#মির্জা_সায়ান_মুগ্ধ — পর্বঃ৬৮(ক)
#jannatul_firdaus_mithila
“স্ট্রেঞ্জ! তুই ঘুমিয়েছিলি কত আরামে। তোর ঘুমে যেন কোনো ডিস্টার্ব না হয়, তাই না বারবার চেঞ্জ করে দিয়েছি। পরে যদি লিক্যাজ হতো?”
যুবকের এহেন অকপট স্বীকারোক্তিতে থমকায় মাহি'র মুখ অভিব্যাক্তি। বিস্ময়ের ঘোরে স্থির হয়ে আসে দু’চোখ! কয়েকপল বাকশূন্য রইল রমণীর সিক্ত জিভের ডগা। খানিকবাদেই চোখদুটোর পলক ফেলে, কম্পিত কণ্ঠে অস্ফুটে আওড়াল —
“ লিক্যাজ? আর ইউ কিডিং উইদ মি?”
নির্লিপ্ত ভান ধরে বসে রইলো মুগ্ধ! ভাবলেশহীন ভঙ্গিতে কাঁধ ঝাঁকাল পরপরই। তা অবলোকন হওয়া মাত্রই ক্ষুদ্র মানবীর তুলতুলে চোয়ালের পেশীতে টান পড়ল ভীষণ! দাঁত খিঁচে তক্ষুনি খেঁকিয়ে আওড়াল,
“ আপনার কী মনে হচ্ছে না, আপনি যা করেছেন তা এককথায় অতিরিক্ত? অতিরিক্ত বললেও তো ভুল হবে! এগুলো তো এক ধরনের পাগলামি বলা চলে।লাইক...ইউউউ! আমার তো ভাবতেই গা গুলিয়ে উঠছে! কোনো সুস্থ স্বাভাবিক মানুষ আদৌ সারারাত বসে বসে প্রতি দু'ঘন্টা পরপর কারো প্যাড চেঞ্জ করে? হ্যাঁ?”
পিয়ার্সিং করা ভ্রু'খানা তক্ষুনি উঁচু হলো মুগ্ধের। দৃষ্টিজোড়া হলো বাঁকা! ঠোঁটের কোণে ফুটলো সে-ই চিরচেনা দুর্বোধ্য হাসির রেশ।
“ তোকে কে বলল আমি সুস্থ -স্বাভাবিক মানুষ?”
ভড়কায় মাহি! থতমত খেয়ে বসল এরূপ তীক্ষ্ম প্রতুত্তরে। দৃষ্টি হলো ছন্নছাড়া। অথচ যুবক নির্বিকার। নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে খানিক এগিয়ে এসে হাত রাখলো মাহি'র ক্যানোলা পরা হাতটায়। অতঃপর ঘাড় ঝুঁকিয়ে অতি সন্তর্পণে ক্যানোলাটা খুলতে মত্ত হলো সে। মাহি নিশ্চুপ! ঢোক গিলছে শুকনো। ক্ষণকাল পেরুতেই আচমকা কোমল হাতখানা তুলে এনে স্পর্শ বসালো মুগ্ধের ক্লিন শেভড গালের ত্বকে! মুহুর্তেই থেমে গেল মুগ্ধের ব্যস্ত আঙুলের ডগা। তীক্ষ্ণ দৃষ্টি তুলে পরপরই তাকাল রমণীর পানপাতার ন্যায় কোমল মুখশ্রীর পানে। মাহি ঢোক গিলল ফের! মুগ্ধের গালের ত্বকে হাত বুলিয়ে, বোঝানোর সুরে অতি শান্ত গলায় শুধালো,
“কোনোকিছুই অতিরিক্ত ভালো নয়, বিস্ট! বাড়াবাড়ি নামক উচ্ছিষ্ট বিষয়বস্তু বরাবরই যেকোনো সম্পর্কের সৌন্দর্য নষ্ট করে। আপনার অধিকার ফলাতে ইচ্ছে করে, তাই তো? তাহলে ফলান না! কিন্তু সেই অধিকার ফলাতে গিয়ে আমার অস্বস্তির মাত্রা বাড়িয়ে তোলার আদৌ মানে হয়? আপনি কেন করলেন এমনটা,বিস্ট? কী দরকার ছিল আমার ঘুমের সুযো...”
অষ্টাদশীর ব্যতিব্যস্ত কণ্ঠ সহসাই রুদ্ধ হলো মস্তিষ্কের অভ্যন্তরে জেগে ওঠা এক আকস্মিক দ্বন্দ্বে। কয়েক মুহুর্ত স্থিরতায় কাটিয়ে আচমকা ভীত-সন্ত্রস্ত দৃষ্টিজোড়ায় বিভ্রম লেপ্টে, সঙ্গে সঙ্গে তাকাল সম্মুখের ভাবলেশহীন মানবের পানে। শক্ত ঢোক গিলে দ্বিধাজড়িত কন্ঠে বলে উঠল —
“ আমার ঘুম এতটাও গভীর নয় যে, কেউ আমাকে এভাবে স্পর্শ করবে অথচ আমি টেরই পাব না।”
থামল মাহি! সন্দিগ্ধতায় জোড়া হলো চোখ। ফের সন্দিহান গলায় প্রশ্ন ছুড়ঁল —
“ সত্যি করে বলুন তো, বিস্ট! আমি কী কাল রাতে শুধুই নাক টেনে গভীর ঘুমে তলিয়ে ছিলাম? না-কি আমার সে-ই গভীর ঘুমের পেছনে রয়েছেন? সামহাউ, আপনি কি... আমাকে ঘুমের ওষুধ দিয়েছিলেন, বিস্ট?”
“ হুম! দিয়েছিলাম।”
নির্লিপ্ত প্রতুত্তর মুগ্ধের! দৃষ্টিতে গভীরতা লেপ্টে চেয়ে আছে সম্মুখে। ওমনি থমকায় মাহি! হতবিহব্বলের ন্যায় তক্ষুনি থেমে থেমে জিজ্ঞেস করে ওঠে,
“ কি-হ? কিন্তু কেনো? কেনো দিয়েছিলেন আমায় ঘুমের ঔষধ?”
নির্লিপ্ত ভাবভঙ্গিমায় বিন্দুমাত্র পরিবর্তন নেই মুগ্ধের। বরং ঘাড় ঝুঁকিয়ে আলতো হাতে, রমণীর হাতে পরে থাকা ক্যানোলাটা খুলে আনলো পুরোপুরি। হাস্কি স্বরে প্রতুত্তর করল,
“ যেন পিরিয়ড ক্র্যাম্পসে তোর ঘুম নষ্ট নাহয়!”
বিস্ময়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেল মাহি। একমুহূর্ত কাটল তীব্র মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বে। তবে পরক্ষণেই রমণীর সম্বিৎ ফিরিয়ে আনলো মুগ্ধের তীক্ষ্ণ দৃষ্টিজোড়া। তক্ষুনি কেমন চিড়বিড়িয়ে উঠল সে —
“ পিরিয়ড ক্র্যাম্পসে ঘুম নষ্ট? সিরিয়াসলি? ঘুম নষ্ট হলে হতো নাহয়, তাই বলে ওমন ম'রার মতো ঘুম পারিয়ে রাখতে হবে আমায়? এগুলো কিন্তু সত্যিই বাড়াবাড়ি, বিস্ট! আপনি বোধহয় ভুলে যাচ্ছেন — দিস ইজ নট মা'ই ফার্স্ট টাইম।”
রাগে থরথর করে কাঁপছে মাহি! মখমলি বিছানার ওপর থেকে নেমে যাবার উদ্দেশ্যে পাদু’টো হম্বিতম্বি নিয়ে ছোঁয়াচ্ছে তকতকে মেঝেতে। ঠিক তখনি, সম্মুখ থেকে ছুটে এলো মুগ্ধের শক্তপোক্ত হাতদুটো। এক ঝটকায় অতিষ্ঠ মানবীর ক্ষুদ্র দেহখানি তুলে নিলো শূন্যে। মাহি নাক ফুলিয়ে তাকিয়ে রইলো অন্যত্র! দাঁত খিঁচে নির্বাক থাকতেই কর্ণকুহরে ভেসে এলো মুগ্ধের ভনিতাহীন দৃঢ় কন্ঠ!
“ তোর জন্য এসব ফার্স্ট টাইম নাহলেও, আমার জন্য তো ফার্স্ট টাইম, বেইব! হাউ কুড আই এভার লেট ইউ টলারেট দিস কাইন্ডা ফা'কিং পেইন?”
রমণীর কোমল হৃদয়ে হুট করেই ঝংকার তুললো কথাটা। তবুও নজর উঠল না অতিষ্ঠতার ভারে। কর্ণকুহরে আবারও ভেসে এলো —
“ তুই যখন সেন্সলেস হয়ে গিয়েছিলি, তখন প্যাড পরেছিলি? বল! পরেছিলি? পরিসনি, তাই না? আমি তো তোকে জাস্ট চেঞ্জ করে দিয়েছি। দ্যাটস ইট! আর যাই হোক, তোকে আমি সারারাত ঐ অবস্থায় ফেলে রাখতে পারি নাহ! তুই আমার চোখের সামনে এমন কষ্ট সহ্য করবি, আর আমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে দেখব? হাহ! হাউ কুড ইউ ইভেন থিংক সাচ ফা'কিং বুলশিট?”
সহসা হতবুদ্ধির ন্যায় ঘাড় উঁচিয়ে তাকাল মাহি। বিস্ময়ে বাড়ল অধরের ফাঁক! মুগ্ধ থামল না। দৃষ্টিজোড়া সরু করে নিয়ে চোয়ালের পেশী করল শক্ত! ফের গমগমে গলায় শুধালো,
“ বাই দ্য হেল ইন দ্য মনস্টার'স ওয়ে, দিস ইজ সাচ আ নরমাল থিং! এতে এতটা অস্বস্তি পাওয়ার কী আছে ফা'কিং গ্লুপায়া? এজ ইয়োর বেটার হাফ, আই হ্যাভ দ্য রাইট টু টেক কেয়ার অফ ইউ। রাইট? যদিওবা কাগজে-কলমে বিয়ে করেছি, তবুও করেছি তো! তারমানে তুই আমার অর্ধেক তাই না? তোর শরীরে এমন কোন গুপ্ত রহস্য রয়েছে, যা দেখার বৈধতা আমার নেই? মা'ই ফা'কিং সোলমেইট! হাজবেন্ড-ওয়াইফের বৈধতা মানেই শুধু ই*ন্টিমেট হওয়া নয়। তোর শরীর খারাপ হলে পাশে দাঁড়ানো, তোর কষ্টটুকু নিজের মতো করে অনুভব করার চেষ্টা করা, তুই দুর্বল হয়ে পড়লে তোর সমক্ষে নিজের বুক পেতে দেওয়া, এসবও তো আমার দায়িত্ব।
জানি, এই ফা'কিং পিরিয়ড ক্র্যাম্পসের ব্যথা আমি কোনোদিনই উপলব্ধি করতে পারব না। কারণ এই যন্ত্রণাটা একান্তই তোর, আমার নয়। কিন্তু তাতে কী? ব্যথাটা আমি নিতে না পারি, অন্তত তোকে একা সেই ব্যথার সঙ্গে লড়তে তো দিতে পারি না! তোকে জ্বালানোর অধিকার কেবল আমার রয়েছে, তোকে সুখের অসুখে ছিন্নভিন্ন করে দেওয়ার অধিকার শুধু আমার রয়েছে। এক্ষেত্রে আমি তো অন্যকিছুকে দেব না তোকে কষ্ট দিতে! এই সামান্য ফা'কিং পিরিয়ড ক্র্যাম্পসকেও না।”
লাজুকলতার চোখের পর্দা ভার হয়েছে লজ্জার তোড়ে। গালদুটো করছে টকটক! চোখের কার্নিশে জল জমেছে খানিক। তন্মধ্যে লোকটা আবারও নিজের কপটহীন স্বীকারোক্তিতে ঝংকার তুলে দিলো মায়াবিনীর অন্তঃকোণে!
“ জাস্ট কিপ ওয়ান থিং ইন ইয়োর ফা'কিং হেড, গ্লুপায়া!আই ডোন্ট নিড এনি ফা'কিং পারমিশন টু টেক কেয়ার অফ ইউ। সো, ডোন্ট ইউ এভার ডেয়ার টু কোয়েশ্চন মি! আই'ম জাস্ট ডুয়িং মাই অউন ফা'কিং ডিউটি!”
লজ্জায় বাকরুদ্ধ মাহি। নাকের ডগাটা কাঁপছে তিরতির করে। লম্বা এক নিঃশ্বাস টেনে পরপর মিনমিনে স্বরে আওড়াল,
“ ফাইন! পরিয়ে দিয়েছেন তো দিয়েছেন। তারজন্য অসংখ্য কৃতজ্ঞতা। তাই বলে ২ ঘন্টা পরপর চেঞ্জ করতে হবে? আমি কোনো নবজাতক নই বিস্ট, যে আমায় একটু পরপর চেঞ্জ করিয়ে...”
বাকিটা শেষ করার ফুরসত পেলো না মাহি। তার আগেই ক্ষুব্ধ মানবের শক্ত হাতখানা আচমকা খামচে ধরল রমণীর কোমল পিঠের ত্বক। ক্ষিপ্ত কন্ঠে হিসহিসিয়ে শুধালো,
“ আমি এসব জানতাম আগে? জাস্ট আন্সার মি, ইউ ফা'কিং গ্লুপায়া! আমি এসব মেয়েলী ব্যাপারে আগে থেকে কিছু জানতাম? না-কি ১০/১২টা গার্লফ্রেন্ড নামক কালনাগিনী পুষেছি এর আগে? আমি কী জানতাম এসব ক'ঘন্টা পরপর চেঞ্জ করতে হয়? আমার যা ভালো মনে হয়েছে, যেভাবে ভালো মনে হয়েছে, আমি আমার ব্যাক্তিগত প্রোপার্টির টেক কেয়ার সেভাবেই করেছি। দ্যাট'স ইট!”
সহসা চিবুক নামালো মাহি! না তাকিয়েও বেশ বুঝল — পাগলটা ক্ষেপেছে ভীষণ। অজানা শঙ্কায় সে তড়িঘড়ি করে মুখ লুকলো বলিষ্ঠের রুক্ষ বক্ষভাঁজে। ক্ষুব্ধ বাঘের ন্যায় একাধারে হিসহিসিয়ে যাচ্ছে মুগ্ধ। রমণীকে কোলে তুলেই পা বাড়াল ওয়াশরুমের অভিমুখে। খানিকক্ষণ যেতে না যেতেই তার রুক্ষ বক্ষভাগ হতে ক্ষুদ্র চড়ুই মুখ তুললো। কপাল গুটিয়ে কন্ঠে কেমন সন্দিহান ভাবস্রোত নামিয়ে আওড়াল,
“ গতকাল রাতে না আপনার ব্লা*ড দেখার পর প্যানিক এ্যাটাক হয়েছিল? তাহলে..রাতে ওসব করলেন কী করে? হুম?”
তৎক্ষনাৎ পায়ের গতি থামালো মুগ্ধ! সামান্য ঘাড় হেলিয়ে দুর্ধর্ষ দৃষ্টে তাকাল চঞ্চলার মুখপানে। ওমনি বক্ষভাগে আরেকটু গুটিয়ে গেল মাহি। নজর জোড়া আড়াল করল যুবকের অন্তর্ভেদী চাহনি হতে। তক্ষুনি নিম্নাংশের অধরে দাঁত বসায় মুগ্ধ। ঘাড়টা বড্ড ঝুঁকিয়ে মুখ ঠেকালো চঞ্চলার কানের পিঠে। হাস্কিস্বরে শুধালো,
“ শুধু কী ওসবই? তা বাদে আর কিছু আন্দাজ করতে পারিসনি?”
সহসা সর্বাঙ্গ কেঁপে উঠল মাহি'র। বিভ্রান্তি নিয়ে তাকাল হুট করে। মুগ্ধ ফের আওড়াল,
“ ইউ নো হোয়াট, সিগনোরা-হ? গতরাতের প্রতিটি মুহূর্ত তোর জন্য হয়তো নিস্তব্ধতায় কেটেছে, বাট ফর মি? ইট ওয়াজ ফা'কিং সো ওয়াইল্ড!”
“ ম-মানে? ক-কী করেছেন আপনি?”
অবিলম্বে রমণীর তুলতুলে কানের ত্বকে দাঁত বসল মুগ্ধের। ওমনি নাক-মুখ কুঁচকে নিলো মাহি। লোকটা আবারও বলতে লাগলো,
“ গতরাতে তোর সঙ্গে ঠিক কী কী করেছি, তা নিয়ে যদি এই মুহূর্তে তোকে ব্যাখ্যা করতে যাই — দ্যান, ট্রাস্ট মি, সিগনোরা-হ! তুই এক্ষুনি নিজেকে খু-ন করে ফেলতেও দু’বার ভাববি না।”
নিঃশ্বাস আঁটকে গেল মাহি'র। ক্ষুদ্র তনুটা নড়চড় বাড়ালো ভীষণ। অথচ মুগ্ধের বাঁধন দৃঢ়! একপর্যায়ে অতিষ্ঠ মাহি দাঁত খিঁচে বলেই বসল,
“ ছাড়ুন আমায়, বেয়াদব লোক! একটা অসুস্থ মেয়ের সঙ্গে রাত-বিরেতে ওসব উৎপটাং কর্মকান্ড করতে লজ্জা করল না আপনার?”
“ কিন্তু আমার তো লজ্জাই নেই! না থাকলে করবে কোত্থেকে?”
থতমত খেয়ে বসল মাহি! হতবুদ্ধির ন্যায় তাকিয়ে রইলো একপল। পরক্ষণেই দৃষ্টিতে ছড়ালো অগ্নি। কটমটিয়ে যেই না কিছু আওড়াবে অমনি তার দৃষ্টি গিয়ে থমকাল — মুগ্ধের ফর্সা বলিষ্ঠ ঘাড়ের ত্বকে। যেথায় ক্ষত হয়ে আছে গভীর! মুহুর্তেই রমণীর মুখাবয়ব জুড়ে নেমে এলো তীব্র উদ্বিগ্নতার ছাপ। সে তৎক্ষনাৎ ব্যাকুল হয়ে আঙুল ছোঁয়াল মুগ্ধের ঘাড়ে। অস্থির কন্ঠে শুধালো,
“ একি! আপনার ঘাড়ে এতবড় ক্ষত হলো কি করে? তাছাড়া, ক্ষতটা তো এখনো তাজা। কখন পেলেন এতবড় ব্যথাটা? কই..কাল রাতেও তো ঘাড়ে কোনো দাগ ছিল না। এসব কী, বিস্ট?”
রমণীর ছোঁড়া একের পর এক প্রশ্নে খানিক দ্বিধায় জড়ালো কি-না রূঢ় মানব! বড্ড কৌশলে ছাপালো নিজ অভিব্যাক্তি। অত্যন্ত ঠান্ডা কন্ঠে প্রতুত্তর করল,
“ নাথিং সো সিরিয়াস, বিউটি! ইউ শুড গেট ফ্রেশেনড আপ। আমি টেবিলে নাস্তা সার্ভ করছি, ওকে? একসঙ্গে ব্রেকফাস্ট সারব, আই'ল বি ওয়েটিং ফর ইউ।”
বলেই তৎক্ষনাৎ মেয়েটাকে ওয়াশরুমের দ্বারপ্রান্তে দাঁড় করালো মুগ্ধ। অতঃপর একপ্রকার জোরপূর্বক রমণীকে ঠেলেঠুলে ঢুকিয়ে দিলো ওয়াশরুমে। মাহি হতবুদ্ধির ন্যায় দেখে গেল সব। ওয়াশরুমের দোর আঁটকে সন্দিগ্ধতায় আপনমনে বিড়বিড়ালো,
“ কি লুকচ্ছেন আবার, বিস্ট?”
ভাবনায় মত্ত মাহি! তার দূর্বল পাদু’টো আনমনে এগিয়ে এসে দাঁড়ালো শাওয়ার হেডের নিচে। গা-টা কেমন ম্যাজম্যাজ করছে! এক্ষুনি শাওয়ার না নিলে হয়? মাহি'র হাত এগোলো সম্মুখের শাওয়ার নবের দিকে। তা একটুখানি ঘোরাতেই ওপর থেকে ঝপঝপিয়ে নেমে এলো পানির ধারা। তবে বিপত্তি বাঁধল তক্ষুনি! শীতল পানির স্পর্শ গা ছুঁতেই সর্বাঙ্গ চিড়চিড় করে উঠল মাহি'র। জ্বলে উঠল উদর এবং বক্ষস্থলের নরম ত্বকের অংশ! সহসা পানির ধারা হতে দাঁড়াল মাহি। হতভম্বের ন্যায় ঘটনাপ্রবাহ অনুধাবন করার প্রক্রিয়া চালালো বারকয়েক। অতঃপর ক্ষুদ্র মস্তিষ্কে উত্থাপিত হওয়া এক অনিমেষ সংকেতে তৎক্ষনাৎ শাওয়ার হেড ছেড়ে ছুটে এসে দাঁড়ালো বেসিনের সুবিশাল আয়নার অভিমুখে। ব্যস্ত হাতে সর্বাঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে লেপ্টে থাকা কালো রঙা সিক্ত ফিনফিনে শার্টের উপরাংশ উম্মুক্ত করল মাহি। ঠিক তখনি, তার চোখদুটো বোধহয় বিস্ফোরিত রূপ ধরে বেরিয়ে আসার যোগাড় হলো। আয়নার স্বচ্ছ প্রলেপে প্রতিবিম্বিত হচ্ছে — তার মসৃণ উর্ধাঙ্গের ত্বক। যেথায় থোকায় থোকায় ধারালো দাঁতের দাগ বসেছে গাঢ়। কালসিটে হয়ে আছে জায়গাগুলো। হতভম্ব রমণী একটু একটু করে উম্মুক্ত করল উদরের অংশ! সেখানেও দেখা মিললো একইরকম পাগলাটে পরশের ছোঁয়া। তার আর বুঝতে বাকি নেই — এ কান্ড কার!
মাহি দাঁত খিঁচল! তড়িঘড়ি করে কোনমতে শার্টের ক'টা বোতাম আঁটকে পা ছোটালো দরজার নিকট। ব্যতিব্যস্ত হয়ে দরজাটা এক ঝটকায় খুলে বের হতে গেলেই আচমকা থমকে গেল মাহি! দেখল — সম্মুখের দরজার দুপাশে দু'হাত ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে মুগ্ধ। ঘাড়টা হেলিয়ে রেখে, ঠোঁটের কোণে ঝুলিয়ে রেখেছে সে-ই চিরচেনা বাঁকা হাসিটুকু। অন্তর্ভেদী দৃষ্টে পরোখ করে যাচ্ছে সিক্ত রমণীকে।
মাহি'র ওদিকে খেয়াল নেই! মুগ্ধের দেখা পাওয়া মাত্রই চিড়বিড়িয়ে উঠল সে,
“ বেয়াদব লোক! আর কোনো জায়গায় বাকি রেখেছেন কামড়ানো? কি পান এসব করে, নির্লজ্জ লোক?”
মুগ্ধের দৃষ্টি রমণীর উর্ধাঙ্গে। যেথায় কালো রঙা ফিনফিনে শার্টখানা লেপ্টে আছে বড্ড। নারী কায়ার দুর্ধর্ষ রূপটুকুকে যেন ঢাকতে বড়ো হিমশিম খাচ্ছে বেচারা শার্টের প্রলেপটা। স্পষ্ট থেকেও স্পষ্টতর হচ্ছে চঞ্চলার প্রতিটি অঙ্গের বাঁক। মুগ্ধ দৃষ্টি বুলাচ্ছে রমণীর সর্বাঙ্গে। হিসহিসিয়ে প্রতুত্তর ছুড়ঁল,
“ বিয়ে করেছি তোকে! অসুস্থ বলে কী একটু-আধটু ছোঁবোও না? আমায় এতোটা ভদ্রলোক ভাবিস? অথচ ভদ্রলোকের স্পেলিংটাই আমার ডিকশনারিতে নেই!”
কপাল গোছালো মাহি! দাঁত তুললো কটমট শব্দ। সামান্য নড়েচড়ে এক কদম এগোতেই তার ক্লিভেজের গভীরতা পরিলক্ষিত হলো স্পষ্ট! যা মুহুর্তেই মস্তিষ্ক থমকে দিলো মুগ্ধের। বেচারা ঢোক গিলল আচমকা! তা দেখে রমণীর কপালের ভাঁজ গাঢ় হলো যেন। মুগ্ধের দৃষ্টি অনুসরণ করে আনমনে তাকাল এবার নিজ পানে। অমনি লজ্জায় গালদুটো ঝাঁঝিয়ে উঠল বেচারির। তড়িঘড়ি করে দু'হাতে নিজেকে আড়াল করবার চেষ্টা চালালো। পাদু’টো উল্টো ছুটিয়ে যেই না দৌড়ে পালাবে ওমনি তার মেদহীন বাঁকানো কোমরটা একটানে আঁকড়ে ধরল মুগ্ধ। এক বিকট হেঁচকা টানে রমণীর ক্ষুদ্র দেহটা টেনে এনে মিশিয়ে দিলো নিজের সঙ্গে। বোকা মানবী মোচড়াচ্ছে ভীষণ। তার পিঠ ঘেঁষেছে মুগ্ধের উদরের সনে। মুগ্ধ হাসলো বোধহয়! ঘাড় ঝুঁকিয়ে হিসহিসিয়ে দুষ্ট কন্ঠে শুধালো,
“ আমার চোখ চুলকাচ্ছে, সিগনোরা-হ! তাড়াতাড়ি শার্টটা খুলে ফেল তো।”
ভড়কায় মাহি! ব্যতিব্যস্ত কন্ঠে শুধায়,
“ চোখ চুলকালে পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন চোখদুটো! শুধু শুধু আমার শার্টের পেছনে পড়লেন কেনো?”
অধর কোণে লেপ্টে থাকা বাঁকা হাসিটুকু গাঢ় হলো মুগ্ধের। তক্ষুনি উল্টো বাক্যে আওড়াল,
“ তুই হয়তো ভুলে যাচ্ছিস, তোর গায়ে থাকা শার্টটা আমার! এক্ষুণি খোল শার্টটাকে। ফেরত দে আমার শার্ট আমাকে!”
“ ছিহ! ছিহ! ছিহ! একটা শার্টের জন্য কেউ এমন করে, বিস্ট? লোকে শুনলে কি বলবে? বলবে — রাশিয়ার অতোবড় একটা মাফিয়ারও না-কি শার্টের অভাব পড়েছে পরার জন্য। আপনার ক্লজেট ভর্তি শার্ট আছে না? যান না, ওখান থেকে একটা পরে ফেলুন।”
“ না আমি এটাই পরব! এক্ষুণি পরব। খোল আমার শার্ট!”
বলেই একহাতে শার্টটা খামচে ধরল মুগ্ধ। অন্যহাতে জড়িয়ে রাখল রমণীকে। মাহি অতিষ্ঠ বড্ড। নাক-মুখ কুঁচকে বুকের কাছের শার্ট খামচে আওড়াল,
“ না আমি দেবো না! এটা আমার হাজবেন্ডের শার্ট। এটার ওপর আমার অধিকার আছে!”
কথাটা শেষ হবার প্রায় সঙ্গে সঙ্গে এক ঝটকায় মাহি'কে নিজের দিকে ঘুরিয়ে দাঁড় করালো মুগ্ধ। চোখেমুখে দুষ্টুমির প্রলেপ লেপ্টে, শক্ত হাতে শার্টটা খামচে ধরে রেখে শুধালো —
“ তাই নাকি বেইব? সো..তোর হাসবেন্ডকে গিয়ে বল না...তার শার্টটা নিয়ে গিয়ে, ওয়াইফটা আমার জন্য রেখে দিয়ে যেতে! তোর হাসবেন্ডের ওয়াইফটা যা কড়া মালললললল না! উফফ...”
লজ্জায় হাসফাস করছে মাহি। কানদুটো গরম হয়ে ধোঁয়া ছাড়ছে বোধহয়। ক্ষুদ্র শরীরে মোচড় বাড়াল তক্ষুনি। মুগ্ধ ওসবের ধার ধরল না। একহাতের বলিষ্ঠ টানে আচমকা রমণীর দেহসৌষ্ঠবে লেপ্টে থাকা ফিনফিনে শার্টের প্রলেপটু ছিঁড়ে ফেলল এক নিমিষেই! মুহুর্তেই রমণীর অন্ত কায়া উম্মুক্ত হলো তার অক্ষিপুটের সম্মুখে। লাজুকলতার লজ্জায় বাড়ল তার মনন-চোখের আবেশিত ভাবস্রোত। কামনার তীব্র জঞ্জালে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে তৎক্ষনাৎ ঝোঁকাল ঘাড়। মায়াবিনী চোখ খিঁচে দাঁড়িয়ে আছে। ঠোঁটের ডগা বাকশূন্য। মুগ্ধ ধীরলয়ে হাত গড়াচ্ছে রমণীর গালের ত্বক হতে ঘাড়ের পেছনে। ক্ষনকাল পেরুতেই নিজ রুক্ষ আঙুলের ডগা দিয়ে খামচে ধরল মাহি'র চুলের গোছা। সেথায় টান বসিয়ে উচাঁলো রমণীর মুখ। অতঃপর তিরতির করে কাঁপতে থাকা টকটকে গোলাপি রঙা অধরজোড়ার পানে নিজ ওষ্ঠপুট বাড়িয়ে হাস্কি স্বরে আওড়াল,
“ আই মাস্ট সে, বিউটি, ইউ আর লুকিং ফা'কিং ইরেজিস্টিবল, অল ড্রেসড আপ ইন দোজ রেডিশ মার্কস আই লেফট অন ইউ। ড্যাম… আই হ্যাভ টু অ্যাডমিট, দে লুক ফার টু গুড অন ইউ।”
সর্বাঙ্গ শিউরে উঠছে মাহি'র। শুকনো ফাঁকা ঢোক গিলবার প্রয়াস চালাতেই আচমকা তার কোমল ওষ্ঠপুটের ওপর হামলে পড়ল মুগ্ধের রুক্ষ অধরযুগল। বেপরোয়া যুবকের অদম্য ব্যাকুলতা আর দখলদারির তীব্রতায় বাড়ছে চুম্বনের আবেশ! ক্ষুদ্র মানবীর বেগ পোহাতে হচ্ছে তাল মেলাতে গিয়ে। সে ত্রস্ত বন্ধ করল নিজ চোখ। ওমনি রূঢ় মানব চোখ খুলল। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাল অদূরের কাঁচ-ঘেরা দেয়ালের ওপাশে। যেখান থেকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে — ক'জন কালো পোশাকধারী তাড়াহুড়োয় কয়েকটা বস্তা টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছে গভীর জঙ্গলের দিকে। মুগ্ধের চোখজোড়া বাঁকা হাসলো তা দেখে! কয়েক মুহুর্ত সেদিকে তাকিয়ে থেকে পরক্ষণেই ফের ডুব দিলো মেয়েটার মাঝে। ভাগ্যিস দেয়ালগুলো ওয়ান-ওয়ে মিরর দিয়ে তৈরী। নতুবা এমন একটা মুহুর্ত থোড়াই গোপন থাকতো!
___________________________________________
গটগট পায়ে হাঁটছে এডউইন! তীব্র রাগে থরথর করছে তার চোয়াল। হাতের মুঠোয় চেপে রাখা আর্টিফিশিয়াল আঙুলটা। তার ক-কদম দুরত্বেই ক'জন গার্ড একপ্রকার টেনেহিঁচড়ে নিয়ে আসছে বেচারি নিরুকে। নিরু কাঁদছে! নিজেকে ছাড়ানোর বৃথা প্রয়াসে মত্ত। অথচ গম্ভীর মুখোর অনুমতি ছাড়া তাকে মুক্ত করা বারণ।
ধুপধাপ কদমের গতি হিমাংশু রায়ের কক্ষে বাঁক নিলো এডউইনের। কোনরূপ আগাম সতর্কসংকেত ছাড়াই গম্ভীর মুখো প্রবেশ করল সেথায়। এদিক ওদিক ঘাড় বাকিয়ে খুঁজল কাঙ্ক্ষিত ব্যাক্তিকে। শূন্য কামরার নিস্তব্ধতা যেন কাঁটার ন্যায় বিঁধল তার অঙ্গে। কপালের চামড়ায় গোটাকতক ভাঁজ ফেলে, আচমকা হুংকার ছুঁড়ল এডউইন,
“ হিমাংশু রায়!”
ক্ষণকাল বাদেই কক্ষ সংলগ্ন বারান্দা হতে বেরিয়ে এলেন হিমাংশু রায়। আহত মুখ তার, চোখদুটো তীব্র লাল! গায়ের ওপর এহেন অসময়ে জড়িয়ে রাখা মোটা একটা শাল। এডউইনের রাগ বাড়ল তাকে দেখে। ক্ষুব্ধ বাঘের ন্যায় তক্ষুনি হিং স্র গর্জন তুলে আওড়াল,
“ শ্যামৌপ্তী দেবীকে কেনো মে'রেছেন আপনি?”
কপাল গোছালেন হিমাংশু রায়। বিরসমুখে পিঠ ফিরে দাঁড়ালেন পরপর। গম্ভীর কন্ঠে প্রতুত্তর করলেন,
“ রাতে কী বেশি গিলে ফেলেছিস? নেশা না কাটলে লেবু পানি খা!”
“ মুখ সামলে কথা বলুন হিমাংশু রায়! ভুলে যাবেন না, আপনি মনস্টারের পরিচিত, আমার না। বেশি তেড়িবেড়ি করলে আপনাকে একটানে ছিঁড়ে ফেলতে আমি কিন্তু দুবারও ভাববো না।”
ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেললেন হিমাংশু রায়। বলে উঠলেন,
“ খুব বেশি ফ্রী থাকলে নিজের বা*ল ছেঁড়, ল্যাওড়ার ছেলে। পরে আমাকে ছিঁড়তে আসিস। এখন বের হো আমার ঘর থেকে।”
নাকের পাটা ফুললো এডউইনের। গজগজ করতে করতে এগিয়ে এসে একটানে হিমাংশু রায়ের বাহাতটা তুলে ধরল সম্মুখে। অমনি দেখা গেল — হিমাংশু রায়ের বাহাতের সবগুলো আঙুল অক্ষত! মুহুর্তেই কপাল কুঁচকে গেল এডউইনের। তার দৃষ্টি এবার আটকালো, হিমাংশু রায়ের শালের নিচে লুকিয়ে রাখা হাতটার পানে। সেদিকে হাত বাড়াতে গেলেই আচমকা গম্ভীর মুখোর বুক বরাবর ধাক্কা দিয়ে বসলেন হিমাংশু রায়। চিড়বিড়িয়ে বলে উঠলেন,
“ কী চাই?”
দু-কদম দুরত্বে দাঁড়িয়ে আছে এডউইন। ক্রুদ্ধ কন্ঠে বলে ওঠে,
“ শ্যামৌপ্তী দেবীকে কেনো মে'রেছেন আপনি?”
“ কোন প্রমাণের ভিত্তিতে আমার ওপর এই অভিযোগ এনেছিস, ল্যাওড়ার ছেলে?”
বাঁকা হাসলো এডউইন। তক্ষুনি হাতের মুঠোটা সম্মুখে এনে খুলে ধরল সে। হিসহিসিয়ে বলে উঠল,
“ আঙুলটা চিনতে পারছেন, হিমাংশু রায়? আমি জানি এটা আর কারোর নয়, আপনারই! যে হাত আপনি লুকিয়ে রেখেছেন, এটা সে-ই হাতেরই আঙুল।”
দাঁত কিড়মিড় করছেন হিমাংশু রায়। খেঁকিয়ে বলে উঠলেন,
“ এক্ষুণি আমার ঘর থেকে বের হো!”
শুনলো না এডউইন! উল্টো দাঁত খিঁচে শুধালো —
“ কী ভেবেছেন আপনি, হিমাংশু রায়? হাত লুকিয়ে রাখতে পারছেন বলে এত সহজেই পুরো সত্যটাও আড়াল করে ফেলবেন? আপনিই যে শ্যামৌপ্তী দেবীকে মেরেছেন, তা আর কেউ না জানুক—আমি ঠিকই জানি! কেননা ঐ কুয়োর গুপ্ত পথ আমি বাদে এই রায় বাড়িতে কেবল আপনিই জানেন।”
পিঠ ফিরে নিশ্চুপ ভঙ্গিতে এখনো দাঁড়িয়ে আছেন হিমাংশু রায়। মুখাবয়বে এতক্ষণে এঁকেছেন গাম্ভীর্যের কঠিন প্রলেপ। চোয়ালের পেশি শক্ত হয়ে উঠতেই ক্ষীণ কটমট শব্দে ফুটে উঠছে তার দমিত ক্রোধ।
ক্ষুব্ধ এডউইন দাঁত কিড়মিড় করে পুনরায় ধুপধাপ পায়ে এগিয়ে এসো মিটিয়ে দিলো মধ্যকার দুরত্ব। রণমূর্তি ভাব ধারণ করে ঝাঁঝালো কণ্ঠে বলে উঠল,
“ এখনো সময় আছে সত্যটা স্বীকার করুন হিমাংশু রায়। নতুবা — তৈরী থাকুন আপনার মেয়ের সর্বনাশ দেখার জন্য!”
নড়েচড়ে উঠলেন হিমাংশু রায়! ঘাড় বাঁকাতেই এডউইন কেমন দাঁত কিড়মিড়িয়ে শুধালো,
“ সত্য কোনোদিন চাপা থাকে না, হিমাংশু রায়! যে সত্য প্রকাশ পাওয়ার আগেই শ্যামৌপ্তী দেবীকে আপনি খু*ন করেছেন, তা আজ নয়তো কাল ঠিকই মনস্টারের সামনে এসে দাঁড়াবে! তিনি একদিন ঠিক জানতে পারবেন — তার বাবা আর কেউ নয়, বরং ভিনসেণ্ট রোম্যানিও, এবং এই সম্পূর্ণ সত্যিটা আপনি নিজের মুখে খোলাসা করবেন! যতদিন না করছেন ততদিন আপনার মেয়ে আমার কাছে থাকবে! কেমন থাকবে? তা বোধহয় সেদিনের রাতের কথা মনে করলেই বুঝে যাবেন।”
থামল এডউইন! খানিকটা নিঃশ্বাস টেনে আচমকা ভারিক্কি গলায় বলে উঠল —
“ যতদূর শুনেছি, তাতে আর বুঝতে বাকি নেই — মনস্তারের মায়ের মৃ*ত্যুর পেছনে লুকিয়ে আছে নির্মম কিছু সত্য। সে-ই সত্যে হয়তোবা আপনার হাতও.....”
বাক্যটি সম্পূর্ণ করার অবকাশটুকুও পেল না এডউইনের ব্যস্ত জিভ। তার আগেই আচমকা সম্মুখ হতে ছুটে এলো এক আগ্রাসী লাথি। যা সজোরে আঘাত হানল তার বুক বরাবর। এহেন অতর্কিত আক্রমণের অভিঘাতে মুহূর্তেই কয়েক কদম পেছনে ছিটকে পড়ল এডউইন। হতভম্বতার রেশ কাটিয়ে নিজেকে সামলে ওঠার পূর্বেই দৃষ্টি থমকাল সম্মুখের মধ্যবয়স্ক পুরুষটির পানে। তার মুখের আদল কেমন এক নিমেষেই বদলে গিয়েছে মন হচ্ছে। চোখেমুখে নেমে এসেছে হিং স্রতার অন্ধকার। তিনি এক ঝটকায় নিজ গায়ে জড়িয়ে থাকা মোটা শালটি খুলে দূরে ছুঁড়ে ফেললেন। মুহুর্তেই এডউইনের দৃষ্টিপটে স্পষ্ট হয়ে উঠল তার সদ্য ব্যান্ডেজ করা কাটা বাহুটি। সহসাই স্তব্ধ হয়ে গেল এডউইন। বিস্ময়ে অধর নড়ল খানিক। একি! হিমাংশু রায়ের হাত কোথায় গেল? হাত না থাকলে ঐ আর্টিফিশিয়াল আঙুলটা তবে কার?
আপন ভাবনায় মগ্ন এডউইন! কিছু বলার আগেই সম্মুখ থেকে গর্জে উঠল হিমাংশু রায়ের বাজখাঁই কণ্ঠ—
“ দু’দিনের বৈরাগী ল্যাওড়ার বাচ্চা! কতটুকু জানিস তুই? ঐ বান্দীর মেয়ে বলে যায়নি সবটা? বলে যায়নি — ঐ মা*** কি কি করেছে? বলে যায়নি — দ্য গ্রেট মাফিয়া শ্যাডো হান্টার, তার স্ত্রী গুলনুরের ৭মাসের গর্ভাবস্থায় আত্ম**হ*ত্যা করেছে!”
সহসা মাথার ওপর বাজ পড়ল এডউইনের। বিস্ফোরিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো সম্মুখে। ক্ষুব্ধ হিমাংশু রায় ঢুলতে ঢুলতে এগিয়ে এলো আরেক কদম। দাঁত খিঁচে শুধালো,
“ কতটুকু জানিস তুই কু***বাচ্চা? কতটুকু জানিস? প্রশ্ন করার খুব শখ তোর তাই না? তাহলে বল —
◑ যেই শ্যামৌপ্তীর সঙ্গে আগাগোড়ায় র*ক্তের কোনো সম্পর্ক নেই, সেই শ্যামৌপ্তীকেই পুরো পৃথিবীর সম্মুখে ‘ মা ’ বলে পরিচয় দিয়ে এসেছে দ্য মাফিয়া শ্যাডো মনস্টার, কেনো দিয়েছে?
◑ গুলনুরের র*ক্ত হওয়া স্বত্বেও কেনো একটাবার গুলনুরকে মা হিসেবে পরিচয় দেয়নি অধীর রায়?
◑ দ্য গ্রেট মাফিয়া শ্যাডো হান্টার, যার কদমতলে ছিল ক্ষমতার সকল উৎস, কি এমন ঘটেছিল তার সঙ্গে — যার দরুন তিনি আত্ম*হ*ত্যার মতো পথ বেছে নিলেন?
◑ শ্যামৌপ্তী কেনো নিজেকে রুশদী কিংয়ের স্ত্রী বলে দাবী করে? এটা জেনেছিস?
◑ অধীর যদি রায় বাড়ির কেউ নাই হয়ে থাকে — তাহলে জমিদার রায় বল্লভ কেনো তাকে নিজের উত্তরসূরী বানিয়ে গিয়েছিল?
◑ সবচেয়ে বড়ো কথা — যার মা মুসলিম পরিবারের সন্তান। তাকে কেন-ইবা চিতায় তোলা হয়েছিল? পরিপূর্ণভাবে ঝলসে যাওয়ার আগেই তুলে ফেলা হয়েছিল যার অর্ধগ*লিত লাশ — সে-ই লা*শ কোথায়? কেনো আজ পর্যন্ত ঐ লা*শ কারো জানাশোনার বাইরে?
◑ যেই ভিনসেণ্ট রোম্যানিও আত্ম*হ*ত্যা করেছে বলে পুরো পৃথিবী জানে, তার লা*শটাই বা কেন আজ অব্ধি কেউ দেখেনি? কোথায় তার লা*শ?
◑ অধীরের জন্ম যদি ভিনসেণ্টের মৃ*ত্যুর পরেই হয়ে থাকে — তাহলে অধীরের মা মা-রা যাবার সময় তিনমাসের গর্ভবতী ছিল কি করে? সে-তো দ্বিতীয় বিয়ে করেনি কোনোদিন!”
থামলেন হিমাংশু রায়! গলাটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছে তার। একমুহূর্ত নীরব থেকে আবারও আওড়ালেন,
“ তোর কী মনে হয় রে ল্যাওড়ার ছেলে, দ্য মাফিয়া শ্যাডো মনস্টার জানে না তার আসল পিতৃপরিচয় কী? জানে না তার অতীত?”
বলতে বলতেই এক পা এগিয়ে এলেন তিনি। দৃষ্টিতে যেন জ্বলন্ত আঙ্গার! ভাব এমন — এই বুঝি সামনের মানুষটিকে চোখের দৃষ্টিতেই ছিন্নভিন্ন করে ফেলবেন তিনি। দাঁত কিড়মিড়িয়ে ফের আওড়ালেন,
“ফাকিং বাস্টার্ড! যার বিষাক্ত অতীতের রহস্যের খোলাসায় ডুব দিতে চাচ্ছিস , অথচ তুই জানিসই না — সে নিজেই আস্ত একটা বিষাক্ত সাপ! একটাবার ভেবে দেখ তো — যেই পৌঢ়া গত ২০ বছরে কোনোদিন মুখ ফুটে একটা টুঁশব্দও করেনি কারো সঙ্গে, সে হঠাৎ করে তোর মতো ল্যাওড়ার ছেলেকে দেখে এতো কিছু কেনো বলেছে? একটাবারও মাথা খাটিয়েছিস?”
থমকায় এডউইন! কথাটা মস্তিষ্কে জোর দিচ্ছে তার। হিমাংশু রায় বাঁকা হাসলেন। হাসতে হাসতে আওড়ালেন,
“ কারণ সে জানে — মির্জা সায়ান মুগ্ধ নামের গোলকধাঁধায় একবার যারা পা দিবে, তাদের মুক্তি কেবল মৃ*ত্যু হয়েই ধরা দিবে।”
এডউইনের চোখে হাজারো প্রশ্ন! ঠিক তখনি খানিকটা ঝুঁকে দাঁড়ালেন হিমাংশু রায়। চিড়বিড় কন্ঠে আওড়ালেন,
“ রিমেম্বার, যা চোখে দেখা যায় — তা সবসময় সত্যি হয়না। যা কানে শোনা যায়, তা সবসময় বৈধ হয় না! যে গল্পের অতীতের সামান্য একাংশ জেনে তুই যাকে আগাগোড়ায় ভিকটিম ভাবছিস, অথচ সে নিজেই পুরো গল্পের মূল ভিলেন! হু ইজ নান আদার দ্যান — মির্জা সায়ান মুগ্ধ—ওরফে এডওয়ার্ড ভিনসেণ্ট ড্যানিয়েল। দ্য সন অব ভিনসেণ্ট রোম্যানিও! মেয়ে নিবি? ফাইন...নিয়ে যা। যা, যা। নিয়ে যা! তবে মাথায় রাখিস...তুই এখনো ড্যানিয়েল কী জিনিস তা বুঝতেই পারিসনি। ইউ আর স্টিল টু ইয়াং টু নো হিম, কিডো! নাউ গেট লস্ট, বাস্টা'র্ড!”
বলেই আর একমুহূর্তও সেদিকে দাঁড়ালেন না হিমাংশু রায়। গটগটিয়ে পা চালিয়ে চলে গেলেন খোলা বারান্দার দিকে। ক্ষুব্ধ দৃষ্টিতে অদূরের ঘনজঙ্গলের পানে তাকিয়ে ফোঁস ফোঁস করছেন তিনি। ঠিক তখনি, এক অযাচিত দৃশ্যে আচানক দৃষ্টিজোড়া থমকে গেল তার। কুয়োর পাশে সগৌরবে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে থাকা সুবিশাল রেন্ডি গাছের আড়াল হতে দেহের একাংশ বার করে দাঁড়িয়ে আছেন এক পাহাড়সম লোক! যার সর্বাঙ্গ ঢাকা কালো রঙা একখানা মোটা শালের আড়ালে। মাথার ওপরে শালের উপস্থিতি। মুখাবয়বের একাংশ ঢাকা তাতে।
হিমাংশু রায় দম খিঁচলেন তক্ষুনি! ভয়ার্ত দৃষ্টিজোড়া তার থমকে আছে — অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটার জ্বলজ্বল করতে থাকা নীলচে বা-চোখের পানে। উনি হাসছেন বোধহয়! মুখাবয়বের কুঁচকে যাওয়া চামড়ায় ভাঁজ পড়ছে তাতে। মুহুর্তেই দম আঁটকে এলো হিমাংশু রায়ের। বেচারা তড়িঘড়ি করে দু'হাত জোর করলেন লোকটার অভিমুখে। সর্বাঙ্গ শিউরে কাঁদছেন তিনি। কাঁদতে কাঁদতে কপাল ঠেকালেন হাতের সঙ্গে! বিড়বিড়িয়ে শুধালেন,
“ ক্ষমা করুন! ঐ নাম আমি আর উচ্চারণ করবো না। ক্ষমা করুন আমায়।”
__________________________________________
মেকআপ ভ্যানিটির সম্মুখে বসে আছে লাজুকলতা। দৃষ্টি তুলতে ঘোর আপত্তি! পেছনে দাঁড়িয়ে আছে বেয়াদব, নির্লজ্জ মহাশয়। তার উম্মুক্ত সিক্ত গায়ে লেপ্টে আছে পানিরছিটা। সম্মুখ আয়নার পানে দৃষ্টি ঠেকিয়ে, আলগোছে তোয়ালে দিয়ে চুল মুছে দিচ্ছে রমণীর। মাহি হাত কচলাচ্ছে অনবরত! বারকয়েক টিস্যু দিয়ে ঘষছে নাক। তন্মধ্যে পেছন থেকে মুগ্ধ কেমন শান্ত গলায় বলে উঠল —
“ উপরওয়ালার দেওয়া এই অভিশপ্ত চোখদুটো দিয়ে আমি অতি ধৈর্য্যের সাথে যা দেখছি তা হলো — তোর চোখেতে আমার সর্বনাশ!”
ভড়কায় মাহি। ত্বরিত তুললো দু-চোখ। হতভম্ব কন্ঠে শুধালো,
“ আমার চোখে আপনার সর্বনাশ? এমন ভয়ঙ্কর একটা কথা এতোটা অবলীলায় আপনি বলতে পারলেন, বিস্ট?”
অধর কামড়ে হাসল মুগ্ধ! পরপর পেছন থেকে দু'হাতে জড়িয়ে ধরল রমণীকে। ঘাড়ের ত্বকে মুখ ডুবিয়ে হাস্কি স্বরে জবাব দিলো —
“ বা-রে! তোর চোখদুটো যে রোজ আমায় একটু একটু ধ্বংস করছে, আমার অন্ধকার জগতে অভিশপ্ত আলোর ছটা ছড়িয়ে দিচ্ছে! নিজ চোখে নিজের সর্বনাশগুলো দেখেও কী অসামান্য ধৈর্য্য নিয়ে বসে আছি আমি। তাই বলে কী মুখেও বলব না — তোর চোখদুটো সর্বনাশী? তুই তো পুরোটাই আ
গাগোড়া আমার সর্বনাশী প্রিয়তমা-হ!”
চলবে.....