ফন্ট সাইজ:
থিম:
চোখের আড়ালে ভালোবাসা

পর্ব 5

লেখক: মেহেজাবিন আভা

পর্ব — ০৫

----------

সকালবেলা স্কুলের মাঠটা বরাবরের মতোই কোলাহলে ভরা। কেউ বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করছে, কেউ ক্লাসের পড়া শেষ করার চেষ্টা করছে, আবার কেউ পরীক্ষার ভয়ে শেষ মুহূর্তে বই নিয়ে বসে আছে।

কিন্তু এই চেনা পরিবেশের মাঝেও একজনের দিনগুলো যেন একেবারেই বদলে গেছে।

আরিয়ান!

যে ছেলেটা সবসময় বন্ধুদের সঙ্গে হাসি-ঠাট্টায় মেতে থাকত, ক্লাসে দুষ্টুমি করত, সুযোগ পেলেই আভাকে বিরক্ত করত—সেই ছেলেটাই গত এক সপ্তাহ ধরে একেবারে চুপচাপ।

না আছে আগের মতো হাসি, না আছে কারও সঙ্গে দুষ্টুমি। এমনকি বন্ধুরা কথা বলতে এলেও সে দু-একটা কথার বেশি বলে না।

কারণ?

আভা এক সপ্তাহ ধরে স্কুলে আসছে না!

প্রথম দিন আরিয়ান ভেবেছিল, হয়তো আভার শরীর একটু খারাপ। পরের দিনও যখন আভা এল না, তখন সে একটু চিন্তিত হয়েছিল। কিন্তু দিন যত গড়িয়েছে, তার চিন্তাও তত বেড়েছে।

একসময় চিন্তাটা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, এখন ক্লাসে বসেও তার মন টেকে না।

স্যার বোর্ডে কী লিখছেন, কোন পড়া বুঝাচ্ছেন—কিছুই যেন তার মাথায় ঢুকছে না।

প্রতিদিন স্কুলে এসে প্রথমেই সে ক্লাসের দরজার দিকে তাকায়। ভাবে, এই বুঝি আভা তার চিরচেনা হাসিটা নিয়ে ক্লাসে ঢুকবে!

কিন্তু না।

প্রতিদিনই তাকে হতাশ হতে হয়।

আরিয়ানের কাছে এই একটা সপ্তাহের প্রতিটা দিন যেন একেকটা বছরের মতো দীর্ঘ মনে হয়েছে।

একদিন টিফিনের সময় আরিয়ান আর চুপ থাকতে পারল না। সে সোজা চলে গেল ইসরাত, তিথি, তানু আর নাইমার কাছে।

আরিয়ান: আচ্ছা, তোরা কেউ জানিস আভার কী হয়েছে?

ইসরাত: কেন? কী হয়েছে আবার?

আরিয়ান: আরে, এক সপ্তাহ ধরে স্কুলে আসছে না! তোরা ওর বান্ধবী, তোরা জানিস না?

তিথি: আমরাও তো জানি না রে! আমরাও কতবার ওর কথা ভেবেছি।

তানু: ফোনেও ঠিকমতো যোগাযোগ করতে পারিনি। ওর খবর জানার চেষ্টা করছি।

নাইমা: তুই এত চিন্তা করছিস কেন? কী হয়েছে তোর?

আরিয়ান একটু থমকে গেল।

আরিয়ান: আমি আবার চিন্তা করব কেন? মানে... ও স্কুলে আসছে না, তাই জিজ্ঞেস করলাম!

ইসরাত ভ্রু কুঁচকে তাকাল।

ইসরাত: ওহ্! তাই নাকি? শুধু জিজ্ঞেস করলি?

আরিয়ান: হ্যাঁ! সমস্যা কী?

তিথি: না না, কোনো সমস্যা নেই! তোর চেহারা দেখে তো মনে হচ্ছে আভা স্কুলে না, দেশ ছেড়ে চলে গেছে!

কথাটা শুনে বাকি তিনজন হেসে উঠল।

কিন্তু আরিয়ান হাসল না।

সে শুধু একবার আভার খালি বেঞ্চটার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

আরিয়ান: তোরা খবর পেলে আমাকে জানাস, কেমন?

এই বলে সে চলে গেল।

চার বান্ধবী একে অপরের মুখের দিকে তাকাল।

নাইমা: আচ্ছা, তোদের একটা কথা বলি?

তানু: বল।

নাইমা: আমার কিন্তু মনে হচ্ছে, আমাদের আরিয়ান সাহেবের মনে অন্য কোনো ব্যাপার আছে!

ইসরাত: অন্য ব্যাপার না ছাই! ব্যাপারটা তো আমাদের চোখের সামনেই ঘুরঘুর করছে!

তিথি: মানে আভা?

ইসরাত: আরে, এতদিনে বুঝলি?

চারজন আবার হেসে উঠল।

অন্যদিকে আরিয়ান তখনও জানত না, আভা কোথায় আছে, কেমন আছে। তার শুধু মনে হচ্ছিল, আভা একবার স্কুলে আসুক। অন্তত নিজের চোখে ওকে দেখুক!

একটা সপ্তাহ কেটে গেল এভাবেই।

তারপর...

সোমবার সকাল।

ক্লাসে সবাই যার যার মতো বসে আছে। আরিয়ান জানালার পাশের বেঞ্চে চুপচাপ বসে বাইরে তাকিয়ে ছিল।

হঠাৎ ক্লাসের দরজার কাছে একটা পরিচিত কণ্ঠ শোনা গেল।

আভা: আসসালামু আলাইকুম!

কণ্ঠটা শুনেই আরিয়ান যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারল না!

সে দ্রুত দরজার দিকে তাকাল।

আভা!

হ্যাঁ, আভাই তো!

সেই চেনা মুখ, সেই মিষ্টি হাসি, সেই পরিচিত চোখ!

এক সপ্তাহ পর আভাকে দেখে আরিয়ানের বুকের ভেতর জমে থাকা সব দুশ্চিন্তা যেন এক নিমেষে উধাও হয়ে গেল।

তার ঠোঁটে অজান্তেই হাসি ফুটে উঠল।

মনে হচ্ছিল, এতক্ষণে সে আবার প্রাণ ফিরে পেয়েছে!

কিন্তু আভা ক্লাসে ঢুকেই শান্তিতে বসার সুযোগ পেল না।

কারণ তার চার বান্ধবী যেন এতক্ষণ ধরে জমিয়ে রাখা সব প্রশ্ন নিয়ে প্রস্তুত হয়ে বসে ছিল!

ইসরাত: এই আভা! তুই কোথায় ছিলি এতদিন?

তিথি: হ্যাঁ রে! আমাদের কথা একবারও মনে পড়েনি তোর?

নাইমা কিছু না বলেই আভাকে জড়িয়ে ধরল।

নাইমা: জানিস, তোকে কত মিস করেছি? তুই জানিস না, তুই না থাকলে আমাদের একদম ভালো লাগে না!

তানু তো রীতিমতো বকাঝকা শুরু করে দিল।

তানু: তোর সাহস তো কম না! একটা সপ্তাহ স্কুলে আসবি না, আর আমাদের কোনো খবরও দিবি না? আমরা কত চিন্তা করেছি জানিস? তুই কি একবারও ভাবিসনি, আমরা তোকে নিয়ে চিন্তা করতে পারি?

আভা হতভম্ব হয়ে চারজনের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।

আভা: আরে বাবা! তোরা আমাকে কিছু বলার সুযোগ দিবি তো? একসঙ্গে এত প্রশ্ন করলে আমি কোনটার উত্তর আগে দেব?

ইসরাত: আগে বল, কোথায় ছিলি?

আভা: আমি অসুস্থ ছিলাম রে!

চারজন একসঙ্গে বলে উঠল—

চারজন: কীইইই!

আভা হেসে ফেলল।

আভা: হ্যাঁ রে! জ্বর হয়েছিল। শরীর এত খারাপ ছিল যে বিছানা থেকে উঠতেও কষ্ট হচ্ছিল। তাই স্কুলে আসতে পারিনি।

তিথির মুখটা সঙ্গে সঙ্গে মলিন হয়ে গেল।

তিথি: আরে, তুই আগে বলবি না? তোর শরীর খারাপ ছিল আর আমরা তোকে বকছি!

নাইমা আবার আভাকে জড়িয়ে ধরল।

নাইমা: এখন ঠিক আছিস তো? আর শরীর খারাপ করছে না তো?

আভা: না রে, এখন অনেকটাই ভালো আছি। তোদের সঙ্গে দেখা হওয়ার পর তো আরও ভালো লাগছে!

তানু: আচ্ছা, ঠিক আছে। কিন্তু এরপর থেকে এমন হলে খবর দিবি। বুঝেছিস?

আভা: জি ম্যাডাম!

সবাই হেসে উঠল।

কিন্তু এই পুরো সময়টাতে একজন একদম চুপচাপ বসে ছিল।

আরিয়ান!

সে এতক্ষণ ধরে আভার দিকে তাকিয়ে সব শুনছিল। তার ভেতরে তখন এক অদ্ভুত স্বস্তি কাজ করছে। মেয়েটা অসুস্থ ছিল, তাই আসেনি। অন্তত এখন সে জানে আভা কোথায় ছিল, কেন আসেনি।

কিন্তু মনের ভেতর জমে থাকা এত দিনের কথাগুলো কীভাবে বলবে, সেটাই বুঝতে পারছিল না।

সে মনে মনে কতবার ভেবেছে, আভাকে দেখলে প্রথমেই জিজ্ঞেস করবে, 'কোথায় ছিলে তুমি? জানো, কত চিন্তা করেছি?'

কিন্তু এখন আভাকে সামনে দেখে সব কথা যেন মাথা থেকে উধাও!

শুধু ইচ্ছে করছে, ওর দিকে তাকিয়ে হাসতে!

আরিয়ান হঠাৎ উঠে দাঁড়াল।

তারপর...

সে দুই হাত তুলে একবার ঘুরে দাঁড়াল!

এরপর আরেকবার!

তারপর এক পা সামনে, এক পা পেছনে দিয়ে এমন অদ্ভুত ভঙ্গিতে নাচতে শুরু করল, যেন আজ তার জীবনের সবচেয়ে আনন্দের দিন!

আভা তো অবাক!

ইসরাতের মুখ হাঁ হয়ে গেল।

তিথি চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে।

নাইমা আভার হাত ছেড়ে দিয়ে আরিয়ানের দিকে তাকাল।

আর তানু নিজের চোখকে বিশ্বাসই করতে পারছে না!

যে ছেলে গত এক সপ্তাহ ধরে কারও সঙ্গে ঠিকমতো কথা বলেনি, হাসেনি, ক্লাসে চুপচাপ বসে থেকেছে—সেই ছেলে আজ ক্লাসের মাঝখানে নাচছে!

তাও আবার আভা স্কুলে আসার পর!

কয়েক সেকেন্ড সবাই অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকার পর ইসরাত আর নিজেকে সামলাতে পারল না।

ইসরাত: কী ব্যাপার, এই আরিয়ান? আভু আসার সঙ্গে সঙ্গেই তোর নাচ শুরু হয়ে গেল যে!

কথাটা শুনে পুরো ক্লাস হেসে উঠল।

আরিয়ান সঙ্গে সঙ্গে নাচ থামিয়ে দিল।

আরিয়ান: আরে! আমি নাচব না? আমার ইচ্ছা হয়েছে, তাই নাচছি!

তানু: হ্যাঁ, বুঝেছি! তোর ইচ্ছা হয়েছে, আর আভা আসার পরেই হয়েছে!

তিথি: এক সপ্তাহ ধরে মুখে তালা মেরে বসে ছিল, আর আজ তো দেখি একেবারে নাচের শিল্পী!

নাইমা: আরে, কেউ থামা! আমাদের আরিয়ান সাহেব তো আজ খুশিতে পাগল হয়ে গেছেন!

আভা এবার হেসে কুটিকুটি।

আভা: কী ব্যাপার, আরিয়ান? আমি এক সপ্তাহ স্কুলে আসিনি বলে তুই এত খুশি? নাকি আমার আসাটা তোর একদম পছন্দ হয়নি?

আভা কথাটা মজা করে বললেও আরিয়ানের বুকের ভেতর যেন ধক করে উঠল।

সে দ্রুত মাথা নাড়ল।

আরিয়ান: আরে না না! তুই আসিসনি বলে... মানে, তুই এসেছিস বলে... মানে...

সে নিজেই নিজের কথায় আটকে গেল।

ইসরাত: ও মাগো! কথাও গুছিয়ে বলতে পারছে না!

তানু: আরিয়ান, পানি খাবি? নাকি আভার জন্য এক গ্লাস শরবত আনব?

তিথি আর নাইমা হেসে গড়িয়ে পড়ল।

আরিয়ান বিরক্তির ভান করে বলল—

আরিয়ান: তোরা থামবি? সকাল সকাল মাথা খাস না!

ইসরাত: আমরা তো কিছুই বলিনি! তুই নিজেই তো সব বলে দিচ্ছিস!

আভা হেসে বলল—

আভা: আচ্ছা, তোরা ওকে আর বিরক্ত করিস না। বেচারা এমনিতেই পাগল হয়ে গেছে!

এই বলে আভা নিজের বেঞ্চের দিকে এগিয়ে গেল।

কিন্তু বসার আগে একবার আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হাসল।

আভা: আর হ্যাঁ, এত নাচানাচি করিস না। স্যার এসে দেখলে কিন্তু খবর আছে!

আভা নিজের জায়গায় বসে পড়ল।

আরিয়ান কয়েক মুহূর্ত ওর দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর নিজের বেঞ্চে বসে মুচকি হাসল।

মনের ভেতর শুধু একটা কথাই বারবার বাজতে লাগল—

'এক সপ্তাহ পর আজ আবার আমার পৃথিবীটা আগের মতো লাগছে।'

সে জানত না, এই অনুভূতির নাম কী।

জানত না, আভাকে নিয়ে তার এত চিন্তা কেন হয়।

শুধু জানত, আভা না থাকলে তার দিনগুলো কেমন ফাঁকা হয়ে যায়, আর আভা ফিরে এলে চারপাশটা কেমন আলোয় ভরে ওঠে!

ক্লাস শুরু হলো।

স্যার পড়াতে শুরু করলেন।

আভা মনোযোগ দিয়ে পড়া লিখছে। মাঝে মাঝে বান্ধবীদের সঙ্গে ফিসফিস করে কথা বলছে।

আরিয়ানও বই খুলে বসেছে।

কিন্তু তার চোখ বারবার চলে যাচ্ছে আভার দিকে।

হঠাৎ আভা পেছন ফিরে তাকাল।

দুজনের চোখাচোখি হলো।

আভা ভ্রু উঁচু করে ইশারা করল—

'কী হয়েছে?'

আরিয়ান তাড়াতাড়ি বইয়ের দিকে তাকাল।

আভা মুখ টিপে হাসল।

আরিয়ানও অজান্তেই হেসে ফেলল।

দূর থেকে ইসরাত সব দেখে ফেলেছে!

সে তানুর কানে কানে বলল—

ইসরাত: এই তানু, একটা কথা বলি?

তানু: আবার কী?

ইসরাত: আমাদের গল্পে কিন্তু নতুন একটা অধ্যায় শুরু হতে যাচ্ছে!

তানু: কোন অধ্যায়?

ইসরাত মুচকি হেসে আভা আরিয়ানের দিকে তাকাল।

ইসরাত: চোখের আড়ালে যে ভালোবাসা, সেটা একদিন চোখের সামনেও চলে আসবে!

তানু হাসতে হাসতে বলল—

তানু: আগে আভাকে বুঝতে দে, তার বন্ধুর মাথায় কী চলছে!

দুজনেই হেসে উঠল।

কিন্তু তারা কেউই জানত না, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই বন্ধুত্বের আড়ালে জমে উঠবে কত না বলা কথা, কত অভিমান, আর কত অজানা অনুভূতি!

আর আরিয়ান?

সে তখনও চুপচাপ আভার দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলছিল—

'আর কখনো এভাবে হারিয়ে যাস না, আভা। তোকে ছাড়া এই একটা সপ্তাহ যে কতটা দীর্ঘ ছিল, সেটা তোকে বোঝাতে পারব না!'

চলবে...

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 5 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন