#মির্জা_সায়ান_মুগ্ধ — পর্বঃ৬৬(ক)
#jannatul_firdaus_mithila
“ আহ! বেইব, হোয়াট আর ইউ শোয়িং! উফফ.. জাস্ট ফা'ক মি!”
অভ্যন্তরীণ কোন্দলে জর্জরিত রূঢ় পুরুষ! বেহায়া বাদামী চোখদুটো কেমন আঠার ন্যায় আঁটকে আছে সম্মুখের টিভির পর্দায়, যেথায় লাইভ প্রচারিত হচ্ছে — বোকা মানবীর ওমন অন্তরঙ্গ দৃশ্য! মায়াবিনীর মাখনরঙা মসৃণ উর্ধাঙ্গে বস্ত্রের ছিটেফোঁটাও নেই। আয়নার অভিমুখে দাঁড়িয়ে, সে কেমন গোমড়ামুখে বাহাতের তর্জনীর ডগায় অয়েন্টমেন্ট নিয়ে মাখছে কালসিটে দাগ বসে যাওয়া স্থানগুলোতে। মাঝেমধ্যে মৃদু জ্বলুনি অনুভূত হতেই নাকমুখ কুঁচকে নিচ্ছে অষ্টাদশী। ধারালো দাঁতের তলায় চটপট পিষে নিচ্ছে নিজ নিম্নাংশের অধর!
রমণীর এহেন দৃশ্য নিজ কক্ষে বসে অবলোকন করা মাত্রই অস্থিরতায় কেঁপে ওঠে মুগ্ধ! উদোম গা-টা তার ভিজে নেয়ে একাকার অবস্থা। ক্ষনে ক্ষনে কন্ঠনালীর উঁচু হাড়খানা নাড়িয়ে ঢোক গিলছে শক্ত। বাহাতের শক্ত জোরে কোলের ওপর চেপে রেখেছে বেচারা কুশনটাকে। ইশশ্! রূঢ় মানবের শক্ত কোলে কি দলাই-মলাইটাই না হচ্ছে বেচারা। অথচ সেসবে থোড়াই খেয়াল রয়েছে মাফিয়া বিস্টের? সে-তো অস্থির! রমণীর ওমন খোলামেলা দৃশ্যের পানে দৃষ্টি অটুট রাখতেই নিঃশ্বাস ক্রমাগত ভারী হচ্ছে তার। বাড়ছে বুকের ওঠানামার গতি! চোখদুটোর অন্তঃকোণে জমাট বেঁধেছে লালিমা। খানিকক্ষণের মধ্যেই অস্থির সুদর্শন বোধহয় পৌঁছে গেল উত্তেজনার চরম সীমায়! সর্বাঙ্গ কেমন ঝাঁকিয়ে উঠল তার। তৎক্ষনাৎ কোলের ওপর কুশনটা চেপে ধরল আরও জোর খাঁটিয়ে। কামড়ে ধরল নিজ নিম্নাংশের অধরকোণ। কয়েক মুহূর্তের জন্য তার বেগতিক অস্থিরতা থমকে গেল যেন। বুকের দ্রুত ওঠানামা ধীরে ধীরে স্তিমিত হলো। পাগলাটে অস্থিরতার কোন্দলে জর্জরিত রূঢ় মানব, এতক্ষণে দেহের ওপর স্পর্শ পেলো দীর্ঘ অবসাদের। হাত-পা ছেড়ে দিলো নিজেদের টান! মাংসপেশিতে নেমে এলো খানিক স্তিমিত ভাবস্রোত। যেন কোনো এক দীর্ঘ ঝড় শেষে হঠাৎ নিস্তব্ধতায় মুড়িয়েছে তার অন্তঃকোণ!
বলিষ্ঠ দেহের সম্পূর্ণ ভরটুকু কাউচের গায়ে এলিয়ে হাঁপাচ্ছে মুগ্ধ! হাঁপাতে হাঁপাতে শক্তপোক্ত হাতদুটো আলগোছে ছড়িয়ে দিয়েছে কোমরের দুপাশে। দৈবাৎ শক্তিতে বলিষ্ঠ ঘাড়টা বড্ড কাত করে, বাদামী চোখদুটোর গভীর দৃষ্টিজোড়া ঠেকালো অদূরে — টিভির পর্দায়! রমণী ধীরে ধীরে নিজ দেহসৌষ্ঠবে লাল রঙের আবেদনময়ী বস্ত্রের আবরণখানা জড়াচ্ছে। পিঠখোলা জামাটার কোমরের বড্ড নিচে লম্বা একখানা চেইনের দাগ! যা অব্ধি হাত পৌঁছুচ্ছে না মাহি'র। সে কত ব্যর্থ চেষ্টা মায়াবিনীর! কোমর ছুঁই ছুঁই চুলগুলো হাতের সাহায্যে সামনে এনে, চেইন টানার চেষ্টায় মত্ত সে। তবে তা কী আর হচ্ছে? বেয়াদবটা যেন উপরের দিকে উঠছেই না। মুগ্ধ কিয়তক্ষন নিরব চোখে তাকিয়ে রইলো টিভি স্ক্রিনের দিকে। পরপরই ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসির রেশ ফুটলো বেপরোয়া যুবকের। এক ঝটকায় কোলের ওপর চেপে রাখা কুশনটা বড্ড অনিহায় ছুঁড়ে ফেলল মেঝেতে। মুহুর্তেই বেচারা কুশনটা কেমন অবহেলায় ছিটকে গিয়ে পড়ল বেশ খানিকটা দূরের মেঝেতে। তার গায়ে স্পষ্ট হয়েছে সিক্ত ছোপ ছোপ দাগগুলো! খানিকবাদে রূঢ় মানবের বলিষ্ঠ পাদু’টো বড্ড দাম্ভিকতায় বেচারা কুশনটাকে ডিঙিয়ে চলে গেল কক্ষের বাইরে। আহারে! কিছুক্ষণ আগেও যাকে কোলে চেপে রেখেছিল বেয়াদব পুরুষ, সময় গড়াতে না গড়াতেই তা কেমন ঠাঁই পেলো মেঝেতে!
_____________________________
সময়ের কাঁটা এক-দু মিনিট গড়াতে গড়াতে নেমে এলো প্রায় মিনিট পাঁচেকের ঘরে। অথচ এখনো পেছন থেকে জামার চেইন টেনে উঠাতে ব্যর্থ মাহি। তার ক্ষুদ্র বদনটা রাগের তোড়ে লাল হয়ে গিয়েছে এতোক্ষণে। দাঁত তুলছে কটমট শব্দ! মায়াবিনী নিজ কর্মে বড্ড মনোযোগী, ঠিক তখনি কক্ষের দুয়ারে আঘাত হানলো একের পর এক জোরালো করাঘাত!
“ ধড়াম! ধড়াম! ধড়াম!”
তক্ষুনি চমকে উঠে মাহি। চমকে ওঠার দরুন নরম হাত দু'খানার তুলতুলে আঙুলের ডগাগুলো হুট করেই ছেড়ে দিলো চেইনের ডগা। রমণী খানিক ভড়কে তাকালো অদূরের দুয়ার পানে। দরজার গায়ে তীব্র করাঘাত অবিরত চলছেই! মাহি খানিক হকচকিয়ে গলা তুলে আওড়াল,
“ কী হয়েছে? কিছু লাগবে আপনার?”
দুয়ারের ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা অধৈর্য্য লোকটা কী আদৌও শুনলো তার কথা? তার দিশাহীন কায়দায় করাঘাত দেখে তো তা মনে হচ্ছে না! মাহি কপাল গোছালো বিরক্তিতে। তৎক্ষনাৎ কোমড় ঝুঁকিয়ে পায়ের কাছে পড়ে থাকা ভারী তোয়ালেটা তুলে এনে, আলগোছে জড়িয়ে নিলো নিজ গায়ে। পরক্ষণে দু'হাতে জামা ধরে চিড়বিড়িয়ে এগোলো দুয়ারপানে।
অধৈর্য্য মুগ্ধ! শক্তমুখে একের পর এক করাঘাত করেই যাচ্ছে। অধৈর্য্যের ধৈর্য্যের বাঁধ প্রায় ভেঙে আসবার যোগাড়! উদ্যোত হয়েছে জোরালো এক লাথিতে দুয়ারটা ভেঙে ফেলবে এক্ষুণি। বলিষ্ঠ পা-টা খানিক উঁচালো মুগ্ধ। জোরালো হামলাটা যে-ই না দুয়ারের গায়ে বসাতে যাবে ওমনি সম্মুখ থেকে দুয়ারটা কেমন খট করে খুলে গেল দুপাশ দিয়ে! মুহুর্তেই স্থির হয়ে গেল মুগ্ধ। থমকে গেল তার বাড়ন্ত পা-টা। এহেন কান্ডে দৃষ্টি সম্মুখে দাঁড়িয়ে থাকা গম্ভীর মানবীর গুছিয়ে রাখা কপালখানা গুছিয়ে গেল আরও। চোখেমুখে তার নেমে এলো বিশাল সন্দিগ্ধতা! তা নিরবে বোধগম্য হওয়া মাত্রই তৎক্ষনাৎ পা নামায় মুগ্ধ। দ্রুত কদমযুগল খানিক এগিয়ে এনে, দু'হাত পকেটে গুঁজে সটানভাবে দাঁড়াল মাহি'র অভিমুখে। চোয়াল করল দৃঢ়! মাহি হতভম্ব। ঘাড়টা বড্ড উঁচিয়ে বেগ নিয়ে তাকাল মুগ্ধের পানে। ধীরলয়ে হাতদুটো কোমরের দুপাশে ঠেকিয়ে, খেঁক খেঁক করে শুধালো,
“কী ব্যাপার? হঠাৎ করে ওমন একটা রাশিয়ান খাম্বার মতো সামনে এসে দাঁড়ালেন কেনো?”
অধৈর্য্য যুবকটা কেমন হুট করেই নিস্তেজ হয়ে গিয়েছে মায়াবিনীর মুখদর্শনে। চোখদুটোয় সে-কি প্রগাঢ়তা তার। মুহুর্তব্যয়েই মাহি'র ক্ষুদ্র বদনের ওপর বলিষ্ঠ ঘাড়টা সামান্য ঝুঁকিয়ে আনলো মুগ্ধ। কন্ঠে নামালো ভনিতাহীন দৃঢ়তা!
“ স্ক্রিনে দেখে পোষাচ্ছিল না, আ'ই মিন ফিল করতে পারছিলাম না! তাই লাইভ দেখতে চলে এলাম।”
ভড়কায় মাহি! অবোধের ছাপ ফোঁটালো মুখারন্যে। তৎক্ষনাৎ মুগ্ধের গভীর কথার পিঠে হকচকিয়ে প্রশ্ন ছুড়ঁল,
“ মানে? কিসের স্ক্রিন? কী দেখে পোষাচ্ছিল না আপনার?”
সহসা অধরকোণে দাঁত বসালো মুগ্ধ। বাদামী চোখদুটোয় নামালো এক আকাশসম শ্লেষাত্মক ভাবভঙ্গিমা। বলিষ্ঠ ঘাড়টা এবার বেশ ঝুঁকিয়ে এনে, মুখ ঠেকালো রমণীর তুলতুলে কানের লতি বরাবর। অতঃপর দুষ্টমির ছলে ক্ষীণস্বরে আওড়াল,
“ তোকে!”
অজানা শঙ্কায় সহসা কেঁপে ওঠে মাহি। হকচকিয়ে তক্ষুনি বাঁকায় ঘাড়। ওমনি রমণীর তুলতুলে অধরযুগল খানিক ঘর্ষণ খেলো রূঢ় মানবের রুক্ষ ওষ্ঠপুটের সনে। মুগ্ধ অনড়! অধর কামড়ে হেসে উঠল ক্ষনিকেই। তার ওমন হাসি দেখে ঢোক গিললো মাহি। জড়তায় ক'কদম পেছাতে গেলেই আচমকা মেদহীন কোমর বরাবর টান পড়ল তার। রূঢ় মানবের বলিষ্ঠ হাতের হেঁচকা টানে মুহূর্তেই রমণী পেছানোর বদলে একপ্রকার আছড়ে পড়ল মুগ্ধের ঘর্মাক্ত রুক্ষ বক্ষভাঁজে। এরূপ আছড়ে পড়ার অভিঘাতে রমণী সরু নাকের ডগাটা খানিক ব্যাথা পেল যেন। সে কেমন নাক-মুখ কুঁচকে নিলো পরপরই। গলায় অসামান্য ঝাঁঝ ঢেলে, ঘাড় উঁচিয়ে আওড়াল,
“ কি সমস্যা? হঠাৎ করে এভাবে টেনে ধরলেন কেন?”
মুগ্ধ হাসলো! ঘাড় নুইয়ে, নিজ উন্নত নাসারন্ধ্রের পাটাটা দিয়ে আলগোছে নাক ঘষে দিলো রমণীর। মুহুর্তেই অভ্যন্তরীণ বেপরোয়া অনুভূতির বিপক্ষে মৃদু কেঁপে ওঠে মাহি'র ক্ষুদ্র দেহ। আখিঁদ্বয় ঝোঁকানোর চেষ্টা চালালেও তা যেন ব্যর্থ হলো বরাবরই। তন্মধ্যে কর্ণকুহরে ভেসে এলো মুগ্ধের ভরাট কন্ঠ!
“ ইচ্ছে হলো তাই!”
রমণীর গভীর দৃষ্টিযুগল ধীরলয়ে উঁচু হলো। লোকটার ওমন পরিপ্রেক্ষিতে বাহ্যিক সত্তা একবার চাইলো — ক'টা ঝাঁঝালো বাক্য তার মুখের ওপর ছুঁড়ে দিবে, অথচ অভ্যন্তরীণ দুর্বল সত্তা লোকটার ওমন পাগলামো দেখে না চাইতেও মোমের মতো গলে যাচ্ছে কেমন। মাহি ঢোক গিললো সামান্য। জিভের ডগায় ঝাঁঝাল বুলি হলেও কন্ঠে রাখলো বড্ড নমনীয়তা। আওড়াল,
“ মগের মুল্লুক নাকি? যে যখন ইচ্ছে হবে, তখনই ধরতে হবে!”
কথাটা শেষ হবার প্রায় সঙ্গে সঙ্গে নিজ শক্ত হাতের জোরে মেয়েটাকে এক ঝটকায় উঁচু করে নিলো মুগ্ধ। সহসা রমণীর পাদু’টো ঝুলে গেল শূন্যে। অন্যহাতের রুক্ষ আঙুল দ্বারা রমণীর তুলতুলে চিবুকটা আলতো করে চেপে ধরে, মুগ্ধ কেমন তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে, ফুঁসে ওঠা গলায় শুধালো,
“ ডোন্ট ইউ ডেয়ার টু সে দ্যাট — ইউ আর মগের মুল্লুক! ইনস্ট্যাড, ইউ শুড সে—ইয়ো আর দ্য মাফিয়া শ্যাডো মনস্টার’স ব্যক্তিগত মুল্লুক! গট ইট বেইব?”
লোকটার এরূপ পাগল পাগল বাক্য শুনে অন্তঃকোণে হেসে কুটিকুটি খাবার যোগাড় মাহি'র, অথচ বাইরে থেকে বেশ দক্ষতায় মুখভঙ্গিতে কপট ভাব ধরে রেখেছে সে। দৃষ্টিতে সন্দিগ্ধতা নামিয়ে একপলক তাকিয়ে রইলো ফুঁসতে থাকা বেপরোয়া যুবকের পানে। পরক্ষণেই মুখ ঝামটি মে'রে অন্যত্র ঘোরালো ঘাড়। কপট রাগ নিয়ে আওড়াল,
“ হ্যাঁ! হ্যাঁ, কথায় কথায় ব্যাক্তিগত, ব্যাক্তিগত। ভাব এমন যেন তিনি আমায় কিনে ফেলেছেন!”
এটুকু কথাই যেন বেপরোয়া মানবের মাথায় দাউদাউ করে জ্বলতে থাকা অদৃশ্য আগুনে ঘি ঢালবার সমান হলো। কটমটিয়ে চোয়াল করল শক্ত! তৎক্ষনাৎ দুআঙুলের শক্ত থাবায় মায়াবিনীর তুলতুলে চোয়ালটা চেপে ধরে, এক ঝটকায় মুখটা ঘুরিয়ে আনলো নিজের দিকে। হতভম্ব মাহি! অধর নাড়িয়ে কিছু বলার পূর্বেই শুনতে পেলো, মুগ্ধের দাঁত কিড়মিড় কন্ঠ!
“ তোকে টাকা দিয়ে না কিনলেও, বহু আগেই পৃথিবীর সকল বাঁধন ছিন্ন করে তোকে নিজের নামে দলিল করে ফেলেছি আমি! কেনো, তুই জানতিস না এসব? এই তুই জানতিস না, বেয়াদব?”
সহসা দৃষ্টি নামিয়ে নিলো মাহি। অভিমানে ফোলালো গাল। দু'হাতে রূঢ় মানবের দৃঢ় বাঁধন হতে নিজ ক্ষুদ্র দেহখানি ছাড়ানোর বৃথা প্রয়াসে মত্ত থেকে, অভিমানভরা কন্ঠে আওড়াল,
“ না জানতাম না! দলিল তো করেছেন আমার ঘুমের সুযোগ নিয়ে। সেদিন ওমন একটা পরিস্থিতি তৈরী নাহলে আমি শতভাগ নিশ্চিত — আপনি তখনো আমায় বলতেন এ বিষয়ে। যাকগে, ছাড়ুন এবার। রেডি হবো আমি।”
অভিমানীর অভিমানী বাক্যে টনক নড়ল মুগ্ধের। গম্ভীর হলো পরপরই! বিচক্ষণী মস্তিষ্কটা অভ্যন্তরে ভাবলো কিছু একটা। পরক্ষণেই ভাবনার ঘোর কাটিয়ে বাঁকা দৃষ্টিতে তাকালো মাহি'র পানে। সন্দিগ্ধ গলায় শুধালো,
“ তোকে সজাগ না রেখে নিজের নামে দলিল করেছি বলে তোর আফসোস হচ্ছে, সিগনোরা?”
মাহি চোখ তুললো না। অভিমানে নাকের পাটা ফুলিয়ে পরপর জবাব দিলো,
“ না! ছাড়ুন এবার।”
বাধ্য যুবক তাই করল। আলতো করে মায়াবিনীকে নামিয়ে দিলো নিজ কোল থেকে। চঞ্চলা চড়ুই ছাড়া পেতেই উড়াল দেবার আশঙ্কায় দু'হাতে টেনে ধরল জামার একাংশ। অতঃপর ব্যস্ত কদমে চটপট ছুটে গেল কক্ষে। খানিকবাদে ফের আয়নার অভিমুখে এসে দাঁড়ালো মাহি। হুটহাট উদাসীনতায় উদাস মুখে, নতদৃষ্টে কাঁচ-ঘেরা মেকাপ-ভ্যানিটির ওপর থেকে একখানা কাঠের কম্ব তুলে চুলের দিকে বাড়াতেই যাবে ওমনি রমণী টের পেলো — তার গা থেকে মোটা তোয়ালের আবরনখানা সরে যাচ্ছে ক্রমশ। তৎক্ষনাৎ ভড়কে যায় মাহি। হকচকিয়ে দৃষ্টিপাত করল সম্মুখে। মুহুর্তেই তার চোখদুটো আঁটকে গেল আয়নায় দৃশ্যমান সুদর্শনের পানে। যিনি আপাতত ঠিক তার পেছনে। ধীরলয়ে মায়াবিনীর গা থেকে সরিয়ে দিচ্ছে তোয়ালেটা। অদ্ভুত এক লজ্জা মেশানো জড়তায় রমণী তৎক্ষনাৎ একহাতে খামচে ধরল তোয়ালের এককোণ। ভয়াতুর দৃষ্টি মেলে দূর্বল কন্ঠে আওড়াল,
“ কি করছেন?”
প্রতুত্তর করল না রূঢ় মানব। উল্টো গম্ভীর মুখে আচমকা রমণীর পেছনে থেকে নিজ হাঁটুজোড়া ঠেকালো মার্বেলের তকতকে মেঝেতে। এদিকে তার এহেন উদ্ভট কান্ডে যারপরনাই হতবাক মাহি। তার হতবাক কন্ঠফুঁড়ে কিছু বেরুনোর পূর্বেই রূঢ় মানব করে বসল আরেক কান্ড। একটানে মায়াবিনীর গা থেকে তোয়ালেটা সরিয়ে এনে ছুঁড়ে ফেলল অদূরে। সহসা লজ্জায় সিটিয়ে গেল মাহি! নড়চড় বাড়ালো ক্ষুদ্র দেহের। ঠিক তখনি পেছন থেকে ভেসে এলো মুগ্ধের গমগমে কন্ঠ!
“ ডোন্ট মুভ বেইব! লেট মি ডু মা'ই ওয়ার্ক ক্যাজুয়ালি।”
এহেন বাক্যে তৎক্ষনাৎ প্রস্তরখন্ডের ন্যায় জমে গেল মাহি। লজ্জা আর ভয়ের মিশেলে কুঁচকে নিলো চোখদুটো। ওদিকে, নিষ্পলক ভঙ্গিমা ধরেছে মুগ্ধের বাদামী চোখজোড়া। ঠায় তাকিয়ে আছে রমণীর ধনুকের ন্যায় বাঁকানো পিঠের ত্বকে। ফর্সা মসৃণ জেল্লাটা কেমন তকতক করছে দেখো! পিঠের মেরুদণ্ডের হাড় বরাবর জ্বলজ্বল করতে থাকা কালো কুচকুচে তিলটা বড্ড টানছে বেপরোয়া যুবককে। তার চোখদুটো যেন ধাঁধিয়ে উঠছে রমণীর এহেন সমক্ষ দৈহিক সৌন্দর্যে। নিজ অজান্তেই হিতাহিত জ্ঞান ভুলে মায়াবিনীর অঙ্গে দৃশ্যমান বিউটি স্পটের পানে মুখ আগাচ্ছে রূঢ় মানব। একপর্যায়ে তার উষ্ণ নিশ্বাসগুলো কেমন আছড়ে পড়তে লাগলো মাহি'র মসৃণ অঙ্গে। ধীরলয়ে রুক্ষ অধরযুগল তার আর কোনো বাঁধ বিপত্তির ধার না ধরে, আলতো করে নিজেদের ছোঁয়াল রমণীর মসৃণ পিঠে। মুহুর্তেই সর্বাঙ্গ কেঁপে ওঠে মাহি'র। ধনুকের ন্যায় কটিদেশখানা বাঁকা হয়ে গেল নিমিষেই। শক্ত হলো পদযুগলের তল! বেপরোয়া উম্মত্ত লোকটার কর্মকাণ্ড বড্ড বেগতিক। মায়াবিনীর কালো কুচকুচে তিলটার ওপর বসিয়ে রাখা রুক্ষ অধরযুগলের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র চুম্বন থেকে চুম্বনের রেশ ক্রমশ গাঢ় হচ্ছে! ঠোঁটের উষ্ণতা ছাপিয়ে যুবকের রসনা ইতোমধ্যে ছুঁয়েছল রমণীর কোমল ত্বক। এহেন ছন্নছাড়া, বেগতিক আদরের অভিঘাতে দূর্বল মাহি, কাঁপতে কাঁপতে দুহাতে চেপে ধরেছে ভ্যানিটির একাংশ। কম্পিত কণ্ঠে অস্ফুটে আওড়াচ্ছে।
“ মুগ্ধ... প্লিজ স্টপ!”
কে শোনে কার বারণ? বেপরোয়া ছেলেটা আদৌও ধার ধরেছে এসব বারণের? সে বরং আরও খানিকটা বাড়িয়ে দিলো নিজ পাগলামোগুলো। কখনো সিক্ত ঠোঁটের উষ্ণতায়, তো কখনো আবার রসনার দুষ্টু স্পর্শে কাঁপিয়ে তুলছে মায়াবিনীকে। মাঝেমধ্যে বেয়াদবের ন্যায় বসাচ্ছে ধারালো দাঁতের অসহনীয় পরশ! রুক্ষ আঙুলের মুঠোয় আলতো করে রমণীর পিঠের ত্বক জড়িয়ে ধরে আবারও ছেড়ে দিচ্ছে সে। রমণী আর সইতে পারলোনা এহেন উন্মত্ততা। তক্ষুনি অধরের ফাঁক গলিয়ে অস্ফুটে বার করে দিলো খানিক শীৎকার ধ্বনি! যা রূঢ় মানবের কর্ণকুহরে পৌঁছান মাত্রই হেঁসে ওঠে সে। নিজ বেপরোয়া কর্মকাণ্ডে অনিচ্ছায় রুখ টেনে আচ্ছন্ন দৃষ্টে তাকালো মাহি'র উম্মুক্ত পিঠ পানে। দেখল — কালো তিলটার চারপাশে জমাট বেঁধেছে লহু! কয়েক জায়গায় ধারালো দাঁতের কড়া উপস্থিতি স্পষ্টতর। রূঢ় মানব হাসলো নিরবে। তক্ষুনি হাত বাড়িয়ে দূর্বল রমণীর জামার চেইনটা ধীরে ধীরে উঠিয়ে দিতে দিতে বাঁকা কন্ঠে শুধালো,
“ ইউ নো হোয়াট, সিগনোরা? নাথিং ইন দিস ওয়ার্ল্ড ইজ মোর বিউটিফুল দ্যান দ্য লিটল মোলস অন ইয়োর প্রাইভেট স্পটস। বাই দা হেল ইন দ্য মনস্টার'স ওয়ে — তোর গায়ের হিড্যান বিউটি স্পটে লাল তিলটা কিন্তু বেশ সুন্দর মানিয়েছে!”
আকাশ থেকে টপকালো মাহি। অজানা আতঙ্কে আর একমুহূর্তও দেরি না করে তক্ষুনি ঘুরে দাঁড়াল পেছনে। চোখদুটোতে এক আকাশসম সন্দিগ্ধতা লেপ্টে, ভড়কানো কন্ঠে শুধালো,
“ ক-কি বললেন? ক-কিসের লা-ল তিল? আ-আমার এমন কোনো তিল নেই তো!”
বাঁকা হাসলো মুগ্ধ। রমণীর সমক্ষে দুহাঁটু গেঁড়ে বসে থেকে, ঘাড়টা কাত করল আলতো। দুষ্ট কন্ঠে পরপর শুধালো,
“ নেই?”
হতচকিত মানবী মিথ্যে বলবার সাহস করল আজ। তড়াক দু'ধারে নাড়ালো মাথা। তা দেখে ঠোঁটের কোণে শ্লেষাত্মক হাসি ফুটলো মুগ্ধের। তক্ষুনি এক হাত বাড়িয়ে আচমকা টেনে ধরল মাহি'র কোমল ডানপা-টা। যুবকের এহেন অতর্কিত কান্ডে হতভম্ব মাহি, সহসা পা ছাড়ানোর উদ্যেগ ঘটাতেই হাতের জোর বাড়ায় মুগ্ধ। জোরপূর্বক রমণীর তুলতুলে পা'টা আলগোছে তুলে এনে রাখলো নিজ প্রশস্ত উরুর ওপর। পরক্ষণে নিজ শক্ত তর্জনীটা ধীরলয়ে রমণীর পা গড়িয়ে উঠিয়ে আনতে আনতে আচানক থামালো মাহি'র জঙ্ঘার বাঁক বরাবর। অতঃপর স্থির দৃষ্টিতে বড্ড শান্ত গলায় শুধালো,
“ তাহলে এখানে যেটা রয়েছে... সেটা কী?”
মুহুর্তেই চমকে উঠে মাহি। মুখাবয়বে এক আকাশসম হতবাকতা লেপ্টে অস্ফুটে আওড়াল,
“ হোয়াদ্দা ফা'ক! হাউ ডিড ইউ নো দ্যাট?”
অধর কামড়ে হাসল মুগ্ধ। রমণীর উরুদেশে খানিক হাত বুলিয়ে ক্ষীণস্বরে আওড়াল,
“ আ'ই নো ইয়োর এভরিথিং, বেইব!”
সহসা চোয়াল শক্ত করল মাহি! এক ঝটকায় মুগ্ধের উরু থেকে পা সরিয়ে এনে কটমট কন্ঠে বলে উঠল,
“ অসভ্য, বেয়াদব লোক! আপনি নিশ্চয়ই আমার ওপর নজর রেখেছেন তাই না? লজ্জা করে না আপনার? একটা মেয়েকে এভাবে লুকিয়ে চুরিয়ে দেখতে?”
ঠোঁট উল্টায় মুগ্ধ। খানিকবাদে সটান হয়ে দাঁড়িয়ে সামান্য কাঁধ ঝাঁকিয়ে, ভাবলেশহীন কন্ঠে আওড়াল,
“ একটা মেয়ে? সিরিয়াসলি? ইউ আর নট যেন-তেন একটা মেয়ে, সিগনোরা! ইউ আর মিসেস অধীর রায়, দ্যাট মিনস ইউ আর মা'ইন। সো, তোকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখবো না তো কাকে দেখব? তুই ছাড়া দেখার মতো কি আছে আমার?”
যুবকের এহেন নির্লিপ্ত প্রতুত্তরে থমকে গেল মাহি। জিভের ডগায় বেশকিছু কটুবাক্য এসেও থেমে গেল অচিরেই। কেবল নাক ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে রইল সে। এই সুযোগে রমণীর মেদহীন বাঁকানো কোমর বরাবর হাত রাখল মুগ্ধ! পরপরই এক হেঁচকা টানে অষ্টাদশীকে নিয়ে এলো নিজের বড্ড কাছে। ঘাড়টা ভীষণ ঝুঁকিয়ে একহাতের আঙুলের ডগাগুলো আলতো করে ছোঁয়াল মাহি'র নরম তুলতুলে ওষ্ঠপুটের ওপর। কপট সন্দিগ্ধ গলায় শুধালো,
“ হোয়াট ইজ দিস, সিগনোরা? তোর ঠোঁট ফাটছে কেনো?”
অবোধ মাহি! যুবকের ওমন কপট বাক্যের পরিপ্রেক্ষিতে বোকার ন্যায় ঠোঁট উল্টে আওড়াল,
“ সত্যি ঠোঁটটা ফাঁটা ফাঁটা লাগছে? তাহলে তো লিপবাম প্রয়োজন। দেখি ছাড়ুন তো, একটু লিপবামটা ইউজ করি।”
কার্যসিদ্ধির আদ্য লগ্নে বাঁকা হাসল মুগ্ধ। আচমকা একহাতে চেপে ধরল মাহি'র নরম চোয়ালখানা। হাতের জোর বাড়িয়ে রমণীর মুখটা বড্ড উঁচিয়ে, নিজ ঠোঁটজোড়া আগালো রমণীর তুলতুলে অধরযুগলের পানে। প্রায় ডুবিয়ে দেবার পূর্বেই কেমন অদ্ভুত ভাব নিয়ে আওড়াল,
“ লিপবামের কী দরকার? আমি আছি না? আমার চাশমিসের লিপবাম!”
বলতে বলতেই রমণীর তুলতুলে ওষ্ঠপুটে ঠোঁট ডোবায় মুগ্ধ! এক গভীর আশ্লেষী টানে ঝড় তুললো মায়াবিনীর নরম ওষ্ঠপুটের ওপর। রমণী বাঁধ সাধার জোরে নেই! বাঁধ সাধলেও খুব একটা লাভ হবে না জানে। তারচেয়ে বরং চুপটি করে ভালো মেয়ের মতো দাঁড়িয়ে রইলো সে। ওদিকে, মুগ্ধ কেমন উন্মত্ত! বেগতিক আদরের সংস্পর্শে রমণীর তুলতুলে অধরযুগলের খানিক দফারফা করে আচমকা বিচ্ছিন্ন করল অধরযুগল। হাঁপাতে হাঁপাতে কপালে ঠেকালো কপাল! রমণী চোখবুঁজে ঢোক গিলছে। হাঁপাচ্ছে বেশ! এরইমধ্যে পাগল ছেলেটা কেমন হুট করেই বলে বসল,
“ লেট'স গেট ম্যারিড, সিগনোরা!”
তড়াক চোখ খুললো মাহি। নজর তুলে তাকালো সম্মুখের সুদর্শনের পানে। হকচকিয়ে জিজ্ঞেস করে উঠল,
“ হোয়াট? হেভ ইউ লস্ট ইয়োর মাইন্ড, বিস্ট? কিভাবে করবেন বিয়ে? কোন নিয়মে করবেন?”
তৎক্ষনাৎ প্রতুত্তর করল না মুগ্ধ। বরং রয়েসয়ে দু'হাতে আঁকড়ে ধরল মাহি'র কোমল মুখখানা। অতঃপর চোখে রাখল চোখ। বড্ড দৃঢ় কন্ঠে শুধালো,
“ তুই যেই নিয়মে বলবি সেই নিয়মেই করবো। তবুও আজ তোকে আমার করে ছাড়বোই, সিগনোরা! আ'ই কান্ট ওয়েট এনিমোর।”
থামলো মুগ্ধ! আচমকা ফিচেল হেসে ফের ভারিক্কি গলায় শুধালো,
“ বিয়ে নামক শেকলে হাসিমুখে আবদ্ধ হওয়ার ইচ্ছেটা যদিওবা প্রথম প্রথম তোর ছিলো, তবে কবুল বলে তোকে সারাজীবন নিজ মনঃগহীনের একমাত্র বাসিন্দা হিসেবে বন্দী করার ইচ্ছেটা নাহয় এমুহুর্তে আমিই পোষণ করলাম, চাশমিস। এক্ষুণি, এমুহুর্তে আমাকে বিয়ের করার জন্য কবুল বলবি চাশমিস, নয়তো তোর চোখদুটো আজ ভিন্ন এক ধ্বংসযজ্ঞের সাক্ষী হবে। যার দ্বারপ্রান্তে শুধু তুই থাকলেও, শেষপ্রান্তে থাকবে কেবল মাফিয়া বিস্ট! ইয়োর ব্লা'ডিবিস্ট!”
_____________________________________
জনমানবশূন্য সুনশান-নিস্তব্ধতায় মুড়িয়ে আছে গহীন জঙ্গলের চারপাশ! ক্ষনে ক্ষনে বাতাসের তালে অদূর থেকে ভেসে আসছে খেঁক শেয়ালদের কান্না। অথচ সবকিছু উপেক্ষা করে জঙ্গলের পথ ধরে ব্যাপক সর্তকতায় এগোচ্ছে এডউইন। শুকনো পাতায় তার ব্যাুটজুতোর আঘাত পড়তেই পাতাগুলো কেমন মর্মর শব্দ তুলছে। চারপাশে বিদঘুটে অন্ধকার! আকাশে আজ চাঁদ নেই। তবুও এহেন অন্ধকারে নির্বিঘ্নে এগোচ্ছে এডউইন। খানিকবাদে তার পাদু’টো এসে দাঁড়ালো পরিত্যক্ত কুয়োর সম্মুখে। কুয়োর মুখ বন্ধ! হাত বাড়িয়ে তার ওপর থেকে জঙ্গলের জরাজীর্ণ সরাচ্ছে এডউইন। কর্মের ফাঁকে ফাঁকে ঘাড়টা সামান্য এদিক-ওদিক বাঁকিয়ে আশপাশ একবার দেখে নিচ্ছে। নাহ! আশেপাশে কেউ নেই।
গম্ভীর মুখো এডউইন এবার ধীরলয়ে নিজ হাতে থাকা মোটা দড়ির গোছাটার একপ্রান্ত পেছনের এক মোটা গাছের সনে শক্ত করে বেঁধে নিলো। পরক্ষণে দড়ির অন্যপ্রান্ত হাতে গোটাতে গোটাতে তা এক ঝটকায় ছুঁড়ে ফেললো পরিত্যক্ত কুয়োর মুখে। ভেতরে যাবার পথ ঠিক করে, দক্ষ এডউইন এবার ধীরে ধীরে কুয়োর ভেতর পা রাখলো। দড়িটায় শক্ত করে আকঁড়ে ধরে ক্রমশ নামতে লাগলো নিচে!
★
বিদঘুটে অন্ধকারে নিমজ্জিত চারপাশ। কুয়োর ভেতর পা রাখতেই সামনে পড়ল একখানা মোটা দেয়াল। দক্ষ এডউইন দেয়ালটা ঠিক বাঁদিক থেকে ঠেলে দিলো অন্যপাশে। মুহুর্তেই মোটা দেয়ালটা বিনাশ্রমে সরে গেলো খানিকটা। এডউইন ঢুকলো ভেতরে। পাতালে তৈরী জেলখানার মতো জায়গাটায় অসংখ্য কামরা। প্রতিটি আবদ্ধ লোহার মোটা শিঁকে! আশেপাশে লাইটের স্বচ্ছ আলো নেই, রয়েছে আগুন জ্বলন্ত মশাল। যার দাউদাউ আগুনের তীব্রতায় কোনমতে আলোকিত চারপাশ। গম্ভীর মুখে সম্মুখে এগোয় এডউইন। ডানদিকে বাঁক নিয়ে চলে আসে পাকশালার ন্যায় ক্ষুদ্র জায়গাটায়। কি বিশ্রী, অপরিষ্কার জায়গাটা! খাবারের পঁচা দুর্গন্ধে গা গুলিয়ে ওঠার যোগাড়। এডউইন ত্রস্ত পকেট থেকে একখানা রুমাল বার করে এনে, বেঁধে নিলো নাক-মুখের ওপরে। পরক্ষণে এগোলো আরেকটু। অপরিষ্কার একখানা প্লেটে দু'দিনের বাসি-পচাঁ খাবারটুকু তুলে নিলো আলগোছে। অতঃপর প্লেটটা নিয়ে হাঁটা ধরল উল্টোপথে।
লম্বাটে এক বারান্দা পেরিয়ে একদম সম্মুখের অন্ধকারে নিমজ্জিত কামরার পানে এগোচ্ছে এডউইন। চারহাত দুরত্বে থেকেই সম্মুখের কামরা থেকে ভেসে আসা পঁচা দুর্গন্ধে বরাবরের ন্যায় গা গুলিয়ে উঠছে বেচারার। তবুও উপায়হীন সে, মনস্টারের আদেশে ঠিকই খাবার দিতে হবে — কামরায় থাকা মানুষটাকে। এডউইন গতি বাড়ালো পায়ের। কামরার অভিমুখে এসে সামান্য ঝুঁকে দৃষ্টি তাক করল মোটা শিঁকের ওপাশে। কামরাটায় এক ছটাক আলো নেই! সে বোধহয় ভেতরের মশালটা ধরায়নি আজ। এডউইন মহাবিরক্ত হলো! বিরক্তিতে কপাল কুঁচকে তক্ষুনি পকেট হাতড়ে বার করল কামরার অভিমুখে ঝুলন্ত তালাটার মোটা চাবিটা। ঝুঁকে থেকে তালার ভেতর চাবিটা পরপর দু'বার ঘোরাতেই খট করে খুলে গেল তালাটা। এডউইন ব্যস্ত হাতে তালা খুলে, ঘাড় ঝুঁকিয়ে প্রবেশ করল কামরাটায়। একহাতে তার এখনো খাবার প্লেট, অন্যহাতে তালা! অন্ধকারের মাঝেও গুনে গুনে পা বাড়াচ্ছে গম্ভীর মানব। বিরক্ত কন্ঠে ঘরে থাকা ব্যাক্তিকে আচমকা বলে ওঠে,
“ কতবার করে বলেছি, মশালটা জ্বালিয়ে বসবেন! আমাকে কী প্রতিবার আপনার বেতনভুক্ত চাকর মনে করেন না-কি?”
প্রতুত্তরে নীরবতা বিনে কিছুই পেলো না এডউইন। হাতে থাকা খাবারটা একপ্রকার ঝাঁঝ দেখিয়ে রাখল আধভাঙা চৌকিখাটের ওপর, পরক্ষণে পকেট হাতড়ে বার করল লাইটারটা। আঙুলের তীব্র ঘষায় লাইটারটা ধরিয়ে তা ক্রমশ আগালো মশালের দিকে। মুহুর্তেই আগুন স্পর্শ পেয়ে দাউদাউ করে জ্বলে উঠল মশালের আগাটা। সহসা কামরার বিদঘুটে অন্ধকারের প্রলেপ সরে গিয়ে সেথায় এবার ফুটে উঠল খানিকটা আলোর ছিটেফোঁটা। বিরক্ত এডউইন লাইটারটা নিজ পকেটে ঢোকাতে ঢোকাতেই পেছন থেকে স্পষ্ট শুনতে পেলো — ঘরে থাকা ব্যাক্তিটি অধিক ক্ষুধায় গোগ্রাসে গিলছে বাসী পঁচা দুর্গন্ধযুক্ত খাবারটুকু।
ফোঁস করে নিশ্বাস ফেলে এডউইন! পেছনে না ঘুরেই কেমন একটা উদাসীন কন্ঠে আচানক প্রশ্ন ছুড়ঁল,
“ আমার জানামতে — দ্য মাফিয়া শ্যাডো মনস্টার তার শত্রুদের বাঁচিয়ে রাখে না। আজ নাহয় কাল, ঠিকই মে'রে দেয়! তবে আপনার ক্ষেত্রে উল্টো হচ্ছে কেনো? সে আপনাকে এখনো বাঁচিয়ে রাখলো কেনো? কে আপনি?”
গ্রোগাসে খাবার গিলতে থাকা অপরিষ্কার, পৌঢ়া থেমে গেলেন হুট করেই। তার মাথাভর্তি এলোমেলো সফেদ রঙা চুল, জটলা পাকিয়ে আছে কেমন। চোখদুটো ঢেকে আছে ময়লার আবরণে। বহুদিন গোসল না দেবার কারণে গায়ে জমেছে দশ প্রলেপ ময়লা। দাঁতগুলোয় কেমন হলদে -কালসিটে অবস্থা! পৌঢ়া কাঁপতে কাঁপতে একবার দাঁত বার করে হাসলো। এডউইনের ছোঁড়া প্রশ্নের অভিঘাতে কেবল অধর বাঁকিয়ে আওড়াল,
“ ভিনসেণ্ট রোম্যানিও ওরফ মির্জা সায়ান রোম্যানিওর অর্ধাঙ্গিনী, অর্থাৎ শ্যামৌপ্তি দেবী রায় আমি!”
চলবে....
#মির্জা_সায়ান_মুগ্ধ — পর্বঃ৬৬(খ)
#jannatul_firdaus_mithila
“ ভিনসেণ্ট রোম্যানিও ওরফ মির্জা সায়ান রোম্যানিওর অর্ধাঙ্গিনী, অর্থাৎ শ্যামৌপ্তি দেবী রায় আমি!”
পৌঢ়ার আধো আধো ক্লান্ত বুলি! যা নিমিষেই ঝংকার তুলে দিলো — অদূরে উল্টোমুখে দাঁড়িয়ে থাকা গম্ভীর মুখো মানবের সর্বাঙ্গে! মশাল ধরে রাখা ইস্পাত-দৃঢ় কঠিন হাতদুটো তার অজান্তেই কেঁপে উঠল খানিক। যার অভিঘাতে জ্বলন্ত মশালটা প্রায় পড়তে পড়তে বাচঁলো এডউইনের শক্ত হাতের মুঠো হতে। স্তব্ধতায় সে কেমন ঢোক গিললো শক্ত। অবিশ্বাসের কঠিন আবেশে মুহুর্তেই বলিষ্ঠ কাঁধদুটো টানটান করে নিয়ে, ঘাড়টা সামান্য বাঁকিয়ে তাকালো পেছনে। তীর্যক দৃষ্টিজোড়ায় অপরিষ্কার পৌঢ়াকে আঁটকে নিয়ে তড়াক সন্দিগ্ধতায় গমগমে গলায় শুধালো,
“ কী বললেন?”
আচমকা ময়লা ময়লা দাঁতকপাটি বার করে খেঁক খেঁক করে হেসে উঠলেন পৌঢ়া। নিস্তব্দতায় মোড়ানো পরিবেশে বড্ড ভয়ানক শোনালো সে হাসি। পৌঢ়া হাসতে হাসতে নিজ দূর্বল শরীরটা খানিক দোলাচ্ছেন চৌকিখাটের এদিক-ওদিক! এডউইন মহাবিরক্ত এপর্যায়ে। পৌঢ়ার হুটহাট পাগলামি দেখে আন্দাজে আপনমনে ভেবেই বসল — পৌঢ়া এতক্ষণ যা যা বলেছে, সবটাই তার পাগলের প্রলাপ! পরপর দাঁত খিঁচল এডউইন। কপালে গোটাকতক বিরক্তির ভাঁজ টেনে তক্ষুনি শরীর ঘুরিয়ে দাঁড়ালো সে। শক্ত মুখে গটগটিয়ে মশাল হাতে এগোতে লাগলো কামরার প্রবেশদ্বারের অভিমুখে। ঠিক তখনি পেছন থেকে ভেসে এলো ক্লান্ত পৌঢ়ার হিসহিসানো কন্ঠে ছোঁড়া বাক্য!
“ রাক্ষসটা কোথায় রে? ক'দিন ধরে এলো না যে! মা'রলো না তো আমায়।”
থমকে দাঁড়ালো এডউইন। গুটিয়ে রাখা কপালের চামড়া আরও খানিকটা গুটিয়ে, দাঁত খিঁচল এবার। পরপর তিরিক্ষি মেজাজে প্রতুত্তর করল,
“ কেনো? মনস্টারের হাতে মা'র খেতে বুঝি খুব ভালো লাগে আপনার? মা'র খেতে খেতে মাথাটাও তো বোধহয় খুইয়েছেন। নতুবা নিজেকে শ্যামৌপ্তি দেবী রায় বলে পরিচয় দেবার মতো সাধ্যিই বা কোথায় পেতেন?”
সহসা হাসিমুখটা থমথমে হয়ে গেল পৌঢ়ার। চোখদুটো হয়ে উঠল চিকচিক। দৈববশত এক অদৃশ্য শক্তির টানে তার ঘাড়টা ধীরে ধীরে একদিকে কাত হয়ে গেল। সফেদ রঙা জটলা পাকানো চুলগুলো বড্ড এলোমেলো তার। কপাল ছেয়ে ঢেকে দিয়েছে চোখমুখ! যার দরুন তার হুটহাট রাগান্বিত চোখদুটো নজরে এলো না এডউইনের। তন্মধ্যে পৌঢ়া কেমন খেঁকিয়ে আওড়ালেন,
“ মূর্খদের সবচেয়ে বড়ো পরিচয় কী জানিস? তারা সত্য আর মিথ্যের মধ্যে পার্থক্য করতে জানে না। গুলিয়ে ফেলে দু'টোকেই! এর আগে কখনো মূর্খ দেখেছিস?”
দুর্বল হলেও পৌঢ়ার কণ্ঠে সে কী গাম্ভীর্য! মুহূর্তেই যা ভেতর অবধি নাড়িয়ে দিলো গম্ভীরমুখো এডউইনকে। হতবিহ্বল মানব তক্ষুনি গমগমে গলায় প্রতুত্তর ছুঁড়ল,
“ না! কেনো?”
হিসহিস করে হেঁসে উঠলেন স্বঘোষিত শ্যামৌপ্তী দেবী। মশালের দাউদাউ আগুনের লেলিহানে তার মলিন মুখটায় কেমন হলদেটে একখানা আবরণ এসে চিকচিক করতে লাগলো। তিনি সময় নিলেন। ক্ষণকাল পেরুতেই হুট করে বলে উঠলেন,
“ সে কী? আয়নায় কোনোদিন নিজেকে দেখিসনি? দেখলে তো অন্তত তোর এই মূর্খ না দেখার আক্ষেপটা আজ আর থাকতো না।”
সহসা চোয়াল শক্ত হয়ে এলো এডউইনের। মুহুর্তব্যয়েই মশাল হাতে ঘুরে দাঁড়াল সে। চিড়বিড়িয়ে আওড়াল,
“ মুখ সামলে কথা বলুন! কোন সাহসে আমায় মূর্খ বলছেন আপনি? আপনি-ই যে শ্যামৌপ্তি দেবী রায় সেটা কি করে বিশ্বাস করতে বলছেন আমায়? যেখানে গোটা জগৎ জানে — শ্যামৌপ্তি দেবী রায় বহুবছর আগেই মৃ ত!”
কথাটা কর্ণকুহরে পৌঁছান মাত্রই অন্যমনস্ক হয়ে গেলেন পৌঢ়া। ঘাড়টা বড্ড উঁচিয়ে ছানি পড়া চোখদুটো ঠেকালেন ইট-সিমেন্টের সিলিংয়ের পানে। কন্ঠে ভারী আক্ষেপের সুর টেনে হিসহিসিয়ে শুধালেন,
“ গোটা পৃথিবীর কাছে আমায় নামেমাত্র মে'রে দিয়ে, লোকচক্ষুর আড়ালে এই আবদ্ধ কারাগারে বহুবছর আগে আমায় বন্দী করেছে ঐ রাক্ষসটা! নয়তো বাইরের মানুষ তো জেনে যেতো ওর আসল রূপ। জেনে যেতো — মানুষের মতো দেখতে হলেও অভ্যন্তরে সে ঠিক কতবড় একটা হিং স্র জা-নোয়ার! আমাকে না মে'রেও এ নরকযন্ত্রণায় আঁটকে রেখেছে ও। আমাকে না মে'রেও প্রতিবছর আমার নামে লোকদেখানো মিথ্যে শ্রাদ্ধ কার্য করে! ও একটা ন*রপি-শাচ!”
কপাল গোছালো এডউইন! নিজ মনীবের বিরুদ্ধে আরোপিত এতবড় অপবাদটা মোটেও হজম হলো না তার। তাইতো সহসা র*ক্তচক্ষু নিয়ে তাকালো পৌঢ়ার পানে। রাগের তোড়ে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে তক্ষুনি ছুটে এলো এক-কদম। এসেই আচমকা নিজ সকল বোধবুদ্ধি হারিয়ে খামচে ধরল দূর্বল পৌঢ়ার জটলা পাকানো চুলের গোছা।
মুহুর্তেই ককিয়ে ওঠেন পৌঢ়া। চোখমুখ কুঁচকে নিলেন ব্যাথার চোটে। তন্মধ্যে তার কর্ণকুহরে ভেসে এলো সম্মুখে দাঁড়িয়ে থাকা গম্ভীর মুখোর গজগজ করতে থাকা কন্ঠ!
“ হাউ ডেয়ার ইউ স্যা দ্যাট, বি'চ? যে মায়ের গত হবার শোকে পাগল প্রায় — দ্য মাফিয়া শ্যাডো মনস্টার। মায়ের কথা মনে পড়লেই যার তীব্র হ্যালুসিনেশন হয়। মায়ের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো মনে পড়া মাত্রই নিজের ব্যথাগুলো ভুলতে যার একসঙ্গে কড়া ডোজের ড্রা-গ-স নিতে হয়, তাকে নিয়ে এতবড় মিথ্যাচার করতে লজ্জা করছে না আপনার? কোন সাহসে নিজেকে প্রয়াত শ্যামৌপ্তি দেবি রায় দাবী করেন আপনি? কোন সাহসে বলেন — মনস্টার নর*পি*শাচ?”
তৎক্ষণাৎ চোখদুটো বিস্ফারিত করে মেলে ধরলেন পৌঢ়া। দাঁত কিঁড়মিড়িয়ে ক্ষোভে জ্বলজ্বল করা দৃষ্টিতে তাকালেন এডউইনের মুখপানে। পরক্ষণেই আচমকা মুখভর্তি থুতু ছিটকে দিলেন গম্ভীর মুখো এডউইনের মুখের ওপর।
অপ্রত্যাশিত এহেন বিদঘুটে কান্ডে মুহূর্তেই নাক-মুখ কুঁচকে নিলো এডউইন। বিরক্তি আর বিস্ময়ের মিশেলে কঠিন হয়ে উঠল তার সুশ্রী মুখাবয়ব। পৌঢ়া এখনো বাঁধহীন ক্রোধে থরথর করছেন। কম্পিত দৃঢ় কণ্ঠে দাঁত চেপে আওড়ালেন,
“ মিথ্যাচার? ওরে মূর্খ! তুই জানিস না? মৃ*ত্যুর দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে কেউ কখনো মিথ্যে বলে না! ঐ রাক্ষসকে নিয়ে আমার মিথ্যে বলেই বা কী লাভ? যে রাক্ষস সবার আগে নিজের বাপের মৃ-ত্যুর কারণ হয়েছে! অন্ধকার জগতের অসীম ক্ষমতা লাভের লোভে ধ্বংস করেছে আমার পুরো পরিবারকে। তাকে নিয়ে মিথ্যাচার কেন করব আমি? যে নিজেই আগাগোড়ায় একটা মিথ্যে পরিচয় বহন করে যাচ্ছে! তুই ওকে চিনিস? চিনিস ঐ রাক্ষসকে? চিনিস না! আজ অবধি ওকে কেউ ঠিকমতো চিনে উঠতে পারেনি। কেননা, তাকে কেউ চেনা ধরলেই তো সে এ পৃথিবী থেকে ঐ ব্যক্তির নাম চিরতরে মুছে দেয়। সেক্ষেত্রে তুই ওকে ঠিকমতো চিনিস না বলেই বেঁচে আছিস। শোন, ও একটা আস্ত নর*পি*শাচ!”
থমকায় এডউইন! হতভম্বতায় আলগা হলো তার দৃঢ় হাতের মুঠো। ঢিলে হলো মুঠোয় চেপে রাখা পৌঢ়ার চুলের গোছা। হতবাকতার সাগরে আনমনে ডুব দিয়ে দু-কদম পিছিয়ে গেল এডউইন। গভীর ভাবনায় মত্ত থেকে বাহাতে আলগোছে মুছে নিলো মুখটা। পরপরই গম্ভীর কন্ঠে আওড়াল,
“ আ-আপনি! তারমানে আপনি-ই শ্যামৌপ্তী দেবী রায়? কিন্তু আপনি না বহুবছর আগে মা-রা গিয়েছেন? যেখানে আপনার মৃ*ত্যুর প্রতিশোধ নিতে গিয়ে আপনার ছেলে অর্থাৎ অধীর রায় আজ মনস্টারে পরিণত হয়েছে, সেখানে আপনি...”
কথাটা জিভের ডগা পেরুনোর ফুরসত পেলো না যেন। তার পূর্বেই অদূরের চৌকিখাটে বসে থাকা দূর্বল পৌঢ়ার ছানি পড়া চোখদুটো কেমন জ্বলজ্বল করে উঠল ক্রোধে। কুঁচকে যাওয়া মুখমণ্ডলের চামড়ায় নতুন করে স্পষ্ট হলো এক আকাশসম রাগের ছাপ! দাঁত কিড়মিড় করতে করতে তিনি হুট করেই হিতাহিত জ্ঞান হারালেন নিজের। সম্মুখে দাঁড়িয়ে থাকা গম্ভীরমুখো এডউইনের পানে ব্যাপক রাগ নিয়ে তেড়েফুঁড়ে এগিয়ে আসতে গিয়েই সংকটে পড়লেন তিনি। মোটা মোটা শেকলে আবদ্ধ পাদু’টো আর খুব একটা আগালো না তার। থেমে গেল মাঝপথে! পৌঢ়ার পা থামলেও ঝাঁঝ কমলো না যেন। বড়ো বড়ো অপরিষ্কার নখরযুক্ত দূর্বল হাতখানা সম্মুখে বাড়িয়ে খামচে ধরতে চাইলেন এডউইনকে। এহেন অতর্কিত কান্ডে ভড়কায় এডউইন! তক্ষুনি পাদুটো ছিটকে সরে গেল আর-ও দু-কদম পেছনে। হতভম্বতায় হাতে ধরে রাখল মশালটা! ক্ষুব্ধ পৌঢ়া কেমন কাঁপতে কাঁপতে নিজ সর্বশক্তি দিয়ে হুংকার ছুঁড়লেন,
“ কার ছেলে? কিসের ছেলে জানো-য়া-রের বাচ্চা? কে আমার ছেলে? যেখানে আমার সন্তান ভূমিষ্ট হওয়ার আগেই আমার গর্ভে মা-রা গেছে, সেখানে ঐ রাক্ষসটা আমার ছেলে হলো কিভাবে? যার হাত রাঙিয়ে আছে আমার স্বামীর র*ক্তে, যার মুখে লেপ্টে আছে আমার বাবার বুকচেরা র*ক্তের দাগে, যার হিং স্রতায় বলি হয়েছে আমার রঘু, যার নরকবাসনায় পিষ্ট হচ্ছি দিনের পর দিন আমি, তাকে আমি গর্ভে ধরব? আমি ধরব? রায় জমিদার বাড়ির একমাত্র কন্যা, শ্যামৌপ্তী রায় নিজ গর্ভে ধরবে ঐ রাক্ষসের বাচ্চাটাকে?”
__________________________________
“ কাম, সিগনোরা! আজকেই আমরা বিয়ে করব।”
রূঢ় মানবের বেপরোয়া পাগলামি আজ বড্ড বেকায়দায় জড়িয়েছে মাহি'কে। মাথায় তার হুট করেই বিয়ের ভূত চাপলো কেনো কে জানে! মায়াবিনীর নরম তুলতুলে কব্জিসন্ধিতে জোরালো টান বসিয়ে এগোচ্ছে সে। এদিকে, তার বলিষ্ঠ কদমের সনে তালে মেলাতে গিয়ে বারংবার হোঁচট খাওয়ার দশা মাহি'র। শেষমেশ আর টিকতে না পেরে হুট করেই পদযুগলে রুখ টানলো অষ্টাদশী। আচমকা একটানে নিজ তুলতুলে নরম কব্জিসন্ধিটা ছিনিয়ে আনলো মুগ্ধের রুক্ষ হাতের মুঠো হতে। এহেন অতর্কিত কান্ডে হঠাৎ থমকালো মুগ্ধ। দৈবশক্তির ভারে বলিষ্ঠ ঘাড়টা বাঁকিয়ে তাকালো ধীরলয়ে। তার তীর্যক দৃষ্টিজোড়া রমণীকে গ্রাস করতেই ভয়াতুর ঢোক গিলে মাহি। ভয়ে ভয়ে কদম জোড়া খানিক পেছাতে পেছাতে আওড়াল,
“ মুগ্ধ! একটু থামুন। আগে মনোযোগ দিয়ে আমার কথাটা শুনুন!”
ফর্সা ললাটে গোটাকতক ভাঁজ পড়েছে মুগ্ধের। তার অন্তরালে বিরক্তি না-কি রাগ, তা নিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত মাহি। বলিষ্ঠ পুরুষ ধীরে ধীরে শরীর ঘুরিয়ে দাঁড়াতেই সে কেমন ছটফটিয়ে বলে ওঠে,
“ মুগ্ধ! প্লিজ লিসেন টু মি। আপনি যেটা করতে চাচ্ছেন সেটা এমুহূর্তে করাটা একদম ঠিক হবে না।”
কপালের ভাঁজ আরও গাঢ় হলো মুগ্ধের। দৃষ্টির গভীরে নেমে এলো স্পষ্ট ক্ষোভ। চোয়ালের পেশি টানটান করে আচমকাই নিজ বলিষ্ঠ বাহুর এক হেঁচকা টানে রমণীর মেদহীন, বাঁকানো কোমরখানি নিজের বড্ড কাছে টেনে নিয়ে এলো সে। মুহূর্তেই দু'জনার মধ্যকার দূরত্বটুকু বিলীন হলো। বলিষ্ঠের ঘাড়টা ততক্ষণে বড্ড ঝুঁকে এলো অষ্টাদশীর পেলব মুখখানার ওপরে।
এরূপ হুটহাট ঘটে যাওয়া কাণ্ডে স্তম্ভিত মাহি! বিস্ময়াভিভূত চোখে ভড়কে তাকিয়ে রইল সুদর্শনের মুখপানে। মুগ্ধের চোয়াল এখনো শক্ত। দাঁত কটমট করে, গম্ভীর অথচ ক্ষুব্ধ স্বরে শুধালো,
“ কেনো ঠিক হবে না? উত্তর দে বেয়াদব! কেনো ঠিক হবে না? তুই...”
থামলো মুগ্ধের বাক্য। একমুহূর্ত উদ্বিগ্ন মাহি'র মুখপানে দৃষ্টি বুলিয়ে আচমকা শক্ত করল চোয়াল! ক্ষুব্ধতায় তক্ষুনি অন্যহাতে চেপে ধরল রমণীর কোমল চোয়ালখানা। দাঁত কিড়মিড় কন্ঠে হিসহিসিয়ে আওড়াল,
“ হেই চাশমিস! সত্যি করে বলতো — তুই কী আমায় বিয়ে করতে চাচ্ছিস না? আমি ছাড়া অন্য কাউকে নিয়ে মনে মনে বিয়ের প্ল্যানিং করছিস না-কি জানো** বাচ্চা?”
ভড়কে ওঠে মাহি! তড়িঘড়ি করে দু'ধারে মাথা নাড়িয়ে, হকচকান কন্ঠে আওড়ায়,
“ এই না না! এমন কিছু না। আমি আসলে...”
যত্রতত্র চোখ নামালো মাহি। মুখাবয়বে আঁধার নামিয়ে ফের উচ্চারণ করল,
“ বিস্ট! বিয়েটা মুখের কথা নয়। ধর্মীয় বিশ্বাস ছাড়া ধর্মীয় রীতিতে বিয়ে করাটা একেবারেই অনুচিত। আপনি আগেও বলেছেন — আপনি কোনো ধর্ম মানেন না। সেক্ষেত্রে কেবলমাত্র আমায় বিয়ে করার জন্য ধর্মীয় রীতি অনুসরণ করার কোনো মানেই হয় না!”
থামলো মাহি। ছলছল চোখজোড়া তক্ষুনি উঁচিয়ে তাক করল মুগ্ধের পানে। দৃঢ় কন্ঠে আবারও বলল,
“ যেদিন মন থেকে ধর্মকে মানবেন, ধর্মের প্রতি বিশ্বাস আনবেন, সেদিনই নাহয় আমরা ধর্মীয় রীতিতে বিয়ে করব, কেমন? এর আগে দয়া করে আমাকে এ বিষয়ে জোর করবেন না। ধর্ম কোনো ছেলেখেলার বিষয় না। আমি সব মানতে পারলেও এসব মানতে নারাজ, বিস্ট! আপনি যে ধর্মেরই হোন না কেনো, আমি চাই আপনি সে ধর্মকে মনেপ্রাণে বিশ্বাস করুন। ব্যস! এটুকুই তো।”
মায়াবিনীর বাক্যশেষের রেশটুকু মিলিয়ে যেতে না যেতেই, তার কোমর ঘিরে থাকা রূঢ় মানবের বলিষ্ঠ হাতখানা ধীরে ধীরে শিথিল হয়ে এলো। মুহূর্তেই মুগ্ধের দৃঢ় বাহুবন্ধন হতে মুক্ত হলো রমণী। নিজেকে ধাতস্থ করার ব্যর্থ প্রয়াসে কিছুক্ষণ স্থির হয়ে রইল সে। ঠিক তখনি, কোনোরূপ কথা না বাড়িয়ে উল্টো দিকে মুখ ফিরিয়ে দাঁড়ালো মুগ্ধ। দু’হাত তৎক্ষণাৎ পকেটের গহ্বরে গুঁজে দিয়ে, কণ্ঠে জমাট বাঁধা রূঢ়তা মিশিয়ে আওড়াল,
“ রাক্ষসের আবার ধর্ম-কর্ম! এসব মানলে তারা থোড়াই রাক্ষস হতো?”
তড়াক ঘাড় উঁচায় মাহি। রাগ করার কথা থাকলেও ঠোঁটের কোণে এক চিলতে মুচকি হাসির রেশ টেনে প্রতুত্তরে বলল,
“ রাক্ষসটা তো জন্ম থেকে রাক্ষস ছিলো না! জন্মের পর সে নিশ্চয়ই তার মায়ের কাছ থেকে দীর্ঘজীবনের দোয়া পেয়েছে। না-কি পায়নি বলুন তো?”
মেয়েটা ইদানীং বড্ড বুদ্ধিমতী হয়ে উঠেছে বুঝি! কথার এমন নিপুণ জাল বিছিয়েছে না.. তাতে অনায়াসেই আটকা পড়ে গেল রূঢ় মানব। কিছুক্ষণ চোয়াল শক্ত করে নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল সে। ভাব এমন — এমুহূর্তে প্রত্যুত্তরের সমস্ত পথ রুদ্ধ করে দিয়েছে বোকা মানবী। অবশেষে খানিক বাদে গম্ভীর গমগমে কণ্ঠে কেবল আওড়াল,
“পাঁচ মিনিট পর আসছি! যতটুকু তৈরি হওয়ার, হয়ে নে। ফিরে এসে কিন্তু কাঁধে তুলে নিয়ে যাব।”
এক চিলতে ফিচেল হাসি ফুটে উঠল মাহি'র অধরকোণে। পরক্ষণেই পায়ের গতি ঘুরিয়ে ফিরে এসে দাঁড়ালো মেকআপ ভ্যানিটির সম্মুখে। হাত বাড়িয়ে তুলে নিলো একটি ন্যুড-কালারের লিপস্টিক। আয়নার প্রতিবিম্বে নিজ ঠোঁট বরাবর তা তুলে ধরল অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে।নিজের কাজে মগ্ন থেকেই আচমকা বলে উঠল,
“ তা, কোথায় নিয়ে যাবেন শুনি?”
দুয়ারের অভিমুখে পা বাড়ালো মুগ্ধ! কথার পিঠে ঝাঁঝ দেখিয়ে প্রতুত্তর করল,
“ জাহান্নামে!”
ঠোঁটের ওপর বড্ড নিপুণ কৌশলে লিপস্টিকের প্রলেপ ঘষছে মাহি। তন্মধ্যে কর্ণকুহরে ভেসে আসা মুগ্ধের এহেন প্রতুত্তরে সে কেমন ভাবলেশহীন ভঙ্গিতে চটপট অনিহা মিশ্রিত কন্ঠে বলে ওঠে,
“ দুঃখীত! ওসব যাচ্ছে তা-ই জায়গায় যাবার পথ আমি চিনি না, এমনকি সেখানে যাবারও বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই। তাই আপনার পছন্দের জায়গায় আপনিই একা একা যান বরং!”
সহসা থেমে গেল মুগ্ধের ব্যস্ত কদম। ঘাড়টা ঝাঁঝিয়ে ঘুরে তাকালো তক্ষুনি। অদূরে মেক-আপ করতে ব্যস্ত মায়াবিনীর পানে একমুহূর্ত ক্ষুব্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে পরপরই চিড়বিড়িয়ে আওড়াল!
“ ফা'কিং গ্লুপায়া!”
★
ঘড়ির কাঁটা পাঁচ মিনিট অতিক্রম করতে এখনো বাকি প্রায় সেকেন্ড বিশেক। তন্মধ্যেই বলিষ্ঠ দু’হাতের জোরালো ধাক্কায় কক্ষের দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করল মুগ্ধ। জনাব এবার পুরোদস্তুর প্রস্তুত। সুঠাম দেহে পরিপাটি করে ইন করে পরে এসেছে কালো রঙের পাতলা ফিনফিনে শার্ট! সঙ্গে জমিয়েছে কালো রঙা দামি স্যুট-বুট। বরাবরের মতোই গলার কাছের বেশ কয়েকটি বোতাম হা করে খুলে রাখা। ফলে দৃশ্যমান হয়েছে সুদর্শনের লোমহীন, পেটানো বক্ষদেশ। বাদামী চুলগুলো আজও ভীষণ এলোমেলো। পেছনে ঝুঁটি বাঁধা নেই, অবাধে ছড়িয়ে থেকে ছুঁয়ে আছে ঘাড়ের প্রান্ত। তার শরীর থেকে ভেসে আসা তীব্র সুগন্ধির ঘ্রাণ মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়েছে সমগ্র কক্ষে।
মুগ্ধ আর দাঁড়াল না। সুশ্রী গৌরবর্ণ মুখমণ্ডলে বরাবরের সেই গুরুগম্ভীর ছাপটুকু ফুটিয়ে সম্মুখে তাকাতেই আচমকা থমকে গেল সে। থমকে গেল ক্রোধে দীপ্ত মুখাবয়বও। অদূরে মেকআপ ভ্যানিটির সম্মুখে দাঁড়িয়ে থাকা বোকাসোকা মানবীকে এ মুহূর্তে যেন কোনোভাবেই চেনা যাচ্ছে না। সে যেন নির্ঘাত এক অপ্সরা! মাখনের মতো কোমল ত্বকের ওপর টকটকে লাল বডিকন ড্রেসটি কী নিখুঁতভাবে সেঁটে আছে! সুশ্রী মুখশ্রীতে মিশেছে অল্পস্বল্প প্রসাধনীর পরশ। আয়নার দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে সম্ভবত শেষবারের মতো সাজে নিখুঁততার ছোঁয়া দিচ্ছে সে। মুগ্ধ আজ সত্যিই বিমুগ্ধ। বিমুগ্ধ তার স্বঘোষিত ব্যক্তিগত রমণীর উপচে-পড়া সৌন্দর্যে। কিছুক্ষণের জন্য যেন ভুলেই গেল নিজ চারপাশ। মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় মোহাচ্ছন্ন দৃষ্টিতে ধীর কদমে এগিয়ে এলো মাহি'র অভিমুখে।
এদিকে, সাজকর্মে মত্ত মাহি। বহু আগেই টের পেয়েছে মুগ্ধের আগমন। তবুও ঠোঁটের কোণে লিপবামের শেষ প্রলেপটুকু মসৃণ করে লাগাতে লাগাতে আয়নার দিকে তাকিয়ে থেকে শুধালো,
“ কেমন লাগছে আমায়?”
মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় একদৃষ্টে মেয়েটার পানে তাকিয়ে আছে মুগ্ধ। কর্ণকুহরের মাহি'র কন্ঠ পৌঁছাল কি-না কে জানে! মাহি ফের আয়নায় তাকিয়ে ঠোঁট গোল করে দেখল। সন্দিহান গলায় শুধালো,
“ বললেন না, কেমন লাগছে?”
এবারেও মৌন মুগ্ধ! তা বোধহয় সহ্য হলো না মাহি'র। অপ্সরা তক্ষুনি কপাল গুছিয়ে ঘুরে দাঁড়াল মুগ্ধের অভিমুখে। সহসা থমকে গেল মুগ্ধ! বেড়ে গেল হৃৎস্পন্দনের হাড়। ক্ষনে ক্ষনে শুকনো ঢোক গিলছে সে। মাহি একবার আপাদমস্তক পরোখ করল সুদর্শনকে। সুদর্শনের এহেন রূপে বরাবরই আবিভূত সে। আজও তার ব্যতিক্রম নয়। তবে..তাকে আজ কেমন লাগছে? লোকটার পাশে দাঁড়ানোর মতো ঠিকঠাক লাগছে তো?
দ্বিধায় জর্জরিত মাহি! আবারও গাল ফুলিয়ে প্রশ্ন ছুড়ঁল,
“ এভাবে সাজায় খুব খারাপ লাগছে দেখতে?”
মুগ্ধের দৃষ্টি অনড়! অথচ আহত হলো মাহি। বিভ্রম নিয়ে শুধালো,
“ কথা বলুন না, বিস্ট! এভাবে চুপ করে তাকিয়ে আছেন কেনো? আমায় দেখতে কী ভীষণ বাজে লাগছে?”
মাহি'র অস্থিরতা আকাশ ছুঁই ছুঁই। যার পিঠে মুগ্ধের ওমন নিস্তব্ধতা কাঁটার ন্যায় বিঁধল অষ্টাদশীর কোমল হৃদয়ে। আহতের ন্যায় অন্তঃকোণে চোট পেয়ে রমণী গাল ফোলালো। তক্ষুনি ঘুরে দাঁড়িয়ে হাতে নিলো টিস্যু। এক্ষুণি মুছে ফেলবে সব সাজসজ্জা! জেদের বশে টিস্যুর পাতলা আবরনটুকু গাল ছুঁতেই যাবে ওমনি সুদর্শনের বলিষ্ঠ হাত এসে বাঁধ সাধল তাতে। রমণী থমকায়। রাগের তোড়ে একপল ঘুরেও তাকালো না মুগ্ধের পানে। সাপের ন্যায় ফোঁস ফোঁস করতে করতে টিস্যু ছিনিয়ে আনার পায়তারা তার। ঠিক তখনি রূঢ় মানবের কন্ঠে আচানক ফুটে উঠল এক অবিশ্বাস্য শান্ত অথচ নিরেট বাক্য!
“ আমাকে মা-রার হাজারটা পথ খোলা থাকা স্বত্বেও তুই কেনো সযত্নে বেছে নিলি নিজেকে রাঙানোর কৌশলটুকু? কী লাভ হলো এতে? একটা কনক্রিটের আস্তরণে ঢেকে থাকা সামান্য হৃদয়টা তোকে দেখে থমকালো স্রেফ। মিস হলো কয়েকটা হার্টবিট! গলার কাছে আঁটকে গেল নিশ্বাস! ব্যস এটুকুই। এরচেয়ে বেশি কিছু হলো না তো!”
থামলো মুগ্ধ! তক্ষুনি মাহি'র তুলতুলে হাতের কব্জিসন্ধি মুঠোয় চেপে, তাকে এক ঝটকায় ঘুরিয়ে আনলো সে। পিঠটা আটকালো নিজ বুকের সনে। পরক্ষণে তটস্থ মায়াবিনীর কান বরাবর মুখ ঠেকিয়ে ফের আওড়াল,
“ আমাকে অস্ত্র ছাড়া মা-রার সুচেষ্টায় তুই সফল — বেয়াদব! সফল তোর কাজ। আগে যদি ঘুনাক্ষর জানতাম — নিজেকে ধ্বংস করা এতোটা সহজ, তাহলে বহু আগেই তোকে বহুবার, বারংবার নিজ হাতে যত্ন করে সাজাতাম। দেখ কি করলি তুই! এখন দেখছি তোকে পুরোপুরি নিজের করে না পেলে নিঃশ্বাস আঁটকে যাবে আমার। আ'ই ক্যান এনশিওর ইউ, তোর সর্বাঙ্গে বসানো সুনিপুণ সাজটুকু নিজ ঠোঁট দিয়ে নষ্ট না করা অবধি হার্টবিট স্বাভাবিক হবে না আমার! আমার কিন্তু নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে চাশমিস! এর দায়ভার কে নিবে শুনি? এ্যাই...তুই কী খুব করে চাচ্ছিলি — বড্ড যত্ন করে খু ন করতে আমায়?”
রমণীর মেরুদণ্ডের হাড় বেয়ে শীতল স্রোত নেমে যাচ্ছে অকপটে। নিঃশ্বাস হচ্ছে ক্রমশ ভারী! মাহি ঢোক গিলছে বারংবার। মুগ্ধের রুক্ষ অধরযুগল ধীরে ধীরে তার কানের ত্বক বেয়ে গড়িয়ে নামছে উম্মুক্ত কাঁধে। যেথায় কোনমতে ঠাঁই পেয়েছে জামাটার চিকন স্ট্র্যাপ! মুগ্ধের শক্ত আঙুলের ডগা যাদের মুহুর্তেই বিচ্ছিন্ন করে দিলো রমণীর কাঁধ হতে। পরক্ষণেই মায়াবিনীর উম্মুক্ত কাঁধে নিজ রুক্ষ অধরযুগল গাঢ়ভাবে বসিয়ে দিলো মুগ্ধ। তক্ষুনি সর্বাঙ্গ শিউরে ওঠে মাহি'র। চোখদুটো আনমনে কুঁচকে গেল বড্ড। মুগ্ধ সময় নিলো বেশ! ধীরলয়ে কাঁধ হতে উঠালো নিজ রুক্ষ অধরযুগল। অতঃপর কোনরূপ বলাকওয়া ছাড়াই আচমকা দূর্বল রমণীকে এক ঝটকায় তুলে নেয় নিজ কাঁধে। বোকা মানবী হকচকায়! মিনমিনিয়ে আওড়ায়,
“ আপনি নামিয়ে দিন আমায়। আমি নিজে হেঁটে যেতে পারব তো!”
বাঁকা হাসে মুগ্ধ! রমণীকে কাঁধে তুলে নির্বিঘ্নে হাঁটতে হাঁটতে শুধালো,
“ বাট...আমার পা থাকতে তোর নিজ পা'দুটোকে কষ্ট দিতে হবে কেনো?”
____________________________
রাতের অন্ধকারে সমুদ্রের বুকখানা যেন গাঢ় নীল আবহে ডুবে আছে। সি-বিচের বড্ড কাছে সাজানো হয়েছে ছোট্ট অথচ রাজকীয় এক ডিনার টেবিল। সাদা টেবিলক্লথের ওপর সারি সারি জ্বলছে সুগন্ধি মোমবাতি। মোমের নরম হলুদ আলোয় চারপাশটা কেমন স্বপ্ন স্বপ্ন ভাব ধরেছে! টেবিলের মাঝখানে টকটকে কালো গোলাপের তোড়া, পাশে দু'টি ক্রিস্টালের ওয়াইনগ্লাস। চারপাশে রয়েছে কতগুলো স্ট্যান্ড! সেথায় ঝুলছে সফেদ রঙা কতগুলো পর্দা। বাতাসের ঝাপটায় যারা বড্ড এলোমেলো। সমুদ্রের কোল ঘেঁষে ভেসে আসা দমকা হাওয়াগুলো বারংবার কাঁপিয়ে দিচ্ছে মোমের জ্বলন্ত শিখাগুলোকে! অদূরেই রাখা হয়েছে ছোট্ট একখানা মিউজিক সিস্টেম। যেখান থেকে ভেসে আসছে ধীরলয়ের এক রোমান্টিক সুর।
এহেন নৈসর্গিক দৃশ্যে অক্ষিযুগল আঁটকে গিয়েছে হতবাক রমণীর! মুগ্ধের কাঁধে চড়ে থেকেই ঘাড় ঘুরিয়ে দেখছে চারপাশ। ঠিক তখনি, হতবাক রমণীর ক্ষুদ্র দেহটা আলতো করে কাঁধ হতে নামিয়ে দিলো মুগ্ধ। দোদুল্যমান ক্ষুদ্র তনু সামলে পাদু’টো স্থির হলো মাহি'র। হতবাক কন্ঠফুঁড়ে অস্ফুটে বেরিয়ে এলো,
“ কখন করলেন এতোকিছু?”
প্রতুত্তরে অধর কামড়ে রাখল মুগ্ধ! রমণীর বড্ড পিঠ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে, কোটের নিচ দিয়ে হাত ঠেকালো নিজ কোমরের পিঠে। সেখান থেকে একটানে একখানা কাগজ বের করে এনে আচমকা ছুঁড়ে ফেলার মতো রাখল সম্মুখের টেবিলের ওপর। মাহি ভ্রু গোটায়। কাগজটার পানে সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতেই, মুগ্ধের ঠোঁটদুটো ছুঁয়ে দিলো মাহি'র কানের ত্বক। খানিকক্ষণ মুখগহ্বরে জিভ নাড়িয়ে হাস্কি স্বরে আওড়ায় মুগ্ধ —
“ নে! এবার সজ্ঞানে সাইন কর — তুই নামক আমার দলীলপত্রে।”
_____________________________
বলিষ্ঠ পাদু’টো ভাঁজ করে রাখা মেঝেতে! গম্ভীর মুখখানা ডুবে আছে হতবাকতায়! সর্বাঙ্গে ঘামের তীব্র উপস্থিতি। এডউইন একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে দু'হাত দুরত্বে চৌকিখাটে বসে থাকা পৌঢ়ার পানে। পৌঢ়া চুলের গোড়া চুলকাচ্ছে। বারবার চুলের ভাঁজ থেকে কিছু একটা বের করে এনে টুপ করে পুরে দিচ্ছে মুখগহ্বরে। এডউইন নাক সিটকচ্ছে না, বরং মুখাবয়বে ছড়িয়েছে প্রশ্নবোধক চাহনি। খানিকক্ষণ ঢোক গিলে হতবুদ্ধির ন্যায় আওড়াল সে,
“ তারমানে... আপনি বলতে চাইছেন, অধীর রায় আপনার র*ক্ত না? তাহলে সে আপনাকে এখানে, এই অন্ধকার কারাগারে এতগুলো বছর ধরে আঁটকে রাখল কেনো?”
ফোঁস করে নিশ্বাস ফেললো পৌঢ়া। মুখাবয়বে নামালো ব্যাথাতুর ছাপ। আহত কন্ঠে ধীরে ধীরে শুধালো,
“ ঐ রাক্ষস আমার র*ক্তের কেউ না কিন্তু ওর গায়ে যার র*ক্ত বইছে — সে ছিল আমার বড্ড প্রিয় একজন! আমার একান্ত ব্যাক্তিগত পুরুষ।”
থামলেন পৌঢ়া অথচ কৌতুহল বাড়ল এডউইনের। সে তৎক্ষনাৎ অতি আগ্রহে প্রশ্ন ছুড়ঁল,
“ কে সে?”
আচমকা দৃষ্টিজোড়া এডউইনের পানে তাক করল পৌঢ়া। বাঁকা হেসে ক্ষীণ কন্ঠে উত্তর দিলো,
“ যার নাম মুখে নেওয়া পাপ! যার নাম মুখে নিলেই স্বয়ং মৃ ত্যু এসে সামনে দাঁড়াবে।”
এহেন প্রহেলিকায় বিরক্ত এডউইন! চিড়বিড়িয়ে তক্ষুনি বলে উঠল,
“ আরে এতো কথা না ঘুরিয়ে সরাসরি নাম বলেন!”
“ দ্য গ্রেট রুশদী কিং খ্যাত শ্যাডো হান্টার, আমার স্বামী! ভিনসেণ্ট রোম্যানিও।”
মুহুর্তেই মাথার ওপর আকাশ ভেঙে পড়ল এডউইনের। চোখদুটো হয়ে গেল বিস্ফোরিত! তার এহেন ভড়কানো দেখে খ্যাকখ্যাক করে হেঁসে উঠলেন পৌঢ়া। স্মৃতিচারণের ন্যায় চোখদুটো বুঁজে নিয়ে আওড়াতে লাগলেন,
★ অতীত ★
১৯৯৫ ; কলকাতার, শোভাবাজার। [ রায় জমিদার বাড়ি]
“ রুমঝুম রুমঝুম রুমঝুম ঝুম...
খেজুর পাতার নুপুর বাজায়ে...কে যায়? যায়....”
সুমধুর কণ্ঠধ্বনির সনে ঘুঙুর পরিহিত পা-জোড়ার নজরকাঁড়া নৃত্যে মোহিত আগত নৃত্যশিল্পীরা! জমিদার বাড়ির নাচ মহলের প্রবেশদ্বারে ইতোমধ্যেই ভীড় জমিয়েছে আশপাশের মানুষজন। নাচ মহলের সুবিশাল কক্ষের ঠিক মাঝখানে ঝুলছে বিশাল এক সফেদ রঙা পর্দা। যার এপাশে বিদেশি নৃত্যশিল্পীরা জহুরী চোখে পরোখ করছে ওপাশে দক্ষ নৃত্যরত রমণীর প্রতিটি পদক্ষেপ! পর্দার ওপাশ থেকে ভেসে আসা সুরেলা নারী কন্ঠে মোহিত চারপাশ! শহুর থেকে আগত দক্ষ বিণাবাদিনী বিণী বাজানো রেখে মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় শুনে যাচ্ছে সেই গান! সকলের চোখেমুখে এক অদ্ভুত দীপ্তি! আর ঠোঁটের কোণে কেবল একটিমাত্র নাম — শ্যামৌপ্তী! শ্রীমতি শ্যামৌপ্তী দেবী রায়।
প্রায় ঘন্টা দুয়েকের টানা নৃত্যের পরিক্ষায় সফলভাবে উর্ত্তীন হলেন পর্দার ওপাশে নৃত্যরত রমণী। যার এহেন সফলতা দেখে জমিদার কর্তার মুখাবয়বে সে-কি আনন্দ! হাসিমুখে মেয়ের প্রশংসা শুনছেন সকলের মুখ থেকে। তন্মধ্যে আগত দক্ষ নৃত্যরত শিল্পীদের মধ্যে কেউ একজন বড্ড আগ্রহের সাথে ইচ্ছে পোষণ করল,
“ জমিদার সাহেব! শুনেছি, আপনার মেয়ে না-কি কখনো কারোর সামনে মুখ দেখিয়ে নৃত্য করে না। এমনকি গানও গায় না! এমনটা কেনো বলুন তো?”
এহেন প্রশ্নে জমিদার বাবুর চোখেমুখে এক অদ্ভুত শঙ্কা পরিলক্ষিত হলো। জোরপূর্বক ঠোঁটের কোণে হাসি টেনে প্রসঙ্গ চাইলেন ঘোরাতে। তবে নাছোড়বান্দা নৃত্যশিল্পীরা এবার জোর করেই বলে উঠলেন,
“ আপনার মেয়ের পদধূলি নিতে চাই জমিদার বাবু! যার নৃত্য এতো সুন্দর, গলায় সাক্ষ