#মির্জা_সায়ান_মুগ্ধ — পর্বঃ৩৯(ক)
#jannatul_firdaus_mithila
“ কেন বে তাড়ছ্যাড়া হিউম্যান? আমার আম্মুর বুকে আমি যাব, তাতে তোর বাপের কী? তুই কি আমার বাপ লাগিস যে আমায় এভাবে ধমকাচ্ছিস? নিজে যেতে পারবি না আর আমি যাচ্ছি বলে জ্বলে তাই না?”
বোবা প্রাণীদের চিত্তে খই ফুটলেও জিভের ডগা শান্ত থাকাটাই যেন প্রকৃতির নিয়ম। ছোট্ট কিউটি তাকিয়ে আছে পিটপিট চোখে। দৃষ্টে তার এক আকাশসম সন্দিগ্ধতা। বিরক্তিতায় ছেয়ে গিয়েছে শুভ্র রঙা পশমি মুখশ্রী। আদুরে ছানা মোচড়াচ্ছে। রূঢ় মানবের রুক্ষ হাতের মুঠোয় গা নাচাচ্ছে ভীষণ। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দাঁতগুলো একে-অপরের সনে পিষ্ট করে কুটকুট শব্দ তুলছে বেচারা। তা দেখে মায়া হলো না মুগ্ধের। যুবক আগের ন্যায় অগ্নিদৃষ্টে তাকিয়ে আছে কিউটির পানে। তীক্ষ্ণ চোয়ালখানা তার ফুটে উঠেছে বেশ। ফর্সা ললাটপটে দৃশ্যমান গোটাকতক ক্ষোভের ভাঁজ। মুগ্ধ অনবরত হিসহিসিয়ে যাচ্ছে। সাপের ন্যায় ফোঁস ফোঁস করতে করতে চাপা ক্ষোভে দাঁত কিড়মিড় করে আওড়াল,
“ জাস্ট স্টে এওয়ে ফ্রম মা'ই প্রপার্টি ওকেই? ওকে ছোঁয়ার অধিকার কেবল আমার। আর আমি আমার অধিকারের ওপর অন্য কারো হস্তক্ষেপ মোটেও সহ্য করিনা।”
কিউটির চোখদুটোতে বোধগম্যহীনতার ছাপ স্পষ্ট। অবোধ দৃষ্টি আঁটকে আছে সম্মুখের সুদর্শন যুবকের পানে। লোকটার এতো রাগ হবার কারণটা কি? তাই হয়তো ভাবতে ভাবতে দিশেহারা বেচারা। এদিকে মুগ্ধের দাঁতকপাটির কটমট ধ্বনি পূর্বের তুলনায় কমেছে খানিক। শূন্যে তুলে রাখা শক্তপোক্ত হাতখানা পরক্ষণেই নামিয়ে আনলো রূঢ় মানব। মুখাবয়বে একরাশ বিরক্তি ফুটিয়ে তক্ষুনি পশমি কিউটিকে ছুঁড়ে মা'রল মখমলি বিছানার কোলে। এহেন হুটহাট কান্ডে নিজ ক্ষুদ্র দেহটা খানিক নাড়িয়ে চাড়িয়ে তৎক্ষনাৎ উঠে বসে কিউটি। ভাগ্যিস বিছানাটা নরম ছিলো, নয়তো বেচারা বোধহয় এক্ষুনি পটল তুলতো। ঐটুকুন কিউটি বড়ো সাহসী! সহসা মাথা তুলে তাকায় সম্মুখে। দু'পায়ে ভর দিয়ে শরীর সটান করে দাঁড়ানোর বৃথা প্রয়াসে মত্ত সে। অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা মুগ্ধ কেমন চোখ পাকিয়ে তাকিয়ে আছে দেখো! পারছেনা ঐ চোখ দিয়েই গিলে খেতে কিউটিকে। ক্রমশ ফর্সা মুখশ্রীটা লাল হচ্ছে মুগ্ধের, গৌরবর্ণা কপালের চামড়ায় উপস্থিত দগদগে ক্ষতে বোধহয় আবারও নতুন করে আঁচড় লেগেছে। ললাটে ছেয়ে থাকা সিক্ত চুলগুলো পুনরায় সিক্ত হচ্ছে তাজা লোহুর উপস্থিতিতে। ডানহাতেরও যে বেহাল দশা! রুক্ষ হাতের তালু বরাবর গভীর ক্ষত। সে ক্ষত নিয়েই কি-না শ্যাডো মনস্টার মে'রে এসেছেন সাতজন অস্ত্রধারীকে।
সুদর্শনের মুখাবয়বে ব্যথাতুর ছাপ অনুপস্থিত। যেন কপালের এবং হাতের ওমন দগদগে ক্ষতগুলো মোটেও কাবু করতে পারছেনা তাকে। সে বড়ো বেখেয়ালি নিজের প্রতি! বেখেয়ালে ভুলে বসেছে নিজের সকল কাজ। মুখাবয়বে ফুটিয়েছে এক ভিত্তিহীন প্রতিহিংসার আগুন। যে আগুনের শীর্ষে আপাতত — ছোট্ট পশমির স্থান। যুবক চিড়বিড় করছে। দু'হাতে নিজ উম্মুক্ত কোমরের দু'পাশ আঁকড়ে এগোয় সম্মুখে। নিরবে বিছানার কাছে এগিয়ে এসে মেরুদণ্ড বাঁকিয়ে ফের কিউটির দিকে ঝুঁকে দাঁড়ায় রূঢ় মানব। আগের ন্যায় কপাল গুছিয়ে ব্যাতিব্যস্ত চাপা কন্ঠে চিড়বিড়িয়ে বলে,
“ ডু ইউ্য থিংক — ইউ্য আর মোর হ্যান্ডসাম দ্যান মি? নো ওয়ে বাস্টার্ড — আ'ম মাচ হটার এন্ড সেক্সিয়ার দ্যান ইউ্য। তুই দেখতে যতই কিউট হোস না কেনো, আমার বান্দীর মেয়ে দিনশেষে ভয় পেলে সবার আগে আমার বুকেই ছুটে আসে। তাই বুঝতে পারছিস? তোর আর আমার পার্থক্যটা?”
মাথার সবগুলো স্নায়ুর চাপে পা গ ল হয়েছে দ্য গ্রেট রুশদী কিং ওরফে মাফিয়া শ্যাডো মনস্টার। নয়তো সামান্য একটা খরগোশের সঙ্গে প্রতিহিংসা দেখিয়ে এমনটা থোড়াই বলতো! উম্মাদ যুবক কেমন বাঁকা হাসছে দেখো। ছোট্ট কিউটির পানে ক্রুর দৃষ্টি লেপ্টে পা ঘোরালো উল্টোপথে। কিউটি ছনাাও কেমন একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে! এ যেন এক অঘোষিত নিরব যুদ্ধ দু'জনার মধ্যে। যে যুদ্ধের পুরস্কার হিসেবে নাম লিখিয়েছে — স্বয়ং মাহি।
__________________________________________
উদোম গা! ফর্সা পেটানো দেহখানায় ঘামের তীব্র উপস্থিতি স্পষ্ট। সিলিংয়ের সঙ্গে ঝুলে থাকা মোটা মোটা দু'টো কালো রঙা স্ট্র্যাপের সনে নিজ শক্তপোক্ত হাতদুটো আঁটকে শরীর শূন্যে ঝোলাচ্ছে মুগ্ধ। একবার উঠছে ওপরে, তো আবার পরক্ষণেই নেমে আসছে নিচে। কঠোর শারীরিক কসরতে দৈহিক সৌন্দর্য বাড়ছে জনাবের। ফর্সা উদোম দেহখানা শুষে নিচ্ছে জাগতিক সকল সৌন্দর্য। শক্ত দু-হাতের ফুলেফেঁপে থাকা মাসেলগুলো ফুলছে ভীষণ! প্রতিটি দোদুল্যমান আন্দোলনে পিঠের শক্ত মাংসল পেশীতে টান পড়তেই সেথায় আকার ধরেছে প্রজাপতির। মেদহীন পেটানো উদরের ছয়টি হাড় সুস্পষ্ট। যুবক যখন নিজ কার্যে বেজায় নিমগ্ন ঠিক তখনি ঘরের দরজায় কর্কশ শব্দে এলার্ম বেজে উঠল। একবার, দুবার পরপর তিনবার। এহেন কান্ডে সহসা ঘাড় বাঁকায় মুগ্ধ। ঝুলন্ত স্ট্র্যাপে হাত ঝুলিয়ে রেখে কপাল গোটায় বিরক্তিতায়। কাজের মাঝে ব্যাঘাত ঘটানো মোটেও পছন্দ নয় মাফিয়া মনস্টারের, তা-ও সে কাজ যদি হয় তার শারীরিক কসরত, তাহলে তো কথাই নেই! যুবক আবার নিজ হ্যান্ডসাম বডি নিয়ে বড্ড সিরিয়াস কি-না! মুগ্ধ তখনো ঝুলছে শূন্যে। সেকেন্ড দুয়েক পেরুনোর পর এলার্মের পুনরাবৃত্তি না হওয়ায় সে কেমন কপাল কুঁচকে চোয়ালের পেশি টানটান করে ফের শরীর উঠালো ওপরের দিকে। এরইমধ্যে এলার্ম বাজলো দুর্বার গতিতে। থামাথামির নাম নেই! যুবক চোয়াল ফোটালো এপর্যায়ে। মাথাভর্তি অদৃশ্য আগুন নিয়ে তক্ষুনি নেমে এলো নিচে। ফর্সা মুখখানায় এক পশলা রাগান্বিত ছাপ ফুটিয়ে, সে কেমন গটগট পায়ে এগিয়ে গেল সম্পূর্ণ কাঁচের তৈরী নন-ট্রান্সপারেন্ট স্লাইডিং দরজার পানে। অতঃপর এগিয়ে এসে দরজার গোলকাকার নবে হাত ঠেকিয়ে একটানে দরজাটা খুলতে খুলতে তীক্ষ্ম কর্কশ কন্ঠে বলে ওঠে,
“ হু দ্য ফাআআআআআআ......”
বাকিটা যুবকের শুকনো জিভের ডগা আঁটকে গিয়েছে হুট করে। কন্ঠে নেমেছে একরাশ হতবাকতা! বাদামী চোখদুটো বিস্ময়ে ছুঁয়েছে কপাল। ললাটস্পর্শী এলোমেলো শাইনি বাদামী চুলগুলো ঢেকে দিচ্ছে যুবকের বিস্মায়াবিষ্ট দৃষ্টি। চোয়ালটা কেমন আনমনেই খানিকটা নেমে এসেছে তার। তামাকে পোড়া শুকনো বাদামী ঠোঁটদুটো নড়ল বোধহয় খানিক। মুখগহ্বর দিয়ে অস্ফুটে বেরুলো —
“ তুই?”
দরজার নিকট দাঁড়িয়ে আছে সপ্তদশী! গায়ে একখানা লেভেন্ডার রঙা স্কিনি সিল্ক কাপড়ের ড্রেস। স্লিভলেস হওয়ায় সপ্তদশীর মাখনের ন্যায় ফর্সা মসৃণ হাতদুটো সুস্পষ্ট। বিদেশি ঢঙের আঁটসাঁট পোশাকের আড়ালে লুকিয়ে থাকা নারী কায়া যেন অনায়াসেই ধরা দিচ্ছে যুবকের বিস্মায়াবিষ্ট দৃষ্টে। গলার কাছটা উম্মুক্ত সপ্তদশীর। মসৃণ সুডৌল বক্ষদেশের আভাস মিলছে সহজেই। তার মেদহীন ক্ষীণকায় কোমরের গড়ন যেন বাঁকানো ধনুক। যুবকের বাদামী চোখদুটো বুঝি ধাঁধিয়ে গেল সপ্তদশীর আঙ্গিক সৌন্দর্যে। ঘরময় মাইনাস ডিগ্রি তাপমাত্রা চললেও তার কন্ঠায় নামলো বিশাল আকারের খরা। শুকনো অধরজোড়া সিক্ত জিভ ঠেলে খানিক ভিজিয়ে নিচ্ছে মুগ্ধ, তবে কান্ড দেখো! আজ বোধহয় গরমটা বেশ বেড়ে গিয়েছে তার। যুবক ব্যর্থ চেষ্টায় নিজ অসভ্য চোখদুটোকে একপ্রকার টেনেহিঁচড়ে সরিয়ে আনতে চাইছে মেয়েটার ওপর থেকে। কিন্তু বালাইষাট! অসভ্য, অবাধ্য চোখদুটো যে আজ লাগামহীন। নিগূঢ় দৃষ্টে অবলোকন করে যাচ্ছে সপ্তদশীর বাঁকান কায়া। যুবক স্পষ্ট টের পাচ্ছে তার হৃদয় কাঁপছে! সে কি আর যেন-তেন কাঁপা? মুগ্ধ বড়ো বিরক্ত হলো নিজ অবস্থাতে। কপালের চামড়ায় গোটাকতক ভাঁজ ফেলে তক্ষুনি বাহাতে খামচে ধরল নিজ হৃৎপিণ্ডের অংশ। দাঁতে দাঁত চেপে কটমট ধ্বনিতে হিসহিসিয়ে বলল,
“ এ্যাই শালা থাম! ম্যারাথনে দৌড়াবি নাকি?”
কর্ণহীন হৃৎপিণ্ড আদৌও কথাটা শুনলো কিনা কে জানে! তবে সম্মুখে থাকা মায়াবিনী কেমন আবেদনময়ী আঙ্গিকে হেসে উঠল তা শুনে। তার হাসির শব্দে কেঁপে ওঠে রূঢ় মানবের বুক! থমকে যায় ক্রুর দৃষ্টি। নিশ্বাসের গতি কয়টা মিস হলো তা আপাতত তার ধারণার বাইরে। সে কেবল মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে রইলো মেয়েটার পানে। সপ্তদশী হাসছে! সে-ই সঙ্গে হাসছে তার মায়াবী চোখদুটো। আজ সে চোখে চশমা অনুপস্থিত। ফলে ঘন পাপড়ি মিশ্রিত হরিণী চোখদুটো বড্ড টানছে নির্দয় মাফিয়া বসকে। যুবকের বিমুগ্ধ নয়ন মাহি'র ওপর স্থির থাকতেই আচমকা হাসি থামায় মাহি। মুখাবয়বে এক নিরবিচ্ছিন্ন আবেশি ভঙ্গিমা ঢেলে নিজ উদ্যোগে মধ্যকার দুরত্ব ঘুচিয়ে এগিয়ে এলো এক কদম। যুবকের মোহাচ্ছন্নতায় মুদে থাকা চোখদুটোতে আবেশি দৃষ্টে ডুব দিয়ে হুট করেই নিজের শীতল ডানহাতখানা উঠিয়ে এনে রাখল মুগ্ধের বুকের বাঁপাশে। তক্ষুনি সর্বাঙ্গ জুড়ে এক অদ্ভুত বিদ্যুৎ ঝলকানি অনুভত হলো নির্দয় মাফিয়া বসের। হৃদয়টা বুঝি এক্ষুণি ছুটে আসতে চাইছে বাইরে। নিশ্বাসের গতি তার বেড়ে গিয়েছে বহুগুণ। চোখদুটো আঁটকে গিয়েছে সম্মুখে। মাহি হাসলো! ঠোঁট কামড়ে সে-কি নিপুণ কৌশলে আবেদনী কায়দায় হাসলো সপ্তদশী। মাফিয়া মনস্টার দূর্বল হলো তা দেখে। গলার কাছে কঠিন বাক্যগুলো ভীড় জমিয়েছে, অনুমতির অভাবে ভীড় ঠেলে বেরুচ্ছে না তারা। ফলে যুবকের কন্ঠ হয়েছে বাকরুদ্ধ। এদিকে সপ্তদশী মুচকি হেসে অত্যন্ত ঠান্ডা গলায় আওড়াল,
“ মাফিয়া বিস্ট! শেষমেশ এ কি হলো আপনার? আপনার বুকের খাঁচায় লুকায়িত অঙ্গটা আমার নামে দৌড়াচ্ছে কেনো? তবে কি আমি ধরে নিব, আপনি আমায় ভালোবেসে ফেলেছেন? দূর্বল হচ্ছেন আমার প্রতি?”
সহসা ঘোর ভাঙল যুবকের। কপালের চামড়ায় দেখা মিললো গোটাকতক ক্ষোভের ভাঁজ। সে তক্ষুনি এক ঝটকায় নিজ বুক হতে নামিয়ে দিলো মাহি'র নরম তুলতুলে হাতখানা। পায়ের গতি পেছনে ঠেলে বাজখাঁই কন্ঠে আওড়াল,
“ ওসব ভালোবাসা এন্ড অল দোস ফা'কিং বুলশিট আর জাস্ট ননসেন্সস। দ্য গ্রেট রুশদী কিংয়ের কোনো দূর্বলতা নেই। আগেও ছিলোনা, ভবিষ্যতেও থাকবেনা। নাও ফা'ক অফ এভরিথিং বান্দীর মেয়ে। সোজা ঘর থেকে বের হ।”
সপ্তদশী মানতে নারাজ। গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে এসে দাঁড়ালো মুগ্ধের শক্তপোক্ত দেহের পেছনে। তার উপস্থিতি টের পেতেই ঘুরে দাঁড়ায় রূঢ় মানব। সহসা ভ্রু কুঁচকে শক্ত করল চোয়াল। কোমরের পিঠে দু'হাত চেপে গমগমে গলায় গর্জে বলল,
“ কথা কানে যায়নি তোর বান্দীর মেয়ে? ঘর থেকে বের হ বলছি।”
শুনলো মাহি। ঘাড়ের নরম মাংসল জায়গাটুকু কুঁচকে ঘাড় উঁচিয়ে তাকালো সম্মুখে। যুবকের ক্রুর দৃষ্টে ফের আচ্ছন্ন নয়নে তাকিয়ে থেকে হাসলো একটুখানি। এদিকে তার এহেন কান্ডে ফের স্থির হলো রূঢ় মানব। একমুহূর্তের জন্য নিজের সকল রূঢ়তা একপাশে ঠেলে দিয়ে মেয়েটার পানে তাকালো নির্লিপ্ত দৃষ্টিতে। হুট করেই আনমনে বিড়বিড়িয়ে আওড়াল,
“ এভাবে তাকাস না বান্দীর মেয়ে! আমার সহ্য হচ্ছে না।”
সপ্তদশী কি বুঝল কে জানে! কোনরূপ আগাম সতর্কসংকেত ছাড়াই দু'হাতের শক্ত আক্রমণ বসালো যুবকের বুক বরাবর। আর ওমনি হুটহাট আক্রমণের শিকার মাফিয়া মনস্টার, নিজ শক্তপোক্ত দেহের তাল সামলাতে না পেরে সহসা গিয়ে পড়ল ডিভানের কোলে। ওতোবড় একটা পাহাড়সম মানুষ ডিভানের কোলে হঠাৎ গা এলিয়ে দিতেই ডিভানটা কেমন ঘেঁষে সরে গেল বেশকিছুটা দূরে। মুগ্ধ হতবাক! বলিষ্ঠ দেহখানা তার ছড়িয়ে আছে ডিভানে। হাতদুটোর অবস্থান ডিভানের গায়ে। সে কেমন বিস্ময়াবহ চোখে তাকিয়ে আছে মেয়েটার পানে। মাহি হাসছে মিটমিটিয়ে। তার আজ কি হলো কে জানে! সে তক্ষুনি ছুটে এসে কোনরূপ বলাকওয়া ছাড়াই একলাফে উঠে বসল মাফিয়া বিস্টের কোলে। সহসা হকচকিয়ে ওঠে মুগ্ধ! তড়িঘড়ি করে নড়েচড়ে উঠে বসতে গেলেই টান পড়ল অন্য কোথাও। যুবক অস্থির হলো পরক্ষণেই। অস্থিরতায় দাঁতের রুষ্ট চাপে ঠোঁটের পাতলা চামড়া আঁকড়ে ধরে ফোঁস ফোঁস করে কিছুক্ষণ। কিন্তু দৈহিক অবস্থা যেন ধীরে ধীরে লাগামহীন হচ্ছে তার। যুবক তৎক্ষনাৎ মুখাবয়বে কপট রাগ টানলো। দাঁতে দাঁত চেপে কিড়মিড় করে বলল,
“ হোয়াট দ্য ফা'ক আর ইউ্য ডুয়িং বান্দীর মেয়ে? নাচতে নাচতে আমার কোলে উঠলি কেনো? এটা তোর বসার জায়গায় পেয়েছিস? এক্ষুনি কোল থেকে নাম বলছি নির্লজ্জ মেয়েছেলে!”
সপ্তদশীর মোহ-আবিষ্ট চোখদুটো অবাধ্য। ঠোঁটের কোণে ঝুলছে মিষ্টি হাসির রেশ। সে মোটেও কানে তুললো না যুবকের রূঢ় কন্ঠ। উল্টো মুচকি হেসে মাথা রাখল যুবকের প্রশস্ত বুকে। এহেন কান্ডে হাসফাস বাড়ল নির্দয় মানবের। পাহাড়সম দেহটা তার নড়ছে ভীষণ। হাতদুটো মুষ্টিবদ্ধ! দাঁতের সনে দাঁত পিষে চোখ বুঁজেছে মুগ্ধ। বুকের মধ্যে আপাতত ঝড় বইছে তার। অপ্রিয়, অপছন্দীয় আবেদন ছড়িয়ে গিয়েছে শরীরের প্রতিটি রন্ধ্রে। বলিষ্ঠ দেহের কামনা বড়ো বিরক্ত করছে তাকে। মনের মধ্যিখানে কু- গাইছে কেউ। উত্থাপন করছে নানান উদ্ভট প্রস্তাব। তবে কোনো প্রস্তাবেই রাজি নয় মাফিয়া মনস্টার। তার বিচক্ষণ মস্তিষ্ক এখনো সজাগ হয়ে জানান দিচ্ছে —
“ শি ইজ ঠু ইয়াং! ও ব্যথা পাবে, ওর কষ্ট হবে। আই কান্ট ডু দিস উইথ হার। আই কান্ট!”
কন্ঠা শুকিয়ে কাঠ মুগ্ধের। অবচেতন মনের দ্বারা উত্থাপিত দুষ্কর্ম প্রস্তাব মানতে নারাজ সে। তাই তো কষ্ট বাড়ছে তার। শরীরের প্রতিটি রন্ধ্রে রন্ধ্রে বইছে ঝড়। নিশ্বাসের গতি জোরালো থেকে তীব্রতর হচ্ছে। উদোম পেটানো বক্ষের উঠানামার গতি ক্রমশঃ বাড়তেই, যুবকের বুক থেকে মাথা তোলে মাহি। ঠোঁট ফুলিয়ে অভিমানী কন্ঠে বলে,
“ কি হয়েছে আপনার এমন করছেন কেনো?”
যুবক চোখ কুঁচকায় তৎক্ষনাৎ। দাঁতের রুক্ষ চাপায় পিষ্ট করে নেয় নিম্নাংশের বাদামী ঠোঁটখানা। এ মেয়েকে আর দেখবেনা সে। দেখলেই ঘটে যাবে বিপদ! এদিকে মুগ্ধের ওমন উদ্ভট কর্মে বিচলিত সপ্তদশী। নিজ ক্ষুদ্র বদনখানি সামান্য নাড়িয়ে চাড়িয়ে তৎক্ষনাৎ দু'হাতের নরম তুলতুলে আজলায় চেপে ধরল মুগ্ধের রুক্ষ গাল। তার এরূপ শরীর দোলানোতে তক্ষুনি ঠোঁটের চামড়ায় দাঁতের পিষ্টে ক্ষত হলো রূঢ় মানবের। অস্ফুটে গোঙালো,
“ ওহ ফা'ক!”
সপ্তদশী আরেকধাপ বিচলিত হলো। নিজ উদ্যোগে খানিকটা এগোতেই যুবকের সর্বাঙ্গ জুড়ে ঝংকার তুলল কেমন! সে কন্ঠ উঁচিয়ে দাঁত কিড়মিড় করে বলল,
“ নাম নাম নাম! এক্ষুনি আমার কোল থেকে নাম বান্দীর মেয়ে। নয়তো ফায়ার হয়ে যাবে কিন্তু!”
অবোধ সপ্তদশী বোঝেনি রূঢ় মানবের বাক্য! সে কেমন অবোধের ন্যায় তাকিয়ে রইলো। কন্ঠে একরাশ মায়া ঢেলে আওড়াল,
“ আমার ভয় করছে! আমি আপনাকে একটু জড়িয়ে ধরি?”
সহসা চেঁচিয়ে ওঠে মুগ্ধ। গর্জে বলল,
“ নো নো নো! বান্দীর মেয়ে, ডোন্ট ডু দিস।”
কে শোনে কার কথা! অবাধ্য সপ্তদশী আচমকা দু'হাতে জড়িয়ে ধরল মুগ্ধের গলা। মুচকি হেসে মাথা রাখল যুবকের প্রশস্ত কাঁধে। আর তার এহেন অবাধ্য কান্ডে অবশেষে ধৈর্য্যের বাঁধ ভাঙল যুবকের। সর্বাঙ্গের প্রতিটি রন্ধ্রে রন্ধ্রে কয়েক সেকেন্ডে ছড়িয়ে পড়ল তীব্র স্নায়বিক স্রোত। হৃৎস্পন্দনের অস্বাভাবিকতা বেড়ে গেল বহুগুণ। নিশ্বাস ছুঁলো গভীরতা। পাহাড়সম বলিষ্ঠ দেহখানার কেন্দ্রীয় অংশের পেশিগুলো অনিচ্ছাকৃতভাবে কুঁচকে গেল কয়েকগুণ। মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামাস সংকেত পেয়েছে বহুক্ষণ আগে। সে নিজ কর্মে ব্যস্ত! যুবকের চোয়াল শক্ত হলো। চোখদুটোয় নামলো দৃঢ়তা। শরীরের অনিয়ন্ত্রিত কম্পনে কেঁপে উঠল স্বয়ং নির্জীব ডিভান। অতঃপর.. অতঃপর কয়েক মুহুর্তের স্থায়ী তীব্র স্নায়বিক প্রতিক্রিয়ার পর অবশেষে ধীরে ধীরে শিথিল হলো মাফিয়া বিস্টের কম্পিত দেহ। মস্তিষ্ক ভর্তি অনিয়ন্ত্রিত উত্তেজনার ঝড় থেমে সেথায় এবার ভর করল একরাশ নিরব প্রশান্তি। অবসাদমুক্ত হলো তার অবচেতন মন। নিশ্বাসের গতি খানিকটা শিথিল হয়ে জানান দিলো — যুবক এখন ক্লান্ত! বড্ড ক্লান্ত।
মুগ্ধ ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে। চোখদুটো নিবুনিবু তার। ঝাপসা দৃষ্টি সম্মুখে বুলাতেই আচমকা বিস্ফোরিত আকারে খুলে গেল যুবকের ক্লান্তিতে মুদে থাকা বাদামী নেত্র। সে তক্ষুনি উঠে বসল শোয়া ছেড়ে। হন্যে দুচোখ এদিক-ওদিক তাকিয়ে খুঁজতে লাগল কাঙ্খিত মুখ। তবে কান্ড দেখো! মাহি তো দূর, তার টিকিটা পর্যন্ত আশেপাশে কোত্থাও নেই। মুগ্ধ ভারী অবাক হলো। কপালের চামড়া গুটিয়ে গমগমে গলায় ডাকল,
“ চাশমিস? চাশমিস হোয়ার আর ইউ্য?”
শূন্য কামরার নিরব দেয়ালে এহেন বাক্য আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে তা ফের কানে এসে ঠেকল মুগ্ধের কানের পর্দায়। মুগ্ধ বুঝল — চাশমিস কোথাও নেই। রূঢ় মানব তৎক্ষনাৎ নড়েচড়ে বসল। তবে বসতে গিয়েই বাঁধল আরেক বিপত্তি। মখমলি তুলতুলে বিছানাটা ওমন ভেজা ভেজা কেনো? মনের কোণে একরাশ সন্দিগ্ধতা লেপ্টে সহসা এক ঝটকায় গায়ের ওপর থেকে ব্ল্যাঙ্কেট সরায় রূঢ় মানব। তবে পরক্ষণেই বিছানার বেহাল দশা দেখে কপালে ক্ষোভের ভাঁজ ফুটল সুদর্শনের। চোয়াল হয়ে গেল কটমট! ব্রিটিশের ন্যায় তীক্ষ্ণ নাসারন্ধ্রের সরু ছিদ্র দিয়ে উষ্ণ নিশ্বাস ফেলতে ফেলতে যুবক কেমন নিজের ওপরেই ক্ষোভ ঝেড়ে আওড়াল,
“ নো নো নো! হোয়াট দ্য ফা'ক আই হেভ ডান? হলি শিট!”
নাক সিটকচ্ছে মুগ্ধ! পরনের সফেদ রঙা ঢিলেঢালা ট্রাউজারের সম্মুখভাগ আপাতত নাজেহাল অবস্থায় আবর্তিত। যুবকের আর ধৈর্য্যে কুলোয়নি বসে থাকতে। সে তড়িঘড়ি করে পা নামায় বিছানা থেকে। দাঁতের চাপে ঠোঁট পিষে একপলক নিজের দিকে দৃষ্টি ফেলে সে আবারও নাক সিটকে আওড়ায়,
“ ইয়াক! নো হেল! কি করলাম আমি এটা? ইয়াক!”
নিজ কান্ডের প্রতি একরাশ ঘৃণা জন্মেছে রূঢ় মানবের। তার এমুহুর্তে ইচ্ছে করছে নিজের গালে নিজেই দু'টো কষিয়ে থাপ্পড় বসিয়ে বলতে,
“ ঘটনা যখন ঘটারই ছিলো তাহলে অন্য কাউকে দেখে ঘটাতি! শুধু শুধু ঐ বান্দীর মেয়েকে দেখে ঘটাতে গেলি কেনো? ছিহ ছিহ ছিহ!”
সুদর্শন হাঁটছে। কদম টেনেছে ঘর সংলগ্ন সুইমিংপুলের দিকে। সম্মুখে কাঁচের স্লাইডিং দরজা। কাঁচের ওপাশে দৃশ্যমান বাইরের বেগতিক আবহাওয়া। রাত থেকে স্নোফল হচ্ছে, সঙ্গে বইছে ঠান্ডা ঝড়ো হাওয়া। সুইমিংপুলের উপরিভাগে ছেয়ে আছে বরফের পাতলা আবরণ। যুবক ওসব স্নোফলকে একপ্রকার বুড়ো আঙুল দেখিয়ে দুয়ার খুলে বাইরে বেরুলো। অতঃপর গটগট পায়ে এগিয়ে এসে এক ঝটকায় ঝাপ দিলো বরফ ঠান্ডা পানির মাঝে। হাড় হিম করা শীতল পানি যুবকের ফর্সা ত্বক স্পর্শ করতেই লাল হয়ে গিয়েছে ত্বকের অনেকাংশ। অথচ মুগ্ধের কান্ড দেখো! ওমন একটা হাড় হিম করা ঠান্ডায় সে কেমন মাথা শুদ্ধ শরীর ডুবিয়ে সাঁতরাচ্ছে! সে যেন বিশাল মাপের এথলেটিকস। মাত্র কয়েক সেকেন্ডে পৌঁছে গেল অপর কিনারায়। পানির ঘোলাটে আবরণ গা থেকে একপ্রকার ঝেড়েঝুড়ে পুল থেকে মাথা তুললো মুগ্ধ। ললাট ছুঁইয়ে নাকের উপরিভাগ স্পর্শ করা সিক্ত বাদামী চুলগুলো একহাতে পেছন দিকে ঠেলে দিয়ে, যুবক কেমন চিড়বিড়িয়ে বলল,
“ ঐটুকুন একটা বান্দীর মেয়ে আমার ৩০ বছরের যৌবন শেষ করে দিলো! বাপ দেয়নি শৈশবে শান্তি, মেয়ে দিচ্ছে না যৌবনে শান্তি। আ পিওর জানোয়ারের বাচ্চা দুইটা। উফফ! ফা'ক অফ ম্যান।”
শেষটুকু আওড়ে ফের উল্টো হয়ে পানিতে শরীর ডোবায় মুগ্ধ। ধুপধাপ পায়ের গতিতে উল্টো সাঁতার কাটছে মাফিয়া মনস্টার। সে শব্দে কেঁপে উঠছে সম্পূর্ণ পেন্ট হাউজের টপ ফ্লোর।
রাত তিনটে বেজে পঁচিশ মিনিট! টপ ফ্লোরের সাইবার রুমে ভুলবশত ঘুমিয়ে কাত হয়েছেন এডউইন। গতরাতে কিসব ফুটেজ চেক করতে করতে বেচারা কখন যে ঘুমিয়েছে সে খবর তার নিজের কাছেও নেই বোধহয়! তবে তার ওমন সাধের ঘুমটায় হুট করেই চিড় ধরল সিসিটিভি ফুটেজ থেকে ভেসে আসা ধুপধাপ শব্দে। সহসা হকচকিয়ে ওঠে এডউইন! হড়বড়িয়ে তাকায় সিসিটিভির পর্দায়। কেউ একজন ওমন ভারী স্নোফলে ডুবচ্ছে। নিবুনিবু দৃষ্টে মুখ দেখছেনা এডউইন। এতে বুঝি সে নিজেও বিরক্ত হলো। তক্ষুনি তিতিবিরক্তিতায় উঠে দাঁড়ায়। ঘুমে ঢুলুঢুলু কদমে এগোয় কক্ষের বাইরে।
সম্পূর্ণ কাঁচের তৈরী প্রশস্ত করিডর। কয়েক কদম হাঁটতেই টপ ফ্লোরের দুয়ার। সেথায় দায়িত্বরত অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছেন দু'জন গার্ড। মাথা নুইয়ে দাঁড়িয়ে আছেন তারা। তন্দ্রায় মুদ এডউইন গটগটিয়ে এগুলো তাদের পানে। পায়ের গতি রুখে কন্ঠে একরাশ ঝাঁঝ ঢেলে তক্ষুনি বলে ওঠে,
“ রাত বাজে তিনটা। এতোরাতে কার এতো উত্তেজনা বেড়েছে শুনি যার জন্য ওমন বরফ পানিতে দাপড়াতে হচ্ছে! কে সাঁতরাচ্ছে পুলে?”
কন্ঠে সে-কি তেজ এডউইনের। জিভ খসে কথাটা বেরিয়েছে বোধহয় সেকেন্ড ত্রিশেক হবে। এরইমধ্যে একজোড়া ভেজা কদম কেমন ব্যগ্র গতিতে এগিয়ে এলো বেচারার নিকট। তন্দ্রা আচ্ছাদিত গম্ভীর মুখো এডউইনের ঘাড়ের পেশি শক্ত হাতে খামচে ধরে, বেচারাকে এক হেঁচকা টানে স্নোফলে আচ্ছাদিত টপ ফ্লোরের মেঝেতে ছিটকে ফেলল। এহেন ঘটনার আকস্মিকতায় হকচকায় এডউইন। মুহুর্তেই তার চোখদুটো থেকে কেটে গেল সকল তন্দ্রার ছাপ। ঘুমন্ত মস্তিষ্ক সজাগ হবার পূর্বেই কন্ঠনালী বরাবর বসল এক শক্তপোক্ত হাতের হিং স্র থাবা। এডউইন ককিয়ে ওঠে তৎক্ষনাৎ। দুটো ভিন্ন চোখের ভড়কানো দৃষ্টি সম্মুখে ফেলবার আগেই কর্ণকুহরে ভেসে এলো মাফিয়া বিস্টের চিড়বিড় কন্ঠ!
“ লুক হু ওয়াজ সুইমিং। তোর বাপ! দ্য শ্যাডো মনস্টার।”
ভয়ার্ত ঢোক গিলল এডউইন। সহসা ঝুঁকিয়ে নিলো নজর। কন্ঠে অপরাধীত্ব ঢেলে আওড়াল,
“ মাফ করবেন মনস্তার! আসলে..আমি মানে।”
বাকিটা বলার পূর্বেই বেচারা এডউইনের চোয়াল বরাবর পড়ল এক শক্ত ঘুষি। মুহুর্তেই গাল বেঁকে গেল বেচারা এডউইনের। ব্যথায় ভেঙে যাবার যোগাড় চোয়ালখানা। তবুও গম্ভীর মানব নিশ্চুপ রইলেন। পরক্ষণেই শুনতে পেলেন মাফিয়া বিস্টের হুংকার!
“ এ্যাই আমাকে ভয় লাগে না তোদের? ভয় লাগে না আমায়? যখন না তখন আমার শান্তিতে বাগড়া দেয়ার জন্য ওঁৎ পেতে থাকিস বাস্টার্ড'স! একজনের জন্য ঘুমিয়ে শান্তি নেই, আরেকজন আসছে আমার ডুবানো নিয়ে প্রশ্ন তুলতে। বলি ম'রার পাখনা গজিয়েছে তোদের? আমার হাতে ছিন্ন ভিন্ন না হওয়া অব্ধি শান্তি হবে না তোদের তাই না?”
আঁতকে উঠল এডউইন! আত্মাটুকু গলার কাছে এসে দাঁড়ালো তার। ভয়ে শুকনো ঢোক গিলবার পরিস্থিতি নেই। ওদিকে রূঢ় মানব ছেড়ে দিয়েছে তার কন্ঠা। দু-কদম সরে গিয়ে কটমট করছে সে। মাত্রাতিরিক্ত রাগে ঘাড় ডলছে অনবরত। এডউইন আড়দৃষ্টে দেখছে সব। জিভ ঠেলে শুকনো অধরজোড়া আলতো করে ভিজিয়ে নিয়ে যেইনা কিছু বলতে যাবে তার আগেই সম্মুখে দাঁড়িয়ে থাকা মাফিয়া মনস্টার কেমন হিসহিসিয়ে আলটিমেটাম ছুঁড়ে বলল,
“ লিসেন বাস্টার্ড! কাল থেকে ঐ বান্দীর মেয়েকে যথাসম্ভব আমার দৃষ্টি থেকে দূরে দূরে রাখবি। ভুলক্রমেও ও যদি আমার সামনে পড়ে দ্যান আই সয়্যার — আমি তোকে শূলে চড়াব। আই রিপিট আই উইল কিল ইউ্য বাস্টার্ড! ঐ বান্দীর মেয়ে যেন ভুলেও আমার চোখের সামনে না আসে।”
#মির্জা_সায়ান_মুগ্ধ — পর্বঃ ৩৯(খ)
#jannatul_firdaus_mithila
“ লিসেন বাস্টার্ড! কাল থেকে ঐ বান্দীর মেয়েকে যথাসম্ভব আমার দৃষ্টি থেকে দূরে দূরে রাখবি। ভুলক্রমেও ও যদি আমার সামনে পড়ে দ্যান আই সয়্যার — আমি তোকে শূলে চড়াব। আই রিপিট আই উইল কিল ইউ্য বাস্টার্ড! ঐ বান্দীর মেয়ে যেন ভুলেও আমার চোখের সামনে না আসে।”
মাথার ওপর অদৃশ্য বাজ পড়ল এডউইনের। অক্ষিপুট ছুঁয়েছে কপাল! কন্ঠনালীর উঁচু হাড়খানা নড়ে উঠল অস্থিরতায়। চাপ বাড়ল মস্তিষ্কে। ঘাড় ঝুঁকিয়ে গম্ভীর মুখো এডউইন বিড়বিড়িয়ে আওড়াচ্ছে —
“ কিসব ভয়ংকর কাজ দিচ্ছেন আমায় মনস্তার! মুখে বলছেন, মুনবার্ড যেন আপনার সামনে না আসে। বাট আ'ম ড্যাম শিওর, আপনি তাকে একবেলা না দেখলে নিজেই পাগলামি শুরু করবেন! আপনার মতো ক্ষ্যাপাটে ষাঁড়কে নতুন করে ক্ষ্যাপানোর সাধ্যি আছে কোন মানবের?”
রাগে গজগজ করছে মাফিয়া বিস্ট! দু'হাতে নিজের উম্মুক্ত কোমর আঁকড়ে দাঁত কিড়মিড় করে যাচ্ছে একাধারে। ওদিকে এডউইন যে বিড়বিড়িয়ে কিসব বলে যাচ্ছে, তা থোড়াই কানে ঢুকল মাফিয়া বিস্টের! ঢুকলে এতক্ষণে বেচারা এডউইনের প্রাণ নিয়ে টানাটানি হতো না? তবুও বিচক্ষণি পুরুষ সহসা ঘাড় বাকিয়ে তাকালেন পেছনে। গৌরবর্ণ মসৃণ ললাটে গোটাকতক সন্দেহের ভাঁজ ফেলে রূঢ় কন্ঠে হুংকার ছুঁড়ে শুধালেন,
“ ডিড ইউ্য জাস্ট সে সামথিং?”
আঁতকে উঠে এডউইন! মনস্টারের ওমন হুংকারে তার দেহ খাচাঁয় লুকায়িত আত্মাটা বোধহয় মাত্রই গলার কাছে এসে ঠেকল। সে ত্বরিত গতিতে দু'ধারে মাথা নাড়িয়ে হকচকান কন্ঠে বলে ওঠে,
“ নো, নো মনস্তার! কিচ্ছু বলিনি তো।”
মুহুর্তেই ক্লিন শেভের দৃঢ় চোয়ালখানা তীক্ষ্ণ হলো মুগ্ধের।শুভ্র ললাটে তুলির দক্ষ টানে অঙ্কিত ঘন ভ্রুযুগল বেঁকে গেল খানিক। সুস্পষ্ট, সুগঠিত থুতনিটা শক্ত হয়েছে পরমুহূর্তেই। হাতের বাঁধনে জোর বাড়ল বেশ। যুবক পা ঘোরালো উল্টোপথে। এরইমধ্যে একজোড়া শক্তপোক্ত ব্যুটপরিহিত কদম এসে দাঁড়ালো টপ ফ্লোরের বরফে ঢাকা মেঝেতে। কদমের মালিক বড়ো শান্ত! তার মুখাবয়বে তীক্ষ্ণ ভাব স্পষ্ট। গায়ে একখানা কালো রঙা স্যুট, সঙ্গে মিলিয়ে পড়েছে ব্যুটজুতো। চোখে আটাঁ রিমলেস চশমা! কানের পেছন দিয়ে একখানা সরু পাতলা তারের ন্যায় কিছু একটা ঝুলছে তার। কর্ণের মধ্যিখনে দাবিয়ে রাখা ব্লুটুথ। উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ সুদর্শন নতমস্তকে গম্ভীর মুখে খানিকটা এগিয়ে এসে দাঁড়ালেন। পায়ের চলন্ত তাল রুখে দিয়ে, মনস্টারের প্রতি ভীষণ বাধ্যতা দেখিয়ে একহাঁটু গেঁড়ে কুর্নিশ জানিয়ে বললেন,
“ হোলা মনস্তার!”
(হ্যালো মনস্তার)
মনস্টারের দাম্ভিক কদম আগের ন্যায় ব্যস্ত! সে এগিয়ে আসছে ধুপধাপ পায়ে। একটিবারও সম্মুখের শ্যামবরণ সুদর্শনের পানে দৃষ্টিপাত না করে উল্টো বাজখাঁই কন্ঠে আদেশ ছুড়েঁ বলল,
“ এলেক্স! টর্চার সেল খুলে দে। আই নিড টু কুল অফ রাইট নাও।”
এলেক্স বাধ্য মানব! শত হলেও দ্য গ্রেট রুশদী কিংয়ের চিফ অফ গার্ডস বলে কথা। বাধ্যতা যেন তার রন্ধ্রে রন্ধ্রে। মনস্টারের আদেশ পাওয়া মাত্রই যুবক নড়েচড়ে দাঁড়ালেন। ডানহাতখানা তক্ষুনি মুষ্টিবদ্ধ করে বুকের বাঁপাশে ঠেকিয়ে গুরুগম্ভীর মুখে শুধালেন,
“ কমান্ড এক্সেপ্টেড মনস্তার!”
বলেই যুবক পা ঘোরালো উল্টোপথে। সঙ্গে সঙ্গে পায়ের গতিতে টান না বসিয়ে, লাগাম টেনে দাঁড়িয়ে রইল কিয়তক্ষন। মনস্টারের আগে স্থান ত্যাগ করার সাধ্যি নেই তার, আর না আছে এরূপ অবাধ্যতা! পেছন থেকে মনস্টার ধুপধাপ পায়ে এগিয়ে এসে তাকে পাশ কাটিয়ে চলে যেতেই এলেক্স গতি টানল পায়ের। তবে এবার আর সম্মুখে নয়, বরং এগিয়ে গেল পেছনে। বরফের পুরু আস্তরণে ঢেকে থাকা সুইমিংপুলের অতি সন্নিকটে বসে আছে এডউইন, মুখটা কেমন শক্ত হয়ে আছে মানবের। তীক্ষ্ণ দৃষ্টে নিষ্পলক ভঙ্গিতে তাকিয়ে আছে সম্মুখে। এলেক্স হাসলো! চকচকে দাঁতের ধারালো চাপে পিষ্ট করল বাদামী ঠোঁটযুগল। মুখাবয়বে ফুটালো এক অভিন্ন ধূর্ততার ছাপ! পায়ের ব্যুটজুতোর শক্ত পাটাতনের নিচে রুক্ষ ভঙ্গিমায় পিষতে লাগল তুষারের নরম-সরম গা। সে এগুলো, লম্বা লম্বা পাঁচটে কদমে এগিয়ে এসে দাঁড়াল এডউইনের ঠিক মুখোমুখি। বেশ দাম্ভিকতার সঙ্গে দু'হাত প্যান্টের পকেটে গুঁজে রহস্যময় বাঁকা কন্ঠে আওড়াল,
“ অবশেষে তুমি তোমার আসল জায়গা অব্দি পৌঁছে গেলে এডউইন। ট্রাস্ট মি, নাও ইউ্য আর লুকিং ফার বেটার।”
সরু নাকের পাটাটা তৎক্ষনাৎ ফুলে উঠল এডউইনের। শুভ্র মুখখানা রঙ পাল্টালো অচিরেই। সেথায় আবার ফুটে উঠেছে একরাশ চাপা ক্ষোভের ছাপ। যুবক তড়িঘড়ি করে উঠে দাঁড়ায়। দু'হাতে গা থেকে ছোট ছোট তুষারকণা ঝাড়তে ঝাড়তে কটমট দৃষ্টে তাকায় এলেক্সের পানে। অথচ এলেক্স কেমন গাল বাঁকাল তার ওমন দৃষ্টি দেখে। একপ্রকার গা-ছাড়া ভাব ধরে চোখদুটো উল্টে তাকাল অন্যত্র। এডউইন চোয়াল শক্ত করল এবার। কাঠকাঠ কন্ঠে আওড়াল,
“ মুখ সামলে কথা বলো এলেক্স। আদারওয়াইজ.... ”
বাকিটা শেষ হবার পূর্বেই ঘাড় কাত করে সম্মুখে দৃষ্টি তাক করল এলেক্স। ঠোঁটের কোণে অদ্ভুত বাঁকা হাসির রেশ ফুটিয়ে, গমগমে গলায় শুধালো,
“ আদারওয়াইজ?”
তৎক্ষনাৎ জবাব দিলো না এডউইন। উল্টো মুখাবয়বে আগুনসম রাগের পরিতুষ্টি বাড়িয়ে আচমকা শক্ত হাত এগিয়ে দিতেই এলেক্স খামচে ধরল সে হাত। খসখসে হাতের রুক্ষ মুঠোয় চাপ বাড়াতেই এডউইন কামাল দেখাল পায়ের। তক্ষুনি এক শক্তপোক্ত লাথি বসাল এলেক্সের হাঁটু বরাবর। এহেন ঘটনার আকস্মিকতায় সামান্য দুলে উঠল এলেক্স। হাতের বাঁধন একটুখানি আলগা হতেই সম্মুখ থেকে ধেয়ে এলো এডউইনের হিং স্র থাবা। এক ঝটকায় যুবক চেপে ধরল এলেক্সের কন্ঠনালী! তবে এলেক্সও যে কম যায় না। সে-ও একই ভঙ্গিমায় হাত বাড়িয়ে চেপে ধরল এডউইনের কন্ঠা। দু-মহারথীর এরূপ আগাম সতর্কসংকেত ছাড়া যুদ্ধ যে আজ নতুন নয়। বরং দু'জন সাপেনেউলে একে-অপরের মুখোমুখি হলেই বেঁধে যায় মহাপ্রলয়। আজও যেমন বাঁধল! আজকের যুদ্ধে কে বিজয়ী হবে তা আপাতত মূখ্য নয়, বরং মূখ্য হচ্ছে — কে আগে দূর্বল হবে। একদিকে গৌরবর্ণ বিদেশি এডউইন, কন্ঠায় অতিরিক্ত চাপ বেড়েছে বলে মুখ হয়েছে লাল টকটকে। যেন যেকোন মুহুর্তেই যুবকের সনে ঘটে যাবে যেকোনো অঘটন। অথচ যুবকের শক্তপোক্ত বাহুতে শক্তির খামতি নেই! আরেকদিকে শ্যামবর্ণ স্প্যানিশ যুবক, ললাটে তার মোটা মোটা রগ ইতোমধ্যেই স্পষ্ট! লম্বাটে মুখে লালাভ আবরণ সুস্পষ্ট। যুবকের নিশ্বাস প্রায় আঁটকে আঁটকে যাচ্ছে। তবে শেষমুহুর্তে এসে মোমবাতির শেষ বাতিটুকু যেমন ধড়ফড়িয়ে উঠে ঠিক তেমনি এলেক্সও বুঝি ধড়ফড়িয়ে উঠল পরক্ষণে। চোয়ালের অভ্যন্তরণে দাঁত কপাটিকে একে-অপরের সনে রুষ্টতার সঙ্গে পিষে নিয়ে, যুবক মাথা এগিয়ে আনে খানিকটা। অতঃপর নিজ কপাল দিয়ে সম্মুখে থাকা এডউইনকে পরাস্ত করার জন্য অভিনব কৌশল অবলম্বন করে, এডউইনের নাকমুখ বরাবর আঘাত করে বসে সজোরে। এহেন অতর্কিত আক্রমণে হাতের বাঁধন ঢিলে হলো আহত এডউইনের। বেচারা তৎক্ষনাৎ ছিটকে গেল দু-কদম। চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হয়েছে তার, নাক থেকে গরম কিছু গড়িয়ে পড়ছে তা স্পষ্ট টের পাচ্ছে সে। যুবক এদিকওদিক মাথা নাড়িয়ে নিজেকে সামলানোর বৃথা প্রয়াসে মত্ত। এরইমধ্যে সম্মুখ থেকে ধেয়ে এলো এলেক্সের শক্তপোক্ত হাতের থাবা। শ্যামবর্ণ সুদর্শন কেমন এক লহমায় আঁকড়ে ধরল এডউইনের চুল। অতঃপর হাতের জোর বাড়িয়ে বেচারার চুলগুলো টানতে তৎপর সে। এদিকে চুলের ব্যথায় দাঁতে দাঁত চাপছে এডউইন। আহত হওয়া স্বত্বেও বাহাতের কনুই দিয়ে একের পর এক আঘাত করে যাচ্ছে এলেক্সের পেটে অথচ এলেক্সকে দেখো! যুবকের দেহ যেন ইস্পাত-দৃঢ়। পেট বরাবর ওতো আঘাত পাওয়া স্বত্বেও সে কেমন অটল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। শক্ত হাতে এডউইনের চুল টেনে তার মুখখানা সামান্য উঁচিয়ে হিসহিসিয়ে শুধালো,
“ ভুলে যাস না এডউইন, তোর হম্বিতম্বি জাস্ট প্যালেস অব্দি সীমাবদ্ধ। তুই যদি হোস প্যালেসের চিফ, তাহলে আমি হচ্ছি — প্যান্ট হাউজের চিফ। সো আমার দায়রায় এসে হম্বিতম্বি চালানোর মতো দুঃসাহস দেখাবি না ব্লা'ডি মোরন। কজ ইউ্য নো না? মনস্টার বাদে সাইকিকে ভয় না পাওয়া ব্যক্তিটা একমাত্র আমি। তাই সাবধান!”
নিরব এডউইন! পরাস্ত সাপের ন্যায় ফোঁস ফোঁস করছে কেবল। চোখদুটোর দৃষ্টে নামিয়েছে আগুন, পারছেনা সে আগুনেই জ্বলসে দিতে এলেক্সকে। এলেক্স স্পষ্ট দেখল সে দৃষ্টি! পরক্ষণে ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের হাসি টেনে বেশ রহস্যময় বাঁকা কন্ঠে বলল,
“ শুধরে যা এডউইন! দ্য গ্রেট রুশদী কিংয়ের আগেও কোনোদিন কোনপ্রকারের দূর্বলতা ছিলো না, ভবিষ্যতেও থাকবে না। ইনফ্যাক্ট, আমিই মনস্টারের লাইফে কোনো দূর্বলতাকে থাকতে দিব না। দ্য গ্রেট রুশদী কিং উইল অলওয়েজ রিমেইন আ হার্টলেস মাফিয়া। এন্ড আ'ল মেক শিওর অফ ইট।”
সহসা ভ্রুযুগল কুঁচকে গেল এডউইনের। মুখভঙ্গিতে ফুটলো একরাশ সন্দিগ্ধতা। ললাটের মসৃণ চামড়ায় ভাঁজ পড়েছে ইতোমধ্যেই। হতবাকতায় চিবুক নেমেছে তার। অধরযুগলের সামান্য ফাঁক গলিয়ে অস্ফুটে বেরুলো,
“ মানে? কোন বিষয়ে বলছিস তুই?”
এলেক্সের মুখাবয়বে রহস্যময় ভাব স্পষ্ট। প্রসঙ্গ এড়ানোর ন্যায় শ্লেষাত্মক কন্ঠে বলল,
“ বৃষ্টিতে ভিজে মনস্তারের পা ধরে একটা সামান্য মেয়েকে বাঁচানোর জন্য নিজ প্রাণ সপে দিতে চাওয়ার মতো দয়ালু মানুষটা তো তুই না এডউইন। আমি জানি, ঐ কাজের পেছনেও তোর সার্থ লুকিয়ে আছে। কজ যে ব্যাক্তি ক্ষমতার লোভে নিজের গার্লফ্রেন্ডকে শত্রুর বেডে পাঠাতে পারে, সে যে কতটা ভালো মনের মানুষ তা আমার জানা বাকি নেই। তুই হয়তো ভেবেছিস, মনস্তার এ বিষয়ে কিছুই জানে না, তাই না?”
চমকপ্রদ তথ্য বোধগম্য হতেই চোখদুটো বিস্ময়ে গোল হয়েছে এডউইনের। ঠোঁট দুটোর মধ্যকার দুরত্ব বেড়েছে কয়েকগুণ। বিস্ময়ে ভ্রুযুগল ছুঁয়েছে কপাল। হতভম্বতায় কন্ঠরুদ্ধ তার! এলেক্স এবারেও ঠোঁট পিষে হাসল। তক্ষুনি এডউইনের চুলগুলো এক ঝটকায় ছেড়ে দিয়ে সটানভাবে দাঁড়াল। আগের ন্যায় দাম্ভিকতা বজায় রেখে প্যান্টের পকেটে হাত গুঁজল নিরবে। অতঃপর উল্টোপথে পা বাড়িয়ে গমগমে গলায় বলে গেল,
“ মনস্তার লাভস টু চেস হিজ এনিমিস। তোকেও ছাড় দিয়েছে, হয়তো দেখতে চাচ্ছে — তুই আর তোর সো-কলড গার্লফ্রেন্ড, কি যেন নাম? ওহ ইয়েস — মিলা! মিলা রোস্তাগিজ। তোরা কতটুকু বাড়তে পারিস। ট্রাস্ট মি এডউইন, যেদিন মনস্টার তোদের ধরবে — একদম ছিড়েখুঁড়ে ফেলবে। এন্ড আমি সেদিনটার অপেক্ষায় আছি।”
দ্বিধায় জর্জরিত দৃষ্টে চেয়ে আছে এডউইন। ব্যস্ত কদমে চলন্ত এলেক্সের বলে যাওয়া প্রতিটি বাক্য যেন একেকটা বিকট বজ্রপাতের ন্যায় পড়ল তার মাথার ওপর। বেচারা ডুবেছে এক ভিন্ন চিন্তায়! মনে মনে আওড়াচ্ছে —
“ এই মিলা আবার আমার গার্লফ্রেন্ড হলো কবে থেকে? হোয়াট দ্য হেল ওয়াজ হি টকিং এবাউট?”
_________________________________________
বিদঘুটে অন্ধকারে আবদ্ধ একখানা বিশালকার কামরা। যেথায় জানালার উপস্থিতি নামেমাত্রও নেই। একপ্রকার ভ্যাপসা গন্ধে মুদে আছে চারপাশ! গরমে নাজেহাল অবস্থা কয়েদীদের। অন্ধকারে স্পষ্ট নয় কামরায় উপস্থিতি কয়েদীদের সংখ্যা। প্রত্যেকের পাদু’টোয় মোটা মোটা শিকল বাঁধা, হাতদুটো ঝুলে আছে শূন্যে। বোধহয় সিলিংয়ের সনে শিকল ঝুলিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে তাদের। মুখের ওপর কালো স্কচটেপ! ফলে গোঙানির শব্দ বাবদ শোনা যাচ্ছে না আরকিছু।
মাত্রাতিরিক্ত কষ্টে ডুবে থাকা কয়েদীরা যখন নিজ শিকলে বাঁধা ঠিক তখনি বিশালাকার কক্ষে আচমকা দেখা গেল এক ছটাক আলো। বিদঘুটে অন্ধকারে থাকতে থাকতে অভস্ত্যতা জড়িয়ে গিয়েছে কয়েদীদের ঘোলাটে দৃষ্টে, ফলে হুটহাট আলোর ছটা চোখে পড়তেই কুঁচকে গিয়েছে প্রত্যেকের চোখ। কেউ কেউ আবার সিটকে নিয়েছে নাক-মুখ। কেউ আবার ধীরে ধীরে চোখের পর্দা সরিয়ে তাকিয়েছে সম্মুখে। কয়েদীদের নিবুনিবু দৃষ্টিতে ধরা দিয়েছে এক বলিষ্ঠ অবয়ব, আলোর বিপরীতে এগোচ্ছে। সে-কি পাহাড়সম উঁচু দেহ তার! গুনে গুনে পা ফেলে এগোচ্ছে অন্ধকার ভেদ করে। গায়ে বোধহয় কাপড়ের উপস্থিতি নেই তার। কোমরের বড্ড নিচে ঝুলছে ট্রাউজারের আগা। একহাতে তার একখানা জ্বলন্ত সিগার। অন্ধকারে সিগারের জ্বলন্ত স্ফুলিঙ্গ বেশ স্পষ্টতর। অন্যহাতে ধরে রাখা লম্বাটে ধাতব নল জাতীয় কিছু একটা, কাঁচের মেঝেতে গড়াচ্ছে তার আগা। লম্বাটে ধাতব নলের খ্যাচখ্যাচ শব্দে ধুকপুকানি বাড়ছে প্রত্যেকের, কেউ কেউ সিটিয়ে যাচ্ছে ভয়ে। যুবক এগোচ্ছে। তার পায়ের গতিতে আজ কেন যেন বিলকুল তারাহুরো নেই। যেন আজ বড্ড বেশি শান্ত সে। প্রায় মিনিট দুয়েক পর, বলিষ্ঠ পুরুষ নিরবে এসে দাঁড়ালেন সম্মুখের এক কয়েদীর নিকট। অতঃপর হাতে থাকা সিগারটায় লম্বা এক টান বসিয়ে গমগমে গলায় শুধালেন,
“ কার খুব বেশি কষ্ট হচ্ছে?”
নিঃশব্দ কামরায় যুবকের এহেন গমগমে গলার স্বর যেন বড্ড ভয়াল শোনালো সকলের নিকট। ক্ষনে ক্ষনে ঢোক গিলতে ব্যস্ত তারা। তন্মধ্যেই একজন কেমন দূর্বল কন্ঠে গুঙিয়ে গেলেন জোরেশোরে। বোধহয় মুখ উম্মুক্ত থাকলে চেঁচিয়ে বলতেন,
“ আমি, আমি! আমার খুব কষ্ট হচ্ছে।”
যুবক আলগোছে ঘাড় কাত করে তাকালো সেদিকে। অন্ধকার কক্ষের বাঁদিক থেকে ভেসে এসেছে আওয়াজ। যুবকের ব্যগ্র কদম সেদিকে ছুটলো। সিগারে লম্বা একটা টান বসিয়ে মুখভর্তি সিগারের কলুষিত ধোঁয়া আটকে রাখল কিয়তক্ষন। পরক্ষণে মুখের বদলে নাসারন্ধ্রের সরু ছিদ্র দিয়ে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে এগোলো কয়েদির পানে। অতঃপর ব্যস্ত পা যখন কয়েদির একদম মুখোমুখি এসে দাঁড়াল, ঠিক তখনি যুবক ঠোঁটের ফাঁকে সিগার চেপে ডানহাতের বৃদ্ধা এবং মধ্যমার সহযোগ ঘর্ষণে চুটকি বাজালো একবার। আর ওমনি সম্পূর্ণ অন্ধকার কক্ষে ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেল লাল রঙা বিদঘুটে মৃদু আলোর ঝলকানি! সে আলোর উপস্থিতিতে সকলের দৃষ্টি গেল পাহাড়সম বলিষ্ঠদেহী পুরুষের পানে। মুহুর্তেই ভড়কায় সবাই। সম্মুখে দাঁড়িয়ে আছে এক বলিষ্ঠ পুরুষ, গায়ে কাপড়ের উপস্থিতি নেই। মাথার ওপর ফেলে রাখা একখানা লাল রঙা সিল্ক কাপড়। মুখ ঢেকে আছে কাপড়ের আড়ালে। যুবকের বাহাতে কোনো ধাতবাকার নল নয়, বরং সেটি একখানা ধারালো তলোয়ার। তা অবলোকন হওয়া মাত্রই আঁতকে ওঠেন সবাই। ভয়ে জড়সড় ভাব নিয়ে অন্যত্র ছুটতে চাইলেই আটকা পড়লেন পায়ের শিকলের টানাটানিতে। এদিকে মনস্টারের সম্মুখে থাকা ব্যক্তি যেন ভাষা হারিয়েছেন নিজের। লোকটা বোধহয় নিজ ভবিষ্যত নিয়ে বড্ড চিন্তায় পড়লেন এপর্যায়ে। সম্মুখে দাঁড়িয়ে থাকা রূঢ় মানব এতক্ষণে ফের মুখ খুললেন। বাহাতের তলোয়ারটা উঁচিয়ে গমগমে গলায় আওড়ালেন,
“ এক কো পে মা থা আলাদা করব! একদম নড়াচড়া করবিনা। আমার মাথা গরম আছে এখন, যতক্ষণ না অব্ধি কারো শরীরের তা জা র- ক্তে পা না ভেজাব ততক্ষণ পর্যন্ত মাথা ঠান্ডা হবে না আমার। সো ডোন্ট মুভ!”
ভয়ার্ত আর্তনাদে ছেয়ে গিয়েছে কয়েদীর চোখদুটো। মুখে বেরুচ্ছে না বাক! অন্যরা ইতোমধ্যেই জুড়ে দিয়েছে ম'রা গোঙানির শব্দ। অথচ রূঢ় মানব সেদিকে ভ্রুক্ষেপহীন। সে বাহাতের ধারালো তলোয়ারটা উঁচিয়ে আচমকা আড়া আড়ি ভঙ্গিতে আঘাত বসালো ক য়ে দির ঘা ড় বরাবর। ঠিক পরমুহূর্তেই অদূরে ছিটকে গেল কয়েদির বিছিন্ন ম স্ত ক। ছিন্ন দেহখানা কাতরাচ্ছে! তাজা লহুর উষ্ণতায় ছেয়ে গিয়েছে স্বচ্ছ কাঁচের মেঝে। কাতরাতে থাকা দেহটা মিনিট পাঁচেক পর শান্ত হলো। নিরবে বেঁকে পড়ল মেঝেতে। তার উষ্ণ লহু ততক্ষণে গা ছেড়ে মেঝেতে গড়াগড়ি খাচ্ছে। বাঁধহীন ভঙ্গিমায় গড়াতে গড়াতে লহু গিয়ে আলগোছে ভিজিয়ে দিলো নির্দয় মাফিয়া মনস্টারের পদতল। এতক্ষণে পরম প্রশান্তিতে চোখদুটো বুঁজল মাফিয়া বিস্ট! শরীরের উত্তপ্ত আগুনে বোধহয় এক বালতি জল ঢালল কেউ। সে কেমন দাঁড়িয়ে আছে নিরবে। ধারালো দাঁতের রুষ্ট চাপে আঁটকে রেখেছে বাদামি ঠোঁটজোড়া। সর্বাঙ্গ তার লোহুতে মাখামাখি! এতে বুঝি প্রশান্তি আরও বাড়ল তার।
______________________________________
ভোর চারটে বেজে ১ মিনিট!
এতক্ষণ ভারী তুষারপাত হলেও এখন আকাশভাগ কেমন ডেকে যাচ্ছে একাধারে! নেভা নদীর আশেপাশে গড়ে ওঠা সেইন্ট পিটার্সবার্গের আবহাওয়া কুল-কিনারাহীণ! এই তুষারপাত হচ্ছে, তো এই আবার ভারী বৃষ্টিপাত। আকাশ ডাকছে ভীষণ! চারিদিকে ছুটেছে শীতল হাওয়ার বেগ। নিজ কামরায় ঘুমে আচ্ছন্ন সপ্তদশী মাহি। কিন্তু মেয়েটা ঘুমের ঘোরেও বড়ো অস্থির! পত্রপল্লবের ন্যায় টানা মুখখানা থরথর করে কাঁপছে তার, বন্ধ হরিণী অক্ষিপুটের পর্দার আড়াল দিয়েই নড়ছে চোখ। ওমন এক ঠান্ডা পরিবেশের মাঝেও দরদর করে ঘামছে মাহি। অস্থির হচ্ছে তার ক্ষুদ্র বদন। কাঁপা কাঁপা হাতদুটো সজোরে চেপে ধরেছে বিছানার একাংশ। মেয়েটার এহেন বেগতিক দশা স্পষ্ট জাহির করছে — ঘুমের ঘোরে সে এক দুঃস্বপ্নে আটকা পড়েছে। দুঃস্বপ্নের প্রখরতা ক্রমশঃ বাড়ছে তার। সপ্তদশীর বদ্ধ চোখের পাতায় দৃশ্যমান হয়েছে অতীতের একফালি তিক্ত স্মৃতি।
★ অতীত ★
দশম শ্রেণিতে পড়ুয়া একঝাঁক কিশোরী! ঘুরতে এসেছে সিলেটের মাধবকুণ্ডে। গোটা কয়েক দায়িত্বশীল শিক্ষকদের তত্ত্বাবধানে দেখতে এসেছে মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত। সেই কিশোরীদের ঝাঁকে উপস্থিত এহসান পরিবারের জমজ দু-রত্ন, আহিরা এহসান এবং মাহিরা এহসান। দুজন দেখতে একই হলেও ছোট থেকেই দু'জনার ব্যাক্তিত্বে রয়েছে বেশ বড়সড় পার্থক্য। যেখানে চঞ্চলা কিশোরী আহি, বান্ধবীদের সাথে হৈ-হুল্লোড়ে মত্ত, সেখানে আদুরে চশমাপরুয়া ভীতু মাহি জলপ্রপাতের কাছ থেকে বড্ড দূরে গা বাঁচিয়ে বসে আছে। ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসির রেশ টেনে একমনে দেখে যাচ্ছে সকলের আনন্দ।
আকাশ আজও বড়ো উদাসীন। গোমড়ামুখী বউয়ের ন্যায় মুখাবয়বে নামিয়েছে রাজ্যের আধার। বোধহয় যেকোনো সময় নিজের ভেতরটা উজাড় করে দিবে ধরণীর গায়ে। হৈ-হুল্লোড়ে মত্ত চঞ্চলা আহি'র অবচেতন মনের কোণে হুট করেই উত্থাপিত হলো এক দুঃসাহসী চিন্তা। মেয়েটা বড়ো কৌতুহলী কি-না! তার আবার বড্ড শখ, জীবনে একবার হলেও জলপ্রপাতের ওপরে থাকা পাহাড়ের টিলায় উঠা। এহেন ইচ্ছের পরিক্রমায় সে তৎক্ষনাৎ পা ঘোরায় সকলের অলক্ষ্যে। ধীরে ধীরে ছোট ছোট পাথরে পা ফেলে এগোয় অন্যত্র। এদিকে তার এহেন কান্ড আর কেউ পরোখ না করলেও মাহি বেশ দেখল। মেয়েটা তক্ষুনি কন্ঠ উঁচিয়ে বোনকে ডেকে আওড়াল,
“ আহি! ওদিকে কোথায় যাচ্ছিস? আহি!”
শুনছেনা আহি! ওতো ভিড়ের মধ্যে তার কান অব্দি হয়তো সে ডাক পৌঁছায়নি তেমন। আহি ধীরে ধীরে দৃশ্যপটের বাইরে যাচ্ছে! মাহি তৎক্ষনাৎ বিচলিত হলো উড়নচণ্ডী বোনকে নিয়ে। সাতপাঁচ না ভেবে মেয়েটা নিজেই পা বাড়াল বোনকে আনতে।
*****************************************
ওপর থেকে প্রবাহিত হওয়া ঝর্ণার একপাশে সময়ের বিবর্তনে তৈরী হয়েছে একখানা প্রশস্ত খাঁজ যুক্ত রাস্তা। উঁচু নিচু অসংখ্য পাথর সেজে আছে চারপাশে। পানির পরশে পিচ্ছিল চারপাশ! মাহি এক কদম এগোলে আছাড় খেয়েছে চারবার। তার পরনের কাপড়ের জবুথবু অবস্থা, স্লাইড কেটে আঁচড় লেগেছে গায়ের বেশকিছু জায়গায়। তবুও তার কদম চলন্ত! বোনকে একাধারে ডাকছে আর এগোচ্ছে সম্মুখে। প্রশস্ত খাঁজের রাস্তাটা ধীরে ধীরে সংকুচিত হচ্ছে। বোকা মানবী নিজেও অবগত নয় সে কোন পথে এগোচ্ছে। সে শুধু দেখেছে — তার বোন এ পথে এগিয়েছে। সে এতক্ষণে নিশ্চয়ই চলে গিয়েছে অনেকটা ওপরে। মাহি'র চিন্তা বাড়লো বেশ। মনের কোণে একরাশ সাহস সঞ্চয় করে মেয়েটা কেমন উদ্বিগ্ন কদমে ছুটল ওপরের দিকে।
প্রায় চল্লিশ মিনিট ধরে খাঁজকাটা রাস্তা ধরে এগোচ্ছে মাহি। ধীরে ধীরে পথ হয়েছে সংকুচিত। সম্মুখের চিপা রাস্তায় মানুষ ঢোকবার জো নেই! বাঁদিকে খোলা একখানা রাস্তা। অদূর থেকে ভেসে আসছে জলপ্রপাতের বিকট গর্জন। কিশোরী মনে দোলা লাগল এহেন শব্দে। তার অবচেতন মন ধরেই নিয়েছে — আহি এ পথ ধরে এগিয়েছে। অতঃপর ভীতু কিশোরী কোনোরুপ কালবিলম্ব না করে কাঁপা কাঁপা কদম বাড়ালো সে পথে। ছোট একখানা সরু রাস্তা। গা বাঁকিয়ে ঢুকতে হয় সে পথে। চিকন-চাকন পাতলা গায়ের গড়ন হওয়ায় মাহি অনায়াসে ঢুকে গেল সে পথে। এতক্ষণের অন্ধকার ছাপিয়ে হুট করেই আকাশ খোলা আলো পেয়ে কুঁচকে গিয়েছে কিশোরীর চশমাপরা মায়াবী চোখদুটো। সে তৎক্ষনাৎ একহাতে আড়াল করল দৃষ্টি। সরু দৃষ্টে টুকটুক করে সম্মুখে তাকাতেই স্তব্ধ হলো মাহি! সম্মুখের নৈসর্গিক দৃশ্য দেখে জুড়িয়ে গিয়েছে তার তন-মন। চারিদিকে সবুজ আবহ, মাথারওপর কালো মেঘেদের আকাশ! পায়ের নিচে হলদেটে-সবুজ রঙা পাথর। যার ফাঁক ফোকর দিয়ে গড়াচ্ছে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন পানি। মুহুর্তেই ঠোঁটের কোণে এক ঝলক পরিতুষ্টির ছাপ ফুটলো মাহি'র। ধীরে ধীরে গাল ভরে গেল আত্মতৃপ্তির হাসিতে। ভীতু মেয়ের এখন আর ভয় করছে না। সে কি সুন্দর প্রজাপতির মতো দু'হাত ছড়িয়ে দিয়েছে দুপাশে। চোখদুটো বুঁজে লম্বা এক নিশ্বাস টানতেই আচানক কিশোরীর কর্ণকুহরে ভেসে এলো কারো মৃদু গোঙানির শব্দ। তক্ষুনি চোখ খুলল মাহি! বোনের চিন্তায় অস্থির হয়ে কদম ছোটালো শব্দের উৎসের দিকে। অদূরের বিশালকার পাথর দুটোর ফাঁক থেকে ভেসে আসছে গোঙানির শব্দ। ভীতু কিশোরীর অদক্ষ কদম বারবার হোঁচট খেয়েও এগোচ্ছে সেদিকে। ধীরে ধীরে পায়ের গতি কমালো মাহি। ভয়ে ঠান্ডা হয়েছে তার সম্পূর্ণ বদন। কন্ঠায় নেমেছে শুষ্কতা! জিভের সিক্ত ডগা ঠেলে শুকনো অধর ভেজাচ্ছে কিশোরী। কাঁপা কাঁপা বদনে পাথরের ফাঁকের কাছে কদম থামিয়ে, মাথাটা আলতো করে বাড়িয়ে উঁকি দিলো মাহি। তবে পরক্ষণেই ভয়ে জমে গেল বেচারি! কন্ঠরুদ্ধ হয়ে গেল চিরচেনা ভীতু স্বভাবের জন্য। সর্বাঙ্গ জুড়ে বয়ে গেল ভয়াতুর ঝংকার। পাথরের ফাঁকে দাঁড়িয়ে আছে এক বলিষ্ঠ পুরুষ! গায়ে কালো রঙা হুডি। তার হাতে একখানা ধারালো চা কু। তা দিয়েই সে অনবরত এলোপাথাড়ি আঘাত করে যাচ্ছে সম্মুখে নিষ্প্রাণ আকারে পড়ে থাকা এক মধ্যবয়স্ক লোকের বুক বরাবর। লোহুতে একাকার আহতের শরীর! চোখদুটো বদ্ধ! নিশ্বাস নেই লোকটার। তবুও নির্দয় মানব কেমন উম্মাদের ন্যায় এলোপাতাড়ি আঘাত করে যাচ্ছে তাকে। ভয়ার্ত মাহি প্রতিক্রিয়া শূন্য! হাত-পা অনবরত কাঁপছে তার। কাঁপা কাঁপা পাদু’টো টলতে টলতে হুট করেই ভেঙে পড়ল কেমন! পাথরের গায়ে কিশোরীর ক্ষুদ্রকায় দেহখানা পড়তেই ধপ করে শব্দ হলো। সে শব্দে হাত থামল নির্দয় মানবের। মুহুর্ত ব্যয়ে সে আচানক ঘাড় বাকিয়ে তাকায় পেছনে। তার সম্পূর্ণ মুখ ঢেকে আছে পাতলা সফেদ রঙা ফুল মাস্কে। সে যেন এক ভয়ানক অশরীরী! মাথার ওপর হুড ফেলে রাখা। মাস্কের আড়ালে লুকিয়ে থাকা একজোড়া বাজপাখির ন্যায় তীক্ষ্ণ বাদামী দৃষ্টি ছোট্ট কিশোরীর পানে পড়তেই টানাটান ললাটে বিরক্তির ভাঁজ পড়ল যুবকের। শরীর ঘুরল কিশোরীর পানে। র ক্তে ভেজা হাতদুটো থেকে এখনো চুইয়ে পড়ছে লহু। যুবক আলগোছে ঘাড় কাত করে তাকাল মাহি'র পানে। ভয়ার্ত মাহি তক্ষুনি পেছাতে লাগল শরীর। যুবক তাকিয়ে রইল একদৃষ্টে। মাস্কের আড়ালে তার দৃষ্টি অনুভুতিশূন্য। হাতটা নিশপিশ করছে মেয়েটাকে এক্ষুণি মে'রে ফেলতে। সে কদম বাড়ায় সম্মুখে। ভয়ার্ত মাহি তৎক্ষনাৎ দু'হাতে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়ায় কোনরকমে। টলমল কদমে ছুটে জলপ্রপাতের কাছে। এদিকে যুবক নিরুত্তাপ! তার কদমে ব্যস্ততা নেই। হাতে থাকা চা কু টা উল্টেপাল্টে দেখছে সে। ছুটন্ত কিশোরীর পদযুগল হুট করেই থেমে গেল সম্মুখে গিয়ে। সামনে পালানোর রাস্তা নেই! আছে কেবল পড়ন্ত ঝর্ণা। এখান থেকে লাফ দিলে পাথরের হাত থেকে বেঁচে ফিরতে পারলেও, সাঁতার না জানার অপরাধে প্রাণ যাবে নিশ্চয়ই। ভীতু কিশোরী পা থামায় তক্ষুনি। শুকনো ফাঁকা ঢোক গিলছে মেয়েটা, পেছনে তাকানোর সাহস যোগাতে অপারগ সে। ভয়ানক লোকটা নিসন্দেহে এতক্ষণে তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। বোকা কিশোরীর মস্তিষ্ক হুট করেই কার্যক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে। শরীরে ছড়িয়েছে নিস্পৃহতা। কাঁধদুটোতে ভর করেছে পরম ক্লান্তি। মানবী নিজেকে বাঁচানোর বৃথা প্রয়াসে তক্ষুনি লাফ দিলো সম্মুখের জলপ্রপাতের সঙ্গে। পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা রূঢ় মানব কেমন দৃষ্টি কুঁচকে দেখল সবটা। সে নিরুত্তাপ! চোখেমুখে এক আকাশসম তিতিবিরক্তিতা লেপ্টে দু-কদম এগিয়ে এসে নিচে উঁকি দিতেই দেখল — কিশোরী ডুবে যাওয়ার পথে। যুবক বিরক্ত হলো! পিয়ার্সিং করা ভ্রুযুগল কুঁচকে দাঁত খিঁচে আওড়াল,
“ হোয়াট দ্য ফা'ক!”
মেয়েটা তার কর্মকাণ্ডের একমাত্র প্রতক্ষ্যদর্শী। একে কি আর ওতো সহজে ছেড়ে দেয়া যায়? যুবক তক্ষুনি দাঁতে দাঁত পিষে লাফ দিলো জলপ্রপাতের নিচে। দূরদর্শি এথলেটিকের ন্যায় শরীর বাকিয়ে লাফ দিয়েছে যুবক। হাত থেকে চাকুটা পড়ে গিয়েছে কোথায় যেন! বড্ড উচুঁ থেকে লাফ দেয়ায় তৎক্ষনাৎ শরীরটা শীতল পানির গভীরতায় তলিয়ে গেল যুবকের। তবুও সে সাঁতরে উঠে আসতে চাইল ওপরে। তবে এরইমধ্যে সে পরোখ করল — পাশ থেকে কিশোরীর নিস্তেজ দেহ পানির গভীরতায় তলিয়ে যাচ্ছে। খোলা চুলগুলো ভাসছে এদিকওদিক। হাতদুটো ওপরে ওঠার চেষ্টায় এখনো মত্ত। কিশোরীর ডুবন্ত শরীর দেখে আচমকা সেদিকে হাত বাড়ায় যুবক। এক শক্ত থাবায় তক্ষুনি আঁকড়ে ধরে ডুবন্ত কিশোরীর ডানহাত। অতঃপর এক হেঁচকা টানে মেয়েটার নিস্তেজ শরীরটা নিজের দিকে টেনে এনে পানির উপরে মাথা তোলে যুবক। অচেতন নিস্পৃহ কিশোরীর ঠান্ডা শরীরটা নিজের বুকের সঙ্গে লেপ্টে রেখে বাদামী চোখদুটোর মালিক আচমকা প্রশ্ন ছুড়ঁল —
“ হু আর ইউ্য পিচ্চি?”
চলবে.....