#মির্জা_সায়ান_মুগ্ধ — পর্বঃ৫৭(ক)
#jannatul_firdaus_mithila
“ অন্তত তোর মাঝে এই আমাকে চাইলেই একটুখানি জায়গা দিতে পারিস। কথা দিচ্ছি মেয়ে — তোর দুঃখের ফুলবাগানের প্রতিটি কাটা আমি হাসিমুখে নিজ গায়ে মেখে নিবো।”
মুগ্ধের বিমুগ্ধ বাক্যবাণ! যার প্রতিটি শব্দ কর্ণকুহরে পৌঁছাতেই বিমূঢ় হলো মাহি। গভীর দৃষ্টে একমনে তাকিয়ে আছে সুদর্শনের পানে। জিভের ডগা নিশপিশ করছে তার। চোখদুটো যেন নিজে থেকেই বলে যাচ্ছে কতকিছু! মুগ্ধ নিরব অপেক্ষায় অপেক্ষায়িত। আলতো করে ছুঁয়ে রেখেছে রমণীর তুলতুলে কপোল। দৃষ্টিজোড়া অনড় তার। পলক ফেলতে ভুলে গিয়েছে বোধহয় বহু আগে! সপ্তদশী ঢোক গিললো খানিক। অন্তঃকোণ হতে সকল ভয়ডর কাটিয়ে গম্ভীর কন্ঠে প্রতুত্তর করল —
“ অথচ আমার জীবনে আপনি আসার আগে দুঃখের ফুলবাগান নামক কোনোকিছুর অস্তিত্বই ছিলো না মনস্টার!”
চোখদুটো মুহুর্তেই সরু হয়ে গেলো মুগ্ধের। চোয়ালের রেখায় টান পড়ল বেশ! কপালের চামড়ায় গোটাকতক ভাঁজ ফেলে সন্দিগ্ধ গলায় শুধালো —
“ তার মানে বলতে চাচ্ছিস, আমি-ই তোর জীবনের একমাত্র দুঃখের কাঁটা?”
আহত হাসলো রমণী! মুখাবয়বে তক্ষুনি ফুটে উঠল এক আকাশসম ব্যথাতুর ছাপ। দৃষ্টিযুগল আলতো করে ঝুঁকিয়ে এনে, সপ্তদশী কেমন মোটা কন্ঠে আওড়াল,
“ সব কথা থোড়াই মুখে ফুটে বলতে হয়!”
সহসা ভ্রু-যুগল কুচঁকে নেয় মুগ্ধ। মুখাবয়ব জুড়ে চরম অসন্তুষ্টির ছাপ ফুটিয়ে দাঁত কিড়মিড় করল তৎক্ষনাৎ! রমণীর গালের ওপর ছুঁয়ে থাকা রুক্ষ হাতটা পরমুহূর্তেই গড়িয়ে আনলো রমণীর নরম চোয়াল রেখায়। সেথায় রুষ্টতার সনে সামান্য জোর বসাতেই মৃদু ককিয়ে ওঠে মাহি! ক্ষুদ্র বদনে খানিক নড়চড় বাড়াতেই রূঢ় মানব দাঁতে দাঁত চাপলেন যেন। চোখদুটোতে অদৃশ্য আগুন লেপ্টে পরক্ষণেই কটমটিয়ে শুধালেন,
“ আমি কাঁটা? আমি তোর জীবনের কাঁটা? ওকে ফাইন! কাঁটা হলে কাঁটাই সই। কান খুলে শুনে রাখ মেয়ে, আমি নামক এ-ই কাঁটা নিয়েই তোকে গোটা একটা জীবন কাটাতে হবে।”
বোকা মানবীর চোখদুটো ছলছল! কান্নার উপচে পড়া ঢেউয়ে বাঁধ পড়েছে যেন। কন্ঠস্বর হয়েছে বড্ড ভারী!
“ গোটা একটা জীবন? তাও আবার আপনার মতো নির্দয়ের সাথে? তারচেয়ে মৃ ত্যু বরং ঢের ভালো।”
তক্ষুনি রাগের পারদ তরতর করে আকাশ ছুঁলো মুগ্ধের। দৃঢ় চোয়ালখানা শক্ত করে ফুটিয়ে, এক ঝটকায় সপ্তদশীর কোমল বদনখানি সরিয়ে দিলো নিজের ওপর থেকে। মাহি নিস্তব্ধ! টলমল কদম দুটো খানিক নাড়িয়ে পিছিয়ে দাঁড়ালো কয়েক হাত। ওমনি পাহাড়সম বলিষ্ঠ পুরুষ উঠে দাঁড়ালেন ভাঙা কাঠের স্তুপ হতে। মুখাবয়বে একপ্রকার আগুন লেপ্টে তক্ষুনি সম্মুখে এগিয়ে এসে আক্রমণ বসালো রমণীর তুলতুলে গ্রীবাদেশে। মাহি হকচকায়নি! না নড়লো নিজ জায়গা হতে। রূঢ় মানবের পানে স্থির দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখতেই শুনতে পেলো —
“ কথায় কথায় মৃ ত্যুর কথা বলিস কোন সাহসে বেয়াদবের বাচ্চা? কি মনে হয় তোর? মৃ ত্যু হলেই তুই আমার হাত থেকে মুক্তি পাবি? ইউ বি'চ! লিসেন টু মি কেয়ার ফুলি। মরণের পরও এই নামক নির্দয়ের সঙ্গী হিসেবেই থাকতে হবে তোকে! তুই মিলিয়ে নিস কথাটা।”
“ সবকিছুতে জোরজবরদস্তি করাটা বোধহয় আপনার চরিত্রগত বদঅভ্যেস তাই না?”
“ আর কথায়-কাজে বারবার নিজের দূষিত র ক্তের কথা মনে করিয়ে দেয়াটা তোর জন্মগত বদঅভ্যেস তাই না?”
মুহুর্তেই মুখভঙ্গি শক্ত হলো মাহি'র। পেলব মুখখানা হতে সঙ্গে সঙ্গে সরে গেলো অন্তর্মুখীতার প্রলেপ! দাঁত খিঁচে তৎক্ষনাৎ বলে বসল,
“ মুখ সামলে কথা বলুন মিস্টার! কার র ক্ত কে দূষিত বলছেন আপনি? কোন স্পর্ধায় বলছেন এসব? আমায় যা ইচ্ছে বলুন বিস্ট, তবে খবরদার আমার আব্বুকে নিয়ে কিচ্ছু বলবেন না!”
সহসা রমণীর মুখের ওপর ঘাড় ঝোঁকায় মুগ্ধ। বাদামী চোখদুটো তার, আগুনের লেলিহানে চিকচিক করছে যেন! চোয়ালের পেশি শক্ত করে চিড়বিড় কন্ঠে প্রতুত্তর করল —
“ খুব জ্বলছে তা-ই না? তোর জা*নো*য়ার বাপকে কিছু বলতে গেলেই জ্বলে উঠে তোর তাই না? অথচ যেদিন জানতে পারবি — তোর বাপ ঠিক কতবড় বা*স্টার্ড, সেদিন কি বলবি তুই? পারবি এভাবে আমার সামনে দাঁড়িয়ে থেকে গলাবাজি করতে?”
কপাল গোটায় মাহি! চোখেমুখে একপ্রকার বিতৃষ্ণা লেপ্টে তক্ষুনি মুখ ঝামটি দিয়ে বলে ওঠে,
“ জোর করে তুলে এনেছেন পর থেকেই শুনে যাচ্ছি — আমার আব্বু খারাপ, তার ওপর নেওয়া প্রতিশোধের জেরে আমায় তুলে এনেছেন! রোজ নিয়ম করে টর্চার করেছেন আমায়। অথচ এপর্যন্ত একটাবারের জন্যও কিন্তু আপনি বলেননি বিস্ট, কিসের প্রতিশোধে নিচ্ছেন আপনি! মানলাম আপনি প্রতিশোধে অন্ধ, মানলাম আমার আব্বু দোষী! কোনো প্রকার দোষ করলে আমার আব্বু করেছে, আমিতো করিনি। তাহলে কিসের ভিত্তিতে আমার মতো নির্দোষের ওপর ওভাবে অমানুষিক নির্যাতন চালালেন? কিসের ভিত্তিতে চালালেন? আপনার কি মনে হয় আমি মানুষ না? মুখ বুঁজে ব্যথা গুলো সয়ে গিয়েছি বিধায় কষ্ট হয়নি আমার? আমায় নিজ হাতের কাঠ পুতুল মনে করেছেন আপনি? যে যখন ইচ্ছে বেধড়ক মারধর করবেন, যখন ইচ্ছে দূরছাই করে ছুঁড়ে ফেলবেন, আবার যখন ইচ্ছে হবে বেহায়ার মতো কাছে টানবেন!”
থামল ফুঁসতে থাকা রমণী! রূঢ় মানবের কটমট দৃষ্টিতে আজ ভয় পাচ্ছে না সে। অন্তঃকোণের তীব্র জখম গুলো ফের তাজা হয়েছে তার। চোখদুটো ঝরাচ্ছে ঘৃণার অশ্রু! মুগ্ধের বলিষ্ঠ হাতখানা আলগা হয়েছে খানিক। সে সুযোগে তড়াক দু'হাতের শক্ত ধাক্কায় রূঢ় মানবের রুক্ষ বক্ষভাঁজে আঘাত হানলো সপ্তদশী! তবে বালাইষাট। মুগ্ধ মশাই তো নড়লেন-ই না, উল্টো তীব্র আঘাতের বিপরীতে ক্ষুদ্র রমণী কেমন পিছিয়ে গেল সহসা! পিছিয়ে গিয়েও রাগ কমেনি তার। রাগে-ঘৃণায় ফুঁসতে ফুঁসতে ফের আওড়াল,
“ আপনি সবসময় বলতেন না? আমার মুখ দেখলে আপনার বমি আসে? আপনি বলতেন না? আপনি আমায় ঘৃণা করেন!”
“ ওসব পুরনো কথা! রাত গেয়ি তো বাত গেয়ি।”
যুবকের নির্লিপ্ত প্রতুত্তর! কপাল ফেটে দরদর করে লহু গড়ালেও বড্ড নির্বিকার সে। বলিষ্ঠ দু'হাত ততক্ষণে ঠায় পেয়েছে ট্রাউজারের পকেটে! লোকটার এহেন নির্লিপ্ততা দেখে রাগ বাড়ল মাহি'র। চোয়ালের পেশিতে দৃঢ়তা বাড়িয়ে তক্ষুনি ছুঁড়ল ঝাঁঝাল বাক্যবাণ —
“ আপনার জন্য ওসব পুরনো কথা হতে পারে মিস্টার অধীর রায়! তবে আমার জন্য ওগুলো ছিলো একেকটা বিষাক্ত তীর! যার অভিঘাতে আজও ক্ষত হয় আমার ছোট্ট হৃদয়। ট্রাস্ট মি মনস্টার! আ'ই উইল নেভার এভার ফরগট দোজ লাইনস! আজ এখানে, আপনার সম্মুখে দাঁড়িয়ে আপনার চোখে চোখ রেখে বলছি — আই জাস্ট হেট ইউ্য মিস্টার অধীর রায়! আমার চোখে এ পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি ঘৃণ্য ব্যক্তিটি কেবলমাত্র আপনি! আপনার নৃশংসতা, আপনার ছলচাতুরী, আপনার জোরজবরদস্তি, আপনার কথাবার্তা, আপনার মুখ, আপনার ঐ বাদামী দু'টো চোখ, সবকিছু, সবকিছুকে ঘৃণা করি আমি!”
রমণীর তীক্ষ্ণ বাক্যবাণে জর্জরিত হবার কথা ছিলো রূঢ় মানবের। অথচ হলো তার উল্টো! মুগ্ধের চোখদুটোতে কেমন তাচ্ছিল্যের ছাপ ফুটলো মুহুর্তেই। ঠোঁটের কোণ বেঁকে গেল শ্লেষাত্মক ভঙ্গিতে। বলিষ্ঠ পাদু’টো নিরবে অগ্রসর হলো সম্মুখে। রমণী ভীত নয় আজ। তবুও ঘৃণায় নাক-মুখ কুঁচকে পেছালো কদম। পেছাতে পেছাতে মুহুর্তের অভিঘাতে ধনুকের ন্যায় বাঁকানো পিঠটা তার হুট করেই গিয়ে ঠেকল দেয়ালের সনে। তৎক্ষনাৎ স্থির হলো রমণীর পাদু’টো। দাঁড়িয়ে রইলো প্রস্তরখন্ডের ন্যায়। মুগ্ধের পাদু’টো ততক্ষণে এসে দাঁড়ালো রমণীর অভিমুখে। বলিষ্ঠ হাতের সুকৌশলে দেয়াল আঁকড়ে সপ্তদশীকে আটকালো এক অভেদ্য বাঁধনে। রমণী স্থির! অন্যত্র মুখ ঘুরিয়ে রাখা তার। যুবকের নিষ্পলক শ্লেষাত্মক দৃষ্টিজোড়া সম্মুখে নিবদ্ধ! ধীরলয়ে কাত করল বলিষ্ঠ ঘাড়টা। অন্যহাতে আচমকা মাহি'র নরম তুলতুলে কব্জিসন্ধি আঁকড়ে ধরতেই তড়াক চোখ তুলে মাহি। সবেগে রূঢ় মানবের রুক্ষ হাতের মুঠো হতে কব্জি ছাড়াবার বৃথা প্রয়াসে মত্ত থাকতেই মুগ্ধ ঘটালো আরেক কান্ড! কোনরূপ বলাকওয়া ছাড়াই মানবীর হাতটা টেনে এনে তা আলগোছে চেপে ধরল মেয়েটার-ই বুকের বাঁপাশে। কন্ঠে ভীষণ তাচ্ছিল্যের ছাপ ফুটিয়ে আওড়াল,
“ বুকে হাত রেখে বলতো চড়ুই! অধীর রায়কে ঘৃণা করলেও, মির্জা সায়ান মুগ্ধকে ঘৃণা করিস কি-না!”
থমকায় মাহি! অন্তঃকোণের গোপন সম্ভাষণে হোঁচট খেয়ে চোখ নামালো ত্রস্ত। শক্ত মুখে রয়েসয়ে প্রতুত্তর ছুঁড়ল —
“ ঐ একই বিষয়! নাম দু'টো হলেও, মানুষটা তো একজনই। আমি তো নামকে নয়, গোটা মানুষটাকেই ঘৃণা করি!”
“ আসলেই?”
মুগ্ধের সন্দিগ্ধ কন্ঠ! তা শুনে কেবল ওপর নিচ মাথা নাড়ায় মাহি। সঙ্গে সঙ্গে তাচ্ছিল্যের টানে বাঁকা হাসে মুগ্ধ। তীক্ষ্ম দৃষ্টে শ্লেষাত্মক ভঙ্গিতে বলে ওঠে,
“ আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মিথ্যে বলতে নেই বোকা চড়ুই! এতে ধরা পড়ে যাবার শঙ্কা বড্ড বেশি! যার একরূপে বিমুগ্ধ হয়েছিস, তার প্রতিটি রুপ গ্রহন করতে শেখ।”
“ এ দেহে নিশ্বাস থাকাকালীন তা আমার দ্বারা হচ্ছে না!”
রমণীর পরপর দৃঢ় প্রতুত্তর। তা কর্ণকুহরে পৌঁছাতেই দৃষ্টিজোড়ায় তাচ্ছিল্যের রেশ ছড়ালো মুগ্ধের। অধরের কোণে বসল দাঁত। ধীরলয়ে মানবীর নরম হাতের কব্জিসন্ধি ছেড়ে দিয়ে পরক্ষণেই রুক্ষ হাতের আঙুলগুলো ছোঁয়াল মানবীর মসৃণ কপোলে। সেথায় খানিক স্লাইড করতে করতে শুধালো,
“ একটা সময় ঘৃণার দুর্বোধ্য জালে লেপ্টে থেকে যাকে মা'রতে চেয়েছে আমার কঠোর মস্তিষ্ক, আজ সময়ের পরিক্রমায় সে-ই আমার দু-চোখের জালে আঁটকে থাকা মায়াবী এক প্রহেলিকা! কাউকে এতোটা ঘৃণা করতে নেই চড়ুই, যতটা ঘৃণার অভিঘাতে হৃদয় কেবল তার জন্যই স্পন্দিত হতে শুরু করে। পার্সোনাল এক্সপেরিয়েন্স থেকে বললাম! মানলে মান, না মানলে বা*ল ছেঁড়। হু কেয়ারস?”
সহসা মুখ কুঁচকায় মাহি! ক্ষুদ্র মস্তিষ্কে যা ধরলো তার ভিত্তিতেই কর্কশ কন্ঠে শুধালো —
“ সবাই এক নয় মনস্টার। কেউ কেউ চোখ থেকে ঘৃণার প্রলেপ সরাতে গিয়ে কবর অব্দি পৌঁছে যায়। মাগার আফসোস! ঘৃণাটা তখনো অটুট থাকে।”
“ এত্তো কনফিডেন্স? ভেঙে গুড়িয়ে গেলে তখন?”
তৎক্ষনাৎ ঘোলাটে দৃষ্টিজোড়া উঁচু হলো মাহির। দৃঢ়তা বাড়ল কন্ঠায়,
“ তখন আমি স্বেচ্ছায় আপনার শয্যাসঙ্গী হবো। যেভাবে চাইবেন সেভাবেই হবো!”
মুহুর্তেই ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ফুটলো মুগ্ধের। তাচ্ছিল্যের সুরে পরপর বলে উঠল,
“ সেটা তুই না চাইলেও হবি! আর মাত্র ৬দিন পর এমনিতেই তুই আমার বেডে আসবি। স্বেচ্ছায় নয়তো কি হয়েছে? তুই বললি না আমি জোরজবরদস্তিতে এক্সপার্ট? ওকে, আ'ম অনেস্টলি এক্সেপ্টিং দিস! তোর কনসেন্ট, তোর এথিকস, এন্ড তোর অসুস্থতার গুল্লি মারি! একদিকে ঘড়ির কাঁটায় ১২টা বাজবে, আরেকদিকে তুই শুধু আমার হবি। এতে তোর চোখে আমার জন্য ঘৃণা বাড়লে বাড়ুক, হু দা ফা'ক কেয়ারস এবাউট দ্যাট? আমার কেবল দে হ পেলেই চলবে! হৃদয় দিয়ে তুই মুড়ি খা বেয়াদব মেয়েছেলে!”
কামারের দোকানে বসে নীতিবাক্য আওড়ানোর কোনো মানে নেই! তা বুঝতে বড্ড দেরি হলো মাহি'র। তবে বোধগম্য হবার পরমুহূর্তেই কর্ণকুহরে ভেসে এলো টক্সিক লোকটার খেঁক খেঁক কন্ঠস্বর!
“ এক্ষুনি আমার চোখের সামনে থেকে সরে যা! নয়তো ধরলে আস্ত রাখবো না।”
কথাটা বলেই সম্মুখ থেকে সরে গেল মুগ্ধ। কদম বাড়িয়ে গটগট করে চলে গেল বারান্দার অভিমুখে। বোকা রমণী হাঁফছেড়ে বাঁচল যেন। তক্ষুনি দ্রুতপায়ে ছুটে গেল দরজার পানে। ব্যস্ত হাতে দুয়ার খুলতেই তাকে আর পায় কে! প্রাণটা যেন হাতের মুঠোয় নিয়ে ঘর ছাড়লো রমণী।
এদিকে তার ওমন ছুটে যাওয়ার পানে আড়াল হতে চেয়ে রইলো মুগ্ধ! ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের হাসি টেনে আনমনে বিড়বিড়ালো,
“ তুই আমার দেয়া ক্ষতগুলো মনে রাখলি পিচ্চি, অথচ তোকে আগলে রাখার চেষ্টাটুকু দেখলি না!”
_________________________________________
“ হায় ভগবান! এ-কি হলো আমার মেয়ের? নিরু? ও মা? মা? কি হয়েছে তোর মা? চোখ খোল মা!”
সুদীপা রায়ের কন্ঠে ভয়! মধ্যবয়সী শরীরটা কাঁপছে ভীষণ। এহেন দুপুর - গড়ানো প্রহরে জঙ্গলের ওমন গহীন দিকটায় মেয়েটাকে এভাবে অচেতন আকারে পরে থাকতে দেখে অন্তরাত্মা শুকিয়ে কাঠ কর্তাগিন্নির। বারংবার ডেকে যাচ্ছেন মেয়েকে! তবে মেয়ে যে পাত্তাহীন। চোখদুটো খুলছেও না। সর্বাঙ্গ দরদর করে ঘামছে অচেতন মানবীর। সুদীপা রায় বড্ড অসহায় চোখে তাকালেন এদিক-ওদিক। সাহায্যের কেউ নেই আশেপাশে। সঙ্গে আনেননি ফোনটাও! এ পথে এসেছিলেন একা, লোকজন থাকবে কোত্থেকে শুনি? মানুষটা যে মেয়েকে ছেড়ে দিয়ে সাহায্যের জন্য ছুটতেও পারছেন না মধ্যবয়সী। পরিশেষে কোনরূপ উপায়ন্তর না পেয়ে হাঁক ছুঁড়লেন তিনি!
“ ওগো নিরুর বাবা! কোথায় গো তুমি? নিরুর বাবাআআআ!”
হাঁক ছুঁড়তে ছুঁড়তে গলা ব্যথা হয়ে আসার যোগাড় সুদীপা রায়ের। শেষমেশ আর সইতে না পেরে কেঁশে উঠলেন বেশ। ঠিক তখনি অদূরের অন্দরমহলের তিন-তলার বারান্দা হতে ধেয়ে এলো রূঢ় মানবের বিকট ধমক!
“ শেয়ালের মতো হাঁক ছুঁড়ছেন কোন সুখে? বিয়ে লেগেছে কার? আপনার ঘরের বুইড়া ভামের?”
তৎক্ষনাৎ ঘাড় বাকিয়ে তাকায় সুদীপা রায়। অদূরের বারান্দায় মুগ্ধকে সটান দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে, আজ রাগ হবার বদলে খানিক স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন তিনি। তড়িঘড়ি করে সাহায্যের জন্য মুখ খুলতেই যাবেন ওমনি অন্দরমহলের পেছন গেইট হতে দ্রুতপায়ে ছুটে আসেন হিমাংশু রায়। স্ত্রীর ওমন হাঁক ছোঁড়া কন্ঠের পিঠে কেমন বিচলিত আঙ্গিকে শুধায়,
“ কি হয়েছে সুধা? এভাবে চিৎকার .....!”
ছুটন্ত পদযুগল হুট করেই থমকে দাঁড়ালো হিমাংশু রায়ের। বাক আটঁকালো গলার কাছে। মেয়েকে ওমন অচেতন পড়ে থাকতে দেখে, একমুহূর্তের জন্য পায়ের তলা থেকে জমিন খসে গেল তার! বুকটা কেঁপে উঠল ধ্বক করে। মধ্যবয়স্ক চরম উদ্বিগ্নতায় তক্ষুনি মেয়ের পাশে হাঁটু গেঁড়ে বসলেন। দু'হাতে আলতো করে মেয়ের মসৃণ কপোলে চাপড় বসিয়ে ধীরলয়ে ডাকলেন,
“ মা? নিরু? কি হলো মা তোর?”
সুদীপা রায়ও কাঁদছেন। আঁচলের কোণে মুখ লুকিয়ে ব্যস্ত গলায় বলে ওঠেন,
“ তাড়াতাড়ি মেয়েকে বাড়িতে নিয়ে চলো নিরুর বাবা।”
হিমাংশু রায় ত্রস্ত মাথা নাড়ালেন। তড়িঘড়ি করে দু'হাতে মেয়েকে পাঁজা কোলে তুলতে গেলেই খট করে শব্দ হলো তার দূর্বল কটিদেশের অস্থিতে। ওমনি বেচারা মেয়েকে নিয়ে হোঁচট খেয়ে পড়লেন সম্মুখে। পরমুহূর্তেই দু'হাতে চেপে ধরলেন নিজ ভাঙা কোমর! ব্যথাতুর কন্ঠে অস্ফুটে আওড়ালেন,
“ মাগো! শেষ শেষ! আমার কোমর শেষ।”
সুদীপা রায় ভড়কালেন। তক্ষুনি এগিয়ে এসে দাঁড়ালেন স্বামীর পাশে। ব্যাকুল চিত্তে দু'হাতে স্বামীর কোমর ডলতে ডলতে শুধালেন,
“ তুমি না পারলে অধীরকে বলো না। অধীর তো বারান্দাতেই দাঁড়িয়ে আছে।”
তড়াক ঘাড় বাকাঁলেন হিমাংশু রায়। কোমর চেপে ধরেই হাঁটলেন দু-কদম। খানিকটা এগিয়ে এসে ঘাড় উঁচিয়ে তাকালেন অদূরের বারান্দার অভিমুখে। কন্ঠে ব্যথাতুর ভাবভঙ্গি ফুটিয়ে আওড়ালেন,
“ অধীর! বাবা শোনো। একটু সাহায্য করো আমায় বাবা!”
কানে ইয়ারপোড গুঁজে কার সাথে যেন বাক্যালাপে মত্ত মাফিয়া বিস্ট। তন্মধ্যে নিচ থেকে ধেয়ে আসা উঁচু কন্ঠে বিরক্তির শেষ নেই তার। বলিষ্ঠ ঘাড়টা সামান্য বাঁকিয়ে কপাল গুছিয়ে তাকালো হিমাংশু রায়ের পানে। অতঃপর দাঁত খিঁচে আওড়াল,
“ কি সাহায্য? আপনাকে চিতায় তুলে দিয়ে আসতে হবে না-কি?”
আজ আর রাগ করলেন না হিমাংশু রায়। উপায়ন্তরহীনের ন্যায় উল্টো বলে উঠেন,
“ আমার নিরুটাকে একটু কোলে তুলে বাড়ি অব্ধি নিয়ে যাবে অধীর? আমার কোমরে ভীষণ চোট লেগেছে! মনে হচ্ছে হাড়টা নড়ে গিয়েছে জায়গা থেকে। তাই....!”
তৎক্ষনাৎ চোয়াল শক্ত হলো মুগ্ধের। কানে এয়ারপোড থাকা স্বত্বেও বদরাগী পুরুষ দাঁত খিঁচে শুধালো,
“ রাতের অন্ধকারে খাটে গিয়ে কি এমন করেছেন? যার দরুন আপনার কোমরে ঠাডা পড়েছে বান্দীর ছেলে! সময়কালে নিজের বা*লপাকনা মেয়েকে যেহেতু কোলে তুলতে পারবেনই না, সেহেতু পয়দা করতে গেলেন কেনো অসভ্য নাগরিক? না-কি বউ দেখলে উত্তেজনা কাঁধে উঠে যায় কোনটা? তাছাড়া কোমরে এমন নড়বড়ে জোর নিয়ে ওমন একটা বা*লপাকনা পয়দা করলেনই বা কিভাবে বান্দীর ছেলে?”
যুবকের মুখ না যেন আস্ত একটা গোলাবারুদ! কথা দিয়েই যেন উড়িয়ে দিবে সম্মুখের মানুষজনদের। হিমাংশু রায় থম ধরে দাঁড়িয়ে রইলেন কেবল। প্রতুত্তরে ঠিক কেমন প্রতিক্রিয়া দেখাবেন তা নিয়ে বড্ড সন্দিহান তিনি। এরইমধ্যে পিঠ দেখিয়ে উল্টো পায়ে বারান্দা ছাড়লো মুগ্ধ। গটগটিয়ে চলে গেলো কক্ষে। হিমাংশু রায় ফের অসহায়ত্বে ভুগলেন। অসহায় চোখে একবার তাকালেন স্ত্রীর পানে। ভগ্ন কন্ঠে আক্ষেপের সুর টানতেই যাবেন ওমনি সেথায় আগমন ঘটলো এডউইনের। ব্যস্ত কদমে ছুটছে গম্ভীর পুরুষ! একহাতে রিভলবার। মনে হচ্ছে কাকে তাড়া করছে সে। হিমাংশু রায় চোখ সরু করলেন৷ হতবাক কন্ঠে আওড়ালেন,
“ এডউইন?”
থামলো না এডউইন। দ্রুত পায়ে ছুটলেন বাঁদিকে। ঠিক তখনি অসহায় হিমাংশু রায় ডাক পারলেন তাকে!
“ এডউইন? এডউইন! এদিকে আসো।”
তৎক্ষনাৎ পায়ের গতিতে রুখ টানলো এডউইন। গম্ভীর মুখে খানিক বিরক্তির ছাপ ফুটিয়ে আওড়ালেন,
“ কে মরেছে?”
যেমন পীর, তেমন তার মুরিদ! তাতে বিন্দুমাত্র ভড়কালেন না হিমাংশু রায়। উল্টো আহত কন্ঠে বলে উঠেন,
“ আমার মেয়েটাকে একটু বাড়িতে দিয়ে আসবে? বড্ড উপকার হতো জানো। আমার কোমরটায় হুট করেই যে কি হলো! দেখো দাঁড়াতেও পারছিনা ঠিক মতো।”
কপাল গোছায় এডউইন! দৃঢ় চোয়ালে তক্ষুনি প্রতুত্তরে বলে,
“ মাথা খারাপ? কাকে না কাকে কোলে নিতে বলছেন? তাছাড়া আপনি কে আমায় অর্ডার দেওয়ার?”
“ অর্ডার না। ইট’স আ রিকুয়েষ্ট এডউইন। প্লিজ!”
মুখভঙ্গিতে এক আকাশসম বিরক্তির ছাপ ফুটিয়ে এগিয়ে এলো এডউইন। নাক-মুখ কুঁচকে তাকালো অচেতন নিরুর পানে। মনে মনে তেঁতোভাব নিয়ে বিড়বিড়ালো,
“ এসেছি পর থেকে চিপকু মেয়েটা পিছুই ছাড়ছে না! সেন্সলেস হয়েও কোলে ওঠার কি শখ তার।”
ধীরলয়ে নিরুর পানে ঝুঁকে আসে এডউইন। হাতদুটো আলগোছে বাড়িয়ে দেয় রমণীর তুলতুলে দেহের নিচ দিয়ে। শক্ত হাতের জোরালো শক্তিতে পরমুহূর্তেই এক ঝটকায় অচেতন অষ্টাদশীকে পাঁজা কোলে তুলে নেয় এডউইন। বিরক্ত দৃষ্টে সম্মুখে পা বাড়িয়ে বিড়বিড়ায় সে!
“ হলি কাউ! কতটা দূর্ভাগ্য এসে ধরা দিলে শেষমেশ একটা চিপকু মেয়েকে কোলে তুলে হাঁটতে হচ্ছে আমার! মনস্তার...! বাঁচান প্লিজ।”
---------------------------------------------------------------------
সন্ধ্যে গড়িয়ে রাত হবার যোগাড়! এরইমধ্যে বিদঘুটে অন্ধকারে বুদ হয়েছে মাহি'র কামরা। সপ্তদশী বসে আছে বিছানার কোলে। দু'হাঁটুতে ভর দিয়ে রেখেছে মাথাটা। মাঝেমধ্যে ফোপাঁনোর শব্দগুলো বেশ ভেসে আসছে রমণীর কাছ থেকে। ধীরলয়ে হাত উঠিয়েছে চুলের গোঁড়ায়। সেথায় জোরালো চাপ বসিয়ে নিজেকে শাসাতে ব্যস্ত বোকা মানবী!
“ না! আমি কোনোদিন তার প্রতি দূর্বল হবো না৷ কোনোদিন হবো না। সে আমায় পরিবারহারা করেছে! আমার গোটা জীবনটা নষ্ট করেছে মাফিয়া বিস্ট। আমি পুরো পরিবারকে হেনস্তা করেছে সে।”
নিজেকে শাসাতে গিয়ে দূর্বল মাহি। ফোলা ফোলা চোখদুটো বন্ধ তার। বদ্ধ চোখের পাতায় হুট করেই ভেসে উঠল অতীতের কিছু স্মৃতি! দু-বোনের একসঙ্গে কলেজ যাওয়া, সন্ধ্যা হতে না হতেই পড়ার টেবিলে বসে খুটখাট করা৷ পরিবারের সকলের সঙ্গে করা খুনসুটি! মুহুর্তেই ঠোঁটের ফাঁক গলিয়ে উপচে পড়া কান্নার শব্দগুলো বেরিয়ে এলো রমণীর। কাঁদতে কাঁদতে দুহাতে চেপে ধরল নিজ ক্ষুদ্র মুখখানা। রমণী কান্না বিলাসে মত্ত। ঠিক তখনি ঘরের দরজায় কড়া নাড়ানোর শব্দ পড়ল বেশ। মুহূর্তেই কান্না থেমে গেল মাহি'র। রয়েসয়ে কন্ঠ উঁচিয়ে শুধালো,
“ কে?”
ওপাশ থেকে আওয়াজ এলো না কারো। বোকা মানবী উঠে দাঁড়ায় তক্ষুনি। দু'হাতের উল্টো পিঠে সিক্ত চোখদুটো মুছে নিয়ে এগোলো দুয়ারপানে। ধীরলয়ে দুয়ার খুলতেই দেখা গেল — দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছে এক গৃহকর্মী! হাতে একখানা খাবার ট্রলি তার। রিনরিনে কন্ঠে বলল,
“ খাবারটা খেয়ে নিন দিদিমণি।”
নাক টানলো সপ্তদশী। গম্ভীর কন্ঠে প্রতুত্তর করল,
“ নিয়ে যান খাবার। আমার খেতে ইচ্ছে করছে না।”
সম্মুখে দাঁড়িয়ে থাকা কমবয়সী গৃহকর্মী কেমন নড়ে উঠল কথাটা শুনে। খানিক জড়তা নিয়ে পরপর বললেন,
“ খেয়ে নিন দিদিমণি। নয়তো আপনি না খেলে আমার পেটে খাবার পড়বে না আজ!”
কপাল গোছায় মাহি! মুখটা করে গম্ভীর। কন্ঠে সন্দিগ্ধতা ছড়িয়ে পরপর জিজ্ঞেস করল —
“ মানে? আমার খাওয়া, না খাওয়া নিয়ে আপনার খাওয়ার কি সম্পর্ক?”
“ তা আমি বলতে পারবো না দিদিমণি। আপনি দয়া করে খাবারটা খেয়ে নিন।”
বেচারির কথাগুলো বড্ড মনে লাগলো মাহি'র। অনিচ্ছা সত্ত্বেও মাথা নাড়িয়ে বলল,
“ ঠিক আছে। ভেতরে দিয়ে যান।”
গৃহকর্মী তা-ই করল। চটজলদি ব্যস্ত কদমে হাতের ট্রলিটা ঠেলতে ঠেলতে ঢুকল ভেতরে। মাহি আগ বাড়িয়ে তাকে কিছু বলতেই যাবে, তবে তার আর বালাই রইল না তেমন। গৃহকর্মী রমণী কেমন ব্যগ্রতায় ছুটে বেরিয়ে গেলেন ঘর ছেড়ে। মাহি হতভম্ব এরূপ কান্ডে। অন্ধকারে দেখেনি রমণীর মুখ! শঙ্কায় জর্জরিত বোকা মানবী পা ছোটায় ওয়াশরুমের দিকে। ফ্রেশ হয়ে ফিরে এসে খাবে নাহয়!
★
জমিদার বাড়ির বাঁদিকের পথ! খানিক অন্ধকারে রূপ ধরেছে ভয়ানক। একজোড়া নুপুর পড়া সর্তক কদম ধীরলয়ে এগোচ্ছে সেথায়। গায়ে জড়ানো একখানা শাল। মুখ ঢাকা তাতে। হাতে একখানা হারিকেন মালকিনের। মৃদুমন্দ জ্বলছে আগুন! খানিকটা সম্মুখে এসে দাঁড়াতেই পাদু’টোর মালিক চাপা স্বরে ডাকলেন কাউকে।
“ শম্ভু?”
তৎক্ষনাৎ অন্ধকার ভেঙে এগিয়ে এলো এক কৃষ্ণাঙ্গ লোক। হারিকেনের মৃদুমন্দ আলোতে কেবল দেখা যাচ্ছে তার চিকচিক দাঁতক'টা। সম্মুখে দাঁড়িয়ে থাকা মালকিন তক্ষুনি নিজ শালের নিচ হতে বের করে আনলেন একখানা রুপির বান্ডিল। তা ধীরলয়ে শম্ভুর পানে বাড়িয়ে দিয়ে সর্তক গলায় শুধালেন,
“ খাবার খেয়ে নিক আগে। তুই এক ঘন্টা পরে যাবি ওর ঘরে। আমি বাড়ির ইলেক্ট্রিসিটির তার কেটে দিব তখন। ওই মেয়ে ততক্ষণে মাতাল হয়ে যাবে, হুঁশ থাকবেনা ওর! ঐ সুযোগে ওকে বস্তাবন্দি করে যেখানে ইচ্ছে সেখানে ফেলে দিয়ে আসবি। মনে রাখবি, ও যাতে আর কোনোদিন ফিরে আসতে না পারে।”
শম্ভু দাঁত কেলিয়ে হাসলো। বুকের দুপাশে হাত উঠিয়ে দোনোমোনো কন্ঠে শুধালো,
“ মাজি! হামকো থোড়া...!”
নারী লোভী শম্ভুর কথাটা বুঝতে খুব একটা সময় নিলেন না মালকিন। তিনি কেমন বাঁকা হেসে পরপর বলে উঠেন,
“ যা ইচ্ছে করিস! তবে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে করিস। আজকে রাতের মধ্যেই ও আমার মেয়ের জীবন থেকে সরে যাওয়া চাই!”
চলবে.....
#মির্জা_সায়ান_মুগ্ধ — পর্বঃ৫৭(খ)
#jannatul_firdaus_mithila
“ যা ইচ্ছে করিস! তবে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে করিস। আজকে রাতের মধ্যেই ও আমার মেয়ের জীবন থেকে সরে যাওয়া চাই!”
মুহুর্তেই মুখাবয়বে লালসার তৃপ্তি ফুটে উঠল শম্ভুর। কালচে ঠোঁট দু'টো আপনাআপনি বেঁকে গেল পৈ শা চি ক আনন্দের পূর্বাভাসে। তৈলাক্ত দেহখানা কোনমতে নাড়িয়ে চাড়িয়ে এগোয় সে। পথিমধ্যে ফের কিছু মনে পড়ে যাওয়ায় পাদু’টোয় রুখ টানে শম্ভু। ঘাড় বাকিয়ে তাকায় অন্ধকারের সিন্দুকে দাঁড়িয়ে থাকা মালকিনের পানে! রয়েসয়ে এক গাল হেসে, দোনোমোনো করতে করতে শুধায় সে,
“ মা জি!”
বিরক্তিতে কপাল গোছালেন সুদীপা রায়। মাথার ওপর জড়িয়ে থাকা পাতলা শালটা আরেকটু টেনেটুনে, মুখ ঢেকে নিলেন আলগোছে। নিরব কদমে কয়েক হাত এগিয়ে এসে চাপা ক্ষোভে আওড়ালেন,
“ কি হয়েছে?”
মালকিনকে এক আকাশসম হতবাকতায় ডুবিয়ে দিয়ে নিষ্পাপ কায়দায় দাঁতকপাটি বার করে হাসলো শম্ভু। বাহাতে আলতো করে চুলের গোড়া চুলকাতে চুলকাতে খানিক নিচু স্বরে বলে উঠল,
“ একথাল ভাত তৈয়ার করে রাখিয়েন মা জি। গরম গরম ভাত। পারলে লগে একটুখানি ঘি ছড়ায় দিয়েন। সক্কাল তোন পেডে ব্যাদনা! ভাত খাইবার পারিনাই মা জি। আভি বহুত ভুক লাগছে। হাম কামডা সাইরা আসি। আপ ততক্ষণে ভাতডা বাইড়া রাখিয়েন।”
অভাবের দায়ে বাঁকা পথে হাটছে শম্ভু! তা যে অজানা নয় সুদীপা রায়ের। বেচারার এহেন অভাবের সুযোগটুকুই বড্ড কাজে লাগালেন বিচক্ষণী! সামান্য গলা খাঁকারি দিয়ে পরপরই গুরুগম্ভীর কন্ঠে শুধালেন,
“ তুই যা শম্ভু! আমি ভাত রেডি রাখবো।”
কাঙ্ক্ষিত আশ্বাস পেয়ে অমায়িক হাসলো শম্ভু! তক্ষুনি কাঁধের ওপর বস্তা তুলে পা বাড়ালো সম্মুখে। অতঃপর দেখতে দেখতে হারিয়ে গেল অন্ধকারের মাঝে। ওদিকে সুদীপা রায়ের দৃষ্টি অনড়! অন্ধকারেও চেয়ে আছেন একদৃষ্টে। হাত উঠিয়ে মাথার ওপর থেকে শালের আবরণটুকু সরিয়ে দিয়ে, পরক্ষণেই গম্ভীর কন্ঠে বিড়বিড়ালেন,
“ ভাগ্য ভালো হলে ফিরে এসে ভাত খেতে পারবি শম্ভু! নয়তো....”
★
সদ্য ওয়াশরুম থেকে বের হলো সপ্তদশী! ক্ষুদ্র মুখখানায় তার এখনো মুক্তোর ন্যায় পানির ছিটাফোঁটা স্পষ্ট বিদ্যমান। হাতে একখানা তোয়ালে মেয়ের, আলতো করে মুছে যাচ্ছে সিক্ত মুখ। ধীরলয়ে কাউচের পানে আগাচ্ছে পা। কয়েক কদম সম্মুখে এসে দাঁড়াতেই রমণীর ক্লান্ত দৃষ্টিজোড়া একত্রে নিক্ষিপ্ত হলো কাউচের অভিমুখে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট্ট টেবিলের ওপর। সেথায় একে-একে সাজিয়ে রাখা কয়েক পদের খাবার দাবার। কি সুন্দর ঘ্রাণ বেরুচ্ছে! তন্মধ্যে সর্ষে ইলিশের ঝাঁঝালো ঘ্রাণটা যেন সবকিছু ছাপিয়ে রমণীর নাসারন্ধ্রের সরু ছিদ্র দিয়ে ভকভক করে প্রবেশ করল। মুহুর্তেই মায়াবিনী টের পেলো — তার পেট ডাকছে! উদরে অবস্থিত ক্ষুধার্থ ইঁদুর গুলো দৌড়াচ্ছে রীতিমতো। মাহি'র আর তর সইলো না। দুপুর থেকে না খেয়ে থাকায় ক্ষুধায় অন্ধ সে, তক্ষুনি পা ছুটিয়ে গিয়ে ধপ করে বসে পড়ল মখমলি কাউচের কোলে। ব্যস্ত ভঙ্গিতে হাতে প্লেট নিয়ে ভাত নিলো কিছুটা। অতঃপর আর কোনোদিক না তাকিয়ে বাটি থেকেই সর্ষে ইলিশের তরকারিটুকু তুলে খেতে লাগলো রমণী। মুহুর্তেই জিভের ডগায় দারুণ স্বাদে চোখদুটো আপনা-আপনি বুঁজে এলো তার। রয়েসয়ে পরিতৃপ্ত কায়দায় সবটুকু ভাত মাখিয়ে বড্ড শৃঙ্খলায় খেতে লাগলো সপ্তদশী। আয়েশ করে চাটতে লাগলো আঙুলের ডগাগুলো। এরইমধ্যে হুট করেই মাথাটা কেমন চক্কর দিয়ে উঠল তার। চোখদুটোর দৃষ্টি হতে লাগলো ঘোলাটে! মাহি হতভম্ব। ডানহাতে খাবার প্লেটটা ধরে রেখে, বাঁহাতে চেপে ধরল মাথার একপাশ। অস্থিরতায় ব্যাকুল হয়ে আওড়াল,
“ আশ্চর্য! মাথাটা কেমন ভনভন করছে কেনো আমার? এমন ঘুমঘুম পাচ্ছে কেনো হঠাৎ করে?”
নিজ মনে উত্থাপিত প্রশ্নের উত্তরে নিরব মাহি। দৃষ্টিযুগল ঝাপ্সা হতেই দূর্বলতা বাড়লো তার হাতের। অবহেলায় কাঁচের প্লেটটা কেমন মুহুর্তেই খসে পড়ল হাত থেকে। কন্ঠায় তীব্র খরা অনুভুত হতেই দূর্বল হাতদুটো সম্মুখে বাড়ায় বোকা মানবী। কাঁপা কাঁপা হাতে পানিভর্তি গ্লাসটা তুলে এনে ঠোঁটের ডগায় বসাতেই এক বিদঘুটে গন্ধে গা গুলিয়ে উঠে তার। মুখটা ত্রস্ত কুঁচকে গেল ঘৃণায়! তবুও তীব্র তৃষ্ণায় ধুঁকতে থাকা সপ্তদশী উপায়ন্তর পেলো না তেমন। অনিচ্ছা সত্ত্বেও বিদঘুটে গন্ধযুক্ত পানিটুকু ঢকঢক করে গিলে নিলো দুবারে। ওমনি ঝাঁঝালো তেঁতো স্বাদে নাকমুখ কুঁচকে গেল মাহি'র। তৃষ্ণা মেটাতে গিয়ে ভুলক্রমে ঝাপ দিলো নেশার অতল সমুদ্রে।
__________________________________________
মূল রায় জমিদারবাড়ির ঠিক পেছনে পুরনো আমবাগান এবং বাঁশঝাড়। খানিকটা আড়ালে একটি পরিত্যক্ত একতলা, চুন-সুরকির ছোট দালান! দালানের কোথাও তেমন আলোর দেখা নেই। পুরনো দিনের দু/তিনটে ঘর পেরিয়ে সামনে সরু বারান্দা, জানালায় মরিচে ধরা লোহার শিক। দরজায় কোনমতে আঁটকে আছে ঘুনে খাওয়া পুরনো কাঠের পাল্লা। বহু বছর আগে যা একসময় ব্যবহৃত হতো জমিদার কর্মচারীদের থাকার ঘর হিসেবে, তা এখন সাধারণের জন্য পরিত্যক্ত!
পরিত্যাক্ত বাড়ির একদম শেষের ঘর! বহুদিন ধরে আবদ্ধ থাকায় চারিদিক থেকে ভেসে আসছে স্যাঁতস্যাঁতে দেয়ালের উটকো গন্ধ। পায়ের তলায় ইট-সিমেন্টের জমিনে ক্ষয় ধরেছে বেশ। মনস্টার নামক বলিষ্ঠ সুদর্শন দাঁড়িয়ে আছেন কামরার ঠিক মাঝখানে। চিরচেনা স্বভাবসূলভে গা উদোম তার, একহাতে ধরে রাখা একখানা ধারালো চাপাতি! চুন-খসা সিলিং হতে ঝুলতে থাকা হলদেটে ল্যাম্পশেডের মৃদু আলোয় চাপাতির গা-টা কেমন চিকচিক করছে। সম্পূর্ন মুখাবয়ব তার আড়াল হয়েছে কালো রঙা বালাক্লাভা মাস্কের আবরণে। মাস্কের ওপর দিয়েই অনবরত ফুঁকছে সিগার! তার ঠিক পেছনে দু'হাত দুরত্বে দাঁড়িয়ে আছে এডউইন। নতমুখ তার, সে-ই সঙ্গে গম্ভীর অভিব্যক্তি। পাশের কক্ষ হতে তখনো ভেসে আসছে মৃদু গোঙানির শব্দ। যেন মুখের ওপর কাপড় পেঁচিয়ে কাউকে ইচ্ছেমতো অত্যাচার করা হচ্ছে সেথায়। মাঝেমধ্যে ধেয়ে আসছে বেশকিছু জোরালো পায়ের আঘাতের শব্দ! এরইমধ্যে কক্ষে বিরাজমান নিরবতার দেয়াল ভাঙতে নিজ উদ্যোগেই অধর নাড়ালো এডউইন। কেমন ভীতসন্ত্রস্ত কন্ঠে শুধালো,
“ মনস্তার! আরেকটাবার নাহয় ভেবে....”
বাক্যটুকু পূর্ণ হবার ফুরসত পেলো না বেচারা এডউইন। তার পূর্বেই কর্ণকুহরে পৌঁছাল মুগ্ধের ভারী এবং তেজী কন্ঠ!
“ ম'রতে ইচ্ছে করছে?”
আঁতকে উঠে এডউইন! তড়িঘড়ি করে শুকনো ফাঁকা ঢোক গিলে মাথা নাড়ায় দু'ধারে। ভয়ার্ত কন্ঠে প্রতুত্তরে বলে,
“ ন-না মনস্তার!”
তৎক্ষনাৎ চোয়ালের পেশি টানটান করল মুগ্ধ! আঙুলের ভাঁজে আঁটকে রাখা জ্বলন্ত সিগারটা মেঝেতে ছুঁড়ে দিয়ে, সেথায় পা পিষলো দাম্ভিকের ন্যায়। রুক্ষ হাতের মুঠোয় চেপে রাখা চাপাতির হাতলটা আরেকটু শক্ত করে চেপে নিয়ে, তক্ষুনি পিছু ঘুরল রূঢ় মানব। চোখের পলকে চাপাতিটা এডউইনের কন্ঠনালী বরাবর আলতো করে চেপে ধরতেই ভড়কায় এডউইন! তটস্থলক্ষণে বিস্ফোরিত দৃষ্টিতে তাকায় সম্মুখে। ওমনি মুগ্ধ কেমন দাঁত খিঁচে চিড়বিড়িয়ে আওড়াল,
“ ইফ ইউ ডোন্ট ওয়ান্না ডা'ই, সো জাস্ট শাট ইউ'র ফা'কিং মাউথ বাস্টা'র্ড! নয়তো ওর জায়গায় তোর গর্দান যাবে।”
তৎক্ষনাৎ ভয়ার্ত ঢোক গিললো এডউইন। নেত্র নামালো মুহুর্তব্যয়ে। ধীরলয়ে কাঁপা কাঁপা কন্ঠে শুধালো,
“ ওকে মনস্তার।”
সহসা চাপাতি সরায় মুগ্ধ! দৃঢ় চোয়ালে কটমট শব্দ তুলে পা বাড়ায় বা-দিকে। গটগটিয়ে মাত্র কয়েক সেকেন্ডে অপর কক্ষের দুয়ার পানে এসে দাঁড়াতেই অভ্যন্তরে থাকা গার্ডেরা কেমন জড়সড়ভাব ধরল তৎক্ষনাৎ। পেটানো কর্মে খানিকটা অব্যহতি ঢেলে, আহত ব্যক্তিকে ছেড়ে দিয়ে কদম পেছায় সকলে। মুগ্ধ ঢুকলো এবার। দৈবাৎ শক্তিতে ঘাড়টা সামান্য বাঁকিয়ে কুঞ্চিত দৃষ্টিতে তাকালো সম্মুখে। অদূরে মেঝেতে আহতাবস্থায় লুটিয়ে আছে শিবু। সঙ্গে দু'জন তারই সাঙ্গোপাঙ্গো! মা'র খেতে খেতে ছেলেগুলোর হয়েছে বেহাল দশা। চোখদুটো টেনে খুলতে গিয়েও পারছেনা যেন। মুগ্ধ এগোয় সেথায়। গুনে গুনে দু'টো কদম সম্মুখে বাড়াতেই অপর কক্ষ হতে আচানক ছুটে আসে এডউইন। সন্দিগ্ধ গলায় বলে ওঠে,
“ মনস্তার! আপনার বাড়িতে হঠাৎ করেই সব লাইট অফ হয়ে গিয়েছে। অথচ এখানকার লাইটগুলো এখনো জ্বলছে!”
মুহুর্তেই স্থবির হলো মুগ্ধ। ব্যস্ত পায়ে টানলো রুখ। কপালের চামড়ায় গোটাকতক সন্দিষ্ট ভাঁজ টেনে ভাবলো কিছু একটা। পরক্ষণেই চোয়াল শক্ত হয়ে এলো রূঢ় মানবের। বলিষ্ঠ পাদু’টো তৎক্ষনাৎ ঘোরালো উল্টোপথে। ক্ষুব্ধ বাঘের ন্যায় হিসহিসিয়ে ছুটলো সে। হাতে তার তখনো ধরে রাখা ধারালো চাপাতিটা! এডউইন গম্ভীর মুখে তক্ষুণি দুয়ার ছেড়ে দাঁড়ালো। মুগ্ধ তাকে পাশ কাটিয়ে চলে যেতেই ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেললো বেচারা। ধীরলয়ে আপনমনে বিড়বিড় করে আওড়াল —
“ আজ মনে হয় হেক্সা ডান হয়ে যাবে কিছুক্ষণ পরেই! সো স্যাড অফ দ্যাম। চু চু চু!”
_______________________________________
দূর্বার গতিতে ছুটছে মুগ্ধ! ব্যস্ত কদমে সিঁড়ি বেয়ে উঠছে অন্দরমহলের তিনতলার দিকে। ঘেমে-নেয়ে একাকার তার সুদর্শন বদন। অবচেতন হৃদয়টা কেমন ধ্বকধ্বক করছে সপ্তদশীর চিন্তায়। মেয়েটা অন্ধকারে ভয় পায়! আলো না থাকায় নিশ্চয়ই এতক্ষণে কেঁদেকেটে বুক ভাসিয়েছে। এহেন চিন্তায় ব্যাকুল নির্দয় মানব। অন্ধকারেই বড্ড দক্ষতায় ছুটে এলো রমণীর কক্ষের দারপ্রান্তে। ব্যগ্র দু'হাতে আচানক দুয়ার ঠেলে কক্ষে ঢোকে মুগ্ধ। ওমনি বিদঘুটে অন্ধকারে চোখদুটো বুঁজে এলো তার। নিরব কদমে সম্মুখে এগোতে এগোতে সন্দিহান গলায় ডাকলো,
“ সিগনোরা!”
তৎক্ষনাৎ প্রতুত্তর আসেনি তেমন। তবে একখানা রিনরিনে কন্ঠের খিলখিল হাসির শব্দ ঠিক পৌঁছুলো রূঢ় মানবের কর্ণকুহরে। তক্ষুনি পাদু’টো জমে গেল মুগ্ধের। সন্দিগ্ধতায় গুটিয়ে গেল কপালের চামড়া। ভারী কন্ঠে ফের ডাকলো,
“ সিগনোরা?”
এবারে খিলখিল হাসির শব্দটা বেশ জোরালো হলো মনে হচ্ছে! রয়েসয়ে প্রতুত্তরে রিনরিনে কন্ঠ ফুঁড়ে বেরিয়ে এলো,
“ হ্যাঁ জান!”
বাক্যটুকু কর্ণধার হতেই অন্ধকারে আঁচানক হোঁচট খেলো মুগ্ধ। পড়তে পড়তে কোনরকমে বাঁচলো রুশদী কিং। পরমুহূর্তে নিজেকে সামলে নিয়ে, মুখভঙ্গিতে একরাশ হতবুদ্ধিকর ভাবস্রোত লেপ্টে সন্দিহান গলায় পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ঁল,
“ কি বললি তুই?”
“ কাছে আসো জাআআআআআন! তোমার টসটসে গাল বরাবর ঠেসে দু'টো চুমু খাবোওওওওও।”
মুহুর্তেই হতবাকতার সমুদ্রে সাঁতার না জানার অপরাধে গলা অব্ধি ডুবে গেলো মুগ্ধ! ভাব ধরল হতবিহ্বলের ন্যায়। কিয়তক্ষন মৌন থেকে অন্ধকারেই পা আগায় সে। কিন্তু রমণীকে হাতের নাগালে না পেয়ে চোয়াল শক্ত হলো তার। সাপের ন্যায় ফোঁস ফোঁস করতে করতে দাঁত খিঁচে শুধালো,
“ রাত-বিরেতে বাংলা ম দ গিলেছিস বেয়াদব? নিজের থেকে একযুগ বড়ো মুরুব্বিকে ঠেসে চুমু খাওয়ার কথা বলিস কোন সাহসে নির্লজ্জ মেয়েছেলে?”
কথাটা শেষ হতে না হতেই চমৎকার ধ্বনিতে হেসে ওঠে মাহি। অন্ধকার কূপে আড়াল থেকে আওড়ায়,
“ মুরুব্বি যদি হয় তোমার মতো হ্যান্ডসাম এন্ড হট, তবে আমি আজীবন নির্লজ্জ খেতাবে ভূষিত হতে রাজি জাআআআআন! কাছে এসো আমার কুচুপুউউউউ! আমার গুলুগুলু! আমার সোনাআআআআ। আ'ই ওয়ান্না গিভ ইউ আ টাইইইইট হাগ!”
বিরক্তিতে নাকমুখ কুঁচকে গেল মুগ্ধের। রাগে-জেদে নিম্নাংশের অধর চলে গেলো ধারালো দাঁতের তলায়। প্রকাশ্যে মেয়েটাকে একটুখানি ছুঁতে গেলেই — অসভ্য, নির্লজ্জ, বেহায়াসহ আরও কত কত অভিনব নাম-খেতাবে ভূষিত হতে হয়েছে তাকে, অথচ এখন দেখো! অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে নির্লজ্জ মেয়েছেলেটা কিসব উদ্ভট কথাবার্তা বলে যাচ্ছে তাকে। এহেন ভাবাবেগে ক্ষুব্ধতায় হিসহিস করতে করতে তৎক্ষনাৎ শরীর ঘুরিয়ে দাঁড়ায় মুগ্ধ। বড় বড় নিশ্বাস ফেলে নিজ উপচে পড়া রাগগুলো প্রশমিত করার প্রয়াসে মত্ত হলো পরক্ষণেই!
★
বিদঘুটে অন্ধকারে চারপাশ যেন ডুবে আছে এক অতল গহ্বরে। বোকার ন্যায় টর্চ লাইটের আলো জ্বালাতে ভুলে গিয়েছে শম্ভু। এগোনোর পথে হাত খসে টর্চ লাইটটা যে কোথায় পড়লো! তা খুঁজতে গিয়ে সময় নষ্ট করার মতো বোকামি করল না ময়লা পুরুষ। কার্যসিদ্ধির প্রয়াসে এক হাতে বস্তা আঁকড়ে ধরে, অন্ধের ন্যায় হাতড়ে-হাতড়ে কোনোরকমে এগোচ্ছে সে। কয়েক গজ পথ পাড়ি দিতেই টের পেলো — কাঙ্ক্ষিত ঘরের দরজা খোলা। ওমনি পাদু’টো থেমে গেল শম্ভুর। আনমনে ভাবল —
“ ঘরের দুয়ার খুইলে রাখছে কার লাইগ্গা? আমার লাইগা না-কি?”
ভাবনার ডোরে আষ্টেপৃষ্টে আঁটকে থেকে বোকার ন্যায় হাসলো শম্ভু! তবে সর্তকতায় দাঁতকপাটি কেলিয়ে হাসেনি সে। কর্মের উদগ্রীবতায় পা বাড়ায় ফের। গরমে অতিষ্ঠ সে, ঘেমে-নেয়ে একাকার ইতোমধ্যে। কিন্তু কর্মের টানে ঠিকই এগোচ্ছে!
এমনিতেই চারপাশে সে-কি ঘুটঘুটে অন্ধকার! তার ওপর শম্ভুর ওমন ময়লা গায়ের রঙ। দুটো মিলিয়ে বড্ড উপকার হলো শম্ভুর। অন্ধকারে সযত্নে তলিয়ে গিয়ে এগোলো দক্ষের ন্যায়। দু'হাত এদিক-ওদিক ছড়িয়ে হাঁটছে শম্ভু। বোকার ন্যায় হাত নাড়তে গিয়ে আঁচানক অন্ধকারের ভেতর কোনো এক ইস্পাত-দৃঢ় অচেনা বস্তুর সঙ্গে তার তৈলাক্ত হাতখানা স্পর্শ হলো খানিক। বস্তুটি আসলে কি? তা যাচাই করার প্রয়োজনটুকুও বোধ করল না শম্ভু। বরং স্বভাবসুলভ কৌতূহলে বস্তুটাকে সজোরে খামচে ধরল সে! ওমনি নিস্তব্ধ অন্ধকার চিরে সম্মুখ থেকে ভেসে এলো এক ক্ষিপ্ত হুংকার—
“হু দা ফা'ক ডেয়ার টু টাচ মা'ই ‘পাখি’? অন্ধকারের মধ্যে কোন লু*চ্চা কু***বাচ্চা করলি রে এই কাজ?”
বাক্যটি শেষ হওয়ার আগেই প্রচণ্ড ক্রোধে ছোড়া এক জোরালো লাথি এসে সজোরে আঘাত হানলো শম্ভুর তৈলাক্ত বুক বরাবর। মুহূর্তেই ভারসাম্য হারিয়ে অদূরে ছিটকে পড়ল বেচারা শম্ভু। কয়েক সেকেন্ড হতভম্বের ন্যায় মাটিতে পড়ে থেকে কোনোরকমে মাথা তুলে সম্মুখের অন্ধকারের দিকে তাকাল সে। চোখেমুখে একরাশ বিস্ময় ঢেলে হতবুদ্ধির ন্যায় আওড়াল —
“বেডি ধরবার লাগি আইসা, বেডা আইলো কইত্তে?”
বেচারার কন্ঠে হতবুদ্ধিকর ভাবস্রোত! তন্মধ্যে অন্ধকার হাতড়ে ছুটে এলো মুগ্ধ। ক্ষুব্ধ বাঘের ন্যায় এক আগ্রাসী হিং স্র থাবায় আচমকা চেপে ধরল বেচারা শম্ভুর তৈলাক্ত গ্রীবাদেশ। সেথায় নিজ শক্তপোক্ত হাতের ব্যাপক জোর বসাতেই অদূর হতে ধেয়ে এলো সপ্তদশীর নিষ্পাপ রিনরিনে কন্ঠ!
“ জাআআআন! তোমার “ পাখি ” মানে? তুমি আবার পাখি পালো কবে থেকে? আগে কোনোদিন বলোনি তো! কি নাম তোমার পাখির? দাও তো পাখিটা আমার কাছে। একটু আদর করে দিই। ইউ নো কুচুপুউউউ? আ'ই লাভ পাখি'স!”
এপর্যায়ে রূঢ় মানবের রাগের পারদ যেন তরতর করে বেড়ে গিয়ে আকাশ ছুঁলো। একহাতে শম্ভুর কন্ঠা চেপে রেখে, দাঁত কিড়মিড়িয়ে ঝাঁঝিয়ে আওড়াল,
“ চুপ কর নির্লজ্জ মেয়েছেলে! নয়তো থাপড়ে গাল লাল করে দিব বলে দিলাম।”
“ দাও না সোনা! দাও দাও। থাপ্পড় দিলেও তুমি দিবে, আদর করলেও তুমি করবে। তাই আসো না প্লিইইইজ।”
সুদর্শন এবার বেশ বুঝলো — এই মেয়ে নির্ঘাৎ নিজ অজান্তে নেশা-পানি করেছে। নয়তো এমন দুঃসাহসিক কথাবার্তা তার মুখ দিয়ে থোড়াই বেরুতো! রূঢ় মানব চোয়াল শক্ত করল ফের। শক্ত হাতের জোরালো শক্তিতে শম্ভুর কন্ঠনালী চেপে ধরে, বেচারাকে টানতে টানতে ঘর ছেড়ে বের হতে উদ্যোত হতেই পেছন থেকে ফের শোনা গেল বোকা মানবীর বোকা কন্ঠ!
“ জাআআআআন! কই যাও?”
প্রতিত্তোর করল না মুগ্ধ। অথচ গলার যন্ত্রণায় শম্ভু খানিক চেঁচিয়ে উঠতে গেলেই সে ঘটিয়ে বসল আরেক কাণ্ড। মুহূর্তেই হাতে থাকা চাপাতিটি তুলে এনে আড়াআড়িভাবে চেপে ধরল বেচারার উন্মুক্ত মুখ বরাবর। রুষ্ট ক্রোধে শক্ত হাতে চাপ বাড়াতেই শম্ভুর গালের দুপাশের মাং সে ফুটে উঠল তীব্র ছে দের দাগ। ব্যথায় কুঁকড়ে গেল শম্ভুর মুখ, গলায় বাড়ল তীব্র আত্মচিৎকারের স্বর। অথচ অন্ধকারে সম্মুখে বসে থাকা রূঢ় মানবের চোখে দয়া-মায়ার লেশমাত্রও নেই। সে কেমন হিং স্রতার সনে মুখ এগিয়ে এনে হুট করেই আওড়াল,
“ হুঁশশ! আওয়াজ করবি না। আমার চাশমিস ভয় পেলে, তোকে আমি নির্ঘাৎ মে রে ফেলব!”
মুহুর্তেই শম্ভুর আর্তনাদের করুণ সুরগুলো আঁটকে গেল গলার কাছে। মুখভর্তি উষ্ণ ক্ষারীয় তরলে মাখামাখি অবস্থা তার! ছলছলে চোখে কেবল তাকিয়ে আছে সম্মুখে। মুহুর্ত খানেক যেতে না যেতেই রূঢ় মানব আচমকা এক হেঁচকা টানে শম্ভুকে তুলে নিলো নিজ কাঁধে। পাদু’টোয় ভর দিয়ে শক্ত মুখে ঘর ছাড়বার উদ্দেশ্যে খানিক এগোতেই সপ্তদশী ফের ঘুমঘুম কন্ঠে আওড়াল,
“ গুলুগুলুউউউ! আসোওওওওও না।”
এবার আর রাগ করল না মুগ্ধ! উল্টো শম্ভুকে কাঁধে চেপে রেখে ঠোঁট পিষে হাসল খানিক। প্রতুত্তরে একইভাবে নাটকীয় ভঙ্গিতে প্রতুত্তর করল —
“ না গোওওওও! আ'ম বিজি নাউ!”
রমণী কি বুঝলো কে জানে! আচমকা তিরিক্ষি মেজাজে বলে উঠল —
“ কেনো? বিজি কেনো? তুমি কি হা গ তে যাচ্ছো?”
সপ্তদশীর এহেন বোকা বাক্যে না চাইতেও হেসে উঠে মুগ্ধ! সুদর্শন মুখখানায় সে-কি সৌন্দর্য ফুটেছে তার। ভাগ্যিস অন্ধকার! নয়তো নেশায় জড়ানো মানবী এতক্ষণে ঠিক ছুটে আসতো নির্দয় লোকটার কাছে। মুগ্ধ পা বাড়ায় সম্মুখে। প্রতিত্তোরে উল্টো প্রসঙ্গে আওড়ায়,
“ ঘর ছেড়ে বের হবি না সিগনোরা! আ'ল বি ব্যাক সুন!”
ব'লেই পা ছোটায় মুগ্ধ। তবে এরইমধ্যে পেছন থেকে ভেসে এলো মাহি'র উদ্বিগ্ন কন্ঠ!
“ সাবধানে হাই গো জাআআআআন!”
মুহুর্তেই থমকায় মুগ্ধ! বিরক্তিতে চিড়বিড়য়ে চাপা স্বরে আওড়াল,
“ বান্দীর মেয়ের মাথার ক'টা তাঁর আগে থেকেই ছেঁড়া, তার ওপর কোন কু***বাচ্চা বাকি তাঁর ক'টাও ছিঁড়ে দিয়ে গেল? একবার পেয়ে নেই শুধু হাতের কাছে! এ্যাই বান্দীর ছেলে! এসবে তোর হাত আছে তাই না?”
“ উমমম...ওগগগগগ...”
কপাল গোছায় মুগ্ধ! প্রবল বিরক্তিতে দাঁত খিঁচে বলে ওঠে,
“ চল বে বান্দীর ছেলে! তোকে আজ গায়ে হলুদ দিবো।”
____________________________________________
“ সে-ই কখন থেকে বাড়িতে আলো নেই! কি করছিস তোরা? বাড়ির মেইন সুইচবোর্ডটা চেক করেছিস আদৌও?”
“ যাইতেছি কর্তাবাবু।”
“ যাচ্ছি মানে? এই যাচ্ছি মানে কী? এখনো আলো এলো না কেনো? সব-কয়টা খেয়েদেয়ে হাতি হচ্ছিস উচ্ছিষ্টের দল-বল কতগুলা! যা তাড়াতাড়ি।”
অন্দরমহলের প্রশস্ত খোলা অঙ্গনে দাঁড়িয়ে থেকে হাঁক ছুঁড়ছেন হিমাংশু রায়। চিড়বিড়িয়ে গাল-মন্দ করে যাচ্ছেন গৃহকর্মীদের। বলিষ্ঠ পাঠার ন্যায় লোকগুলো অন্ধকারেই ছুটছে এদিক-ওদিক। হিমাংশু রায় যারপরনাই বিরক্ত। একহাতে পরনের ধুতির গোছ আঁকড়ে, সম্মুখে পা বাড়াতেই হুট করে পুরো বাড়ি ঝলমলিয়ে উঠল কেমন! তক্ষুনি থেমে গেলেন হিমাংশু রায়। খানিকক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে ধীরলয়ে ঘাড় উঁচিয়ে তাকালেন অদূরের তিনতলার পানে। সেথায় আগত সপ্তদশীর কক্ষের দুয়ারপানে স্ত্রীকে ওমন দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সন্দিষ্ট হলেন তিনি। খানিক ভ্রু উঁচিয়ে ইশারায় জিজ্ঞেস করলেন কিছু একটা। সুদীপা রায় গালের ভাঁজে জিভ ঠেললেন পরপরই। ইশারায় কিছু একটার ইঙ্গিত দিয়ে তৎক্ষনাৎ পা ঘোরালেন উল্টোপথে। তা দেখে স্বস্তির ঢেকুর তুললেন হিমাংশু রায়। অস্ফুটে বিড়বিড়ালেন,
“ যাক ভ গ বা ন! আপদটা ঘাড় থেকে নামলো তবে।”
★
নীরব কক্ষ! কক্ষের ওমন হাড় হিম করে দেওয়া নিরবতার মাঝে হঠাৎ কানে বিঁধল ধাতুর সনে ধাতু ঘষার একখানা বিদঘুটে শীতল শব্দ! শররররররশররর! ত্বরিত ভয়ার্ত ঢোক গিললো শম্ভু। আহত হাতদুটো তার পিছমোড়া করে পিঠের সনে বেঁধে রাখা। আহত মুখখানা থেকে এখনো অবলীলায় গড়াচ্ছে লহু। দূর্বল দৃষ্টিযুগল তার সম্মুখে আঁটকে আছে সে-ই কখন থেকে। অদূরেই পিঠ ঘুরিয়ে দাঁড়িয়ে আছে এক সুদর্শন ভয়ানক পুরুষ। আলোর বিপরীতে দাঁড়িয়ে থাকায় বলিষ্ঠ দেহখানা তার, কেমন স্বর্ণের ন্যায় চিকচিক করছে। এক সুস্পষ্ট ধোঁয়ার কুণ্ডলী উড়ছে মুখারন্যের চারপাশে। বোধহয় সিগার ফুঁকছে ভয়ংকর পুরুষ। তার বাহাতের মুঠোয় চেপে রাখা একখানা নিস্তেজ খন্ডিত ম স্ত ক। তা যে কার, তা নিয়ে বড্ড সন্দিহান শম্ভু! রূঢ় মানবের ঠিক সম্মুখে দু'টো জংলী কুকুর। আয়েশ করে ছিড়েখুঁড়ে খাচ্ছে কারো খ ন্ডি ত দেহ। এহেন পৈ শা চি ক কান্ড স্বচক্ষে দেখে জ্ঞান হারানোর উপক্রম শম্ভুর। নিবুনিবু হয়ে আসছে তার চোখদুটো! ঠিক তখনি রূঢ় মানব ধীরলয়ে শরীর ঘুরিয়ে দাঁড়ালেন। ঠোঁটের ফাঁকে সিগার চেপে রেখে দৃষ্টি করলেন তীক্ষ্ণ। গমগমে গলায় জিজ্ঞেস করলেন,
“ কে পাঠিয়েছে তোকে?”
জিভ কেটে গিয়েছে শম্ভুর! গোঙানি ছাড়া বাক বের হচ্ছে না মুখ দিয়ে। তা অবলোকন হতেই বাঁকা হাসলো মুগ্ধ। পাদু’টো দরজার অভিমুখে বাড়িয়ে কটমট কন্ঠে শুধালো,
“ ওয়েট কর বাস্টা'র্ড! তোকে একা একা চিতায় তোলাটা ঠিক হবে না। তোর সঙ্গ দিতে ওদেরকেও নাহয় নিয়ে আসি।”
★
কয়েক জোড়া ব্যস্ত কদম! পিছুপিছু হাঁটছে কয়েক হাত সম্মুখে নির্বিকার ভঙ্গিতে হাঁটতে থাকা শ্যাডো মনস্টারের। অদূরে দাম্ভিক কদমে হাঁটছে মুগ্ধ! তার ফর্সা পেটানো উদোম দেহে লোহুর ছিটেফোঁটার শেষ নেই! মুখটা মাখোমাখো লহুর দাগে। ট্যাটুশৈলীতে অঙ্কিত বলিষ্ঠ হাতদুটোয়ও তরতাজা লহুর উপস্থিতি। অথচ সেদিকে বিন্দুমাত্র উদ্বেগ নেই মাফিয়া বিস্টের। উল্টো নির্বিঘ্নে টানছে সিগার। তার ব্যস্ত পাদু’টো অন্দরমহলে প্রবেশ ঘটানোর পূর্বেই থমকে দাঁড়ায় একমুহূর্তের জন্য। ঠোঁটের কোণে সিগার চেপে অহমিকায় পরিপূর্ণ রূঢ় মানব, দু'হাত খানিকটা পেছনে বাড়াতেই তক্ষুনি একখানা ফিনফিনে কালো রঙা শার্ট হাতে নিয়ে এগিয়ে আসে এডউইন। বাধ্যের ন্যায় শার্টের হাতদুটো শ্যাডো মনস্টারের দু'হাতে জড়িয়ে দিয়েই কদম পেছায় সে। বাকিটুকু মাফিয়া বিস্ট নিজেই করলেন। এক ঝটকায় গায়ের ওপর শার্টখানা কোনমতে জড়িয়ে নিয়ে, ফের গতি টানলেন পায়ের। শার্টের বোতামগুলো অবহেলায় খুলে রাখা তার! সঙ্গে তাল মিলিয়েছে সদ্য ওলফকাটে সজ্জিত বাদামী চুলগুলো।
★
তিনতলার কাঠের করিডর দিয়ে ধুপধাপ শব্দ তুলে এগোচ্ছে মুগ্ধ! পা ছুটিয়েছে বোকা মানবীর কক্ষের পানে। তবে কক্ষের দ্বারপ্রান্তে এসে দুয়ারটা ওমন হা করে খুলে রাখা দেখে মেজাজ খিচঁল বদরাগী পুরুষের। চোয়াল শক্ত করে রুষ্টতার সনে কক্ষে প্রবেশ করতেই চোখদুটোর দৃষ্টি তীক্ষ্ণ হলো তার। সম্পূর্ণ কক্ষ ফাঁকা! রমণীর অস্তিত্বও নেই সেথায়। সঙ্গে সঙ্গে গম্ভীর হলো মুগ্ধ। গমগমে গলায় ডাকলো,
“ সিগনোরা?”
প্রতুত্তর আসেনি কোনো। তবে বিপরীত বারান্দা হতে তক্ষুনি ভেসে এলো সাউন্ডস্পিকারের উচ্চ শব্দ! সহসা পিছু ঘুরে দাঁড়াল মুগ্ধ। বিপরীত বারান্দা অর্থাৎ তার ঘরে ওমন উচ্চশব্দে গান বাজাচ্ছে কে? কার এতবড় সাহস, তার অনুমতি ছাড়া তারই ঘরে ঢোকে? ক্ষুব্ধ মুগ্ধ! ক্রুর দৃষ্টে ক্ষিপ্রতার সঙ্গে এগোয় নিজ ঘরের পানে। ঠিক তখনি পথিমধ্যে রূঢ় মানবের পায়ে বাঁধল নরম কিছু। ওমনি থমকায় মুগ্ধ। ঘাড় ঝুঁকিয়ে পায়ের তলায় তাকাতেই দেখে — সপ্তদশীর পরনের জামা তার পায়ের নিচে। মুহুর্তেই কপাল গোছায় মুগ্ধ। ত্বরিত ঝুঁকে এসে আলগোছে কাপড়টা তুলে নেয় হাতে। চোয়ালের পেশি টানটান করে নিয়ে ফের এগোয় সম্মুখে। পথিমধ্যে পাওয়া গেল সপ্তদশীর ট্রাউজার, হাতের ব্রেসলেট! মুগ্ধ একে একে সব তুললো হাতে। এপর্যায়ে অস্থিরতা বাড়লো তার। অবচেতন মনের কোণে প্রশ্ন জাগলো —
“ মেয়েটা ঠিক আছে তো?”
এহেন ভাবনার জেরে রূঢ় মানব ছুটলো নিজ ঘরের দিকে। দৌড়ে এসে ব্যগ্রতার সনে হালকা ভেজিয়ে রাখা দুয়ারটা একটানে খুলে দিতেই, আচমকা রূঢ় মানবের মুখের ওপর কোত্থেকে যেন ছিটকে এলো কাপড় জাতীয় কিছু। থমকায় মুগ্ধ! ত্বরিত মুখের ওপর থেকে কাপড়টা সরিয়ে এনে দৃষ্টি সম্মুখে বাড়িয়ে ধরতেই অভ্যন্তরে হোঁচট খায় সে। তার হাতে একখানা কালো রঙা অন্তর্বাস! কে ওভাবে মুখের ওপর ছুঁড়ে দিলো তা পরোখ করতে যে-ই না দৃষ্টি সম্মুখে তাক করল, ওমনি ফের হতবাকতায় থমকে যায় মুগ্ধ। অদূরেই টিভিতে গান বাজছে,
“ ek haath mai sharab duja piya mere saath
Peeti jaau peeti jau ni mai saari saari raat...!”
আর সেই গানের তালে কোমর ঢুলিয়ে নাচছে মাহি! গায়ে তার রূঢ় মানবের প্লাস সাইজ টি-শার্ট। যার দৈর্ঘ্য এসে থেমেছে মানবীর পায়ের কাছে। তার হাতে একখানা রেড ওয়াইনের বোতল! ক্ষণে ক্ষণে সেথায় চুমুক দিচ্ছে মেয়েটা!
চলবে......