ফন্ট সাইজ:
থিম:
চোখের আড়ালে ভালোবাসা

পর্ব 10

লেখক: মেহেজাবিন আভা

১০ম পর্ব

_________

সকালের সূর্য প্রতিদিনের মতোই জানালার পর্দা ভেদ করে আভার ঘরে আলো ছড়িয়ে দিচ্ছে। বাইরে পাখির ডাক, রাস্তার মানুষের ব্যস্ততা, স্কুলে যাওয়ার জন্য ছোটাছুটি—সবকিছুই আগের মতো চলছে। শুধু বদলে গেছে আভার প্রতিদিনের জীবন।

যে মেয়েটা আগে সকালে ঘুম থেকে উঠেই বান্ধবীদের সঙ্গে কথা বলত, স্কুলে যাওয়ার জন্য তাড়াহুড়ো করত, ক্লাসে বন্ধুদের সঙ্গে হাসিঠাট্টা করত, সেই আভাই এখন দিনের বেশির ভাগ সময় ঘরের মধ্যে কাটাচ্ছে।

স্কুলে যাওয়ার কথা মনে হলেই তার মনটা খারাপ হয়ে যায়।

গত কয়েক দিনের ঘটনাগুলো সে ভুলে যেতে চায়। কিন্তু যতবারই ভুলতে চেষ্টা করে, ততবারই মনে পড়ে যায় সবার সামনে ঘটে যাওয়া সেই অপ্রীতিকর মুহূর্তটা।

বিশেষ করে আরিয়ানের কথা মনে পড়লে তার অভিমানটা আরও বেড়ে যায়।

আরিয়ান তার খুব ভালো বন্ধু। কিন্তু সেই বন্ধুটাই সেদিন তার কথা না শুনে নিজের মতো করে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। আভা জানে, আরিয়ান হয়তো তাকে সাহায্য করতে চেয়েছিল। কিন্তু সাহায্য করতে গিয়ে সে একবারও ভাবেনি, আভা আসলে কী চায়।

এই কথাটাই আভাকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দিয়েছিল।

সেদিনের পর থেকে আভা ঠিক করে নিয়েছে, কিছুদিন সে স্কুলে যাবে না। কারও সঙ্গে কথা বলবে না। নিজেকে একটু সময় দেবে।

কিন্তু সে বুঝতে পারেনি, তার এই নীরবতা অন্য একজনের দিনগুলোকে এতটা বদলে দেবে।

### সকালে আম্মুর সঙ্গে কথা

সকাল আটটার দিকে মাহমুদা বেগম মেয়ের ঘরে এলেন।

দরজা খুলে দেখলেন, আভা বিছানায় বসে ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আছে। তার সামনে স্কুলের বইগুলো রাখা থাকলেও সেগুলো খোলার কোনো আগ্রহ নেই।

মাহমুদা বেগম মেয়ের কাছে গিয়ে বসলেন।

— আভা, মা!

আভা মুখ তুলে তাকাল।

— জি, আম্মু?

— আজও স্কুলে যাবি না?

আভা মাথা নিচু করে বলল,

— না, আম্মু।

— কিন্তু মা, এভাবে আর কত দিন? স্কুলে না গেলে পড়াশোনার ক্ষতি হবে। তোর পরীক্ষা সামনে চলে আসবে, তখন কী করবি?

আভা চুপ করে রইল।

মাহমুদা বেগম আবার বললেন,

— দেখ, তুই যদি কোনো কারণে কষ্ট পেয়ে থাকিস, আমাকে বলতে পারিস। আমি তোকে জোর করব না। কিন্তু এভাবে নিজেকে সবার কাছ থেকে দূরে সরিয়ে রাখলে তোর নিজেরই খারাপ লাগবে।

আভা মায়ের দিকে তাকিয়ে মৃদু গলায় বলল,

— আম্মু, আমি জানি। কিন্তু এখন স্কুলে যেতে ইচ্ছে করছে না। একটু সময় দাও। সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে।

মাহমুদা বেগম মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।

— আচ্ছা, মা। তুই যত দিন সময় চাস, নে। তবে একটা কথা মনে রাখিস, কোনো সমস্যার কারণে নিজের স্বাভাবিক জীবনটা থামিয়ে রাখিস না। যা হয়েছে, সেটা নিয়ে একসময় তোকে সামনে এগোতেই হবে।

আভা কোনো উত্তর দিল না।

মাহমুদা বেগম উঠে দাঁড়ালেন।

— নাশতা নিচে রাখা আছে। ক্ষুধা লাগলে খেয়ে নিস। আর দুপুরে ঘুমিয়ে থাকিস না, ঠিক আছে?

— আচ্ছা, আম্মু।

মা ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর আভা আবার ফোনের দিকে তাকাল।

স্ক্রিনে তার বান্ধবীদের পাঠানো কয়েকটি মেসেজ দেখা যাচ্ছে।

ইসরাত লিখেছে, ‘আভা, তুই কবে স্কুলে আসবি? তোকে ছাড়া ভালো লাগছে না।’

তিথি লিখেছে, ‘তুই ঠিক আছিস তো? অন্তত একটা মেসেজ দে।’

তানু লিখেছে, ‘এই মেয়ে, রাগ করে থাকিস না। তোর সঙ্গে ঝগড়া করার মানুষটাও যে এখন তোকে মিস করছে!’

মেসেজটা পড়ে আভার ঠোঁটের কোণে সামান্য হাসি ফুটে উঠল।

তানু এমনই। মন খারাপের মধ্যেও হাসানোর একটা উপায় খুঁজে বের করে।

কিন্তু হাসিটা বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না।

আভা মেসেজগুলোর উত্তর না দিয়েই ফোনটা পাশে রেখে দিল।

সে জানত, বন্ধুরা তার জন্য চিন্তা করছে। কিন্তু এই মুহূর্তে তাদের সঙ্গে কথা বলার মতো মানসিক অবস্থা তার ছিল না।

### অন্যদিকে স্কুলের গেটে

সকাল সাড়ে আটটা।

স্কুলের গেট দিয়ে একের পর এক শিক্ষার্থী প্রবেশ করছে। কেউ বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করছে, কেউ আবার দৌড়ে ক্লাসে ঢুকছে।

গেটের পাশে দাঁড়িয়ে আছে আরিয়ান।

তার পাশে ইরফান দাঁড়িয়ে স্কুলের ভেতরের ব্যস্ততা দেখছিল।

ইরফান কিছুক্ষণ পর আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে বলল,

— কী রে, ক্লাসে যাবি না?

আরিয়ান রাস্তার দিকে তাকিয়েই বলল,

— যাচ্ছি।

— কখন থেকে যাচ্ছিস? দশ মিনিট ধরে একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছিস।

আরিয়ান এবার বন্ধুর দিকে তাকাল।

— তুই যা। আমি আসছি।

ইরফান কিছুটা বুঝতে পেরে মৃদু হেসে বলল,

— আভার জন্য অপেক্ষা করছিস?

আরিয়ান এবার আর অস্বীকার করল না।

— হুম।

— কিন্তু তুই তো জানিস, ও কয়েক দিন ধরে স্কুলে আসছে না।

— জানি।

— তাহলে প্রতিদিন এভাবে গেটের দিকে তাকিয়ে থাকিস কেন?

আরিয়ান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর নিচু গলায় বলল,

— জানি না, ইরফান। প্রতিদিন মনে হয়, আজ হয়তো আসবে। হয়তো বান্ধবীদের সঙ্গে হাসতে হাসতে গেট দিয়ে ঢুকবে। আমাকে দেখেও হয়তো কথা বলবে না। তবু অন্তত একবার দেখতে তো পাব।

ইরফান বন্ধুর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।

আরিয়ান আবার বলল,

— আগে কখনো বুঝিনি, কারও সঙ্গে প্রতিদিন দেখা হওয়াটাও একটা অভ্যাস হয়ে যেতে পারে। এখন ওকে না দেখে স্কুলে ঢুকতে গেলেই কেমন যেন লাগে।

ইরফান এবার একটু গম্ভীর হয়ে বলল,

— তুই ওকে সত্যিই অনেক মিস করছিস, তাই না?

আরিয়ান মৃদু হেসে বলল,

— খুব।

— তাহলে একটা কথা মনে রাখিস। ওকে মিস করছিস বলে ওর ওপর নিজের ইচ্ছা চাপিয়ে দিস না। ও যদি এখন একা থাকতে চায়, তাহলে ওকে সেই সময়টা দে।

আরিয়ান মাথা নাড়ল।

— আমি তো সেটাই করছি। ওকে আর মেসেজও দিচ্ছি না। শুধু মাঝে মাঝে মনে হয়, ও ঠিক আছে কি না, সেটা যদি জানতে পারতাম!

ইরফান বন্ধুর কাঁধে হাত রাখল।

— ওর বান্ধবীরা তো ওর সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছে। ওদের কাছ থেকে খবর নিতে পারিস। তবে আভা যদি নিজে থেকে কথা বলতে না চায়, তাহলে জোর করিস না।

আরিয়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

— আচ্ছা, চল।

দুজন ক্লাসের দিকে হাঁটতে শুরু করল।

কিন্তু ক্লাসে যাওয়ার আগে আরিয়ান আরেকবার রাস্তার দিকে তাকাল।

না, আভা আসেনি।

প্রতিদিনের মতো আজও তার অপেক্ষা অপূর্ণ থেকে গেল।

### ক্লাসরুমে আভার শূন্যতা

ক্লাসে ঢুকে আরিয়ান নিজের জায়গায় বসে পড়ল।

সামনের বেঞ্চে আভার জায়গাটা খালি।

আগে এই জায়গাটায় বসেই আভা ইসরাতের সঙ্গে গল্প করত। কখনো কোনো বিষয় বুঝতে না পারলে আরিয়ানকে ডাকত। আবার কখনো আরিয়ান বেশি দুষ্টুমি করলে তাকে বকাঝকা করত।

আজ বেঞ্চটা খালি পড়ে আছে।

আরিয়ান একবার সেদিকে তাকিয়ে বই খুলল।

কিন্তু বইয়ের পাতায় চোখ রেখেও তার মন পড়াশোনায় বসছিল না।

কিছুক্ষণ পর স্যার ক্লাসে এসে উপস্থিত হলেন। সবাই উঠে দাঁড়াল।

ক্লাস শুরু হলো।

স্যার পড়াতে পড়াতে একসময় আভার নাম ধরে একটি প্রশ্ন করলেন। তারপর নিজেই থেমে গেলেন।

— আভা আজও আসেনি?

ইসরাত উঠে দাঁড়িয়ে বলল,

— জি, স্যার।

— ওর শরীর খারাপ নাকি?

ইসরাত একটু ইতস্তত করে বলল,

— স্যার, ও কয়েক দিন ধরে স্কুলে আসছে না। বাসায় আছে।

স্যার চিন্তিত মুখে বললেন,

— আচ্ছা। ওর সঙ্গে যোগাযোগ করে দেখো, যেন দ্রুত স্কুলে ফিরে আসে। পড়াশোনার ক্ষতি করা ঠিক হবে না।

— জি, স্যার।

ইসরাত বসে পড়ল।

আরিয়ান চুপচাপ সব শুনছিল।

স্যারের কথায় তার মনে আরও দুশ্চিন্তা তৈরি হলো। আভা যদি অনেক দিন স্কুলে না আসে, তাহলে তার পড়াশোনার ক্ষতি হবে। অথচ সে নিজে গিয়ে আভাকে কিছু বলতেও পারছে না।

ক্লাস শেষ হওয়ার পর আরিয়ান ইসরাতের কাছে গেল।

— ইসরাত, একটা কথা জিজ্ঞেস করব?

ইসরাত তার দিকে তাকাল।

— বল।

— আভা কেমন আছে?

ইসরাত একটু চুপ করে থেকে বলল,

— জানি না, আরিয়ান। ও আমাদের কারও সঙ্গে ঠিকমতো কথা বলছে না।

আরিয়ানের মুখটা মলিন হয়ে গেল।

— তোরা ওর বাসায় যাসনি?

— যেতে চেয়েছিলাম। কিন্তু ওর আম্মুর সঙ্গে কথা বলে বুঝলাম, ও এখন একটু একা থাকতে চাইছে। তাই ভাবলাম, কিছুদিন সময় দিই।

আরিয়ান ধীরে বলল,

— ও কি আমার কথা কিছু বলেছে?

ইসরাত এবার সরাসরি তার চোখের দিকে তাকাল।

— না। তবে তুই একটা কথা বুঝিস, আরিয়ান। আভা সেদিন খুব কষ্ট পেয়েছিল। তুই ওকে সাহায্য করতে চেয়েছিলি, সেটা আমরা বুঝি। কিন্তু ওর কথা না শুনে ঝগড়া করাটাও ঠিক হয়নি।

আরিয়ান মাথা নিচু করল।

— আমি জানি, আমার ভুল হয়েছে।

— তাহলে এখন ওকে সময় দে। ও নিজে থেকে কথা বলতে চাইলে কথা বলিস।

আরিয়ান মৃদু গলায় বলল,

— আচ্ছা।

ইসরাত চলে গেল।

আরিয়ান কিছুক্ষণ করিডোরে দাঁড়িয়ে রইল।

তার মনে হচ্ছিল, আভা হয়তো এখন তাকে একেবারেই দেখতে চায় না।

তবু সে আশা ছাড়তে পারছিল না।

### ছুটির পর অপেক্ষা

সেদিন স্কুল ছুটি হওয়ার পর সবাই একে একে বাড়ির পথে রওনা হলো।

আরিয়ান গেটের পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। ইরফান তার কাছে এসে বলল,

— চল, বাড়ি যাই।

আরিয়ান বলল,

— তুই যা। আমি একটু পরে আসছি।

ইরফান ভ্রু কুঁচকে বলল,

— আবার কী?

— কিছু না।

ইরফান এবার একটু বিরক্ত হয়ে বলল,

— আরিয়ান, তুই জানিস আভা আজ আসবে না। তারপরও প্রতিদিন স্কুল ছুটির পর এখানে দাঁড়িয়ে থাকিস কেন?

আরিয়ান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

— জানি না। হয়তো ওর সঙ্গে দেখা হওয়ার একটা আশা কাজ করে।

— কিন্তু তুই তো ওর বাসায় গিয়ে দেখা করতে পারিস।

আরিয়ান সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়ল।

— না। ও যদি আমাকে দেখতে না চায়, তাহলে আমি কেন ওর বাড়িতে গিয়ে বিরক্ত করব? ওর নিজের একটা জায়গা দরকার। আমি শুধু চাই, ও ভালো থাকুক।

ইরফান বন্ধুর দিকে তাকিয়ে রইল।

আরিয়ান আবার বলল,

— তুই জানিস, আভা আগে কত কথা বলত? ছোট ছোট বিষয় নিয়েও কত হাসাহাসি করত! এখন ভাবতেই খারাপ লাগে, ও হয়তো একা ঘরে বসে আছে। কারও সঙ্গে কথা বলছে না।

ইরফান শান্ত গলায় বলল,

— সবকিছু একদিনে ঠিক হয় না। তুই নিজের ভুলটা বুঝেছিস, এটাই গুরুত্বপূর্ণ। এখন ওকে নিজের মতো করে সিদ্ধান্ত নিতে দে।

আরিয়ান মাথা নাড়ল।

কিছুক্ষণ পর সে বন্ধুর সঙ্গে বাড়ির পথে হাঁটতে শুরু করল।

কিন্তু যাওয়ার আগে স্কুলের গেটের দিকে আরেকবার তাকাল।

মনে মনে শুধু একটাই কথা বলল,

‘আভা, তুই কবে আবার আসবি?’

### বিকেলের নিস্তব্ধতা

এভাবেই আরও কয়েকটা দিন কেটে গেল।

আভা স্কুলে গেল না।

সকালে ঘুম থেকে উঠে নাশতা করত, তারপর নিজের ঘরে বসে বই পড়ার চেষ্টা করত। কখনো গান শুনত, কখনো জানালার পাশে বসে বাইরে তাকিয়ে থাকত।

দুপুরে মাহমুদা বেগম তাকে খেতে ডাকতেন। সন্ধ্যায় ছাদে যেতে চাইলে যেতে দিতেন। কিন্তু মেয়ের মুখে আগের মতো হাসি দেখতে না পেয়ে তাঁর মনটা সবসময় খারাপ থাকত।

একদিন দুপুরে মাহমুদা বেগম মেয়ের ঘরে এসে দেখলেন, আভা বিছানায় শুয়ে আছে।

— মা, একটু বাইরে যাবি? সারাদিন ঘরে থাকলে মন আরও খারাপ হবে।

আভা চোখ খুলে বলল,

— কোথায় যাব, আম্মু?

— আমার সঙ্গে একটু বাজারে চল। তোর পছন্দের কিছু কিনে দেব।

আভা মাথা নাড়ল।

— আজ না, আম্মু। অন্যদিন যাব।

মাহমুদা বেগম মেয়ের কপালে হাত রাখলেন।

— আচ্ছা। তবে বিকেলে একটু ছাদে যাস। খোলা বাতাসে থাকলে ভালো লাগবে।

আভা মৃদু হেসে বলল,

— যাব।

মা ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।

আভা আবার চোখ বন্ধ করল।

সে বুঝতে পারছিল, আম্মু তাকে নিয়ে খুব চিন্তা করছেন। কিন্তু নিজের মনের মধ্যে জমে থাকা অভিমানটা সে কীভাবে বোঝাবে?

