দ্বিতীয় পর্ব: অতীতের ক্ষত
___________
রাত তখন প্রায় এগারোটা। শহরের ব্যস্ত রাস্তাগুলো ধীরে ধীরে নীরব হয়ে আসছিল। উঁচু উঁচু ভবনের জানালায় জ্বলতে থাকা আলো আর দূরের গাড়ির শব্দ ছাড়া চারপাশে তেমন কোনো কোলাহল নেই।
কিন্তু শহরের এক প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা একটি বাড়ির ভেতর তখন অন্য রকম অস্থিরতা।
— রুমান, প্লিজ! আমাকে একা ছেড়ে দে। তুই বুঝবি না, আমার ভেতর দিয়ে কী যাচ্ছে!
আহমারের কণ্ঠে অসহায়ত্ব। চোখ দুটো ক্লান্ত, চেহারায় কয়েক দিনের অযত্নের ছাপ। একসময় যে ছেলেটা বন্ধুদের আড্ডায় সবচেয়ে বেশি হাসত, আজ সে নিজের কাছেই যেন অপরিচিত।
রুমান শাহ তার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। মুখে কঠিন ভাব, কিন্তু চোখের গভীরে জমে থাকা উদ্বেগটা লুকানো কঠিন।
— তোর কষ্ট আমি বুঝি না, তাই না? এত বছর ধরে তোকে চিনি। তোর হাসির আড়ালে কী আছে, সেটাও বুঝতে পারি। কিন্তু তাই বলে নিজেকে এভাবে শেষ করে দিবি?
আহমার মাথা নিচু করল।
— আমি পারছি না, রুমান। সবকিছু অসহ্য লাগছে। ওকে ছাড়া কিছুই ভালো লাগে না।
রুমান দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
— একজন মানুষ চলে গেছে বলে তুই নিজের জীবনটাকেও মূল্যহীন ভাবতে শুরু করেছিস? যে মানুষটা তোর কষ্টের সময় পাশে থাকল না, তার জন্য তুই নিজের জীবন নষ্ট করবি?
আহমার তিক্তভাবে হেসে উঠল।
— তুই বুঝবি না। আমি ওকে সত্যিই ভালোবেসেছিলাম।
— ভালোবাসা কাউকে নিজের ক্ষতি করতে শেখায় না, আহমার। ভালোবাসা মানুষকে বাঁচতে শেখায়।
কথাগুলো বলেই রুমান বন্ধুর কাঁধে হাত রাখল। তার কণ্ঠ এবার কিছুটা নরম।
— চল, তোকে হাসপাতালে নিয়ে যাই। তোর চিকিৎসা দরকার। তুই একা না, আমরা আছি।
— আমি কোথাও যাব না!
— যেতে হবে। এবার তোর কোনো কথা শুনব না।
রুমানের দৃঢ় কণ্ঠে আহমার আর কিছু বলল না। বন্ধুর অসহায় মুখটার দিকে তাকিয়ে রুমানের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল।
সে জানত, আহমার শুধু একজন মানুষকে হারায়নি; হারিয়ে ফেলেছে নিজের ওপর বিশ্বাসটুকুও।
আর সেই বিশ্বাসটা ফিরিয়ে আনার জন্য রুমান যা করার, তা-ই করবে।
### অতীতের একটি নাম
হাসপাতালের করিডরে বসে ছিল রুমান। পাশে তার আরেক বন্ধু শাহজেব। চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলে তারা জানতে পেরেছে, আহমারের শারীরিক ও মানসিক—দুই দিকেই যত্ন প্রয়োজন।
শাহজেব চুপচাপ রুমানের দিকে তাকাল।
— এভাবে আর কত দিন চলবে, রুমান? আহমারকে এ অবস্থা থেকে বের করে আনতে হবে।
— জানি।
— নাবিলার সঙ্গে কথা বলবি?
নামটা শুনেই রুমানের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল।
নাবিলা—আহমারের জীবনের সেই মানুষ, যার জন্য আজ তার বন্ধুর এই অবস্থা।
আহমার নাবিলাকে নিজের জীবনের অংশ ভেবেছিল। ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখেছিল, এমনকি বিয়ের কথাও ভেবেছিল। কিন্তু নাবিলার কাছে সম্পর্কটা ছিল ততটা গভীর নয়। একসময় সে সরে গেল, আর আহমার সেই বিচ্ছেদ মেনে নিতে পারল না।
রুমান ধীর কণ্ঠে বলল,
— এখন নাবিলার কথা না। আগে আহমারকে সুস্থ করতে হবে।
শাহজেব কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
— কিন্তু ও তো নাবিলাকে ফিরে পাওয়ার আশাতেই বেঁচে আছে। ওকে কী বলবি?
রুমান করিডরের জানালার বাইরে তাকাল। তার চোখে এমন এক দৃঢ়তা, যার আড়ালে লুকিয়ে ছিল অসহায়তা।
— ওকে সুস্থ হওয়ার জন্য একটা কারণ দিতে হবে।
— কী রকম কারণ?
রুমান এবার শাহজেবের দিকে তাকাল।
— আমি ওকে বলেছি, আগে সুস্থ হয়ে উঠতে পারলে নাবিলার সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করব।
শাহজেব অবাক হয়ে গেল।
— তুই সত্যিই নাবিলাকে ফিরিয়ে আনবি?
রুমান কয়েক মুহূর্ত নীরব রইল।
— না। আমি জানি না নাবিলা ফিরবে কি না। কথাটা বলেছি শুধু আহমারকে চিকিৎসা নিতে রাজি করানোর জন্য। ওকে মিথ্যা আশা দিয়ে আটকে রাখতে চাই না। কিন্তু এই মুহূর্তে ওর বেঁচে থাকার ইচ্ছাটা ফিরিয়ে আনা জরুরি।
শাহজেব বন্ধুর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। রুমান কঠিন স্বভাবের মানুষ হলেও তার ভেতরে যে গভীর মমতা আছে, তা শাহজেবের অজানা নয়।
রুমান আবার বলল,
— ও সুস্থ হলে সত্যিটা বুঝিয়ে বলব। এখন আমাদের কাজ ওর পাশে থাকা।
শাহজেব মাথা নাড়ল।
— ঠিক আছে। আমরা দুজন মিলে চেষ্টা করব।
দুজনেই জানত, সামনে পথটা সহজ হবে না। তবু বন্ধুকে ফিরে পাওয়ার আশায় তারা হাল ছাড়ল না।
### যে ছেলেটা আর আগের মতো নেই
রাত আরও গভীর হলো।
আহমারকে চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে রেখে রুমান হাসপাতালের বাইরে এল। ফোনের পর্দায় মায়ের কয়েকটি মিসড কল।
সে সঙ্গে সঙ্গে ফোন করল।
— আম্মু, জেগে আছ?
ওপাশ থেকে মায়ের উদ্বিগ্ন কণ্ঠ ভেসে এল।
— এত রাত হয়ে গেল, বাবা। কোথায় তুই? খাওয়াদাওয়া করেছিস?
রুমানের মুখে ক্লান্তির মাঝেও হালকা হাসি ফুটল।
— একটা জরুরি কাজে আটকে গিয়েছিলাম। তুমি খেয়েছ?
— তোর জন্য অপেক্ষা করতে করতে অনেক রাত হয়ে গেল। মায়াও খায়নি। বলছে, ভাইয়া না এলে একসঙ্গে খাবে।
রুমান চোখ বন্ধ করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
— আম্মু, তোমাকে কতবার বলেছি আমার জন্য অপেক্ষা করবে না। সময়মতো খেয়ে ওষুধ খেয়ে নেবে। তোমার শরীর খারাপ হলে আমি কিন্তু একদম ভালো থাকব না।
— আচ্ছা বাবা, আর বকতে হবে না। তুই কখন আসবি?
— একটু সময় লাগবে। তোমরা খেয়ে নাও। আমি ফিরে এসে তোমাদের সঙ্গে বসব।
মা কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, ঠিক তখনই পেছন থেকে একটি মেয়ের কণ্ঠ শোনা গেল।
— আম্মু, ভাইয়াকে বলো আমার বইটা আনতে যেন ভুলে না যায়!
রুমানের ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠল।
— এই যে আমার পিঁপড়া! নিজের ভাইয়ের খোঁজ নেওয়ার আগে বইয়ের খোঁজ নিতে হবে?
ওপাশ থেকে মায়ার প্রতিবাদ এল,
— আমি পিঁপড়া না! তুমি আমাকে এই নামে ডাকবে না!
— আচ্ছা, আচ্ছা। বইয়ের নাম মেসেজ করে দিস। ফিরলে নিয়ে আসব।
— সত্যি?
— না, মিথ্যা! এত রাতে ফোন করে আবার প্রশ্ন করছিস কেন?
মায়া রাগ দেখিয়ে ফোনটা মায়ের হাতে দিয়ে দিল। রুমান মৃদু হেসে ফোন কেটে দিল।
হাসিটা কয়েক মুহূর্তের বেশি স্থায়ী হলো না।
তার জীবনে মা আর বোনই সবচেয়ে আপন। বাবাকে হারানোর পর সে নিজেকে প্রতিজ্ঞা করেছিল, তাদের কখনো কোনো কষ্ট পেতে দেবে না।
কিন্তু অন্যদের জীবন সামলাতে গিয়ে নিজের জীবনের দিকে তাকানোর সময় কি সে কখনো পেয়েছে?
প্রেম, সম্পর্ক, বিয়ে—এসব নিয়ে তার কোনো আগ্রহ নেই। বরং মানুষের অনুভূতির ওপর তার বিশ্বাসই যেন কোথাও গিয়ে থেমে আছে।
কেন?
এই প্রশ্নের উত্তর রুমান কাউকে দেয় না।
কিছু স্মৃতি সে নিজের ভেতর এমনভাবে আটকে রেখেছে, যেন সেগুলো প্রকাশ পেলেই তার সাজানো পৃথিবীটা ভেঙে পড়বে।
### অন্যদিকে, এক অচেনা অনুভূতি
মালিক জুবায়েরের বাড়িতে তখন রাতের খাবারের আয়োজন চলছে।
মীরাব নিজের ঘরে বসে আয়নার সামনে চুল আঁচড়াচ্ছিল। কিন্তু বারবার তার মনে পড়ছিল শপিং মলের সেই ছেলেটার কথা।
অচেনা একজন মানুষ।
মাত্র কয়েক মুহূর্তের দেখা।
অথচ তার কণ্ঠটা যেন এখনো কানে বাজছে।
মীরাব নিজের মনেই বিরক্ত হয়ে বলল,
— ধুর! একটা মানুষকে নিয়ে এত ভাবছি কেন?
সে বিছানায় রাখা ফোনটা হাতে নিল। বন্ধু সাবা আর সারা কয়েকবার মেসেজ করেছে। মীরাব উত্তর দিতে গিয়েও থেমে গেল।
ওরা যদি বুঝে ফেলে, তাহলে আর রক্ষা নেই!
নিজের অজান্তেই তার ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠল।
ছেলেটার নামও সে জানে না। সে কোথায় থাকে, কী করে, তার জীবনে কেউ আছে কি না—কিছুই জানে না।
তবু মীরাবের মনে হলো, আবার যদি দেখা হতো!
ঠিক তখনই দরজায় টোকা পড়ল।
— মীরাব, নিচে আয় মা। তোর বাবা ডাকছেন।
মায়ের ডাক শুনে মীরাব ফোনটা রেখে দিল।
— আসছি, আম্মু!
সে ঘর থেকে বেরিয়ে নিচে নামল। ডাইনিং টেবিলের পাশে বাবা বসে ছিলেন। মীরাবকে দেখে তিনি হাসলেন।
— আমার মেয়েটা আজ এত চুপচাপ কেন?
মীরাব বাবার পাশে বসে তার কাঁধে মাথা রাখল।
— আমি কি সব সময় কথা বলি নাকি?
— তুই চুপ থাকলে আমার বাড়িটাই চুপ হয়ে যায়।
বাবার কথায় মীরাব হেসে উঠল। মা মাথা নেড়ে বললেন,
— তোমার আদরেই মেয়েটা এমন হয়েছে। কোনো কিছু চাইলেই সঙ্গে সঙ্গে দিতে হবে!
মালিক জুবায়ের হেসে বললেন,
— আমার মেয়ে চাইবে, আর আমি দেব না—তা কি হয়?
মীরাব বাবাকে জড়িয়ে ধরল।
এই মানুষগুলোই তার পৃথিবী। তাদের ভালোবাসার বাইরে কোনো কষ্টকে সে কখনো সত্যি করে চিনতে শেখেনি।
কিন্তু সে জানত না, খুব শিগগিরই তাদের এই শান্ত পৃথিবীর দরজায় এমন এক বিপদ এসে দাঁড়াবে, যার সঙ্গে জড়িয়ে যাবে রুমান শাহের জীবনও।
আর সেই ঘটনার পর মীরাবের কাছে রুমান আর শুধু শপিং মলের এক অচেনা মানুষ হয়ে থাকবে না।
সে হয়ে উঠবে এমন এক রহস্য, যার উত্তর খুঁজতে গিয়ে মীরাব নিজের হৃদয়ের কাছেই হেরে যাবে।
চলবে…