ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রেমের বাজিমাত

৪৭তম পর্ব

লেখক: রোজ ও রুশা

#প্রেমের_বাজিমাত

#লেখনীতে_রোজ_ও_রুশা

#পাঠ_৪৭

>>>>>>>>

নিলয় চৌধুরীকে শেষ পর্যন্ত জেল থেকে ছাড়তেই হলো। যথেষ্ট প্রমাণ না থাকায় আদালত তাকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়েছে। তবে শামসুল আজমীর চৌধুরীকে আইনের হেফাজতে রেখেছে। সবাই জানে—এ মুক্তি নির্দোষতার না, প্রভাব আর ক্ষমতার ও নয়। নিলয় একের পর এক উকিল ধরেছে। টাকা ঢেলেছে পানির মতো। তবুও অ্যাডভোকেট এম এল এ কাজল খানের সাজানো মামলার জাল এত নিখুঁত ছিল যে বেরিয়ে আসতে পারেনি শামসুল।

নিলয়ের ভেতরটাও জ্বলছে।

বাবার উপর রাগ, ঘৃণা, অভিমান—সব একসাথে।

কারণ সেই মানুষটাই একদিন হেরাকে শেষ করে দিতে চেয়েছিল। সেদিন যদি জাওয়াদ খান হেরাকে না বাঁচাতো, তাহলে সে তার হেরাফুলকে কোনোদিনই পেত না। তবুও…বাবাকে এই অবস্থায় দেখে বুকের ভেতর কোথাও একটা কষ্ট চেপে বসে। কারণ মানুষটা ভুল করেছে, ভয়ংকর অন্যায় করেছে—কিন্তু সে তার বাবা।

আর সবচেয়ে বেশি রাগ হচ্ছে কাজল খান আর নাভানের উপর। তার বাবা একটা নারীকে সারাজীবন পাগলের মতো ভালোবেসেছে। অথচ সেই নারীই আজ তাকে কারাগারের অন্ধকারে নিক্ষেপ করেছে ।

এই অপমান শামসুল আজমির চৌধুরী কোনোদিন ভুলবে না। আর নিলয়ও না।

সন্ধ্যার পর কারাগারের ভেতরের পরিবেশটা আরও ভারী হয়ে ওঠে। লোহার গেটের শব্দ, বন্দীদের অস্পষ্ট চিৎকার, স্যাঁতসেঁতে দেয়ালের গন্ধ—সব মিলিয়ে এক বিভীষিকাময় নীরবতা।

আজ সেখানে এসেছে অ্যাডভোকেট এম এল এ কাজল খান। শামসুল বারবার দেখা করতে চেয়েছিল। বলেছিল জরুরি কথা আছে।

কাজল খান নিজের স্বভাবসিদ্ধ আধিপত্য নিয়ে কারাগারের ভেতর ঢুকে পড়লেন। তার উপস্থিতিতেই চারপাশের পুলিশ অফিসাররা সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে যায়। চোখেমুখে কঠোরতা, অথচ বুকের ভেতরে পুরোনো ক্ষতের যন্ত্রণা আজও রক্ত ঝরায়।

লোহার শিকের ওপাশে বসে থাকা শামসুল মাথা নিচু করে ছিল। পায়ের শব্দ শুনেই বুঝে যায়—তার শখের নাড়ী এসেছে।

তার ভালোবাসার মানুষ। যাকে সে ভালোবেসে ধ্বংস করেছে নিজ সংসার …নিজের হাতেই শেষ করেছে একটা জীবন ।

ধীরে ধীরে মাথা তোলে শামসুল। ঠোঁটের কোণে অদ্ভুত এক হাসি ফুটে ওঠে। এডভোকেট কাজল খান ভিতরে প্রবেশ করে।

“বাহ… সুন্দরী। শেষমেশ আমাদের জায়গা এক করে দিলে দেখছি। তুমি আমি একই শিকলের ভিতরে। দুজনকে কিন্তু এখনও দারুণ মানায়। কাজল খান কটমট করে তাকালেন। চোখদুটো জ্বলছে আগুনে।

“ তুই সারাজীবন শুধু দেখেই যা শামসুল। কিন্তু তোর পাশে আমাকে মানাবে—এই স্বপ্ন আর কখনো দেখিস না।

শামসুল ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।

তার চোখে ভয়ংকর হিংস্রতা।

“ স্বপ্ন? তুমি এখনও বুঝো নাই আমি কে? আমাকে জেলে ভরে শেষ করে দিবে ভাবছো?

সে লোহার শিক চেপে ধরে দাঁত কিড়মিড় করে বলে ওঠে—

“ আমি তোকে ধ্বংস করে দিব অ্যাডভোকেট এম এল এ কাজল খান। তোর সংসার শেষ করে দিব। তুই কি ভাবছিস—কারাগারে আটকে রাখলেই শামসুল আজমির চৌধুরী শেষ?

তার কণ্ঠ ধীরে ধীরে বিষে ভরে ওঠে।

" খুন করেছি কিন্তু সেই মামলা না দিয়ে গুম আর খুন করতে চেয়েছি সে মামলা করেছো? ভাবছিস আমি বুঝি নাই? অ্যাডভোকেট এম এল এ কাজল খান আমাকে বোকা বানাবে?”

কাজল খান এবার কিছুটা নড়ে ওঠেন।

মুহূর্তের জন্য বুক কেঁপে যায়। শামসুল সেটা দেখেই হেসে ওঠে।

“ দেখছো? এখনও ভয় পাও তুমি আমাকে।

কাজল খান গর্জে ওঠেন--

“ চুপ কর!

শামসুল আরো এগিয়ে আসে। চোখদুটো নিচে নামিয়ে কুৎসিত দৃষ্টিতে তাকায় তার দিকে।

“ বুড়ো বয়সেও তোর শরীরের রক্ত এখনও টগবগ করছে । তোর রক্ত দিয়ে আমি গোসল করবো।

কাজল খানের চোখ মুহূর্তে রক্তিম হয়ে ওঠে।

“ জানোয়ারের বাচ্চা! আমার দিকে কুদৃষ্টি দিবি না। চোখ উপরে ফেলবো!

শামসুল নিচু স্বরে হেসে বলে—

“ নজর তো শুধু মুখে না… প্রতিটা অঙ্গে অঙ্গে পড়ছে। যুবক বয়সে থেকে, প্রতি রাতে তোকে অনুভব করে পুরুষত্ব ফলিয়েছি। তাও তোর মোহো মায়া কাটাতে পারি নি। না ছুয়ে এতো ভালোবাসা আর পেলে তোকে কি করে রাখতাম ভাব?

কথা শেষ করার আগেই—পেছন থেকে একটা লাঠির প্রচণ্ড আঘাত এসে পড়ে শামসুলের পিঠে। পুরো কারাগার কেঁপে ওঠে। জাওয়াদ খান দাঁড়িয়ে আছে।

চোখে জ্বলন্ত আগুন। আরেকটা আঘাত,তারপর আরেকটা।

মন্ত্রী হওয়ার আগে এমন জাওয়াদ খানকে কেউ কখনো দেখেনি।পুলিশের সামনে তিনি বেদম পেটাচ্ছেন শামসুলকে। কোনো ভয় নেই। কোনো দ্বিধা নেই।

জিহান তালুকদার ও নির্বিকার দাঁড়িয়ে।

তার চোখেও জমে থাকা বছরের পর বছর রাগ।

শামসুল মাটিতে পড়ে গেলেও থামে না জাওয়াদ খান ।

লাথি মারে। আবার লাঠি তোলে।

“তোকে আমি মানুষ ভাবছিলাম শামসুল! অথচ তুই একটা নোংরা জানোয়ার!”

শামসুল রক্তাক্ত মুখ নিয়ে হেসে ওঠে। সে ভাঙেনি।

একটুও না।

চেহারার আভিজাত্য নষ্ট হয়েছে, ক্ষমতা হারিয়েছে, পোশাক এলোমেলো—তবুও চোখের সেই অহংকার এখনও জীবিত।

সে থুতু ফেলে ধীরে বলে ওঠে—

“ মার… আরো মার। শামসুল আজমির চৌধুরী এত সহজে শেষ হয় না।

নিলয় দূরে দাঁড়িয়ে ছটফট করছে।

বাবাকে এমনভাবে মার খেতে দেখে তার বুক ফেটে যাচ্ছে। যত অন্যায়ই করুক…লোকটা তার বাবা।

সে এগোতে যায়, কিন্তু পুলিশ আটকে দেয়। নিলয়ের চোখ তখন আগুনে জ্বলছে। একবার কাজল খানের দিকে তাকায়। একবার জাওয়াদ খানের দিকে।

তারপর ধীরে ধীরে মুষ্টিবদ্ধ হাত শক্ত করে ফেলে।

মনের ভেতর একটাই প্রতিজ্ঞা—এই অপমানের প্রতিশোধ সে নেবে। একদিন সবাইকে কাঁদাবে।

আর সেইদিন… পুরো পৃথিবী দেখবে— শামসুল আজমির চৌধুরীর রক্ত এখনও শেষ হয়ে যায়নি।

******

“ ও আমার লাল গোলাপি কই রইলা রে…? এসো এসো, বুকে রাখি জড়াইয়া…”

পুরো লাইব্রেরী কাঁপিয়ে অধীরের বেসুরো গান ভেসে আসতেই রুশা দুই কানে হাত চেপে ধরে বিরক্ত মুখে ঘুরে দাঁড়াল।

“ আল্লাহ! আপনার এই কাকের গলার গান শুনে আমার কান কোমায় চলে যাচ্ছে। দয়া করে মানবতার খাতিরে বন্ধ করুন।

অধীর দেয়ালে হেলান দিয়ে নাটকীয়ভাবে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

“ এই যুগে শিল্পীর কোনো মূল্যই নাই। এত আবেগ দিয়ে গান গাইলাম…”

“এটাকে গান বলে?”তাও আবেগের?

“ হুম। প্রেমে পড়া পুরুষের আর্তনাদ।

রুশা ঠোঁট চেপে হাসি আটকানোর চেষ্টা করল।

“ আর্তনাদ না, এটা অত্যাচার।

অধীর চোখ সরু করে তাকাল। তারপর ধীরে ধীরে রুশার অনেক নিকটে চলে যায় । তার সেই চোখ অদ্ভুত শান্ত কিন্তু বিপজ্জনক থাকায় রুশার বুক ধক করে উঠল।

“ কি!… এভাবে এগোচ্ছেন কেন?

“ তুমি আমার শিল্পকে অপমান করছো। শাস্তি তো পেতেই হবে।

“ খবরদার! কাছে আসবেন না।

“ আসলে?

“ চিৎকার করবো।

অধীর হেসে ফেলল। সেই হাসিটা ভয়ংকর সুন্দর।

“ চিৎকার করে লাভ নাই লাল গোলাপি। এই ভার্সিটিতে সবাই জানে আমি তোমার প্রেমে পাগল।

রুশা পেছাতে পেছাতে দেয়ালে গিয়ে আটকে গেল। বুঝে উঠার আগেই অধীর দু’হাত দেয়ালে রেখে ওকে বন্দি করে ফেলল।

“ এখন বলেন ম্যাডাম… আমার গলা কাকের মতো নাকি কোকিলের মতো ?

রুশা জোড় করে চোখ রাঙাল।

“ভেড়ার!

“ও আচ্ছা…”

অধীর মাথা নেড়ে হঠাৎ ঝুঁকে পড়ল। টুপ করে রুশার নরম গালে একটা গালটুস খেয়ে নিল।

“আহহ! আমার গাল!”

রুশা লাফিয়ে সরে যেতে গিয়েও পারল না। অধীর আরো শক্ত করে আটকে ফেলেছে।

“ইসস… কী মিষ্টি!”

“ফাজলামো করেন? লাইভ টেলিকাস্ট। কেউ দেখে নিলে কি ভাববে।

“দেখুক । মানুষ জানুক আমি আমার বউকে কত আদর করি।”

“ বউ আবার কে?

অধীর চোখ নামিয়ে ধীরে ধীরে ওর ঠোঁটের দিকে তাকাল।

“ যারে আমি একদিন তুলে নিয়ে গিয়ে নিজের নামে বন্দি করবো…।

রুশার বুক কেঁপে উঠল। লোকটা যখন এসব নিচু গলায় বলে, তখন সত্যি সত্যিই ভয় লাগে। আবার সেই ভয়েই অদ্ভুত নেশাও কাজ করে।

“ আপনি না একদম ডেঞ্জারাস।

“ তবুও ডেঞ্জেরাস লোককে ভালোবাসো।

রুশা উত্তর দিল না। শুধু চোখ নামিয়ে ফেলল। লজ্জায় ওর গাল টকটকে লাল হয়ে উঠেছে।

অধীর মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল।

“ ইস… এই জন্যই তোমারে লাল গোলাপি ডাকি। লজ্জা পেলেই পুরো লাল গোলাপি আঁকার ধারণ করে একেবারে টসটসা আপেলের মতো। মন চায় টুপটাপ খেয়ে ফেলি কামড়িয়ে কামড়িয়ে।

রুশা চোখ বন্ধ করে নেয় অধীরের এমন কথায়। ছেলেটা আজকাল উল্টাপাল্টা কথা বলছে। রসার লজ্জা মিশ্রিত গলায় বলে--

“ আপনি খুব অসভ্য।

“ তোমার জন্য।

“ সবসময় এসব ডায়লগ কোথা থেকে আনেন?

“তোমাকে দেখলেই মাথা খারাপ হয়ে যায়। তখন কি বলি নিজেও জানি না।

রুশা এবার সত্যি সত্যি হেসে ফেলল। সেই হাসিটা দেখেই অধীরের চোখ নরম হয়ে গেল। ধীরে ধীরে ওর থুতনিতে আঙুল ছুঁইয়ে মুখটা উপরে তুলল সে।

“ আমার একটুকরো দেশি রাশিয়ান পরি…।

“ রাশিয়ান কেন?

“ এই ঠান্ডা চোখ দুইটার জন্য। বাইরে বরফ… ভিতরে আগুন।

রুশা কিছু বলার আগেই অধীর টেনে নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে নিল ওকে। এত শক্ত করে জড়িয়ে ধরল যেন ছেড়ে দিলে মেয়েটা হারিয়ে যাবে।

“ অনেক ভালোবাসি তোমাকে…।

রুশা চোখ বন্ধ করে অধীরের বুকের শব্দ শুনছিল। লোকটার হৃদপিণ্ডও যেন পাগলের মতো ধুকপুক করছে।

“ আমিও ভালোবাসি…।

“ কতোটুকু?

রুশা ধীরে ধীরে মুখ তুলে তাকাল। চোখদুটো কাঁপছে।

“ এই…... আপনি আমায় ছেড়ে দিলেও আমি ছাড়বো না কখনো। আপনি ভুলে গেলেও আমি ভুলবো না। আপনি দূরে ঠেলে দিলেও আবার ফিরে আসবো। এতোটুকু............ ভালোবাসি…......!

অধীর কয়েক সেকেন্ড চুপ করে তাকিয়ে রইল। তারপর হঠাৎ করে ওর কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে ফিসফিস করল,

“ ভুলে যাওয়ার সুযোগ দিবো না, লাল গোলাপি। তুমি এখন আমার ভয়ংকর অভ্যাস। আর আমি আমার অভ্যাস খুব যন্ত করে আগলে রাখি…।

রুশার বুকের ভিতরটা কেঁপে উঠল।

লোকটা যখন ভালোবাসার কথা বলে, তখন মনে হয় আদর করছে। আর যখন অধিকার দেখায়… তখন মনে হয় সত্যিই একদিন এই মানুষটার মাঝেই ডুবে যাবে সে।

আজকাল রুশাকে এক পলক না দেখলে তার মন অস্থির হয়ে যায়। সারাদিনের ক্লান্তি, ব্যস্ততা সব মিলিয়ে যেন শান্তিটুকু শুধু এই মেয়েটার মাঝেই লুকিয়ে আছে। তাই তো সুযোগ পেলেই ছুটে আসে… শুধু তার লাল গোলাপিটাকে একটু দেখবে বলে।

*****

সৃজন আজ অনেকদিন পর একটু হালকা সময় কাটিয়েছে। রোজকে নিয়ে বাইরে গিয়েছিল,। দিনের পুরোটা সময় হাসি, গল্প আর ছোটখাটো খুনসুটিতে কেটেছে।

আর নাভান? সে বরাবরের মতোই কাজ, ব্যবসা আর পারিবারিক ঝামেলায় ডুবে আছে। তবুও এই বন্ধুত্বের একটা নিয়ম আছে— রাত নামলে সবাই একসাথে বসে আড্ডা দেয়। যেন দিনের সব ক্লান্তি এক টেবিলে এসে একটু নিঃশ্বাস নেয়।

রাত বেশ হয়েছে।

সৃজন দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতে যাবে, ঠিক তখনই পেছন থেকে মায়ের গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে আসে—

“ তুমি তাহলে কী সিদ্ধান্ত নিলে, সৃজন?

সৃজন থেমে যায়। দরজার হাতল ধরা হাতটা ধীরে নেমে আসে। মুখ ঘুরিয়ে তাকায় মায়ের দিকে।

তার মা সোফায় বসে আছেন, চোখে চশমা, কিন্তু সেই চোখের দৃষ্টিতে আজ অদ্ভুত এক ক্লান্তি।

“ কিসের সিদ্ধান্ত, মা?

মা চশমাটা একটু ঠিক করে ধীরে ধীরে বলে ওঠেন—

“ তুমি তাহলে ওই মেয়েকেই বিয়ে করবে? নূরীকে নয়?

কথাটা শুনে সৃজন কিছুক্ষণ চুপ থাকে। তারপর খুব শান্ত গলায় বলে—

“ এটা আবার মুখে বলতে হয়? রোজ ছাড়া অন্য কোনো নারিকে কোনোদিন ওই চোখে দেখিনি, মা। শুধু নূরী কেন… দুনিয়ার কোনো মেয়েই আমার জীবনে রোজের জায়গা নিতে পারবে না।

তার কণ্ঠে রাগ ছিল না। ছিল শুধু অদ্ভুত এক স্থিরতা।

যে স্থিরতা মানুষ তখনই পায়, যখন কাউকে সত্যি সত্যি ভালোবেসে ফেলে।

মা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

“ কি এমন পেয়েছ ওই মেয়ের মধ্যে, সৃজন? একটা মেয়ে তোমাকে নিঃস্বার্থভাবে ভালোবেসেছে। তোমার জন্য অপেক্ষা করেছে। তোমার ভালোবাসা পাওয়ার আশায় দিন পার করেছে। আর তুমি সেই ভালোবাসাটাকেই পায়ে ঠেলে দিচ্ছো?

সৃজন নিচের দিকে তাকিয়ে হালকা হাসল।

সেই হাসিতে সুখ ছিল না, ছিল গভীর ক্লান্তি।

“ মা… না বুঝে এত কথা বলছো কেন? তুমি তো বাবাকে ভালোবেসে সংসার সাজিয়েছ। যদি বাবা থাকত, তুমি কি অন্য কাউকে সেই জায়গা দিতে পারতে? এমনকি মরার পরও তুমি চাইলে সংসার গুছিয়ে নিতে পারতে কিন্তু তুমি তা করনি বাবার স্থানটা কাউকে দাও নি।

মা চুপ করে থাকেন। সৃজন ধীরে ধীরে বলে যায়—

" আমি আমার ফুলকে ভালোবাসি। তার পাশে অন্য কাউকে কল্পনাও করতে পারি না। আমার জীবনে যদি কেউ স্ত্রী হয়ে আসে, সে শুধু রোজ। না হলে কেউ না।

আমার কাছে ভালোবাসা মানে শুধু বিয়ে না। ভালোবাসা মানে শান্তি, আশ্রয়। রোজ এমন একজন মানুষ, যার কাছে এলে মনে হয়— পৃথিবীটা এখনও সুন্দর।

কথাগুলো বলতে বলতে সৃজনের চোখে অদ্ভুত কোমলতা ফুটে ওঠে।রোজের নাম আসলেই ছেলেটার পুরো মুখ বদলে যায়। যেন কঠিন মানুষটার ভেতরে লুকিয়ে থাকা সব কোমলতা শুধু একটা মানুষের জন্যই বেঁচে আছে। আড়ালে দাঁড়িয়ে সব শুনছিল নূরী।

মেয়েটার চোখ বেয়ে অনবরত পানি পড়ছে।

সে ঠোঁটে হাত চেপে কান্না আটকানোর চেষ্টা করছে। কারণ এই প্রথম সে বুঝলো— ভালোবাসা জোর করে পাওয়া যায় না। কারো হৃদয়ে নিজের জন্য জায়গা বানানো যায়, কিন্তু অন্য কারো জন্য বানানো জায়গা কখনো দখল করা যায় না।

সৃজনের মা আবার বললেন—

“ তুমি আরেকবার ভেবে দেখতে পারো, সৃজন। মেয়েটা তোমাকে অসম্ভব ভালোবাসে। তোমার জন্য সব করতে পারে। ভালোবাসাকে এভাবে ফিরিয়ে দিও না বাবা। কিছু হাহাকার থাকে, যা মানুষের জীবন তছনছ করে দেয়। কিছু অভিশাপ আছে, যা চোখের পানিতে জন্ম নেয়।

মায়ের কণ্ঠ কেঁপে ওঠে। কারণ তিনি নূরীর কষ্ট দেখেছেন। একটা মেয়ে কিভাবে নিঃশব্দে ভেঙে যায়, সেটা একজন নারী সবচেয়ে ভালো বোঝে। সৃজন এবার মায়ের দিকে তাকালো। চোখ দুটো লাল হয়ে আছে।

“ মা… আমি কখনো নূরীর সাথে প্রতারণা করিনি। তাকে কখনো ভালোবাসার কথা বলিনি। মিথ্যে আশা দিইনি। তার হাত ধরে ভবিষ্যতের স্বপ্নও দেখাইনি। বরং সবসময় দূরে থেকেছি।

তার গলা ভারী হয়ে আসে।

“ কারণ আমি জানতাম সে আমার জন্য নয়।

কিছুক্ষণ থেমে আবার বলে—

“ আমি তাকে সম্মান করি। তার অনুভূতিরও মূল্য দিই। কিন্তু ভালোবাসা তো জোর করে হয় না, মা। কাউকে করুণা করে বিয়ে করা সবচেয়ে বড় অন্যায়। আমি যদি তাকে বিয়ে করি অথচ মনটা অন্য কারো কাছে থাকে… সেটা কি নূরীর প্রতি অবিচার হবে না?

মায়ের চোখ ভিজে ওঠে।

“ কিন্তু আমরা তো মেয়েটাকে আশ্বাস দিয়েছি, সৃজন। সেই দায়ভার কি আমাদের না?

এই কথায় সৃজন নিঃশব্দে তাকিয়ে থাকে।

তার বুকের ভেতরেও অপরাধবোধের একটা ভার জমে ওঠে।

কারণ নূরীকে সে কখনো ভালোবাসেনি—

তবুও মেয়েটার কান্নার কারণ হয়ে গেছে।

এটাই হয়তো জীবনের সবচেয়ে নিষ্ঠুর সত্য—

সবাইকে সুখী করতে গিয়ে মানুষ কখনো কখনো নিজেকেও হারায়, আবার কাউকে না চেয়েও কষ্ট দিয়ে ফেলে। সৃজন ধীরে চোখ বন্ধ করল। তার কণ্ঠ খুব নিচু, কিন্তু ভীষণ স্পষ্ট—

“ আমার কিছু করার নেই, মা… সত্যিই নেই। কারণ আমি রোজকে ছাড়া অন্য কাউকে নিয়ে বাঁচার কথা ভাবলেই মনে হয়… আমি নিজের সাথেই বিশ্বাসঘাতকতা করছি।

বলে গটগট পায়ে প্রস্থান করে সৃজন। নূরী চোখের পানি হাতে নিয়ে রক্ত চক্ষু নিক্ষেপ করে বিড়বিড় করে যা বললো। তা কেবলমাত্র সে জানে!

>>>>>>

নিলয় তার গোপন কক্ষে একান্তই কিছু লোকদের সাথে কথা বলে সবকিছু ঠিকঠাক করে বেরিয়ে যায় অজানা উদ্দেশ্যে।

এদিকে নতুন মন্ত্রিসভার শপথের পর থেকেই শহরের বাতাস যেন বদলে গেছে। চায়ের দোকান, অফিস আদালত, ব্যবসায়ী মহল, এমনকি অলিগলির মোড়েও এখন একটাই নাম ঘুরে বেড়াচ্ছে— মন্ত্রী জাওয়াদ খান।

বড় বড় ব্যবসায়ীরা পর্যন্ত হিসাব কষছে তার নাম শুনে। কেউ বলছে--

“ জাওয়াদ খানের সাথে লাগতে নেই।”

আবার কেউ নিচু গলায় বলছে--

“লোকটা নাকি পরিবারের জন্য বছরের পর বছর পুড়ছে।

কিন্তু এসবের মাঝেও সবচেয়ে বেশি আলোচনায় তার পরিবার।

বছরের পর বছর ধরে বিচ্ছিন্ন সম্পর্ক, অভিমান, দূরত্ব… সব যেন এখন মিডিয়ার হাত ধরে আবার সামনে চলে এসেছে। সংবাদপত্রে প্রতিদিন নতুন নতুন শিরোনাম। তবে মন্ত্রী জাওয়াদ খান স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন—

“ পারিবারিক ব্যাপার নিয়ে কেউ কথা বলবে না।

ফলে দুদিনের জন্য মিডিয়া চুপ।

কিন্তু মানুষ? মানুষের মুখ কি থামে?

এদিকে অ্যাডভোকেট এম.এল.এ কাজল খানের মাথার উপর যেন ঝড় বয়ে যাচ্ছে। আবারও এমন এক হুমকি এসেছে, যা মুহূর্তেই সব ওলটপালট করে দিতে পারে।

আর সেই ঝড়ের কেন্দ্রবিন্দুতে দাঁড়িয়ে আছে—তার সুখে থাকা। সকাল সকাল কাজল ভিলার ড্রইংরুমে অদ্ভুত এক উত্তেজনা।

ঘড়িতে তখন সাড়ে আটটা।

সবাই বসে আছে। তবে “বসে আছে” কথাটা শুধু শরীরের জন্য প্রযোজ্য। কারো মন স্থির নেই।

সোফার একপাশে জাওয়াদ খান।

মুখ গম্ভীর। পাশে অ্যাডভোকেট কাজল খান।

তারও চেহারা শক্ত, কিন্তু চোখে স্পষ্ট অস্বস্তি।

জিহান তালুকদার বারবার হাত ঘষছে।

তৌহিদা জিহান মাথা নিচু করে বসে আছে।

কারণ—

নাভান সকালে নিজে ফোন করে সবাইকে ডেকেছে।

আর এই ছেলেটা যখন বলে “গুরুত্বপূর্ণ কথা আছে”, তখন সেটা সাধারণ কিছু হয় না— এটা সবাই জানে।

রুমে নিস্তব্ধতা জমে আছে। হঠাৎ সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামার শব্দ তুলছে তার পদাচরণ। সবাই তাকালো।

নিল শার্টের হাতা ভাঁজ করা। এক হাত পকেটে।

চোখে সেই ভয়ংকর শান্ত ভাব। যে শান্তি দেখলে মানুষ আরও বেশি ভয় পায়।

নাভান নিচে নেমেই কারো দিকে না তাকিয়ে ধীর পায়ে এসে মাঝখানে দাঁড়ালো। তারপর টেবিল থেকে পানির গ্লাস তুলে এক চুমুক খেল।

এদিকে হেরা দাঁত দিয়ে নিজের নখ কাটছে।

রাগে, টেনশনে, বিরক্তিতে সব মিলিয়ে মাথা খারাপ অবস্থা। মনে মনে বিড়বিড় করল---

“এই অসভ্য গিটার ওয়ালা কাউকে কিছু না জানিয়ে সব প্ল্যান করে ফেলে কেন! একটু বললে কি হতো ?

কিন্তু নাভান? তার ভাবভঙ্গি এমন, যেন পুরো পৃথিবীটাই ওর আন্ডারে চলছে। সে ধীরে ধীরে জাওয়াদ খানের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। পুরো রুম নিঃশব্দ। তারপর—

নাভান এমন একটা কথা বলল, যেটা শুনে যেন পুরো ঘরে বোমা ফাটল।

“আজ সন্ধ্যায়…

প্রথমে মা আর বাবার ডিভোর্স হবে।

তারপর পিপিমণি আর ছোট বাবারও।

আর ঠিক সেই সাথে চারজনের আবার বিয়ে হবে।

নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে গেল সবার। নাভান থামল না।

“ তোমরা যেহেতু সম্পর্ক মানতে চাইছো না, তাই আইনিভাবে শেষ করে আবার নতুন করে শুরু করবে। এভাবে বছরের পর বছর সম্পর্ক ঝুলিয়ে রাখা যাবে না। অনেক হয়েছে।

তার গলা ঠান্ডা। কিন্তু প্রতিটা শব্দ যেন আদেশ।

“এটা আমার ফাইনাল ডিসিশন। এর উপর আর কোনো কথা হবে না।”আমি পাত্র পাত্রী ঠিক করে রেখেছি খুব ভালো দেখতে মাশাল্লাহ তোমাদের সাথে মানাবে। আমার চয়েস এর ব্যাপারে তোমাদের ধারণা আছে আশা করি হতাশা হবা না।

“ মাথা ঠিক আছে তোমার?!”

জাওয়াদ খান এমনভাবে চিৎকার করে উঠলেন যে রুম কেঁপে উঠল। কিন্তু আশ্চর্য—

নাভানের চোখের পলকও নড়ল না। অ্যাডভোকেট এম.এল.এ কাজল খান ছেলের দিকে তাকিয়ে আছে।

সেই তীক্ষ্ণ, ভয়ংকর চোখ। কাজল খান আসামিদের সামনে দাঁড়ালে তারা থতমতো খেয়ে যায়। আদালতে দাঁড়িয়ে বড় বড় অপরাধীকে থামিয়ে দেয়।

কিন্তু নিজের ছেলের সামনে? আজ তিনি চুপ। নিশ্চয়ই কিছু ব্যাপার আছে এখানে। কিন্তু তাও একটু নার্ভাসনেস কাজ করছে। ছেলের জেদ সম্পকে জানেন তিনি। জাওয়াদ খান এবার অবিশ্বাস নিয়ে কাজল খানের দিকে তাকালেন।

“ কি ব্যাপার? তুমি চুপ কেন? দেখে তো মনে হচ্ছে তুমি রাজি!

এদিকে তৌহিদা জিহান হঠাৎ হাতজোড় করে কেঁদে উঠলেন।

“ আব্বাজান… তুই কি বলছিস! আমি পারব না… আমি আর কারো সাথে নাম জড়াবো না… মরে যাব তবু না…”

তার কান্না শুনে জিহান তালুকদারের বুক মোচড় দিয়ে উঠল। এই মেয়েটা কম কেঁদেছে? ১ যুগ ধরে পাশাপাশি থেকেও দূরে ছিল। একই ছাদের নিচে থেকেও অপরিচিত। রাতে দরজার ওপাশ থেকে কান্নার শব্দ শুনেছে জিহান। অভিমান মানুষকে কতটা নিষ্ঠুর বানাতে পারে— তারা দুজন তার প্রমাণ। জিহান তালুকদার চোখ নামিয়ে ফেললেন। আর নাভান?

সে শান্ত। অস্বাভাবিক শান্ত।

জিহান তালুকদারকে নাভান ভালো করে পর্যবেক্ষণ করছে। নাভান ভেবেছিলো কিছু বলবেন তার ছোট বাবা উরফে একমাত্র শশুড় মশাই। কিন্তু নাভানকে ভুল প্রমাণ করে, তিনি রাগ, অভিমানকে প্রশ্রয় দিয়েছেন। নাভান পকেট থেকে দু হাত তুলে বুকে আড়া-আড়ি ভাজ করে বির বির করে।

***এমন শিক্ষা দিবো শিক্ষা দিবো শুশুড় আব্বাকে। সারাজীবন আব্বা আব্বা করবে**

নাভান এবার স্বাভাবিক গলায় বলে---

“রেগে লাভ নেই। প্রেস-মিডিয়া জড়িয়ে গেছে। এখন পিছিয়ে যাওয়ার রাস্তা নেই।

হেরা এবার আর সহ্য করতে না পেরে উঠে দাঁড়াল।

“ আপনার মাথায় গ্যাস উঠছে নাকি? কি আজেবাজে কথা বলছেন!

নাভান একবারও তার দিকে তাকালো না।উল্টো আরো ঠান্ডা গলায় বলল--

“ আজ সন্ধ্যা ঠিক ছয়টায় সবাইকে কাজল ভিলায় দেখতে চাই।

তারপর ধীরে ধীরে সবার দিকে তাকালো।

সেই দৃষ্টি দেখে কাজল খান পর্যন্ত কাশলেন।

“এর বাইরে কেউ একটা কথাও বললে… আগুন জ্বালিয়ে দেব।

পুরো রুম থমথমে। নাভান এবার একটু এগিয়ে এল।

গলার স্বর নরম। কিন্তু সেই নরম স্বরেই ভয়ংকর গভীরতা।

“ তোমরা যদি একসাথে থাকতে না চাও… তাহলে আমরাও চাই না । এত বছর বাবা-মায়ের ভালোবাসা পুরোপুরি পাইনি। এবার চাই।

সে একে একে সবার দিকে তাকালো।

“ তোমরা জন্ম দিয়েছো। দায়িত্বও তোমাদের।

তারপর হঠাৎ ঠোঁটে দুষ্টু হাসি ফুটল। কিন্তু মুখে গম্ভির ভাব।

“ আমরা ডাবল ডাবল ভালোবাসা নিবো। একজোড়া মা, একজোড়া বাবা… ফুফু-ফুপা, মামা-মামি— সব ফুল সেট!

জাওয়াদ খান ও এডভোকেট কাজল খান হতভম্ব হয়ে ছেলের দিকে তাকিয়ে আছেন। লোকটা দেশের মন্ত্রী।

তার এক কথায় বড় বড় লোক কাঁপে এখন ।

কিন্তু আজ? আজ তার নিজের ছেলে তাকে কোণঠাসা করে ফেলেছে। এই কথা বাহিরে পৌছালে তার ইজ্জত শেষ। দাম দিবে কেও?

নাভান ঘুরে সবার রিয়েকশন দেখে গটগট করে হেঁটে চলে যেতে লাগল। যাওয়ার সময় এমন একটা ভাব—

যেন যুদ্ধ ঘোষণা করে গেছে। জাওয়াদ খান মাথা নাড়িয়ে বললেন---

“ কি একটা ছেলে বানিয়েছো! একেবারে ঘাড় ত্যাড়া! মুডি কারো কথা শোনে না।

কাজল খান সঙ্গে সঙ্গে তেড়ে এলেন।

“একদম উল্টাপাল্টা কথা বলবেন না! আপনার ছেলে কি আমার একার নাকি? রক্ত তো আপনারও আছে!

“ আমি সহজ সরল মানুষ!

“ হ্যাঁ, সহজ সরল গণিত বই! পুরো ক্যালকুলেশন করে জীবন চালান!

জাওয়াদ খান চোখ বড় বড় করে তাকালেন।

“ আমাকে গণিত বই বললে?!

“ কম বলেছি। আপনি পুরো বিশ্ববিদ্যালয়!

ওদের ঝগড়া দেখে অধীর সোফা থেকে লাফ দিয়ে উঠল।

“ ও ফুপি মণি! ছোট বাবা! তোমরা চোখে চোখে শুধু প্রেম করো কেন? একটু ঝগড়াও করো না! আমরা সিন দেখি!

জিহান তালুকদার বিব্রতকর অবস্থায় পরে যায়। এ কয় দিনে সবাইকে তার চেনা জানা হয়েছে। চোখে চোখে যে হাজার না বলা কথা বলে ফেলছে। জিহান তালুকদার নিরবে প্রস্থান করে।

>>>>>

এদিকে একের পর এক ডেকোরেশনের লোক এসে পুরু কাজল ভিলা সাজাচ্ছে। ছেলের এমন কাজে এবার কিছুটা নরেচড়ে বসেন কাজল খান।

হঠাৎ করেই রুমের দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকে পড়ে কয়েকজন মহিলা। সবার হাতে শপিং ব্যাগ, গয়নার বক্স, শাড়ির কভার। তাদের এমন হুটহাট প্রবেশে ভ্রু কুঁচকে যায় এডভোকেট এম এল এ কাজল খানের। রকিংচেয়ারের হাতল চেপে ধরে ধীরে ধীরে দাঁড়িয়ে পড়েন তিনি। তীক্ষ্ণ চোখে তাকান তাদের দিকে।

“কে তোমরা?

মেয়েগুলোর মধ্যে একজন ভদ্রভাবে মাথা নিচু করে বলল,

“ ম্যাম আমাদের নাভান স্যার পাঠিয়েছেন আপনাদের রেডি করে দেওয়ার জন্য।

“রেডি?

কাজল খানের কণ্ঠে বিরক্তি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

“ কিসের রেডি?

“আজকে অনুষ্ঠানের জন্য ম্যাম । বিয়ের অনুষ্ঠান উপলক্ষে—”

“ স্টপ!”

কঠিন গলায় থামিয়ে দেন তিনি। চোখেমুখে স্পষ্ট অসন্তোষ। যেন এই পুরো বিষয়টাই তার সহ্যের বাইরে চলে যাচ্ছে।

“এত বড় একটা সিদ্ধান্ত! আর আমাকে কেউ জানানোও প্রয়োজন মনে করলো না?

মহিলাগুলো অপ্রস্তুত হয়ে একে অপরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করতে থাকে। কাজল খান আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়ালেন না। বিরক্তিতে মুখ শক্ত করে সোজা বেরিয়ে গেলেন ছেলের রুমের দিকে।

দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকতেই দেখলেন, নাভান বিছানার পাশে বসে ল্যাপটপে দ্রুত কিছু টাইপ করছে। চারপাশে যেন কোনো হেলদোলই নেই তার। মুখে অদ্ভুত স্থিরতা। যেন সবকিছু আগেই ঠিক করে রেখেছে। এই শান্ত মুখটাই আরও বিরক্ত করে তুলল কাজল খানকে।

তিনি দ্রুত এগিয়ে এসে কড়া গলায় বলে উঠলেন--

“ কি শুরু করেছ তুমি? কিসের বিয়ে? তুমি কি পাগল হয়ে গেছো নাভান?

নাভানের আঙুল থামল কিবোর্ডে। ধীরে ধীরে চোখ তুলে তাকাল মায়ের দিকে। কাজল খান থামলেন না।

“ তুমি বুঝতে পারছো এটা কার পরিবার? কার নাম? প্রেস, মিডিয়া, রাজনৈতিক মানুষজন— সবাই তাকিয়ে থাকবে! আর তুমি নিজের ফ্যামিলির ভাঙা সম্পর্ক, দূরত্ব, সবকিছু সবার সামনে এনে দাঁড় করাচ্ছো?

নাভান এবার ধীরে ল্যাপটপটা বন্ধ করল। চেয়ারে হেলান দিয়ে মায়ের দিকে তাকাল স্থির চোখে।

“এটা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।

“ মানে?

“ আমি অনেক দেখেছি, মা।

নাভানের গলা শান্ত, কিন্তু ভেতরে চাপা ক্লান্তি।

“ বছরের পর বছর ধরে তোমাদের দূরত্ব দেখেছি। একই ছাদের নিচে থেকেও কিভাবে মানুষ অপরিচিত হয়ে যায়, সেটা দেখেছি।

কাজল খান কিছু বলতে গিয়েও থেমে যান।নাভান আবার বলল---

“ তোমরা কেউ ভালো নেই। অথচ অভিনয় করে যাচ্ছো সব ঠিক আছে। এই পরিবারে হাসি আছে, কিন্তু শান্তি নেই। সম্পর্ক আছে, কিন্তু অনুভূতি নেই। আমি ক্লান্ত এসব দেখে।

“ নাভান—”

“ না মা, প্লিজ। আজ আমাকে থামিও না।

তার কণ্ঠ এবার ভারী হয়ে উঠল।

“ তোমাদের জন্য অনেক কিছু সহ্য করেছি আমি। ছোটবেলা থেকে শুধু ভাঙা সম্পর্ক জোড়া লাগানোর চেষ্টা করেছি। কিন্তু কেউ কাউকে ঠিকঠাক জীবন দিতে পারোনি। না তুমি… না বাবা…”না পিপি মনি না ছোট বাবা।

কাজল খানের বুকের ভেতরটা হঠাৎ মোচড় দিয়ে উঠল। নাভান ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। মায়ের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,

“ তাই সবকিছু শেষ করে নতুনভাবে শুরু করাটাই ভালো। অন্তত এবার কেউ কাওকে অবিশ্বাস করবে না।

কথাগুলো এমনভাবে বলল সে, যেন প্রতিটা শব্দ বহুদিনের জমে থাকা কষ্ট থেকে বেরিয়ে আসছে।

কাজল খান ঠোঁট নাড়লেন। হয়তো কিছু বলতে চেয়েছিলেন। হয়তো ছেলেকে থামাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু নাভানের চোখের সেই অদ্ভুত দৃঢ়তা তাকে থামিয়ে দিল। তিনি বুঝলেন, আজ তার ছেলে শুধু সিদ্ধান্ত নেয়নি… ভেতর থেকে পুরোপুরি বদলে গেছে। নাভান আর কোনো কথা না বলে বাথরুমের দিকে চলে গেল।

দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দটা পুরো রুমে ভারী নীরবতা ছড়িয়ে দিল। কাজল খান স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। মাথার ভেতর যেন হাজারো চিন্তা একসাথে ঘুরছে। ছেলের এই আচরণে তিনি ভীষণ বিরক্ত… অথচ কোথাও একটা অজানা ভয়ও কাজ করছে।

এদিকে পুরো বাড়িজুড়ে যেন উৎসবের প্রস্তুতি, অথচ সেই উৎসবের মাঝেই বসে আছে এক অদ্ভুত ভারী নীরবতা। চারপাশে আলো ঝলমল করছে, কর্মচারীরা ছোটাছুটি করছে, সাজসজ্জার শেষ মুহূর্তের ব্যস্ততা চলছে— কিন্তু এই বাড়ির দুই মানুষ যেন সেই কোলাহলের মাঝেও সম্পূর্ণ আলাদা এক অন্ধকারে ডুবে আছে।

জিহান তালুকদার ড্রইংরুমের একপাশে গম্ভীর মুখে বসে আছেন। চোখদুটো ক্লান্ত, কপালের ভাঁজ গভীর। মানুষটা জীবনে অনেক কিছু দেখেছেন, অনেক অপমান, অনেক লড়াই, অনেক বিশ্বাসঘাতকতাও। কিন্তু নিজের আর বোনের সংসার ভাঙার কথা— এটা তিনি কখনো কল্পনাও করেননি।

ডিভোর্স! শব্দটা এখনও তার ভেতরটা কাঁপিয়ে দিচ্ছে।

তিনি রাগ করতে চাইছেন,ভাগ্নের উপর, খুব করে চাইছেন। কিন্তু পারছেন না। কারণ নাভানের ব্যাপারে এখন আর কিছুই অজানা নেই। ছেলেটার — সবকিছু একে একে সামনে এসেছে। তারপরও মন মানছে না। নিজের মনে মনে বারবার বলছেন—

“ সংসার কি এত সহজে ভাঙে?

মানুষ কি একটুখানি ঝড় এলেই সম্পর্ক ছেড়ে দেয়?”

কিন্তু পরমুহূর্তেই বুকের ভেতর অন্য একটা দীর্ঘশ্বাস উঠে আসছে। কারণ তিনি খুব ভালো করেই জানেন, কিছু সম্পর্ক বাইরে থেকে যতটা সুন্দর লাগে, ভেতরে ততটাই ক্ষতবিক্ষত হয়। চারপাশের হৈচৈয়ের মাঝেও মানুষটা আজ ভীষণ একা। নাভানের হুকুমে পুরো বাড়িটা আজ অন্যরকমভাবে সাজানো হয়েছে।

এই বিশাল দুই প্লটের বাড়িটার যেন আজ নতুন রূপ।

>>>>>

প্রথম প্লটে বিশাল ড্রইংরুম, রাজকীয় সাজসজ্জা, ক্রিস্টালের আলো, দামি ফুলের গন্ধে ভরে আছে চারদিক। আর দ্বিতীয় পাশটা যেন ছোটখাটো কোনো অভিজাত রিসোর্ট— বড় হলরুম, অফিস সাইড, অনুষ্ঠান করার আলাদা জায়গা, পাশে ছোট্ট লেকের মতো পানির অংশ, তার গা ঘেঁষে ঝর্ণার মতো নেমে পড়া পানির ধারা। সন্ধ্যার আলো পড়তেই পানির উপর চিকচিক করছে আলোর প্রতিফলন।

সবকিছু এত নিখুঁত, এত বিলাসবহুল…

যেন বাইরে থেকে দেখলে কেউ বুঝতেই পারবে না এই বাড়ির ভেতরে কতগুলো মানুষ আজ মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে আছে।

এদিকে সৃজন, অধীর আর রুশা একপাশে বসে আছে।

তাদের মুখেও স্পষ্ট অস্বস্তি।

তারা খুব ভালো করেই জানে নাভান কেমন মানুষ।

চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করার মতোই বন্ধু সে। তাই নাভান যা করছে, নিশ্চয়ই ভেবেচিন্তেই করছে— এটুকু বিশ্বাস তাদের আছে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, আজ সবকিছু হচ্ছে প্রেস আর মিডিয়ার সামনে। আর নাভানের মাথায় ঠিক কী চলছে, সেটা তারা কেউই ধরতে পারছে না।

অধীর কয়েকবার সৃজনের দিকে তাকিয়েছে।

“তোর কি মনে হয় ও ঠিক করছে?”

সৃজন উত্তর দিতে পারেনি। শুধু দীর্ঘশ্বাস ফেলেছে।

কারণ তাদের “চকলেট হিরো” বন্ধুটা যখন চুপচাপ থাকে, তখনই সবচেয়ে ভয়ংকর কিছু করে বসে।

কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, ঝিনুক যেন একদম নির্লিপ্ত। না কোনো প্রশ্ন করছে, না কোনো উদ্বেগ দেখাচ্ছে।

বিশেষ করে ঝিনুকের শান্ত মুখটা দেখে বারবার অবাক হচ্ছে সবাই। যেন সে খুব ভালো করেই জানে— নাভান যা করতে যাচ্ছে, সেটা হয় খুব ভালো কিছু হবে… নয়তো সবকিছু আরও ভয়ংকরভাবে ভেঙে দেবে।

সন্ধ্যা নামার আগেই বাড়ির সবাই সাজগোজ শেষ করেছে।কর্মচারীদের ছোটাছুটি আরও বেড়ে গেছে।

জিহান তালুকদারও না চাইলেও পরিপাটি হয়েছেন। সাদা রঙের পাঞ্জাবিতে মানুষটাকে এখনও ব্যক্তিত্বপূর্ণ লাগছে, কিন্তু চোখের ক্লান্তিটা কিছুতেই ঢাকা পড়ছে না। মনে হচ্ছে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই যেন বহু বছর বুড়ো হয়ে গেছেন।

আর তৌহিদা জিহান…মহিলাটা যেন আজ সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছেন।

সারাদিন কেঁদে কেঁদে চোখ ফুলে গেছে। বারবার নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করছেন, কিন্তু পারছেন না। সবাই যেখানে ভারী গয়না, জমকালো পোশাকে ব্যস্ত, সেখানে তিনি কোনোভাবেই নিজেকে সাজাতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত সাধারণ একটা শাড়িই পরে নিয়েছেন। কারণ আজ তার সাজতে ইচ্ছে করছে না।

আজ তার মনে হচ্ছে সাজলে যেন অপরাধ হবে। তার বুকের ভেতর শুধু একটাই প্রশ্ন ঘুরছে—

“একটা মেয়ের সংসার ভাঙতে এত কষ্ট লাগে?

এতো বছর যে মানুষটা সাথে থেকেছে একটা ভুল করায় সে এভাবে পর করে দিচ্ছে। তবে আমিও দেখবো এর শেষ পরিণিতি কি হয়।

তিনি বারবার কান্না আটকে রাখার চেষ্টা করছেন। কিন্তু চারপাশের প্রতিটা আলো, প্রতিটা শব্দ যেন তাকে মনে করিয়ে দিচ্ছে— আজকের এই আয়োজনের আড়ালে কিছু একটা ভীষণ অস্বাভাবিক হতে চলেছে।

আর সেই অজানা আশঙ্কাই ধীরে ধীরে পুরো বাড়িটার নিঃশ্বাস ভারী করে তুলছে।

------

হঠাৎ করেই চারপাশে হুলস্থুল পড়ে গেল। কয়েকজন ছেলে-মেয়ে সাংবাদিক আর মিডিয়ার লোকজন একসাথে ভিড় করে সামনে এগিয়ে এলো। সবাই যেন এক ঝলক কথা বলতে চায়, একবার কাছে দাঁড়াতে চায়। ক্যামেরার ফ্ল্যাশে পুরো পরিবেশ ঝলমল করছে।

সবকিছু সামলানোর দায়িত্বটা অধীর নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে। শান্ত অথচ আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে একেকজনের প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে সে। তার গম্ভীর ব্যক্তিত্ব আর পরিপাটি উপস্থিতিতে মেয়ে সাংবাদিকদের অনেকেই মুগ্ধ। কারও চোখে উত্তেজনা, কারও মুখে চাপা হাসি। যেন অধীরের ইন্টারভিউ নিতে পারাটাই তাদের জন্য বিশাল কোনো অর্জন।

ঠিক তখনই রুশা ধীরে ধীরে এসে অধীরের পাশে দাঁড়ালো। মেয়েটার চোখে মুখে অদ্ভুত এক প্রশান্তি, কিন্তু ভেতরে কোথাও যেন একটু সংকোচও কাজ করছে। এত মানুষের সামনে দাঁড়াতে সে অভ্যস্ত না।

অধীর সেটা বুঝতে পারল। ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটিয়ে ইচ্ছে করেই সে রুশার হাতটা আলতো টেনে নিজের একদম পাশে এনে দাঁড় করাল। এমনভাবে, যেন সবার সামনে নীরব ভাষায় জানিয়ে দিল—

এই মেয়েটা তার কাছের। খুব কাছের। একান্তই নিজের!

চারপাশের ক্যামেরা যেন মুহূর্তে আরও ব্যস্ত হয়ে উঠল। কয়েকজন সাংবাদিক তো একে অপরের দিকে তাকিয়ে ফিসফাসও শুরু করে দিল।

আর ঠিক সেই মুহূর্তেই দূর থেকে সবকিছু দেখছিল হেরা । আর পর তার বাবা-মা সবাই আলাদা হয়ে যাবে।

গট গট শব্দ তুলে হাই হিল পায়ে সামনে এগিয়ে গেল সে। আশেপাশের কেউ তাকে থামানোর সাহস পেল না। রাগে তার হাঁটার ভঙ্গিটাও যেন বদলে গেছে।

সোজা গিয়ে নাভানের দরজাটা ধাক্কা মেরে খুলে ভেতরে ঢুকে পড়ল হেরা। ভেতরে ঢুকেই থমকে গেল সে।

নাভান পুরো রেডি। নিল শার্ট সাদা গেঞ্জি পরেছে ভিতরে। ব্লাক পেন্ট। শার্টের হাতা কনুই পর্যন্ত গোটানো, হাতে দামি ঘড়ি। মনে হচ্ছে এক্ষনি বের হবে।

দরজার শব্দে ধীরে চোখ তুলে তাকাল নাভান। হেরার রাগে ফুঁসতে থাকা মুখটা দেখে তার ভ্রু সামান্য কুঁচকে গেল।

হেরা কোনো কথা না বলে ঝট করে তার হাত থেকে ঘড়িটা নিয়ে পাশে ছুঁড়ে ফেলে দিল। নাভান হেরার রাগকে পাত্তা না দিয়ে নিরলসভাবে ড্রেসিং টেবিলের কোণায় গিয়ে বসে পড়ল।

নাভান কয়েক সেকেন্ড চুপচাপ তার দিকে তাকিয়ে রইল। চোখে সেই পরিচিত ঠান্ডা দৃষ্টি। কিন্তু ঠোঁটের কোণে যেন চাপা হাসির রেখাও ফুটে উঠেছে। আর হেরা?

সে তো রাগে ফুসফুস করছে। বুক ওঠানামা করছে দ্রুত। নাভান একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে দেখে আরও বিরক্ত হয়ে গেল সে। চোখ রাঙিয়ে দাঁত চেপে বলে উঠল—

“এভাবে কেন তাকিয়ে আছেন? জীবনে মেয়ে মানুষ দেখেননি নাকি?

নাভান তাও চোখ সরালো না হেরার দিক থেকে। সেই গভীর, ভারী দৃষ্টি। যেটা দেখলে বুকের ভিতর কেমন যেন ধক করে ওঠে। নাভানকে কথা বলতে না দেখে হেরা রেগে বললো--

" এসবের মানে কি?

নাভানের নির্লিপ্ত জবাব---

“ মানে তো অনেক কিছুই হতে পারে।”

“ ধাঁধাঁয় কথা বলবেন না।”

“ আমি তো সোজাই বলছি। তুমি বুঝতে চাইছো না।”

হেরা বিরক্ত হয়ে মুখ ঘুরিয়ে নিল।

“আপনি কেন আমার মা-বাবাকে ডিভোর্স করাতে চাচ্ছেন?”

কথাটা বলতেই নাবানের চোখের হাসিটা একটু ফিকে হয়ে গেল। তবে মুখের ভাব আগের মতোই শান্ত।

“কারণ কিছু সম্পর্ক শুধু নামের জন্য টেনে নেওয়া উচিত না।”

“আপনি কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার?” হেরা এবার গম্ভীর গলায় বলল। “হ্যাঁ, তারা আপনার কাছের মানুষ হতে পারে। কিন্তু আমি তাদের মেয়ে। আমারও কিছু চাওয়া-পাওয়া আছে। আপনি এটা করতে পারেন না।”

নাভান ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। তার লম্বা শরীরটা হেরার সামনে এসে থামতেই চারপাশের বাতাস ভারী হয়ে উঠল।

“আমি অনেক কিছুই করতে পারি, মিসাইল গার্ল।

“ফালতু কথা বলবেন না।”তাই বলে ডিভোর্স! বিয়ে?

“ফালতু না।” নাভান একটু ঝুঁকে এল।

“এখন চাইলে তোমাকে কোলে তুলে পুরো অনুষ্ঠান ঘুরে বেড়াতে পারি। সবাইকে দেখিয়ে বলতে পারি— এই মেয়েটা শুধু আমার সাথে ঝগড়া করে।

হেরা সঙ্গে সঙ্গে এক ধাপ পিছিয়ে গেল।

“ আপনার সমস্যা কি?

“ তুমি।”

“ উফ! অসহ্য!”

নাভান মুচকি হাসল। সেই হাসি দেখে হেরার আরও রাগ হলো।

“ আপনি যদি বাবা-মার ডিভোর্স করান…”

হেরা এবার আঙুল তুলে বলল,

“তাহলে আমিও আপনাকে ডিভোর্স দিয়ে দিব। দরকার হলে মুখে মুখেই দিব!”

কথাটা শেষ হতেই মুহূর্তে বদলে গেল নাভানের চেহারা।

চোখ দুটো কেমন অন্ধকার হয়ে উঠল। পরের সেকেন্ডেই সে হেরার হাত টেনে নিজের কাছে নিয়ে এলো। এত কাছে যে হেরা স্পষ্ট তার নিঃশ্বাসের গরম ছোঁয়া অনুভব করতে পারছে। হেরা কেঁপে উঠল।

নাভান ধীরে ধীরে তার ঠোঁটের দিকে তাকাল। তারপর আঙুলের ডগা দিয়ে নিচের ঠোঁট ছুঁয়ে ফিসফিস করে বলল--

“এই কথাটা আবার বলো তো?

হেরা বুক ধড়ফড় নিয়েও গম্ভীর ভাব ধরে রাখল।

“ কি?

“মুখে মুখে কি জানি দিবে?

তার কণ্ঠটা এত নিচু, এত বিপজ্জনক ছিল যে হেরার গলা শুকিয়ে গেল।

নাভান আঙুলটা ঠোঁট বেয়ে নামিয়ে এনে খুব ধীরে বলল---

" এসব কথা মুখ দিয়ে উচ্চারন করবে না । তা না হলে এই গোলাপি ঠোঁট দুটো একটানা চব্বিশ ঘণ্টা আমার ঠোঁটের দখলে থাকবে।

হেরার পুরো শরীর শিউরে উঠল। এই লোকটার কথা বলার ভঙ্গি এমন কেনো? মনে হয় প্রতিটা শব্দ গায়ে এসে লাগে। কিন্তু না। এখন নরম হলে চলবে না। যেভাবেই হোক তাকে থামাতে হবে।হেরা চোখ রাঙিয়ে বলল--

“ আমি যা বলেছি তাই করব।

নাভান ঠিক হেরার মতো করে বললো --

“ আর আমিও যা বলি, সেটা করেও ছাড়ি।

হেরা আমতা আমতা করে বলে --

“ ভয় দেখাচ্ছেন?

“না।”

নাভান ঠোঁটের কোণে হাসি টেনে বলল, “তোমাকে সামলাচ্ছি।

হেরা এবার সত্যি সত্যিই রেগে গেল।

“ সবসময় এমন বেলেল্লাপনা কথা বলেন কেন?”

“ কারণ তুমি রাগলে সুন্দর লাগে।”

“ ছিঃ!”

নাভান হালকা হেসে আরও ঝুঁকে এল।

“এখন চুপচাপ অনুষ্ঠানে এটেন্ড করো। আর একটা কথাও না। বেশি কথা বললে…”

সে হেরার ঠোঁটের দিকে তাকাল।

“ এই ঠোঁট ঠোঁটের জায়গায় থাকবে না। সরাসরি আমার নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে।

হেরা লজ্জা আর রাগে একদম লাল হয়ে গেল।

“ অসভ্য!”

“ শুধু তোমার জন্য।

হেরা আর এক সেকেন্ডও দাঁড়াল না। রাগে গজগজ করতে করতে দরজার দিকে হাঁটতে লাগল।

আর পেছনে দাঁড়িয়ে নাভান দুই হাত ভাঁজ করে তাকিয়ে রইল তার দিকে। ঠোঁটের কোণে সেই গভীর হাসি।

যেন পৃথিবীর সবচেয়ে প্রিয় দৃশ্যটা এখন তার সামনে হেঁটে যাচ্ছে।

হেরা দরজার হাতলে হাত রাখতেই পেছন থেকে নাভানের ভারী গলা ভেসে এলো।

“একবার পিছনে তাকাও।”

হেরা চোখ বন্ধ করে বিরক্তি চেপে রাখল।

“ ইচ্ছা করছে না। আপনার মুখ দেখতে।

“ কিন্তু আমার করছে।

কথাটা এত ধীরে বলল নাভান, যেন শব্দ না… স্পর্শ।

হেরা আর ঘুরতে চায়নি। তবুও অদ্ভুত এক টানে পিছনে তাকাতেই দেখল নাবান আগের জায়গায় নেই। কখন যে তার একদম পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে সে বুঝতেই পারেনি। হেরা চমকে উঠল।

“ আপনি—!

কথা শেষ করার আগেই নাভান তার দুই পাশের দেয়ালে হাত রেখে তাকে আটকে দিল। পুরো শরীর না ছুঁয়েও এমনভাবে ঘিরে ফেলল, যেন পালানোর কোনো রাস্তা নেই। হেরার বুক ধুকপুক করছে। আর নাবান সেটা শুনছে। স্পষ্ট শুনছে। সে ধীরে ধীরে ঝুঁকে এসে হেরার কানের পাশে ফিসফিস করল---

“ তুমি জানো তোমার সবচেয়ে বড় সমস্যা কি?”

“ আপনি।

নাবান হেসে উঠল। খুব আস্তে।

“ না। তোমার সমস্যা হলো… তুমি ভাবো তুমি আমাকে থামাতে পারবে।

হেরা চোখ তুলে তাকাতেই থমকে গেল।লোকটার চোখে আজ অন্য কিছু আছে। অস্বাভাবিক গভীর… অদ্ভুত possessiveness… যেন সে রাগ করলেও ভালোবাসছে, আর ভালোবাসলেও ধ্বংস করতে পারে।

নাভানের আঙুল ধীরে ধীরে হেরার চিবুক ছুঁলো।

“ ডিভোর্স দিবে আমাকে?”

হেরা জেদ ধরে বলল--

“ দিব।

“ তারপর?

“ তারপর আপনার মুখও দেখতে চাইব না।

নাভান এবার সত্যি সত্যি হেসে উঠল। সেই হাসিতে উষ্ণতার চেয়ে বিপদ বেশি ছিল। সে হেরার মুখের আরও কাছে ঝুঁকে এল।এত কাছে… যে তাদের নিঃশ্বাস এক হয়ে যাচ্ছে।

“ তুমি না দেখলেও আমি দেখব।”

“ আমি দূরে চলে যাব।”

“ খুঁজে নিয়ে আসব।”

“আমি লুকিয়ে থাকব।”

“ তাহলে পুরো শহর উল্টে ফেলব।”

হেরার বুকের ভিতরটা কেঁপে উঠল। নাভান তার কানের কাছে ঠোঁট ছুঁইছুঁই করে থেমে বলল--

“তুমি বুঝতে পারছো না হেরা… তোমাকে আমি ভালোভাবে চাই না!

হেরা শ্বাস আটকে শুনছে।

“ আমি তোমাকে এমনভাবে চাই…”

নাভানের গলা আরও নিচু হয়ে গেল--

“যেখানে তোমার রাগ, জেদ, কান্না… সবকিছুর অধিকার শুধু আমার থাকবে।

হেরা ঠোঁট কামড়ে মুখ ঘুরিয়ে নিল।

“আপনি অসুস্থ।”

“হ্যাঁ।” নাভান মুচকি হাসল। “তোমার জন্য।”

হেরা তাকে ঠেলে সরাতে গেল। কিন্তু নাভান তার কব্জিটা ধরে ফেলল। শক্ত না… কিন্তু এমনভাবে, যেন ছাড়ার কোনো ইচ্ছাই নেই। তারপর ধীরে ধীরে হেরার হাতটা নিজের বুকের উপর চেপে ধরল

হেরা স্পষ্ট অনুভব করল নাভানের হৃদস্পন্দন।

নাভান চোখ নামিয়ে তার দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল,নিজের বুকের বাম পাশে হাত রেখে বললো ।-

“এই জিনিসটা খুব শান্ত থাকে। শুধু তুমি কাছে আসলেই বেয়াদব হয়ে যায়।

হেরা দ্রুত হাত সরিয়ে নিল।

“ আপনার সাথে কথা বলাই ভুল! কিছু জিজ্ঞেস করতে আসা ভুল।

“তবুও প্রতিবার আমার কাছেই ফিরে আসো।”

হেরা কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল। কারণ নাবান এবার তার দিকে এমনভাবে তাকিয়ে আছে… যেন সে কোনো মানুষ না, বহু কষ্টে পাওয়া এক নেশা।

আর সেই দৃষ্টি থেকেই পালানো সবচেয়ে কঠিন।

চলবে...

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৪৭তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন