ফন্ট সাইজ:
থিম:
মির্জা সায়ান মুগ্ধ

৫৩তম পর্ব

লেখক: জান্নাতুল ফেরদৌস মিথিলা

#মির্জা_সায়ান_মুগ্ধ — পর্বঃ৫৩(ক)

#jannatul_firdaus_mithila

“ এক্ষুনি আমার জন্য আইস বাথের ব্যবস্থা কর! ওহ...ফা'ক তারাতাড়ি!!!!!”

রূঢ় মানবের বিকট হুংকার! যার ঝাঁঝ প্রতিধ্বনিত হচ্ছে রায় জমিদার বাড়ির প্রতিটি দেয়ালের কোণে। নিজ আরাম কক্ষে আলোচনায় মত্ত থাকা কর্তা এবং কর্তাগিন্নি কেমন হুট করেই চমকে উঠলেন এহেন হুংকারে। খানিকক্ষণ বেভুলার ন্যায় একে-অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করলেন দুই মানব-মানবী। হতভম্ব কর্তাগিন্নি স্বামীর পানে তাকিয়ে থেকে আগ বাড়িয়ে অস্ফুট কন্ঠে আওড়ালেন,

“ এটা অধীরের গলা না? ও এমন হুংকার দিচ্ছে কেনো?”

একইরকম হতভম্বতার সাগরে গলা অব্দি ডুবে আছেন হিমাংশু রায়। চোখদুটোতে সন্দিষ্ট প্রতিচ্ছবি! পরপরই গম্ভীর মুখাবয়বে সন্দিগ্ধ কন্ঠে প্রতুত্তর করলেন,

“ আমারও তো তাই মনে হচ্ছে! চলো তো গিয়ে দেখি, আবার কার কপালে শনি লেগেছে।”

বাক্যটুকু ব্যায় হতে সময় লাগলেও কর্তা বাবুর পায়ে গতি টানতে সময় হলো না যেন। তিনি তড়িৎ বেগে ছুটলেন কক্ষের বাইরে। পিছুপিছু তার লেজ ধরেছেন সুদীপা রায়। ব্যস্ত পদযুগলে দোতলার কাঠের বারান্দায় এসে খানিক উঁকি দিতেই দৃষ্টি ঠেকল অন্দরমহলের প্রশস্ত অঙ্গনে। যেথায় সারিবদ্ধ আকারে ছুটছে বেশ কতক কালো পোশাকধারী সশস্ত্র গার্ডস। মুহুর্তেই কপাল গোছালেন হিমাংশু রায়। গম্ভীর মুখাবয়বে রেলিঙের দ্বার ঘেঁষে ঘাড় উঁচিয়ে তাকালেন তিন তলার দিকে। ওমনি দৃশ্যপটে আটঁকালো রূঢ় মানবের লাল হয়ে আসা সুদর্শন মুখখানা। অজানা অস্থিরতায় কাঁপছে তার পাহাড়সম দেহটা। বাজখাঁই কন্ঠে ফের হুংকার ছুঁড়ল —

“ ডু ইট ফাস্ট বাস্টা'র্ডস!”

সর্বাত্মক গতিতে ছুটছে গার্ডস। দাঁড়াবার একমুহূর্ত ফুরসতও নেই তাদের নিকট। হিমাংশু রায় পা বাড়ালেন এবার। গম্ভীর মুখে গটগটিয়ে এগোলেন সিঁড়ির পানে। পাদু’টো বাঁকা পথে মোড় নিতেই যাবে ওমনি তিন তলার প্রশস্ত কাঠের সিঁড়িগুলো বেয়ে ধুপধাপ শব্দ তুলে নেমে আসে মুগ্ধ। পেটানো দেহখানা বড্ড ঘর্মাক্ত তার। মাথাভর্তি বাদামী রঙা ওলফ-কাট দেয়া চুলগুলো এলোমেলো! চোয়ালের পেশি টানটান করে যুবক নামছে সিঁড়ি বেয়ে। হিমাংশু রায় তাকে দেখেই খানিক গলা খাঁকারি দিয়ে উঠলেন। দু'টো বাক্য আওড়ানোর উদ্দেশ্যে ঠোঁট নাড়াবেন তার পূর্বেই মুগ্ধ একপ্রকার উপেক্ষা করে বসল তাকে। দেখেও না দেখার ভান ধরে মোড় টানল পায়ের গতিতে। অতঃপর চোখের পলকে দৃশ্যপট হতে আড়াল হলো রূঢ় মানব। হিমাংশু রায় কেবল হা করে তাকিয়ে রইলেন। পেটে আসা বাক্যটুকু জিভের ডগায় আনার পূর্বেই তা গিলে ফেললেন বিনা জলে।

_______________________________________

রায় জমিদার বাড়ির সুবিশাল অন্দরমহল হতে প্রায় খানিকটা দূরে বহু আগে নির্মিত হয়েছে একখানা ছোট্ট একতলার দালান। লাল ইটের মোটা মোটা দেয়াল তার, শ্যাওলা ধরা চুনসুরকির গা! সময়ের ক্ষয়ে বিবর্ণ হয়েছে খিলানগুলো। নান্দনিক কারুকার্যের সুবিশাল দরজার গা হতে প্রায় ২৬ বছর পর খুলেছে তালার আবরণ। সরু ইট বিছানো পথ দিয়ে দালান পানে এগোচ্ছে টালমাটাল দুটো বলিষ্ঠ কদম। পথের দুপাশে আজ্ঞাকারীর ন্যায় নতমুখে দাঁড়িয়ে আছে মনস্টার'স গার্ডস। মুগ্ধ ছুটছে একপ্রকার। অস্থির পাদুকা তার, স্নানকক্ষের দালানে প্রবেশ করতেই তটস্থ হলেন বাদবাকি গার্ডেরা। তক্ষুনি নতমুখে সিটিয়ে দাঁড়ালেন কক্ষের একপাশে। রূঢ় মানব সেদিকে বেখেয়ালি। চটজলদি স্নানকক্ষের পানিভর্তি বিশাল চৌবাচ্চার পানে এগিয়ে এসে দিলেন একঝাঁপ! মুহুর্তেই তার পাহাড়সম দেহের ভারে পানির একাংশ কেমন উপচে পড়ল চৌবাচ্চার দেয়াল হতে। বড়ো বড়ো বরফ খন্ড ভাসছে পানিতে, ফলে পানির তাপমাত্রা হয়েছে বরফঠান্ডা! সে-ই হাড় হিম করা ঠান্ডা পানিতে মাথা শুদ্ধ পুরো বদন ডুবিয়ে দক্ষ কায়দায় সাঁতরাচ্ছে মুগ্ধ। থামল খানিকবাদে। বিশাল চৌবাচ্চার অপর প্রান্তে গা ঘেঁষে দাঁড়ায় মুগ্ধ। এক'হাতে আলগোছে কপাল হতে পেছন দিকে ঠেলে দেয় সিক্ত বাদামী চুলগুলো। লম্বা লম্বা নিশ্বাস ফেলতে ফেলতে চোখদুটো বুঁজে এলো আপনাআপনি। হিমশীতল পানির সংস্পর্শে এসে কয়েক মুহূর্তেই স্নায়ুতন্ত্রের অভ্যন্তরীণ যুদ্ধ খানিকটা প্রশমিত হলো রূঢ় মানবের। সংকুচিত হলো ত্বকের র*ক্তনালী। অস্বাভাবিক অস্থিরতা খানিকটা নিয়ন্ত্রণে এলো তার। স্তিমিত হলো কিছুক্ষণ আগে জাগ্রত হওয়া নিষিদ্ধ অস্থিরতার আভাস। স্বাভাবিক হলো শ্বাস-প্রশ্বাসের ছন্দ! ধীরলয়ে চোখের পর্দা সরায় সুদর্শন। ফুলেফেঁপে থাকা বলিষ্ঠ হাতদুটো আলগোছে তুলে দেয় চৌবাচ্চার দেয়ালের গায়ে। পানির তলে দোদুল্যমান দেহখানি টানটান করে রেখে আচমকা বাঁকা হাসে মুগ্ধ। মুহুর্তেই হালকা খাঁজযুক্ত দৃঢ় চোয়ালখানা খানিক নড়ল তার। দাঁত বসল পিয়ার্সিং করা অধরের কোণে। শ্লেষাত্মক ভঙ্গিতে কন্ঠ ফুঁড়ে বেরুলো —

“ সামান্য একটা ডিপকিসে-ই এ হাল আমার বান্দীর মেয়ের? তাহলে তো পুরো হ্যাংকি-প্যাংকি এপ্লাই করতে গেলে খুঁজেই পাওয়া যাবে না তােকে! উফফফ.. সো স্যাড।”

বাক্যটুকু আওড়ে ফের সম্মুখে এগোলেন রূঢ় মানব। ডোবালেন নিজ বলিষ্ঠ দেহ। দু'হাত দু'দিকে ছড়িয়ে চিৎ হয়ে সাঁতার কাটছে এবারে।

_______________________________________

মুগ্ধের সিক্ত গা! পেটানো উম্মুক্ত গা হতে চুইয়ে পড়ছে পানিরকণা। ভি-শেইপের মেদহীন কোমরের বেশ নিচে আঁটকে আছে ঘিয়ে রঙা ঢিলেঢালা ট্রাউজারের গা। সিক্ত বাদামী চুলগুলো কেমন এলোমেলো আকারে লেপ্টে আছে সুদর্শনের ফর্সা কপালে। ঘাড় বেয়ে চুইয়ে পড়ছে পানি। ভাবলেশহীন পায়ের ভঙ্গি মুগ্ধের। পাইথন ট্যাটু শৈলীতে অঙ্কিত ফুলেফেঁপে থাকা বলিষ্ঠ হাতদুটো প্যান্টের পকেটে গুঁজে রাখা। ঠোঁটের ফাঁকে চেপে আছে জ্বলন্ত ক্রুটস নিকারাগুয়ান। যার কলুষিত ধোঁয়া উড়ছে মানবের সুশ্রী গৌরবর্ণ মুখের চারপাশে। তার পিছুপিছু একঝাঁক প্রশিক্ষিত গার্ডস। দুরত্ব রয়েছে দু-হাতের।

র*ক্তলাল আবরণে সুসজ্জিত নিরুর ভাসা ভাসা চোখদুটো। ভঙ্গুর হৃদয়ের ছাপ বসেছে কাঞ্চা সোনা গড়নের সুশ্রী মুখমণ্ডলে। খানিকটা বোঁচা অথচ মায়াবী নাকের ডগাটায় জমেছে লালিমা। দু'হাতে তার আঁকড়ে ধরা একখানা সফেদ রঙা তোয়ালে। গা লুকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে অন্দরমহলের নিচতলার গোলাকার ভিম ঘেঁষে। পাশেই সুদীপা রায়। সর্তক দৃষ্টি উঁচিয়ে তাকাচ্ছেন এদিক-ওদিক। যেন তার চোখদুটো কারো অপেক্ষায় অপেক্ষায়িত। সময়ের দৈর্ঘ্য খুব একটা প্রশস্ত হলো না বোধহয়। কর্তাগিন্নির অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে অন্দরমহলে পা পড়ল মাফিয়া শ্যাডো মনস্টার খ্যাত অধীর রায়ের। তাকে দেখামাত্রই কর্তাগিন্নি উদ্বিগ্ন হলেন। তড়িঘড়ি করে মেয়ের ডানহাতের বাহু আঁকড়ে তাকে একপ্রকার ঠেলতে ঠেলতে আওড়ালেন,

“ যা যা! তারাতাড়ি যা। হাতের তোয়ালেটা দিয়ে আয় অধীরকে। পারলে একটু-আধটু কথা বলিস।”

নিরু মুখ কুঁচকায়। কপালে ঘৃণার ছাপ ফুটিয়ে চাপা স্বরে আওড়ায়,

“ পারব না আমি মা! তুমিই নিয়ে যাও তোয়ালেটা।”

তড়াক চোখ পাকিয়ে তাকালেন সুদীপা রায়। দাঁত কিড়মিড় করতে লাগলেন দু'টো কটু বাক্য আওড়ানোর উদ্দেশ্যে। তবে পরক্ষণেই নিজেকে সামলালেন তিনি। বড্ড বিচক্ষণিক্ষণি কৌশলে খানিকটা এগিয়ে এলেন মেয়ের সন্নিকটে। মুখ নামিয়ে চাপা স্বরে শুধালেন,

“ আহা! হবু বরের সঙ্গে কথায় কথায় ওতো রাগ করতে নেই মা। আমিতো বললাম, অধীরের সঙ্গে ঐ যাচ্ছে তা-ই দু'দিনের মেয়েটার কোনো সম্পর্ক নেই। বিশ্বাস নাহলে তোর বাবাকে গিয়ে জিজ্ঞেস কর। তুই ঘর ছেড়ে যাবার পর অধীর নিজের মুখে আমাদের বলেছে — মেয়েটার সাথে ওর কোনো সম্পর্ক নেই। কি একটা কাজের জন্য না-কি ওকে কলকাতায় এনেছে। ক'দিন পর ফেরত পাঠিয়ে দেয়া হবে ওকে। তাছাড়া তুই তো জানিস নিরু, অধীর কোনো নারীর সান্নিধ্য পছন্দ করেনা। তারপরও নিজের হবু বরের বিরুদ্ধে কিভাবে ওমন উল্টাপাল্টা চিন্তা করিস বলতো?”

সপ্তদশীর অবুঝ মন। গর্ভধারিনীর আওড়ানো বাক্যগুলো বড্ড সহজে বিশ্বাস করল বুঝি। মুহুর্তেই অদৃশ্য পাথরটা বুকের ওপর থেকে সরে গেল তার। ঘাড় বাকিয়ে তাকাল মায়ের মায়াবী মুখপানে। কন্ঠে নামালো অদ্ভুত শঙ্কা!

“ সত্যি বলছো মা?”

কন্ঠায় হুট করেই ব্যাথা অনুভব করলেন কর্তাগিন্নি। অপরাধবোধে এলোমেলো ভঙ্গিতে লুকোলেন দৃষ্টিজোড়া। বুক ফুলিয়ে লম্বা একটা নিশ্বাস ফেলে চোখ খিঁচে বলে উঠলেন,

“ হ্যাঁ!”

অবুঝ মেয়েটার সুখ দেখে কে! চোখদুটোর কার্নিশে মুহুর্তেই হানা দিলো কয়েক দানা অশ্রু। চটপট হলো পায়ের গতি। একপ্রকার ব্যগ্র ভঙ্গিতে প্রায় উড়ে এসে মুহুর্ত ব্যয়েই দাঁড়াল রূঢ় মানবের সম্মুখে। তক্ষুনি পায়ের গতিতে রুখ টানল মুগ্ধ। শক্ত চোয়ালে ভ্রুযুগল কুঁচকে তাকাল মেয়েটার পানে। একহাত দুরত্বে দাঁড়িয়ে থেকে তোয়ালে বাড়িয়েছে নিরু। নতমস্তকে, শর্মিলা কায়দায়। মিনমিনে স্বরে বলে ওঠে,

“ ভেজা গায়ে বেশিক্ষণ থাকলে ঠান্ডা লেগে যাবে আপনার! নিন, তারাতাড়ি তোয়ালেটা দিয়ে গা মুছে ফেলুন।”

কটমট শব্দ তুললো রূঢ় মানবের দাঁতকপাটি। মুখাবয়বে ফুটে উঠল একরাশ বিরক্তির ছাপ। সে তৎক্ষনাৎ ঘাড় বাকিয়ে গলা টানল। মুখভর্তি একদলা থুতু এনে আচমকা ফেলে দিলো নিরুর ঠিক পাশে। এহেন অতর্কিত কান্ডে ভড়কায় নিরু। গুটিয়ে নেয় নিজ বাড়ন্ত হাতখানা। জড়সড়ভাব ধরতেই সম্মুখ থেকে ভেসে আসে রূঢ় মানবের রুক্ষ কন্ঠস্বর।

“ ডোন্ট ইউ্য ডেয়ার কাম ইন ফ্রন্ট অফ মি। নয়তো নেক্সট টাইম থুতুটা মাটিতে নয়, তোর মতো বালপাকনার মুখ বরাবর ফেলব। মাইন্ড ইট!”

সহসা আহত দৃষ্টি তুলে সুদর্শনের মুখপানে তাকায় নিরু। অথচ তার ওমন হাবভাবে বিন্দুমাত্র উদ্বেগ না দেখিয়ে পা ঘোরায় মুগ্ধ। গটগটিয়ে হেঁটে চলে যায় সিঁড়ির পানে। এদিকে তার চলে যাওয়ার পথে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে নিরু। ঢোক গিলে বোধহয় থামাতে চাইছে নিজ উপচে পড়া কান্নাগুলো!

★

নিস্তব্ধতায় মোড়ানো তিনতলার একদম কর্নারের কক্ষটি। মুগ্ধের দাম্ভিক কদমজোড়া মাত্রই প্রবেশ করল ভেতরে। পূর্বের ন্যায় দাম্ভিক ভাবখানা বজায় রেখে এগোচ্ছে বিছানার দ্বারে। অচেতন মানবী কেমন নিস্তেজ আকারে পড়ে আছে মখমলি বিছানার কোলে। রূঢ় মানব একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলো মেয়েটার ঘুমন্ত মুখপানে। বলিষ্ঠ ঘাড়টা সামান্য বাঁকিয়ে ঠোঁটের কোণ হতে নামিয়ে আনলো সিগারটা। অতঃপর ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের হাসি টেনে ধীরলয়ে ঘাড় ঝুঁকিয়ে দাঁড়াল মাহি'র মুখের ওপর। দুষ্ট কন্ঠে শুধালো,

“ আমার মতো আস্ত একটা অশান্তির গোডাউনকে জাগিয়ে রেখে, নিজে কি করে ওতো শান্তির ঘুম ঘুমাচ্ছিস বান্দীর মেয়ে? আমার দুচোখ যে আর নিতে পারছেনা তোর এতো শান্তি, স্বস্তি!”

ঘুমন্ত মাহি থোড়াই শুনল এসব। সে যে ক্লান্ত! পরিশ্রান্তিতে মুদেছে দু-চোখ। তার ক্ষুদ্র মুখখানা কেমন অদ্ভুতভাবে লাল হয়ে উঠেছে। গভীর ক্ষততে সজ্জিত নরম তুলতুলে অধরযুগলের বেগতিক দশা। মুগ্ধ নিষ্পলজ চেয়ে আছে সেদিকে। আনমনে তর্জনীর ডগা উঁচিয়ে মেয়েটার অধরযুগল একটুখানি ছুঁতেই কপাল কুঁচকে গেল সুদর্শনের। গম্ভীর হলো মুখাবয়ব। বাড়ন্ত হাতখানা তক্ষুনি বিচলিত ভঙ্গিতে উঠে এলো রমণীর মসৃণ ললাটে। ওমনি মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল মুগ্ধের। জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে মেয়েটার। তারজন্যই বোধহয় মুখটা ওমন লালাভ আবরণ ধরেছে। মুহুর্তেই মুগ্ধের অস্থিরতা আকাশ ছুঁলো। পাগল প্রায় ভাব ধরল দ্য শ্যাডো মনস্টার। অস্থিরতায় গলা শুকিয়ে কাঠ তার। দু'হাতের রুক্ষ আঁজলায় তক্ষুনি চোয়াল তুললো মাহি'র। বিচলিত কন্ঠে ডাকল —

“ এ্যাই! সি-সিগনোরা। সি-সিগনোরা। আর ইউ্য ওকে? কি হয়েছে তোর? এ্যাই মেয়ে! চোখ খোল। তোর জ্বর এলো কেনো? কি করে এলো? তোর কষ্ট হচ্ছে না? তাকা আমার দিকে। তোর কষ্ট হচ্ছে না?”

মানবীর মসৃণ মুখখানায় ফ্যাকাশে প্রলেপ বসছে ক্রমশ। তা অবলোকন হতেই হৃৎস্পন্দনের অস্বাভাবিকতা বাড়ল মুগ্ধের। তড়িঘড়ি করে নরম টানে সপ্তদশীকে এক ঝটকায় তুলে নিলো পাঁজা কোলে। রমণীর উষ্ণ দেহখানা নিজ শীতল দেহের সনে লেপ্টে রেখে ফের আওড়াল,

“ তাকা না সিগনোরা! ওঠ। উঠে গালি দে আমায়। দেখ তোকে আমি কোলে নিয়েছি। মুখ ঝামটি দে! ঝামটি দিয়ে অসভ্য ডাক একবার। ডাক না সিগনোরা! এ্যাই! এ্যাই মেয়ে, আমার বুক কাঁপছে। ডোন্ট... ডোন্ট ডু দ্যাট। তারাতাড়ি ওঠ! স্ট্রেঞ্জ! আমার নিশ্বাস আঁটকে যাচ্ছে সিগনোরা।”

অদ্ভুত অশান্তিতে মুড়িয়ে গেল রূঢ় মানব। খেয়াল করল — তার নিশ্বাস আঁটকে আঁটকে যাচ্ছে। প্রথমবার গলার কাছে নিশ্বাস আঁটকে যাবার বিদঘুটে অনুভূতি টের পেলেন মাফিয়া বিস্ট। বুকের খাঁচায় লুকিয়ে থাকা অঙ্গটির ধড়াস ধড়াস তো আছেই। সে তক্ষুনি টলমল পায়ে এগোলো দুয়ারের কাছে। মেয়েটাকে কোলে নিয়েই করিডরের রেলিং ঘেঁষে দাঁড়িয়ে ফের গর্জে উঠে বলল —

“ ওখরানা!!”

(গার্ডস!)

বিদ্যুৎ বেগে ছুটে এলেন পাহারারত রক্ষীদের দল। ঘাড় নুইয়ে প্রশস্ত অঙ্গনে পা রাখতেই ফের শোনা গেল মনস্তারের কঠিন হুংকার!

“ চেরেজ ত্রিদ্ৎসাত মিনুত। দাস্তাভতে স্যুদা লুচশিখ ভ্রাচেই কালকুত্তি। পাভতারাইউ: উ ভাস ফ্সিভো ত্রিদ্ৎসাত মিনুত।”

(আধঘন্টার মধ্যে কলকাতার সেরা ডাক্তারদের তুলে নিয়ে আয় এখানে। আই রিপিট, জাস্ট আধঘন্টা!)

হুকুম তামিলে মত্ত হলেন সকলে। যথাসম্ভব দ্রুত বেগে ছুটলেন উল্টোপথে। মুগ্ধ উদ্বেগ নিয়ে মেয়েটাকে নিজ রুক্ষ বক্ষভাঁজের সনে চেপে রেখেছে আলগোছে। এ দৃশ্য অন্য কেউ না দেখলেও অদূরের দোতলার করিডর থেকে স্পষ্ট দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখলেন হিমাংশু রায়। স্পষ্ট বুঝলেন মুগ্ধের বলা রাশিয়ান কথাগুলো। পরপরই মুখটা বড্ড গম্ভীর হলো তার। কোমরের পিঠে বেঁধে গেল হাতদুটো। গম্ভীর কন্ঠফুঁড়ে অস্ফুটে বেরুলো,

“ একটা সামান্য মাশুকার জন্য এতোটা উদ্বেগ? এ-ই মেয়ে আসলেই রুশদী'র মাশুকা তো? না-কি তারচেয়েও বেশিকিছু?”

*******************************************

গভীর রাত! পুরনো রায় জমিদার বাড়ির পেছন পথ দিয়ে একে একে প্রবেশ করানো হচ্ছে চিকিৎসকদের। একজন নয়, দুজন নয়— কলকাতার একাধিক নামকরা চিকিৎসক! নিরাপত্তার শক্ত বলয়ে ঘিরে আনা হয়েছে তাদের। কারো চোখ বাঁধা কালো পট্টি দিয়ে, কারো আবার হাতদুটো! কারোর মুখে স্কচটেপ। ঘুম ঘুম চোখে কেউই টের পেলো না — তারা এমুহূর্তে কোথায় যাচ্ছে , কার কাছে যাচ্ছে। অন্দরমহলের সিড়িঁ বেয়ে অন্ধের ন্যায় উঠতে উঠতে ব্যপক আগ্রহ মিশ্রিত কৌতুহলে একজন চিকিৎসক হুট করেই জিজ্ঞেস করে ওঠে,

“ দাদারা! কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন তা নাহয় না-ই বললেন, কিন্তু কার ওমন জরুরি তলবে ধরে বেঁধে নিয়ে যাচ্ছেন, তা অন্তত বলুন।”

তৎক্ষনাৎ প্রতিত্তোর আসেনি তেমন। ধীরলয়ে পেছন থেকে শোনা গেল কারোর গম্ভীর কন্ঠস্বর। আমেরিকান একসেন্টে আওড়ালেন,

“ কে ডেকেছে তার বিষয়ে জানতে না চেয়ে, বলেন — গু লি করে মে'রে দিই। আপাতত শুধু এটুকু জেনে রাখুন যে মানুষটি আপনাদের ডেকেছে, তার আদেশ অমান্য করার ক্ষমতা কলকাতার খুব কম মানুষেরই আছে। শত হলেও শ্যাডো মনস্তার বলে কথা!”

মুহুর্তেই সর্বাঙ্গে ঝংকার দিয়ে উঠল সকলের। বিভিন্ন ডার্ক ওয়েবসাইটে ট্রেন্ডিং হট টপিকে থাকা বিশেষ নাম — দ্য আন্ডারওয়ার্ল্ড শ্যাডো মনস্তার, তার খবর জানেনা এমন কে আছে শুনি? তার হিং স্রতার নিত্যনতুন খবরাখবর ব্লগ আকারে পেশ করাই থাকে, বিভিন্ন এজেন্টের আকর্ষণের শীর্ষে। সেদিক থেকে মনস্টারের বিষয়ে টুকটাক অবগত সকলে।

★

বিশাল কক্ষের বাইরে সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন চিকিৎসকেরা। কাঁপছে তাদের হাঁটু! হাতদুটো জমে যাচ্ছে ভয়ে। ঘাড় যে সে-ই কখন থেকে ঝুঁকিয়েছেন তার হিসেব নেই। সকলে ভেতরে প্রবেশের অনুমতি পাচ্ছেন একে একে। মাঝেমধ্যে কক্ষ থেকে ভেসে আসে হুটহাট শ্যুট করার বিকট শব্দ! তা কর্ণকুহরে পৌঁছাতেই মুখাবয়বে ভয়ের ছাপ বাড়ে সকলের।

সময় পেরুলো মিনিট পাঁচেক। ভেতর থেকে হুট করেই বার্তা এলো — একযোগে ঢোকার। ওমনি সকল চিকিৎসকেরা ধীরলয়ে প্রবেশ করলেন কক্ষে। অদূরের বিশাল কাউচে পায়ের ওপর পা তুলে বসে আছেন মাফিয়া বিস্ট! তার ঠিক পদতলে অবহেলিত আকারে পড়ে আছে দু'দুটো মানবদেহ৷ লহুতে মাখামাখি অবস্থা তাদের। সদ্য গু লি লাগায় প্রাণ পাখি উড়ে গিয়েছে ইতোমধ্যে। মানবের গা ঢাকা তার চিরচেনা অবয়বে। মুখটা আড়াল করা কালো রঙা গোলাকার টুপির আড়ালে। মাস্কের ওপর দিয়েই অনবরত ফুঁকছে সিগার। আচমকা শক্ত কন্ঠে আওড়াল —

“ ওর চিকিৎসা কর!”

একমুহূর্ত স্থির থেকে সকলের দৃষ্টি ঠেকল অচেতন মাহি'র পানে। ওমনি নিজেদের অবস্থান ভুলে গিয়ে চিকিৎসাধর্মে লিপ্ত হলেন সবাই। উদ্বিগ্ন হলেন রোগীকে নিয়ে। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, বিশাল কক্ষে আগে থেকেই আনা হয়েছে চিকিৎসার সকল প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম, মেশিন! যত্রতত্র এগোলেন সবাই। লেগে পড়লেন যার যার কাজে। অদূর থেকে রূঢ় মানব ঠায় দৃষ্টে তাকিয়ে রইল মেয়েটার দিকে।

★

সময় পেরুলো মিনিট বিশেক! ওমনি অস্থিরতায় ধৈর্যের বাঁধ ভাঙল রূঢ় মানবের। সহসা শক্ত চোয়ালে কটমট কন্ঠে হুংকার ছুঁড়লেন,

“ আর কতক্ষণ লাগবে ওর জ্বর কমতে? আর কতক্ষণ লাগবে ওর জ্ঞান ফিরতে বাস্টা'র্ডস? এখনো ওর জ্ঞান ফিরল না কেনো? কিসের ডাক্তার হয়েছিস তোরা?”

তৎক্ষনাৎ ঘাবড়ে গেলেন সকলে। সাহসী একজন আগ বাড়িয়ে শুষ্ক ঢোক গিলে আমতা আমতা করে শুধালেন,

“ স্যার...না মানে..মনস্টার উনি...!”

বাক্যটুকু জিভ খসানোর পূর্বেই সম্মুখ থেকে একখানা শক্তপোক্ত হাতের হিং স্র থাবা ছুটে এসে আচানক আক্রমণ বসালো বেচারা ডাক্তার সাহেবের অমসৃণ গ্রীবাদেশে। মুহুর্তেই ভয়ে সটান হলেন সবাই। পিছিয়ে গেলেন দু-কদম। এদিকে হাতের সে-কি জোর রূঢ় মানবের! ধীরলয়ে চিকিৎসকের গ্রীবা আঁকড়ে পাদু’টো তুলছে শূন্যে। চিকিৎসক পাতলা মানুষ। গলায় ফাঁস অনুভব হচ্ছে তার। এক্ষুণি বোধহয় ভেঙে গুড়িয়ে যাবে বেচারা ডাক্তার সাহেবের কন্ঠনালীর নরম হাড়। সম্মুখের রূঢ় মানব তখন মাস্কের আড়ালে লুকিয়ে থাকা নিজ দৃঢ় চোয়ালখানা নাড়িয়ে চাড়িয়ে ক্ষুব্ধ বাঘের ন্যায় গর্জন তুলে আওড়াল —

“ ডোন্ট ইউ্য ডেয়ার টু কল অর মেনশন হার! জাস্ট ফোকাস অন হার ট্রিটমেন্ট।”

তৎক্ষনাৎ শুকনো ঢোক গিললেন সবাই। বাচাঁর প্রয়াসে আগে-ভাগেই ব্যগ্র হয়ে ছুটলেন এদিক-ওদিক। এরইমধ্যে দু'জন অভিজ্ঞ ডাক্তার এগিয়ে এসে কি যেন একটা বলতে চাইলেন মাফিয়া বিস্টকে। তবে তা আর হতে দিলেন না মাফিয়া বিস্ট। উল্টো শক্ত চোয়ালে ফের হুংকার ছুঁড়ে শুধালো,

“ নো মোর ওয়ার্ডস! প্রাণে বাঁচতে চাইলে এজ সুন এজ পসিবল ওকে সুস্থ কর। ওর অসুস্থতা আমার গায়ে কাঁটার ন্যায় বিঁধছে। যে তীক্ষ্ণ কাঁটার আঘাত মোটেও সহ্য হচ্ছে না আমার।”

থমকে গেলেন চিকিৎসকেরা। থমকে গেল তাদের অভিব্যক্তি। যথাসম্ভব দক্ষ এবং শান্ত মেজাজে ফের উদ্বেগী হলেন মেয়েটার চিকিৎসায়। রূঢ় মানব তক্ষুনি ছেড়ে দিলো ডাক্তারের সুদীর্ঘ কন্ঠনালী। ছাড়া পেতেই পাতলা মানুষ একপ্রকার আছাড় খেলো মেঝেতে। কাশতে কাশতে চেপে ধরলেন বুক! আরেকটু হলেই মরণ নিশ্চিত ছিল তার। মুগ্ধ ঠায় দাঁড়িয়ে রইল নিজ জায়গায়। এবার আর পেছালো না সে। অপলক তাকিয়ে রইল মেয়েটার দিকে।

★

গুনে গুনে পার হলো আর ১০ মিনিট। অস্থিরতার চরম শিখরে পোঁছেছে মুগ্ধ। রাগে গজগজ করতে করতে আচমকা কোমরের পিঠ থেকে বের করে আনলো রাশিয়ান মডেলের ব-ন্দু-কটা। যার শীতল ধাতব নলখানা গিয়ে ঠেকল ডাক্তারদের পিঠ বরাবর। মুহুর্তেই স্থির হয়ে গেলেন সকলে। রূঢ় মানব হুংকার ছুঁড়ে আওড়ালেন,

“ এখনো ওর জ্ঞান ফেরাতে পারলি না কেনো বাস্টা'র্ডস? প্রাণের মায়া নেই তোদের?”

কন্ঠ শুকিয়ে কাঠ হলো বেচারাদের। তন্মধ্যে বয়স্ক এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এগিয়ে এসে দাঁড়ালেন মনস্টারের পেছনে। মিনমিনে স্বরে ডাকলেন,

“ ম-ম-মনস্তার!”

তক্ষুনি পিছু ঘুরল মুগ্ধ। হাওয়ার বেগে বন্দুকের নলটা গিয়ে আচানক ঠেকল বয়স্কের কপাল বরাবর। সহসা ভড়কে গেলেন লোকটা। দূর্বল পায়ে হুট করেই হাঁটু গেঁড়ে বসে পড়লেন জমিনে। কন্ঠে ভয়ের ছাপ থাকা স্বত্বেও ধীরস্বরে শুধালেন,

“ মনস্তার! পেশেন্টের ব্লাড প্রেশার, পালস রেট, অক্সিজেন স্যাচুরেশন, চোখের পিউপিল, স্নায়বিক প্রতিক্রিয়া, ইভেন ইলেকট্রোলাইট চেক করা শেষে, এজ আ নিউরোলজিস্ট আমি শতভাগ নিশ্চিত — দ্য পেশেন্ট হেজ সাইকোজেনিক সিউডোসিনকোপ! অর্থাৎ এটি কোনো শারীরিক অসুখ নয়, বরং ট্রমা-সম্পর্কিত ডিসোসিয়েটিভ স্টুপর।”

বোধগম্যহীন ছাপ ফুটল মুগ্ধের মুখাবয়বে। সন্দিহান কন্ঠ ফুঁড়ে অস্ফুটে বেরুলো —

“ মানে?”

খানিক শান্ত হলেন চিকিৎসক। শুকনো অধরের কোণ জিভ ঠেলে খানিক ভিজিয়ে নিয়ে ফের আওড়ালেন,

“ আ'ম শিওর, পেশেন্ট হেজ আ ট্রমাটিক পাস্ট মনস্তার। পেশেন্টের অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে তিনি আজ প্রথমবার নয়, বরং এর আগেও কয়েকবার অতিরিক্ত মানসিক চাপ, কষ্ট কিংবা ভয়ে জ্ঞান হারিয়েছে। সাইকোজেনিক সিউডোসিনকোপ সিনড্রোমে আক্রান্ত পেশেন্টরা খুব ছোটবেলাতেই কোনো না কোনোভাবে মারাত্মক ট্রমার শিকার হয়ে থাকে। যার রেশ তাদের মধ্যে বড় হলেও থেকে যায়। যার দরুন, হুটহাট প্রচন্ড মানসিক চাপ, ভয়, কিংবা আতঙ্কিত হলেই এদের নার্ভ স্লো হয়ে যায়। কখনো কখনো তাদের অচেতন থাকার সময় পরিধি ১ ঘন্টা, ২ ঘন্টা কিংবা এর বেশিও হতে পারে। তবে অতিরিক্ত মানসিক চাপ পেয়ে গেলে এদের অবস্থা বেগতিক হতে পারে। এমুহুর্তে ঠিক যেমনটা হচ্ছে পেশেন্টের সঙ্গে। উনি নিশ্চয়ই মানসিক আঘাত পেয়েছে, অথবা গুরুতরভাবে ভয় পেয়েছে বলে আমার ধারণা!”

সহসা পাহাড়সম দেহটায় ঝংকার অনুভূত হলো রূঢ় মানবের। মস্তিষ্ক হলো ফাঁকা। তার সিগনোরার সাইকোজেনিক সিউডোসিনকোপ আছে? মেয়েটা তবে এতো দূর্বল? ছোট থেকেই ট্রমাটিক পাস্ট বহন করে চলেছে? মুগ্ধ নিস্তব্ধ হলো! তার কল্পনার মানসপটে আচানক ভেসে উঠল তারই করা পূর্ব কার্যকলাপ! মেয়েটার গায়ে দিনের পর দিন পশুর মতো হাত তোলা, সারারাত ব্যথায় জর্জরিত থেকে পিচ্চিটার কান্না করা, অতিরিক্ত ভয়ে হুটহাট জ্ঞান হারানো! সবটা... সবটা তো ওর চোখের সামনেই হতো। তারপরও কিচ্ছু টের পেলো না কেনো রুশদী কিং? সে না বিচক্ষণ? আন্ডারওয়ার্ল্ডের সবচেয়ে বড়ো বিচক্ষণ উপাধিতে ভূষিত মানব কি করে বুঝলো না মেয়েটার দূর্বলতা? কি করে টের পেলো না তার অন্তরের খবর? প্রতিশোধের নেশায় সত্যিই কি তবে পুরোপুরিভাবে অন্ধত্ব বরণ করেছিল দ্য মাফিয়া শ্যাডো মনস্টার? আত্ম উপলব্ধিতে জর্জরিত রূঢ় মানব। পা গ ল প্রায় দশা তার। মোটা কন্ঠে কেবল আদেশ ছুঁড়ল!

“ গেট আউট!”

একটিমাত্র বাক্যব্যয়ে কাজ হলো। মিনিট খানেকের মধ্যেই ঘর হলো নিরব, জনমানবশূন্য। এবার বোধহয় নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলেন না মাফিয়া বিস্ট। তক্ষুনি উম্মাদের ন্যায় ছুটে এসে দুয়ার আটকালো ঘরের। অন্তঃকোণের অসহ্য যন্ত্রণায় একটানে গা থেকে একপ্রকার টেনেহিঁচড়ে খুললো নিজের পোশাকী আবরন। উম্মুক্ত হলো পেটানো দেহখানা! সুশ্রী মুখমণ্ডলে তার লেপ্টে গেল অপরাধবোধের বিশাল ছায়া। পাদু’টোতে রাজ্যসম ভার নিয়ে রূঢ় মানব গুনে গুনে এগিয়ে এলো মাহি'র বিছানার ধারে। মেয়েটার পাশে একটুখানি জায়গা। বসবে, না-কি বসবে না তা নিয়ে ইতস্তত রূঢ় মানব। ভঙ্গুর ভাবস্রোতে বারেবারে জিভ ঠেলছে গালে। মেয়েটার পানে চেয়ে আছে অপলক। এই মায়াবিনীর ওপরেই এতদিন পশুর ন্যায় অত্যাচার করেছে সে! কি করে মেয়েটার সম্মুখে দাঁড়াবে এ মুখ নিয়ে? ভঙ্গুর ভাবস্রোতে দোনোমোনো করতে করতে অচেতন মেয়েটার পাশে বসল মুগ্ধ। পা গ ল প্রায় দশায় চুলের গোড়া চুলকাতে লাগল অনবরত। বারবার জিভ ঠেলছে সে। বলতে চাইছে অনেককিছু। তবে কান্ড দেখো! অপরাধবোধের শেকলে আটকা পড়েছে রূঢ় মানবের কন্ঠস্বর। তবুও বোধহয় অস্ফুটে কোনমতে বেরুলো,

“ আমি-হ....আমি-হ!”

দ্য গ্রেট রুশদী কিংয়ের কন্ঠস্বর কম্পিত ! অদ্ভুতভাবে বাদামী চোখদুটোর কার্নিশদ্বয়দ্বয় চিকচিক করছে ল্যাম্পশেডের মৃদু আলোয়। মস্তিষ্কের কড়া অনুমতির অভাবে নিজ চিরচেনা খোলস পাল্টাতে অপারগ মাফিয়া বিস্ট। নিষ্পলক ভঙ্গিতে তাকিয়ে আছে অচেতন মানবীর পানে। চোখদুটো ক্রমশ ভরে আসছে তার। আশ্চর্য! মাফিয়াদের কাঁদতে নেই। দ্য গ্রেট রুশদী কিংয়ের তো আরও আগে নেই। মুগ্ধ তক্ষুনি নজর ঘোরালো অন্যত্র। নিশ্বাস নিতে না পারার কষ্টে মুখ হা করে রাখল কিয়তক্ষন। গলার উঁচু হাড়খানা সামান্য নাড়িয়ে চাড়িয়ে ঢোক গিলছে মুগ্ধ। ধীরলয়ে ফের তাকাল মেয়েটার পানে। তার শক্ত হাতের রুক্ষ তর্জনীখানা আলগোছে বাড়িয়ে দিলো সে। ছুঁয়ে দিলো রমণীর তুলতুলে গাল। মুহুর্তেই রূঢ় মানবের সুদর্শন মুখাবয়বে অস্তিত্ব ফুটল এক অভিন্ন আত্মগ্লানির। নাকের পাটা ফুলছে বেশ। কন্ঠে ভারী ভঙ্গুর ভাবস্রোত!

“ আমি-হ বোধহয় আর মানুষ হলাম না সিগনোরা! বোধহয় আর ২য় বার মানুষ হলাম না। দ্য গ্রেট রুশদী কিং ওরফে দ্য শ্যাডো মনস্টার হতে গিয়ে আমি বোধহয় ভুলেই গিয়েছি সিগনোরা — আমার গায়ে মানুষের খোলস রয়েছে। অধীর রায়ের নামের সঙ্গে যে-ই মনস্টার নামক পদবীটা লেগেছে, তা হয়তো এখন আমার ব্যাক্তিত্বে মিশে গেছে সিগনোরা। দেখ... আমি হয়তো সত্যি সত্যি মানুষরূপী রাক্ষস হয়ে গিয়েছি! নয়তো একটা সাধারণ মানুষ থোড়াই একটাদিন মানুষের র**ক্তের ঘ্রাণ, স্পর্শ না পেলে পা গ ল হয়?”

থামল মুগ্ধ! একমুহূর্ত স্থবির থেকে আচমকা অচেতন মানবীকে হেঁচকা টানে টেনে নিলো নিজ বুক পিঞ্জরের মধ্যিখানে। বাহুবন্ধনের সস্নেহ পরশে একপ্রকার দুমড়েমুচড়ে দিচ্ছে ঘুমন্ত রমণীকে। নিজ রুক্ষ অধরযুগলের শুকনো স্পর্শে ভরাচ্ছে মাহি'র মাথার অগ্রভাগ। চোখের কোটর বেয়ে ততক্ষণে টুপ করে নিঃশব্দে গড়িয়ে পড়ল একফোঁটা নোনাজল! তা গিয়ে গড়ালো রমণীর তুলতুলে কপোলে। রূঢ় মানব হুট করেই দৃষ্টি ফেলল অদূরের দেয়ালে টানানো মায়ের ছবির পানে। এবারে চোখদুটোতে আর বাঁধ সইলো না তার। নিজ চিরচেনা খোলস ভুলে গিয়ে চিৎকার করে শুধালো,

“ আম্মাআআআআ! ও আম্মাআআআ! কি বানিয়ে দিয়ে গেলেন আমায় আম্মা? কেন বানালেন এমন জানোয়ার? কিভাবে হলাম এতটা পশু? আপনার প্রতিশোধ নিতে গিয়ে আবারও হারতে বসেছি আমি আম্মা! দেখেন কি করেছি আমি! হৃদয় যাকে চেয়েছে, মস্তিষ্ক তাকে আঘাত করতে বলেছে! আমি জানোয়ার আম্মা, জানোয়ারের ন্যায় দুমড়েমুচড়ে দিয়েছি আমার অনুভুতিকে। আমার পিচ্চিকে!”

কাঁদছে মুগ্ধ! একদম অচেনা মানবের ন্যায়। কি করুণ সে কন্ঠ। দু'হাতের আলতো ছোঁয়ায় আবারও ঘুমন্ত মাহি'কে টেনে আনলো মুখের সম্মুখে। মুখপানে অপলক তাকিয়ে থেকে অধর ছোঁয়াল মেয়েটার ফ্যাকাশে ললাটে। কাঁদতে কাঁদতে আবারও আওড়াল,

“ আমি নিষ্ঠুর, নিকৃষ্ট, রূঢ় তা আমি জানি! আমি হৃদয়ের কথা শুনতে অপারগ, তা আমি জানি! আমি ভীষণ খারাপ পিচ্চি। আমি ভীষণ খারাপ! বাট ট্রাস্ট মি, এই আমি নামক খারাপ মানুষটার সকল নিষ্ঠুরতা, নিকৃষ্টতা, হিং স্রতার অবসান — একমাত্র তোর সন্নিকটে এলেই হয়। একমাত্র তোর সন্নিকটে! আ'ই উইশ...তুই কোনোদিন আমার না বলা কথাগুলো বুঝতি।”

চলবে....

#মির্জা_সায়ান_মুগ্ধ — পর্বঃ৫৩(খ)

#jannatul_firdaus_mithila

“ আ'ই উইশ...তুই যদি কোনোদিন আমার না বলা কথাগুলো বুঝতি।”

আত্মগ্লানির হাহাকারে ভঙ্গুর রূঢ় মানবের কন্ঠস্বর। ভারী হয়েছে বাদামী চোখদুটোর পর্দা। লালিমা ছেয়েছে সুদর্শন গম্ভীর মুখাবয়বে। রুক্ষ অধরযুগল তার ঠায় ছুঁয়ে রাখা সপ্তদশীর মসৃণ ললাটতটে। তা সরানোর খুব একটা তাড়া নেই মুগ্ধের। চোখদুটো নিরবে ঝরাচ্ছে অশ্রু! সপ্তদশীর উষ্ণ গা, জ্বরের তাপমাত্রা বাড়ছে ক্রমশ। সে-ই উষ্ণতায় জ্বলছে রূঢ় মানবের লোমহীন উম্মুক্ত বক্ষভাজ। মুগ্ধ নড়ল খানিক। অচেতন মানবীর ললাটতট হতে আলতো করে সরিয়ে আনলো নিজ রুক্ষ অধরযুগল। অতঃপর ধীরলয়ে মেয়েটাকে ফের শোয়ালো মখমলি বিছানার কোলে। স্থবির বনে তাকিয়ে আছে মুগ্ধ। অনিমেষ দৃষ্টে দেখছে মাহি'কে। সে বেশ টের পাচ্ছে তার বুক কাঁপছে! বুকের খাঁচায় লুকায়িত অঙ্গটা ভীষণ লাফাচ্ছে। সুদীর্ঘ কন্ঠনালীর অভ্যন্তরে চাপ বসেছে মনে হচ্ছে। মুগ্ধ কপাল গোছালো। নিরব যন্ত্রণায় মুখখানা কুঁচকে নিয়ে হাত উঁচিয়ে রাখল নিজ উম্মুক্ত বক্ষের বাঁপাশে। সেথায় অনবরত হাত ডলতে ডলতে, রুক্ষ অধরযুগলের মধ্যকার দুরত্ব বাড়াল মুগ্ধ। নিঃশ্বাস টানলো অগোছালো ভঙ্গিতে। অস্থিরতার চূড়ান্ত শিখরে পোঁছাতেই হুট করে মস্তিষ্কে টনক নড়ল তার। ত্বরিত বেগে ঘাড় বাকিয়ে তাকাল অচেতন মাহি'র ফ্যাকাশে মুখপানে। জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে মেয়েটার। তার কষ্ট হচ্ছে নিশ্চয়ই! এহেন ভাবাবেগে তক্ষুনি বসা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় মুগ্ধ। ব্যাকুল পদক্ষেপে ছুটে যায় ঘর সংলগ্ন ওয়াশরুমে।

★

দেয়ালঘেঁষা ঘড়ির কাঁটায় ঢংঢং শব্দ বাজছে আবারও। জানান দিচ্ছে রাত্রির শেষ প্রহর শেষ হবার বার্তা। একজোড়া শক্তপোক্ত হাত বেগতিক জ্বরে কুপোকাত মাহি'র সেবাশুশ্রূষায় ব্যস্ত। বারেবারে উদ্বেগী কায়দায় ঘন্টা খানেক পেরুলেই পরোখ করছে থার্মোমিটারের পারদ। সপ্তদশীর মসৃণ ললাটে একখানা সফেদ রঙা পাতলা পট্টি ছড়িয়ে রাখা। সামান্য উষ্ণ হলেই তা বিরতিহীন ভঙ্গিতে বারংবার নতুন পানিতে ভিজিয়ে ফের রমণীর উষ্ণ ললাটে ছড়িয়ে দিচ্ছে মুগ্ধ। নিজ রুক্ষ হাতের অমসৃণ তালু দিয়ে ধীরলয়ে মালিশ করছে মেয়েটার শীতল পাদু’টোর তালু। মাঝেমধ্যে স্পঞ্জ বাথের ন্যায় টুকটাক মুছিয়ে দিচ্ছে রমণীর সুদীর্ঘ কোমল কন্ঠদেশ।

রাত প্রায় শেষ হলো বলে। আরেকটু পরেই বোধহয় পূব আকাশে দেখা মিলবে দিনের একফালি আলোর! অথচ রূঢ় মানবের চোখদুটোর পাতা আজ বড্ড অনড়। সেথায় ঘুমের লেশমাত্রও নেই, রয়েছে কেবল এক আকাশসম উদ্বিগ্নতা। রমণীর পদতলে হাত ঠেকিয়ে, হালকা ধূলোপড়া মেঝেতে আসন পেতে বসে আছে মুগ্ধ। মালিশ করছে মাহি'র পা। তন্মধ্যে উদ্বেগী কায়দায় খানিকটা ঝুঁকে এসে পরোখ করল থার্মোমিটারের পারদ। ওমনি তার বাজপাখির ন্যায় তীক্ষ্ণ দৃষ্টিযুগলে ধরা পড়ল সপ্তদশীর বর্তমান দৈহিক তাপমাত্রা! জ্বর নেই আর। কমেছে বড্ড ধীরলয়ে। তক্ষুনি বুক ফুলিয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে রূঢ় মানব। দৃষ্টিতে নামায় একরাশ প্রশান্তির ছাপ। অন্তঃকোণে শীতলতার ঢেউ বইছে তার।পরম স্বস্তিতে খানিকটা ঝুঁকে এসে আচমকা দু'হাতে আঁকড়ে ধরে অচেতন মানবীর কোমল উদরদেশ। পরপরই সেথায় আলগোছে গুঁজে দেয় নিজ প্রকাণ্ড মস্তক। নাক ডোবায় সপ্তদশীর নাভিকমল অঞ্চলে। একইরকম ভঙ্গিমা ধরে রেখে বারকয়েক জোরালো নিঃশ্বাস টানল মুগ্ধ। আলতো স্বরে আওড়াল,

“ ওয়েক আপ সিগনোরা! আই ডোন্ট নো হোয়াই, আ'ম ফিলিং লো উইদাউট ইউ্য।”

ঘুমন্ত মাহি'র কর্ণকুহর অব্ধি পৌঁছায়নি রূঢ় মানবের এহেন ভনিতা হীন স্বীকারোক্তি। পৌঁছালে বোধহয় থমকাতো নিশ্চিত। এদিকে, মেয়েটার নরম তুলতুলে উদরে মুখ গুঁজতেই আবেশে চোখদুটো বুঁজে এলো মুগ্ধের। সারারাত নির্ঘুম কাটানোর ফলপ্রসূ হিসেবে চোখদুটোর পাতা হলো ভারী। আপনাআপনি ধরা দিতে চাইলো ঘুম। একটুকরো শান্তির ঘুম! তবে মুগ্ধ মহাশয় সেসবে তোয়াক্কা দিলো না। নির্ঘুমে জড়িয়ে রাখল মেয়েটার উদর।

________________________________________

বড্ড দূর থেকে ভেসে আসছে পাখিদের কিচিরমিচির শব্দ! কানের কাছে খুটখুট করছে কি যেন একটা। এহেন উদ্ভট পরিস্থিতিতে গাঢ় ঘুমটা কেমন হালকা হয়ে গেল মাহি'র। মসৃণ ললাটের চামড়ায় হুট করেই দৃশ্যমান হলো গোটাকতক ভাঁজের ছাপ। নড়চড় বাড়ল ক্লান্তিতে মুদে থাকা ক্ষুদ্র বদনখানিতে। ওমনি রমণী টের পেলো তার ক্ষুদ্র বদন আটঁকা পড়েছে কোনো এক দৈবাৎ শক্তির জোরালো বাঁধনে। মাহি নড়ল টুকটাক। ছাড়াতে চাইলো নিজেকে। কিন্তু বালাইষাট! অদেখা বাঁধনটা এতো দৃঢ়! তৎক্ষনাৎ ঘুম বিজড়িত চোখদুটো একপ্রকার টেনেহিঁচড়ে খুললো সপ্তদশী। ধীরলয়ে দৃষ্টি ফেলল এদিক-ওদিক। পরক্ষণেই ভর দিলো দু'হাতের দূর্বল কনুইয়ে। ঘামে জবজবে শরীরখানা খানিকটা উঁচাতেই ভড়কায় মাহি। উদর পানে বলিষ্ঠ মানবকে ওমন আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে থাকতে দেখে বাকশূন্য মানবীর জিভের ডগা। হতবিহ্বলতার ছাপ ফুটলো মুখাবয়বে। ঘুমন্ত মস্তিষ্ক তখনো পরিপূর্ণ রূপে সজাগ হয়নি তার। বোকার ন্যায় আবারও বদনে নড়চড় চালাতেই হুঠাৎ তার উদর হতে মাথা তোলে মুগ্ধ। ক্লান্ত দুটো বাদামী চোখ পরপরই একযোগে নিক্ষেপ হলো সপ্তদশীর পানে। মাহি একমুহূর্ত স্থির রইল। হতভম্বতায় ডুবে থাকতেই মস্তিষ্ক হুট করে সজাগ হলো তার। একে একে মনে পড়ে গেল গতকাল রাতের সকল ঘটনা! ওমনি রমণী ঢোক গিললো। রূঢ় মানবের লাগামহীন হিং স্র কর্মকাণ্ডের শঙ্কায় কাঁপতে লাগলো কেমন। মুগ্ধের গভীর চোখদুটো নিরবে দেখল সব। দেখল মেয়েটার অদৃশ্য ভয়। তক্ষুনি ফের অপরাধবোধ বাড়ল রূঢ় মানবের। বুক চিঁড়ে বেরিয়ে এলো একখানা দীর্ঘ নিঃশ্বাস। দৃষ্টিতে শীতলতা নামিয়ে ভরাট কন্ঠে আওড়াল,

“ ইউ্য ডোন্ট হেভ টু বি আফ্রেইড সিগনোরা। আমি আপাতত কামড়াকামড়ি করব না।”

সহসা চিবুক নামালো মাহি। ভয়ের রেশ খানিকটা কমতেই টের পেলো রূঢ় মানবের শক্তপোক্ত হাতদুটোর জোরালো টান! তক্ষুনি বিস্ফোরিত দৃষ্টিতে সম্মুখে তাকায় মানবী। দেখে — মুগ্ধ তার শক্ত হাতদুটোর দৃঢ় বাঁধনে আবারও সস্নেহে আগলে নিচ্ছে তার মেদহীন উদর। শুকনো ঢোক গিলে মাহি। তড়িঘড়ি করে নিজেকে ছাড়ানোর বৃথা প্রয়াসে মত্ত হতেই আচানক শিকার হয় রূঢ় মানবের উদ্ভট কর্মকান্ডের। মুগ্ধ মুখ ডুবিয়েছে মেয়েটার উদরে। মাহি নড়তে চাইলেই বাড়াচ্ছে হাতের জোর। মানবী অতিষ্ঠ হলো এপর্যায়ে। অতিষ্ঠ কন্ঠে হুট করেই শুধালো,

“ কি হয়েছে আপনার?”

রূঢ় মানব তৎক্ষনাৎ প্রতুত্তর করেনি। উল্টো সরু নাকের ডগাটা আলগোছে ঘষে দিলো মেয়েটার নাভিকমল অঞ্চলে। তৎক্ষনাৎ সর্বাঙ্গ শিরশির করে উঠল ক্লান্ত রমণীর। অথচ সেদিকে বিন্দুমাত্র পাত্তা না দিয়ে, নিজ রুক্ষ অধরযুগল খানিক নাড়িয়ে চাড়িয়ে মুগ্ধ কেমন ভারী কন্ঠে শুধালো,

“ কিচ্ছু না।”

বোকা মানবীর অস্বস্তি বাড়ল এবার। মোচড়াতে লাগল ক্ষুদ্র বদনখানি। আমতা আমতা স্বরে আওড়াল,

“ ছাড়ুন তাহলে!”

“ ইচ্ছে করছে না।”

মুগ্ধের পরপর ছোট প্রতুত্তর। তা কর্ণধার হতেই সামান্য ঢোক গিললো মাহি। সৌজন্যতার খাতিরে আচমকা জিজ্ঞেস করল,

“ আপনি কি অসুস্থ?”

তক্ষুনি মাথা তোলে মুগ্ধ। ঘোলাটে দৃষ্টিযুগল মেয়েটার পানে তাক করে রেখে মুখের ওপর বলে বসল,

“ উঁহুম! অপেক্ষায় ক্লান্ত।”

বলিষ্ঠ পুরুষের কন্ঠস্বর অদ্ভুত শান্ত! সুশ্রী গৌরবর্ণ মুখখানায় সে-কি ক্লান্তির ছাপ। রমণীর নিখাঁদ দৃষ্টি হতে লুকোতে পারেনি তা। তাইতো পরপরই ভেসে এলো সপ্তদশীর পাল্টা প্রশ্ন!

“ কিসের অপেক্ষায়?”

অধরের কোণে আচমকা মৃদু হাসির টান বসল মুগ্ধের। দৃষ্টে নামল চাতকী তৃষ্ণা। কন্ঠনালীর নিখাঁদ সৌন্দর্যমণ্ডিত উঁচু হাড়খানা সামান্য নাড়িয়ে চাড়িয়ে, সে কেমন নির্মল কন্ঠে শুধালো,

“ যদি বলি তোর! তবে কি বিশ্বাস করবি?”

থমথমে ভাবভঙ্গি ফুটলো মাহি'র মুখাবয়বে। দৃষ্টি ঝুঁকে গেল আপনা-আপনি। কন্ঠে তাচ্ছিল্য ভর করল তার। সময় নিয়ে শুধালো,

“ কেনো? আবারও মে'রে -টে'রে বিছানায় শোয়ানোর ইচ্ছে হচ্ছে না-কি আপনার?”

অন্তঃকোণে সামান্য মোচড় ধরল মুগ্ধের। মোটা কন্ঠ ফুঁড়ে তার অজান্তেই বেরিয়ে গেল,

“ আমি কি শুধু মা'রি-ই তোকে ?”

রমণীর তাচ্ছিল্যের হাসি এবার রূপ টানলো প্রশস্ত কায়দায়। ক্লান্ত পরিশ্রান্ত স্বরে পরপরই প্রতুত্তর করল,

“ এখন পর্যন্ত আপনার কাছ থেকে মা'র, অপমান, হিং স্রতা ছাড়া আর কিছুই পাইনি অবশ্য!”

অভ্যন্তরে আহত হলো রূঢ় মানব। চোয়ালের পেশি হলো দৃঢ়। রমণীর কথায় ভুল নেই। তা বোধ হতেই বুকের মাঝে অদৃশ্য চাপ বাড়ল তার। ওদিকে, দূর্বল মানবী কোনমতে ওঠে বসার প্রয়াস চালাচ্ছে। তবে কান্ড দেখো! মাথাটা হুট করেই ঘোরাচ্ছে তার। দূর্বল বদনখানি টলমল হতেই সম্মুখ থেকে একজোড়া শক্তপোক্ত হাত এগিয়ে এসে আচমকা আগলে নিলো তাকে। মাহি স্থির! হতবাক দৃষ্টিজোড়া উঁচিয়ে তাকাতেই দৃশ্যমান হলো — সুদর্শনের গম্ভীর মুখ। গম্ভীর মুখে মেয়েটাকে সযত্নে উঠিয়ে বসাচ্ছে বিছানার হেডবোর্ডের সঙ্গে। মাহি রা করল না। বাধ্য মেয়ের ন্যায় চুপচাপ উঠে বসল বিছানায়। ততক্ষণে মেয়েটার পিঠের কাছে একখানা বালিশ টেনে দিয়েছে রূঢ় মানব। মাহি'র সর্বাত্মক আরাম নিশ্চিত করে গম্ভীর মুখে আচানক বলে উঠল,

“ আফসোস! তুই আমার সব দেখলি তবে অন্তর দেখলি না!”

সহসা ঘাড় বাঁকায় মাহি। ভ্রু উঁচিয়ে তাকায় সুদর্শনের পানে। মুগ্ধ গম্ভীর! তাকাচ্ছে না মেয়েটার দিকে। মাহি তখন শ্লেষাত্মক ভঙ্গিতে বলেই বসল,

“ মনস্টারদের অন্তর বলতে কিছু হয়না অধীর রায়।”

থমকায় মুগ্ধ! কপাল গোছায় পরক্ষণে। কথার সমীকরণে মেয়েটাকে বেঁধে ফেলতে শেষ বাক্যবাণ ছুঁড়ে মুহুর্ত ব্যয়ে।

“ বিউটির বিস্টের তো হয়!”

সহসা হতভম্বতার ঘোরে ডুবল মাহি। মস্তিষ্ক ব্যর্থ হলো রূঢ় মানবের ছোঁড়া বাক্যবাণের অর্থ বুঝতে। মুগ্ধ তীক্ষ্ণ দৃষ্টে দেখল রমণীর এহেন হতভম্বতা। গরম মুখে খানিকটা ঝুঁকে এসে কোনরূপ বলাকওয়া ছাড়াই আচানক রমণীর ক্ষত ওষ্ঠপুটের ওপর আলতো করে ছোঁয়াল নিজ অধর। এরূপ অতর্কিত কান্ডে আঁতকে উঠে মাহি। চোখদুটো তার বিস্ময়ে গোল গোল হয়ে গেল কেমন। মুখের সম্মুখে ঝুঁকে থাকা রূঢ় মানবের সুশ্রী মুখমণ্ডল পানে তাকিয়ে থাকতেই মুগ্ধ কেমন বাঁকা হেসে বলে ওঠে,

“ চাল চাল! তারাতাড়ি ওঠ বান্দীর.....”

আশ্চর্য! মানবীর মায়াবী চোখজোড়ার পানে দৃষ্টি আটকাতেই আচমকা বাকরুদ্ধ হলো মুগ্ধ। জিভের ডগায় “ বান্দীর মেয়ে ” ডাকটা এসেও বেরুচ্ছে না কেমন। রূঢ় মানব সময় নিলো। বোকা মাহি'র মলিন মুখখানায় খানিকক্ষণ দৃষ্টি বুলিয়ে হঠাৎ সন্দিগ্ধ গলায় বলে উঠল,

“ ইউ্য আর মাইন রাইট? সো ফ্রম নাউ ইউ আর — মনস্তার'স বান্দী! কিউট নাহ?”

মুখ কুঁচকায় মাহি। ঝাঁঝ দেখিয়ে মুখ ঘোরায় অন্যত্র। তা দেখে গালের ভাঁজে জিভ ঠেলল মুগ্ধ। মেয়েটার রাগান্বিত মুখশ্রীটা সময় নিয়ে বিমুগ্ধ হয়ে দেখল সে। এতক্ষণে বোধহয় ক্লান্তি কমলো তার। কমলো সকল অচেনা অস্থিরতা!

_________________________________________

“ হায় ভগবান! শুনলে শুনলে? কিরম অলক্ষুণে দানবীয় কান্ডখানা ঘটে গেলো শুনলে? তোমার দানব ভাগ্নেটা। হায় হায়! গত একরাতেই না-কি ঐ পুঁচকে মেয়েটার হাল বেহাল করে ছেড়েছে তোমার দানব ভাগ্নেটা! ভগবান জানে, কি এমন কান্ড সেরেছে যার জন্য পুরো একটারাত হুঁশ নেই বেচারির। শরীরে বাধিয়েছে ১০৩° জ্বর। কিছুক্ষণ আগে তিন তলায় গিয়েছিলাম বুঝলে? উঁকি ঝুঁকি দিয়ে দেখে এলাম পুঁচকে মেয়েটার অবস্থা। দেখলাম....”

একমুহূর্ত থামলেন সুদীপা রায়। তার কন্ঠে উপচে পড়া রাগ! মুখাবয়বে লেপ্টে আছে এক আকাশসম ঝাঁঝের ছাপ। দৃষ্টিতে আগুন ছড়িয়ে তাকিয়ে আছে স্বামীর পানে। বলে যাচ্ছেন কতকিছু! অথচ সেদিকে অপারগ হিমাংশু রায়। কব্জি অব্দি ডুবিয়ে রেখেছেন সুক্তের থালায়। চেটেপুটে খাচ্ছেন গরম গরম ভাতের সঙ্গে। তা বোধহয় আর সহ্য হলোনা কর্তাগিন্নির। রাগে গজগজ করতে করতে তক্ষুনি নজর ঘোরালেন এদিক-ওদিক। টেবিলের ওপর সগৌরবে দাঁড় করিয়ে রাখা কাঁচের ক'টা গ্লাস। কর্তাগিন্নির সকল রাগ গিয়ে উপচে পড়ল সেসব নির্জীবদের ওপর। ক্ষুব্ধ বাঘিনীর ন্যায় একহাতে একখানা গ্লাস খামচে ধরে তা ছুঁড়ে ফেলল মেঝেতে। মুহুর্তেই চিড়বিড় শব্দ তুলে কাঁচের গ্লাসটা চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে ছড়িয়ে গেল এদিক-ওদিক। এতক্ষণে স্ত্রীর পানে মনোযোগ টানলেন হিমাংশু রায়। মুখাবয়বে এক আকাশসম বিরক্তির ঝাঁঝ নিয়ে তাকালেন গজগজ করতে থাকা স্ত্রীর পানে। গোটালেন মসৃণ ললাটের চামড়া। মুখভর্তি ক'টা কটুবাক্য আওড়ানোর উদ্দেশ্যে অধরযুগল খানিক নাড়লেন হিমাংশু রায়,

“ সকাল সকাল পা গ ল হয়ে গিয়েছো তুমি? না-কি রাতের নে শা এখনো কাটেনি? কতবার করে বলেছি রাতের বেলা বেশি বেশি গিলতে না।”

তেঁতে উঠলেন সুদীপা রায়। তেলেবেগুনে ছ্যাৎ করে উঠার ন্যায় ঝাঁঝিয়ে বললেন,

“ মুখ সামলে কথা বলো নিরুর বাবা। আমি ততটুকুই গিলি যতটুকু হজম করতে পারি। তোমার খচ্চর নই আমি!”

কপাল কুঁচকে গেল হিমাংশু রায়। উদ্যোত হলেন আর-ও কিছু বলতে। তবে পথিমধ্যে বাঁধ সাধলেন গিন্নি। আগ বাড়িয়ে হড়বড়িয়ে বললেন,

“ শোনো নিরুর বাপ! তোমার ভাগ্নে অধীর কোনো সাধারণ মানুষ না, আমি নিশ্চিত ও একটা দানব। মেয়ে মানুষের ক্ষুধা থাকে না কার শুনি? কিন্তু কেউ তো তাদের ছিড়েখুঁড়ে দেয় না। তোমার ভাগ্নে কি করেছে জানো? আমি ঐ পুঁচকে মেয়েটার ঠোঁটগুলো দেখে এলাম। ইশশ্! দেখে মনে হলো — কেউ বোধহয় ছিড়েখুঁড়ে খেয়েছে বেচারির ঠোঁটদুটো। ভোর রাত্তিরে ডাক্তাররা বাড়ির পেছন দরজা দিয়ে যাবার সময় কানপেতে শুনলাম, ওরা সব কানাঘুঁষা করছে,

“ ঐটুকুন একটা মেয়ের সঙ্গে এতো রাফলি এসব না করলেই নয়!”

কথাটার মানে বুঝলে? মানে হচ্ছে তোমার ভাগ্নে....ছিহ!”

মুহুর্তেই বিরক্তির পারদ তরতর করে বেড়ে গেল হিমাংশু রায়ের। দাঁতের সনে পিষ্ট হলো দাঁত। কটমট শব্দ তুলে যে-ই না কিছু আওড়াবেন ওমনি তার আনমনে দৃষ্টি গিয়ে ঠেকল স্ত্রীর ঠিক পেছনে। যেথায় তিন হাত দুরত্বে সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে বলিষ্ঠদেহী রূঢ় মানব। ফর্সা পেটানো দেহখানায় আষ্টেপৃষ্ঠে আঁটকে আছে একখানা কালো রঙা হাতাকাটা ট্যাংক-টপ, সঙ্গে জুড়েছে ঘিয়ে-রঙা ঢিলেঢালা ট্রাউজার। হাতদুটো কেমন আত্ম-অহমিকায় গুঁজে আছে ট্রাউজারের পকেটে। ফলে ফুলেফেঁপে উঠেছে তার মাংসল বাহুদ্বয়! চোয়াল শক্ত তার, দৃষ্টি হয়েছে তীক্ষ্ণ। শক্ত মুখে নিরবে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুনছে সুদীপা রায়ের কর্কশ বাক্যালাপ। ভড়কান হিমাংশু রায়। তড়িঘড়ি করে নড়েচড়ে বসলেন নিজ আসনে। স্ত্রীকে চোখের ইশারায় বোঝালেন চুপ থাকতে। তবে বালাইষাট! সুদীপা রায় থামলেন না, উল্টো জোর গলায় চিড়বিড়িয়ে বললেন,

“ বলি অধীর কী আদৌও মানুষ? না-কি একটা দানব গো? আবার এই দানবের সঙ্গেই তুমি আমার মেয়ের বিয়ে দিতে চাইছো নিরুর বাবা? এতকিছুর পরও দানবটা একবার আমার মেয়েটাকে কাছে পেলে আস্ত রাখবে বলে মনে হচ্ছে তোমার?”

স্ত্রীর এহেন অদম্যতা দেখে তক্ষুনি শব্দ করে কপাল চাপড়ালেন হিমাংশু রায়। অস্ফুটে আওড়ালেন,

“ শেষ! এবার আমি নেই এসবে।”

ভ্রু গোটালেন কর্তাগিন্নি। সন্দিগ্ধতায় ফের খেঁকিয়ে বললেন,

“ আরে রাখো তোমার ইশারা-ইঙ্গিত! আগে বলো ঐ দানবটা আর কতদিন থাকবে এখানে? ভাবা যায়? কি পরিমাণ রাক্ষুসে শক্তির অধিকারী হলে একটা মেয়েকে ওভাবে পুরো এক রাতের জন্য অচেতন করে রাখতে পারে! আচ্ছা.. মেয়েটা আদৌও বাঁচবে তো?”

বসে থেকেই একপ্রকার লাফিয়ে উঠলেন হিমাংশু রায়। ভয়ার্ত দৃষ্টে তাকালেন স্ত্রীর পেছনে। আড়দৃষ্টে তা পরোখ হতেই কপাল গোছালেন কর্তাগিন্নি। চোয়াল নাড়িয়ে কিছু আওড়াবেন তার পূর্বেই পাদু’টো নাসারন্ধ্রের সরু ছিদ্রপথে প্রবেশ করল এক অচেনা মনোমুগ্ধকর পুরুষালী সুগন্ধির ঘ্রাণ। তৎক্ষনাৎ শীরঁদাড়া সোজা হয়ে গেল মধ্যবয়সীর। শঙ্কায় কেঁপে উঠল অন্তরাত্মা। তড়িঘড়ি করে তাকালেন স্বামীর মুখপানে। সন্দিগ্ধতায় অস্ফুটে জিজ্ঞেস করলেন,

“ আমার কেনো মনে হচ্ছে — অ-অধীর এখানেই আছে?”

ব্যতিব্যস্ত হিমাংশু রায়। ফোঁস করে নিশ্বাস ফেলে নিঃশব্দে মাথা নাড়ালেন ওপর নিচ। সহসা কাঁপতে লাগলেন সুদীপা রায়। বাকরুদ্ধ ভঙ্গিতে প্রস্তরখন্ডের ন্যায় দাঁড়িয়ে থাকতেই পেছন থেকে ভেসে এলো রূঢ় মানবের হিং স্র হুংকার!

“ আবে বান্দীর ছেলে হিমাংশু রায়! এখনো সময় আছে আপনার স্ত্রীকে সামলান। তার জিভ চলছে বড্ড! জানেনই তো, আমি আবার ভদ্র ছেলে। আমার বিষয়ে নাক গলানোর সুবাদে যারতার জিভ ধরে টেনে ছিঁ ড়ে নিয়ে আসতে পারি যেকোনো সময়। তাছাড়া আমি খুব ধৈর্য্যশীল! যেদিন আমার মেজাজ বিগড়াবে সেদিন আমার ধৈর্য্যের মাপদন্ড দেখাতে সবার আগে আপনার স্ত্রী নামক বান্দীর ঘরের বান্দীর মহিলার, ঘাড় ধরে এমন একটা ঘোরান দেবো না...! যেন সে ঘোরানিতে তার দেহ ছেড়ে ঘাড়টা মুহুর্তেই ছিটকে চলে আসে আমার পায়ের কাছে। বহুদিন হলো মানুষের মন্ডু দিয়ে ফুটবল খেলিনা। এবার নাহয় সে আক্ষেপটুকু মিটিয়ে নেব আপনার স্ত্রীকে দিয়ে।”

সর্বাঙ্গ কাঁপছে সুদীপা রায়ের। ঘেমে নেয়ে একাকার অবস্থা হয়েছে বদনটার। হিমাংশু রায় কুলুপ এঁটেছেন ঠোঁটের ডগায়। গম্ভীর করেছেন মুখ। ওদিকে মুগ্ধ সাপের ন্যায় হিসহিসিয়ে যাচ্ছে। চোয়ালের পেশি টানটান করে নিয়ে, শরীর ঘোরালো উল্টোপথে। দু'টো কদম সম্মুখে বাড়াতেই রূঢ় মানব করে বসলেন আরেক কান্ড! সহসা কোমরের পিঠে হাত নিয়ে গিয়ে বের করে আনলো নিজ ব ন্দু ক টা। অতঃপর উল্টো ঘুরে থেকেই কোনরূপ বাক্যব্যয়ে শ্যুট করল কর্তাগিন্নি ঠিক পায়ের সন্নিকটে। তক্ষুনি ভয়ে লাফিয়ে উঠলেন সুদীপা রায়। হাউমাউ করে চিৎকার জুড়ে লাফাতে লাফাতে পিছিয়ে গেলেন কয়েক কদম। রূঢ় মানব দাঁতে দাঁত চেপেছে। পরপর তিনবার শ্যুট করে থামল অবশেষে। সদ্য ফায়ার হওয়া বন্দুকটা সম্মুখে নিয়ে এসে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখতে লাগল মুগ্ধ। কর্কশ কন্ঠে গর্জে বলল,

“ আজকে শুধু ট্রেইলার দেখালাম। নেক্সট টাইম পুরো পিকচার দেখাবো। মাইন্ড ইট চুলপাকনা বান্দীর মহিলা!”

এহেন অভিনব কৌশলী আলটিমেটামে মুখ টিপে টিপে হাসছেন হিমাংশু রায়। তা অবশ্য স্ত্রীর অলক্ষ্যেে। মুগ্ধের দাম্ভিক কদম জোড়া ডাইনিং ছাড়তেই মহাশয় ঘুরে বসলেন। শ্লেষাত্মক ভঙ্গিতে তাকালেন কাঁপতে থাকা স্ত্রীর পানে। আওড়ালেন,

“ প্রাণের মায়া থাকলে জিভ সামলাও নিরুর মা। মাঝেমধ্যে কথা না বলেও অনেককিছু করা যায় বুঝলে?”

★

দূর্বল মাহি! মাথাটার ওপর যেন একমণ ওজনের ভার বসেছে কিছুর। সদ্য গোসল সেরে, এলোমেলো পায়ে কোনমতে বেরিয়েছে কক্ষ ছেড়ে। প্রশস্ত কাঠের বারান্দা, নিরবতায় ডুবে আছে চারপাশ। রমণী ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র চোখে তাকাচ্ছে এদিক-ওদিক। সুবিশাল চারকোণা বারান্দার একপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে সে। অপর প্রান্ত মানবশূন্য। কৌতুহলী মানবী পা বাড়াল বা-দিকে। কক্ষের কমতি নেই এখানে, তবে সবক'টাই তালাবদ্ধ! কৌতূহলী দৃষ্টিজোড়া সম্মুখে তাক রেখে, দূর্বল কদমে খানিকটা এগোতেই হুট করে কিছু একটার সনে পা বাঁধল রমণীর। আর ওমনি বেচারি হোঁচট খেলো সম্মুখে। পড়ে যাবে যাবে অবস্থা তার! ঠিক তখনি কোত্থেকে যেন একখানা শক্তপোক্ত হাত এসে বাজপাখির ন্যায় ছো মে'রে কোলে তুলে নিলো রমণীকে। ঘটনাপ্রবাহে দোদুল্যমান মাহি'র নরম পদযুগল! হকচকিয়ে ঘাড় উঁচিয়ে সম্মুখে তাকাতেই দৃশ্যমান হলো — সুপরিচিত সুদর্শন মুখাবয়বটি। তৎক্ষনাৎ দাঁত খিঁচল মাহি। অকৃতজ্ঞের ন্যায় ঝাঁঝ দেখিয়ে আওড়াল,

“ কথায় কথায় কোলে তোলেন কেনো? রাশিয়ান দৈত্য একটা!”

অধর কোণে দাঁত বসায় মুগ্ধ। বাঁকা হাসল নিরবে। রমণীর রাগান্বিত পেলব মুখখানায় তীক্ষ্ণ দৃষ্টি লেপ্টে রেখে পরপরই প্রতুত্তর করল —

“ কথায় কথায় শুকনো মাটিতে হোঁচট খাস কেনো? বাংলাদেশী দেড়ব্যাটারী একটা!”

মুখ কুঁচকায় মাহি! উচ্চতার খোঁটা সহ্য হলোনা তার। চিড়বিড়িয়ে বলে উঠল,

“ হোঁচট খেলে খেয়েছি! তাতে আপনার কী? পড়ে যেতে দিতেন!”

“ এতো সহজ? আমি থাকতে আমার সিগনোরা মাটিতে হোঁচট খাবে? নাহ! আমি বেঁচে থাকতে তা হতে দিচ্ছি না মনস্তার'স বান্দী।”

কপাল গোছালো মাহি। পরক্ষণেই দাঁতে দাঁত চাপলো বেশ। কন্ঠে অনমনীয়তা ঢেলে আরও কিছু আওড়াতেই যাবে ওমনি বিপরীত বারান্দা হতে ভেসে এলো এক বাচ্চার উৎফুল্ল কন্ঠস্বর!

“ বাবা!”

তৎক্ষনাৎ ঘাড় বাকিয়ে ডাকের উৎসের পানে তাকায় মাহি। অদূর থেকে তাদের নিকট ছুটে আসছে এক বাচ্চা ছেলে। বয়স কত হবে? বড়জোর ৪ অথবা ৫। যার কণ্ঠে ধ্বনিত হচ্ছে কেবল একটাই ডাক!

“ বাবা!”

হতবুদ্ধির ন্যায় ভাব ধরল মাহি। হতবাক নেত্রে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল মুগ্ধের পানে। মুগ্ধ কেমন শক্ত মুখে তাকিয়ে আছে ছুটে আসা বাচ্চাটার পানে। তার মুখো অভিব্যাক্তি ধরাছোঁয়ার বাইরে। রেগে আছে, না-কি স্বাভাবিক রয়েছে তা বোঝা বড় দায়। মাহি'র হতবাকতা বাড়ল বেশ। হতবাক কন্ঠফুঁড়ে অস্ফুটে বেরিয়ে এলো —

“ আপনার বাচ্চাও আছে?”

চলবে......

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৫৩তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন