ফন্ট সাইজ:
থিম:
মির্জা সায়ান মুগ্ধ

৩২তম পর্ব

লেখক: জান্নাতুল ফেরদৌস মিথিলা

#মির্জা_সায়ান_মুগ্ধ — পর্বঃ৩২.ক

#jannatul_firdaus_mithila

“ চোখ যেন ওপরে না ওঠে এডউইন! উঠলেও সমস্যা নেই, সাইকি অনেকদিন ধরে চর্বিযুক্ত মানুষ খায় না!”

এহেন শান্ত স্বরের কঠিন হুমকিতে শরীর জুড়ে মৃদু ঝাঁকুনি খেলে গেল এডউইনের। সুযোগ বুঝে গিলেছে বারকয়েক শুকনো ঢোক। বেচারা ঘাড় নাড়ানোর সাধ্যিতে নেই। মনস্টারের এরূপ শক্তপোক্ত হাত এসে ওমন ঘাড় পেঁচিয়ে রাখলে থোড়াই মাথা ঝাঁকনোর সুযোগ থাকে! এডউইন স্থির চিত্তে শুনল সব। রয়েসয়ে আমতা আমতা করে কোনরকমে অস্ফুটে বলল,

“ ও-ওকে মনস্তার!”

ঠোঁটের ফাঁক গলিয়ে সিগারের কলুষিত ধোঁয়া ছাড়তে ব্যস্ত মনস্টার। সময় নিয়ে এক ঝটকায় ছেড়ে দিলো এডউইনকে। এতক্ষণে ছাড়া পেয়ে তড়িঘড়ি করে দু'হাতে নিজ ঘাড় চেপে ধরে এডউইন। ইশশ্! ঘাড়ের রগগুলো বোধহয় জমে গিয়েছে তার, একটু এদিক-ওদিক ঘাড় নাড়াতেই যা ব্যথা হচ্ছে না! পাশেই মুগ্ধ নির্বিকার ভঙ্গিতে সিগার ফুঁকছে। একহাত প্যান্টের পকেটে গুঁজে নিয়ে, ভাবলেশহীন ভঙ্গিমায় পা বাড়ায় সম্মুখে। এডউইন ততক্ষণে নিজেকে সামলিয়েছে বেশ। ঘাড়টা সামান্য এদিক-ওদিক নাড়াতেই কটমট শব্দ হলো কেমন! পরক্ষণে গম্ভীর মুখে নজর ঝুঁকিয়ে বরফ আচ্ছন্ন জমিনে দৃষ্টি ফেলতেই হকচকায় সে। একি! খরগোশটা কোথায় গেল আবার? একটু আগেই না তার হাত থেকে নিচে পড়ে গিয়েছিল? এডউইন তৎক্ষনাৎ এদিক-ওদিক দৃষ্টি বুলালো। অদৃশ্য অস্থিরতায় হন্যে হয়ে পা বাড়ালো চেরি ব্লসম গার্ডেনের দিকে।

আকাশ চিঁড়ে স্নোফল হচ্ছে! সাদা তুলোর ন্যায় বরফগুলো বাতাসের মৃদু ঝাপটায় এদিক-ওদিক ছুটছে। এহেন মৃদু স্নোফলে চেরি ব্লসম গার্ডেনের সৌন্দর্য যেন বেড়ে গিয়ে দ্বিগুণ! মাথার ওপর বড় বড় চেরি ব্লসম ট্রি। সুউচ্চ গাছের প্রতিটি ডালে ডালে থোকায় থোকায় ধরে আছে চেরি ব্লসম ফ্লাওয়ারস। সেথায় পাতার উপস্থিতি নামেমাত্রও নেই! বাতাসের মৃদু ঝাপটায় দুলছে ফুল! কেউ কেউ আবার নৈসর্গিক দৃশ্যে নিজেকে আবির্ভূত করতে ঝরে পড়ছে বরফ ঘেরা জমিনে। ব্যস্ত একজোড়া ব্যগ্র পদ লাগাতার ঘুরছে প্রতিটি গাছের নিচে। সন্ধানী চোখজোড়া হন্যে হয়ে ছুটছে এদিক-ওদিক। খুঁজছে ছোট্ট পশমি বোবা প্রাণীটাকে। তবে বেপাত্তা খরগোশ ছানা, কোথায় যে গা গুটিয়ে বসে আছে কে জানে। ছুটতে থাকা এডউইন পা থামায় এবার। সুশ্রী গৌরবর্ণা মুখখানায় লেপ্টে আছে একরাশ বিরক্তি। শেষমেশ সামান্য একটা খরগোশ কি-না তাকে ওতো দৌড় করাচ্ছে? এডউইন মহাবিরক্তিতে কপালে গোটাকতক ভাঁজ ফেলে দু'হাত তুলে কোমরে রাখল। বুক ফুলিয়ে ফোঁস করে নিশ্বাস ফেলে তেঁতো কন্ঠে চিড়বিড়িয়ে আওড়াল,

“ বা'স্টার্ড একটা! কোথায় লুকিয়ে আছে কে জানে! জাস্ট হাতের কাছে একবার পেয়ে নেই দ্যান তুলে একটা আছাড় মা'রব বেয়াদবটাকে! কতবড় সাহস আমাকে দৌড় করাচ্ছে।”

__________________________________________

ডিম্বাকৃতির কোমল মুখখানায় ছেয়ে আছে রাজ্যের আধার। গোলাপি রঙা নরম ঠোঁটযুগল কেমন ফ্যাকাশে হয়ে আছে। মাথাভর্তি কালো রঙা মেঘরাশির ন্যায় চুলগুলোর আগায় জমেছে বরফ দানা। সপ্তদশী দু'হাতে জড়িয়ে রেখেছে নিজ গা! বাইরের স্নোফল ক্রমশ জোরালো হচ্ছে। ফলে ঠান্ডায় গাকাঁটা দিয়ে উঠছে সপ্তদশীর। পরনে স্রেফ একখানা স্যাটিন কাপড়ের ফ্লোরাল ফ্রক! কাপড়ের আড়াল দিয়েই ঠান্ডাটা বুঝি বড্ড জেঁকে ধরেছে বেচারিকে। সে কেমন থরথর করে কাঁপছে! গার্ডেন পেরিয়ে পা ঘুরিয়েছে প্যালেসের সম্মুখ দুয়ারের পানে। মধ্যকার পথটা মিনিট দশেকের হলেও সপ্তদশীর এটুকু পথ পেরুতেই বুঝি বড়ো হিমশিম খেতে হচ্ছে! কাঁপা কাঁপা বদনে হাঁটার একপর্যায়ে হুট করেই থামল মাহি'র পদযুগল। পাদু’টো কেমন নীল হয়ে যাচ্ছে তার। কাশিতে ফেটে যাচ্ছে গলা! কাপত্রয়ী সপ্তদশী কিয়তক্ষন দাঁড়িয়ে রইল চুপচাপ। নিজেকে সামলে নিয়ে ফের সম্মুখে পা বাড়াতে গেলেই আচমকা টাখনুতে কেমন নরম কিছু অনুভূত হলো তার। ত্বরিত ঘাড় নুইয়ে আনলো মাহি। পায়ের দিকে দৃষ্টি ফেলতেই দেখে — কিউটি কেমন খুটখুট করছে তার পায়ের কাছে। মাহি দৃষ্টি চোখা করল এবার। কিউটি একা কেন? সে তো এডউইনের কোলে ছিল! তাহলে এভাবে ঠান্ডার মধ্যে একা একা ঘুরছে কেন কিউটি? মাহি তড়িঘড়ি করে হাত নুইয়ে কিউটিকে কোলে নিলো। আলগোছে পিঠ ঘুরিয়ে পেছনে তাকিয়ে দেখল এডউইনকে দেখা যাচ্ছে কি-না। তবে নাহ! এডউইন তো দূর, তার টিকিটাকেও দেখা যাচ্ছে না কোথাও। মাহি ভ্র কুঁচকায়! প্রিয় সখার প্রতি এডউইনের ওমন অবহেলায় বড্ড ব্যথিত হলো সে। মুখাবয়ব গম্ভীর করে হাঁটা ধরল পরক্ষণে।

কোমল হাত-দুখানার উষ্ণ বাঁধনে গা গুটিয়ে বসে আছে কিউটি। পশমী দেহে বড্ড আরাম পেয়ে দাঁতে দাঁত ঘষে গ্রু-গ্রু শব্দ তুলছেন মহাশয়। এক-আধবার যেচে পড়ে মুখ লুকচ্ছে সপ্তদশীর বুকে। প্রিয় সখার এরূপ আদুরে কান্ডে মুচকি হাসছে মাহি। গুনে গুনে সিড়িঁর ওপর পা ফেলছে কেমন। তার বিরতিহীন পদযুগল সিঁড়ি ছেড়ে মার্বেলের মেঝেতে পড়তেই দরজার দু'ধারে দাঁড়িয়ে থাকা সশস্ত্র গার্ডরা তৎক্ষনাৎ দু-হাটুঁ গেঁড়ে মাথা ঝুঁকিয়ে বসল কেমন! হুটহাট এহেন কান্ডে হকচকায় মাহি। ভড়কে পিছিয়ে যায় দু-কদম। চোখেমুখে একরাশ হতবাকতা লেপ্টে মনে মনে আওড়ায়,

“ এদের আবার কি হলো? আমাকে কুর্নিশ জানাচ্ছে কেনো?”

মনের কোণে উত্থাপিত হওয়া এরূপ প্রশ্নের জবাবে মানানসই উত্তর পায়নি সপ্তদশী। বোকার মতো লোকগুলোর পানে কিয়তক্ষন তাকিয়ে থেকে ভয়ে ভয়ে এগিয়ে গেল ভেতরে। এদিকে সপ্তদশী সম্মুখ থেকে আড়াল হতেই হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন বেচারা গার্ডস। কেউ কেউ তক্ষুনি স্যুটের হাতা উঁচিয়ে আলগোছে মুছে নিলেন নিজেদের ঘর্মাক্ত কপালখানা। যা বোঝা যাচ্ছে, ভীতু মাহি'র উপস্থিতি এখন থেকে সবার জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে।

★

তিন তলার লম্বা প্রশস্ত করিডর দিয়ে হাঁটছে মাহি। একমনে কিউটির সাথে বলে যাচ্ছে রাজ্যের সব কথা। এরইমধ্যে পেছন থেকে ধেয়ে এলো এক অতিপরিচিত কন্ঠ!

“ মুনলাইট!”

থমকায় সপ্তদশীর ব্যস্ত পদযুগল। নিশ্বাসের গতি হলো তীব্রতর! ঘাড়টা বুঝি ঠায় জমে গিয়েছে তার। সৌজন্যবোধে পিছু ঘুরে তাকানোর কথা থাকলেও মাহি দাঁড়িয়ে রইল আগের ন্যায়। এদিকে মাহি'র কয়েক হাত দূরে দাঁড়িয়ে আছে মিলা। তরুণীর চোখদুটো ছলছল! চোখের কোটর বেয়ে টুপ টুপ করে ঝরছে কয়েক দানা অশ্রু। তরুণী কোনরূপ কালবিলম্ব না করে এগোয় জোরালো কদমে। ছুটে এসে আচমকা পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে সপ্তদশীকে। এহেন আচানক ঘটনার আকস্মিকতায় ভড়কায় মাহি। হুটহাট তাল সামলাতে না পেরে সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ে একটুখানি। পেছনে হাউমাউ জুড়ে কাঁদছে মিলা। চোখের অবাধ নোনাপানিতে ভিজিয়ে দিচ্ছে মাহি'র পিঠ। তার ওমন কান্নায় বুক ভার হয়ে গেল সপ্তদশীর। মনে জেকেঁ ধরল একরাশ অপরাধবোধে। সে-তো পালিয়েছিল মিলাকে ধোঁকা দিয়ে। তার এহেন কান্ডে সবাই নিশ্চয়ই তাকে না পেয়ে মিলার ওপর অনেক অত্যাচার করেছে! এহেন চিন্তায় অপরাধবোধের পারদ তরতর করে বেড়ে গেল মাহি'র। চোখদুটোর কোটর ভরে গেল আপনাআপনি। গলার কাছটা ওমন হুট করে ওতো যন্ত্রণা দিচ্ছে কেন কে জানে! ইশশ্! এই বুঝি কেউ সজোরে চেপে ধরেছে তার কন্ঠা। যার দরুন গলা দিয়ে বেরুচ্ছে না এক ছটাক স্বরও। ওদিকে মিলার বেগ বেড়েছে কান্নার। হাতের শক্ত বাঁধনে চেপ্টা হচ্ছে মাহি, অথচ সেদিকে থোড়াই খেয়াল আছে তরুণীর? সে-তো নিজ কান্নায় মত্ত। মাহি আটকালো না মিলাকে। কান্না করে যদি বেচারি একটুখানি স্বস্তি পায়, তাহলে থাক না! সে কাঁদুক ইচ্ছে মতো।

সময়ের কাটাঁ চলমান! দেখতে দেখতে পেরুলো প্রায় মিনিট পাঁচেক। এতক্ষণে কান্না থামিয়ে নাক টানছে মিলা। হাতের বাঁধন ঢিলে করেছে বেশ। মাহি ওমন কড়া হাতের বাঁধন থেকে ছাড়া পেতেই আলগোছে ঘুরে দাঁড়াল। পরক্ষণে মিলার ক্রন্দনরত মুখখানার পানে তাকালো সরু চোখে। সুশ্রী গৌরবর্ণা বিদেশিনীর কাঁদতে কাঁদতে সে-কি বেহাল দশা। ছলছল চোখদুটো একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে মাহির পানে। মলিন মুখখানা কান্নার তোড়ে হয়ে গিয়েছে এইটুকুন! মোটা নাকের পা'টাটা ফুলে উঠেছে খানিক। মাহি ভেজা চোখে মুচকি হাসল। আলতো করে নাক টেনে ধরে আসা গলায় কিছু বলবে তার আগেই সম্মুখ থেকে হড়বড়িয়ে এক-কদম এগিয়ে আসে মিলা। ব্যাকুল চিত্তে আগ বাড়িয়ে মাহির হাতদুটো উল্টেপাল্টে ব্যগ্র কন্ঠে বলে ওঠে,

“ কেমন আছো তুমি মুনলাইট? তোমার কোনো ক্ষতি হয়নি তো? মনস্টার তোমায় মে'রেছে বাচ্চা? বলোনা আমায়! কোথায় মে'রেছে তোমায়?”

কান্না ভুলে হতবিহ্বলের ন্যায় তাকিয়ে আছে মাহি। মিলার ওমন উৎকন্ঠা দেখে মস্তিষ্ক ফাঁকা হয়ে গেল তার। ওদিকে মিলা এবার অস্থির দৃষ্টি তুলে তাকাল মাহি'র মুখপানে। মেয়েটার ফর্সা কপোলে আঙুলের স্পষ্ট ছাপ দেখে ফের ফুপিয়ে উঠে মিলা। ফোপাঁতে ফোপাঁতেই বলে ওঠে,

“ মনস্টার আবারও তোমায় মে'রেছে তাই না?”

সপ্তদশী চিবুক নামিয়েছে গলার কাছে। আলতো করে নাক টেনে ধরে আসা গলায় থেমে থেমে বলে,

“ মা'রে না কবে?”

বুকটায় কেমন হুট করে যন্ত্রণা হচ্ছে মিলার। সে কেমন অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো মাহি'র পানে। রয়েসয়ে আলগোছে নিজের শীতল হাতখানা উঁচিয়ে রাখল মাহি'র নরম ডান গালে। থেমে থেমে মোটা কন্ঠে আওড়াল,

“ আমাকে না বলে কেন পালালে মুনলাইট? আমাকে একটাবার জানালে কি খুব বেশি ক্ষতি হতো?”

ফের নিজের সুপ্ত অপরাধবোধ মাথাচাড়া দিয়ে উঠল মাহি'র। সপ্তদশী ছলছল নয়ন উঁচিয়ে তাক করল মিলার পানে। অতঃপর আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলোনা সে। দু'হাতে কিউটিকে ঝাপটে ধরে কেঁদে উঠল কেমন! মিলা অসহায় নয়নে তাকিয়ে রইলো কেবল। আলতো করে ডানহাত উঁচিয়ে রাখল মাহি'র মাথার ওপর। সেথায় খানিক হাত বুলিয়ে নিরবে স্বান্তনা দিয়ে গেল সপ্তদশীকে। মাহি কাঁদতে কাঁদতেই একপর্যায়ে হেঁচকি তুলে বলে,

“ পালাতাম না-তো কি করতাম মিলা? শুধু শুধু এ কারাগারে জীবন্ত লাশের ন্যায় বেঁচে থাকার আদৌও কোনো মানে আছে? ঐ রাক্ষস যতোই বলুক — আমাকে ছ'মাসের জন্য এনেছে, তবে আমি জানি! সে আমায় আমৃত্যু তিলে তিলে যন্ত্রনা দেবার জন্য এখানে এনেছে। হোক না এটা এক টুকরো স্বর্গ! তবুও দিনশেষে এটা কারাগার!”

থামল সপ্তদশী! কান্নার বেগ ক্রমশ নিয়ন্ত্রণহীন হচ্ছে। ক্ষুদ্র দেহটা কেমন কেঁপে কেঁপে উঠছে। মিলা নিজেও নিরবে কাঁদছে সপ্তদশীর কান্না দেখে। আগ বাড়িয়ে স্বান্তনার বাণী আওড়ানোর ভাষা খুঁজে পাচ্ছে না সে। মাহি এক লহমা চুপ থেকে ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের হাসি টানলো কেমন। তাচ্ছিল্য ভরা কন্ঠে ফের বলল,

“ যখন-তখন আমার ওপর অমানবিক জুলুম চালানো মনস্টার আবার আমি কিছু চাওয়ার সাথে সাথে হাজির করে আমার সামনে। ক্লজেট ভর্তি করেছে কাপড়চোপড় দিয়ে, ট্রাকভর্তি স্ন্যাক্স, ইভেন হাবিজাবি কতকি! অথচ এই এতো এতো কিছু যে মোটেও আমার মন ভোলাতে সক্ষম নয় মিলা। আমি চাই আমার পরিবারকে! আমি চাই আবারও আগের মতো নির্ভয়ে বাঁচতে। মায়ের ভীতু মাহি হয়ে থাকতে। অথচ সে আমায় বন্দী করে নিজের শত্রুতা মেটাচ্ছে! আমায় দেখলে না-কি তার বমি আসে। আমি নাকি অযোগ্য! আমার র*ক্ত খারাপ! হ্যাঁ এটা সত্যি সে আমায় শারিরীক ভাবে স্পর্শ করেনি তবে সে-যে আমায় মানসিক ভাবে ভেঙে ফেলেছে মিলা। বড্ড ভেঙে ফেলেছে! এবার তুমিই বলো মিলা — এমন একটা বিস্টের কাছ থেকে পালাতে চাওয়াটা কি আমার অপরাধ? জানিনা সেদিন আমি ওতো সাহস কোত্থেকে পেয়েছি, তবে মনোবল শক্ত করে জঙ্গলের পথ দিয়ে পালাতে চেয়েছি। ভাগ্যিস সেদিন সিড ছিল। নয়তো কখনোই ঐ দূর্গম পথ দিয়ে... ”

“ ও সিড নয়!”

সপ্তদশীর কথার মাঝেই গম্ভীর কন্ঠে বাঁধ সাধল মিলা। তার এহেন বাক্যে ভ্রু-গোটায় মাহি। চোখেমুখে স্পষ্ট সন্দিহান ভাব ঢেলে আওড়াল,

“ তুমিও বলছো এ কথা? সেদিন ঐ বিস্টও বলেছে ওটা নাকি সিড ছিল না। অথচ আমার স্পষ্ট খেয়াল আছে সেটা সিড ছিল। আশ্চর্য! তোমরা আমার কথা বিশ্বাস করছো না কেন?”

শেষ কথাটুকু অভিমানে শুধায় মাহি। সম্মুখে দাঁড়িয়ে থাকা মিলার মুখভঙ্গি গম্ভীর! তা দেখে ফের নাকের পাটা ফুললো মাহি'র। অভিমানী মন ধরেই নিলো — মিলাও তাকে অবিশ্বাস করছে। এবারে সুপ্ত রাগটুকু তরতর করে বেড়ে গেল সপ্তদশী রাগিণীর। কোলের মাঝে কিউটিকে চেপে পা ঘোরালো উল্টোপথে। গটগটিয়ে দু-কদম হাঁটতেই পেছন থেকে আচমকা তার ডানহাতের কব্জি টেনে ধরে মিলা। মাহি'র পদযুগল থামলেও সে ঘুরে তাকানোর প্রয়োজনবোধ করেনি। উল্টো কন্ঠে একরাশ ঝাঁঝ ঢেলে বলল,

“ হাত ছাড়ো মিলা! আমি ঘরে যাব। আই নিড সাম টাইম এলোন।”

সপ্তদশীর ঝাঁঝ মিশ্রিত স্বর শুনেও হাত ছাড়তে নারাজ মিলা। সে তক্ষুনি নিজ চোখেমুখে একপ্রকার উচাটন ভাব টেনে চটপট কদমে এগিয়ে এসে দাঁড়াল মাহির মুখোমুখি। মাহি সঙ্গে সঙ্গে নাক ফুলিয়ে মুখ ঘোরায় অন্যত্র। কপালে গোটাকতক ভাঁজ ফেলে গমগমে গলায় আওড়ায়,

“ সরো সামনে থেকে। সবার ভাষ্যমতে আমি তো মিথ্যেবাদী তাই না? শুধু শুধু উল্টাপাল্টা মিথ্যে বকবক করে যাচ্ছি!”

সপ্তদশীর কন্ঠে একরাশ অভিমান। ডিম্বাকৃতি মুখটায় ফুটে উঠেছে এক আকাশসম ঝাঁঝ। মিলা চিন্তিত হলো। সহসা মাহি'র নরম-সরম কব্জিখানা ছেড়ে দিয়ে আলগোছে চেপে ধরল মেয়েটার দু-কাধঁ। পরক্ষণেই গলায় অসামান্য অস্থিরতা ঢেলে আওড়াল,

“ কেন বুঝতে চাচ্ছো না মুনলাইট? সেদিন শুধু মেইডেন ম'রেনি, সেই সঙ্গে ম'রেছে সিডও। তোমার সাথে সেদিন যা যা হয়েছে সবটা সিডের পূর্ব পরিকল্পনা ছিল। এমনকি সিড-ই তোমার জন্য সিডেটিভ ড্রা গ স এনে দিয়েছিল। তাছাড়া তুমি বারবার বলছ তুমি সিডের সাথে পালিয়েছিলে, অথচ সিড দেখতে মোটেও তুমি যার সাথে পালিয়েছিলে তার মতো ওতো কালো ছিল না। না সিডের মুখে তেমন কোনো দাগ ছিল। তাহলে তুমি কোন বুদ্ধিতে বারবার বলছ — সেটা সিড?”

আচমকা নজর ঘোরালো মাহি। তক্ষুণি সঙ্কুচিত হলো তার দৃষ্টিযুগল। ভ্রু-দ্বয়ের মাঝে ভাঁজ পড়ল কয়েকটা। মুখখানা সে-কি গম্ভীর হয়েছে তার। সে কেমন একদৃষ্টে মিলার পানে তাকিয়ে রইলো কিয়তক্ষন। মিলার চোখেমুখে এক অদ্ভুত বিরক্তি! মাহি'র দৃষ্টি এড়ায়নি তা। সে কেমন সন্দিগ্ধ গলায় আওড়াল,

“ ওয়েট! তুমি কি করে জানলে, সেদিন আমি যার সাথে পালিয়েছিলাম সে দেখতে কালো ছিল? আর তার মুখে দাগও আছে! স্ট্রেঞ্জ! যে কথা খোদ মনস্টারও এখন অব্ধি জানতে পারেনি, সেটা তুমি জানলে কি করে মিলা? তুমি তো আমার আশেপাশে ছিলে না!”

থমকায় মিলা! মাহি'র কাঁধ থেকে আলগা হলো তার হাত যুগল। মাহি আড়দৃষ্টে দেখল সব। মুখাবয়বে এক আকাশসম সন্দিগ্ধ ভাব তার। মিলা কেমন কাচুমাচু করছে দেখো! দৃষ্টি লুকচ্ছে এদিকওদিক। মাহি এবার মুখ খুলল। ঠান্ডা অথচ গম্ভীর কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,

“ ছেলেটা কে মিলা?”

তৎক্ষনাৎ সর্বাঙ্গে কাঁপন ধরে গেল মিলার। ঠোঁটের ফাঁক গলিয়ে নিশ্বাস টানছে জোরালো। মেয়েটার ওমন হুটহাট অস্থিরতা দেখে মনে মনে ব্যাপক শঙ্কিত মাহি। ভ্রুযুগল কুঁচকে রেখে তক্ষুনি চেপে ধরল মিলার একহাত। মিলা ভড়কায়। চোরের মতো কাচুমাচু করতে করতে চোখ তুলে সামনে তাকাতেই দৃষ্টি থমকায় তার। হুট করেই সর্বাঙ্গ কাঁপতে লাগল তরুণীর। মাহি অবাক হলো এহেন কান্ডে। তড়িঘড়ি করে মিলার দৃষ্টিতে দৃষ্টি ফেলতেই খেয়াল করল — মিলা তাকিয়ে আছে তারই পেছনে। মাহি ভ্রু গুটিয়ে মিলার দৃষ্টি অনুসরণ করে ঘাড় বাকিয়ে পেছনে তাকাতেই দেখে — অদূরে দু'হাত পকেটে গুঁজে দাঁড়িয়ে আছে এডউইন। মুখটা ভীষণ শক্ত তার! চোয়াল ফুটেছে তীক্ষ্ণ ভাবে। তার ক্ষুদ্র দৃষ্টি একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে মিলার পানে। আর মিলা তার চাহনি দেখে কাঁপছে! মাহি বুঝলোনা এদের কান্ড। হতবুদ্ধির ন্যায় এডউইনের দিকে তাকিয়ে থাকতেই দেখল — এডউইন কেমন হুট করে রহস্যময় বাঁকা হাসলো। প্যান্টের পকেটে দু'হাত গুঁজে পায়ে টানলো গতি। মিলা তৎক্ষনাৎ ভয়ে পিছিয়ে গেল দু-কদম। তার টের পেতেই ঘুরে তাকায় মাহি। সন্দিহান গলায় যেইনা কিছু জিজ্ঞেস করবে তার আগেই মিলা কেমন চটপট ভঙ্গিতে বলে ওঠে,

“ তুমি ঘরে যাও মুনলাইট! আমি...পরে আসব তোমার কাছে।”

বলেই পা চালায় মিলা। তড়িঘড়ি করে স্থান ত্যাগ করল তরুণী। এদিকে তার এহেন উদ্ভট কান্ডগুলো বড্ড রহস্যময় ঠেকল মাহি'র কাছে। সপ্তদশী ভেবে ভেবে খুঁজে যাচ্ছে এর কারণ। এরইমধ্যে তার খুব নিকট থেকে শোনা গেল এডউইনের গম্ভীর অথচ শান্ত কন্ঠের অদ্ভুত হুশিয়ারী —

“ এই প্যালেসে হুটহাট কাউকে বিশ্বাস করবেন না মুনবার্ড। ইভেন আমাকেও না!”

তৎক্ষনাৎ স্থির হয়ে গেল মাহি! শীরঁদাড়া বেয়ে এই বুঝি নেমে গেল এক শীতল স্রোত! কেন যেন হুট করেই ভয় হচ্ছে তার। ঘাড় বাকিয়ে পেছনে ঘুরে তাকানোর সাহস পাচ্ছে না সপ্তদশী! সে কেমন ঢোক গিলছে ক্ষনে ক্ষনে। মিনিট দুয়েক যেতেই নিজেকে খানিক স্থির করে নিয়ে তক্ষুনি পিছু ফিরল মাহি। আর ওমনি চোখদুটো যেন এক্ষুণি কোটর ছাড়িয়ে বেরিয়ে আসবে বেচারির। সম্মুখটা পুরো ফাঁকা! এডউইন নেই এখানে। আশ্চর্য! এইমাত্র না এডউইনের কন্ঠ শুনল সে? তাহলে এরইমধ্যে লোকটা কোথায় চলে গেল? হাওয়ায় মিলিয়ে গেল নাকি? মাহি'র মাথা ধরে গেল নানান চিন্তায়। মিলা কিভাবে জানলো ঐ লোকের কথা? আর এডউইনকে হঠাৎ সামনে দেখে সে ওমন ঘাবড়ে গেল কেন? মাহি কেমন হাসফাস করছে দাঁড়িয়ে থেকে। মস্তিষ্কে ফের বাজছে — এ প্যালেসে কাউকে বিশ্বাস করা যাবে না! কাউকে মানে কাউকে না।

___________________________________________

সকাল হয়েছে বহুক্ষণ! তবুও আকাশে গুঁড়ি গুঁড়ি মেঘেদের উপস্থিতি স্পষ্ট। সকাল থেকে স্নোফলের বেগ কমেছে কিছুটা। তবে হাড় কাঁপানো ঠান্ডা হাওয়া বইছে চারপাশে। ফায়ারপ্লেসে আগুন জ্বালিয়ে দিব্যি আগুন পোহাচ্ছ সপ্তদশী। রাতভর ঘুম হয়নি তার। মগজে খেলেছে নানান দুষ্কর প্রশ্ন। ফলাফল স্বরুপ — সপ্তদশীর চোখেমুখে লেপ্টে আছে একরাশ ক্লান্তির ছাপ। কোলে খেলছে কিউটি। বেচারা চুকচুক শব্দ তুলছে বেশ। বোধহয় ক্ষুধা পেয়েছে তার। মাহি বুঝল! তড়িঘড়ি করে কিউটিকে দু'হাতে তুলে আদুরে কন্ঠে বলল,

“ ডু ইউ্য ওয়ান্না ইট সামথিং?”

বোবা প্রাণী আগের ন্যায় চুকচুক শব্দ তুলে সম্মতি জানালো কেমন। মাহি মুচকি হাসলো তা দেখে। আলগোছে কিউটিকে কোলে নিয়ে বেরিয়ে গেল খাবারের উদ্দেশ্যে!

★

টুংটাং শব্দ তুলে এলিভেটর দুয়ার খুলল! ভেতর থেকে আলতো করে উঁকি দিল মাহি। সাহস করে নিচে নেমে এসেছে তবে এবার কোথায় যাবে সে? কার কাছে চাইবে কিউটির জন্য খাবার? মাহি ঠোঁট কামড়ে ভাবল কিছু। একপল কিউটির দিকে তাকিয়ে থেকে ফোঁস করে নিশ্বাস ফেলে বেরিয়ে এলো পরক্ষণে। ধীরেসুস্থে সম্মুখে পা বাড়িয়েই তৎক্ষনাৎ চোখ জোড়া বন্ধ করে নেয় মাহি। গ্রাউন্ড ফ্লোরের লাউঞ্জের পাশ কাটিয়ে যাবার সময় হাঙর গুলো মানুষ দেখলেই দাপাদাপি শুরু করে দেয়! মাহি'কে দেখলেও বোধহয় একই কাজ করবে তারা। মাহি ভুলেও চোখ খুলল না হাঁটার মাঝে। ভয়ে ভয়ে পা গুনে গুনে এগোলো কোনমতে। কিন্তু ঠিক তখনি ঘটল আরেক কান্ড! বেয়াদব কিউটিটা হুট করে মাহি'র কোল থেকে লাফিয়ে নেমে গেল ফ্লোরে। মাহি ভড়কায়! তক্ষুনি কুঁচকে রাখা চোখজোড়া খুলে সামনে তাকাতেই দেখে — কিউটি ছুটন্ত পায়ে এগোচ্ছে। ছুটতে ছুটতে চলে যাচ্ছে সদর দরজার দিকে। মাহি তৎক্ষনাৎ গলা উঁচিয়ে ডাকল সখাকে —

“ কিউটি! স্টপ!”

শুনলোনা কিউটি। দৌড়াতে দৌড়াতে চলে গেল প্যালেসের বাইরে। এদিকে তার এহেন কান্ডে চিন্তায় পড়ল মাহি। বাইরে যা ঠান্ডা হাওয়া বইছে! ওমন ঠান্ডায় কিউটি তো জমে যাবে। মাহি দ্রুত পদ বাড়াল সম্মুখে। চপল পায়ে টুকটাক শব্দ তুলে ছুটল সপ্তদশী। এবারেও সে বাইরে বেরুতেই গার্ডরা ঝুঁকে বসল। মাহি তাদের দিকে ভ্রুক্ষেপহীন! এক আকাশসম বিচলিত ভাবস্রোতে বেরিয়ে গেল প্যালেস থেকে।

মাথার ওপর স্নোফল! চারপাশের হাড় কাঁপানো ঠান্ডা! মাহি নিজেই বোধহয় জমে যাবে এবার। বেচারি দু'হাতে নিজের গা জড়িয়ে রেখে এগোচ্ছে চেরি ব্লসম গার্ডেনের দিকে। ঠান্ডায় দাঁতে দাঁত লেগে যাচ্ছে তার। অথচ কিউটিকে দেখো! অদূরের গার্ডেনের বরফে আচ্ছাদিত জমিনের ওপর বসে থেকে কুটকুট করে কি যেন চিবুচ্ছে। মাহি টলমল কদমে অবশেষে এলো তার কাছে। কাঁপতে কাঁপতে বরফের পুরু আস্তরণের ওপর পা ভাঁজ করে বসতেই হুট করে এক অদ্ভুত ভালো লাগায় ছেয়ে গেল তার শরীর। চারিদিকের চেরি ব্লসমের স্নিগ্ধতা! মৃদু হাওয়ায় দুলছে ফুলের পাপড়ি! মাথার ওপরে স্নোফলের সাথে সাথে ফুলের পাপড়িগুলোও ঝরে পড়ছে তার গায়ে। মাহির ঠোঁটের কোণে আচমকা ফুটে উঠল এক চিলতে মুগ্ধতার হাসি। সে সহসা দু'হাত ছড়িয়ে শুয়ে পড়ল বরফের ওপর। চোখদুটো নিবুনিবু তার! ওপর থেকে ঝরে পড়া ফুলগুলো এসে ঢেকে দিচ্ছে তার মুখ! মাহি খিলখিল করে হাসছে এবার। তার এহেন আনন্দের সঙ্গী হলো কিউটি। তক্ষুনি ছুটে এলো মাহি'র বুকের ওপর। মাহি দু'হাতে আলগোছে উঁচিয়ে তুলল কিউটিকে। কিউটির শুভ্র শরীর, লাল চোখ, কুটুকুটু দাঁত! কি যে নজরকাড়া লাগছে সপ্তদশীর কাছে! মেয়েটা খিলখিলিয়ে হাসছে ফের। আলতো করে এক আঙুল দিয়ে কিউটির পেটে মৃদু সুড়সুড়ি দিয়ে, কন্ঠে একরাশ মুগ্ধতার সুর টেনে বলে ওঠে,

“ ইউ নো হোয়াট কিউটি? আমার দেখা এ পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর প্রাণী তুমি!”

সপ্তদশীর জিভ খসে কথাটা বেরিয়েছে সেকেন্ড খানেক হবে বোধহয়। ঠিক তখনি দু -কদম দূর থেকে হুট করে তার কর্ণকুহরে ভেসে এলো কারো সন্দিগ্ধ গম্ভীর নারাজি কন্ঠ!

“ আমার চাইতেও বেশি সুন্দর?”

#মির্জা_সায়ান_মুগ্ধ _ পর্বঃ ৩২(খ)

#jannatul_firdaus_mithila

(⛔ উক্ত গল্পে কোনো ধরনের ধর্মীয় বিশ্বাস কিংবা চেতনাকে ছোট কিংবা নজর-আন্দাজ করা হয়নি। উক্ত গল্পের সম্পূর্ণ ঘটনা, প্রেক্ষাপট কাল্পনিক এবং নিজস্ব চিন্তাধারায় তৈরী।⛔)

.🥀🥀..

“ আমার চাইতেও বেশি সুন্দর?”

সহসা মুখের উজ্জ্বল হাসিটা নিভে গেল সপ্তদশীর। গমগমে কন্ঠস্বর কানে যেতেই বুক কেঁপে উঠল খানিক। বরফের পুরু আস্তরণে দেবে থাকা উষ্ণ শরীরটা তড়িঘড়ি করে শোয়া ছেড়ে উঠে বসতে তৎপর হলো কেমন। সপ্তদশীর দু-হাতের নরম বাঁধন ঢিলে হয়েছে ইতোমধ্যে। সেই সুযোগে কিউটি মহোদয় লাফ দিয়েছে পাশে। কয়েকহাত দুরত্বে দাঁড়িয়ে থাকা নির্দয় মানবের একজোড়া বাদামী চোখ কেমন সরু দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মাহি'র পানে। তার চোখদুটোতে একরাশ সন্দিগ্ধ ভাবসাব! চোয়াল শক্ত, নিখুঁত ভ্রু-দ্বয় কুঁচকে আছে সামান্য। মাথার ওপর ওমন ভারী স্নোফল হওয়া স্বত্বেও যুবকের ফর্সা উদোম গায়ে কাপড়ের ছিটেফোঁটা অব্ধি নেই। ঢিলেঢালা ট্রাউজারের ডোর অবহেলায় ঝুলছে উদরকুন্ডের বেশ নিচে! ফলে দৃশ্যমান হচ্ছে রূঢ় মানবের বেপরোয়া, উদাসীন ভাব। দিনের আলোয় স্পষ্টতর যুবকের টানটান বলিষ্ঠ দেহ! মাথার চুলগুলো আজ-ও এলোমেলো তার। দু'হাত গুঁজে রাখা পকেটে। এদিকে ঠান্ডা হাওয়ার লাগামহীন স্পর্শে গায়ে কাঁপন ধরছে মাহি'র। বেচারি এতক্ষণে টের পেল ঠান্ডার তীব্রতা। কাঁপতে কাঁপতে দু'হাত মুখের কাছে এনে, ঠোঁটের ফাঁক গলিয়ে উষ্ণ ধোঁয়া ছাড়ছে সপ্তদশী। কোনরকমে টলতে টলতে দাঁড়িয়েছে সে। আড়দৃষ্টে অদূরের রূঢ়ভাষী মানবের পানে একপল তাকাতেই চোখদুটো আপনা-আপনি কপালে উঠে গেল তার। যেখানে সে কাপড় পড়েও কাঁপছে, সেখানে রা'ক্ষসটা কি-না উদোম গায়ে দাঁড়িয়ে আছে? তার কি ঠান্ডা লাগছে না? নিজের অহেতুক ভাবনায় মত্ত সপ্তদশী, বেমালুম ভুলে গেল মনস্টারের করা প্রশ্নের জবাব দিতে। তার এহেন অবাধ্যতায় চোয়াল ফুটল বিপরীত মানুষটার। চোখদুটোতে ছেয়ে গেল অদৃশ্য আগুন। সে কেমন কিড়মিড় করতে করতে এগোচ্ছে সম্মুখে। মাহি আড়দৃষ্টে যুবকের অগ্রসর পদ পরোখ করতেই হকচকিয়ে পিছিয়ে যায় দু-কদম। ঠান্ডায় জমে যাচ্ছে তার বদন! নরম-সরম হাতদুটো একে-অপরের সনে ঘষে যাচ্ছে অনবরত। অথচ যুবক কেমন নির্লিপ্ত ভঙ্গিমায় এগোচ্ছে দেখো! পায়ের গতি মাহি'র বেশ নিকটে এনে দাঁত খিঁচে আওড়াল,

“ ম'রার জন্য জায়গার অভাব পড়েছিল বান্দীর মেয়ে? শুধু শুধু সময় নষ্ট করে এই ঘন তুষারপাতে বের হলি কেনো? এরচেয়ে বরং প্যালেসের ছাঁদ থেকে একটা লাফ দিতি।”

তড়াক জ্বলে উঠল সপ্তদশীর মাথার তালু। নাকের পাটা ফুললো সামান্য। ফর্সা কপোলে টকটকে লালাভ আবরণ ফুটেছে বেশ আগে, তবে যুবকের এহেন অহেতুক খোঁচায় তা আরও গাঢ় হয়েছে এবার। তেলেবেগুনে ছ্যাৎ করে উঠার ন্যায় গজগজ করতে করতে মাহি শুধায়,

“ যখন-তখন ভুলভাল বকবেন না! আমি এখানে ম'রতে আসিনি।”

দৃষ্টিযুগল সরু হলো মুগ্ধের। চোয়ালের পেশী আগের ন্যায় টানটান। মুখাবয়বে একরাশ বিরক্তি লেপ্টে যুবক ফের খেঁকিয়ে বলল,

“ তাহলে কি এই ঠান্ডার মধ্যে বাদঁরের মতো নাচতে এসেছিস বান্দীর মেয়ে?”

দাঁতে দাঁত চাপলো মাহি। রাগ-ক্ষোভে তক্ষুনি মুখ ঘোরায় অন্যত্র। যুবকের একেকটা কথা যেন তার মাথাভর্তি অদৃশ্য আগুনে ঘি ঢালতে সক্ষম। সপ্তদশী বয়সের তুলনায় রাগ দেখাল বেশ। মনের কোণে বিন্দুমাত্র ভয় না রেখে সঙ্গে সঙ্গে কড়া কন্ঠে জবাব দিলো —

“ ফর ইউ্যর কাইন্ড ইনফরমেশন — আমি নাচতে পারিনা! সো উল্টাপাল্টা কথা বলবেন না।”

মেয়েটার এহেন তিরিক্ষি জবাবে কপাল গুটিয়ে চাইলো মুগ্ধ। মস্তিষ্কে জ্বলে উঠল আগুন। যুবক কেমন সাপের ন্যায় ফোঁস ফোঁস করতে করতে আচানক এক হিং স্র থাবায় আঁকড়ে ধরল মাহি'র নরম চোয়াল। তার ওমন অতর্কিত আক্রমণে বিলকুল ভড়কায়নি মাহি। উল্টো চোখমুখ খিঁচে চোয়াল শক্ত করে রাখল কেমন! মুগ্ধ হিসহিসিয়ে যাচ্ছে। শক্তপোক্ত হাতের আঙুলে জোর বাড়িয়ে কর্কশ কন্ঠে বলে ওঠে,

“ নাচতে পারিস না তবে মুখে মুখে তর্ক তো ভালোই করতে পারিস ঘাড়ত্যাড়ার ঘরে ঘাড়ত্যাড়া। কতবড় সাহস হলে আমার মুখে মুখে তর্ক করিস! দেই এবার চোয়ালটা ভেঙে বেয়াদবের বাচ্চা?”

নাক ফুলিয়ে একাকার মাহি। কপালে ফেলেছে গোটাকতক ভাঁজ। নিজেকে শক্ত রাখার কপট প্রয়াসে বরাবরের ন্যায় ব্যর্থ বেচারি। চোয়ালের তীব্র যন্ত্রণায় ছটফটিয়ে উঠে এবার। যুবক বুঝি এক্ষুণি নিজের রাক্ষুসে শক্তিতে তার চোয়ালখানা ভেঙে গুড়িয়ে দিবে । মাহি'র ঠোঁটের ফাঁক গলিয়ে অস্ফুটে বেরুলো ব্যথাতুর শব্দ। তা কর্ণকুহরে পৌঁছাতেই ক্রুর হাসল মুগ্ধ। মাহি'র তুলতুলে নরম গালে নিজ শক্তপোক্ত মোটা মোটা আঙুলগুলো বেশ দাবিয়ে দাঁত খিঁচে আওড়াল,

“ ব্যথা লাগে বান্দীর মেয়ে? অথচ আমার সামনে তোতাপাখির মতো চোয়াল নাড়ানোর সময় একবারও বুক কাঁপে না তোর? এই তোর আমাকে ভয় লাগে না বান্দীর মেয়ে?”

চোয়াল ভঙ্গুর প্রায়! তবুও ঝাঁঝ কমেনি সপ্তদশীর। মাথাটা ত্বরিত দু'ধারে নাড়িয়ে চট করে চোয়ালটা ছাড়িয়ে নিলো মুগ্ধের হাত থেকে। ব্যথাতুর চোয়াল নাড়িয়ে তিরিক্ষি কন্ঠে আচমকা বলে ওঠে —

“ না লাগে না আপনাকে ভয়! একদম লাগে না!”

কথাটা জিভ খসে বেরুনোর পরপরই সপ্তদশীর নরম তুলতুলে ডান গালটায় আচমকা সপাটে বসল এক থাপ্পড়। মুহুর্তেই গালটা কেমন জ্বলে উঠল বেচারির। ঘাড় বেঁকে গেল থাপ্পড়ের তীব্রতায়। ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে আপনা-আপনি বেরিয়ে গেল ফোপাঁনোর শব্দ। জ্বলতে থাকা গালের ওপর আনমনে চলে এলো বেচারির হাত। তবে পরমুহূর্তেই ঘটল আরেক কান্ড! মুগ্ধের রুক্ষ আঙুল সহসা সপ্তদশীর চুলের গোছা খপ করে টেনে ধরেছে। চুলের যন্ত্রণায় এবারেও ককিয়ে ওঠে মাহি। চোখমুখ খিঁচে নিতেই কর্ণকুহরের ছিদ্র দিয়ে ঢুকল মুগ্ধের হিং স্র গর্জন!

“ আমাকে ভয় লাগে না তোর? ইউ্য ব্লা'ডি বি'চ! আমাকে, এই রুশদী কিং-কে ভয় লাগে না তোর? খুব আশকারা পেয়েছিস তাই না বান্দীর মেয়ে? দ্যান ওয়েট! মাইকেল!”

কঠিন হুংকারে দ্রুত পদে ছুটে আসে মাইকেল। কালো রঙা স্যুট-ব্যুট পরিহিত লোকটার সে-কি ভয়ার্ত মুখাবয়ব। শরীরটা বড্ড বড়ো। ঘাড় নুইয়ে দুপা আরামে দাঁড় করিয়ে মিনমিনিয়ে আওড়ালেন,

“ ইয়েস মনস্তার! জাস্ট অর্ডার মি।”

রাগে থরথর করে কাঁপছে মুগ্ধের চোয়াল। বাদামী চোখদুটোয় ছেয়ে গেছে রক্তাভ ভাব। সে কেমন কঠিন গলায় হুংকার ছুঁড়ে আদেশ করল—

“ গো এন্ড গেট সাইকি এন্ড প্রাডা। টুডে দে উইল টেস্ট হার!”

ত্বরিত বিস্ফোরিত দৃষ্টিতে তাকায় মাহি। চুলের ব্যথা বেমালুম ভুলে গিয়ে শুকনো ফাঁকা ঢোক গিলল পরক্ষণে। কাঁপা কাঁপা কন্ঠে আচমকা বলে বসল,

“ কিহ?”

ক্রমাগত হিসহিসিয়ে যাচ্ছে মুগ্ধ। এক ঝটকায় মাহি'র চুলের গোছা ছেড়ে দিয়ে দাঁড়াল সটান হয়ে। দু'হাত পকেটে গুঁজে সম্মুখে পা বাড়িয়ে গমগমে গলায় মাহি'র উদ্দেশ্যে আওড়াল —

“ বাড়ি যাওয়া এন্ড ফেমিলির সাথে কথা বলা ছাড়া নিজের আর কোনো শেষ ইচ্ছে থাকলে বলে ফেল বান্দীর মেয়ে! টুডে ইউ্য আর ফ্রী টু আস্ক ফর এনিথিং।”

আকাশ ভেঙে পড়ল মাহি। মনস্টারের কথায় ঠিক কেমন প্রতিক্রিয়া জানাবে তা নিয়ে পড়ল বড্ড দোলাচালে। মস্তিষ্ক শূন্য শূন্য ঠেকছে তার। মাইকেল বাগান পথ ধরে পাহাড়ের দিকে অগ্রসর হতেই ধ্যান ফিরল মাহি'র। তৎক্ষনাৎ বেচারি ছুটে এলো মুগ্ধের নিকট। পায়ের গতি চলমান রেখে দু'হাত জোর করে অনুনয় জুড়ে বলল,

“ প্লিজ প্লিজ এমনটা করবেন না। আমি কথা দিচ্ছি.. আমি, আমি আর তর্ক করব না আপনার সাথে। প্লিজ সাইকি, প্রাডাকে আনবেন না।”

শুনছেনা রূঢ় মানব। দু'হাত পকেটে গুঁজে নির্বিকার ভঙ্গিতে হাঁটছে গটগটিয়ে। মাহি কেমন ঘাড় উঁচিয়ে অনুভূতি শূন্য নয়নে তাকিয়ে আছে যুবকের পানে। চলন্ত যুবকের সঙ্গে পায়ের তালে জুড়ি মিলা ভার তার। তাইতো থেমেছে মাঝপথে। একযুগল অসহায় দৃষ্টি যুবকের চলে যাওয়ার পথে তাক করে রেখে আচমকা বরফ জমিনে হাঁটু ভেঙে বসল সপ্তদশী। কন্ঠে একরাশ কাতরতা ঢেলে চিৎকার করে আওড়াল,

“ আমায় মে'রে ফেলার পর দয়া করে আমার শরীরটা অক্ষত রাখবেন বিস্ট। আমার পরিবার যেন শেষ দেখাটুকু দেখতে পারে আমায়। আমার মা যেন শেষবার আমার কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিতে পারে অন্তত এই সুযোগটুকু থেকে তাদের বঞ্চিত করবেন না।”

থামল মুগ্ধের ব্যস্ত পদযুগল। ঘাড় বাঁকায় অল্প খানেক। ঠোঁটের রেখা সামান্য বাঁকিয়ে গমগমে গলায় প্রতিত্তোর করল,

“ ফা'ক ইউ্য এন্ড ইউ্যর রিকোয়েস্ট! গো টু হেল বান্দীর মেয়ে।”

যুবকের এরূপ তিরস্কারে মূর্ছাগত সপ্তদশী। চোখদুটোর দৃষ্টি ক্রমশ ঝাপসা হচ্ছে তার। দু-হাটুঁতে হাত চেপে রেখে কাঁদছে নিরবে। যুবক থামেনি। মিনিট খানেকের মধ্যেই আড়াল হলো দৃষ্টি সীমানা থেকে। মাহি ফুপিয়ে উঠল এবার। দু-হাতে মুখখানা ঢেকে নিয়ে ঝরাচ্ছে অশ্রু। ক্ষুদ্র দেহটা তার কাঁপছে কেমন! তা ঠান্ডায় না-কি কান্নার তোড়ে কে জানে! সময় পেরুলো মিনিট পাঁচেক। মাহি নিজ ভাবাবেগে তাড়িত। ঠান্ডায় হাত-পা নীলচে হয়ে যাচ্ছে তার। সেদিকে অবশ্য কোনরূপ উদ্বেগ নেই মেয়েটার। সে কাঁদছে তো কাঁদছেই! তবে এরইমধ্যে মুখ ঢেকে ক্রন্দনরত অবস্থায় আচানক কর্ণকুহরে শুনতে পেলো অতিপরিচিত দাঁত কিড়মিড় কন্ঠ!

“ চাল ওঠ বান্দীর মেয়ে!”

ত্বরিত মুখের ওপর থেকে হাত সরায় মাহি। হতবিহ্বলের ন্যায় ঘাড় উঁচিয়ে তাকালো সম্মুখে পাহাড়ের ন্যায় দাঁড়িয়ে থাকা মানবের দিকে। মানবের মুখখানা কঠিন, চোয়াল শক্ত। চোখদুটো বাজপাখির মতো তীক্ষ্ণ দৃষ্টে চেয়ে আছে কেমন। মাহি হতভম্বের ন্যায় তাকিয়ে রইলো কিয়তক্ষন। সামান্য ফাঁপা ঢোক গিলে অনুরাগীণী নাকের পাটা ফুলিয়ে আওড়াল,

“ না আপনি মা'রবেন!”

সরু দৃষ্টে ঠায় তাকিয়ে আছে মুগ্ধ। তার চোখেমুখে এখন আর আগের মতো উপচে পড়া রাগ নেই। দৃষ্টে জমেছে নির্লিপ্ততা! ঠোঁটের রেখায় তেমন একটা প্রাণোচ্ছল ভাব নেই যুবকের। চোয়ালের পেশী টানটান! সে কেমন গম্ভীর গলায় প্রতিত্তোরে বলল,

“ এমুহূর্তে কথা না শুনলে ঠিক মা'রব!”

তক্ষুনি ভড়কায় মাহি। তড়িঘড়ি করে উঠে দাঁড়াল বসা ছেড়ে। হাতদুটো বুকের কাছে জড়সড়ভাবে টেনে রেখে, সপ্তদশী চিবুক ঠেকিয়েছে গলায়। মুগ্ধ একমুহূর্ত গভীর চোখে তাকিয়ে রইলো মেয়েটার পানে। আশ্চর্য! চোখদুটো ফের বেহায়া হতে চাইছে তার। মেয়েটাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে চাওয়ার সে-কি নিদারুণ প্রচেষ্টা তাদের। মুগ্ধ বিরক্ত নিজের উদ্ভট কর্মে। কিছুক্ষণ আগেই এখান থেকে গটগটিয়ে চলে যাবার পর থেকে শুরু হলো তার মনো দ্বন্দ। বেয়াদব মনটা তারই বিরুদ্ধে ঘোর অবাধ্যতা দেখিয়েছে। বারবার কোনো কারণ ছাড়া তাকে একপ্রকার বাধ্য করেছে মেয়েটার কাছে ছুটে আসতে। অসভ্য পাদু’টোরও হয়েছে বড়ো জ্বালা! তার অনিচ্ছায় বিপক্ষ দলের প্রতি আজ্ঞাকারীতা দেখিয়ে হেঁটে এসেছে উল্টোপথে। এখন আবার চোখদুটোকে দেখো! কেমন গিলে খেতে চাইছে মেয়েটাকে। অথচ নির্দয় মানবের মস্তিষ্কে এখনো চলছে — মেয়েটা তার শত্রুর মেয়ে। সে ঘৃণা করে তাকে। মুগ্ধ নির্দয়! হুটহাট মনের কথায় সায় দেবার মতো বদঅভ্যেস নেই তার। বিচক্ষণী মস্তিষ্ক বরাবরই জিতে যায় এহেন দোটানায়। বেশ দক্ষতায় মনের কথায় সায় জানানো থেকে আঁটকে রাখে তাকে। আজও হলো তাই। মুগ্ধ নিজ মুখাবয়বে কপট গাম্ভীর্যের ছাপ ফোটালো। পকেট থেকে ডানহাতখানা আলগোছে বের করে এনে তর্জনী উঁচিয়ে তাক করল মাহি'র পানে। কন্ঠে রাগী ভাবস্রোত ধরে রেখে হিসহিসিয়ে আওড়ায়,

“ আর কখনো আমার মুখে মুখে তর্ক করবি?”

গাল ফুলিয়ে দু'ধারে মাথা নাড়ায় সপ্তদশী। নিরবে জানায় — আর করবে না। তা দেখে চোখদুটোতে প্রসন্নতার বদলে খানিক রূঢ়তার দেখা মিললো যুবকের। সে ফের একই ভঙ্গিতে আওড়াল,

“ সবসময় আমার কথামতো চলবি তো?”

হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে আলতো করে ভেজা চোখদুটো মুছতে মুছতে ওপর নিচ মাথা নাড়িয়ে নিরবে সম্মতি জানালো মাহি। তবে এহেন নিরব সম্মতি খুব একটা মনে ধরল না নির্দয় মানবের। সে কেমন ফট করে দিলো এক ধমক!

“ মুখ দিয়ে বল বান্দীর মেয়ে।”

এহেন ধমকে কেঁপে ওঠে মাহি। তড়িঘড়ি করে মাথা ঝাঁকিয়ে বাধ্য কন্ঠে আওড়ায়,

“ হ্যাঁ চলব!”

প্রসন্ন হাসলেন নির্দয় মানব। নির্ঘাৎ মনের অজান্তেই ডানহাতের রুক্ষ আঙুল দিয়ে আলগোছে আঁকিবুঁকি চালালো বোকা সপ্তদশীর মাথার তালুতে। চাপা স্বরে গম্ভীর কন্ঠে বললো,

“ অলওয়েজ বি মা'ই গুড গার্ল চাশমিস!”

থমকায় মাহি। বোকার মতো চোখ তুলে তাকায় যুবকের পানে। তার এহেন হতবাক দৃষ্টির পানে নজর ঠেকতেই সম্বিতে ফিরল মুগ্ধ। তক্ষুনি নজর সরিয়ে নিজের আঙুলের পানে দৃষ্টি নিবদ্ধ করতেই ভ্রু-যুগল কুঁচকে গেল তার। নিজের এহেন উদ্ভট কর্মের উপযুক্ত কারণ না পেয়ে তক্ষুনি নিচে নামাল হাত। মুখগহ্বরে জিভটা খানিক উল্টে পাল্টে দাঁতে দাঁত চাপলেন যুবক। তক্ষুনি মাহি'র কাছ থেকে দু-কদম সরে এসে গমগমে গলায় আদেশ ছুড়ঁল —

“ প্যালেসে যা।”

হতভম্বতার ডোর বড়ো ঠুনকো সপ্তদশীর। মুহুর্তেই কেটে গেল যুবকের গমগমে কন্ঠে। তড়িঘড়ি করে মাথা ঝাঁকিয়ে সপ্তদশী দ্রুত পদে পাশ কাটিয়ে চলে গেল যুবককে। এদিকে পেছন থেকে ঘাড় বাকিয়ে তার চলে যাওয়া দেখছে নির্দয় মানব। একমুহূর্ত ঠোঁটের কোণ দাঁত দিয়ে চেপে রেখে পরক্ষণে কপাল গুটিয়ে বিড়বিড়াল —

“ হোয়াট দ্য ফা*ক হ্যাপেনস টু মি হোয়েন শি ইজ এরাউন্ড মি? হলি শিট!”

__________________________________________

মুখ ঢেকে আছে ফাঁ**সির কয়েদীদের ন্যায় কালো কাপড়ে। হাতদুটো পিছমোড়া করে বেঁধে রাখা কোমরের কাছে। মধ্যবয়স্কের টলমল কদমজোড়াঁ অন্ধের ন্যায় এগোচ্ছে সম্মুখে। নাকের ছিদ্র দিয়ে ভুরভুর করে ঢুকছে দামী চন্দন কাঠপোড়ার ভারী সুগন্ধি। মধ্যবয়স্ক বুঝে গেলেন — তিনি চলে এসেছেন যথার্থ স্থানে। দু'জন গার্ড এগিয়ে এসে আলতো করে ধরলেন মধ্যবয়স্কের বাঁধা হাত। অতঃপর তাকে একপ্রকার ঠেলেঠুলে নিয়ে গেলেন শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত একখানা কক্ষে। মধ্যবয়স্ক ঢোক গিলছেন ক্ষনে ক্ষনে। গার্ডদের হুটহাট ঠেলাঠেলি অনুসরণ করে চুপচাপ এগোলেন সামনে। প্রায় বেশ কিছুক্ষণ পর গার্ডরা থেমে গেলেন মাঝপথে। একপ্রকার জোর করে মধ্যবয়স্ককে আলগোছে বসিয়ে দিলেন ফ্লোরে বিছিয়ে রাখা মখমলের তোশকে। মধ্যবয়স্ক মোটেও অবাধ্যতা করলেন না। চুপচাপ বাধ্য ছেলের ন্যায় বসে পড়লেন আসনে। মুহুর্ত ব্যয় হতেই পেছন থেকে কেউ একজন এগিয়ে এসে চট করে কাপড় তুলে নিলো মধ্যবয়স্কের মুখ থেকে। আর ওমনি সম্মুখের সবটা দৃশ্যমান হতে লাগল মানুষটার কাছে। সামনেই দাউদাউ করে জ্বলছে হবনকুন্ড। তার ঠিক বিপরীতে বসে আছেন একজন দক্ষ ব্রাহ্মণ পন্ডিত। পন্ডিতের চোখদুটো বেঁধে রাখা কালো পট্টিতে। ডানপাশে একখানা বড় ফ্রেমের ছবি রাখা। ছবিতে দেখা যাচ্ছে এক অপরুপার মুখ! কি সুন্দর অপ্সরার ন্যায় দেখাচ্ছে তাকে। ছবির সামনে একখানা হলদেটে কলস। যা ঝকমক করছে না! কলসের পানে তাকাতেই চোখ ঝলসে যাবার উপক্রম যেন। কলসের মুখ ঢাকা লাল কাপড়ে। মধ্যবয়স্ক স্থির দৃষ্টিতে ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইলেন কিয়তক্ষন। ছবিতে থাকা মুখখানা যে তার বড্ড চেনা। মধ্যবয়স্ক সময় নিলেন। রয়েসয়ে ঘাড় বাকিয়ে বা-দিকে তাকাতেই ঝটকা খেলেন খানিক। কয়েক হাত দুরত্বে রাজার ন্যায় দু-পা-ভাঁজ করে বসে আছে গম্ভীর মুখো মুগ্ধ। ডানহাতে লম্বা একটা কাঠের চামচ নিয়ে একটু একটু করে ঘি ঢালছে হবনকুন্ডে। পন্ডিত শাস্ত্রীয় মন্ত্র জপলেও মুগ্ধের ঠোঁট স্থির! চোখদুটো একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে হবনকুন্ডের জ্বলন্ত আগুনের লেলিহান শিখার পানে। মধ্যবয়স্ক ঢোক গিললেন অলক্ষ্যে। তড়িঘড়ি করে নড়েচড়ে বসতে গেলেই টের পেলেন — পিছন থেকে কেউ তার হাতের বাঁধন খুলে দিচ্ছে। মধ্যবয়স্ক কৌতুহলবশত ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকালেন, আর ওমনি তার চোখাচোখি হলো এডউইনের নিলচে -সফেদ রঙা অদ্ভুত অক্ষিপুটের সাথে। তক্ষুনি হকচকালেন মধ্যবয়স্ক! ভড়কে পিছিয়ে যেতে চাইলেই তার দৃষ্টি সীমানা থেকে আলগোছে সরে গেল এডউইন। কয়েক কদম ঘুরে এসে দাঁড়ালো মুগ্ধের বা-দিকে। মধ্যবয়স্ক হাফ ছেড়ে বাঁচলেন যেন। নিজেকে কোনমতে সামলে নিয়ে ঘুরে বসলেন হবনকুন্ডে মুখ করে। শাস্ত্রীয় ভঙ্গিমায় দু'হাত জোর করে প্রার্থনায় বসলেন পরক্ষণে।

সময় পেরুলো বেশ! শ্রাদ্ধের রীতিনীতি পালন হলো সুষ্ঠুভাবে। পন্ডিত মহাশয় পূজো অর্চনা শেষে একখানা বড়সড় থালা এগিয়ে দিলেন বা-দিকে। হাতদুটো কাঁপছে তার, সেই সঙ্গে কাঁপছে কন্ঠস্বর। লোকটা কেমন ভয়ে ভয়ে আওড়ালেন,

“ টিকা টুকু দিয়ে নিন কপালে।”

চোখ পাকিয়ে তাকায় মুগ্ধ। দাঁতে দাঁত চেপে থালাটাকে হাত দিয়ে দূরে ঠেলে দিয়ে তক্ষুনি উঠে গেল আসন থেকে। অতপর কোনদিক না তাকিয়ে গটগট পায়ে চলে গেল কক্ষ ছেড়ে। পেছনে একদৃষ্টে তার চলে যাওয়া দেখল মধ্যবয়স্ক। রয়েসয়ে তিনিও উঠে দাঁড়ালেন বসা ছেড়ে। খানিকক্ষণ দোনোমোনো করে এডউইনের পানে তাকিয়ে সন্দিহান গলায় জিজ্ঞেস করলেন,

“ আমি কি মনস্টারের সাথে একটু কথা বলার সময় পেতে পারি?”

এডউইন গম্ভীর মুখে মাথা দোলায় অল্প করে। প্যান্টের পকেটে দু'হাত গুঁজে রেখে পা বাড়ায় দুয়ারের দিকে। গমগমে গলায় বলে,

“ ফলো মি!”

______________________________________

ক্রিমসম চেম্বার!

বিশালাকার কাঁচের তৈরী কক্ষে পা গুনে গুনে ঢুকলেন মধ্যবয়স্ক। অদূরে চোখ পড়তেই দেখলেন — ডেস্কের ওপর দু-পা উঠিয়ে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে আছে মুগ্ধ। ডানহাতের দু-আঙুলের ভাঁজে জ্বলছে সিগার। যুবকের ঠোঁটের ফাঁকফোকঁর দিয়ে বেরুচ্ছে সিগারের কলুষিত ধোঁয়া। মধ্যবয়স্ক রয়েসয়ে এগোতে উদ্যোত হলেন। ঠিক তখনি তার নজ আটকালো — মুগ্ধের পেছনের কাচেঁর দেয়ালে। যেথায় আটকে আছে এক বিশাল কুমির। কুমিরটা বুঝি ঝিমাচ্ছে! তাকে দেখেই শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল মধ্যবয়স্কের। তিনি কেমন ঢোক গিলে দাঁড়িয়ে পড়লেন নিজ জায়গায়। ক্ষনে ক্ষনে ঢোক গিলে মিনমিনে স্বরে আওড়াল,

“ কেমন আছো অধীর?”

অদূরের দাম্ভিক যুবক তৎক্ষনাৎ জবাব দেয়নি। উল্টো হাত এগিয়ে এনে সিগার গুজঁল ঠোঁটের ফাঁকে। লম্বা এক টান বসিয়ে ধীরে ধীরে ছাড়ল ধোঁয়া। কর্কশ কন্ঠে শুধালো,

“ এটা জানতে নিশ্চয়ই আসেননি তৌকির মির্জা!”

থতমত খেলেন তৌকির সাহেব। খানিকক্ষণ আমতা আমতা করে ফের আওড়ালেন,

“ এভাবে কথা বলছো কেন অধীর? আমি কি তোমার ভালোমন্দ জিজ্ঞেস করতে পারিনা? তুমি মানো কিংবা না মানো এটা তো আর পাল্টে যাবে না যে — আমি তোমার বাপ!”

তক্ষুনি ঘাড় বাকিয়ে শক্ত চাহনি নিক্ষেপ করল মুগ্ধ। ধীরে ধীরে হাতের মুঠোয় জ্বলন্ত সিগারটা পিষতে পিষতে কটমট করতে লাগল কেমন। মুহুর্তেই চোখেমুখে একরাশ আগুন লেপ্টে গর্জন তুলে বলল,

“ বাপ? মা'ই ফুট! আপনার মতো সাপকে বাপ মানে কে? নেহাৎ আপনি শ্যামৌপ্তী দেবীর সেকেন্ড হ্যান্ড হাসবেন্ড বিধায় আপনাকে এখনো বাঁচিয়ে রেখেছি, নয়তো এতদিনে আপনাকেও জ্যান্ত পুঁতে ফেলতাম মাটির তলায়।”

কথাখানা শুনতেই তেতেঁ উঠলেন তৌকির মির্জা। রাগ সংবরণ করতে না পেরে ভুলবশত চেঁচিয়ে ওঠে বললেন,

“ অধীর!”

এহেন কন্ঠ কানে যেতেই তৎক্ষনাৎ ডেস্কের ওপর পড়ে থাকা রিভলবারটা তুলে নেয় মুগ্ধ। অতঃপর কোনরূপ আগপাছ বিবেচনা না করে তক্ষুনি ট্রিগার চাপলো বেপরোয়া যুবক। মুহুর্তেই বিকট শব্দে ফায়ার হলো। ভাগ্যক্রমে অল্পের জন্যে বেঁচে গেলেন তৌকির মির্জা। গুলিটা একদম কানের পাশ দিয়ে গিয়েছে তার। বেচারা ভয়ে ভয়ে বুক চেপে ধরে বসে পড়লেন ফ্লোরে। কাঁপতে কাঁপতে হতবাক দৃষ্টে সম্মুখে তাকাতেই হুংকার ছুঁড়ে মুগ্ধ!

“ ভাববেন না গু*লিটা মিস হয়েছে। ইট ওয়াজ মা'ই ফার্স্ট ওয়ার্নিং। হেন্সফোর্থ, আমার রাজত্বে দাঁড়িয়ে গলা উঁচু করে কথা বলার আগে দশবার ভেবে নিবেন তৌকির মির্জা। কারণ সম্পর্কে আপনি আমার সো- কলড বাপ হলেও, ক্ষমতায় আমি আপনার চৌদ্দগুষ্ঠীর বাপ!”

বুক কাঁপছে তৌকির সাহেবের। একটুর জন্য হার্ট ব্লক হতে হতে গিয়ে বাঁচল তার। তিনি এখনো কাঁপছেন কেমন। একটুখানি স্থির থেকে কুটিলতায় নতমুখে থেমে থেমে বললেন,

“ আমি জানি তোমার কাছে সম্পর্কের কোনো মূল্য নেই অধীর। সে-সব নিয়ে আমার তেমন আফসোসও নেই। যাকগে, যা বলতে এলাম — আগামী ১৫ তারিখ নিরুপমার বয়স ১৮ হবে। হিমাংশু রায়কে দেয়া প্রতিজ্ঞার কথা মনে আছে তো? শত হলেও যার বদৌলতে তুমি অধীর রায় থেকে দ্য গ্রেট রুশদী কিং হলে তাকে দেয়া প্রতিজ্ঞা অবশ্য এতো তারাতাড়ি ভুলে যাওনি আশা করি। পৃথিবীর আর কোনো সম্পর্কের মূল্য না দিলেও আমি চাইব তুমি অন্তত ঐ মেয়েটার সিঁদুরের মূল্য দিও, যে কিনা বিগত ৮ বছর ধরে তোমার নাম করে নিজের সিঁথিতে মেখে আসছে!”

চলবেরেএএএএ...

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩২তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন