#মির্জা_সায়ান_মুগ্ধ — পর্বঃ৩৫(ক)
#jannatul_firdaus_mithila
মাথার ওপর খোলা আকাশ! যার বুকেতে জমে আছে থোকায় থোকায় কালো মেঘ। দূর আকাশপটের বোধহয় মন খারাপ আজ। যেন যেকোনো সময় নিজেকে উজার করে দিয়ে ধরণীর বুকে কান্না ঝরাবে! রাশিয়ার বালাশিখা শহরের মধ্যাঞ্চলে অবস্থিত গ্র্যান্ড ভ্যালি প্যালেস। প্রাসাদসম বাড়িটির হর্তাকর্তা নিকোলাস মারগ্রেট, রাশিয়ান ড্রাগ'স ডিলিং সাইডের অন্যতম গ্যাংস্টার।
প্রাসাদসম গ্র্যান্ড ভ্যালির ব্যাক ইয়ার্ডের সম্পূর্ণটা জুড়ে মস্তবড়ো এক সুইমিংপুল বিস্তৃত। খোলা আকাশের নিচে সুইমিংপুলের নিলাভ পানিতে শরীর ডুবিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ত্রিশ বছরের সুদর্শন — নিক এবং তার প্রেয়সীরা! সুইমিংস্যুটে একেকজন বিদেশীনীরা সে-কি আবেদনময়ী ভাব ধরেছে! কেউ কেউ নিজ উদ্যোগে হাত বোলাচ্ছেে সুদর্শনের গায়ে, তো আবার কেউ কেউ এক ধাপ এগিয়ে খাবার তুলে দিচ্ছে যুবকের মুখে। যুবকের মুখাবয়বে লালসা স্পষ্ট! লম্বাটে দু'হাতে আগলে রেখেছে নিজ প্রেয়সীদের। মাঝেমধ্যে টুকটাক বাক্যে টিজ করে যাচ্ছে তাদের, এতেই যেন হাতে চাঁদ পেয়ে যাবার মতো খুশী একেকজন! আর পাঁচটা গ্যাংস্টারের তুলনায় নিকের আবার বড্ড নারীর শখ! বিছানায় রোজ নিত্যনতুন সুন্দরী না পেলে তার যেন চলেই না। নারীলিপ্সুক সুদর্শন লোভাতুর দৃষ্টে তাকিয়ে আছে সম্মুখে। অদূরেই স্নানে মত্ত অস্ট্রেলিয়ান সুন্দরী লিন্ডা, যিনি ক'দিন আগ অব্ধি ছিলেন আলেকজান্ডার নামক অস্ট্রেলিয়ান গ্যাংস্টারের সহধর্মিণী! অথচ দূর্ভাগ্যক্রমে নিক নামক নারীলিপ্সুকের নজরে এসে সে আজ হয়েছে তার বিছানার সৌন্দর্যবর্ধনকারীণী! নিক মুচকি হাসলো। দু'হাতে আগলে রাখা রমণীদের আলগোছে ছেড়ে দিয়ে, নীলাভ পানিতে ঢেউ তুলে এগোয় সম্মুখে। অতঃপর কোনরূপ আগাম সতর্কসংকেত ছাড়াই একহাতে চট করে আকড়েঁ ধরে লিন্ডার উম্মুক্ত মেদহীন পাতলা কোমর। এহেন হুটহাট কান্ডে ভড়কায় লিন্ডা। তড়িঘড়ি করে শরীর ঘুরিয়ে পেছনে ফিরতেই নিকের লাগামহীন অধরযুগল এক ভিন্ন আধিপত্য ফলিয়ে আঁকড়ে ধরে যুবতীর নরম তুলতুলে ওষ্ঠপুট! লিন্ডা বিরক্ত! দেহের সর্বশক্তি প্রয়োগ করে দু'হাতে ঠেলে দিচ্ছে যুবকের উম্মুক্ত লোমহীন বুক। অথচ কান্ড দেখো! তার ওমন ব্যর্থ প্রয়াসে যুবক তো টললোই না উল্টো নিজ ওষ্ঠপুটের কাজ বহাল রেখে, এক হেঁচকা টানে যুবতীকে তুলে নিলো নিজ কোলে। লিন্ডা ছটফটাচ্ছে বেশ! রাগ-ক্ষোভে দু-চোখ দিয়ে ঝরাচ্ছে নিরব অশ্রু। নিক থামছেনা। নিজ উন্মত্ততায় মত্ত থেকে আগ্রাসী ভাব ঝরাচ্ছে যুবতীর নরম অধরযুগলে।
সময়ের কাটাঁ বহমান! প্রায় মিনিট পাঁচেক চলল নিকের লাগামহীন কান্ড। রয়েসয়ে অধর সরালো যুবক। শ্লেষাত্মক কায়দায় গৌরবর্ণা বিদেশিনীর বিড়াল চোখদুটোতে নজর ঠেকিয়ে ঠোঁট কামড়ে হাসলো একটুখানি। মুহুর্তেই এক আকাশসম ঘৃণায় লাল হয়ে গেল রমণীর মুখ। দাঁতে দাঁত চেপে সে তক্ষুনি করে বসল আরেক কান্ড। আচমকা মুখ থেকে একদলা থুতু নিক্ষেপ ক'রল সুদর্শনের ফর্সা মুখ বরাবর। তৎক্ষনাৎ নাক- মুখ কুঁচকে নেয় নিক। দাঁতে দাঁত চেপে কটমট শব্দ তুলে, আলগোছে হাত উঠিয়ে মুছে নেয় নিজ মুখ। ধীরেসুস্থে অক্ষিপুটের শক্ত চাহনি সরাসরি সম্মুখে নিক্ষেপ করে, আচানক এক হিং স্র থাবায় আঁকড়ে ধরে যুবতীর ঘাড়। ককিয়ে ওঠে রমণী! হাত উঁচিয়ে নিজেকে ছাড়ানোর বৃথা প্রয়াসে মত্ত থাকা অবস্থাতেই শুনল — নিকের কটমট কন্ঠ!
“ সারারাত আমার ভোগ্যবস্তু হিসেবে বেড কাপিয়েছিস, আর এখন কি-না সতী সাজতে এসেছিস? ইউ্য ব্লাডি স্লা'ট! এতো তেজ কিসের তোর?”
ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছে রমণী! ক্ষত ঠোঁটের ফাঁক গলিয়ে অস্ফুটে বেরুচ্ছে ক্রন্দন ধ্বনি। নিকের মন গললো না তাতে। তক্ষুনি যুবক গলা উঁচিয়ে নিজ পিএ — মাকসের উদ্দেশ্যে বলে ওঠে —
“ মাকস!”
ত্রস্ত পায়ে পুলের ধারে এগিয়ে এসে দাঁড়ালেন মাকস। বলিষ্ঠদেহী আফ্রিকান লোক সে, দিনের আলোতেও মুখখানা স্পষ্ট নয় তার! বাধ্যগত কর্মচারীর ন্যায় তিনি কেমন মাথা নুইয়ে বললেন,
“ ইয়েস বস।”
রাগী মানব ফুঁসছে রাগে। এক ঝটকায় রমণীর ভেজা দেহখানা পুলের কার্নিশে উঠিয়ে, কটমট করতে করতে বলে ওঠে,
“ গো এন্ড হেভ হার! আগামী দু'ঘন্টা ও তোর। যতক্ষণ অব্ধি ওর জ্ঞান না হারাবে ততক্ষণ পর্যন্ত থামবি না। নাউ টেক হার এন্ড গেট লস্ট।“
এহেন বাক্য কর্ণকুহরে পৌঁছান মাত্রই আঁতকে ওঠে লিন্ডা। ভয়ার্ত ঢোক গিলে আমতা আমতা করে অনুনয় জুড়ে বলতে থাকে —
“ নো নো নো! নো নিক। প্লিজ ডোন্ট ডু দিস। ইউ্য নো দ্যাট আ'ম প্রেগন্যান্ট। প্লিজ ডোন্ট ডু দিস টু মি।”
তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটলো যুবকের বাদামী ঠোঁটযুগলে। পরক্ষণেই পুলভর্তি পানিতে চিৎ আকারে শরীর ডুবিয়ে সাতাঁর কাটতে কাটতে গমগমে গলায় বলে ওঠে,
“ জাস্ট এবোর্ট দিস ফা'কিং ননসেন্স। মাকস.... ”
শেষ বাক্যটুকু আওড়াতেই এগিয়ে এলেন মাকস। তড়িঘড়ি করে লিন্ডাকে পাঁজা কোলে তুলে নিয়ে, গতি বাড়ালেন পায়ের। ওদিকে মেয়েটা কাঁদছে! দু'হাত জোর করে অনুনয় করছেন মাকসকে। অথচ রমণীর এহেন অনুনয় মাকসের কানে গেল কি-না কে জানে! সে কেমন মিটমিটিয়ে হাসছে দেখো!
পুলের শীতল পানি থেকে মাত্রই গা উঠালো নিক। বলিষ্ঠ টানটান দেহখানা খানিক নাড়িয়ে চাড়িয়ে, পুল লেডারে পা রাখতেই অদূর থেকে ছুটে এলেন একজন সশস্ত্র রক্ষী। লোকটা এসেই কেমন হড়বড়িয়ে আওড়ালেন,
“ বস! একজন ডক্টর আপনার সাথে দেখা করতে এসেছে। বলল — ইট’স আর্জেন্ট।”
পুল লেডার বেয়ে পাড়ে উঠে এলো নিক। ভ্রু গুটিয়ে ঘাড় বাকিয়ে আলগোছে তাকাল রক্ষীর পানে। পেছন থেকে আরেক বিদেশিনী এগিয়ে এসে, আলতো করে একখানা বাথরোব জড়িয়ে দিচ্ছে যুবকের গায়ে। যুবক নিরব কায়দায় পরছে তা। সময় নিয়ে রক্ষীর পানে একপলক তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে পরক্ষণে পা ঘোরালো উল্টোপথে। একহাতে বিদেশীনীকে জড়িয়ে ধরে এগোতে এগোতে কর্কশ কন্ঠে বলে ওঠে,
“ বলে দে আ'ম বিজি!”
শুনলেন রক্ষী। তবে পরমুহূর্তেই বড্ড চিন্তিত গলায় পেছন থেকে শুধালেন,
“ বাট ইট’স এবাউট মনস্তার বস!”
হুট করেই পাদুটো থমকায় নিকের। মনস্টারের নাম শুনতেই শরীরখানা অজান্তেই বোধহয় ঝাঁকিয়ে উঠল তার। নিজ হতবাকতা কোনরকমে দমিয়ে রেখে যুবক তড়িঘড়ি করে পা ঘুরিয়ে চলে এলো রক্ষীর পানে। শক্তপোক্ত দু'হাতে রক্ষীর কাধঁ ঝাঁকিয়ে হড়বড়ানো কন্ঠে আওড়াল —
“ কি বললি? মনস্তারের বিষয়ে মানে? কে এসেছে দেখা করতে?”
শুকনো ঢোক গিললেন রক্ষী। শুষ্ক অধরজোড়া সিক্ত জিভের ডগা দিয়ে খানিক ভিজিয়ে নিয়ে, কাঁপা কাঁপা কন্ঠে আওড়ালেন,
“ ডক্টর দামিয়ান, দ্য ফেমাস মেডিসিন স্পেশালিষ্ট ইন টাউন।”
___________________________________________
দূর আকাশে গর্জন তুলছে মেঘ! ঝড়ো হাওয়ায় মুখরিত চারপাশ। এই বুঝি আকাশভাগ কাঁপিয়ে নেমে আসবে বারিধারা। সপ্তদশীর চঞ্চলা মন উৎ পেতে আছে বৃষ্টি নামার অপেক্ষায়। ঝড়ো হাওয়ার ঠান্ডা পরশে কাঁপা-কাঁপি অবস্থা বদনের, তবুও তার শখ দেখো! এই অবেলার বৃষ্টিতে ভিজবার জো তুলেছে মনে মনে। চঞ্চলা হরিণীর ন্যায় দরজার কাছে পা ছোটাচ্ছে মাহি। এখনি বাইরে বের নাহলে বৃষ্টিতে ভিজবে কেমন করে? এদিকে কিউটিটাও কি সুন্দর কুটকুট শব্দ তুলে ছুটছে মনিবের পিছুপিছু। তবে সপ্তদশীর চঞ্চলা কদম হুট করেই থেমে গেল ঘরের দরজার কাছে এসে। সামনেই পথ আটকে দাঁড়িয়ে আছেন দেহরক্ষী দু'জন। তা দেখে মুখটা কেমন থমথমে হয়ে গেল সপ্তদশীর। কপাল কুঁচকে বোঝবার চেষ্টা চালালো — আজ হঠাৎ দেহরক্ষী দু'জনের ওমন হুটহাট কঠোরতার কারণ। তবে মিনিট খানেক পেরুলেও রক্ষীদের এহেন পরিবর্তনের কারণ খুঁজে পায়নি সপ্তদশী। সুশ্রী গৌরবর্ণা মুখখানায় এক পশলা মেঘ জমিয়ে, পরক্ষণেই কেমন নরম গলায় বলল,
“ পথ আটকালেন কেনো? আমি বৃষ্টিতে ভিজবো। আমায় বাইরে যেতে দিন।”
জিভহীন লোকদুটোর মুখ দিয়ে থোড়াই কথা বের হবে! বাধ্য লোক দু'টো কি এক বাধ্যতায় মাথা নুইয়ে ঠায় পথ আটকে দাঁড়িয়ে রইলেন। সপ্তদশীর রাগ হলো এবার! ললাটে পড়ল গভীর ভাঁজ। মুহুর্তেই নাকের সরু ডগাটা কেমন লাল হয়ে গেল টমেটোর ন্যায়। দু'হাত বুকের কাছে বেঁধে সপ্তদশী ফের কাঠকাঠ কন্ঠে বলল,
“ যেতে দিবেন কি-না বলুন?”
এবারেও নিরুত্তাপ লোকদুটো। সপ্তদশী হার মানলো তা দেখে। পরাজিত সৈনিকের ন্যায় ভার হয়ে গেল তার কাঁধ! হাতদুটো বুকের কাছ থেকে আলগোছে নামিয়ে, কালো মুখে সরে গেল দরজার প্রান্ত থেকে। কই একটু বৃষ্টি ভেজার শখ করেছিল সপ্তদশী, সেটাও কি-না ওমন অপূর্ণই থেকে গেল? দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয়ে সপ্তদশীর ক্ষীণ কদম টুকটুক করে এগোলো জানালার দ্বারে বিছিয়ে রাখা কাউচের পানে। সেথায় নরম দেহটা খানিক এলিয়ে দিলো মাহি। কাঁদো কাঁদো মুখে জানালার বাইরে মুখ করে বসে রইলো চুপচাপ। মুহুর্ত ব্যয়েই আকাশ চিঁড়ে নেমে এলো ঝুমবৃষ্টি। মাহি আক্ষেপ নিয়ে তাকিয়ে রইল বৃষ্টির পানে। তার চোখদুটো ভরে উঠছে ক্রমশ। গালের পিঠে হাত উঠেছে আনমনেই। বৃষ্টির পানে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকতেই আচমকা তার চোখ গিয়ে আটকালো গার্ডেনের দিকে। ঝুম বৃষ্টি ভেদ করে এগোচ্ছে এক ছটাক আলো। কি তীক্ষ্ণতা সে আলোর! সপ্তদশী সবকিছু ভুলিয়ে উৎসুক দৃষ্টে তাকিয়ে রইলো সেদিকে। ধীরে ধীরে গার্ডেনের বড়বড় চেরি ব্লসম ট্রি-র আড়াল থেকে দেখা গেল একখানা কালো রঙা বাইককে। মাহি দৃষ্টি তীক্ষ্ণ করল। হাত উঁচিয়ে চোখের চশমাটা খানিক ঠিকঠাক করে নিয়ে ফের তাকালো গার্ডেনের দিকে। সন্ধ্যে হলেও আকাশে মেঘেদের তীব্র উপস্থিতি রাত নামিয়েছে যেন। অন্ধকারে স্পষ্ট নয় বাইকে বসে থাকা মানুষটা। কায়দা করে ধীরে ধীরে এগিয়ে নিচ্ছে বাইক। তবে এরইমধ্যে বাইকের আবার হুট করে কি হলো কে জানে! ঠিক মাহি'র জানালার নিচে এসে ব্রেক কষল আচমকা। মাহি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র চোখে দেখছে সব। মাথার ওপর ঝুম বৃষ্টি নিয়ে, চেরি ব্লসম গার্ডেনের গোলাপি আভায় ছেয়ে থাকা জমিনের ওপর দাঁড়িয়ে আছে কোয়াসাকি নিনজা এইচটুআর ব্র্যান্ডের কালো চকচকে বাইকখানা। বাইকে বসে আছে একজন বলিষ্ঠ পুরুষ! গায়ে তার চিরচেনা কালো রঙা ওভার কোট, ভেতরে শার্টের উপস্থিতি নেই। ফলাফল স্বরুপ — ফর্সা লোমহীন পেটানো বক্ষখানা সহজেই চক্ষুগোচর হচ্ছে। মাথার ওপর কালো রঙা হেলমেট! সম্মুখের শাটার খুলে রাখায় পিয়ার্সিং করা বদামী চোখদুটো দৃশ্যমান। যুবক রয়েসয়ে ঘাড় উঁচিয়ে তাকায় প্যালেসের দোতলার দিকে। মুহুর্তেই তার বাদামী চোখদুটোর সনে চোখাচোখি হলো চশমা পরুয়া একজোড়া ভীতু চোখের। মাহি ভ্রু গোটায় তৎক্ষনাৎ। বিচক্ষণতার সঙ্গে মস্তিষ্ক তক্ষুনি বুঝে নেয় — লোকটা আর কেউ নয় বরং বিস্ট। সপ্তদশীর ললাটের ভাঁজ গাঢ় হলো এপর্যায়ে। জানালার কাছ থেকে তড়িঘড়ি করে খানিকটা আড়াল হয়ে বসল মানবী। তবে পরক্ষণেই তার মোটা মাথায় জুড়ে বসল আরেক চিন্তা! সে কেমন হড়বড়িয়ে জানালার বাইরে মুখ এনে মুগ্ধকে ডেকে বলল,
“ এই বিস্ট শুনুন!”
একদৃষ্টে এখনো চেয়ে আছে রূঢ় মানব। পলক আদৌও ফেলেছে কি-না কে জানে! সপ্তদশীর নরম কন্ঠের ডাক শুনে হেলমেটের আড়ালেই অধরযুগল দাতেঁর সনে খানিক পিষ্ট হলো বোধহয়। সময় নিয়ে গমগমে গলায় প্রতিত্তোরে বলল,
“ ঝেড়ে কাশ বান্দীর মেয়ে!”
মুখটা তৎক্ষনাৎ বিরক্তিতে তেঁতো হয়ে গেল সপ্তদশীর। গাল বেঁকে গেল নারাজিতে। তবুও সে মুখ খুলে কাঠকাঠ কন্ঠে আওড়াল,
“ বৃষ্টিতে ভিজবো কিন্তু আপনার গার্ডরা আমায় ঘর থেকে বেরুতে দিচ্ছে না। ওদের বলুন আমায় যেতে দিতে!”
যুবকের কপালের চামড়ায় ভাঁজ পড়ল মনে হচ্ছে। চোয়ালটাও কেমন কটমটিয়ে উঠল হেলমেটের আড়ালে। মেয়েটাকে আর বিশ্বাস হচ্ছে না নির্দয় মানবের। তাইতো রক্ষীদের আদেশ করেছে কঠোর হতে। যুবক দৃষ্টি সরু রেখে, তক্ষুনি গলা উঁচিয়ে ধমকে বলল,
“ এতো তারাতাড়ি ম'রার শখ উঠল কেনো বান্দীর মেয়ে? বেঁচে থাকতে খুব কষ্ট হচ্ছে? তাহলে বল — এতো দোনোমোনো না করে, এক্ষুনি মে'রে ফেলি।”
সপ্তদশী হতভম্ব! একটা স্বাভাবিক আবদারের পিঠে এহেন তিরস্কার শুনে ব্যথিত হলো তার দূর্বল হৃদয়। চোখেমুখে আঁধার লেপ্টে সে তক্ষুনি গা লুকিয়ে বসল জানালার কাছে। অভিমানীনী রাগ করেছে! নাকের পাটা ফুলিয়ে বসে আছে ভেতরে। যুবক বোধহয় ক্ষীণ হাসল হেলমেটের আড়ালে। আচমকা বাহাতের তর্জনী এবং মধ্যমা একযোগে উঁচিয়ে প্যালেসের দোতলার দিকে তাক করে গমগমে গলায় ডাকল —
“ হেই চাশমিস! লুক!”
তৎক্ষনাৎ ফুলো ফুলো গালে জানালার বাইরে ঘাড় বার করল মাহি। ভ্রু গুটিয়ে সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে যুবকের পানে তাকিয়ে থেকে কাঠকাঠ কন্ঠে জবাব দিলো —
“ কি হয়েছে?”
যুবক ক্রুর হাসলো! হেলমেটের আড়ালে তা থোড়াই নজর কাড়ল সপ্তদশীর! সে কেমন একদৃষ্টে যুবকের পানে তাকিয়ে থাকতেই দেখল — বেয়াদব মনস্টার তার দু'হাতের ইশারায় বোঝাচ্ছে, সপ্তদশীকে এনে বাইকের বসাবে তাও আবার তারই সামনে। মাহি'র কুঁচকে রাখা ভ্রু দ্বয় কুঁচকে গেল আরও। নজর আরেকটু তীক্ষ্ণ করতেই দেখল, যুবক এবার নিজ অশালীন অঙ্গ ভঙ্গিতে কোনরূপ রাখঢাক না রেখে, তাকে দেখিয়ে দেখিয়ে অশোভন কায়দায় কোমর নাড়ছে দোলায়মান ভঙ্গিতে। মাহি ভড়কায়! তীক্ষ্ণ বুদ্ধিসম্পন্না মুহুর্তেই বুঝে গেল মনস্টারের অসভ্য কান্ড কারখানার মানে। তৎক্ষনাৎ রণমুর্তি ভাবে আবির্ভূত হলো সপ্তদশী। দাঁতে দাঁত চেপে শক্ত করল চোয়াল। তা বুঝি বেশ দেখলেন অসভ্য বিস্ট। বেহায়া আঙ্গিকে কোমড় নাড়াতে নাড়াতে তক্ষুনি বাহাতের বৃদ্ধ আঙুল এবং তর্জনী একযোগে উঁচিয়ে ইশারা করল গোলাকার বৃত্তের। অতঃপর ব্যাঙ্গাত্মক ভঙ্গিমায় ডানহাতের তর্জনী উঁচিয়ে বাহাতের বৃত্তে ঘুরিয়ে তাচ্ছিল্যের সুরে গলা উঁচিয়ে বলল —
“ ফা'ক ইউ্য চাশমিস!”
কটমট করছে মাহি! চোখের কোটর ভরে গিয়েছে অপমানের অশ্রুতে। লোকটা তাকে ভাঙতে চাচ্ছে! নিত্যনতুন কায়দা খুঁজছে অপমান করার। সপ্তদশীর নারী সম্মানে বড্ড আচঁ লাগল বুঝি। অজান্তেই রাগ-ক্ষোভে তার হাতদুটো হয়েছে মুষ্টিবদ্ধ। দাঁতে দাঁত চেপে অশ্রু ঝরাতে থাকা সপ্তদশী আচানাক রাগের চোটে ঘুষি বসালো জানালার দেয়ালে। দাঁত কিড়মিড় করতে করতে শুধালো,
“ ব্লা'ডি বি'স্ট!”
ওদিকে তার ওমন ঘুষি বসানো দেখে মুহুর্তেই স্থবির হলো মুগ্ধ। চোখদুটোর খোলস থেকে এক নিমিষেই কেটে গেল এতক্ষণের শ্লেষাত্মক কটাক্ষ ভাবসাব! সেথায় এবার ভীড় জমালো অবাধ রাগ। চোয়ালের পেশি টানটান হলো মুগ্ধের। বৃষ্টির ঝড়ো বেগে শোনা যাচ্ছে না দাঁতের কটমট শব্দ। যুবক তক্ষুনি পা ঘুরিয়ে নেমে গেল বাইক থেকে। অতঃপর নিজ দাম্ভিক কদমে গটগটিয়ে এগোলো প্যালেসের দিকে। মাহি দেখল না সেসব! অপমানে বুক কাঁপছে তার। মাথার তালু জ্বলছে সেই সাথে!
★
গা ভিজে চুপচুপে অবস্থা! ওভারকোটের কোণ হতে টুপটুপ করে ঝরে পড়ছে পানির কণা। একহাতে ধরে রাখা হেলমেটখানা! দাম্ভিক কদমে সগৌরবে গটগটিয়ে এগোচ্ছে মুগ্ধ। দাঁতে দাঁত কিড়মিড় করছে অনবরত। এলিভেটর তিন তলায় এসে থামতেই যুবক পা রেখেছে প্রশস্ত করিডরে। ধুপধাপ পায়ে সপ্তদশী কক্ষের পানে এগোতেই দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকা দেহরক্ষী দু'জন তড়িঘড়ি করে হাঁটু গেঁড়ে মাথা নুইয়ে বসলেন জমিনে। যুবক সেদিকে ভ্রুক্ষেপহীন! চোয়াল শক্ত করে ফুটিয়ে, গটগটিয়ে ঢুকলো মাহি'র কক্ষে। এক ঝটকায় হাতের হেলমেটখানা ফ্লোরে ছুঁড়ে ফেলতেই ঝনঝনিয়ে উঠল তা। সে-ই শব্দ কানে যেতেই হকচকিয়ে ওঠে মাহি। ভড়কে গিয়ে মাথা তুলে হাঁটুর ভাঁজ হতে। এদিকে মুগ্ধ ফোঁস ফোঁস করছে। দাঁতে দাঁত চেপে বলে ওঠে,
“ হাউ ডেয়ার ইউ্য?”
বোকা মাহি অবোধের ছাপ ফুটিয়েছে নিজ মুখাবয়বে। একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে যুবকের পানে। রাগের চোটে কপালের রগগুলো স্পষ্ট যুবকের, চোয়াল ফুটেছে ব্লেডের ন্যায়! হিং স্র যুবক তক্ষুনি এগিয়ে এসে আচমকা এক হেঁচকা টানে টেনে ধরে মাহি'র ডানহাত। এহেন কান্ডে হকচকানোর সময় পায়নি সপ্তদশী, তার আগেই যুবকের হেঁচকা টানে ব্যথায় মুখ কুঁচকে নেয় বেচারি। ইশশ্! হাতটা বুঝি জয়েন্ট ছেড়ে এই বুঝি খুল পড়বে!ওদিকে যুবক উম্মাদ! উদ্ভ্রান্তের ন্যায় মাহি'র ডানহাতটা উল্টেপাল্টে দেখতে দেখতে কটমটিয়ে বলে,
“ কোন জায়গায় লেগেছে বান্দীর মেয়ে? কোন জায়গায় ব্যথা লেগেছে তারাতাড়ি বল জানোয়ারের বাচ্চা।”
এহেন কথায় যারপরনাই অবাক হলো সপ্তদশী। পরমুহূর্তেই চোখভরা ঘৃণা নিয়ে তাকালো যুবকের পানে। যুবক অস্থির! ব্যাকুল চিত্তে মাহির হাত উল্টেপাল্টে দেখতেই হঠাৎ খুঁজে পেল ব্যথা পাওয়া জায়গাটা। সেথায় কেমন কালচে ভাব ধরে গিয়েছে ইতোমধ্যে! যুবকের রাগ বাড়ল বোধহয়। দৃঢ় চোয়ালখানা শক্ত হলো আরও। দাঁতের তীব্র ঘর্ষণে কটমট শব্দ তুলে আচানক এক আগ্রাসী থাবায় আঁকড়ে ধরল মাহি'র নরম তুলতুলে চোয়ালখানা। ব্যথায় ককিয়ে ওঠে মাহি! মুখ কুঁচকাতেই শুনতে পেল — মুগ্ধের দাঁত কিড়মিড় কন্ঠ!
“ মুখে উত্তর দেওয়ার সাহস নেই তোর জানোয়ারের বাচ্চা?
“ মুখে বলার সাহস নেই তোর জানোয়ারের বাচ্চা? কোন সাহসে দেয়ালে হাত ঠুকলি তুই? কে দিলো তোকে এই সাহস? কলিজা বেশি বড়ো হয়ে গেছে বান্দীর মেয়ে? আমার খেয়ে, আমার পরে আমার সামনেই আমার ব্যাক্তিগত অধিকারে আঘাত করিস — তোর দেখি মুখ থেকে পেছন অব্দি কলিজা ভরা! ইট্টুনুক একটা বিল্লোর এত্ত তেজ! কথায় না পেরে গায়ে আঘাত করে। এক্কেবারে হাত-পা কে'টে পঙ্গু বানিয়ে ঘরে বসিয়ে রাখব বান্দীর মেয়ে!”
ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছে মাহি। ছলছল চোখজোড়ায় সে-কি মায়া। যুবক একপলক সেদিকে তাকিয়ে থেকে পরমুহূর্তেই চোখ সরালো অন্যত্র। সরু নাকের পাটাখানা ফুলিয়ে লম্বা এক নিশ্বাস টেনে, ঠোঁট গোল করে নিশ্বাস ফেলল পরক্ষণে। এক ঝটকায় মাহি'র চোয়াল ছেড়ে দিয়ে রূঢ় মানব গিয়ে দাঁড়াল দু-কদম দুরত্বে। সাপের ন্যায় ফোঁস ফোঁস করতে করতে, হাত উঁচিয়ে ঘাড় ডলছে অনবরত। তবে সেকেন্ড ত্রিশেক যেতে না যেতেই রঙ পাল্টালো যুবকের মুখ। সেথায় এবার ভর করল একরাশ রহস্যময় রূঢ়তা। সে কেমন ঘাড় বাকিয়ে ক্রন্দনরত সপ্তদশীর পানে তাকিয়ে থেকে গমগমে গলায় বলল,
“ বৃষ্টিতে ভিজবি না? চল তাহলে! তোর এই শেষ ইচ্ছেটা পূরণ করি।”
হতবিহ্বলের ন্যায় মুখ তুলে তাকায় মাহি। কানে ভুল শুনল কি-না যাচাই করতে আহাম্মকের মতো চেয়ে রইল কিয়তক্ষন। বোকার ন্যায় জিজ্ঞেস করল,
“ শেষ ইচ্ছে মানে?”
রূঢ় মানব রহস্যময় ভঙ্গিতে বাঁকা হাসলো কেমন। রয়েসয়ে এগিয়ে এসে আলতো করে হাত উঁচিয়ে রাখল মাহি'র মাথায়। সেথায় খানিকক্ষণ অল্প অল্প করে ব্যাথাহীন চাপড় বসিয়ে ভরাট কন্ঠে বলল,
“ মানুষের জীবন বড্ড ক্ষীণ চাশমিস! তাই আমাদের প্রতিটি দিন জীবনের শেষদিনের মতো কাটানো উচিৎ। বলা তো যায়না — কার মরণ ঠিক কখন হয়ে যায়।”
অবোধ মাহি বুঝলোনা যুবকের মোটা বাক্য। কান্না ভুলে কেমন অনুভূতিশূন্য চোখে তাকিয়ে রইলো কিয়তক্ষন। যুবক নজর সরায় অন্যত্র। সপ্তদশীর সামনে থেকে সরে গিয়ে দাঁড়ায় দু-কদম দুরত্বে। ভাবলেশহীন ভঙ্গিতে দু'হাত পকেটে গুঁজে গমগমে গলায় বলে,
“ যা!”
সপ্তদশী কাঁপা কাঁপা পাদু’টো সময় নিয়ে ঠেকালো ফ্লোরে। শুকনো ফাঁকা ঢোক গিলে বসা ছেড়ে দাঁড়িয়ে আরেকবার ঘুরে তাকায় রূঢ় মানবের পানে। আমতা আমতা করে মায়াবী কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,
“ সত্যি যাবো? গেলে মা'রবেন নাতো?”
যুবক তীক্ষ্ণ দৃষ্টি তাক করল এপর্যায়ে। পিয়ার্সিং করা ঠোঁটদুটো খানিক নাড়িয়ে চাড়িয়ে রহস্যময় কন্ঠে বলল —
“ এটাই শেষ! আজকের পর থেকে আর কোনোদিন মা'রতে হবে না তোকে।”
সপ্তদশীর মনে চলছে হাজার উচাটন। তবুও বৃষ্টি ভেজার ইচ্ছে পূরণ করতেই হবে তার। শেষবার যখন বাড়িতে ছিলো, তখন মা বলেছিল — বৃষ্টি ভিজলে না-কি মনের সকল দুঃখকষ্ট বৃষ্টির পানির সাথে ধুয়েমুছে যায়। সপ্তদশীর মনভরা কষ্ট! যার ভার বয়ে চলতে বড্ড কষ্ট হচ্ছে তার। তাই তো সে চাচ্ছে এ কষ্ট কমুক। বৃষ্টিতে ভিজলে যদি কষ্ট কমে, তবে নাহয় তা-ই হোক। মাহি ফাঁকা ঢোক গিলে চুপচাপ বেরিয়ে গেল ঘর ছেড়ে। মুগ্ধ একদৃষ্টে তাকিয়ে দেখল সপ্তদশীর চলে যাওয়া। ধীরেসুস্থে হাত ঘুরিয়ে কোমরের পেছন থেকে নিজের চিরচেনা AQ7 মডেলের বন্দুকটি বার করে এনে, যুবক উল্টেপাল্টে দেখতে লাগল তা। পরক্ষণে বিড়বিড়িয়ে আওড়াল,
“ ভেবেছিলাম আর ক'টাদিন বেঁচে থাকবি চাশমিস! তবে তা আর হলো কই?”
_______________________________________
প্রশস্ত করিডর দিয়ে হাঁটছে মিলা। পায়ের গতি এগোচ্ছে মাহি'র ঘরের দিকে। তবে মাঝপথেই ডানহাতের কব্জিতে বিশাল এক টান বসল তরুণীর। মুহুর্তেই ক্ষুদ্র শরীরখানা তার ছিটকে চলে গেল করিডরের পাশের কামরায়। এহেন অতর্কিত কান্ডে হকচকিয়ে ওঠে মিলা। ভড়কানো দৃষ্টে সামনে তাকাতেই মুখোমুখি হলো এডউইনের। তক্ষুনি কুঁচকে গেল তরুণীর ললাট। ঠোঁট নাড়িয়ে কাঠকাঠ কন্ঠে যেইনা কিছু বলতে যাবে ওমনি কোনরূপ বলাকওয়া ছাড়াই শক্ত হাতে তরুণীর কন্ঠা চেপে ধরে এডউইন। গম্ভীর মুখো যুবকের চোয়াল কাঁপছে রাগে। ভিন্ন রঙের চোখদুটোয় লেপ্টে গিয়েছে আগুন। যুবক গলায় একরাশ ঝাঁঝ ঢেলে দাঁত খিঁচে আওড়াল,
“ মুনবার্ডের কাছ থেকে দূরে থাকো গ্লুপায়া! আদারওয়াইজ, আমার হাতে তোমার মরণ নিশ্চিত।”
মুহুর্তেই পাল্টে গেল তরুণীর মুখব্যাক্তি। সেথায় এবার ভীড় জমালো একরাশ কুটিলতা। ঠোঁটের কোণে আচমকা ফুটে উঠল এক চিলতে রহস্যময় বাঁকা হাসি। মেয়েটা কেমন কাঠকাঠ কন্ঠে ত্বরিত জবাব দিলো,
“ আপনি যেটা চাচ্ছেন, সেটা আমি ম'রে গেলেও হতে দিবোনা এডউইন। ওকে আমি ওর সঠিক জায়গায় পাঠিয়েই ছাড়ব! এতে আমার মরণ হলে হোক। আমি প্রস্তুত!”
চোয়াল শক্ত হলো এডউইনের! মিলার কন্ঠায় চেপে রাখা হাতখানার জোর বাড়িয়ে সে কেমন কটমট কন্ঠে আবারও বলে ওঠে,
“ স্টে ইন ইউ্যর লিমিট গ্লুপায়া, আদারওয়াইজ আ'ল কিল ইউ্য।”
তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটলো মিলার পাতলা অধর কোণে। নিশ্বাস আঁটকে আসার যোগাড় হলেও মেয়েটা কেমন রয়েসয়ে থেমে থেমে বলল,
“ একটা কথা বলি এডউইন?”
যুবক শিথিল করল নিজ ভ্রু দ্বয়। তরুণীর পানে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতেই তরুণী ব্যাঙ্গাত্মক কন্ঠে বলল,
“ ফা'ক ইউ্য!”
মুহুর্তেই দাউদাউ করে জ্বলে উঠল এডউইনের মাথার তালু। সদা গম্ভীর ভাব ধরে রাখা যুবক আজ নিজ হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে আচমকা কষিয়ে থাপ্পড় বসালো মিলার গাল বরাবর। একের পর পর চপেটাঘাতে কুপোকাত তরুণীর নরম গাল। ঠোঁটের কোণ ফেটে গিয়ে যাচ্ছে তা-ই অবস্থা! দূর্বল তরুণী গায়ের জোর ধরে রাখতে না পেরে তক্ষুনি লুটিয়ে পড়ল মেঝেতে। এডউইন থামলো এবার। রাগে গজগজ করতে করতে খানিকটা নুইয়ে এসে তৎক্ষনাৎ মুঠোয় চেপে ধরে মিলার চুল। অতঃপর মেয়েটার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলে,
“ স্টে এওয়ে ফ্রম মা'ই ওয়ে! আমি এবার আর কাউকে মানব না। না তোকে, না মনস্টারকে!”
কথাটা শেষ করে তক্ষুনি মিলাকে ছেড়ে দিয়ে উঠে দাঁড়ায় এডউইন। গজগজ করতে করতে পা বাড়ায় ঘরের বাইরে। এলোমেলো দৃষ্টিতে এদিক-ওদিক তাকাতেই আচমকা তার চোখাচোখি হলো অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা মনস্টারের পানে। মুহুর্তেই স্থির হলো এডউইন। মাথাটা তৎক্ষনাৎ ঝুঁকিয়ে নিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো কেমন। মুগ্ধ কঠিন দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে এডউইনের পানে। একহাতে তার রিভলবার স্পষ্ট! চোয়াল শক্ত করে ফুটিয়ে যুবক গুনে গুনে পা ফেলে এগিয়ে এসে দাঁড়ালো এডউইনের পাশে। খানিকক্ষণ মৌন থেকে আচমকা কঠিন গলায় বলতে লাগল,
“ তুই যা করছিস সেটা মাঝপথেই থামিয়ে দে এডউইন!”
এই প্রথম মনস্টারের বাক্য এড়াতে উদ্যোত এডউইন। মাথাটা ঠায় নুইয়ে রেখে শান্ত অথচ রূঢ় কন্ঠে জবাব দিলো,
“ সম্ভব না মনস্তার!”
মুহুর্তেই কটমট করে উঠল মুগ্ধের চোয়াল। একহাতে তক্ষুনি রিভলবার অন করতে করতে কঠিন গলায় শুধালো,
“ তাহলে গার্ডেনে দু'টো কবর খুঁড়ে রাখ এডউইন! কেননা পরবর্তীতে নিজের কবর খোঁড়ার সময় পাবিনা হয়তো।”
কথাটা বলেই পায়ে গতি টেনেছে রুশদী কিং। চলে যাচ্ছে নিজ গন্তব্যে। এদিকে সে পাশ থেকে সরতেই আচানক হাঁটু গেঁড়ে মেঝেতে বসে পড়ে এডউইন। এতক্ষণের রূঢ় মানব এবার কেমন কাঁপছে দেখো! অস্থিরতায় শুষ্ক অধরজোড়া জিভ দিয়ে খানিক ভিজিয়ে নিয়ে আনমনে বিড়বিড় করে বলতে লাগল,
“ আমি পারবোনা মনস্তার! আমি পারবো না। আমি বেঁচে থাকতে মুনবার্ডকে আপনি মা'রতে পারবেন না। কারণ আর কেউ জানুক বা না জানুক, আমি জানি মনস্তার — ইউ্য আর ডিপলি অবসেসড উইথ হার। আমি এটাও জানি, আপনি আপনার মায়ের শেষ শত্রুকে মে'রে দিয়ে আপনি নিজেও আত্মহত্যা করবেন! কারণ আপনার বেঁচে থাকার কারণ ফুরিয়ে যাবে সেদিন! কিন্তু আপনার কিছু হয়ে গেলে এই পুরো সাম্রাজ্যের কি হবে মনস্তার? স্বয়ং রুশদী কিং না থাকলে রুশদী প্যারাডাইসের কি হবে? না না! আমি থাকতে আপনি নিজেকে শেষ করতে পারবেন না। দুনিয়া এসপারওসপার হয়ে গেলেও আমি আপনাকে বুঝিয়ে ছাড়বোই যে — ইউ্য আর ইন লাভ উইথ মুনবার্ড! আপনার বাকিটা জীবন বেঁচে থাকার কারণ হবে ঐ সাধারণ মেয়েটা। এতটুকু বোঝাতে গিয়ে আমার যদি মরণও হয়, তবে তাই সই।”
★
প্যালেসের বাইরে পা রেখেছে মুগ্ধ! ঝুম বৃষ্টি মাথা নিয়ে ফের হাঁটছে গার্ডেনের দিকে। হাতে তার বন্দুক! কন্ঠে চাপা ক্ষোভ। যুবক কেমন বিড়বিড়িয়ে আওড়াচ্ছে —
“ দুনিয়া এসপারওসপার হয়ে গেলেও তোর মরণ আমার হাতে নিশ্চিত বান্দীর মেয়ে! আর সেটা আজকেই।”
#মির্জা_সায়ান_মুগ্ধ — পর্বঃ৩৫(খ)
#jannatul_firdaus_mithila
মার্বেলের স্বচ্ছ তকতকে মেঝেতে একজোড়া ইতালিয়ান লেদারের শুজ পরিহিত পাদু’কা দাঁড়িয়ে আছে ঠায়! পাদুকার মালিক বড়ো অস্থির! কৃত্রিম শীতলতায় মোড়ানো কক্ষেও বড্ড ঘামছেন তিনি। অস্থিরতায় ব্যুট জুতোর শক্ত পাটাতনের ঠকঠক শব্দ তুলে পায়চারী চালাচ্ছেন এদিক-ওদিক। তবে কান্ড দেখো! মধ্যবয়স্কের অস্থিরতা ক্রমশ বাড়ছে বৈ কমছে আর না। অস্থিরতায় এলোমেলো হাত ঢুকিয়েছেন নিজ প্যান্টের পকেটে। খানিকক্ষণ হাতড়ে বের করে আনলেন নরম সুতি কাপড়ের রুমালখানা। তড়িঘড়ি করে নিজ ঘর্মাক্ত কপালখানা কোনমতে মুছতেই মধ্যবয়স্কের কর্ণকুহরে ভেসে এলো কারো দাম্ভিক কন্ঠ!
“ ডঃ দামিয়ান?”
ত্বরিত ঘাড় বাকিয়ে পেছনে তাকালেন দামিয়ান। অদূরের সিঁড়ির আগায় দাঁড়িয়ে আছে নিক। গায়ে একখানা কালো রঙা বাথরোব, মাথাভর্তি ফাঙ্গি রঙা সিক্ত চুলগুলো থেকে চুইয়ে পড়ছে পানি। যুবকের চোখেমুখে একরাশ সন্দিগ্ধ ব্যাকুলতা। পায়ের গতি জোরালো বেশ। মার্বেলের সিঁড়িতে ধুপধাপ পা ফেলে নামছে সে। নামতে নামতেই ব্যাগ্র কন্ঠে ফের জিজ্ঞেস করে,
“ শুনলাম, মনস্টারের ব্যাপারে না- কি কিছু বলতে এসেছেন! তা কি সেটা?”
অস্থির দামিয়ান স্থির করলেন পাদু’টো। ঘর্মাক্ত কপালখানা আরেকবার রুমালের পৃষ্ঠে মুছে নিয়ে, পায়ের গতি টানলেন ভদ্রলোক। নিরবে এগিয়ে এসে দাঁড়ালেন মখমলি সোফার সন্নিকটে। হাতে তার একখানা কালো রঙা স্যুটকেস। সেথায় মালপত্র আছে কি-না কে জানে! তবে ভদ্রলোক ভীষণ কড়াকড়িভাবে আগলে রেখেছেন স্যুটকেসটা। প্রায় মিনিট খানেকের মধ্যেই হন্তদন্ত পায়ে গ্রাউন্ড ফ্লোরে এসে দাঁড়াল নিক। এসেই কেমন বিচলিত ভঙ্গিতে আচানক দু'হাতে আঁকড়ে ধরল দামিয়ানের প্রশস্ত কাঁধ। মুহুর্তেই মধ্যবয়স্কের কাঁধের চামড়ায় শার্টের ওপর দিয়েই দেবে গেল যুবকের ধারালো নখর। দামিয়ান মুখ কুঁচকায়। কাঁধে ব্যথায় গা নাড়তে গেলেই যুবক নিজ উদ্যোগে মধ্যবয়স্কের শরীরখানা মৃদু ঝাঁকিয়ে দাঁত খিঁচে আওড়াল,
“ হোয়ায় ডিড ইউ্য কাম হিয়ার বাস্টার্ড? মনস্টারের ব্যাপারে যা বলার কুইকলি বল। এন্ড ডোন্ট ইউ্য ডেয়ার টু ওয়েস্ট মা'ই টাইম।”
কন্ঠনালীর উঁচু হাড়খানা খানিক ওপর নিচ নড়ল বোধহয় দামিয়ানের। ভয়ে শুকিয়ে গিয়েছে তার কন্ঠা! সম্মুখ থেকে ভেসে আসছে দাঁত কিড়মিড় শব্দ। এতেই যেন বেচারার ভয় বেড়ে দ্বিগুণ। দামিয়ান তড়িঘড়ি করে হাতের স্যুটকেসখানা উঁচিয়ে নিকের দিকে আলগোছে বাড়িয়ে দিলেন। ভয়ার্ত কন্ঠে থেমে থেমে আওড়ালেন,
“ এটাতেই আছে আপনার সব উত্তর!”
কপাল গোছালো রাশিয়ান সুদর্শন। লম্বাটে ফর্সা মুখখানায় তার ফুটে উঠেছে একরাশ সন্দিহান অভিব্যক্তি। যুবকের উপরিভাগের দাঁত কপাটি ইতোমধ্যেই আঁকড়ে ধরেছে নিচের ঠোঁটখানা। ফলে লম্বাটে চোয়ালের রেখা টানটান হয়েছে বেশ। সে কয়েকপল শক্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল বাড়িয়ে দেওয়া স্যুটকেসের দিকে। অতঃপর গম্ভীর রূঢ় কন্ঠে শুধালো,
“ কি আছে এটায়?”
এহেন কথার প্রতিত্তোরে ক্রুর হাসলেন দামিয়ান। তা আড়দৃষ্টে বেশ লক্ষ্য করল নিক। রয়েসয়ে দামিয়ান কেমন কুটিল কন্ঠে বলে ওঠে,
“ মনস্টারের দূর্বলতা!”
মুহুর্তেই এক অদৃশ্য ঝটকা খেলে গেল নিকের সম্পূর্ণ বদনে। নীলচে চোখদুটোর দৃষ্টিতে জমেছে একরাশ হতবাকতা। বাদামী ঠোঁটজোড়ার মধ্যকার দুরত্ব বুঝি বাড়ছে ক্রমান্বয়ে। দামিয়ান তড়িঘড়ি করে মেরুদণ্ড বাঁকালেন। হাতের স্যুটকেসটা সম্মুখের সোফা টেবিলের ওপর রেখে তৎপর হলেন তা খুলতে। এদিকে নিক এখনো ডুবে আছে এক আকাশসম অবিশ্বাস্যতায়। তার হতবাক কন্ঠেফুড়েঁ অস্ফুটে বেরুলো,
“ মনস্টারেরও দূর্বলতা আছে? হাউ ইজ দিস পসিবল?”
অস্ফুটে আওড়ানো বাক্য শুনলেন না দামিয়ান। নিজ কাজে মত্ত সে। মিনিট গড়ানোর আগেই খট-খট শব্দ তুলে খুলে ফেললেন স্যুটকেসখানা। পরমুহূর্তে সেখান থেকে দুটো মসৃণ কাগজের খাম তুলে আলগোছে বাড়িয়ে দিলেন নিকের পানে। ঠোঁটের কোণে শয়তানী হাসির রেশ টেনে ভরাট কন্ঠে বললেন,
“ এটাই সে-ই দূর্বলতা, যার জন্য মনস্টার কিছুদিন আগে গোটা রাশিয়ার টপ লিস্টে থাকা ৩৫জন ডাক্তারকে নিজের হিডেন প্যারাডাইসে নিয়ে গিয়েছিলেন। ফিরতি পথে সবাইকে হ্যালুসিনেশনের ট্যাবলেট খাওয়ালেও আমি মুখে নিয়েও খাইনি তা। অচেতন হবার ভং ধরেছিলাম তখন।”
কথাটা শেষ হবার ঠিক পরমুহূর্তেই দামিয়ানের হাত থেকে এক টানে খাম দুটো নিয়ে নেয় নিক। প্লাগ করা ভ্রু দ্বয়ের মাঝে গোটাকতক ভাঁজ ফেলে ব্যগ্র হাতে খামের ডগা ছিঁড়ে যেইনা ভেতর থেকে মসৃণ পৃষ্ঠা দুটো বের করল, ওমনি ছেলেটার দৃষ্টি হয়েছে বিস্ফোরিত! সফেদ রঙা মসৃণ পৃষ্ঠে পেন্সিল স্কেচে এক সপ্তদশীর মায়াবী মুখ অঙ্কিত। দু'টো পৃষ্ঠাতেই একই ছবি! নিক কপাল গোছালো ফের। চোয়ালের পেশী শক্ত করে কঠিন চাহনি নিক্ষেপ করল দামিয়ানের দিকে। পরক্ষণে এক আগ্রাসী থাবায় দামিয়ানের চোয়াল আঁকড়ে, কটমট করতে করতে আওড়াল,
“ আর ইউ্য সিরিয়াস এসহোল? তুই বলতে চাচ্ছিস দ্য রুশদী কিংয়ের দূর্বলতা একটা সাধারণ মেয়ে? বাস্টার্ড! ডু ইউ্য হেভ এনি আইডিয়া এবাউট হিম? সে চাইলেই রাশিয়া কিংবা যেকোনো দেশের হাজারটা সুন্দরীকে নিজের শয্যাসঙ্গীনী বানাতে পারে। আর তুই কি-না বলছিস এই মেয়ে তার দূর্বলতা? ব্লা'ডি ইনসেন্স!”
বলতে বলতেই হাতের মসৃণ পৃষ্ঠা দু'টো আচমকা হাওয়ায় ছুঁড়ে মা'রল যুবক। দামিয়ান গম্ভীর হলেন এপর্যায়ে। রাগের তোড়ে মুখাবয়বে লালাভ আবরণ ফুটিয়ে ঝাঁঝাল কন্ঠে পরক্ষণেই শুধালো,
“ ইয়েস, ইট সাউন্ডস ফানি বাট ইট’স ড্যাম ট্রুথ! এই সাধারণ একটা মেয়ের জন্য এখানে ..... ”
কথাখানা আওড়াতে গিয়ে তৎক্ষনাৎ নিজের বাহাতের তর্জনী উঁচিয়ে মাথার খুলি বরাবর তাক করলেন দামিয়ান। মুখটায় আগের ন্যায় কটমটে ভঙ্গিমা বজায় রেখে ফের শুধালেন,
“ ঠিক আমার মাথার তালু বরাবর বন্দুকের নল ঠেকিয়ে মনস্টার বলেছিলেন — ২৪ ঘন্টার মধ্যে ঐ মেয়ের জ্ঞান না ফিরলে তিনি আমাদের সবাইকে মে'রে ফেলবেন। এট দ্যাট টাইম, আই ওয়াজ লাইক — সিরিয়াসলি? দ্য গ্রেট রুশদী কিং কিনা একটা মেয়ের জন্য এভাবে আমাদের হুমকি দিচ্ছে! আর আপনি বলছেন সে-ই মেয়ে সাধারণ?”
সহসা চোখদুটো সরু হয়ে এলো নিকের। কপালের চামড়ায় দেখা গেল দীরুক্তির ভাঁজ। সে কেমন সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে আলগোছে তাকাল মেঝেতে অবহেলিত আকারে পড়ে থাকা সপ্তদশীর স্কেচের পানে। রয়েসয়ে শরীর বাকিয়ে হালকা ঝুঁকে এসে স্কেচদুটো তুললো নিক। আনমনে সপ্তদশীর মুখপানে তাকাতেই দৃষ্টি থমকাল তার। মায়াবতীর মুখটা বড্ড সাধারণ। চোখদুটো হরিণীর ন্যায় বড়ো বড়ো। তার মুখাবয়বের সবচেয়ে আকর্ষণী ব্যাপার তার ওষ্ঠপুট! মনে হচ্ছে — কোনো দক্ষ কারিগর তার সারাজীবনের মেহনত এবং দক্ষতা দিয়ে বড্ড নিপুণ হাতে এঁকেছে সপ্তদশীর ঠোঁটদুটো। নিক কেমন অদ্ভুত কামার্ত দৃষ্টিতে চেয়ে আছে সেদিকে। আনমনে সপ্তদশীর নিখাঁদ সৌন্দর্যের প্রতীকী ঠোঁটযুগলের ওপর আঙুল বুলিয়ে কামার্ত কন্ঠে আওড়াল,
“ উফফ! হার লিপস! দে আর অলরেডি টার্নিং মি অন।”
বাঁকা হাসলেন দামিয়ান। নজর খানিকটা ঝুঁকিয়ে, আলতো করে কপাল চুলকালেন এরইমধ্যে। সম্মুখ থেকে নিক তখন সন্দিহান গলায় জিজ্ঞেস করে ওঠে,
“ হেই দামিয়ান! ও আমার বেড কাঁপাতে পারবে তো?”
এপর্যায়ে হাসি আর রুখতে পারলেন না দামিয়ান। ঠোঁটের রেখা প্রশস্ত করে হাসলেন গালভরে। চোখেমুখে এক অদ্ভুত লিপ্সা লেপ্টে কামবর্ত্ম কন্ঠে শুধালেন,
“ স্বয়ং মনস্টারকে কাবু করেছে যে-ই মেয়ে, তার ক্ষমতা থোড়াই কম! বেড কাঁপাতে না পারলে মনস্টার কি আর এমনি এমনি তাকে নিজ প্রাসাদের রাণী করে রেখেছে?”
কথাখানা শেষ করেই হাসি গাঢ় হলো দামিয়ানের। ওদিকে নিক এখনো একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে সপ্তদশীর নির্জীব ছবির পানে। যুবকের ঠোঁটের কোণে ঝুলছে এক অদ্ভুত ঠান্ডা হাসি। আচমকা সে কেমন হিসহিসিয়ে বলে ওঠে,
“ এন্ড ফাইনালি, মনস্তারের দূর্বলতার সন্ধান পেয়েছে নিকোলাস মারগ্রেট। খুব অচিরেই যে হবে আমার রাতের সঙ্গীনি!”
হাসছে নিক! পাদু’টোর গতি টেনেছে উল্টোপথে। হাতে থাকা ছবিগুলোর পানে ঠায় দৃষ্টি বজায় রেখেই যুবক কন্ঠ উঁচিয়ে ডাকল,
“ এঞ্জেলা!”
এক ডাকেই কোত্থেকে যেন হাওয়ার বেগে ছুটে এলেন এক পারস্যের সুন্দরী! আবেদনময়ী ভাব ভঙ্গিমা তার সর্বাঙ্গে। গায়ে জড়ানো একখানা পাতলা ফিনফিনে সফেদ রঙা সাদা শার্ট। নারী কায়ার লুকায়িত প্রতিটি স্পর্শকাতর অঙ্গের ভাঁজ যার ওপর দিয়ে স্পষ্ট! অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা মধ্যবয়স্ক দামিয়ান বুঝি চোখ দিয়ে গিলে খাচ্ছে সুন্দরীকে। সে যে নারী লিপ্সায় নিকের চাইতে খুব বড়ো নাহলেও খুব একটা ছোটও নয়। সুন্দরীর বাঁকান কায়া দেখে অভ্যন্তরীণ লুকনো পৌরুষ্য জাগ্রত হতে খুব একটা সময় নেয়নি দামিয়ানের। মধ্যবয়স্ক কেমন কামার্ত নয়নে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সুন্দরীর পানে। সুন্দরী এলোমেলো ভঙ্গিতে ছুটে এসে আচমকা দু'হাতে গলা জড়িয়ে ধরে নিকের। যুবক ঠোঁট কামড়ে হাসলো। এক হেঁচকা টানে সুন্দরীর কোমর টেনে নিজের সঙ্গে গভীরভাবে মিশিয়ে নিলো পরক্ষণে। অতঃপর নিজ বেহায়াপনায় কোনরূপ রাখঢাক না রেখে তৎক্ষনাৎ ঠোঁট ডুবালো সুন্দরীর রক্তভেজা কৃত্রিম লালিমায় ছেয়ে থাকা অধরযুগলে। এক গভীর চুম্বনে লিপ্ত দু'জন! আশেপাশে ওতো মানুষ থাকা স্বত্বেও সেদিকে ভ্রুক্ষেপহীন তারা। প্রায় মিনিট পাঁচেকের লম্বা চুম্বন শেষে থামল নিক। পারস্য সুন্দরীর লাল টুকটুকে নাকের পাটায় আলগোছে দাঁত বসিয়ে দিয়ে ফিসফিসে কন্ঠে বলল,
“ গো এন্ড গেট রেডি ডিয়ার! আ'ম ফিলিং হাঙ্গরি ফর ইউ্য!”
তৎক্ষনাৎ সুন্দরীর সিক্ত ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল লালসার হাসি। বিন্দুমাত্র লাজলজ্জা না দেখিয়ে সুন্দরী জিভ উল্টে বলল,
“ কাম বেবি! আ'ম অলওয়েজ রেডি ফর ইউ্য।”
মুচকি হাসলো নিক। সুন্দরীর মেদহীন বাঁকান কোমরের পিঠে দু'হাত ঠেকিয়ে আলগোছে ঘাড় বাকিয়ে তাকায় পেছনে। অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা দামিয়ান অস্থির! সর্বাঙ্গ ঘামছে তার। নিঃশ্বাসের ওঠানামা প্রবল। নিক বিচক্ষণী পুরুষ! খুব একটা সময় লাগল না তার দামিয়ানের হুটহাট অস্থিরতার কারণ বুঝতে। সে কেমন ক্ষুদ্র দৃষ্টিতে আপাদমস্তক পরোখ করল দামিয়ানকে। পরক্ষণেই তার নজর আটকালো অন্য কোথাও। একমুহূর্ত সেথায় তাকিয়ে থেকে নিক কেমন ঠোঁট কামড়ে হাসল খানিকক্ষণ। সময় নিয়ে শ্লেষাত্মক ভঙ্গিতে বলল,
“ চোখ দিয়ে গিলে খেয়েও লাভ নেই দামিয়ান, ওর সাথে তুমি পারবেনা!”
লজ্জায় ধ্যান ভাঙল দামিয়ানের। পরক্ষণেই নিজের পানে দৃষ্টি নিবদ্ধ করতেই আঁতকে ওঠে বেচারা। তড়িঘড়ি করে পেছনের সোফায় গা এলিয়ে বসল সে। পাশ থেকে একখানা কুশন নিয়ে এসে আলগোছে ঠেকালো নিজ কোলে। লজ্জায় কান গরম হয়েছে বেচারার! সুন্দরীর সামনে পৌরুষ্য নিয়ে এভাবে তাকে খোঁটা দিতে পারল নিক? ইশশ্ কি লজ্জা কি লজ্জা!
___________________________________________
দাম্ভীক যুবকের গটগট পাদু’টো ছুটছে চেরি ব্লসম গার্ডেনের দিকে। ট্যাটু শৈলীতে অঙ্কিত ডানহাতের রুক্ষ আঙুলের ভাঁজে আঁটকে আছে রিভলবার। যুবকের গায়ে কেবল একখানা ওভারকোট, যার সবক'টা বোতাম হা করে খুলে রাখা। অসময়ের বৃষ্টিতে ঠান্ডা বোধহয় একটু বেশি-ই। তবে ওমন ঠান্ডা কি আর ওতো সহজে গায়ে ধরে রূঢ় মানবের? সে কেমন অনুভূতিহীন কায়দায় এগোচ্ছে সামনে। আর কয়েক গজ এগুলেই বাগান। সেথায় হয়তো সপ্তদশী বৃষ্টি বিলাসে মত্ত। যুবকের নির্দয় মনের কোণে লুকিয়ে থাকা একটুখানি মুগ্ধতাও বুঝি হার মানছে যুবকের রূঢ়তার কাছে। সে এগোচ্ছে, এক ভিন্ন উদ্যোমে সপ্তদশীকে চিরদিনের জন্য নিস্তব্ধ করে দিতে এগোচ্ছে।
মাথার ওপর ঝুম বৃষ্টি! ব্যস্ত পদযুগলে ছুটছে এডউইন। হন্যে হয়ে খুঁজছে মনস্টারকে। বৃষ্টির প্রকোপ বাড়ছে ক্রমশঃ হাওয়ার তীব্র বেগে সম্মুখে তাকিয়ে থাকা দায় এমুহূর্তে। তবুও গম্ভীর মানব আজ বড্ড বিচলিত। হন্যে কদমে অগ্রসর হলো প্যালেসের বাঁদিকে। খানিকটা এগোতেই আচমকা দেখা গেল কঠিন মানবের প্রশস্ত অবয়ব। এডউইন তক্ষুনি সটান হলো। মনের মধ্যিখনে এক আকাশসম সাহস যুগিয়ে এগোলো মনস্টারের দিকে। ছুটতে ছুটতে দিশেহারা অবস্থা বেচারার। ঠান্ডায় কাঁপছে সর্বাঙ্গ। কোনমতে পায়ের গতি টেনে চলে এলো মনস্তারের পেছনে। ভাঙা ভাঙা গলায় থেমে থেমে আওড়াল,
“ মনস্তার! মনস্তার প্লিজ ডোন্ট ডু দিস। ওকে এখনি মে'রে দেয়াটা ঠিক হবে না।”
থামল রূঢ় মানবের ব্যস্ত পদযুগল। ঘাড় বাকিয়ে শক্ত চাহনিতে পেছনে তাকাতেই ভয়ে কদম পেছালো এডউইন। তড়িঘড়ি করে মাথা নোয়াতেই শুনতে পেল মুগ্ধের চিড়বিড় কন্ঠ!
“ হু দা ফা'ক আর ইউ্য বাস্টার্ড টু লেকচার মি? আরেকবার আমার কাজে ব্যাঘাত ঘটাতে চাইলে একদম কলিজা টেনে ছিঁড়ে ফেলব ব্লা'ডি এসহোল!”
ভয়ার্ত ঢোক গিলল এডউইন। এমন একটা ঠান্ডার মধ্যেও শরীরে আগুন জ্বলছে তার। গলার কাছটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে ইতোমধ্যে। যুবক ফাঁকা ঢোক গিলল ক্ষনে ক্ষনে। সম্মুখে ফের অগ্রসর হতে থাকা রূঢ় মানবের পানে একপল তাকিয়ে থেকে বুক ফুলিয়ে জোরালো নিশ্বাস টানল সে। তক্ষুনি মনের সকল ভয়ডর ভুলিয়ে, চিতাবাঘের ন্যায় পায়ের গতি বাড়িয়ে এগিয়ে এসে পথ আটকালো মুগ্ধের। দু'হাত দু'দিকে ছড়িয়ে বেচারা আওড়াল,
“ ক্ষমা করুন মনস্তার! কিন্তু এবার কেন যেন মনে হচ্ছে আপনি তাড়াহুড়ো করছেন। কারণ — তায়েফ এহসানের দূর্বলতা এতো তারাতাড়ি হারিয়ে গেলে তাকে মা'রতে খুব একটা আনন্দ পাবেন না আপনি। তাই বলছি মনস্তার, আরেকবার নাহয় ভেবে... ”
কথাটা পুরোপুরি শেষ করবার আগেই এডউইনের প্রশস্ত বুকের মাঝে আচমকা বসল এক সজোর লাথি। এহেন অতর্কিত আক্রমণের তাল সামলাতে না পেরে মুহুর্তেই কয়েক কদম পেছনে ছিটকে পড়ল এডউইন। জমিনে জমে থাকা বৃষ্টির পানিগুলো কেমন ছিটকে সরে গেল এদিক-ওদিক। বুকের ব্যথায় মুষড়ে যাচ্ছে বেচারা। দু'হাতে বুক চেপে শব্দ তুলছে ব্যথাতুর। চোখমুখ কুঁচকে থাকায় সে দেখেনি সম্মুখে দাঁড়িয়ে থাকা হিং স্র মনস্টারকে। সেকেন্ড ত্রিশেক পেরুতেই আহত এডউইন টের পেল তার চোয়াল বরাবর কারো শক্ত হাতের থাবা। ধীরে ধীরে সে থাবার জোর বাড়ছে। কটমট করছে বেচারার চোয়াল। এডউইন চোখ কুঁচকে রাখলেও বেশ চিনল সম্মুখের মানুষটাকে। সে রয়েসয়ে নিবুনিবু দৃষ্টিতে সামনে তাকাতেই দেখল — সুদর্শন যুবক কেমন সাপের ন্যায় ফোঁস ফোঁস করছে। তার চোখদুটো বুঝি আগুন ঝরাচ্ছে রীতিমতো। এডউইন ভড়কায়! চোয়ালের ব্যথা ভুলিয়ে অসহায়ের ন্যায় তাকাতেই কর্ণকুহরে ভেসে এলো মুগ্ধের দাঁত কিড়মিড় কন্ঠ!
“ ও আমার! ওর সাথে কি করব, না করব — সে সিদ্ধান্তও আমার। সেখানে তুই আমাকে নতুন করে জ্ঞান দেবার কে জানোয়ারের বাচ্চা? দু'দিনের প্রশ্রয়ে মাথায় চড়তে চাচ্ছিস বাস্টার্ড? ভুলে যাস না, তুই যদি চলিস ডালে ডালে — তাহলে আমি চলি পাতায় পাতায়। তুই যে খেলায় নতুনভাবে মত্ত হয়েছিস, আমি বহু আগে থেকেই ঐ খেলার ক্লাস নেওয়া বন্ধ করে দিয়েছি। এখনো সময় আছে এডউইন — এ পথ থেকে সরে দাঁড়া। নাহলে তোকে মা'রতে আমার কিন্তু বিলকুল হাত কাঁপবে না।”
বুক কাঁপছে এডউইনের। চোখ নেমেছে নিচু। বলার মতো কথা না থাকায় সে এবার মৌন। মুগ্ধ তখন এক ঝটকায় ছেড়ে দেয় এডউইনের চোয়াল। পরক্ষণে শীরঁদাড়া সটান করে দাঁড়ায় সে। ওভারকোটের হাতা উপরিভাগে টানতে টানতে গমগমে গলায় বলে ওঠে,
“ ক্ষমতা আর প্রতিপত্তির লোভ এ পৃথিবীর সবচেয়ে বড়ো লোভ বাস্টার্ড! যে একবার এ লোভে পড়েছে, সে নিজের সর্বস্ব খুইয়ে তবেই থেমেছে। তাই বলছি লোভ ছাড়। তোর এসব সো-কলড নাটক আমার সামনে করতে আসবি না।”
মুহুর্তেই পাল্টে গেল এডউইনের মুখো-অভিব্যাক্তি। সেথায় এবার ভর করল একরাশ কুটিলতা। মনস্টার কিভাবে তার কুট-কৌশল টের পেল তা নিয়ে বড্ড সন্দিহান যুবক। তবুও এমুহূর্তে নিজেকে বড়ো শান্ত দেখাল সে। তৎক্ষনাৎ ভঙ্গিমা ধরল নাটকীয়। মুখাবয়বে হতবাকতা লেপ্টে অবোধের সুরে বলল,
“ আপনি ভুল ভাবছেন মনস্তার! আমি কখনোই আপনার বিরুদ্ধে.. ”
কথাটা বলতে দেরি আর ওমনি জমিনে পড়ে থাকা যুবকের পেট বরাবর পড়ল আরেক লাথি। এবারের আক্রমণে জোর হয়েছে বেশ! তৎক্ষনাৎ ব্যথায় কুঁচকে গেল এডউইনের নাক-মুখ। ঠোঁটের ফাঁক গলিয়ে অস্ফুটে বেরুলো ব্যথাতুর ধ্বনি। সম্মুখে দাঁড়িয়ে থাকা যুবক এবার তক্ষুনি পা রাখল এডউইনের বুকের ওপর। পরক্ষণে হাতের রিভলবারখানা একটানে অন করে তাক করল এডউইনপর কপাল বরাবর। অতঃপর ঠোঁটের কোণে আচমকা তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটিয়ে বিচক্ষণী কন্ঠে আওড়াল,
“ তুই তো জানিস, আমি আমার আশেপাশে শত্রুদের কয়েদ করে রাখতে পছন্দ করি। নাহলে এতদিনে তোর কবর হতো প্যালেসের পেছনের জঙ্গলে।”
মুখটা থমথমে হয়ে গেল এডউইনের। জিভের ডগা বাকশূন্য! অপরাধীত্বে নত হয়েছে তার মুখ। মুগ্ধ হাসল! তাচ্ছিল্য ভরা হাসিতে প্রাণ নেই তেমন। সম্মুখে অগ্রসর হয়ে শ্লেষাত্মক ভঙ্গিতে বিড়বিড়াল,
“ নশ্বর এ দুনিয়ায় মনস্টারের আপন বলতে আছে কেবল তার প্রাণটা! ইশ্বর বাদে যেদিন মনস্টার চাইবে — সেদিন তার প্রাণটাও তাকে ত্যাগ করবে। সেখানে তোরা তো ক্ষনিকের শত্রু!”
বৃষ্টির প্রকোপে যুবকের বিড়বিড়ানো বাক্য পৌঁছুলো না কারো কানে। সে বাক্য কেবল মিলিয়ে গেল হাওয়ায়। নির্দয় মানব সম্মুখে অগ্রসর। টানটান চোয়ালের পেশীতে তার বরাবরের নির্দয়তা স্পষ্ট! বাদামী চোখদুটোতে খেলছে হিং স্রতা। বুকের পাটা ফুলিয়ে হাঁটতেই আচমকা তার পাদু’টোয় বেড়িবাঁধের ন্যায় জড়িয়ে ধরে এডউইন। আগের ন্যায় গুঙিয়ে বলল,
“ আপনি যা ইচ্ছে বলুন আমায় মনস্তার, তবুও মেয়েটাকে... ”
ঠাসসস.....
জিভ খসে যতটুকু বেরিয়েছে তার পরিপ্রেক্ষিতেই গায়ে আগুন ধরেছে মুগ্ধের। হাতের বন্দুকখানা এডউইনের বাহু বরাবর তাক করে ফায়ার করেছে নির্দয় মানব। চোখেমুখে একরাশ আগুন লেপ্টে দাঁতে দাঁত চেপে আওড়াল,
“ শি ইজ মা'ই প্রপার্টি! হাউ ডেয়ার ইউ্য কল হার — মেয়েটা? বাস্টার্ড! কতবার বলেছি ওর কথা মুখে না আনতে। আমার অবাধ্য হবার দুঃসাহস কোত্থেকে পাচ্ছিস জানোয়ারের বাচ্চা? ওর জন্য তোর এতো দরদ দেখাতে হবে কেনো? আমি ম'রে গেছি জানোয়ারের বাচ্চা? ওর জন্য দরদ দেখাতে আমি একাই যথেষ্ট। শি নিডস নো বডি, নো বডি মিনস নো বডি। ডু ইউ্য গেট দ্যাট ফা'কিং বাস্টার্ড?”
বাহু থেকে গলগলিয়ে বেরুচ্ছে লহু। ব্যথায় জ্ঞান হারাবে হারাবে ভাব এডউইনের। বেচারা মুখ কুঁচকে রেখেছে কেমন। ওদিকে মুগ্ধ হিসহিসিয়ে যাচ্ছে। কপালের রগগুলো ফুলে একাকার অবস্থা তার, দাঁতের সনে দাঁত পিষে তুলছে কটমট শব্দ। যুবক তক্ষুনি একটানে গা থেকে ওভারকোটটা খুলে এনে ছুঁড়ে জমিনে। অতঃপর রাগে গজগজ করতে করতে এডউইনের কপাল বরাবর বন্দুকের লৌহনল তাক করে, শক্ত গলায় বলল,
“ গেট লস্ট ইন হেল ব্লা'ডি এসহোল।”
হকচকায় এডউইন! চোখদুটো ছলছল তার। এতো তারাতাড়ি ম'রতে প্রস্তুত নয় সে। তাইতো তার ওতো উচাটন ভাব। বেচারা ভয়ে তটস্থ! একহাতে ক্ষমা চাওয়ার ভঙ্গিমা ধরতেই ক্রুর হাসলো মুগ্ধ। আকাশে তখন বিকট শব্দে গর্জন তুললো মেঘ। বজ্রপাতের এহেন আগ্রাসী শব্দে কেঁপে উঠবে যেকেউ। মুহুর্তেই কয়েক সেকেন্ডের এক পশলা সফেদ আলোর প্রতিচিত্রে দৃশ্যমান হলো আশেপাশের সবকিছু। যে বিকট শব্দে কেঁপে উঠেছে স্বয়ং এডউইন, অথচ সে সে শব্দের বিন্দুমাত্র তোয়াক্কা করেনি মুগ্ধ। উল্টো চোখেমুখে আগের ন্যায় ক্রুরতা বজায় রেখে বন্দুকের মধ্যকার ফারাকে আঙুল ঢুকিয়েছে। রুক্ষ আঙুলখানা যেইনা বাঁকিয়ে নিবে ওমনি পাহাড়সম যুবকের প্রশস্ত পিঠখানায় আচমকা আছড়ে পড়ল এক ক্ষুদ্রকায় তুলতুলে দেহ। নরম-সরম দুটো হাত যুবকের শক্তপোক্ত হাতের আড়াল দিয়ে জড়িয়ে ধরেছে তাকে। মুহুর্তেই থমকায় রূঢ় মানব। পেছন থেকে হুট করে ধেয়ে আসা ওমন আক্রমণে পাহাড়সম মানুষটা বোধহয় টললো খানিক। প্রশস্ত লোমহীন পেটের কাছে বাঁধন আকারে থাকা তুলতুলে হাতদুটো খামচে ধরেছে তার ত্বক। যুবক নিস্তব্ধ! ঠিক তখনি আকাশভাগ কাঁপিয়ে কাছাকাছি কোথাও পড়ল আরেক বজ্রপাত। সেই বিকট শব্দে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরা সপ্তদশী কেমন ভয়ে চেঁচিয়ে উঠল! ভয়ে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে দুহাতের সদ্য বড়ো হওয়া নখর দাবিয়ে দিলো যুবকের পেশিবহুল পেটানো পেটে। চোখমুখ খিঁচে আওড়াল,
“ আআআআ! বিস্ট, আমি আর বৃষ্টি ভিজবো না। প্লিজ নিয়ে চলুন আমায়। আমি আর বৃষ্টি ভিজবো না।”
সপ্তদশীর কথা আদৌও কানে গেল যুবকের? কই, যুবকের থমকানো চাহনি দেখে তাতো বুঝবার জো নেই। সে কেমন নিস্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে দেখো! সপ্তদশীর তুলতুলে গায়ের স্পর্শের ওমন মনমাতানো উষ্ণতা গায়ে ঠেকতেই হৃদয় থমকেছে রূঢ় মানবের। অবহেলায় হাত থেকে কখন যে বন্দুকখানা খসে পড়েছে কে জানে! বুকের ওঠানামার গতি বাড়ছে মুগ্ধের। এই প্রথম! এই প্রথম হার্টের কয়েকটি বিট একত্রে মিস হলো তার। মাথার ওপর ঝুম বৃষ্টি থাকা স্বত্বেও গলার কাছটায় বোধহয় খড়া নেমেছে নির্দয় মানবের। তৃষ্ণায় ফেটে যাচ্ছে বুক। বারেবারে সিক্ত অধরজোড়া দিয়ে ভিজিয়ে যাচ্ছে নিজ ওষ্ঠপুট! তবে বালাইষাট! এতে কি আর হয়? যুবক অস্থির হচ্ছে ক্রমশ। ঘাড় সমান বাদামী রঙা বাবরী চুলগুলো বাঁধন হারা হয়েছে বেশ আগে। তারা এবার সিক্ত হয়ে লেপ্টে গিয়েছে যুবকের প্রশস্ত কপালে। সপ্তদশীর হুঁশ নেই আজ! ঠান্ডায় বদন কাঁপছে তার। একটুখানি উষ্ণতার লোভে পারছেনা যুবকের পিঠ চিঁড়ে ভেতরে ঢুকে পড়তে। যুবকের তখন কি হলো কে জানে! নিজ সম্বিতে ফিরল বুঝি সে। তক্ষুনি চোয়াল শক্ত করে এক ঝটকায় পেট থেকে নামিয়ে দিলো মাহি'র নরম হাত দু'খানা। পরক্ষণে শরীর বাকিয়ে পেছনে ঘুরে যেইনা শক্ত চোখে তাকাল মেয়েটার পানে ওমনি দৃষ্টি থমকায় তার। সম্মুখে দাঁড়িয়ে আছে সিক্ত সপ্তদশী! সর্বাঙ্গ ভিজে যাচ্ছে তাই অবস্থা! কালো মেঘরাশির ন্যায় চুলগুলো থেকে চুইয়ে পড়ছে পানি। বৃষ্টির ফোঁটা আলতো করে ছুঁয়ে দিচ্ছে সপ্তদশীর তুলতুলে গোলাপি অধর। এটুকুতেই হুট করে হিংসে ধরল যুবকের মনে। দাঁতে দাঁত চেপে যেইনা সপ্তদশীর ঠোঁটের পানে হাত বাড়াবে ওমনি ঘটল আরেক বজ্রপাত! এবারেও ভয়ার্ত মাহি স্থানকাল ভুলিয়ে আচমকা মুখ লুকোলো নির্দয় মানবের বুকে। আগের ন্যায় ভয়ার্ত কন্ঠে আওড়াল,
“ আমার...ব-ভয় লাগছে বিস্ট!”
যুবকের বুকটা আজ হঠাৎ ওমন অদ্ভুত প্রশান্তিতে ছেয়ে গেল কেনো? তার হৃদয় ওমন দ্রুত ছুটছে কেনো? হাতদুটো নিশপিশ করছে কেনো মেয়েটাকে জড়িয়ে ধরতে? জানেনা মুগ্ধ! জানেনা নিজের এহেন হুটহাট পরিবর্তনের কারণ। সে শুধু মুখ নামিয়ে আনল সপ্তদশীর কান বরাবর। অতঃপর ফিসফিসিয়ে বলল,
“ বিস্টের বুকে লুকোতে ভয় লাগছেনা চাশমিসের?”
জবাব দিলো না সপ্তদশী! এতে বুঝি সাহস বাড়ল মুগ্ধের। যুবক নিজ অজান্তেই চোখ বুজঁল। সিক্ত অধরজোড়া খানিক নাড়িয়ে আনমনে বিড়বিড় করে বলল,
“ পুরুষ মানুষের প্রেমে পড়তে লাগে একমুহূর্ত,
অথচ সে-ই প্রেম ভুলতে লাগে গোটা এক জনম! কি দরকার একটা নির্দয় বিস্টকে নিজের মায়ায় জড়ানোর? আমি বলেছি তোকে, তুই আমার হ? বলিনি তো! তাহলে সে-ই ঘুরেফিরে তুই শুধু আমার বুকেই নিজেকে লুকাস কেনো চাশমিস? এর পরিণতি ঠিক কতোটা ভয়ংকর হতে পারে, সেই ধারণা কি আদৌও আছে তোর?”
চলবে......