সে নিজেও তো চায়, সবকিছু আগের মতো হয়ে যাক।

বন্ধুদের সঙ্গে হাসতে চায়।

স্কুলে যেতে চায়।

ক্লাসে বসে পড়াশোনা করতে চায়।

কিন্তু আরিয়ানের মুখটা মনে পড়লেই সেদিনের ঘটনা চোখের সামনে ভেসে ওঠে।

তখন আর কিছুই ভালো লাগে না।

### এক বিকেলে ছাদে আভা

সেদিন বিকেলটা ছিল অন্য দিনের চেয়ে একটু আলাদা।

সারাদিন আকাশ মেঘলা ছিল। বিকেলের দিকে মেঘ সরে গিয়ে আকাশে নরম রোদ ছড়িয়ে পড়েছে। বাতাসে হালকা শীতলতা।

আভা ঘরে বসে থাকতে থাকতে বিরক্ত হয়ে গেল।

ফোনটা বিছানার ওপর রেখে সে ধীরে ধীরে ছাদের দিকে চলে গেল।

সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতেই বাতাস এসে তার চুলগুলো এলোমেলো করে দিল।

আভা ছাদের এক পাশে গিয়ে দাঁড়াল।

দূরে গাছের মাথার ওপর সূর্যের শেষ আলো পড়ছে। রাস্তা দিয়ে মানুষজন বাড়ি ফিরছে। কোথাও কয়েকজন বাচ্চা খেলছে, আবার কোথাও দোকানের সামনে মানুষজন দাঁড়িয়ে গল্প করছে।

আভা রেলিংয়ের কাছে গিয়ে দাঁড়াল।

কিছুক্ষণ আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকার পর হঠাৎ তার চোখ নিচের রাস্তার দিকে পড়ল।

আর ঠিক তখনই সে থমকে গেল।

রাস্তার একটু দূরে একটি ছেলে দাঁড়িয়ে আছে।

পরিচিত মুখ।

পরিচিত চেহারা।

আভা ভালোভাবে তাকাল।

ছেলেটি আর কেউ নয়, আরিয়ান।

আভা যেন নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছিল না।

সে একটু ঝুঁকে নিচের দিকে তাকাল। আরিয়ান রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল, মাঝে মাঝে বাড়িটার দিকে তাকাচ্ছিল। তার মুখে কোনো হাসি নেই। হাতে ফোন নিয়ে কিছুক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকাচ্ছে, আবার ফোনটা পকেটে রেখে চারপাশ দেখছে।

আভার বুকের ভেতরটা হঠাৎ ধক করে উঠল।

‘আরিয়ান এখানে কী করছে?’

তার প্রথম ইচ্ছা হলো, আরেকটু সামনে গিয়ে ভালোভাবে দেখবে।

কিন্তু পরমুহূর্তেই সে নিজেকে সামলে নিল।

না, নিচ থেকে যদি আরিয়ান তাকে দেখে ফেলে?

তাহলে হয়তো ডাকবে।

কথা বলতে চাইবে।

আর আভা এখনো জানে না, সে আরিয়ানের সঙ্গে কথা বলতে পারবে কি না।

তাই সে ছাদের একটু আড়ালে সরে দাঁড়াল।

কিন্তু চোখ সরাতে পারল না।

নিচে আরিয়ান তখনও দাঁড়িয়ে আছে।

### এক নজর দেখার অপেক্ষা

আসলে সেদিন স্কুল ছুটির পর আরিয়ান সরাসরি বাড়ি ফিরে যায়নি।

গত কয়েক দিন ধরে আভার কোনো খবর না পেয়ে তার মনটা অস্থির হয়ে উঠেছিল। ইসরাতের কাছ থেকেও খুব বেশি কিছু জানতে পারেনি।

তাই আজ বাড়ি ফেরার পথে সে আভার বাড়ির কাছ দিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।

তার উদ্দেশ্য আভার সঙ্গে দেখা করতে যাওয়া নয়।

সে জানত, আভা এখন কারও সঙ্গে কথা বলতে চায় না। তাই বাড়ির সামনে গিয়ে ডাকাডাকি করা বা দেখা করার জন্য চাপ দেওয়া তার একদমই উচিত হবে না।

সে শুধু দূর থেকে বাড়িটার দিকে একবার তাকাতে চেয়েছিল।

হয়তো আভাকে দেখা যাবে।

হয়তো ছাদে আসবে।

হয়তো জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকবে।

একবার দেখতে পেলেই সে বুঝতে পারবে, আভা ভালো আছে কি না।

এই সামান্য আশাটুকু নিয়েই আরিয়ান রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।

মাঝে মাঝে সে বাড়িটার ওপরের দিকে তাকাচ্ছিল।

কিন্তু কোথাও আভাকে দেখতে পাচ্ছিল না।

সে মনে মনে বলল,

‘আভা, তুই কি বাসায় আছিস? নাকি কোথাও গিয়েছিস?’

তারপর নিজের মনেই একটু হাসল।

‘আমি এখানে দাঁড়িয়ে আছি, আর তুই হয়তো জানিসই না।’

কিছুক্ষণ পর সে ফোন বের করল।

আভার নামটা স্ক্রিনে দেখা যাচ্ছে।

আরিয়ান চ্যাটটা খুলে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল।

তার খুব ইচ্ছে করছিল একটা মেসেজ পাঠাতে।

লিখতে ইচ্ছে করছিল, ‘আভা, তুই কেমন আছিস?’

কিন্তু সে লিখল না।

কারণ সে জানত, আভা যদি উত্তর না দেয়, তাহলে তার মনটা আরও খারাপ হবে। আর আভাকে বারবার মেসেজ দিয়ে বিরক্ত করাও সে চায় না।

শেষ পর্যন্ত ফোনটা পকেটে রেখে আবার বাড়িটার দিকে তাকাল।

সে জানত না, আভা ঠিক তার মাথার ওপরের ছাদেই দাঁড়িয়ে আছে।

### ছাদের আড়ালে আভা

আভা নিচে দাঁড়িয়ে থাকা আরিয়ানকে দেখছিল।

তার মনে হচ্ছিল, ছেলেটা যেন কারও জন্য অপেক্ষা করছে।

কিন্তু কার জন্য?

এই প্রশ্নের উত্তর আভা জানত।

তবু নিজের মনকে বিশ্বাস করতে চাইছিল না।

সে মনে মনে বলল,

‘হয়তো অন্য কোনো কাজে এসেছে। আমার জন্য আসবে কেন?’

কিন্তু আরিয়ান বারবার তাদের বাড়িটার দিকে তাকাচ্ছিল।

আভা এবার আরেকটু ভালোভাবে লক্ষ করল।

আরিয়ানের মুখটা আগের মতো নেই। স্কুলে সে সবসময় বন্ধুদের সঙ্গে হাসিঠাট্টা করে। তানুর সঙ্গে ঝগড়া করে, ইরফানকে নিয়ে দুষ্টুমি করে।

কিন্তু আজ তাকে খুব চুপচাপ লাগছে।

চোখেমুখে কেমন একটা ক্লান্তি।

আভার বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে উঠল।

তার মনে পড়ল, সেদিন স্কুলের গেটে আরিয়ান তাকে কতবার ডাকছিল।

‘আভা, একবার আমার কথাটা শোন।’

কিন্তু সে শোনেনি।

সেদিন আরিয়ানের মুখের দিকে তাকিয়ে তার এতটাই রাগ হয়েছিল যে সে আর কিছু ভাবতে পারেনি।

আজ নিচে দাঁড়িয়ে থাকা আরিয়ানকে দেখে তার মনে হলো, হয়তো ছেলেটা সত্যিই নিজের ভুল বুঝতে পেরেছে।

কিন্তু তাতে কি তার কষ্টটা মুছে গেছে?

না।

আভা এখনো ভুলতে পারেনি, কীভাবে সেদিন সবার সামনে পরিস্থিতিটা আরও জটিল হয়ে উঠেছিল।

সে আরিয়ানের ওপর রাগ করে আছে।

তবু তাকে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আভার মনটা কেমন নরম হয়ে আসছিল।

আভা রেলিংয়ের পাশ থেকে একটু সরে এসে ছাদের দেয়ালের আড়ালে দাঁড়াল।

সে চাইল না, আরিয়ান তাকে দেখতে পাক।

অন্তত আজ নয়।

আজ সে শুধু দূর থেকে দেখবে।

আরিয়ান যদি সত্যিই তার জন্য এসে থাকে, তাহলে সে চলে যাওয়ার আগপর্যন্ত অপেক্ষা করবে।

### আরিয়ানের চোখে একটুখানি আশা

রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে আরিয়ানের মনে হলো, হয়তো আজও আভার দেখা পাবে না।

সে একবার বাড়িটার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

— আভা, তুই যে কোথায় আছিস!

কথাটা সে এত নিচু গলায় বলল যে আশপাশের কেউ শুনতেও পেল না।

তারপর আবার নিজের মনেই বলল,

— একবার তোকে দেখতে পেলে ভালো লাগত। কথা বলার দরকার নেই। তুই আমার সঙ্গে রাগ করে থাক, তবু অন্তত বুঝতে পারতাম, তুই ভালো আছিস।

সে জানত না, আভা তার প্রতিটি নড়াচড়া ছাদের আড়াল থেকে দেখছে।

আরিয়ান এবার রাস্তার অন্য পাশে একটু হাঁটল। তারপর আবার থেমে গেল।

তার চোখ বারবার বাড়িটার দিকে চলে যাচ্ছিল।

সে প্রায় দশ মিনিট ধরে সেখানে দাঁড়িয়ে ছিল।

এই সময়ের মধ্যে অনেক মানুষ রাস্তা দিয়ে চলে গেছে। কেউ তাকে চিনতে পারেনি, কেউ তার দিকে তাকিয়েও দেখেনি।

কিন্তু আরিয়ানের কাছে সময়টা যেন অনেক দীর্ঘ হয়ে উঠেছিল।

তার মনে হচ্ছিল, একবার যদি আভার দেখা পেত!

একবার যদি দূর থেকে দেখতে পারত, আভা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছে কি না!

কিন্তু কোনো সাড়াশব্দ নেই।

ছাদের ওপরও কাউকে দেখা যাচ্ছে না।

অবশেষে আরিয়ান মাথা নিচু করে দাঁড়াল।

তার চোখেমুখে হতাশা স্পষ্ট হয়ে উঠল।

### চোখের সামনে থেকেও দেখা হলো না

ছাদের আড়ালে দাঁড়িয়ে আভা সব দেখছিল।

আরিয়ান যখন বারবার বাড়িটার দিকে তাকাচ্ছিল, তখন আভার খুব ইচ্ছে হচ্ছিল, একটু সামনে গিয়ে দাঁড়াবে।

হয়তো আরিয়ান তাকে দেখতে পাবে।

হয়তো অবাক হয়ে তাকাবে।

হয়তো তার মুখে সেই চেনা হাসিটা ফিরে আসবে।

কিন্তু পরমুহূর্তেই আভা নিজের ইচ্ছেটাকে থামিয়ে দিল।

সে মনে মনে বলল,

‘না, আভা। এখনই না। তুই এখনো প্রস্তুত না।’

তারপর সে দেয়ালের সঙ্গে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

নিচে আরিয়ান শেষবারের মতো বাড়িটার দিকে তাকাল।

তারপর ধীরে ধীরে হাঁটতে শুরু করল।

আভা চোখের দৃষ্টি দিয়ে তাকে অনুসরণ করতে লাগল।

আরিয়ান একবারও পেছনে তাকাল না।

সে জানত না, যাকে দেখার জন্য এতক্ষণ অপেক্ষা করেছে, সেই মেয়েটাই তার থেকে কয়েক হাত দূরে দাঁড়িয়ে তাকে দেখছিল।

আরও কয়েক মুহূর্ত পর রাস্তার বাঁক ঘুরতেই আরিয়ান চোখের আড়াল হয়ে গেল।

আভা তখনো দাঁড়িয়ে রইল।

তার মনে হলো, বুকের ভেতর থেকে কিছু একটা সরে গেল।

সে চাইলেই তো একবার ডাকতে পারত।

শুধু একবার।

কিন্তু সে ডাকেনি।

কেন ডাকেনি, সেই উত্তরটাও তার কাছে পরিষ্কার ছিল না।

হয়তো অভিমান।

হয়তো রাগ।

হয়তো ভয়—কথা বলতে গেলে আবারও সবকিছু মনে পড়ে যাবে।

অথবা হয়তো সে নিজেই বুঝতে পারছিল না, আরিয়ানের প্রতি তার এই অভিমানের আড়ালে ঠিক কতটা মায়া লুকিয়ে আছে।

### নিজের মনের সঙ্গে লড়াই

আরিয়ান চলে যাওয়ার পর আভা ধীরে ধীরে ছাদের মাঝখানে এসে দাঁড়াল।

আকাশের দিকে তাকাতেই তার চোখে পড়ল, সূর্য প্রায় ডুবে গেছে। চারপাশে সন্ধ্যার আলো ছড়িয়ে পড়ছে।

সে রেলিংয়ের পাশে বসে পড়ল।

মনে পড়তে লাগল আগের দিনগুলোর কথা।

স্কুলের মাঠে সবার সঙ্গে বসে টিফিন খাওয়া।

আরিয়ানের সঙ্গে ছোটখাটো ঝগড়া।

তানুর দুষ্টুমি দেখে হাসাহাসি।

ক্লাসে কোনো কিছু বুঝতে না পারলে আরিয়ানকে প্রশ্ন করা।

সবকিছু কত স্বাভাবিক ছিল!

কিন্তু একটা ঘটনার পর যেন সবকিছু বদলে গেল।

আভা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

নিজের মনেই বলল,

‘তুই যদি আমার ভালো বন্ধু হোস, তাহলে আমার কথাটা আগে শুনতে পারতিস না, আরিয়ান?’

তার চোখ দুটো ভিজে উঠল।

সে দ্রুত চোখ মুছে নিল।

না, সে কাঁদবে না।

সে কাউকে বুঝতে দেবে না, তার ভেতরে কী চলছে।

কিন্তু মনকে কি এত সহজে বোঝানো যায়?

নিচে দাঁড়িয়ে থাকা আরিয়ানের মুখটা বারবার মনে পড়ছিল।

সে যেভাবে বাড়িটার দিকে তাকাচ্ছিল, যেভাবে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে আবার চলে গেল—সবকিছুই আভার চোখের সামনে ভাসছিল।

আভা নিজের মনকে প্রশ্ন করল,

‘ও কি সত্যিই আমার জন্য এসেছিল?’

তারপর নিজেই উত্তর দিল,

‘হয়তো।’

কিছুক্ষণ পর আবার মনে হলো,

‘যদি আমার জন্যই এসে থাকে, তাহলে আমাকে একবার ডাকল না কেন?’

কিন্তু পরমুহূর্তেই সে বুঝতে পারল, আরিয়ান হয়তো তাকে বিরক্ত করতে চায়নি।

এই কথাটা মনে হতেই আভার মনটা আরও অস্থির হয়ে উঠল।

সে বুঝতে পারছিল না, রাগ করে থাকবে, নাকি আরেকবার আরিয়ানের কথাগুলো শোনার কথা ভাববে।

### সন্ধ্যায় আম্মুর সঙ্গে কথোপকথন

কিছুক্ষণ পর মাহমুদা বেগম ছাদে উঠে এলেন।

মেয়েকে একা বসে থাকতে দেখে তিনি কাছে গিয়ে বললেন,

— কী রে মা, এখানে বসে আছিস কেন? নিচে আয়, সন্ধ্যা হয়ে গেছে।

আভা মায়ের দিকে তাকাল।

— এমনিই, আম্মু। একটু বাতাস খাচ্ছিলাম।

মাহমুদা বেগম মেয়ের পাশে বসলেন।

— তোর মনটা কি এখনো খারাপ?

আভা একটু হেসে বলল,

— না, আম্মু। এখন ভালো আছি।

— সত্যি?

— হুম।

মাহমুদা বেগম মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।

— দেখ মা, জীবনে সবার সঙ্গে সব সময় ভালো সম্পর্ক থাকবে না। কখনো ভুল বোঝাবুঝি হবে, কখনো মন খারাপ হবে। কিন্তু কোনো কষ্টের কারণে নিজেকে একেবারে গুটিয়ে রাখিস না।

আভা চুপ করে মায়ের কথা শুনছিল।

মাহমুদা বেগম আবার বললেন,

— তুই যদি কারও ওপর রাগ করে থাকিস, তাহলে সময় নিয়ে ভাবিস। তাড়াহুড়ো করে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে হবে না। তবে নিজের মনের কথাটাও বুঝতে চেষ্টা করিস।

আভা মায়ের কাঁধে মাথা রেখে বলল,

— আম্মু, কখনো কখনো কাউকে ক্ষমা করতে ইচ্ছে করে, কিন্তু তার ওপর রাগটাও কমে না। তখন কী করতে হয়?

মাহমুদা বেগম মেয়ের মুখের দিকে তাকালেন।

— তখন নিজেকে সময় দিতে হয়, মা। ক্ষমা করা মানে এই নয় যে সবকিছু ভুলে যেতে হবে। আবার রাগ করে থাকা মানেই এই নয় যে মানুষটার প্রতি তোর আর কোনো মায়া নেই।

আভা মায়ের কথা শুনে চুপ করে গেল।

কথাগুলো যেন তার মনের ভেতরে গিয়ে লাগল।

মাহমুদা বেগম উঠে দাঁড়ালেন।

— চল, নিচে যাই। তোর জন্য কফি বানিয়ে দেব?

আভা মৃদু হেসে বলল,

— হ্যাঁ, আম্মু।

— আচ্ছা, চল।

মা-মেয়ে একসঙ্গে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে গেল।

কিন্তু আভার মনে তখনো একটা প্রশ্ন ঘুরছিল।

আরিয়ান কি সত্যিই তাকে দেখতে এসেছিল?

### রাতের নীরবতায়

রাত সাড়ে নয়টা।

আভা নিজের ঘরে বসে কফি খাচ্ছিল। জানালার পাশে বসে বাইরে তাকিয়ে আছে। দূরের বাড়িগুলোর জানালায় আলো জ্বলছে, কোথাও টেলিভিশনের শব্দ ভেসে আসছে।

তার ফোনটা বিছানার ওপর রাখা।

হঠাৎ ফোনের স্ক্রিন জ্বলে উঠল।

ইসরাতের মেসেজ।

ইসরাত: আভা, তুই কেমন আছিস? আজও তোর সঙ্গে কথা হলো না। জানিস, তোকে ছাড়া আমাদের একদম ভালো লাগছে না।

আভা মেসেজটা পড়ল।

তারপর তিথির মেসেজ এল।

তিথি: তুই যত দিন সময় চাস, নে। কিন্তু আমাদের ভুলে যাস না। আমরা সবাই তোর জন্য অপেক্ষা করছি।

এরপর তানুর মেসেজ।

তানু: আভা, তুই স্কুলে ফিরলে প্রথম দিন তোকে কিছু বলব না। শুধু একবার জড়িয়ে ধরে বসে থাকব। আর হ্যাঁ, তোর টিফিনের ভাগ কিন্তু আমি খাব!

মেসেজটা পড়ে আভার ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠল।

চোখের কোণে জমে থাকা পানিটুকু সে মুছে নিল।

তারপর অনেক দিন পর সে ইসরাতকে ছোট্ট একটা মেসেজ পাঠাল।

আভা: আমি ঠিক আছি। তোরা চিন্তা করিস না। একটু সময় লাগবে।

মেসেজটা পাঠিয়ে আভা ফোনটা রেখে দিল।

অন্যদিকে ইসরাত উত্তর পেয়ে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল।

সে সঙ্গে সঙ্গে তিথি আর তানুকে খবর দিল যে আভা মেসেজের উত্তর দিয়েছে।

তিনজনেরই মনটা একটু ভালো হয়ে গেল।

কিন্তু আরিয়ান?

সে তখনো জানত না, আভা আজ প্রথমবার কারও মেসেজের উত্তর দিয়েছে।

সে নিজের ঘরে বসে পড়ার টেবিলে বই খুলে রেখেছিল। পড়ার চেষ্টা করলেও মন বসছিল না।

বিকেলের সেই অপেক্ষা তার মনে পড়ছিল বারবার।

আজও সে আভার দেখা পায়নি।

আজও সে একবারও জানতে পারেনি, আভা ভালো আছে কি না।

তবু সে নিজেকে বোঝাল, আভাকে সময় দিতে হবে।

সে ফোন হাতে নিয়ে আভার চ্যাট খুলল। শেষবার পাঠানো মেসেজটা এখনো উত্তরহীন অবস্থায় পড়ে আছে।

আরিয়ান কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে ফোনটা বন্ধ করে দিল।

মনে মনে বলল,

‘তুই ভালো থাকিস, আভা। তুই আমার সঙ্গে কথা না বললেও আমি চাই, তোর মনটা ভালো হয়ে যাক।’

তারপর বইয়ের দিকে মন দেওয়ার চেষ্টা করল।

### আরেকটি বিকেল, আরেকটি অপেক্ষা?

পরদিন সকালে আভা ঘুম থেকে উঠে জানালার পর্দা সরাল।

আকাশ পরিষ্কার।

দূরে স্কুলে যাওয়ার পথে কয়েকজন শিক্ষার্থীকে দেখা যাচ্ছে।

একসময় এই দৃশ্য দেখলেই আভার স্কুলে যাওয়ার জন্য মন ছটফট করত। আর এখন সে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে শুধু তাকিয়ে থাকে।

সে জানত, আরিয়ান প্রতিদিন স্কুলে যায়।

হয়তো আজও গেটের দিকে তাকাবে।

হয়তো আজও তার খালি বেঞ্চটার দিকে তাকিয়ে থাকবে।

এই ভাবনাগুলো আসতেই আভা নিজেকে থামাল।

সে কেন আরিয়ানের কথা ভাবছে?

সে তো ঠিক করেছে, কিছুদিন স্কুলে যাবে না, কারও সঙ্গে কথা বলবে না।

তাহলে কেন প্রতিদিন তার মন আরিয়ানের দিকেই চলে যাচ্ছে?

আভা জানালার পর্দা টেনে দিল।

নিজেকে বলল,

‘না, এখন এসব ভাবব না।’

কিন্তু সেদিন বিকেলে আবারও তার মনে পড়ল আগের দিনের দৃশ্যটা।

রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আরিয়ান।

একবার বাড়িটার দিকে তাকানো।

তারপর হতাশ হয়ে চলে যাওয়া।

আভা বুঝতে পারছিল না, এই দৃশ্যটা তার মনে এতটা জায়গা করে নিয়েছে কেন।

হয়তো সে চেয়েছিল, আরিয়ান তাকে দেখতে পাবে।

হয়তো সে চেয়েছিল, আরিয়ান একবার তার নাম ধরে ডাকবে।

আবার হয়তো সে নিজেই ভয় পেয়েছিল, যদি সত্যিই তাদের চোখাচোখি হয়ে যায়, তাহলে সে নিজের অভিমান ধরে রাখতে পারবে কি না।

সেই উত্তরটা আভা নিজেও জানত না।

### দূরত্বের ওপারে

এদিকে আরিয়ান নিজের প্রতিদিনের রুটিনে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করছিল।

স্কুলে যেত, ক্লাস করত, ইরফানের সঙ্গে কথা বলত। কিন্তু আভার অনুপস্থিতি তার কাছে প্রতিদিনই নতুন করে ধরা দিত।

আভার বন্ধুরা মাঝে মাঝে তার খোঁজ নিত। ইসরাত একদিন জানাল, আভা অন্তত একটা মেসেজের উত্তর দিয়েছে।

খবরটা শুনে আরিয়ান কিছুটা স্বস্তি পেল।

— ও ভালো আছে তো? — সে জিজ্ঞেস করল।

ইসরাত বলল,

— ও বলেছে, ভালো আছে। তবে এখনো স্কুলে আসার কথা বলেনি।

আরিয়ান মাথা নাড়ল।

— আচ্ছা। ওকে বলিস না যে আমি জিজ্ঞেস করেছি। ও যদি এখন আমার কথা শুনতে না চায়, তাহলে আমি ওকে আর অস্বস্তিতে ফেলতে চাই না।

ইসরাত কিছুক্ষণ আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর বলল,

— তুই সত্যিই নিজের ভুলটা বুঝেছিস, আরিয়ান। এখন শুধু ধৈর্য ধর।

আরিয়ান মৃদু হেসে বলল,

— চেষ্টা করছি।

সেদিন বাড়ি ফেরার সময়ও আরিয়ানের মনে হলো, আভার বাড়ির রাস্তা দিয়ে একবার ঘুরে গেলে কেমন হয়।

কিন্তু এবার সে নিজেকে থামিয়ে দিল।

আভাকে নিজের মতো থাকতে দিতে হবে।

সে আর কোনোভাবেই আভার ওপর নিজের উপস্থিতি চাপিয়ে দিতে চায় না।

তাই সেদিন সে অন্য রাস্তা দিয়ে বাড়ি ফিরে গেল।

অন্যদিকে আভা বিকেলে ছাদে গিয়ে অনেকক্ষণ আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল।

কিন্তু সেদিন নিচের রাস্তায় আরিয়ানকে দেখা গেল না।

আভা জানত না, আরিয়ান আজ ইচ্ছে করেই ওই রাস্তা দিয়ে আসেনি।

তবু অজান্তেই তার চোখ বারবার নিচের দিকে চলে যাচ্ছিল।

কেউ নেই।

রাস্তা দিয়ে মানুষজন যাচ্ছে, শিশুরা খেলছে, দোকানে আলো জ্বলছে।

কিন্তু সেই পরিচিত ছেলেটা নেই।

আভা কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে মুখ ফিরিয়ে নিল।

নিজের মনকে বোঝাল, এতে তার কিছু যায় আসে না।

কিন্তু সত্যিটা হলো, আজ সে নিজেই একবার আরিয়ানকে দেখতে চেয়েছিল।

আর সেই চাওয়াটা সে কাউকে বলতে পারল না।

### চোখের আড়ালে ভালোবাসা

রাত গভীর হলো।

আভা বিছানায় শুয়ে চোখ বন্ধ করল। বাইরে বাতাসে গাছের পাতাগুলো নড়ছে। ঘরের ভেতর নীরবতা।

তার মনে আজও আরিয়ানের কথা ঘুরছে।

সে এখনো রাগ করে আছে।

এখনো সেদিনের ঘটনাটা ভুলতে পারেনি।

কিন্তু আরিয়ানকে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তার মনে যে অদ্ভুত অনুভূতি হয়েছিল, সেটাও অস্বীকার করতে পারছে না।

হয়তো সে এখনো আরিয়ানের ওপর অভিমান করে আছে বলেই তাকে দেখতে চায় না।

আবার হয়তো অভিমান থাকা সত্ত্বেও তার মন চায়, আরিয়ান তাকে একবার বুঝিয়ে বলুক—কেন সেদিন এমন করেছিল।

কিন্তু আভা জানত না, কখন সে আবার আরিয়ানের সঙ্গে কথা বলতে প্রস্তুত হবে।

আরিয়ানও জানত না, কখন আভা তার দিকে তাকিয়ে আগের মতো হাসবে।

তবু দুজনের জীবনেই একটা অদ্ভুত পরিবর্তন ঘটে গেছে।

আভা স্কুলে যায় না, কারও সঙ্গে ঠিকমতো কথা বলে না। অথচ বিকেল হলেই অজান্তে তার চোখ চলে যায় নিচের রাস্তায়।

আরিয়ান প্রতিদিন স্কুলে যায়, ক্লাস করে, বন্ধুদের সঙ্গে থাকে। অথচ গেট দিয়ে ঢোকার সময় তার চোখ খোঁজে সেই পরিচিত মুখটাকে।

দুজনের কেউই নিজেদের মনের কথা স্বীকার করতে প্রস্তুত নয়।

একজন অভিমানের আড়ালে নিজের অনুভূতিগুলো লুকিয়ে রাখছে।

অন্যজন অপরাধবোধ আর অপেক্ষার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।

তাদের মাঝখানে এখনো অনেক না-বলা কথা, অনেক ভুল বোঝাবুঝি, অনেক দূরত্ব।

কিন্তু একটা বিষয় ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠছে—দূরে সরে থাকলেও কাউকে মন থেকে সরিয়ে দেওয়া সব সময় সহজ হয় না।

আর কখনো কখনো সবচেয়ে কাছের মানুষটাকেই সবচেয়ে বেশি মিস করা হয়, অথচ তাকে সেটা বলা যায় না।

সেদিন বিকেলে আভা আরিয়ানকে দেখেছিল, কিন্তু আরিয়ান আভাকে দেখতে পায়নি।

কিন্তু যদি কোনো দিন তাদের চোখাচোখি হয়?

যদি আরিয়ান বুঝতে পারে, আভা তাকে দূর থেকে দেখছিল?

আর যদি আভা আর নিজের অভিমান ধরে রাখতে না পারে?

তাহলে কি তাদের বন্ধুত্ব আবার আগের জায়গায় ফিরে যাবে?

নাকি এই নীরবতা তাদের সম্পর্ককে এমন এক দিকে নিয়ে যাবে, যার কথা তারা কেউ কখনো ভাবেনি?

সেই উত্তর সময়ই দেবে।

চলবে…

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 10 শেষ করেছেন।

আগের পর্ব উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন