ফন্ট সাইজ:
থিম:
মির্জা সায়ান মুগ্ধ

৫৫তম পর্ব

লেখক: জান্নাতুল ফেরদৌস মিথিলা

#মির্জা_সায়ান_মুগ্ধ — পর্বঃ৫৫(ক)

#jannatul_firdaus_mithila

⛔ 17+ Alert ⛔

“ বাড়িতে জায়গার অভাব পড়েছে আপনার মতো পাড়ার কুচুটে মহিলার? আমার ঘরে কি করব না করব, ওপেনলি করব না আঁটকে করব, তা বলার আপনি কোন ভেড়ার বা*ল? যাক কষ্ট করে এসেছেন যখন কাছে আসেন। আমি এখন ফুল মুডে আছি, আপনার সামনেই নাহয় রঙ্গলিলাটা শুরু করি। এতে অনেককিছু লাইভ শিখতে পারবেন আপনি। বুড়ো বয়সে কাজে দিবে! এটলিস্ট ভীমরতি বাড়বে।”

সহসা জিভের তলায় দাঁত চলে গেল মধ্যবয়সী সুদীপা রায়ের। বেয়াদব ছেলেটার ওমন বেফাঁস কথাবার্তায় বিরক্তিতে কুঁচকে নিলেন মুখ। চোয়ালের পেশি টানটান করে নিয়ে তক্ষুনি দাঁত কিড়মিড়িয়ে শুধালেন,

“ ছিহঃ ছিহঃ ছিহঃ শেষমেশ জমিদার বাড়ির সে-কি দূর্ভাগ্য এলো! এভাবে খুল্লাম খুল্লাম নোংরামো করতে একটুও বাধছেনা তোমাদের?”

লজ্জায় বাকরুদ্ধ মাহি! আলগোছে নামিয়ে নিয়েছে চিবুক। যুবকের কোল থেকে নামার বৃথা প্রয়াসে খানিকটা মত্ত হতেই হাতের বাঁধন গাঢ় করলেন রূঢ় মানব। কাপড়ের পাতলা আবরণের ওপর দিয়েই খামচে ধরলেন রমণীর নরম উরুর ত্বক। সহসা মৃদু ব্যথার জেরে মুখ বিকৃত হলো সপ্তদশীর। কন্ঠ ফুঁড়ে অস্ফুটে বেরিয়ে এলো একটুখানি ব্যথাতুর ধ্বনি!

“ উহঃ!”

মুগ্ধ প্রতিক্রিয়াহীন! বাদামী চোখদুটোতে নামিয়েছে একরাশ প্রগাঢ়তা। রমণীর পেলব মুখখানার পানে অটুট দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে, বলিষ্ঠ ডানহাতটা আলগোছে উঠিয়ে আনলো রমণীর নরম ঘাড়ের ত্বকে। সেথায় এবার আলতো চাপ প্রয়োগ করছে রূঢ় মানব। ধীরলয়ে নিজ সুশ্রী মুখমণ্ডলের অত্যন্ত সন্নিকটে টেনে আনছে রমণীর পেলব মুখখানা। অথচ সপ্তদশী বড্ড চঞ্চলা! যুবকের লাগামহীন কর্মকাণ্ডের পূর্বাভাস পেয়ে, হরিণী চোখদুটোয় ঘৃণার প্রকট ছাপ ফুটিয়ে চিড়বিড়িয়ে চাপা কন্ঠে আওড়াল —

“ এতটা নির্লজ্জ হবেন না বিস্ট! আপনার লজ্জা না থাকতে পারে, তবে আমার রয়েছে!”

তক্ষুনি অধর কামড়ে বাঁকা হাসলো মুগ্ধ। মাহি'র ক্ষুদ্র মুখখানা বড্ড কাছে টেনে এনে চোখে রাখল চোখ। তার রুক্ষ অধরযুগল ছুঁই ছুঁই সপ্তদশীর তুলতুলে ওষ্ঠপুট! ভাবস্রোতে খানিক দুষ্টুমি লেপ্টে পরপরই গমগমে গলায় আওড়াল —

“ আপাতত তোর সকল লাজ-লজ্জা গরম পানিতে ফুটিয়ে, ঠান্ডা করে ঢকঢক করে গিলে নে পিচ্চি! কজ আমি এখন আরো নির্লজ্জ হবো।”

মুখাবয়বে বোধগম্যহীনতার ছাপ ফুটলো মাহি'র। ভ্রু যুগল খানিকটা কুঞ্চিত হতেই অধর বরাবর অতর্কিত আক্রমণ বসালেন নির্লজ্জ মাফিয়া বিস্ট। রমণীর তুলতুলে ওষ্ঠপুটে বেগতিক আশ্লেষী ভঙ্গিতে আধিপত্য বিস্তারে মত্ত হলেন তিনি। রমণী হতভম্ব! সে-ই সঙ্গে লজ্জিত বড্ড। ওষ্ঠপুটে চলমান আগ্রাসী হামলায় গা সইতে না সইতেই তার ক্ষুদ্র বদনে লেপ্টে গেলো রূঢ় মানবের শক্তপোক্ত বাহাতের বেপরোয়া স্পর্শ! তক্ষুনি নিঃশ্বাস আঁটকে যাবার উপক্রম মাহি'র। চোখদুটো খিঁচে নিয়েছে একপ্রকার। নরম হাতদুটোর মখমলি আঙুলের ডগাগুলো ততক্ষণে দেবে গিয়েছে বলিষ্ঠের রুক্ষ বক্ষভাঁজে। বসাচ্ছে নিজেদের নখর চিহ্ন! অথচ সেদিকে ভ্রুক্ষেপহীন মুগ্ধ। ডানহাতের রুক্ষ তালুতে রমণীর তুলতুলে ঘাড়ের পেশী আঁটকে রেখে, বাহাতের উৎকট স্পর্শে ভেঙ্গে দিচ্ছে রমণীর ক্ষুদ্র লাজের দরজা। মাহি দূর্বল হচ্ছে ক্রমশ! যুদ্ধে পরাস্ত সৈনিকের তকমা পাবার পূর্বে বীরাঙ্গনার ন্যায় ফের মোচড়ে উঠল রমণী। বলিষ্ঠের শক্ত বাঁধনে আঁটকে থেকেও ডানা ঝাঁপটালো বারকয়েক। রমণীর এরূপ ব্যর্থ প্রয়াস উপলব্ধ হতেই চুম্বনের নিবিড়তা বাড়ালেন অভদ্র মাফিয়া বিস্ট। বাড়ালেন রুক্ষ হাতের বেপরোয়া স্পর্শের গভীরতা।

ওদিকে দু - কপোত-কপোতীর এহেন বেলাজা কর্মকাণ্ড দেখে নাকমুখ কুঁচকে বসেছেন সুদীপা রায়। তড়িঘড়ি করে মুখ লুকোলেন শাড়ির আঁচলে। মুখাবয়বে চরম মাত্রার অসন্তোষ্টির ছাপ ফুটিয়ে মুখ ঝামটি দিয়ে সরে গেলেন দুয়ারের কাছ থেকে। পা চালাতে চালাতে দাঁত খিঁচে আওড়ালেন,

“ নষ্ট ছেলে কোথাকার! অথচ এর গায়ে নাকি রাশিয়ার ওতো বড়ো মানুষটার র ক্ত বইছে!”

★

চুম্বনের দীর্ঘ আবেশ কাটিয়ে সদ্য অধরযুগল বিচ্ছিন্ন করলেন সুদর্শন। পরপরই মিলন ঘটালেন সপ্তদশীর নিবুনিবু আঁখিদ্বয়ের সনে। দূর্বল রমণী ভীত! সামান্য গভীর চুম্বনের আবেশে কুণ্ঠিত। বদন কাঁপছে ক্ষণে ক্ষণে! মুগ্ধ আলতো হাসলো বোধহয়। দাঁত বসালো নিম্নাংশের অধরকোণে। ধীরলয়ে রমণীর তুলতুলে ঘাড়ের ত্বক হতে গড়িয়ে নামছে রূঢ় মানবের রুক্ষ আঙুলগুলো। মুহুর্তব্যয়ে তারা আঁচানক ছুঁয়ে দিলো মাহি'র তিরতির করে কাঁপতে থাকা সিক্ত ওষ্ঠপুট। জখমের ওপর জখম পড়ায় দাগ বসেছে সেথায়। তাজা লহুর ক্ষীণতম উপস্থিতি স্পষ্ট! যুবকের রুক্ষ বৃদ্ধা আঙুলখানা আলতো করে ঘষে দিলো জায়গাটুকু। হুটহাট ব্যথার উপশমে মুহুর্তেই রমণীর ঠোঁটের ফাঁক গলিয়ে অস্ফুটে বেরিয়ে এলো ব্যথাতুর ধ্বনি! যুবক মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় শুনলো শব্দটুকু। গভীর দৃষ্টে অপলকভাবে তাকিয়ে রইলো মেয়েটার আহত ওষ্ঠপুট পানে। কন্ঠে ব্যাপক শান্ত ভাব ঢেলে শুধালো,

“ আমি বড়ো বিধ্বংসী পিচ্চি! যার সন্নিকটে এলে বিধ্বস্ত হওয়াটা বড্ড স্বাভাবিক!”

অশ্রুসজল চোখদুটো রমণীর! নত হয়ে আছে সে-ই কখন থেকে। যুবকের বোধহয় ইচ্ছে হলো রমণীর ছলছলে চোখদুটোয় ডুব দিতে। যার ভাবাবেগে সে তৎক্ষনাৎ আঁকড়ে ধরল মাহি'র নরম সরম চোয়ালখানা। মুহুর্তেই জমে গেল মাহি! নাকের পাটা ফুলিয়ে একত্রিত করল নিজ ঘোলাটে দৃষ্টিজোড়া। নির্দয়ের মুখ অভিব্যক্তি তক্ষুনি রং পাল্টালো। এক অদৃশ্য আধিপত্যের জানান দিয়ে ফের হিসহিসিয়ে আওড়াল,

“ আমি বড্ড রূঢ় সিগনোরা। ভীষণ খারাপ আমি! একটুখানি ছুঁয়ে দিলে তীব্র ব্যথায় জর্জরিত যে হতেই হবে! বাট ডোন্ট ওয়ারি মা'ই গার্ল, যতবার আমার স্পর্শে তোর বদনে ক্ষত হবে, ঠিক ততবার তোর ঐ ক্ষততে মলম হিসেবে নাহয় আমি লেপ্টে যাবো।”

সহসা ফুপিয়ে ওঠে মাহি! অন্তঃকোণের উদ্ভট বেয়াদবির রেশে আঁটকা পড়ে, সদ্য কর্তিত লাউলতার ডগার ন্যায় মুষড়ে পড়ল রূঢ় মানবের রোমহীন প্রশস্ত বক্ষে। সহসা ঢুলে পড়া দূর্বল মানবীকে বলিষ্ঠ দু'হাতের দৃঢ়বন্ধনে আগলে নেয় লোকমুখে চর্চিত হার্টলেস মাফিয়া বিস্ট! আঁটকে নেয় নিজ রুক্ষ বক্ষপিঞ্জরে। নিষ্পাপ রমণী অশ্রু বিসর্জনে মত্ত! কেঁদেকুটে ভাসাচ্ছে রূঢ় মানবের লোমহীন উম্মুক্ত বুক। মুগ্ধ থামালো না মেয়েটাকে। উল্টো আলগোছে জড়িয়ে রাখলো নিজের সনে। কাঁদতে কাঁদতে হেঁচকি তোলবার যোগাড় হয়েছে মাহি'র। তা টের পেতেই যুবকের উদ্বিগ্নতা বাড়ল বোধহয়। সে তড়িঘড়ি করে হাত উঠিয়ে আনলো ক্রন্দনরত রমণীর মাথার ওপর। উদ্বিগ্ন ভারী কন্ঠে আওড়াল,

“ হুঁশ! কাঁদে না। নয়তো মাথাব্যথা করবে। আমি এখন ফুল মুডে আছি সিগনোরা! এক্ষুণি একটু-আধটু হ্যাংকি-প্যাংকি করতে না পারলে শান্তি হচ্ছে না আমার! তাই এখনি কাঁদিস না। কান্নাটুকু জমিয়ে রাখ, আরেকটু পর এমনিতেই কাঁদতে হবে।”

তৎক্ষনাৎ কান্নার বেগ বেড়ে গেল সপ্তদশীর। রূঢ় মানবের বলিষ্ঠ হাতদুটো গা থেকে সরানোর প্রয়াসে ক্ষুদ্র বদনে তুললো ঝংকার। কিন্তু বালাইষাট! লোকটার ইস্পাত-দৃঢ় হাতদুটো থোড়াই নড়ল জায়গা থেকে। মাহি অতিষ্ঠ এপর্যায়ে। নাক টেনে টেনে ঝাঁঝিয়ে আওড়াল,

“ হাত সরান আমার গা থেকে!”

কথাটা মোটেও কানে তোলেনি মুগ্ধ। উল্টো নরম তালে আকিঁবুকিঁ চালাতে লাগল মাহি'র মাথার ওপর। বোকা মানবী শান্ত হতে গিয়েও হচ্ছে না যেন। নাক ফুলিয়ে মোটা কন্ঠে ফের বলে বসল,

“ ছাড়ুন আমায়।”

সহসা গালের ভাঁজে জিভ ঠেলল মুগ্ধ। একমুহূর্ত মৌন থেকে পরক্ষণেই গমগমে গলায় শুধালো,

“ তুই কি জানিস? তুই রেগে তোকে ঠিক কতটা হট এন্ড সে ক সি লাগে? এ্যাই ওয়েট ওয়েট! এটা আগেভাগে টের পেয়েই কি তুই আমায় সিডিউস করতে চাচ্ছিস পিচ্চি?”

ত্বরিত নাকমুখ কুঁচকে গেল মাহি'র। ঝাঁঝ ছড়িয়ে গেল ক্ষুদ্র পেলব মুখখানায়। তিতিবিরক্ত মেজাজে তেতোঁ কন্ঠে পরপরই শুধালো,

“ ছিহঃ!”

“ ষিহ!”

রমণীর কথার পিঠে ব্যাঙ্গাত্মক স্বর আওড়াল রূঢ় মানব। দাঁত পিষে হাসল পরক্ষণেই। রয়েসয়ে ভরাট কন্ঠে বলে উঠল,

“ চল সিগনোরা!”

অবোধ মাহি! ভ্রুযুগল অলক্ষ্যে কুঁচকে নিয়ে পাল্টা প্রশ্ন ছুড়েঁ সপ্তদশী,

“ কোথায়?”

বাঁকা হাসে মুগ্ধ। ধীরলয়ে শক্তপোক্ত হাতখানা নামিয়ে আনে মেয়েটার মেদহীন বাঁকানো কোমর বরাবর। সেথায় খানিক রুষ্ট চাপ বসিয়ে হুট করেই দুষ্ট কন্ঠে শুধালো,

“ বেড কাঁপাতে!”

বোধগম্যহীনের ন্যায় ঠোঁট উল্টায় মাহি। বোকাসোকা ভাবভঙ্গিমায় ধীরলয়ে মাথাটা সামান্য উঁচিয়ে দৃষ্টি তাক করল মুগ্ধের পানে। হতভম্ব কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,

“ মানে?”

তৎক্ষনাৎ প্রতুত্তর করেনি মুগ্ধ। নির্বিকার ভঙ্গিতে তাকিয়ে রইলো খানিকক্ষণ। বোকা রমণীর উৎসুক দৃষ্টিজোড়া তার পানে নিবদ্ধ। বোধহয় কাঙ্ক্ষিত উত্তরের অপেক্ষায়! মুগ্ধ আলগোছে জিভ ঠেলে অধর ভেজালো। দৃষ্টিজোড়া সরু করে নিয়ে জিজ্ঞেস করল,

“ বুঝিসনি?”

নির্বোধের ন্যায় দু'ধারে মাথা নাড়ায় মাহি। তা দেখে জনাবের দুষ্টুভঙ্গিমা বাড়ল বোধহয়। তৎক্ষনাৎ বিজ্ঞের ন্যায় অভিব্যক্তি ধরে রেখে শুধালো,

“ ওয়েট! লেট মি শো ইউ।”

উত্তর জানতে বড্ড আগ্রহী মাহি! কৌতুহলী চোখদুটো মানবের পানে নিবদ্ধ। এরইমধ্যে নিজ বলিষ্ঠ হাতদুটো সম্মুখে নিয়ে আসে মুগ্ধ। রমণীকে দেখিয়ে দেখিয়ে বাহাতের বৃদ্ধা এবং তর্জনীর সাহায্যে একখানা গোলাকৃতি বানিয়ে, অপর হাতের মধ্যমা তাক করল তাতে। মুহুর্তের কৌশলে ইঙ্গিত দেখালো বাজে কিছুর! ওমনি বিস্ফোরিত রূপ ধরল মাহি'র চোখদুটো। বিষিয়ে গেল মন। ঘৃণায় গা গুলিয়ে উঠার উপক্রম বেচারির। নাকমুখ কুঁচকে, দাঁত খিঁচে বলে ওঠে,

“ জানোয়ার লোক একটা! সকাল সকাল হতে না হতেই শুরু হয়ে গেল আপনার লুচুগিরী? অসভ্য, বেয়াদব লোক!”

গালি খেয়েও ঠোঁটের কোণে হাসি ধরে রাখার সুকৌশলে কৌশলী মুগ্ধ! বেয়াদবের ন্যায় ঠোঁট কামড়ে হাসছে আর দুষ্ট দৃষ্টে তাকিয়ে আছে মেয়েটার পানে। মাহি দাঁত কিড়মিড় করছে এপর্যায়ে। ঝাঁঝ দেখিয়ে ফের বলে ওঠে,

“ চোখ নামান অসভ্য লোক! আমার দিকে মোটেও এমন অসভ্য নজরে তাকাবেন না।”

গা-ছাড়া ভাব ধরলেন যুবক। ধীরলয়ে শক্তপোক্ত হাতটা ঘুরিয়ে এনে রাখল নিজ মাথার নিচে। দৃষ্টিজোড়া অপরিবর্তিত রেখে, গমগমে গলায় বলে ওঠে,

“ তোকে ছাড়া আর কার দিকে এমন করে তাকাবাে শুনি?”

যথাতথা ক্ষুদ্র মুখখানা গম্ভীর হলো সপ্তদশীর। লাজুক বদনে নামলো খানিক স্থিরতা। রয়েসয়ে রূঢ় মানবের কোলে উঠে বসলেন বোকা মানবী। নজর রাখলেন ঝুঁকিয়ে! কন্ঠে ভারী গাম্ভীর্যের ছাপ ফুটিয়ে সময় নিয়ে আওড়ালেন,

“ মানুষের অভাব আছে আপনার?”

“ দুয়েকটা উদাহরণ দে দেখি!”

এক লহমায় স্থবির হলো মাহি! ক্ষুদ্র চোয়ালের পেশি টানটান করে নিয়ে ঝাঁঝাল কন্ঠে পরপরই শুধালো,

“ শুনলাম কে না-কি মিসেস টু-বি অধীর রায় হতে যাচ্ছে!”

তড়াক বাদামী চোখদুটোয় তীক্ষ্ণতা ভর করল রূঢ় মানবের। অজানা উপলব্ধিতে বিস্ময় লেপ্টে গেল সম্পূর্ণ মুখমণ্ডলে। একমুহূর্ত মৌন থেকে ছেলেটা হুট করেই ভ্রু বাঁকালো। কন্ঠে সন্দিহান ভাবভঙ্গি ফুটিয়ে শুধালো,

“ জ্বলে?”

তক্ষুনি দৃষ্টি উঁচায় মাহি! একপ্রকার থতমত খেয়ে আমতা আমতা স্বরে প্রতুত্তর করে,

“ কি? কি জ্বলবার কথা বলছেন আপনি?”

রূঢ় মানব বড্ড বেয়াদব! মেয়েটার মনের অবস্থা খানিক টের পেতেই জ্বালাতন বাড়ালেন তিনি। বিজ্ঞের ন্যায় এদিক-ওদিক নাক বাড়িয়ে টানলেন জোরালো নিশ্বাস। সময় নিয়ে সন্দিগ্ধ গলায় আওড়ালেন,

“ তেমন কিছু না। কোত্থেকে যেন ভীষণ পোড়া পোড়া গন্ধ পাচ্ছি মনে হচ্ছে! তাই জিজ্ঞেস করলাম — জ্বলছে না-কি কিছু?”

নাক ফোলায় মাহি! মুখ ঝামটি দিয়ে বলে ওঠে,

“ হোয়াট ননসেন্স! আপনার নাকে নির্ঘাত সমস্যা দেখা দিয়েছে। ডাক্তার দেখান গিয়ে, যান!”

হাসলো মুগ্ধ! মুক্ত হাতটা আলগোছে বাড়িয়ে দিলো মেয়েটার দিকে। রমণীর নরম তুলতুলে কব্জিসন্ধি আঁকড়ে ধরে বলতে লাগলো,

“ ডাক্তারের কি দরকার? তুই আছিস না? তুই থাকতে...”

“ আহ!”

মুহুর্তেই বাক আটকালো মুগ্ধের। চোখদুটো বিস্ফোরিত হলো পরপরই। মেয়েটা ওভাবে গোঙালো কেনো? কি হয়েছে ওর হাতে? উৎকন্ঠায় তক্ষুনি রমণীর নরম হাতখানা সম্মুখে তুলে ধরে মুগ্ধ। ওমনি দৃশ্যপটে দৃশ্যমান হলো — সদ্য ফোঁসকা পড়া রমণীর দু'টো আঙুল। লালচে ভাব ধরেছে সম্পূর্ণ হাতের তালুতে। তৎক্ষনাৎ মুখ অভিব্যক্তি পাল্টে গেল মাফিয়া বিস্টের। চোখদুটোতে ছড়িয়ে গেল আগুন! সে তক্ষুনি এক ঝটকায় উঠে বসল শোয়া ছেড়ে। একহাতে মানবীর কোমর আঁকড়ে রেখে অন্যহাতে আলতো করে চেপে রাখল ফোস্কা পড়া হাতটা। বিশাল হুংকার ছুঁড়ে আওড়াল,

“ কি হয়েছে তোর হাতে? ফোস্কা পড়ল কিভাবে? কি করেছিস তুই? কোথায় গিয়েছিলি? উত্তর দে সিগনোরা! তাড়াতাড়ি উত্তর দে।”

রূঢ় মানবের বিকট হুংকারে কেঁপে ওঠে মাহি! ভয়ার্ত ঢোক গিলে আমতা আমতা করে কোনমতে শুধায়,

“ ঘরের ওয়াশবেসিনের ফসেট থেকে গ-গরম পানি বের হচ্ছিল।”

মুহুর্তেই চোয়াল শক্ত হলো মাফিয়া বিস্টের। রাগে থরথর করে কাঁপতে লাগল শুভ্র মুখশ্রী। সাপের ন্যায় ফোঁস ফোঁস করতে ফের ক্ষুব্ধ বাঘের ন্যায় গর্জন তুলে বলে ওঠে,

“ কোন বাস্টা'র্ডের এত ইচ্ছে হলো আমার হাতে ম'রার? চল..”

বলতে বলতেই হালকা ওজনের রমণীকে এক ঝটকায় কাঁধে তুললেন রূঢ় মানব। পায়ের গতিতে লম্বা লম্বা টান বসিয়ে বেরুলেন কক্ষ ছেড়ে!

___________________________________________

চারিদিকে হুলস্থুল কান্ড! মানুষের ভীড়ের নিপীড়নে পা ফেলা দ্বায় যেন! বাতাসের তীব্রতায় ভেসে আসছে আশেপাশের মানুষজনের কানাঘুঁষার ফিসফিসানো। অদূরে ঘরের দরজার নিকট বিধ্বস্ত অবস্থায় পড়ে আছেন এক অপ্সরা! ফোলা ফোলা পেটটা তার কোনমতে ঢেকে-ঢুঁকে রাখা শাড়ির পাতলা আবরণে। অপ্সরার মাথার সন্নিকটে বসে আছেন বেশ ক'জন পৌঢ়া। হায় হায় শব্দ ধ্বনিতে মুখরিত তাদের কন্ঠস্বর! উদ্বিগ্নতায় পানি ঢালছেন অচেতন অপ্সরার মাথার তালুতে। কয়েক জোড়া ব্যস্ত কদম এহেন উৎসুক জনতার ভীড় ঠেলে এগিয়ে এসে দাঁড়ালো বিশাল এক কারুকার্যে শোভিত কাঠের দরজার পানে। ঠেলেঠুলে কোনমতে কক্ষে প্রবেশ করলেন তারা। নেত্র ঠেকালেন সম্মুখে! তাদের চোখদুটোতে ঘোর আমাবস্যা! কেউ কেউ হাত থেকে অস্ত্র ফেলে দিয়ে কাঁদছে অঝোরে। কেউ কেউ হাঁটুর দূর্বলতায় মেঝেতে গড়িয়ে কাঁদছেন। কেউ কেউ দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয়ে দাঁড়িয়ে আছেন স্তব্ধ হয়ে। এরইমধ্যে সন্দিগ্ধ অস্থিরতায় জোরপূর্বক উৎসুক জনতার ভীর ঠেলে কক্ষে ঢুকলেন এক যুবক। দূর থেকে ছুটে আসার দরুন বড্ড হাঁপাচ্ছেন তিনি। হোঁচট খেতে গিয়েও এক সুহৃদয়বান সাহায্যকারী হাতের জন্য বেঁচে গেলেন কোনমতে। যুবক বেশ অস্থির! বিচলিত কায়দায় সম্মুখে নেত্র ঠেকাতেই থমকালেন তিনি। টের পেলেন তার হৃৎস্পন্দন আঁটকে গিয়েছে মাঝপথে। নিঃশ্বাস ফেলতে কষ্ট হচ্ছে ভারী। পরনে তার একখানা লাল রঙা ধূতি, সঙ্গে রয়েছে সফেদ রঙা বোতাম খোলা কুর্তা! মাথাভর্তি ঝাঁকড়া চুলগুলো পাখির বাসার ন্যায় এলোমেলো। শ্যামবরণ মুখখানায় মুহুর্তেই নেমে গিয়েছে এক আকাশসম ভঙ্গুর ছাপ। অদূরেই কক্ষের ঠিক মাঝ বরাবর সিলিং হতে মোটা একখানা দ ড়ি গ লা য় দি য়ে ঝুলছে ভিনদেশী বলিষ্ঠদেহী এক সুদর্শন! ফর্সা মুখশ্রীটা ফ্যাকাশে রূপ ধরেছে ইতোমধ্যে। মাথাভর্তি বাদামী চুলগুলো এলোমেলো হয়ে লেপ্টে আছে ললাটে! চোখদুটো কেমন অনড়ভাবে হা করে খুলে রাখা তার! কার্নিশে জমেছে দু-তিন ফোঁটা অশ্রু। আগত যুবক আহত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে কেবল। সে বাকরুদ্ধ! বুকটা দুমড়েমুচড়ে ছিঁড়ে যাচ্ছে তার। তন্মধ্যে কে যেন তাকে পাশ কাটিয়ে চলে গেল ঘর ছেড়ে। যেতে যেতে ভঙ্গুর কন্ঠে আওড়ে গেল,

“ ভিনসেন্ট ইজ নো মোর! হি কমিটেড আ ব্লা'ডি হেল সুই সাইড! ওহ গড!”

যুবক তক্ষুনি নিজ শুকনো অধরজোড়া নাড়ালো। ঘোলাটে দৃষ্টিযুগল সম্মুখে তাক করে রেখে কাপঁতে কাঁপতে অস্ফুটে আওড়াল,

“ ভিনসেন্ট...মির্জা .... রোমেনিও। ভিনসেন্ট, ভিনসেন্ট!”

ঘামাচ্ছেন হিমাংশু রায়! কল্পনার মানসপটে ভেসে ওঠা অতীতের টুকরোগুলো আজও জ্বালাচ্ছে তাকে। অস্থিরতায় দু'হাতে খামচে ধরেছে গায়ের ব্ল্যাঙ্কেটটা। চোখদুটো বুঁজে রেখেই একনাগাড়ে আওড়ে যাচ্ছেন —

“ ভিনসেন্ট! রোমেন, রোমেন।”

এদিকে, সদ্য শোবার কক্ষে পা রাখলেন সুদীপা রায়। তিতিবিরক্ত মেজাজে বিড়বিড়িয়ে যাচ্ছেন কতকিছু। গটগট পায়ে বিছানার ধারে এগিয়ে আসতেই দৃষ্টিজোড়া হুট করে থমকালো তার। হিমাংশু রায়ের ওমন ঘুমের ঘোরে প্রলাপ দেখে তক্ষুনি বিচলিত হলেন কর্তাগিন্নি। নিজ তিতিবিরক্তিতা ভুলে গিয়ে মুহুর্তেই ছুটে এলেন স্বামীর পানে। চটজলদি দু'হাতে কর্তার গা ধাক্কা দিতে দিতে অস্থির কন্ঠে ডাকলেন,

“ নিরুর বাবা? ও নিরুর বাবা? বলি কি হলো তোমার? এমন ঘুমের ঘোরে বিড়বিড় করছো কেনো? নিরুর বাবা!”

সহসা ঘুম ভাঙল মধ্যবয়স্ক হিমাংশু রায়ের। ছলছল চোখজোড়া তার হুট করেই সরালো নিজেদের পর্দা। বুকের ওঠানামার গতি বড্ড অগোছালো তার, মুখ হা করে টানছেন নিঃশ্বাস। সম্মুখে অস্থির সুদীপা রায়! তড়িঘড়ি করে এগিয়ে এসে স্বামীর বুকের ওপর হাত দিয়ে মালিশ করতে লাগলেন অনবরত। অস্থির গলায় শুধালেন,

“ কতবার করে বলেছি, রাতে শোবার আগে ঘুমের ঔষধগুলো খেয়ে তারপর ঘুমাবে। কিন্তু নাহ! আমার কথা থোড়াই শুনবে তুমি।”

অস্থিরতায় ঘেমে-নেয়ে একাকার হিমাংশু রায়। বুক করছে ধড়ফড়। ধীরলয়ে শোয়া ছেড়ে উঠলেন তিনি। শুকনো ঢোক গিলে হাতের ইশারায় স্ত্রীকে বোঝালেন পানি দিতে। যথাতথা আজ্ঞাকারী পত্নী সুদীপা রায়। তড়িঘড়ি করে বেডসাইড টেবিল হতে পানিভর্তি গ্লাসটা তুলে এনে আলগোছে বাড়িয়ে দিলেন স্বামীর পানে। কাঁপা কাঁপা হাতে গ্লাসটা কোনমতে ঠোঁটের আগায় তুললেন হিমাংশু রায়। এক ঢোকে গিলে ফেললেন প্রায় অর্ধেকটা পানি। পরক্ষণে কিছুটা শান্ত হয়ে বসে রইলেন গম্ভীর মুখে। পাশ থেকে সুদীপা রায় আলতো করে হাত রাখলেন স্বামীর কাঁধে। সন্দিহান গলায় আওড়ালেন,

“ আবারও ঐ দুঃস্বপ্ন দেখেছো?”

কপাল এখনো ঘামের আবরণ লেপ্টে আছে হিমাংশু রায়ের। কন্ঠ ভারী দূর্বল! সিক্ত অধরজোড়া কোনমতে নাড়িয়ে চাড়িয়ে আওড়ালেন তিনি।

“ বরাবরের ন্যায়!”

সহসা বুক চিঁড়ে একফালি দীর্ঘ নিশ্বাস বেরিয়ে এলো কর্তাগিন্নির। মুখে কুলুপ এঁটে বসে রইলেন চুপচাপ। হিমাংশু রায় ফের পানির গ্লাসে চুমুক বসালেন। ঠিক তখনি অন্দরমহলের প্রশস্ত অঙ্গন হতে ধেয়ে এলো কারো বিকট হুংকার!

“ কোন বাস্টা'র্ড এ বাড়িতে প্লাম্বিংয়ের কাজ করেছে? জাস্ট আন্সার মি ইউ্য ব্লা'ডি এসহোল!”

এহেন বিকট হুংকার ধ্বনি কর্ণকুহরে পৌঁছাতেই নাকেমুখে উঠে যাচ্ছে তা-ই অবস্থা হিমাংশু রায়ের। কাশতে কাশতে বেচারা বুক চেপে ধরলেন তক্ষুনি। ভড়কানো কন্ঠে অবোধের ন্যায় শুধালেন,

“ কি হলো? অধীর এভাবে চেঁচাচ্ছে কেনো?”

অলক্ষ্যে শুকনো ঢোক গিললেন সুদীপা রায়। মুখটা করলেন কাচুমাচু। তা বুঝি আড়দৃষ্টে বেশ খেয়াল করলেন হিমাংশু রায়। বিচক্ষণের ন্যায় হুট করেই সন্দিহান গলায় প্রশ্ন ছুড়ঁলেন,

“ তুমি আবার কোনো অকাজ করোনি তো?”

চোর ধরা পড়ে গেলে যেমনটা মুখভঙ্গি প্রকাশ করে, ঠিক তেমন ভাবই ধরলেন সুদীপা রায়। নতমুখে চিবুক ঠেকালেন গলার কাছে। ওদিকে ক্ষুব্ধ বাঘের ন্যায় একাধারে গর্জে যাচ্ছে মুগ্ধ। সে কণ্ঠধ্বনি কানে পৌছুঁতেই উদ্বিগ্ন হলেন হিমাংশু রায়। স্ত্রীর পানে কটমট দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে দাঁত খিঁচে আওড়ালেন,

“ তোমার এসব আগাম কাজকর্মগুলো আমার কাছে একদম বিষাক্ত লাগে সুদীপা! কোনদিন যেন এসবের জন্য অধীরের হাতে অকালে প্রাণটা খোয়াও!”

★

পান থেকে চুন খসলেই ইদানীং রায় জমিদার বাড়িতে বেচারা কতগুলো চিকিৎসকদের ধরে বেঁধে নিয়ে আসা হয়! এ নিয়ে বিরক্তির শেষ নেই চিকিৎসকদের। তবে মুখ ফুটে বিরক্তি প্রকাশ করে থোড়াই যার যার গর্দান দিবে!

মিনিট বিশেকের জরুরী তলবে ফের এক রমণীর চিকিৎসায় ব্যস্ত হলেন কলকাতার দক্ষ চিকিৎসকেরা। সামান্য দুটো আঙুলে ফোস্কার চিকিৎসায় সে-কি ব্যস্ততা তাদের। মুখভর্তি বিরক্তির ছাপ নিয়েই করে যাচ্ছেন চুপচাপ। ভীতসন্ত্রস্ত মাহি! নতমুখে রাণীর ন্যায় বসে আছে মখমলি বিছানার একদম মাঝামাঝি। তার চারপাশে দক্ষ চিকিৎসকদের ভীর। টুকটাক সেবাশুশ্রূষায় দু-তিনজন মত্ত থাকলেও, বাকিরা কাজের অভাবে মশা তাড়াচ্ছেন দাঁড়িয়ে থেকে। জোরপূর্বক তুলে আনায় সে-কি বেহাল দশা তাদের। কক্ষের বাইরে পাহারারত সশস্ত্র গার্ডস! যাদের ভয়ে কুণ্ঠিত চিকিৎসকেরা। খোলা দুয়ার হতে ভেসে আসছে রূঢ় মানবের গর্জনধ্বনি! কি যে করছে তিনি কে জানে। মাহি বিরক্ত! লোকটার এহেন মাত্রাতিরিক্ত পাগলামিতে বিরক্ত সে। নাকমুখ কুঁচকে বসে আছে চুপচাপ।

★

“ আ'ম আস্কিং ইউ সামথিং বাস্টা'র্ড! বাড়িতে প্লাম্বিংয়ের কাজ কে করেছে?”

লহুতে মাখামাখি অবস্থা কানাইয়ের শ্যামলা মুখশ্রী! ললাটের উপরিভাগ ফেটে যাচ্ছে তা-ই অবস্থা হয়েছে! বেচারা কেমন নিবুনিবু চোখে পলক ফেলছে। দূর্বলতায় অসার তার দেহ! মুগ্ধ হিং স্র হয়েছে ফের। ধৈর্য্যের অভাবে আবারও নিজ শক্তপোক্ত হাতের জোরালো পাঞ্চ বসালো কানাইয়ের নাকমুখ বরাবর। ওমনি বেচারা আহতের নাক-মুখ থেঁতলে গেল বোধহয়! ছিটকে বেরুলো লহু। অন্দরমহলের প্রশস্ত করিডর থেকে তক্ষুনি ভেসে এলো কানাইয়ের স্ত্রীর আত্মচিৎকার! স্বামীর ওমন বেগতিক দশা দেখে কেঁদেকেটে একাকার অবস্থা তার। এগোতে পারছেন না সশস্ত্র গার্ডদের ভয়ে। ততক্ষণে অন্দরমহলে গটগটিয়ে পা রাখলেন হিমাংশু রায়। হতভম্ব চোখে আশেপাশে দেখলেন বারকয়েক। প্রশস্ত খোলা অঙ্গনে রীতিমতো ঝড় বয়ে গিয়েছে যেন। ক্ষুব্ধ বাঘের ন্যায় হিং স্রতায় মত্ত রূঢ় মানব। চারপাশে সাজিয়ে রাখা এন্টিক গৃহসজ্জার বস্তুগুলো ভেঙে গুড়িয়ে ছেড়েছে ইতোমধ্যে। হিমাংশু রায় তক্ষুণি ভড়কে তাকালেন মুগ্ধের পানে। দৃষ্টিজোড়া কানাইয়ের পানে নিবদ্ধ হতেই আঁতকে ওঠেন তিনি। সহসা পায়ের গতি বাড়িয়ে এগিয়ে এলেন মুগ্ধের সন্নিকটে। হতবুদ্ধির ন্যায় বলিষ্ঠের হাতটা সামান্য ধরতে গেলেই আচমকা হাত ঝাড়া দিয়ে ওঠে মুগ্ধ! সে-ই ঘটনার আকস্মিকতায় বেচারা মধ্যবয়স্ক কেমন ছিটকে সরে গেল কয়েক-কদম পেছনে। নিজেকে সামলানোর প্রয়াস চালানোর পূর্বেই কর্ণকুহরে ভেসে এলো মুগ্ধের ক্ষুব্ধ গর্জন!

“ ডোন্ট ইউ ডেয়ার টু টাচ মি বান্দীর ছেলে! দূর থেকে কথা বল!”

বাকরুদ্ধ হিমাংশু রায়। নির্বাক ভঙ্গিতে তাকিয়ে রইলেন কেবল। মুগ্ধ ফের হাত উঠালো কানাইয়ের দিকে। এতক্ষণে বেচারা কানাই মুখ খুলল। কাঁপতে কাঁপতে দূর্বল কন্ঠে আওড়াল,

“ শিবু...শিবু এ বাড়ির পুরাতন প্লাম্বার।”

কথাটা জিভ খসতে না খসতেই অদূরের করিডর দিয়ে হুট করেই বাতাসের বেগে ছুট লাগালো কেউ। কে গেলো ওমন করে? মাফিয়া বিস্টের বাজপাখির ন্যায় তীক্ষ্ণ দৃষ্টিজোড়া মুহুর্তেই তাক হলো সেথায়। দৈবাৎ শক্তিতে ঘাড়টা সামান্য বাঁকিয়ে হুংকার ছুঁড়লেন গার্ডদের উদ্দেশ্যে,

“ ওকে নিয়ে আয়!”

যত্রতত্র ছুটলেন গার্ডেরা। দক্ষ এথলেটের ন্যায় দৌড়ে গেলেন শিবুর পেছনে। এদিকে মুগ্ধ মহাশয় খানিক স্থির হলেন। দম্ভীর ন্যায় পাহাড়সম দেহটা খানিক নাড়িয়ে চাড়িয়ে দাঁড়ালেন অঙ্গনের ঠিক মাঝামাঝিতে। পেটানো দেহখানা উম্মুক্ত তার, নাভিকমলের বড্ড নিচে ট্রাউজারের কাঁধ! বলিষ্ঠ হাতদুটো আলগোছে পকেটে গুঁজে নিয়ে গর্জন তুলে গার্ডদের উদ্দেশ্যে আওড়ালেন,

“ এই সিগার দে!”

সহসা নতমুখে এগিয়ে এলেন দু'জন। কাঁপা কাঁপা হাতে একজন সিগার তুলে দিলেন রূঢ় মানবের রুক্ষ ঠোঁটের ডগায়, আরেকজন ধরিয়ে দিলেন লাইটার! কাজ শেষ হতেই দ্রুত বেগে সরে গেলেন তারা। মুগ্ধ দাঁড়িয়ে রইলো ঠায়! ফুঁকতে লাগলো সিগার।

সময়ের কাটা গুনে গুনে মিনিট তিনেক পার হতেই আচানক সম্মুখ থেকে এক ছিমছাম গায়ের গড়নের কৃষ্ণবরণ ছেলে কেমন হুমড়ি খেয়ে পড়ল রূঢ় মানবের পায়ের কাছে। অদূরে দাঁড়িয়ে আছে বাধ্য গার্ডস। হাঁপাচ্ছে ভীষণ! মুগ্ধ তখন আলগোছে ঘাড় বাকিয়ে তাকায় পায়ের কাছে পড়ে থাকা ছেলেটার পানে। ঠোঁটের ফাঁকে সিগার চেপে রেখেই মেরুদণ্ড বাঁকান মাফিয়া বিস্ট। শক্ত হাতের রুক্ষ তালুতে আচমকা টেনে ধরে শিবুর মাথার চুলগুলো। ব্যথায় তক্ষুনি মুখ কুঁচকে নেয় শিবু। চুলে অসহ্য টান পরতেই ধীরলয়ে উঠে দাঁড়ায় সে। পাহাড়সম বলিষ্ঠের পানে তাকায় ঘাড় উঁচিয়ে। দু'হাত ত্রস্ত জোর করে অনুনয়ের সুরে বলে,

“ আমি কিছু করিনি দাদাবাবু। আমার কোনো দোষ নেই।”

সহসা বাঁকা হাসল মুগ্ধ। অন্যহাতে ঠোঁটের কোণ থেকে সিগারটা নামিয়ে এনে তা মুহুর্তেই চেপে ধরল শিবুর বুক বরাবর। এহেন হিং স্র কর্মকাণ্ডে আত্মচিৎকারে ফেটে পড়ে শিবু। অথচ রূঢ় মানব কেমন ঠান্ডা কন্ঠে শুধালো,

“ তাহলে পালালি কেনো?”

মুখে বাক নেই শিবুর! কর্তাগিন্নির বড্ড উপকার রয়েছে তার ওপর। কৃতজ্ঞতায় থোড়াই জাহির করবে তার নাম! বেচারা চুপ করে সয়ে গেলো বুকের জ্বলুনি। কাঁদতে কাঁদতে হেঁচকি তুলছে প্রায়। মুগ্ধ তখন ফের হুংকার ছুঁড়ল!

“ সব নিয়ে আয়!”

বিচক্ষণি গার্ডস! ছুটলেন মুহুর্তব্যয়ে। ফিরে এলেন পরপরই। সঙ্গে নিয়ে এলেন বেশ বড়সড় একখানা সিলভারের পাত্র। কয়েকজনের হাতে বেশকিছু জার। পাত্রটা রাখা হলো অদূরে! তাতে রয়েসয়ে ঢালা হলো জার ভর্তি তরলগুলো। উম্মুক্ত বাতাসের সংস্পর্শে আসতেই তরল থেকে কেমন এক ধরনের উটকো গন্ধ বেরুচ্ছে! ধোঁয়াও বেরুচ্ছে বেশ। মুগ্ধ পা চালালো তক্ষুনি! শিবুর চুলগুলো হাতের মুঠোয় চেপে রেখে এগোচ্ছে সে। তরল ভর্তি সিলভারের পাতের সন্নিকটে এসে আচানক শিবুর বাহাতটা টেনে ধরে চুবিয়ে দিলো তরলে। ওমনি বেচারার আত্মচিৎকারে কম্পিত হলো রায় জমিদার বাড়ির প্রতিটি দেয়াল। উদ্বিগ্ন মাহি তৎক্ষনাৎ নিজ কক্ষ ছেড়ে বেরিয়ে এলো। রেলিঙের দ্বার ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থেকে নিচে চোখ ফেলতেই দেখল — মাফিয়া বিস্টের হিং স্রতার নিদর্শন। সহসা কেঁপে ওঠে মাহি। ভয়ে তটস্থ হয় তার সর্বাঙ্গ। পাদু’টো অসারতায় ডুবতে চাইলেও রমণী ছুটলো ত্রস্ত কদমে।

এদিকে, মুগ্ধের হিং স্র তা চলমান! বেচারা শিবুর বাহাতটা একপ্রকার ঝলসে গিয়েছে এসিডের ঘনত্বে। ডানহাতটাও ইতোমধ্যে ডুবেছে উটকো তরলে। বেচারা গলা ফাটিয়ে চেচাচ্ছে ভীষণ। কাঁদতে কাঁদতে বেহাল দশা! অথচ তার এহেন দহনে মোটেও মায়া হলোনা নির্দয় মানবের। উল্টো শক্ত হাতে শিবুর ঘাড় চেপে ধরল কেমন! জোরালো শক্তিতে শিবুর মাথাটা তরলে ডোবাতে উদ্যোত রূঢ় মানব। ঠিক তখনি হাওয়ার বেগে ছুটে এলো দু'টো নরম তুলতুলে হাত। ঝুঁকে থাকা নির্দয় মানবের ক্লিন শেইভড রুক্ষ গালে আচমকা বসালো দু'টো শীতল হাতের পরশ। মুহুর্তেই থমকালো পরিবেশ! থমকালো মাফিয়া বিস্টের জোরালো হাতের শক্তি! অগ্নিদৃষ্টিযুগল সম্মুখে তাক হতেই দেখা গেল— সপ্তদশীর পেলব মুখখানা! কর্ণকুহরে তখন ভেসে এলো রমণীর হৃদয় নিঙড়ানো বাক্যদুটো!

“ বিস্ট! আমার বিস্ট!”

থমকায় মুগ্ধ! থমকায় তার সকল হিং স্র তা। একমুহূর্তের জন্য থেমে গেলো তার হৃৎস্পন্দন। দৃষ্টিযুগল থেকে সরে গেল অদৃশ্য অগ্নি স্পৃহা! শক্ত হাতের রুক্ষ তালু বোধহয় ঢিলে হলো তার। সুযোগটা কাজে লাগায় শিবু। ত্রস্ত সরে গেল পেছনে। এদিকে মাহি শান্ত! ধীরলয়ে রূঢ় মানবের গালে হাত বুলাতেই আবেশে চোখদুটো আপনাআপনি বুঁজে নিলো নির্দয় বিস্ট। শুকনো অধরজোড়া জিভ ঠেলে খানিক ভিজিয়ে নিয়ে ফের ঘাড় বাকিয়ে আচ্ছন্ন দৃষ্টে তাকালো মেয়েটার পানে। মাহি নাক টানলো। কেমন ভগ্ন কন্ঠে আওড়াল,

“ এতোটা হিং স্র হতে নেই বিস্ট! আপনাকে আমার ভীষণ ভয় করছে!”

চলবে......

#মির্জা_সায়ান_মুগ্ধ — পর্বঃ৫৫(খ)

#jannatul_firdaus_mithila

“ এতোটা হিং স্র হতে নেই বিস্ট! আপনাকে আমার ভীষণ ভয় করছে!”

থমকে দাঁড়িয়ে আছেন মাফিয়া বিস্ট। নিখাঁদ সৌন্দর্যমণ্ডিত বাদামী চোখজোড়া তার, ডুবে আছে এক দুর্বোধ্য নিগূঢ়তায়! মানবীর হুটহাট স্নিগ্ধ বাক্যবাণে মুহুর্ত ব্যয়েই নিজেকে হারালো রূঢ় মানব। বাক্যবাণের অভিঘাতে অন্তঃকোণে এতক্ষণ যাবত দাউদাউ করে জ্বলতে থাকা উন্মত্ত দাবানলে বোধহয় মুহুর্তের ব্যবধানে নেমে এলো এক পশলা স্নিগ্ধ বৃষ্টি। পাহাড়সম দেহখানা নিথর হলো তার! বক্ষপিঞ্জরে আঁটকে থাকা বেয়াদব অঙ্গটা হারালো নিজ বিন্যস্ত গতির ঢেউ! তার নিষ্পলক দৃষ্টিযুগল আঁটকে আছে সম্মুখে দাঁড়িয়ে থাকা রমণীর পেলব মুখাবয়বে। আর রমণী? সে কাঁপছে! থরথর করে কাঁপছে তার ক্ষুদ্র বদন। রূঢ় মানবের রুক্ষ কপোলদ্বয়ে স্থির হয়ে থাকা সপ্তদশীর কোমল হাতদুটো কেমন মৃদু কম্পনে বারবার নড়বড়ে হচ্ছে! সুউচ্চ দাম্ভিক পুরুষের গালদুটো নাগাল পেতেই যেন বড্ড বেগ পোহাতে হচ্ছে তাদের। বোকা মানবীর আর ধৈর্য্যে কুলোচ্ছে না। কোমল হাতদুটোয় অসামান্য অসারতা ভর করায় তা ধীরলয়ে রূঢ় মানবের কপোল হতে গড়িয়ে নামাতে চাইলো বোধহয়। আর ওমনি রমণীর তুলতুলে হাতদুটোর ওপর চাপ পড়ল জোরালো! চোখের পলকে রূঢ় মানবের শক্তপোক্ত হাতদুটোর রুক্ষ তালুদ্বয় কেমন আঁকড়ে ধরল মাহি'র নরম তুলতুলে হাতদুটো। তক্ষুনি ভড়কায় মাহি! ভীতসন্ত্রস্ত চোখে তাকিয়ে রয় মুগ্ধের পানে। বুক কাঁপছে বোকা মেয়েটার। অন্তঃকোণে ভয় জমেছে ভীষণ! অপরিচিত লোকটাকে প্রাণে বাঁচাতে গিয়ে ঘটে যা এসেছে তা-ই করেছে বোকা মানবী! উপস্থিত বুদ্ধি কাজে লাগিয়ে নির্দয় লোকটাকে থামিয়েছে একমুহূর্তের জন্য। তবে এবার? এবার যে ভীষণ ভয় করছে তার। লোকটাকে থামানোর অপরাধে তাকেই যদি মে'রে বসে এখন? দুশ্চিন্তায় জর্জরিত সপ্তদশীর তন-মন! শুকনো ফাঁকা ঢোক গিলে আমতা আমতা করতে উদ্যোত হতেই সম্মুখ থেকে ভেসে এলো মুগ্ধের ভারী ঠান্ডা কন্ঠ!

“ কি বলে ডাকলি তুই আমায়?”

রমণীর পেলব মুখাবয়বে সহসা আঁধার নামলো আমাবস্যার। চোখদুটো যত্রতত্র নুইয়ে গেল জমিনে। জিভের ডগা বাকশূন্য তার! গলার কাছটা হুট করেই ওমন ব্যথা করছে কেনো কে জানে! অন্তঃকোণে কেমন চিনচিন করছে। সম্মুখ থেকে মুগ্ধ এবার হাত বাড়ালো। শক্ত হাতের রুক্ষ আঙুলগুলো আলগোছে মানবীর চুলের ভাঁজে নিয়ে গিয়ে, চুলগুলো খানিক মুঠোবন্দি করল রূঢ় মানব। পরপরই নিজ বলিষ্ঠ হাতের এক হেঁচকা টানে ক্ষুদ্র মানবীকে টেনে নিয়ে এলো অত্যন্ত সন্নিকটে। হাতের জোর বাড়িয়ে রমণীর পেলব মুখখানা সামান্য উঁচিয়ে, ঘাড় ঝোঁকায় মুগ্ধ। সন্দিষ্ট কুঞ্চিত দৃষ্টিজোড়া একত্রে ডোবালো রমণীর হরিণী আঁখিদ্বয়ে। একপ্রকার স্তব্ধ কন্ঠে শুধালো,

“ হোয়াট ডিড ইউ সে দ্যান? সে দ্যাট এগেইন!”

মাহি নিশ্চুপ! চোখে আঁটা চশমাটা এলোমেলো তার। স্বচ্ছ কাঁচ ভেদ করে ছলছল দৃষ্টিযুগল তাকিয়ে আছে সুদর্শনের পানে। একমুহূর্তের জন্য দিনদুনিয়া ভুলে গেলো মাহি। অক্ষিপটের কাল্পনিক দৃশ্যপটে ফের উত্থাপিত হলো অতীতের কিছু টুকরো টুকরো স্মৃতি! চাচাতো বোন রুহিপুর শ্বশুরবাড়িতে বেড়াতে গিয়ে হুট করেই এক ভিনদেশী অপরিচিত লোকের সাথে ধাক্কা খাওয়া। প্রথম দর্শনে ভিনদেশী রূঢ় মানবের ঐ বাদামী চোখদুটোর ভয়ে সিটিয়ে যাওয়া। পরিচিতি পর্বে ভীনদেশীকে ঘিরে রেহান দুলাভাইয়ের পক্ষ থেকে শুনতে পাওয়া কয়েকটা বাক্য!

“ ওর নাম — মির্জা সায়ান মুগ্ধ! আমার দুঃসম্পর্কের মামাতো ভাই! সাউথ কোরিয়ার একটি বিখ্যাত মাল্টিন্যাশনাল সফটওয়্যার কোম্পানিতে একজন সফটওয়্যার ইন্জিনিয়ার হিসেবে রয়েছে। পাশাপাশি ও কিন্তু একজন এথলেট!”

সেদিন প্রথমবারের মতো ভিনদেশী সুদর্শনকে দেখে মনে মনে খানিকটা চমকে যাওয়া। দ্বিতীয় দর্শনে অজান্তে বলা বোকা বাক্যের পরিণামে শক্ত হাতের জোরালো থাপ্পড় খাওয়া! তৃতীয় দর্শনে কলেজ ক্যাম্পাস থেকে কোনরূপ বলাকওয়া ছাড়াই হুটহাট সপ্তদশীকে কাঁধে করে তুলে নিয়ে আসা। সারারাত ফোনকলে থেকে বিনাবাক্য ব্যয়ে সপ্তদশীর প্রতিটি নিঃশ্বাসের শব্দ শোনা! বিয়ে বাড়ির অনুষ্ঠানে গিয়ে সেখানে সকলের সম্মুখে প্রথমবারের মতো ভিনদেশী সুদর্শনের মুখ থেকে নির্গত “আমার চাশমিস ” সম্বোধন শুনে খানিকটা মুগ্ধ হওয়া। সদ্য হৃদয়ভাঙা অন্তর্মুখীর নতুন করে আবারও কারো প্রতি সামান্য দূর্বল হওয়ার কট্টর উপলব্ধি!

সবটাই যেন জীবন্ত আকারে স্পষ্ট দৃশ্যপটে ভাসছে মাহি'র। যার জের ধরে ঠোঁটের কোণে অজান্তেই মুচকি হাসি ফুটলো রমণীর। বেভুলার ন্যায় বিমুগ্ধ নয়নজোড়া সুদর্শনের পানে তাক করে রেখে, কোমল বা-হাতটা ফের সম্মুখে বাড়াতে উদ্যোত হলো। ঠিক তখনি বোকা মানবীর কল্পিত দৃশ্যপটের দেয়ালে ভেসে উঠল বাবার মলিন মুখখানা! ভেসে উঠল রূঢ় মানবের দ্বারা অপমানিত হওয়ার প্রতিটি ক্ষণ। পরিবার হারানোর যন্ত্রণার কাতরানি! ভেসে উঠল — নির্দোষ হওয়া স্বত্বেও মাফিয়া বিস্টের হাতে নির্মম অত্যাচারের শিকার হওয়ার দিনগুলো! সেই সঙ্গে মনে পড়ল হিং স্র মানবের হিং স্রাত্মক কর্মকাণ্ডগুলো। কথায় কথায় র* ক্তপাত! খুন-খারাবি, ক্ষমতার অহংকার, এক বিদঘুটে কালো জগত ইত্যাদির কথা মনে পড়তেই রমণীর অন্তঃকোণে সদ্য পরিস্ফুটিত হওয়া মুগ্ধতার দেয়ালে চিঁড় ধরল যেন। এক অদৃশ্য ক্ষমতাবলে কল্পনা থেকে মুহুর্তেই ছিটকে বেরিয়ে এলো মাহি। ছলছল চোখদুটোর কার্নিশ বেয়ে গড়ালো কয়েক ফোঁটা অশ্রুকণা। সহসা বাড়িয়ে দেয়া হাতটা নামিয়ে আনলো মাহি। দৃষ্টি সরালো এদিক-ওদিক। রূঢ় মানব স্থির! দৃষ্টিতে এক অদ্ভুত নমনীয়তা ঢেলে, মেয়েটার মুখের ওপর চোয়াল নামালো আরেকটু। কন্ঠ খাঁদে নামিয়ে সন্দিহান গলায় আওড়াল,

“ কথা বল সিগনোরা! তুই কি আমায় “ আমার ” বলে ডাকলি?”

গলা ধরে এসেছে মাহি'র! মুহুর্তের প্রবাহে উত্থাপিত মুগ্ধতার মোহজালে আর আঁটকে নেই সে। তাইতো কেমন গম্ভীর মুখে প্রসঙ্গ এড়াতে আওড়াল,

“ কিচ্ছু না! ছাড়ুন আমায় বিস্ট।”

শুনলো না মুগ্ধ! উল্টো অস্থির হলো ক্রমশ। বিচক্ষণ মস্তিষ্ক একমুহূর্তের জন্য নিজেদের কার্যক্ষমতা হারালো। অবচেতন মন বাড়ালো নিজ পাগলামি! অস্থির ভঙ্গিতে তক্ষুনি মানবীর চুলগুলো ছেড়ে দিয়ে, পরপরই দু'হাতের রুক্ষ আঁজলায় আঁটকে নিলো মাহি'র ক্ষুদ্র সুশ্রী মুখখানা। মুখাবয়বে একপ্রকার অদৃশ্য প্রশান্তি লেপ্টে উম্মত্ত কন্ঠে শুধালো,

“ তুই...তুই আমায় “ আমার ” বললি? সত্যি? আমি..আমি তোর? সত্যি সিগনোরা? তুই আমায় তোর বললি? আমি...আমি তোর? সিগনোরা... আমায় তুই তোর..আমি...!”

বাক্য বড্ড এলোমেলো মাফিয়া বিস্টের। ক্ষণে ক্ষণে জিভ ঠেলে ভেজাচ্ছে অধর। সর্বাঙ্গের ওমন অস্থিরতার প্রবাহে হিতাহিত জ্ঞান হারাচ্ছে বলিষ্ঠ পুরুষ। রমণীর পেলব মুখখানার ওপর থেকে হাত সরিয়ে কেমন এলোমেলো কায়দায় চুলকাচ্ছে নিজ চুল! সেকেন্ডের প্রবাহে ফের স্থির রমণীর পানে অগ্রসর হতে গিয়ে পদযুগল থামায় মুগ্ধ। উম্মাদের ন্যায় এক-আধবার তাকায় আশেপাশে। চারপাশে গার্ডদের অভাব নেই! নতমুখে দাঁড়িয়ে আছে বেচারারা। অদূরে জমিনে কোমর ঠেকিয়ে পড়ে থাকা হিমাংশু রায় হতভম্ব! কেমন হতবিহ্বল দৃষ্টে তাকিয়ে দেখছে রুশদী কিংয়ের পাগলামি। মুগ্ধ থামলো না। উল্টো বেপরোয়ার ন্যায় রমণীর পানে এগিয়ে এসে এক ঝটকায় রমণীকে তুলে নিলো কাঁধে। পায়ের গতিতে এথলেটিক ভাবস্রোত বসিয়ে তক্ষুনি ছুটলো মুগ্ধ। মেয়েটা যে কাঁধে পড়ে আছে সেদিকে বিন্দুমাত্র হুঁশ নেই তার। সে-তো ছুটছে! এদিকে মুগ্ধের ওমন পাগলাটে কান্ডে হতাশ মাহি। ফোঁস করে নিশ্বাস ফেলা ছাড়া আর কাজ নেই তার!

★

মধ্যবয়স্কের হতবিহব্বল দৃষ্টিপট হতে সদ্য আড়াল হয়েছে মাফিয়া বিস্ট। অথচ মধ্যবয়স্কের মাঝে তেমন কোনো হেলদোল নেই। তিনি কেমন ঠায় বসে রয়েছেন ধুলোপড়া জমিনে। ওদিকে নিচতলার প্রশস্ত বারান্দার সুবিশাল গোলাকৃতি ভীমের আড়াল হতে এতক্ষণে মাথা বের করে খানিক উঁকি দিলেন সুদীপা রায়। রূঢ় মানবের ভয়ে যেভাবে গা লুকিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন মানুষটা! যেন সাক্ষাৎ যমের ভয়ে লুকিয়ে থাকা নগন্য সৈন্য। সুদীপা রায় ধীরলয়ে ভীমের আড়াল হতে বের হলেন। গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে এসে দাঁড়ালেন স্বামীর সন্নিকটে। ঘাড়টা বারকয়েক দু'ধারে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সর্তক হলেন তিনি। পরক্ষণে স্বামীর পাশে একহাঁটু গেঁড়ে বসলেন কোনমতে। হিমাংশু রায়ের হেলদোল নেই! সম্মুখে তাকিয়ে আছে তো আছেই! তার এহেন হাবভাবে কপাল গোটালেন সুদীপা রায়। খানিক দোনোমোনো করতে করতে আলতো করে হাত উঠিয়ে রাখলেন স্বামীর কাঁধে। সামান্য গলা খাঁকারি দিয়ে আওড়ালেন,

“ কি হয়েছে তোমার? আর কতক্ষণ এভাবে বসে থাকবে? চলো উঠে পড়ো। চান করে নাহয় পূজো ঘরে যাবে।”

এবারেও ভাবাবেগে পরিবর্তন ঘটেনি হিমাংশু রায়ের। দৃষ্টিজোড়া সম্মুখে ঠায় নিবদ্ধ রেখে প্রতুত্তরে কেবল নির্লিপ্ত কণ্ঠে আওড়ালেন,

“ দেখলে সুদীপা?”

সহসা দৃষ্টি ক্ষুদ্র করলেন সুদীপা রায়। সন্দিগ্ধ গলায় পরপর প্রশ্ন ছুড়ঁলেন,

“ কি?”

হিমাংশু রায়ের কন্ঠ ভারী! মুখাবয়বে ভীষণ হতবাকতার ছাপ!

“ ঐ একই মুখ, একই তেজ! একইরকম হুংকার। আজ ওকে দেখে মনে হলো — আমি যেন আবারও ৩১ বছর পেছনে চলে গিয়েছি! মনে হলো নিজ চোখের সামনে সে-ই মাফিয়া কিং-কে দেখছি। আশ্চর্য! দু'টো মানুষের মধ্যে এতো মিল কি করে হয় সুদীপা?”

বোধগম্যতায় মুখ কুঁচকালেন সুদীপা রায়! অত্যন্ত বিরক্তির মেজাজে বলেই বসলেন,

“ র ক্ত বলে কথা! একই গান গাইবে না?”

ধীরলয়ে চোখদুটো বুঁজে নিলেন হিমাংশু রায়। মুহুর্তব্যয়ে অক্ষিপটের দৃশ্যপটে ছড়ালেন অতীতের খণ্ডাংশ। যেথায় স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে — ভিনদেশী সুদর্শনের নিস্তেজ দেহের সম্মুখে বসে কাঁদতে থাকা যুবক হিমাংশু রায়কে। দু'হাতে বারবার নিস্তেজের পাদু’টো ছুঁয়ে দিচ্ছেন তিনি। চাইছেন ক্ষমা! সঠিক সময়ে ঘটনাস্থলে না পৌঁছানোর ক্ষমা।

মুহুর্তেই বুক চিঁড়ে ফের এক দীর্ঘ নিশ্বাস বেরিয়ে এলো হিমাংশু রায়ের। চোখদুটো বুঁজে রেখেই অস্ফুটে শুধালেন,

“ আপনি ম'রে গিয়েও বেঁচে আছেন! হয়তো অন্য কারোর রূপে। তবে আছেন নিশ্চয়ই!”

থামলেন হিমাংশু রায়। চোখদুটোর পর্দা সরিয়ে ঘাড় উঁচিয়ে তাকালেন অদূরের তিন তলার করিডর পানে। ঐ যে! দেখা যাচ্ছে বেপরোয়া যুবককে। কেমন উন্মত্তের ন্যায় ছুটছে মেয়েটাকে কাঁধে নিয়ে। তৎক্ষনাৎ বাঁকা হাসলেন বিচক্ষণ মধ্যবয়স্ক। অধর কামড়ে বিড়বিড়িয়ে ফের আওড়ালেন,

“ যে-ই ভুল গত ৩১ বছর আগে আপনি করেছিলেন — দ্য লেট রুশদী কিং ভিনসেন্ট রোম্যানিও ওরফ মির্জা সায়ান রোম্যানিও, আজ ঠিক একই ভুল আপনার ছেলেও করছে! যাকে আমি নিজ হাতে নির্দয় মানব হিসেবে দীক্ষিত করেছিলাম, আজ সে না চাইতেও নিজের দূর্বলতা জাহির করেছে! অবশেষে বাপ কা বেটা প্রমাণ করল — তারও হৃদয় আছে, তারও দূর্বলতা রয়েছে। যে-ই দূর্বলতা আপনাকে রাশিয়ান গোরস্থানের কবর অব্দি পৌঁছে দিয়েছে, দেখা যাক — ঐ একইরকম দূর্বলতা আপনার ছেলেকে কোথায় নিয়ে দাঁড় করায় ভিনসেন্ট। ওহ সরি সরি! মা'ই মিস্টেক। ইট শ্যুড বি — মির্জা সায়ান রোম্যানিও। হায় হায়....নাম উচ্চারণ করলাম বলে আমাকেও মে'রে দেবে না-কি তারা?”

বলেই বাঁকা হাসলেন হিমাংশু রায়। দু'হাত পেছনে ঠেকিয়ে বসলেন আয়েশ করে। ঘাড়টা সামান্য বাঁকিয়ে পেছনে তাকালেন তিনি। দৃষ্টি ঠেকালেন হতভম্ব স্ত্রীর পানে। দক্ষ কৌশলী কায়দায় আওড়ালেন,

“ যাও গিন্নি! মেয়েকে গিয়ে তৈরী করো। খুব শীঘ্রই তার নামের পাশে জমিদার বাড়ির পুত্রবধূর তকমা বসবে। তবে...!”

“ তবে?”

সুদীপা রায়ের পাল্টা প্রশ্ন! তা শুনে ফের খেঁকিয়ে হাসলেন হিমাংশু রায়। হলদেটে দাঁতগুলো বাইরে এনে চাপা স্বরে শুধালেন,

“ তবে শাড়ি ২টো কিনো! একটা লাল, যেটা গায়ে জড়িয়ে বিয়ের পিড়িতে বসবে আমাদের মেয়ে। অন্যটা সাদা, যেটা পরে বাড়ির উঠোন মাড়াবে — স্বামীর প্রয়াত হবার শোকে।”

সহসা গম্ভীর হলেন সুদীপা রায়। দু'হাত আলগোছে বাঁধলেন বুকের কাছে। খানিকবাদে কিছু একটা মনে পড়ে যাবার ভঙ্গিতে হুট করেই আওড়ালেন,

“ কিন্তু... বিয়েটা হবে কোন রীতিতে? অধীর তো সনাতনী নয়! ও তো...!”

চটজলদি বসা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন হিমাংশু রায়। গা থেকে ধুলোময়লা ঝাড়তে ঝাড়তে ভাবলেশহীন ভঙ্গিতে, স্ত্রীর কথা মাঝপথে আঁটকে দিয়ে বলে উঠেন,

“ হ্যা জানি, ও কোনো ধর্মে বিশ্বাসী নয়। তবে খ্রিস্টান বাপের ছেলে যেহেতু, আজ নাহয় কাল নিজ ধর্ম পালন করবেই! তাছাড়া আমাদের ওসব ধর্ম-অধর্ম নিয়ে কথাবার্তা বাড়িয়ে লাভ নেই। আমাদের যা দরকার তা পেলেই হলো। আজকাল তো আবার কাগজেও বিয়ে হয়! নিরুর সঙ্গেও নাহয় সেভাবেই হবে।”

শ্বাস ফেললেন হিমাংশু রায়। পদযুগল সম্মুখে বাড়িয়ে সন্দিগ্ধ গলায় ফের স্ত্রীকে প্রশ্ন ছুড়ঁলেন,

“ নিরু কোথায়?”

“ পদ্ম বিলে!”

__________________________________________

রূঢ় মানবের ব্যস্ত পদযুগল! ছুটে এসে আচানক ঢুকলো নিজ কক্ষে। পথিমধ্যে বাহাতের জোরালো ধাক্কায় ওতো মোটা ভারী দরজাটা লাগিয়ে দিলো এক ধাক্কায়। বিকট শব্দে তক্ষুনি আঁতকে উঠে মাহি। ভীতসন্ত্রস্ত ভাবাবেগে সহসা খামচে ধরে রূঢ় মানবের উম্মুক্ত পিঠ। মুগ্ধ সেসবে বেখেয়ালি। চটপট কদমে খানিকটা এগিয়ে এসে আচমকা রমণীকে কাঁধ হতে নামিয়ে আনে রূঢ় মানব। সপ্তদশীর দোদুল্যমান ক্ষুদ্র বদনখানি তৎক্ষনাৎ স্থির হতে না পারার দুঃখে সামান্য ঢলে পড়তে গেলেই, সহসা নিজ বলিষ্ঠ দু'হাতের দৃঢ়বন্ধনে রমণীকে আগলে নেয় মুগ্ধ। ব্যাপক অস্থিরতায় মাহি'র চোখে চোখ রেখে আবেদন জুড়ল,

“ আমায় আরেকবার “ আমার ” বলে ডাক না পিচ্চি! আরেকটাবার ডাক।”

এতক্ষণে কিছুটা স্থবির হলো মাহি। অনড় দৃষ্টিজোড়া সম্মুখে তাক করে, ডানহাতখানা উঁচিয়ে আলতো রাখল রূঢ় মানবের বুকের কাছে। শান্ত কন্ঠে শুধালো,

“ আপনি একটু শান্ত হোন বিস্ট!”

কথাটা মানতে নারাজ মাফিয়া বিস্ট। তক্ষুনি রমণীর পেলব মুখখানা দু'হাতের রুক্ষ আঁজলায় নিয়ে, ঘাড় ঝুঁকিয়ে কপালে ঠেকালো কপাল। শুকনো ফাঁকা ঢোক গিলে অস্থির কন্ঠে বলে উঠল —

“ উঁহু! আই কান্ট এন্ড আ'ই ওন্ট। আই জাস্ট ওয়ান্না হিয়ার ইউর ওয়ার্ডস! জাস্ট কল মি সিগনোরা। জাস্ট ফা'কিং কল মি! শুধু আরেকটাবার আমায় “ আমার ” বলে ডাক পিচ্চি।”

যুবকের এহেন অস্থিরতায় অতিষ্ঠ মাহি। অনিহায় দু'হাতে ঠেলছে রূঢ় মানবের বুক। অথচ কান্ড দেখো! যুবক নড়ছেই না সম্মুখ হতে। উল্টো বেপরোয়া ভঙ্গিতে রমণীর সম্পূর্ণ মুখমণ্ডলে লেপ্টে দিচ্ছে সিক্ত চুম্বনের ছাপ। মানবীর ধৈর্য্যের বড্ড অভাব আজ। অনিচ্ছা সত্ত্বেও কপাল গুছিয়ে হুট করেই বলে বসল,

“ ছাড়ুন বিস্ট!”

ছোট ছোট সিক্ত চুম্বন লেপন করতে মত্ত মুগ্ধ! ব্যাপক আবেদন জুড়ে আওড়ায়,

“ তুই বল আমি তোর! আরেকবার বল না সিগনোরা।”

নাক ফুলিয়ে চোয়াল শক্ত করল মাহি! জিভের ডগায় মিথ্যে বুলি বসিয়ে পরপরই প্রতুত্তর করল,

“ হ্যা আপনি আমার! আমার বিস্ট!”

ফের থমকায় মুগ্ধ! থামায় নিজের উৎকট পাগলামি। হুট করেই যুবকের পাহাড়সম দেহটায় মৃদু কম্পন বইছে যেন। বলিষ্ঠ হাতদুটোর ঝংকার স্পষ্ট টের পেলো মাহি। অবোধের ন্যায় চেয়ে রইলো কেবল। এদিকে মাফিয়া বিস্টের বেহাল দশা! কাঁপতে কাঁপতে পেছালো কদম। অবিশ্বাস্য প্রাপ্তিতে প্রশান্তির বদলে স্তব্ধতা বেড়েছে তার। অত্যাধিক আনন্দে ঠিক কেমন প্রতিক্রিয়া দেখানো উচিত তা নিয়ে বড্ড সন্দিহানতায় ভুগছেন মাফিয়া বিস্ট। একবার দু-ঠোঁটের মধ্যকার দুরত্ব বাড়িয়ে হা করে নিঃশ্বাস ফেলছেন, আরেকবার উম্মাদের ন্যায় চুলকাচ্ছেন চুল। আরেকবার এগিয়ে এসে ঠেসে চুমু দিতে চাইছেন মেয়েটার নরম তুলতুলে গালে, তবে পরক্ষণেই কি মনে করে যেন থেমে যাচ্ছেন রূঢ় মানব। মাহি নির্লিপ্ত চোখে দেখছে লোকটার পাগলামি। সে অজ্ঞ নয়! বেশ বুঝতে পারছে রূঢ় মানবের অভ্যন্তরীন অনুভুতি। তবুও যেন তা দেখেও অদেখায় মত্ত মানবী। গম্ভীর মুখে দু'হাত বুকের কাছে বেঁধে নিয়ে, মুখ ঘোরায় অন্যত্র। ঠিক তখনি রূঢ় মানব এগিয়ে এলো তার সম্মুখে। শক্ত হাতের বলিষ্ঠ চাপায় আঁকড়ে ধরল মাহি'র নরম তুলতুলে বাহুদ্বয়। অতঃপর মেয়েটাকে কোনোকিছু বলার সুযোগ না দিয়ে তাকে একপ্রকার টেনেহিঁচড়ে নিয়ে গেলো মুগ্ধ। টানতে টানতে মানবীর ক্ষুদ্র বদনখানা আলতো করে বসালো মখমলি বিছানার কোলে। পরপরই সপ্তদশীর দোদুল্যমান পায়ের সন্নিকটে মেঝেতে গা ঠেকিয়ে বসল মুগ্ধ। তার এরূপ কান্ডে কপাল গোছায়৷ ত্বরিত পাদু’টো যুবকের সম্মুখ হতে সরাতে চাইলেই বাঁধ সাধল মুগ্ধ। একহাতের বলিষ্ঠ থাবায় তৎক্ষনাৎ আঁকড়ে ধরল মাহি'র নরম পাদু’টো। মুহুর্তেই স্থির মানবী। হকচকানো কন্ঠে আওড়ায়,

“ কি করছেন আপনি? এভাবে পায়ের কাছে বসলেন কেনো? উঠুন বলছি।”

শুনলো না মুগ্ধ। উল্টো নিজ বলিষ্ঠ হাতখানা আলতো করে উঠিয়ে আনলো মাহি'র গাল বরাবর। এক অদ্ভুত সরল স্বীকারোক্তিতে আওড়াতে লাগল,

“ আমার সিগনোরা! তুই আমার তাই না? তুই শুধু আমার তাই তো? আর আমি? আমি তোর! শুধু তোর। তুই বললি না আমি তোর? হ্যাঁ, হ্যাঁ! আমি শুধু তোর। তোকে আমি রাণী বানিয়ে রাখব সিগনোরা। রুশদী কিংডমের রাণী! তোর পায়ের কাছে গোটা দুনিয়ার সকল সুখ-শান্তি, সব নিয়ে আসব আমি। তোর মুখ ফুটে কিছু চাওয়ার আগে সবকিছু তোর হবে সিগনোরা! তুই শুধু রাজ করবি! আমার ওপর, আমার কিংডমের ওপর।”

থামল মুগ্ধ! আচমকা মানবীকে অবাক করে দিয়ে মাথা রাখল তার কোলে। এহেন ঘটনার আকস্মিকতায় জড়সড়ভাব ধরল মাহি। ক্ষুদ্র বদনখানি মোচড়াতে লাগল কেমন! ওদিকে যুবকের বলিষ্ঠ বাহাতটা তক্ষুণি আঁটকে নিয়েছে মেয়েটাকে। অন্যহাত আঁচানক রমণীর ডানহাতের কোমল কব্জিসন্ধি আঁকড়ে ধরে, টেনে ঠেকালো নিজ মাথার ওপর। নিজ হাত দিয়েই রমণীর হাতখানা বুলাতে লাগল নিজ এলোমেলো বাদামী রমা সিল্কি চুলগুলোর ওপর। অস্ফুট কন্ঠে পরপর আওড়াল,

“ আমাকে আজ পর্যন্ত কেউ “ আমার ” বলেনি চাশমিস! আজ পর্যন্ত কেউ আমার গালে হাত রাখেনি! কেউ আমায় বলেনি — আমার জন্য তার ভয় করছে। আমার এই অন্ধকার দুনিয়ায় আজ অব্ধি পা রাখার দুঃসাহস দেখায়নি কেউ। তুই এলি সিগনোরা! আমায় তোর বললি! কথা দিচ্ছি সিগনোরা, আর কোনোদিন কেউ তোকে আমার কাছ থেকে আলাদা করতে পারবে না। আই সয়্যার — আজ থেকে তোর ওপর সকল অধিকার শুধু আমার, আর আমার ওপর কেবল তোর।”

একমুহূর্ত শান্ত রইলো মুগ্ধ। পরক্ষণেই ঝড়ের বেগে রমণীর কোল থেকে তুলে নিলো মাথাটা। একপ্রকার তাড়া দেখিয়ে শুধালো,

“ চাল ওঠ সিগনোরা! গো এন্ড গেট রেডি।”

ভড়কায় মাহি! বোধগম্যহীনের ন্যায় আচমকা প্রশ্ন ছুড়ঁল,

“ মানে? তৈরি হতে হবে কেনো?”

রূঢ় মানবের মুখ অভিব্যাক্তি ধরা ছোঁয়ার বাইরে। রমণী প্রশ্ন ছুড়ঁতে না ছুঁড়তেই সে আলগোছে দু'হাত তুলে আঁকড়ে ধরল সপ্তদশীর পেলব মুখখানা। ধীরলয়ে শান্ত কন্ঠে শুধালো,

“ কজ, উই'ল গেট ইন্টিমেট চাশমিস। আ'ই ওয়ান্না মেক শিওর দ্যাট ইউ আর মা'ইন। অনলি মাইন! সো তাড়াতাড়ি ওঠ! ফ্রেশ হয়ে নিজের মতো করে তৈরী হয়ে নে। নিচতলার সবগুলো ঘরভর্তি করে জামাকাপড় রাখা! তোর যেটা ভালো লাগে সেটা পর। সাজতে ইচ্ছে হলে সাজ! বাট যা করার তা মাত্র ১০ মিনিটের মধ্যে করবি। আ'ই ডোন্ট হেভ পেশেন্স এনিমোর!”

“ কিন্তু...!”

কথাটা পূর্ণ করবার সময় পেলো না মাহি। তার পূর্বেই যুবক এগিয়ে এসে অধর দিয়ে টেনে ধরল সপ্তদশীর তুলতুলে ওষ্ঠপুট! মিনিট খানেকের উন্মত্ত চুম্বন শেষে রয়েসয়ে বিচ্ছিন্ন করল ওষ্ঠপুটের বন্ধন। স্তম্ভিত রমণীর পানে সরু দৃষ্টি তাক করে, চিরচেনা অধিকারবোধে হিসহিসিয়ে শুধালো,

“ নো মোর ওয়ার্ডস। গো এন্ড গেট রেডি বিউটি। আ'ম ইয়েগারলি ওয়েটিং ফর ইউ!”

________________________________________

খাল কেটে কুমির আনা — প্রবাদটুকুর সঙ্গে বেশ আগে থেকে পরিচিত মাহি। তবে কুমিরের কাছে গিয়ে ধেইধেই করে নিজেকে সপে দেয়ার মতো বোকামির সনে আজ প্রথমবারের মতো পরিচিত হলো অভাগী! এ নিয়ে দুঃখের শেষ নেই তার। বিষন্ন ভাবনায় ইতোমধ্যেই পার করেছে বরাদ্দকৃত সময়ের চার মিনিট। পরিশেষে কোনরূপ উপায়ন্তর না পেয়ে বিষন্ন মাহি, ঠিকই নেমে এলো নিচ তলায়। দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয়ে এগোলো বারান্দার প্রথম কামরার পানে। আনমনে বন্ধ দুয়ারপানে ধাক্কা দিতেই রমণী টের পেলো — দুয়ার বাইরে থেকে আটঁকানো। ওমনি কপাল গোছায় মাহি। কুঞ্চিত দৃষ্টে তাকায় দরজা দিকে। পরমুহূর্তেই দেখল — দরজার গায়ে ঝুলছে মস্তবড় এক তালা! মাহি বিরক্ত! এবার চাবি পাবে কোথায় সে? ভাবাবেগে তিতিবিরক্তির ছাপ লেপ্টে রমণীর কদম ঘোরাতে গেলেই অদূর থেকে ছুটে এলো এক এক তরুণী। এসেই কেমন মাহি'র উদ্দেশ্যে খ্যাক খ্যাক করে শুধালো,

“ কি সমস্যা? এখানে কি করেন? আপনি থাকবেন তিন তালায়। তাইলে নিচে কি?”

অপরিচিত দেখলে খানিক জড়তা বেড়ে যায় মাহি'র। কন্ঠে নামে দূর্বলতা। বোকা মানবী খানিক সময় নিয়ে আওড়াল,

“ আসলে...আমি কাপড় নিতে এসেছিলাম কিন্তু দরজাটা...!”

মুহুর্তেই কপালে গোটাকতক ভাঁজ পড়ল তরুণীর। দাঁত খিঁচে পরপরই বলে উঠল,

“ কেন? আমার নিরু দিদির সোয়ামীর দিকে নজর দিয়া শান্তি হয় নাই? এহন আসচেন আমার ভোলাভালা দিদির কাপড়গুলানও হাতাইতে? বলি আপনার একটুও শরম লজ্জা নাই?”

কট্টর অপমানে চোয়াল শক্ত হয়ে গেল মাহি'র। জিভ ঠেলে ক'টা উপযুক্ত বাক্য বেরিয়ে আসতে চাইলো যেন। তবুও আদব লেহাজে পরিপূর্ণ মানবী কেমন চুপ করে রইলো। শক্ত মুখে তক্ষুনি পা ছোটালো সিঁড়ির দিকে। ধুপধাপ কদমে বারান্দা হতে বাঁক নিয়ে যে-ইনা সিঁড়ির অভিমুখে যাবে ওমনি সম্মুখে পড়ল মুগ্ধ! সহসা থমকে দাঁড়ায় মাহি। দৃষ্টি উঁচিয়ে তাকায় মুগ্ধের পানে। মুগ্ধ কেমন কপাল কুঁচকে তাকিয়ে আছে। গুরুগম্ভীর মুখ তার, দু'হাত গুঁজে রাখা পকেটে! মুহুর্তব্যয়ে গমগমে গলায় জিজ্ঞেস করল,

“ এখনো তৈরী হোসনি কেনো? এভাবেই আসবি না-কি আমার বেডে?”

তৎক্ষনাৎ শক্ত চোয়ালে দৃঢ়তা বাড়ল মাহি'র। দাঁত তুললো কটমট শব্দ! একপ্রকার ঝাঁঝিয়ে আওড়াল,

“ হ্যাঁ এভাবেই যাবো! চলুন। যা ইচ্ছে করুন। আমি নতুন করে তৈরী হতে পারবোনা। আমার কাছে পড়ার মতো তেমন কিচ্ছু নেই!”

মুখাবয়বে গাম্ভীর্যের ছাপ বাড়ল মুগ্ধের। কন্ঠে সন্দিগ্ধতা!

“ এতগুলো ঘরভর্তি নতুন কাপড়। তাতেও তোর হচ্ছে না?”

নাক ফুললো মাহি'র! শক্ত মুখে পরপর শুধালো,

“ না হচ্ছে না! কারণ ওসব কাপড় আমার নয়, মিসেস টু-বি অধীর রায়ের। যার জন্য ওসবে আমার কোনো অধিকার নেই।”

চলবে......

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৫৫তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন