ফন্ট সাইজ:
থিম:
মির্জা সায়ান মুগ্ধ

২৯তম পর্ব

লেখক: জান্নাতুল ফেরদৌস মিথিলা

#মির্জা_সায়ান_মুগ্ধ — পর্বঃ২৯ (ক)

#jannatul_firdaus_mithila

“ মিট উইথ মা'ই ফেভরেট — সাইকি! দ্য ব্ল্যাক মাম্বা। হাউ ডু ইউ্য লাইক ইট দেড়ব্যাটারী?”

নিশ্বাস আঁটকে রেখেছে মাহি! সর্বাঙ্গ কাঁপছে রীতিমতো। গলা দিয়ে শব্দ বেরুচ্ছে না তার। চোখমুখ খিঁচে রেখেছে কোনরকম! ক্ষুদ্র দেহটা একপ্রকার দুমড়েমুচড়ে যাচ্ছে ওমন দৈত্যাকার সাপের বাঁধনে। সাপটা ধীরে ধীরে আরও পেঁচিয়ে যাচ্ছে সপ্তদশীকে। নীলচে-সবুজ চোখগুলো কেমন চকচক করছে তার পানে তাকিয়ে! মাহি ভুলেও চোখ খুলে তাকালো না। শরীরের অসহ্য যন্ত্রনায় কুপোকাত সে, ঘনঘন নিশ্বাস ফেলে বহুকষ্টে আওড়াল,

“ আমি..আমি ম'রে যাচ্ছি! প্লিজ এর হাত থেকে আমায় বাঁচান।”

ডিভানে গা ছড়িয়ে বসে আছে মুগ্ধ। ঘাড়টা সামান্য কাত করে ক্রুর দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মেয়েটার পানে। একহাত তার তুলে রাখা ডিভানের গায়ে, উম্মুক্ত বক্ষে চিপচিপে তরলের উপস্থিতি স্পষ্ট! নাভিকমলের নিম্নভাগে ঢিলেঢালা ট্রাউজারের বাঁধন। ছেলেটা কেমন একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল কিয়তক্ষন। আচানক ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসির রেশ টেনে গমগমে গলায় শুধালো,

“ আমার কাছে সাহায্য চাইছিস কেনো বান্দীর মেয়ে? তোর না হওয়া নাগরকে ডাক এবার, ডেকে বল তোকে সাহায্য করতে!”

অস্থির মাহি! দূর্বল পাদু’টো শিরশির করছে পিচ্ছিল সরীসৃপের সংস্পর্শে এসে। সাপটা কেমন হিসহিসিয়ে তার শরীর বেয়ে উঠছে! গা-ভর্তি তরলের উপস্থিতিতে সরীসৃপের বোধহয় বড্ড আরাম লাগছে গা বাইতে। সরীসৃপের মোটা মাথাটা যেইনা মাহির গলা অব্ধি উঠে এসেছে ওমনি বেচারির গা গুলিয়ে ওঠে কেমন। চোখমুখ খিঁচে রেখেই সপ্তদশী হড়বড়িয়ে বলে ওঠে,

“ প্লিজ একে নামান আমার গা থেকে! আমি..আমি, আমি বলছি কে আমায় সাহায্য করেছে। প্লিজ একে নামান।”

রয়েসয়ে নড়েচড়ে বসল মুগ্ধ। পাদু’টো আগের ন্যায় ছড়িয়ে রেখে কপাল গোছালো পরক্ষণে। চোখেমুখে একরাশ কঠিন ভাবসাব ফুটিয়ে গমগমে গলায় শুধালো,

“ নাম বল!”

ভয়ার্ত মাহি! ক্ষণে ক্ষণে ঢোক গিলে আমতা আমতা করে বলে ওঠে,

“ স-স-সিড! সিডের সাথে পালিয়েছিলাম আমি।”

তক্ষুনি মুখাবয়বে পরিবর্তন নামল কঠিন মানবের। এতক্ষণের রাগী ভাবসাব সরে গিয়ে এবার সেথায় ভর করল প্রবল হিংস্রতা। চোয়ালের পেশী শক্ত হলো যুবকের, বাদামী চোখদুটোতে লেপ্টে গেল আগুন। মাফিয়া মনস্টার কেমন কটমট করতে করতে হাত উঁচিয়ে ঘাড় ডলতে লাগল নিজের। চোখদুটো বুঁজে রেখে কটমটিয়ে আওড়াল,

“ আই জাস্ট হেট লায়ার্স! আই জাস্ট ফা'কিং হেট দ্যাম!”

ত্বরিত চোখ খুলল মাহি। আর ওমনি তার চোখাচোখি হলো ব্ল্যাক মাম্বার সবুজ চোখদুটোর সঙ্গে। তৎক্ষনাৎ আর্তচিৎকারে ফেটে পড়ে মাহি। আতঙ্কে কাঁপতে কাঁপতে বেচারি পা গুটিয়ে বসে পড়ে মেঝেতে। কান্নার বেগ বাড়ছে তার। গলা দিয়ে শব্দ বেরুনোর কায়দা নেই মোটেও! ওদিকে মুগ্ধ এবার চট উঠে দাঁড়ায় বসা ছেড়ে। শক্ত মুখের আদলে কটমট করতে করতে এগিয়ে আসে মাহির মুখোমুখি। পরনের ট্রাউজার প্যান্টটা সামান্য উঁচিয়ে মহাশয় একহাঁটু ঠেকালেন মেঝের সঙ্গে। তারপর কোনরূপ আগাম সতর্কসংকেত ছাড়াই কাঁদতে থাকা মাহি'র তালুর চুলগুলো আচমকা চেপে ধরে শক্ত হাতে! মাহি ঠোঁট কামড়ে ধরল তৎক্ষনাৎ! ঠোঁটের ফাঁক গলিয়ে অস্ফুটে বেরোচ্ছে তার আর্তনাদ। সেদিকে থোড়াই খেয়াল করেছে মুগ্ধ! সে উল্টো দাঁত কিড়মিড় করতে করতে আওড়াল,

“ ইউ্য বি'চ! হাউ ডেয়ার ইউ্য লাই টু মি? যেখানে আমার নাম শুনলেই মানুষ প্যান্ট ভিজিয়ে ফেলে, সেখানে আমার সামনে দাঁড়িয়ে আমার চোখে চোখ রেখে, তোর মতো একটা স্লা'ট মিথ্যে বলে কিভাবে? হোয়ার দ্য হেল ডিড ইউ গেট সো মাচ ডেয়ার ফ্রম?”

থমকায় মাহি! একমুহূর্তের জন্য নিজের সকল কষ্ট গুলো বেমালুম ভুলে গিয়ে ছলছল চোখে তাকালো মুগ্ধের মুখপানে। খানিকক্ষণ স্থবির থেকে আচমকা মুখাবয়ব শক্ত হলো সপ্তদশীর। চোখেমুখে স্পষ্ট লেপ্টে গেল অদৃশ্য আগুন। নরম চোয়ালখানা তার শক্ত হলো পরক্ষণে। নিশ্বাসের গতি বেগ বাড়ল বেশ। আচমকা নিজের অগ্নিদৃষ্টি যুগল মুগ্ধের বাদামী চোখদুটোতে তাক করেছে সপ্তদশী। এখন আর ভয় লাগছেনা তার। ভেতরটা ফেটে যাচ্ছে রাগে! নিজ আত্মমর্যাদা ক্ষুন্ন হওয়ায় হিংস্র বাঘিনীর ন্যায় গর্জন তুললো মাহি! দাঁতে দাঁত চেপে আওড়াল,

“ ডোন্ট ইউ্য ডেয়ার টু কল মি আ স্লা'ট মিস্টার অধীর রায়! আ'ম ইনোসেন্ট, ডু ইউ্য হিয়ার দ্যাট মাফিয়া বিস্ট? আ'ম ইনোসেন্ট! সেদিন সিড আমাকে ছুঁয়েও দেখেনি! না করেছে আমার সাথে খারাপ কিছু! আই ওয়াজ পিওর বিফোর, আ'ম স্টিল পিওর এন্ড আ'ল অলওয়েজ রিম্যান পিওর। ডু ইউ্য গেট দ্যাট?”

একদৃষ্টে মেয়েটার অগ্নিমূর্তির ন্যায় মুখাবয়বের পানে তাকিয়ে আছে মাফিয়া মনস্টার। চোখেমুখে এক অদ্ভুত কুটিলতা তার! ঠোঁটের কোণে ঝুলছে ক্রুর হাসির রেশ। সুদর্শন যুবক তক্ষুনি নিজের পিয়ার্সিং করা ঠোঁটখানা আলতো করে চেপে ধরল দাঁতের সাহায্যে। খানিকক্ষণ শ্লেষাত্মক ইঙ্গিতে হাসল সে, পরক্ষণে মুখাবয়বে একরাশ নাটকীয় ভাব ফুটিয়ে আওড়াল,

“ উফফ! হোয়াট এন এটিটিউড বি'চ! আ'ম মেল্টিং।”

নাকার পাটা ফুললো মাহি'র। দাঁত হলো কটমট! এদিকে সাইকি নিজের জোর বাড়াচ্ছেে। মেয়েটাকে আরেকটু চেপে ধরেছে নিজের শরীর দিয়ে। মাহি বুক ফুলিয়ে নিশ্বাস টানলো ফের। ব্যথাতুর ভাব স্পষ্ট তার মুখে। এদিকে মুগ্ধ কেমন তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মেয়েটার পানে। তার ভাব ভঙ্গিমায় একরাশ রহস্য! সে একটুখানি এগিয়ে এসে আচমকা শক্ত থাবায় চেপে ধরল মাহি'র নরম চোয়াল। মাহি কাতরালো না এবার। হিংস্র বাঘিনীর ন্যায় চোখ তুলে ফোঁস ফোঁস করছে কেমন! মুগ্ধ তাচ্ছিল্য হাসল। হাতের জোর বাড়িয়ে মাহি'র নরম মুখখানা নিজের শক্ত মুখের বেশ খানিকটা নিকট এগিয়ে এনে কুটিল কন্ঠে হিসহিসিয়ে বলল,

“ গলার আওয়াজ নামিয়ে কথা বল জানোয়ারের বাচ্চা! বাই দা হেল —আই নো ইউ্য আর স্টিল ভা'র্জিন বি'চ! এন্ড আই অলসো নো দ্যাট, সেদিন তোর আর সিডের মধ্যে কিচ্ছু হয়নি।”

কপাল গোছায় মাহি। চোখেমুখে সন্দিগ্ধ ভাব স্পষ্ট! নরম তুলতুলে ঠোঁটদুটো তিরতির করে কাঁপছে তার, বোধহয় বলতে চাইছে কিছু। মুগ্ধ ঠিক বুঝল মেয়েটার উদ্যোগ। হাতের জোর বাড়িয়ে, ঠোঁট পিষে ফের আওড়াল,

“ সেকেন্ড হ্যান্ড কোনোকিছুর প্রতি বিন্দুমাত্র ইন্টারেস্ট নেই আমার! সেখানে সেকেন্ড হ্যান্ড শিকার? হলি শিট! সেদিন যদি সত্যি সিড তোর সাথে কিছু করে থাকত, তাহলে সিডের সাথে তোকেও সেদিনই কবরে পাঠাতাম! সিরিয়াসলি বলছি, আমার শিকার মানে, সে আমার ব্যাক্তিগত প্রপার্টি! যাকে ভোগ করা, মা'রা কিংবা পেম্পার করার অধিকার কেবল আমার। নো ওয়ান ক্যান ডেয়ার টু লুক অন দেম! নো ওয়ান মিনস নো ওয়ান! বাই দা হেল ইন দা মনস্টার'স ওয়ে — আমি কিন্তু এমনি এমনি রাশিয়ার টপ থার্টি ডক্টরকে আমার প্যালেসে আনিনি!”

বাকিটুকু বলার প্রয়োজনীয়তা বোধ করেনি মনস্টার। স্রেফ ঠোঁটের কোণে ফোটালো শ্লেষাত্মক ইঙ্গিত। সপ্তদশী বুঝে গেল যা বোঝার। লোকটা তবে আগেই ডক্টর দিয়ে তাকে পরিক্ষা করে বসে আছে! সপ্তদশীর কাজলদিঘী চোখদুটোর কোণে অশ্রু জমল বেশ! নাকের পাটাটা লাল হয়ে গেছে কেমন! গালদুটোতে ঈষৎ রক্তাভ ভাব স্পষ্ট। সে বহুকষ্টে চোয়াল নাড়ালো কোনরকমে। মনের কোণে উত্থাপিত হওয়া প্রশ্নটুকু জিভের ডগায় এনে আওড়াল,

“ তাহলে বারবার আমাকে স্লাট ডাকেন কেনো? যখন জানেন আমি স্লা'ট নই!”

এবারেও ক্রুর হাসল মুগ্ধ! এক ঝটকায় ছেড়ে দিলো মাহি'র চোয়াল। পরক্ষণে সটানভাবে দাঁড়িয়ে দু'হাত গুঁজল পকেটে। ভীষণ দাম্ভিকতার সাথে ডিভানের দিকে পা বাড়িয়ে গম্ভীর কন্ঠে শুধালো,

“ এখন হসনি, তবে আর কয়েকদিন পর ঠিকই হবি! কেননা তোকে তো এখানে আনাই হয়েছে স্লা'ট বানানোর জন্য, মনস্টার'স প্রাইভেট স্লা'ট! বাট ইউ নো হোয়াট?”

থামে রূঢ় মানব! উল্টো ঘুরে ধপ করে গা এলিয়ে দিলো ডিভানের গায়ে। পায়ের ওপর পা তুলে, দু'হাত বুকের কাছে বাঁধল যুবক। চোয়াল শক্ত করে তাচ্ছিল্য ভরা কন্ঠে বলল,

“ যেখানে তোর মতো বান্দীর মেয়ের দিকে তাকালেই আমার বমি আসে, সেখানে তোকে নিজের র'ক্ষিতা বানাতে কেমন রুচিতে বাঁধছে। অনেস্টলি স্পিকিং — আমার স্লা'ট হওয়া তো দূরের কথা, আমার বেডের ধারে কাছে যাবার যোগ্যতাও তোর নেই। দ্যাটস হোয়ায় — ইউ্য আর স্টিল ভা'র্জিন।”

ঘাড় ঝুঁকিয়েছে সপ্তদশী! অপমানে লালচে হয়ে গেছে মুখ। চোখের কোটর বেয়ে টুপ টুপ করে ঝরে পরছে নোনা জল। এখন আর সাপের ভয় হচ্ছে না তার! বুকটা খানখান হয়ে যাচ্ছে রাগে-দুঃখে! ওদিকে মুগ্ধ কেমন বিরক্তি ভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মাহি'র নতমুখ পানে। খানিকক্ষণ ঠায় তাকিয়ে থেকে আচমকা গমগমে গলায় প্রশ্ন ছুড়ঁল,

“ নাউ টেল মি, কোন বা'স্টার্ড তোকে পালাতে সাহায্য করেছিল? এন্ড খবরদার এবার মিথ্যে বললে তোর জিভ টেনে ছিঁড়ে ফেলব।”

মাহি আগের ন্যায় ঝুঁকিয়ে রেখেছে মাথা। গলাটা বড্ড ধরেছে তার। চিৎকার করা কান্না গুলো কেমন উপচে বেরিয়ে আসতে চাইছে গলা ছেড়ে। মাহি কোনমতে ঢোক গিলে আঁটকে নিলো কান্নাটুকু। মোটা কন্ঠে কেবল বলল,

“ সিডের সাথে!”

ফের চোয়াল শক্ত হলো মুগ্ধের! কটমটালো দাঁত! অগ্নি দৃষ্টিতে মেয়েটার পানে তাকিয়ে থেকে দু-লাফে চলে এলো ফের। আচমকা ঝুঁকে এসে শক্ত থাবায় মাহি'র গলা চেপে ধরে হুংকার ছুঁড়ে আওড়াল,

“ এই তোর ভয় লাগে না আমায়? এই জানোয়ার উত্তর দে! ম'রার খুব শখ জেগেছে তোর? বারবার মিথ্যে বলছিস কেন? যার মাথা আমি নিজ হাতে তার শরীর থেকে আলাদা করেছি, তার সাথে তুই পালালি কিভাবে? আমায় পাগল মনে করেছিস তুই?”

মুখ কুঁচকে রেখেছে মাহি! দাঁতে দাঁত লেগে যাচ্ছে নিশ্বাস না টানার কষ্টে। বেচারি ছলছল চোখে তাকায় কোনমতে! আকুল গলায় থেমে থেমে ফের বলে,

“ সত্যি বলছি! ঐটা সিড ছিল। আমি ওর সাথে... ”

কথাটা বলতে বলতে চোখ মুদে আসছে মাহি'র। একদিকে ক্ষুদ্র দেহটায় সাপ পেঁচান, আরেকদিকে গলা চেপে রেখেছে মনস্টার! বেচারি থোড়াই নিশ্বাস নিতে পারছে! মুগ্ধের হঠাৎ কি হলো কে জানে! সে কেমন থমকে গিয়েছে মাহি'র ছলছল চোখপানে তাকিয়ে থেকে। আশ্চর্য! মেয়েটার চোখ থেকে আজ দৃষ্টি সরাতে পারছেনা কেন সে? বেয়াদব চোখদুটো দেখছি ভারী অবাধ্যতা করছে আজ। শুনছেনা দ্য গ্রেট রুশদী কিং ওরফে মনস্তারের কথা! তারা কেমন একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে মেয়েটার নিখাঁদ চোখদুটোতে। সপ্তদশীর চোখদুটোর ভাষা আজ বড্ড স্পষ্ট মনস্টারের নিকট। তারা জানাচ্ছে — সপ্তদশীর কথা সত্যি। নির্দয় মানবের হাতের বাঁধন ঢিলে হচ্ছে ক্রমশ! প্রায় জ্ঞানহীন মাহি ঢুলছে বেশ! সৌজন্য বোধহীন যুবক আগ বাড়িয়ে ধরল না মেয়েটাকে। ধরলে যদি জাত যায়? এদিকে বেচারি মাহি ঢুলতে ঢুলতে আচমকা পড়ে গেল মেঝেতে। চোখদুটো তার পুরোপুরি বন্ধ হলো এবার। মুগ্ধ ঠায় দাঁড়িয়ে আছে সম্মুখে। প্রশ্নবিদ্ধ চোখে তাকিয়ে আছে কেমন! কপাল গুটিয়ে রাখা তার, মুখটা বড্ড কঠিন। সে চোয়াল নাড়িয়ে গর্জে বলল,

“ লিভ হার সাইকি!”

সাপও কি কথা বোঝে মানুষের? তাও আবার ওমন হিংস্র ব্ল্যাক মাম্বা? বোঝে হয়তো। এই যে, ওতোবড় দৈত্যাকার ব্ল্যাক মাম্বাটি মনস্তারের হুকুম শোনা মাত্রই ধীরে ধীরে সপ্তদশীর গা থেকে কেমন আলগা হতে লাগল। সময়ের কাটাঁটা বোধহয় মিনিট তিনেক পার করেছে, আর ওমনি সাইকি নিজের জোরালো বাঁধন থেকে পুরোপুরি উম্মুক্ত করল সপ্তদশীকে। মনস্টার নিরব পায়ে এগিয়ে গিয়ে বসল ডিভানে। পিয়ার্সিং করা ভ্রু-দ্বয় গুটিয়ে রেখে সন্দিগ্ধ দৃষ্টি তাক করে রাখল অচেতন মাহির পানে। পাশেই গোল গোল করে শরীর গুটিয়ে রেখেছে সাইকি। তুলছে ফণা! কঠিন মানব হালকা এগিয়ে এসে সামনের টেবিলের ওপর পড়ে থাকা সিগারের প্যাকেট থেকে একখানা সিগার তুলে ঠোঁটের ফাঁকে গুঁজল। পরক্ষণে প্যাকেটের পাশ থেকে লাইটার তুলে সিগারের শেষভাগে আগুন জ্বালিয়ে সুখটান বসালো জোরালো ভাবে। ঠোঁটের ফাঁকে জ্বলন্ত সিগার চেপে রেখে, ডানহাতের বৃদ্ধা এবং মধ্যমার ঘর্ষণে খানিক চুটকী বাজিয়ে আহবান জানাল সাইকিকে। আর ওমনি সাইকি কেমন গা নাচিয়ে মেঝেতে ভর দিয়ে এগোতে লাগল মুগ্ধের দিকে। মিনিট দুয়েকের মধ্যেই দৈত্যাকার সাপটা যুবকের শরীর বেয়ে উঠতে উঠতে উঠে গেল ঘাড়ে। কি ভয়ানক দৃশ্য এঁটেছে দু'জন! বলিষ্ঠদেহী হিংস্র এক যুবক গা ছড়িয়ে বসে আছে আরামসে, মুখমন্ডলের চারপাশ ধূমায়িত তার। ঘাড়ে ঝুলছে ব্ল্যাক মাম্বা! দূর থেকে এহেন দৃশ্য এক ঝলক দেখলে যেকেউ জ্ঞান হারাবে নিশ্চিত। অথচ যুবক কি সুন্দর ভ্রুক্ষেপহীন ভঙ্গিতে বসে আছে দেখো! গায়ে থাকা তরলে সাপটা বড্ড আরামে ছুটছে এদিক-ওদিক। শত হলেও পোষা প্রাণীর আরাম বলে কথা! এ নিয়ে বিন্দুমাত্র রিস্ক নেয় না মাফিয়া বস। সে কেমন একনাগাড়ে সিগার ফুঁকছে মেয়েটার পানে একদৃষ্টে তাকিয়ে থেকে। কপাল গোটানো তার, মুখখানা বড় শক্ত। সে কেমন বিড়বিড় করে আওড়াল,

“ তোকে আজ হুট করে ওমন বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করছে কেন চাশমিস? যেখানে এসব বিশ্বাস অবিশ্বাস এন্ড অল দোস ফা'কিং ক্রাইটেরিয়া আর নট ইন মাই নেচার, সেখানে আজ কেন ইচ্ছে করছে বিশ্বাস করতে? কেনো ইচ্ছে করছে?”

উত্তর পেলো না রূঢ় মানব! কপালের ভাঁজ গাঢ় করল পরক্ষণে। এসব বিশ্বাস অবিশ্বাসের কপটতায় পরতে চায় না সে। তার ব্যাক্তিত্বে ওসব বিশ্বাস করাটা খুব একটা মানায়ও না, তারপরও আজ হঠাৎ মনটার কি হলো কে জানে। সে কেমন উঠেপড়ে লেগেছে মেয়েটাকে বিশ্বাস করতে। মনের এহেন দোলাচালে বড্ড বিরক্ত মাফিয়া মনস্টার। বিরক্তিতে কয়েকটানে শেষ করে ফেলল গোটা চার-পাঁচটে মোটা সিগার। নাহ! তাতেও স্বস্তি পাচ্ছে না সে। মেয়েটার সামনে থাকলে স্বস্তি থোড়াই মিলবে তার? মুগ্ধ তক্ষুনি উঠে দাঁড়ায় বসা ছেড়ে। কাঁধে তখনো সাইকি! তাকে নিয়েই হাঁটা ধরলেন মনস্টার। কয়েক কদম এগোতেই সাইকি হঠাৎ ফণা তুলল মাহি'কে দেখে। তা দেখে তক্ষুনি হিংস্র সাপটার গলা চেপে ধরে মনস্টার! ক্ষিপ্রতায় দাঁতে দাঁত চেপে আওড়ায়,

“ হুঁশশ! শি ইজ মা'ইন! ওর দিকে ফণা তুলে নিজের জীবনটা অকালে শেষ করিস না। তোর খাবার দিচ্ছি, চল!”

কথাটা থোড়াই বুঝল বোবা প্রাণী? শুধু শান্ত হলো মনস্তারের হুকুমে। মুগ্ধ আড়দৃষ্টিতে একপলক তাকালো মাহির দিকে। কপাল গুছিয়ে নিজ অজান্তেই সন্দিহান ভঙ্গিমায় বিড়বিড়ালো,

“ ইজ শি রিয়েলি মা'ইন?”

___________________________________________

দূর্বল কদমে হাঁটছে এডউইন! ডানহাতে ভর দিয়ে রেখেছে আফ্রিকান গার্ডের কাঁধে। বাহাতে চেপে ধরে রেখেছে পেট। যুবকের মুখখানায় সে-কি ব্যাথাতুর ছাপ। প্রশস্ত করিডর দিয়ে কয়েক কদম এগোতেই হঠাৎ দেখা মিললো মিলার। মেয়েটা কোত্থেকে যে ওমন দৌড়ে এলো কে জানে! এসেই দু'হাতে হাঁটুতে ভর দিয়ে হাঁপাচ্ছে কেমন। এডউইন বিরক্ত হলো। তিতিবিরক্ত কন্ঠে দাঁত খিঁচে বলল,

“ ওমন ছাগলের মতো জিভ বার করে হাঁপানোর জন্য আর কোনো জায়গা পাওনি গ্লুপায়া? ঘুরেফিরে আমার সামনে এসে হাঁপানোর মানেটা কি?”

তক্ষুনি সটান হয়ে দাঁড়ায় মিলা। খানিকটা ঢোক গিলে বিচলিত দৃষ্টিতে আপাদমস্তক পরোখ করল এডউইনকে। পরক্ষণে কেমন মিনমিনিয়ে বলল,

“ আপনার এ অবস্থা কিভাবে হলো এডউইন? কে মা'রলো আপনাকে এভাবে? আর মুনলাইট? ওকে খুঁজে পেয়েছেন তো?”

চোয়াল শক্ত করল এডউইন। কপাল কুঁচকে ঝাঁঝাল কন্ঠে প্রতিত্তোর করল,

“ তা জেনে তুমি কি করবে? নাকি আবারও মুনবার্ডকে পালাতে সাহায্য করবে কোনটা?”

হতবাক মিলা! অসহায় চোখে তাকিয়ে রইলো কেমন। এডউইন বেশ বিরক্ত তা আর বুঝতে বাকি নেই তার। সে তৎক্ষনাৎ ঘাড় নুইয়ে কন্ঠে একরাশ অপরাধীত্ব ফুটিয়ে আওড়াল,

“ বিশ্বাস করুন এডউইন! আমি মুনলাইটকে মোটেও সাহায্য করিনি পালাতে। ও তো আমায় ধোঁকা...”

বাকিটা জিভ খসিয়ে বেরুনোর আগেই শোনা গেল এডউইনের বিরাট ধমক!

“ শাট ইউ্যর মাউথ! কি করেছ না করেছ, তার জবাবদিহিতা আমায় না বরং খোদ মনস্টারকে দিও। নাউ গেট লস্ট ফ্রম মাই আই সাইট!”

এহেন বিরাট ধমকে কেঁপে ওঠে তরুণীর ক্ষুদ্র বদন। চোখদুটো মুহুর্তেই চিকচিক করে উঠল বুঝি। এডউইন মুখ ঘোরালো অন্যত্র। গমগমে গলায় ফের বলল,

“ মুভ! এভাবে সঙের মত দাঁড়িয়ে থাকার ইচ্ছে থাকলে অন্য কোথাও গিয়ে দাঁড়াও। যাও!”

এবারেও ধমকে উঠল এডউইন। নতমুখী মিলা তক্ষুনি সরে দাঁড়ায় পথ ছেড়ে। এডউইন কেমন গম্ভীর মুখে গার্ডকে ধরে ধরে পা বাড়ালো সম্মুখে। বেশ কিছুটা পথ অতিক্রম করতেই সামনে থেকে হন্তদন্ত পায়ে ছুটে এলেন আরেকজন গার্ড। বেচারা এসেই কেমন জরুরি তলবে বলল,

“ এডউইন! মনস্তার ইজ কলিং ইউ্য। হি ইজ ইন দ্যা পেন্টহাউজ।”

গম্ভীর মুখে কথাটা শুনল এডউইন। গার্ডের বলা শেষ হতেই গমগমে গলায় প্রতিত্তোর করল,

“ যাও আমি আসছি!”

★

খুড়িয়ে খুড়িয়ে হাঁটছে এডউইন। গার্ডের কাঁধে ভর দিয়ে কোনরকমে এসে দাঁড়ালো — ব্ল্যাক চেম্বারের সম্মুখে। ভেতরে ঢুকতে কেমন ভয় ভয় করছে তার। একপা এগোতে গেলে দু-কদম পিছিয়ে যাচ্ছে আপনাআপনি। এডউইন কিছুক্ষণ ঠায় দাঁড়িয়ে রইলো। পাশ থেকে গার্ড তখন চাপা স্বরে বলে ওঠে,

“ ভেতরে যাবেন না এডউইন?”

দাঁত খিঁচে এডউইন! তিতিবিরক্ত হয়ে ঘাড় বাকিয়ে তাকায় পাশে। চিবিয়ে চিবিয়ে নিচু কন্ঠে আওড়াল,

“ এতোটা পথ যেহেতু এসেছি, ভেতরে তো যাবই! এটা আবার জিজ্ঞেস করার কি আছে? যাও তুমি তোমার কাজে যাও। বাকিটা আমি মেনেজ করে নিব।”

ভড়কালেন গার্ড! তার এটুকু কথায় ওমন রিয়েক্ট করার কি আছে তা-ই হয়তো ভাবছেন বেচারা। সে কেমন ঠোঁট উল্টে দাঁড়িয়ে থাকতেই এডউইন দিলো আরেক ধমক!

“ কি হলো! যাওওও।”

তক্ষুনি হকচকিয়ে ওঠে গার্ড! হড়বড়িয়ে কদম পেছায় কোনমতে। এদিকে এডউইন ততক্ষণে নিজেকে সামলে নিয়েছে কোনরকম। বুকের পাটা ফুলিয়ে লম্বা এক নিশ্বাস টেনে, বেচারা দেয়াল ধরে ধরে ঢুকল ব্ল্যাক চেম্বারে। ভেতরে ঢুকতেই চক্ষু চড়কগাছে আবর্তিত হলো এডউইনের। আলো-আঁধারে ছেয়ে থাকা বিশালাকৃতির ঘরটায় কেমন গা ছমছমে পরিবেশ। অদূরের বিশালকার সিংহাসনে বসে আছে মনস্টার, পায়ের ওপর পা তুলে রাজার ন্যায় সিগার ফুঁকছে কেমন। তার সামনেই মেঝেতে পড়ে আছে সাইকি। মাং'স জাতীয় গিলছে কিছু। দৈত্যাকার সাপটার পেটটা কেমন ফুলে ফেঁপে একাকার! এডউইন ফাঁপা ঢোক গিললো বুঝি! সাইকিকে বড্ড ভয় হয় তার। সে ভুলেও সাইকির আশেপাশে থাকেনা। তবে আজ যে না চাইতেও সাইকির সামনে আসতে হলো তাকে। এডউইন ত্বরিত নজর ঝুঁকালো। ভয়ার্ত ঢোক গিলে মিনমিনিয়ে বলল,

“ হেলো মনস্তার!”

প্রতিত্তোর আসেনি এখনো। এডউইন অপেক্ষায়িত! চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতেই টের পেল মনস্টারের দাম্ভিক কদমের। সিংহাসন ছেড়ে নামছেন তিনি। কিছুটা এগিয়ে এসে ঝুকেঁ বসল সাইকির সম্মুখে। গুরুগম্ভীর কন্ঠে আওড়াল,

“ সিড নাকি এখনো বেঁচে আছে!”

তক্ষুনি ঝটকা খেল এডউইন। নজর উঁচানোর সাহস নেই তার। তবুও হতভম্ব কন্ঠে জবাব দিলো,

“ এটা কি করে সম্ভব মনস্তার? আপনি নিজ হাতে ওর মাথা আলগা করেছেন।”

কিছুক্ষণ মৌন রইল মনস্টার। সময় সেকেন্ড খানেক পেরুতেই ফের ভাবলেশহীন কন্ঠে বলল,

“ বাট ঐ বান্দীর মেয়ে বলছে সে নাকি সিডের সাথে পালিয়েছিল! এবার বল কোনটা সম্ভব!”

বড্ড দোটানায় পড়ল এডউইন। যাকে নিজ চোখের সামনে মৃ'ত দেখল তার সাথে কেউ কি করে পালাবে? এটা তো নির্ঘাত মিথ্যে কথা। এডউইন গম্ভীর হলো এপর্যায়ে। মাথাটা ঠায় নুইয়ে রেখে গুরুগম্ভীর কন্ঠে বলল,

“ মনস্তার! সিডের বেঁচে থাকা অসম্ভব। সেখানে ও কাউকে নিয়ে পালাবে সেটাও অসম্ভব! সো আই থিংক, উনি মিথ্যে বলছেন!”

কথাটা শেষ করে মুহুর্ত খানেক দাঁড়িয়ে রইল এডউইন। তবে এর পরপরই ঘটল আরেক কান্ড! তক্ষুনি এক হিংস্র লাথি এসে আচমকা তার বুক বরাবর আছড়ে পড়ল সজোরে। মুহুর্তেই কয়েক কদম পেছনে ছিটকে পড়ল এডউইন! এহেন অতর্কিত আক্রমণে কিছু বুঝে ওঠার আগেই যুবকের চুল খামচে ধরল মুগ্ধ। এক ঝটকায় এডউইনের নতমুখটা সামান্য উঁচিয়ে, চোয়াল শক্ত করে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল,

“ জাস্ট হোল্ড ইউ্যর টাঙ্গ বাস্টার্ড! আমার চাশমিস বোকা হতে পারে বাট মিথ্যাবাদী নয়! নেক্সট টাইম ওকে নিয়ে কথা বলার আগে জিহবায় লাগাম টানবি, আদারওয়াইজ আমি তাের জীবনের লাগাম টেনে দিব একেবারের জন্য!”

#মির্জা_সায়ান_মুগ্ধ — পর্বঃ২৯(খ)

#jannatul_firdaus_mithila

“ জাস্ট হোল্ড ইউ্যর টাঙ্গ বাস্টার্ড! আমার চাশমিস বোকা হতে পারে বাট মিথ্যাবাদী নয়! নেক্সট টাইম ওকে নিয়ে কথা বলার আগে জিহবায় লাগাম টানবি, আদারওয়াইজ আমি তাের জীবনের লাগাম টেনে দিব একেবারের জন্য!”

ব্যথায় কুঁচকে গেছে এডউইনের গম্ভীর মুখ! দু'হাত পেটে চেপে রেখে গোঙাচ্ছে বেচারা। ফর্সা মুখের আদলে লেপ্টে গেছে লালাভ আবরণ। মাথাভর্তি লালচে-সোনালি চুলগুলো এখনো মন্সটারের শক্তপোক্ত হাতের মুঠোয় পিষ্ট হচ্ছে। আহত যুবকের চোখদুটো কুঁচকে রাখা, কর্ণকুহরে ভেসে আসছে মনস্তারের দাঁত কটমটানো শব্দ! ভয়ার্ত যুবক ঢোক গিলছে ক্ষনে ক্ষনে। সম্মুখে থাকা কঠিন মানব ক্রমশ নিজের হিতাহিত জ্ঞান হারাচ্ছে। ফর্সা মুখখানার সে-কি রাগী ভাবসাব! মসৃণ ললাটে উল্টেপাল্টে আছড়ে পরেছে মাথাভর্তি সিল্কি বাদামী চুলগুলো। আজ কোন উদ্দেশ্যে যুবকের ওলফ-কাট দেওয়া চুলগুলো ওমন ছাড়া পেয়েছে কে জানে! তারা কি সুন্দর বেপরোয়া ভঙ্গিতে ঘাড় ছুঁইয়ে যাচ্ছে রূঢ় মানবের। মুগ্ধ হিসহিসিয়ে যাচ্ছে! শক্ত হাতে এডউইনের মাথাটা আরেকটু ঝাঁকিয়ে উঠল কেমন। বেচারা এডউইন এবারেও চোখ খুলল না। চোখ খুলে থোড়াই চোখাচোখি করবে মনস্টারের সঙ্গে! এদিকে নাক দিয়ে সাপের ন্যায় ফোঁস ফোঁস শব্দ তুলছে মুগ্ধ। চিবিয়ে চিবিয়ে ফের বলল,

“ ওকে নিয়ে তুই কথা বলার কে? এ্যাই এসহোল! হু দা ফা'ক ইউ্য আর টু টক এবাউট হার? জিভটা খুব বেশি লকলক করছে নাকি তোর? তাহলে তো কেটে দেওয়া উচিত!”

আঁতকে উঠল এডউইন! ত্বরিত পেট থেকে হাত সরিয়ে এনে মুখের সামনে হাতজোড় করল বেচারা। চোখদুটো ঠায় বুজেঁ রেখে ভয়ার্ত কন্ঠে থেমে থেমে আওড়াল,

“ ক্ষমা করুন মনস্তার! আমার ভুল হয়েছে। এ জীবনে শিক্ষা থাকলে আর কখনো উনাকে...”

কথাটা জিভ খসে বেরুলো মাত্র, আর ওমনি বেচারা এডউইনের খোঁচা খোঁচা ডানগালটায় সপাটে বসল এক চড়! চড়ের তীব্রতায় গাল বেঁকে গেল এডউইনের। ঠোঁটের ফাঁক গলিয়ে অস্ফুটে বেরুলো ব্যথাতুর শব্দ। এরইমধ্যে এক হিংস্র থাবা এসে চট করে চেপে ধরে এডউইনের চোয়াল। কর্ণকুহরের ছেদ দিয়ে ঢুকল মনস্তারের দাঁত কিড়মিড় কন্ঠ,

“ খবরদার ওর প্রসঙ্গ জিভের আগায় আনবি না! ওকে উনি, তিনি, সে ইত্যাদি সম্বোধন করা তো দূর, ওর কথা মাথায় আনলেও তোর শরীর থেকে গর্দানটা আলাদা করে দিতে দু’সেকেণ্ডও ভাববো না আমি। মাইন্ড ইট!”

বুঝল এডউইন! তড়িঘড়ি করে মাথা ঝাঁকালো ওপর নিচ। বাদামী চোখদুটো কিয়তক্ষন কটমট করে তাকিয়ে রইলো তার পানে। পারছেনা এক্ষুণি এডউইনকে কাঁচা গিলে ফেলতে! তবে মানুষ বিধায় থেমে রইলেন মনস্টার। ফোঁস ফোঁস করতে করতে এক ঝটকায় ছেড়ে দিলো এডউইনের চোয়াল। পরক্ষণে রয়েসয়ে শীরঁদাড়া সোজা করে দাঁড়ালেন মনস্টার। বাহাতের কব্জিতে বেঁধে রাখা হেয়ার ব্যান্ডটা তক্ষুনি একটানে খুলে এনে, মাথার এলোমেলো চুলগুলোকে কোনমতে বাঁধতে উদ্যোত হলো সে। কপালে গোটাকতক ভাঁজ স্পষ্ট তার, শক্ত চোয়ালে আনমনে বিড়বিড় করছে কি যেন! দক্ষ হাতে কায়দা করে গাঁট দিচ্ছে ওতো সুন্দর চুলগুলোতে, তবে গাঁট দেবার একপর্যায়ে আচমকা স্থবির হলো মুগ্ধ। ব্যস্ত হাতদুটো তার আচমকা থেমে গেল মাঝপথে। মস্তিষ্কটা হঠাৎ করে বেজে উঠল কেন যেন! এতক্ষণের উপচে পড়া রাগটায় বুঝি এক পশলা বৃষ্টি নামলো মুহুর্তেই। বিচক্ষণী মস্তিষ্ক হুট করে সচল হলো ফের। কানদুটোতে ঝা ঝা করে উঠল তার বলা কিছুক্ষণ আগের কথাটা —

“ আমার চাশমিস!”

থমকায় মুগ্ধ! হতবিহ্বলের ন্যায় মেঝেতে তাক করল হতবাক দৃষ্টি। কপালের চামড়া আরও কিছুটা গুটিয়ে নিয়ে, যুবক মনে মনে নিজেকে শাসিয়ে আওড়াল,

“ আমি এটা কি বললাম? আমি ঐ বান্দীর মেয়েকে আমার চাশমিস বললাম কেনো? কি বললাম আমি?হোয়াট দা ফা'ক ইজ হেপেনিং টু মি? ঐ বান্দীর মেয়ে আবার আমার হলো কবে থেকে? ও জাস্ট ছ'মাসের রক্ষি'তা আমার। জাস্ট আ ফা'কিং রক্ষিতা, নাথিং এলস!”

নিজেকে বড়ো স্বান্তনা দিয়ে যাচ্ছে মাফিয়া মনস্টার। ভেতরে ভেতরে ফেটে যাচ্ছে নিজ উদ্ভট কর্মে। মাথার তালুটা জ্বলে যাচ্ছে রাগে। সে কেমন গজগজ করতে করতে ঘাড় বাকিয়ে পাশে তাকাতেই তার দৃষ্টি থমকালো — আহত এডউইনের পানে। তক্ষুনি চোয়াল শক্ত হলো মুগ্ধের। চোখেমুখে লেপ্টে গেল একরাশ বিরক্তির ছাপ! মনের কোণে আচানক উত্থাপিত হলো একরাশ প্রশ্ন সংখ্যা। সে কি এডউইনকে মারলো? কিন্তু কেনো মারলো? মেয়েটাকে সামান্য মিথ্যেবাদী বলায়? ভাবতে ভাবতেই দাঁতে দাঁত চাপলো মুগ্ধ। শক্ত হাতে ঘাড়ের পাশ ডলতে ডলতে, আলগোছে একহাত উঁচিয়ে রাখল উম্মুক্ত কোমরের ওপর। অতঃপর পায়ের গতি টেনে এগোয় উবু হয়ে বসে থাকা এডউইনের নিকট। মাঝে কিছুটা দুরত্ব রেখে থামল মুগ্ধের পাদুকা। ছেলেটা তখন হুট করে বসে থাকা এডউইনকে সন্দিগ্ধ গলায় প্রশ্ন ছুড়ঁল,

“ ডিড আই জাস্ট হিট ইউ্য এডউইন?”

হতবিহ্বল এডউইন! তক্ষুনি মাথা তুলে তাকালো সম্মুখে। একপল মনস্টারের আগুন চোখদুটোর সনে চোখাচোখি হতেই গা জুড়ে কাঁপন বয়ে গেল বেচারার। সে ত্বরিত নজর নামিয়ে বসে রইলো বোবার ন্যায়। এদিকে তার ওমন নিরবতায় মেজাজ হারাচ্ছে মুগ্ধ। দাঁত কিড়মিড় করে যুবক ফের ধমকে বলল,

“ আ'ম আস্কিং ইউ্য সামথিং, ড্যাম ইট!”

এহেন ধমকে আঁতকে ওঠে এডউইন। ভয়ে ভয়ে শুকনো ঢোক গিলে ওপর নিচ মাথা নাড়াতে গিয়েও বেচারা পরমুহূর্তেই শুধরে নিলো নিজেকে। প্রাণ সংশয়ে না চাইতেও ভং ধরে মাথা নাড়ায় দু'ধারে। মুগ্ধ কপাল কুঁচকালো এবার। নিচের ঠোঁটখানা ওপরের দাঁত ক'টা দিয়ে চেপে ধরে পায়চারি চালালো এদিকওদিক। মনে মনে কিছু একটা ভেবে হুট করে গমগমে গলায় আদেশ ছুড়ঁল,

“ আগামী দু-ঘন্টার মধ্যে প্যালেসের সকল গার্ডদের হলরুমে নিয়ে আয় এডউইন!”

হকচকায় এডউইন। গুরুগম্ভীর সাজে আবির্ভূত হলো তার মুখ। ভেতর ভেতর একরাশ প্রশ্ন জেগে উঠলেও বাইরে থেকে সে কেমন নির্লিপ্ত ভাব ধরে রেখেছে দেখো! সময় নিয়ে অত্যন্ত বিনয়ের সাথে জবাব দিলো,

“ ওকে মনস্তার!”

কথাটা শেষ হতেই পিনপতন নীরবতায় ছেয়ে গেল সম্পূর্ণ কক্ষ। এডউইন ধীরেসুস্থে বসা ছেড়ে দাঁড়ানোর প্রয়াসে মত্ত। এদিকে মুগ্ধ নামক বলিষ্ঠ পুরুষ সেদিকে বিন্দুমাত্র পাত্তা না দিয়ে, উল্টো পথে গটগটিয়ে প্রস্থান ঘটাল কক্ষ থেকে। সে যাবার সঙ্গে সঙ্গে সাইকি কেমন ফণা তুলল আচমকা! ভয়ংকর সাপটার ওমন ধারালো দাঁত দেখে ফের ধপ করে মেঝেতে বসে পড়ে এডউইন। বেচারা ভয়ে তটস্থ! দু'হাতে মেঝেতে ভর দিয়ে পিছিয়ে যাচ্ছে কোনরকম। ওদিকে সাইকি ধীরে ধীরে শরীর দুলিয়ে এগোচ্ছে এবার। তা দেখে বেচারা এডউইন কেমন চেঁচিয়ে উঠল ঘর কাঁপিয়ে। ভাবা যায়? মনস্টারের ডানহাত নামক ওমন বলিষ্ঠদেহী কঠিন মানুষটাও কি-না মনস্টারের সাইকিকে দেখে ভয়ে চেঁচাচ্ছে! বেচারা এডউইন ক্ষনে ক্ষনে ঢোক গিলে দু'হাতে দূর দূর করে সাপটাকে বলছে,

“ হুঁশ, হুশ! অন্য দিকে যা সাইকি! আমার শরীরে গোশত নেই। আমি মানুষটাও অনেক লম্বা, গিলে হজম করতে সপ্তাহ লেগে যাবে! তাই বলছি, হুঁশ হুঁশ! দূরে যা।”

বোবা প্রাণীটা থোড়াই বুঝল এডউইনের কথা! সে কেমন আঁকাবাকাঁ শরীর নাচিয়ে হিসহিস করে এগোচ্ছে এডউইনের দিকে। এডউইনের এবার নাজেহাল দশা! শরীরের সব ব্যথা ভুলিয়ে বেচারা তক্ষুনি গা ঝেড়েঁ উঠে দাঁড়ালো নিজ পায়ে। অতঃপর এক লাফে ঘর ছেড়ে বেরুনোর উদ্দেশ্যে খানিকটা এগোতেই পথ আটকালো সাইকি! এডউইন থমকায়! সাইকির ধারালো র*ক্তা*ক্ত দাঁতগুলোর ওমন হা করা দেখে ভয়ে ফের চেঁচিয়ে ওঠে বেচারা। সাইকি ফণা তুলতেই দু'হাতে তক্ষুনি চেপে ধরে নিজ মুখমণ্ডল। তবে কিছুক্ষণ পেরিয়ে যাবার পরও গায়ে তেমন ব্যথা অনুভূত না হওয়ায়, আঙুলের ফাঁক গলিয়ে পিটপিট করে সামনে তাকায় এডউইন। পরমুহূর্তেই সম্মুখের দৃশ্য দেখে চক্ষু ছানাবড়া হলো তার। দরজার কাছে সটান হয়ে দাঁড়িয়ে আছে মনস্টার! দু'হাত গুঁজে রেখেছে পকেটে। সাইকি ধীরে ধীরে তার গা বেয়ে ওপরে উঠছে। এহেন দৃশ্য দেখে গা শিরশির করে উঠল এডউইনের। তার কেন যেন মনে হচ্ছে সাইকি মনস্টারের নয়, তার গা বেয়ে উঠছে! এডউইন নিজ ভাবনায় নিমগ্ন ঠিক তখনি সামনে থেকে ধেয়ে আসে মুগ্ধের ঝাঁঝাল কন্ঠ!

“ গায়ের ব্যথা শেষ? নাউ গো অন ইউ্যর ডিউটি।”

ভড়কায় এডউইন! তৎক্ষনাৎ হাত সরায় মুখমণ্ডল থেকে। হতবিহ্বলের ন্যায় কিয়তক্ষন চুপচাপ মাথা নুইয়ে দাঁড়িয়ে থেকে ভাবল,

“ মনস্টার তাহলে ইচ্ছে করে সাইকিকে আমার পিছে লাগিয়েছিল? মানুষ আহত হলে ডাকে ডাক্তারকে, আর মনস্টার কি-না ডাকে সাইকিকে! হাহ!”

নিজ ভাবনায় মত্ত এডউইন! হুট করে ধ্যান ভাঙল সাইকির হিসহিসানোর শব্দে। ত্বরিত বিস্ফোরিত দৃষ্টিতে মাথা তুলে সামনে তাকাতেই মুখোমুখি হলো ফণা তোলা সাইকির সাথে। সাইকিকে কেমন এগিয়ে ধরে আছে মনস্টার, মুখাবয়বে তার কুটিল হাসির ছাপ স্পষ্ট। এডউইন তৎক্ষনাৎ হকচকিয়ে দু-কদম পিছিয়ে গেল। ভড়কে যাওয়া কন্ঠে মিনমিনিয়ে বলল,

“ যাচ্ছি, যা-যাচ্ছি মনস্টার!”

হড়বড়িয়ে কথাগুলো শুধিয়ে কোনরকমে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে ঘর ছেড়ে পালালো এডউইন। যাবার সময় ভুলেও তাকালো না সাইকির দিকে। সে চলে যেতেই মনস্টার পা বাড়ায় উল্টো পথে। প্রশস্ত করিডর দিয়ে কদম বাড়িয়ে আনমনে বিড়বিড়াচ্ছে মুগ্ধ। কাঁধের ওপর সাপ ঝুলছে, আর সে কেমন নির্লিপ্ত ভঙ্গিমায় এগোচ্ছে। আওড়াচ্ছে,

“ ইউ নো হোয়াট সাইকি? শি ইজ নো ওয়ান টু মি! নো ওয়ান মিনস, নো ওয়ান। বাট ওর দিকে কেউ চোখ তুলে তাকালে কেন যে সহ্য হয়না! আই থিংক ঐ বান্দীর মেয়ে জাদু জানে! ভয়ংকর জাদু।”

বোবা প্রাণী কি বুঝল কে জানে! আনন্দে আলগোছে গা ঘষতে লাগল মুগ্ধের বুকের সঙ্গে। মুগ্ধ ক্রুর হাসল! পকেটে দু'হাত গুঁজে এগুলো সম্মুখে।

__________________________________________

ঘুম জড়ানো চোখদুটো আজ বড্ড ভার সপ্তদশীর। মাথাটা টনটন করছে ভোঁতা যন্ত্রনায়। শরীরের প্রতিটি অঙ্গ আজ মড়মড় করছে ব্যথায়। সপ্তদশী গোঙাচ্ছে বেশ! ফ্লোরটা কেমন বরফের ন্যায় শীতল হয়ে যাচ্ছে ক্রমশ। সপ্তদশীর ক্ষুদ্র শরীরের উষ্ণতাকে ছাপিয়ে যাচ্ছে এরূপ মাত্রাতিরিক্ত ঠান্ডা। কিয়তক্ষন পেরুলো বোধহয়, এহেন হিম- শীতল মেঝেতে শুয়ে থাকার আর জো নেই মাহি'র। সে ঘুমঘুম চোখেই কোনরকমে দু'হাত ফ্লোরে ঠেকাল। অতপর কাঁপা কাঁপা বদনে চোখমুখ খিঁচে উঠে বসল মেঝেতে। সপ্তদশী এখনো কুঁচকে রেখেছে চোখ! দু'হাত ওপরে তুলে আড়মোড়া ভেঙে শরীরের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে জানান দিল উঠে পড়ার ইঙ্গিত। আড়মোড়া ভাঙা শেষ হতেই লম্বা একটা হামি টানলো মাহি। পিটপিট করে চোখদুটো খুলে সামনে তাকাতেই বিশাল এক ঝটকা খেল মনে হচ্ছে। মুহুর্তেই সকল ঘুম ছুটে গেল তার, যে-ই দেখল — সে এক ট্রান্সপারেন্ট কাঁচের ঘরে বসে আছে। চারিদিকে সফেদ রঙা মেঘেদের উড়ন্ত ভেলা, মনে হচ্ছে সম্পূর্ণ ঘরটা বুঝি মেঘেদের রাজ্যে বানানো হয়েছে। মাহি অবাক চোখে পুরো ঘরময় চোখ বুলালো। কি বিশাল কামরা! ঘরের একপাশে ঝুলন্ত গোল বিছানা। পাশেই ছোট ছোট দুটো বেডসাইড টেবিল। ডানদিকে লম্বা সোফা কাউচ বিছিয়ে রাখা। সেথায় বসলে বুঝি সরাসরি পাহাড়, আকাশ আর উঁচু ভ্যালির প্রতিটা মনোমুগ্ধকর দৃশ্য অকপটে নজরে পড়বে। বামদিকে ক্লোজেটের স্লাইডিং দরজা। সামনের দিকে একখানা কাঁচের দেয়াল দেখা যাচ্ছে। মাহির কৌতুহলী মনে একটু-আধটু আগ্রহ জন্মালো সেথায় কি আছে তা দেখতে। তাইতো সপ্তদশী স্থানকাল ভেদে রয়েসয়ে ফ্লোরে পা বিছিয়ে দাড়াঁতে গিয়ে হঠাৎ থমকে গেল ফের। একি! পুরো ফ্লোরটাও যে কাঁচের তৈরী। নিচ দিয়ে উড়ছে মেঘ। মাহি ভয় পেলো এরূপ কান্ডে। এক্ষুণি ফ্লোরটা যদি ভেঙে পড়ে যায় নিচে তখন? বোকা মেয়ে তৎক্ষনাৎ ভয়ে ভয়ে ছুটে পালালো বিছানার দিকে। একলাফে ঝুলন্ত গোল বিছানাটায় উঠতেই দেবে গেল তার পাদু’টো! মাহি ভড়কায়। হতবিহ্বলের ন্যায় নিজ পাদু’টোর দিকে দৃষ্টিপাত করতেই দেখে পাদুকা কেমন দেবে গেছে বিছানার নরম তুলোতে। সপ্তদশীর বাচ্চা মনটা কেমন গদগদ হলো এহেন কান্ডে। সে মুচকি হেসে ডানপা -টা আরেকটু সামনে বাড়াতেই সেটাও দেবে গেল আলগোছে। সপ্তদশীর পেল্লব মুখখানায় হুট করে দেখা মিললো এক ভিন্ন উচ্ছ্বাস। ঠোঁটের কোণে লেপ্টে থাকা মুচকি হাসির রেশ প্রশস্ত হলো বেশ! সে এবার লাফ দিলো নরম তুলতুলে বিছানায়। একবার, দুবার, পরপর কয়েকবার! উচ্ছ্বাসে গদগদ সপ্তদশী! হাসছে আর লাফাচ্ছে বিছানায়। মাথার ওপর স্বচ্ছ কাঁচের সিলিং, আকাশের নীল-সাদার প্রতিটি রঙ ধরা দিচ্ছে তার চোখে। এ যেন ঘর নয় মনে হচ্ছে মেঘের কোলে এক টুকরো স্বর্গ! গত ১৬দিনে এই প্রথম অন্তর্মুখী সপ্তদশী এতোটা উচ্ছ্বসিত হলো। লাফাতে লাফাতে মায়াবিনী আচমকা দু'হাত ছড়িয়ে গা এলিয়ে দিলো নরম তুলতুলে বিছানার কোলে। খিলখিল করে হাসছে আর দু'হাত তুলে আকাশের দিকে আঁকিবুঁকি করছে। মনখারাপ গুলো তার কোথায় যে পালালো কে জানে! তবে এরইমধ্যে পেটটা কেমন চো চো করে উঠল মাহি'র। ক্ষুধায় পেট মোচড়াচ্ছে এবার। সে তক্ষুনি উঠে বসল শোয়া ছেড়ে। কিয়তক্ষন ঠোঁট কামড়ে বসে রইলো চুপচাপ। এটা কোন জায়গা, জানে না সে। কাল যখন এসেছিল তখনও তো চোখে পট্টি বাঁধা ছিল! হুটহাট নতুন জায়গায় এসে কাকে বলবে খাবারের কথা? চিন্তায় চিন্তায় ঠোঁট কামড়ে ধরল মাহি। এদিকে পেটটা তার বারবার মাইকিং করে ডাকছে। বেচারি আর পারলোনা বসে থাকতে। ছোট ছোট কদমে তৎক্ষনাৎ পা ছোটালো এটাচ ওয়াশরুমের দিকে।

___________________________________________

চাচেঁর দরজাটা সামান্য খুলে রেখে, মাথা বার করে উঁকি ঝুঁকি দিচ্ছে মাহি। একহাতের তর্জনী দিয়ে আলতো করে নাকের ওপর এসে পড়া চশমাটাকে খানিক ঠেলে দিয়ে পা বাড়ালো বাইরে। আজ বুঝি সপ্তদশীর অবাক হবার দিন। প্রশস্ত করিডর দিয়ে যত হাঁটছে ততই যেন সে মুগ্ধ হচ্ছে। কাঁচের তৈরী স্বচ্ছ ফ্লোর, নিচ দিয়ে উড়ছে মেঘ। করিডরের বেশকিছু জায়গায় ইউরোপীয় এন্টিক মূর্তি। মাহি হাঁটার গতি কমিয়ে, খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে সব। মূর্তি গুলো কি জীবন্তই না দেখাচ্ছে! তবে একটু সামনে এসপ কিছু কিছু মূর্তিকে দেখে হুট করে থেমে গেল মাহি। কপাল গোছালো পরক্ষণে। তার স্পষ্ট মনে আছে, এ মূর্তিগুলোর ছবি লাইব্রেরীর ইতিহাসের বইয়ে দেখেছে সে। এগুলো তো এন্টিক কালেকশন, যা বিশ্ব দরবারে কোটি কোটি টাকার কালেকশন হিসেবে পরিচিত। তবে এগুলো এখানে কেন? মাহির ছোট্ট মনে উদয় হলো হাজারো প্রশ্ন। কিন্তু উত্তর পাওয়া যে বেশ মুশকিল এসবের। সে কিছুক্ষণ ঠায় দাঁড়িয়ে রইলো মূর্তিগুলোর সামনে। পরক্ষণে পেটের চোঁচোঁ শব্দে ফের বাড়ালো পায়ের গতি। অন্যদিকে, প্রশস্ত করিডর দিয়ে ক'জন সশস্ত্র গার্ড মাত্রই এগোচ্ছিলেন একে-অপরের সাথে কথোপকথন চালিয়ে। তবে কিছুটা পথ এগোতেই যেইনা সামনে থেকে মাহি'কে হেঁটে আসতে দেখলেন ওমনি বেচারাগুলো কেমন হন্তদন্ত পায়ে উল্টোপথে হাঁটা ধরলেন। সে-কি পায়ের গতি তাদের! যেন হাঁটছেন না দৌড়াচ্ছেন। পেছন থেকে এগিয়ে আসা মাহি হতবিহ্বলের ন্যায় দেখল সব। লোকগুলো ওমন হন্যে হয়ে উল্টোপথে ছুটছে কেন? কই সে ভাবল তাদের ডেকে জিজ্ঞেস করবে — কিচেন কোথায়? অথচ তাদের দেখো! মেয়েটাকে দেখেই উল্টো পথে ছুটছে। মাহি ঠোঁট ফুলালো। দু'হাত বুকের কাছে বেঁধে শক্ত মুখে এগোতে লাগল কেমন। লম্বা প্রশস্ত করিডরের শেষ প্রান্তে সিঁড়ি, অতটুকু পথ আসতেই মেয়েটার লেগেছে পাক্কা আধঘন্টা। অবশেষে সিঁড়ির কাছে এসে প্রথম পা রাখতেই, সিঁড়িতে কেমন সোনালী আলো ঝলকে উঠল! মাহি এবারেও হতবাক চোখে দেখল সব। বাড়িটা তাকে আর কত মুগ্ধ করবে কে জানে!

লম্বা সিঁড়ি ডিঙিয়ে নেমে এলো সপ্তদশী। এদিক-ওদিক বারকয়েক নজর বুলিয়ে খুঁজল কাউকে। তখনকার গার্ড কোথায় আছে কে জানে! তার তো খিদে পেয়েছে নাকি? কাউকে না দেখলে কিভাবে খাবারের সন্ধান পাবে সে? পেটের যন্ত্রণায় আধার নেমে এলো সপ্তদশীর মুখমণ্ডলে। সে দূর্বল কদমে এগোয় সামনের দিকে। হাঁটার পথে এক-আধবার ঘাড় বাকিয়ে দেখছে চারপাশ। বা-দিকে বিশাল জায়গা জুড়ে গ্রাউন্ড লাউঞ্জ। ডানদিকটা খুব একটা দেখা যাচ্ছে না এখান থেকে। মাহি আর আগ্রহ দেখালো না সেদিকে যেতে। কদম যেভাবে বাড়ছে সেভাবে এগোতে এগোতে মেয়েটা হুট করে পেয়ে গেল গ্লাস হাউজের সদর দরজা। বোকা সপ্তদশী কোনরূপ কালক্ষেপ না করে এগোয় সম্মুখে। বিশালাকৃতির কাঁচের দরজাটার বাইরে পা রাখতেই এক শীতল দমকা হাওয়া এসে চট করে বারি খেলো তার গায়ে। মুহুর্তেই পুরো শরীর জুড়ে অদ্ভুত প্রশান্তি ছড়িয়ে গেল মাহি'র। যতদূর চোখ যাচ্ছে তাতে বোঝা যাচ্ছে সে এখন কোনো বড় মাপের পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থানরত। অদূরেই উঁচু উঁচু পিলার, সঙ্গে কাঁটাতারের বেড়া। মাহি ঘাড় বাকিয়ে তাকায় পাশে। ওমনি মুখটা কেমন হা হয়ে গেল তার। ইশশ! বা-দিকে ওটা বুঝি কোনো গার্ডেন! বড় বড় পাইন আর ওক গাছের সমন্বয়ে গড়া বাগান, যার পুরোটা জমিন জুড়ে বরফ ঢেকে আছে। মাহি মুচকি হেসে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলো সেথায়। সময় বুঝি মিনিট খানেক পেরুলো, অদূর থেকে হুট করে ধেয়ে এলো কোনো জন্তুর ছুটে আসার শব্দ। মাহি হকচকিয়ে পিছিয়ে গেল বাড়ির দিকে। ভয়ার্ত ঢোক গিলে সম্মুখে তাকাতেই হঠাৎ দেখল — বাগানে একটা ছোট্ট খরগোশ ছানা কেমন হন্তদন্ত হয়ে ছুটছে। মাহি'র নরম মনটা বড্ড আনচান করে উঠল খরগোশটার জন্য। সে খুশিমনে সামনে পা বাড়াতেই কোত্থেকে যেন এক হিংস্র স্পটেড হায়না এসে পথ আটকাঁল নিরীহ খরগোশটার। মাহি থমকায়! ভয়ার্ত ঢোক গিলে একমুহূর্ত তাকিয়ে থাকে সম্মুখে। অদূরের খরগোশটা রীতিমতো কাঁপছে ভয়ে। হায়নাটা কেমন হিংস্র বন্য হাসিতে এগোচ্ছে তারপানে। মাহির ভীতু মনটা কেমন হুট করে শক্ত হলো এপর্যায়ে। মনে মনে সিদ্ধান্তে উপনীত হলো — খরগোশটাকে বাঁচাবেই। সপ্তদশী এদিক-ওদিক উদ্ভ্রান্ত দৃষ্টিতে খুঁজল কিছু। বাড়ির সামনের জমিনে পড়ে আছে বেশকিছু ছোট-বড় পাথর। মাহি'র ছোট্ট মস্তিষ্কে আচমকা এসে বাসা বাঁধল কিছু সুবুদ্ধির। সে তড়িঘড়ি করে এগিয়ে এসে দু-চারটে মাঝারি সাইজের পাথর নিলো হাতে। অতঃপর ভয়ে ভয়ে পাথরগুলো একে একে স্পটেড হায়নার গায়ে ছুড়েঁ মা'রল মাহি। এহেন অতর্কিত আক্রমণে হায়নাটা লেজ গুটিয়ে পালালো সম্মুখে। এই সুযোগে তক্ষুনি জোরালো পায়ে খরগোশটার পানে ছুটলো মাহি। হন্তদন্ত হয়ে খরগোশ ছানাকে কোলে তুলতেই তার চোখ আটকালো সামনের দিকে। কয়েক হাত দুরত্বে দাঁড়িয়ে আছে দুটো বিশালদেহী স্পটেড হায়না! তারা নিজেদের হিংস্র দাঁতগুলো বের করে তাকিয়ে আছে মাহি'র পানে। এহেন দৃশ্যে থমকায় মাহি! খরগোশ ছানাকে বুকের মাঝে চেপে ধরে তক্ষুনি ছুট লাগায় পেছনের দিকে তবে বালাইষাট! হিংস্র হায়না গুলো এক লাফে এগিয়ে এসে ঝাপিয়ে পড়ল মেয়েটার ওপর। ধারালো নখরে মেয়েটার হাত এবং পায়ে অসংখ্য আঁচড় বসিয়ে ক্ষত বসালো গভীর। মাহি চিৎকার জুড়েছে! কাঁদছে আকাশ কাঁপিয়ে। চোখমুখ খিঁচে খরগোশটাকে জড়িয়ে ধরে আছে মানবী। ঠিক তখনি অদূর থেকে ভেসে এলো কারো গর্জনধ্বনি!

“ ড্যানি, হ্যালি!”

অতিপরিচিত কন্ঠ কানে যেতেই থেমে গেল হিং*স্র হায়না দুটো। ভীষণ বাধ্যতায় নিজেদের ধারালো দাঁত কপাটি বের করে একইভাবে হুংকার ছুঁড়ল তারা। পরিচিত কন্ঠের মালিক তখন গটগটিয়ে এগিয়ে আসেন সেথায়। এসেই বলিষ্ঠ যুবক কেমন হিং*স্র থাবায় দু'হাতে চেপে ধরে হায়না দুটোর কন্ঠা! বাদামী চোখদুটোতে একপ্রকার আগুন লেপ্টে নিয়ে, শক্ত চোয়ালে চিবিয়ে চিবিয়ে আওড়ায়,

“ ও ময়্যা!”

(ও আমার!)

পোষা পশুদের মধ্যে এ এক বিরাট ধর্ম! মালিকের ব্যাক্তিগত কিছু মানে, তা তাদের জন্য নিষিদ্ধ। মুগ্ধ কটমট করছে। শক্ত হাতে হায়না দুটোর কন্ঠা চেপে আচমকা তাদের ছুঁড়ে ফেলল অদূরে। অন্য কেউ হলে এতক্ষণে হায়না দুটো নিশ্চয়ই পাল্টা আঘাত করত, তবে এ যে স্বয়ং তাদের মালিক! তার দিকে থোড়াই এগোবে তারা। তাইতো হ্যালি আর ড্যানি মাথা নুইয়ে লেজ গুটিয়ে পালালো সেখান থেকে। এদিকে তারা যেতেই পিছু ফিরল মুগ্ধ। ফর্সা মুখখানা তার কেমন লাল হয়ে আছে! উম্মুক্ত ট্যাটু আকাঁ বদনে ঘামের তীব্র উপস্থিতি। সদ্য এক্সারসাইজ ছেড়ে উঠে এলে যা হয় আরকি! যুবক ভ্রু গুটিয়ে এগিয়ে এলো মাহি'র দিকে। মাথাভর্তি অদৃশ্য আগুন নিয়ে আচমকা মেয়েটার গালে বসালো এক থাপ্পড়। এহেন কান্ডে তক্ষুনি ঠোঁট ভেঙে কেঁদে উঠে মাহি। থাপ্পড়ের তীব্রতায় গাল বাকিয়ে নিয়েছে মেয়েটা। মুগ্ধ মহাশয়ের রাগ বাড়ছে তরতর করে। সে তৎক্ষনাৎ শক্ত থাবায় মাহি'র নরম চোয়ালখানা চেপে ধরে দাঁত খিঁচে আওড়াল,

“ হোয়াট দা ফা'ক আর ইউ্য ডুয়িং হেয়ার? কোন সাহসে বাড়ি থেকে বের হলি তুই? কোন সাহসে জানোয়ারের বাচ্চা?”

হুংকার ছুঁড়ছে মুগ্ধ। যার বজ্র কন্ঠে কাঁপছে চারপাশের বাতাস। বোকা মাহি কথা বলার সাধ্যিতে নেই। মেয়েটা ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছে ভীষণ। হাতদুটো সামান্য ঢিলে হওয়ায় বুকের মাঝ থেকে ছোট খরগোশ ছানাটা আচমকা উঁকি দিলো বাইরে। তা মোটেও নজর এড়ায়নি মাফিয়া মনস্টারের। সে কেমন তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে পরোখ করল খরগোশটাকে। বিচক্ষণ মস্তিষ্কে একে একে দুই মিলিয়ে আচানক ঝাঁঝ ঢেলে জিজ্ঞেস করল,

“ সামহাউ এটার জন্য এখানে আসিসনি তো?”

নিরব মাহি! তৎক্ষনাৎ নজর ঝুঁকালো নিচে। মুগ্ধ বুঝে গেল যা বোঝার। সে তক্ষুনি এক ঝটকায় ছেড়ে দিলো মাহি'র চোয়াল। সটান হয়ে দাঁড়িয়ে কটমট করতে করতে গর্জন তুলল,

“ আর ইউ্য ডাম্ব? ইট'স জাস্ট আ রেবিট! একে বাঁচাতে নিজের প্রাণ সংকটে ফেললি কোন পাগলামিতে? হুটহাট ম'রার এতো শখ উথলে উঠল কেন তোর? পাগল হয়েছিস বান্দীর মেয়ে?”

এহেন গর্জনে থরথর করে কাপঁছে সপ্তদশী! ডিম্বাকৃতি ফর্সা মুখখানায় ছেয়ে গিয়েছে রক্তাভ আভা। এতক্ষণের দস্তাদস্তিতে চোখে আটাঁ গোল ফ্রেমের চশমাটারও বড়ো এলোমেলো অবস্থা। ঘনকালো সিল্কি চুলগুলো কেমন উষ্কখুষ্ক হয়ে আছে! সপ্তদশীর চোখেমুখে একরাশ ভয়ভীতি। বুকের কাছে দু'হাত দিয়ে আগলে রাখা সদ্য পাওয়া খরগোশগোশ ছানাকে। পরনের ফ্রকটা কেমন ছিঁড়ে গেছে বেশ কয়েক জায়গায়। দু'হাতের নরম ত্বকে গভীর আঁচড়ের দাগ। সপ্তদশী কাঁপছে ভীষণ! বুকের কাছে খরগোশ ছানাকে আরেকটু চেপে ধরে থেমে থেমে আওড়াল,

“ হোক সামান্য খরগোশ, তবুও ও একটা নিরীহ প্রাণী। নিজ চোখের সামনে একটা অসহায় প্রাণীকে কিভাবে ম'রতে দিব আমি?”

সম্মুখে দাঁড়িয়ে থাকা দীর্ঘকায়ী রূঢ় মানব কেমন কপাল গোছালো এরূপ কথায়। চোয়ালের পেশী শক্ত করে ফের,দাঁত খিঁচে ঝাঁঝাল কন্ঠে আওড়াল,

“ তাই বলে পাগলের মতো স্পটেড হায়নাদের সামনে চলে আসবি? ইউ্য ফা'কিং গ্লুপায়া, ডু ইউ্য ইভেন নো — হু দে আর? ওদের একটা কামড়ে তোর শরীরটা মুহূর্তেই ছিন্ন ভিন্ন হয়ে যেত!”

নাক টানলো মাহি! খরগোশ ছানার পশমি শরীরে খানিক হাত বুলিয়ে কাঁদো কাঁদো কন্ঠে অভিমানিনী শুধালো,

“ আমি মর'লে আপনার কি? ওহ আমাকে আর মা'রতে পারবেন না বলে আফসোস হতো তাই না?”

থামল সপ্তদশী! নাক টানছে অনবরত। এদিকে তার ওমন বাক্যে অবাকের শীর্ষে পৌঁছেছে মনস্টার। মেয়েটার মুখে কেমন খই ফুটেছে দেখো! মাহি খানিকক্ষণ সময় নিয়ে ফের বলল,

“ আমি আপনার মতো নির্দয় নই মাফিয়া বিস্ট, যে নিজ চোখের সামনে একটা অসহায় প্রাণীকে শুধু শুধু কষ্ট পেতে দেখব। আমি মানুষ! একটা নিরীহকে বাঁচাতে গিয়ে আমার যদি মরণও হয়, তবে তাই সই!”

কপালের ভাঁজ আরও গাঢ় হলো মুগ্ধের। চোয়ালের পেশি টানটান। যুবক দাঁত খিঁচে তক্ষুনি শুধালো,

“ সুযোগ পেয়ে আমায় বিস্ট ডাকছিস বান্দীর মেয়ে? এখন যদি আমি না আসতাম, তখন? তখন বোধহয় খুব ভালো হতো তাই না? বাই দা হেল ইন দ্য মনস্টার'স ওয়ে — নিজের দিকে তাকিয়েছিস একবার? ওদের একবেলার খাবার হওয়ার যোগ্যতাও তো তোর নেই। সারা শরীরে হাড্ডি ছাড়া মাংস নেই এক ছটাক! তোর মতো কাঁকলাসকে খেতে গেলে ওদেরই জাত যেত বান্দীর মেয়ে!”

চলবে.....

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২৯তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন