলো শুভ্র....

" আর তুই তোর কমন সেন্স কি পানির সাথে গিলে নিয়েছিস ? স্টুপিড কোথাকার....

বড়রা আর থামলেন না । মাথা নেড়ে বেরিয়ে গেলেন একে একে । আদ্র বুঝতে পারে না, কি এমন বললো সে ?

মেঘা চিবুক নত করে চোখ চুরিয়ে দাঁড়িয়ে আছে । শুভ্র ওকে বললো হাঁফ ছেড়ে......

" আমি ইবাদ কে নিয়ে যাচ্ছি,,, আমাদের সাথে থাকবে ও ।

" ওকে সামলাতে পারবে না ভাইয়া ! জ্বালাতন করবে ! রেখে যাও !

" রেখে গেলে তোদের ডিস্টার্ব করবে । নিয়ে যাচ্ছি আমি ওকে !

আহম্মক বনে চোখ তুললো মেঘা । কি আশ্চর্য ! সবাই খোঁচাচ্ছে ?

শুভ্র ঠোঁট টিপে হাসি চেপে বেরিয়ে যায় ঘর থেকে । সব শেষে শিশির আদ্র কে টেনে বের করলো । যাওয়ার আগে চাপিয়ে দিলো দরজা ।

সবাই বেরিয়ে যেতেই ওষ্ঠ উল্টায় মেঘা । পা দাপিয়ে তড়াক করে চায় রৌদ্রের দিকে । তেড়ে এসে লোকটার কলার টেনে ধরে.....

" ইউ রাইনো মুখো,,, আপনার জন্য সবসময় লজ্জায় পড়তে হয় আমায় । নির্লজ্জ, বেহায়া, অসভ্য কোথাকার, আই হেইট ইউ ।

গা দুলিয়ে হেসে ওঠে রৌদ্র । মেয়েটাকে বুকের সাথে চেপে ধরে বলে দাঁত খিচে.......

" বাট আই লাভ ইউ সভ্য মেয়ে ।

রোশ্ পিটপিট করে চেয়ে আছে । সে ডাকলো টান দিয়ে......

" মাম্মা......

ফিরে চায় দু'জনেই । স্ত্রীর সাথে সাথে মেয়েকেও বুকে টেনে নেয় বেপরোয়া যুবক । দু'জনের কপালে চুমু এঁকে বলে ঠান্ডা গলায়.....

" আই লাভ ইউ সুইটহার্ট । ঐ দুষ্টু ছেলেটাকেও লাভ ইউ । আর আমার এই মিষ্টি মেয়ে টাকেও লাভ ইউ ।

প্রিন্সেস,,, তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে যাবে,, ওকে ! মাম্মা পাপ্পা কে ডিস্টার্ব করবে না । ঘুমাও সোনা....

মেঘা মাথা তুলে চাইতেই ফিক করে হাসে রৌদ্র ।

#চলবে......

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৯৪তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন