উপন্যাস : প্রণয়াসক্ত
পর্ব সংখ্যা : ১
লেখিকা : ফারিয়া মিম
🌸 হোসাইন ভিলা | সকাল ৭টা
— রায়ান! আর কতক্ষণ ঘুমাবি? নিচে আয়!
নাজনীন বেগমের চিৎকারে হোসাইন ভিলার শান্ত সকালটা মুহূর্তেই অশান্ত হয়ে উঠল।
সিঁড়ির পাশে দাঁড়িয়ে রায়ান হাই তুলতে তুলতে বলল,
— আম্মু, এত সকালে চিৎকার করো কেন? মানুষের ঘুমেরও তো একটা অধিকার আছে!
পাশের সোফায় বসে তাসনিম হেসে বলল,
— তোমার ঘুমের অধিকার আছে, কিন্তু আমাদের শান্তিতে থাকার অধিকার নেই?
রায়ান বোনের দিকে তাকিয়ে বলল,
— তুই চুপ কর। তোর বিয়ের সময় এমন পাত্র খুঁজব, যে তোকে সকাল ছয়টায় ঘুম থেকে উঠিয়ে দেবে!
তাসনিম চোখ বড় বড় করে বলল,
— আম্মু! ভাইয়া আমাকে বিয়ে দিয়ে দিতে চাইছে!
নাজনীন বেগম রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসে দুজনের মাথায় আলতো টোকা দিলেন।
— তোরা দুজন কি এক মিনিট চুপ থাকতে পারিস না?
ঠিক তখনই সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামল আরহাম হোসাইন।
কালো শার্ট, পরিপাটি চুল, হাতে ঘড়ি আর মুখে গম্ভীর ভাব। তাকে দেখেই রায়ান সোজা হয়ে দাঁড়াল।
— সুপ্রভাত, বড় ভাই!
আরহাম একবার তাকিয়ে বলল,
— তোর মুখে সকালবেলা এত হাসি কেন?
— কারণ আজ আমার মন ভালো!
— আমার কিন্তু তোকে দেখেই মন খারাপ হয়ে যাচ্ছে।
তাসনিম হেসে উঠল।
রায়ান বুকের ওপর হাত রেখে বলল,
— আম্মু, দেখো! নিজের ছোট ভাইয়ের সঙ্গে কেমন ব্যবহার করে!
আরহাম কোনো উত্তর না দিয়ে ডাইনিং টেবিলে বসে পড়ল।
নাজনীন বেগম ছেলের সামনে নাশতা রাখতে রাখতে বললেন,
— আরহাম, আজ দুপুরে মাহমুদ ভাইয়ের পরিবার আসবে। সবাইকে সময়মতো বাড়িতে থাকতে বলেছি।
আরহাম চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে জিজ্ঞেস করল,
— মেহেরও আসবে?
রায়ান আর তাসনিম একসঙ্গে একে অপরের দিকে তাকাল।
নাজনীন বেগম মুচকি হেসে বললেন,
— হ্যাঁ, মেহেরও আসবে। কেন?
— এমনিই জিজ্ঞেস করলাম।
রায়ান মুখ টিপে হাসল।
— ভাই, মেহের আপুর জন্য আলাদা করে চা বানাতে বলব?
আরহাম চোখ তুলে তাকাল।
— তোর জন্য কি একটা তালা কিনে আনব?
— কেন?
— মুখ বন্ধ রাখার জন্য।
রায়ান সঙ্গে সঙ্গে চুপ করে গেল।
তাসনিম হাসতে হাসতে বলল,
— ভাইয়া, আপনি সত্যিই একটা বিপদ!
আরহাম নির্বিকারভাবে উত্তর দিল,
— তোদের সঙ্গে থাকতে থাকতে এমন হয়েছি।
━━━━━━━━━━━━━━━━━━
— আম্মু! আমার গোলাপি জামাটা কোথায়?
মেহেরের চিৎকারে খান বাড়ির সবাই বিরক্ত হয়ে গেল।
নাজমা বেগম রান্নাঘর থেকে বললেন,
— আলমারিতে দেখ!
— দেখেছি! নেই!
— তাহলে অন্য আলমারিতে দেখ!
— আম্মু, আমার জামা কি নিজে নিজে হাঁটতে পারে?
মায়া পাশের ঘর থেকে বেরিয়ে এসে বলল,
— পারে আপু! হয়তো তোমার অত্যাচারে পালিয়ে গেছে!
মেহের বালিশ তুলে মায়ার দিকে ছুড়ে মারল।
— এই মেয়ে! তোর মুখে কি কোনো দিন ভালো কথা আসে না?
মায়া হেসে বলল,
— আসে তো! কিন্তু তোমার সামনে বলতে ভুলে যাই!
ঠিক তখন আরমান ঘরে ঢুকল।
— কী হয়েছে আবার?
মেহের অভিযোগের সুরে বলল,
— ভাইয়া, কেউ আমার জামা লুকিয়ে রেখেছে!
আরমান দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
— তোর জামা খুঁজতে এখন গোয়েন্দা ডাকতে হবে?
— ডাকো! আমার জামা উদ্ধার না হওয়া পর্যন্ত আমি কোথাও যাব না!
নাজমা বেগম হাতে জামাটা নিয়ে ঘরে ঢুকলেন।
— এই যে তোর জামা! কাল রাতে নিজেই অন্য আলমারিতে রেখেছিস!
মেহের কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে জামাটা নিয়ে বলল,
— আমি পরীক্ষা করছিলাম, তোমরা আমাকে কতটা ভালোবাসো!
আরমান হেসে বলল,
— তুই একদিন আমাদের সবাইকে পাগল করে ছাড়বি!
মেহের জামাটা বুকে জড়িয়ে ধরে বলল,
— ভালোবাসো বলেই তো সহ্য করো!
মায়া মাথা নেড়ে বলল,
— আপুর আত্মবিশ্বাস দেখে আমি মুগ্ধ!
কিন্তু মেহেরের হাসি বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না।
মায়া হঠাৎ বলল,
— আপু, আজ হোসাইন বাড়িতে যাচ্ছি। আরহাম ভাইয়াও থাকবে!
মেহেরের মুখটা সঙ্গে সঙ্গে গম্ভীর হয়ে গেল।
— ওই রাগী লোকটার নাম আমার সামনে নিবি না!
আরমান ভ্রু তুলে তাকাল।
— আরহাম কী করেছে?
— কিছু করেনি! ওর মুখটাই এমন, দেখলে মনে হয় পৃথিবীর সব মানুষ ওর কাছে টাকা ধার নিয়েছে!
মায়া হেসে বলল,
— আপু, তুমি কিন্তু আরহাম ভাইয়াকে বেশ ভালোই খেয়াল করো!
মেহের চোখ বড় করে তাকাল।
— মায়া!
— আচ্ছা, আর কিছু বলব না!
মায়া দৌড়ে পালিয়ে গেল।
মেহের বিড়বিড় করল,
— হোসাইন বাড়িতে গিয়ে যদি লোকটা আমাকে বিরক্ত করে, তাহলে কিন্তু আমি ছেড়ে কথা বলব না!
━━━━━━━━━━━━━━━━━━
🖤 হোসাইন ভিলা | দুপুর ১২টা
দুপুরের আগেই খান পরিবারের সবাই হোসাইন ভিলায় এসে পৌঁছাল।
ড্রয়িংরুমে কামাল হোসাইন ও মাহমুদ খান পুরোনো দিনের গল্পে মেতে উঠেছেন। ফারুক হোসাইন আর শায়লা বেগমও তাঁদের সঙ্গে গল্প করছেন।
এদিকে রায়ান, তাসনিম, নুহা আর আদনান মিলে নতুন পরিকল্পনা করছে।
রায়ান ফিসফিস করে বলল,
— আজকে একটা কাজ করব।
নুহা কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল,
— কী কাজ?
— আরহাম ভাই আর মেহের আপুকে একসঙ্গে বসাতে হবে!
তাসনিম হেসে বলল,
— তারপর পাঁচ মিনিটের মধ্যে ঝগড়া শুরু হবে!
আদনান মাথা নেড়ে বলল,
— তোমাদের কাজ নেই?
রায়ান গম্ভীর মুখে উত্তর দিল,
— আছে। পরিবারের বিনোদন বিভাগের দায়িত্ব আমাদের!
ঠিক তখনই দরজার কাছে মেহের এসে দাঁড়াল।
— কার বিনোদন বিভাগ?
চারজন একসঙ্গে সোজা হয়ে বসল।
তাসনিম দৌড়ে এসে মেহেরকে জড়িয়ে ধরল।
— আপু! তুমি এসেছ!
মেহের হেসে বলল,
— হ্যাঁ, এসেছি। কিন্তু তোমাদের মুখ দেখে মনে হচ্ছে আমার অনুপস্থিতিতে কোনো ষড়যন্ত্র চলছিল!
রায়ান সঙ্গে সঙ্গে বলল,
— না না, আমরা তো তোমার প্রশংসা করছিলাম!
মেহের ভ্রু তুলে তাকাল।
— আমার প্রশংসা? তোমার মুখে?
— মানুষ বদলায়, আপু!
মেহের হেসে ফেলল।
ঠিক তখন পেছন থেকে গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে এল,
— এত চিৎকার করার কী আছে?
মেহের ঘুরে তাকাল।
আরহাম!
কালো শার্টের হাতা গোটানো, চোখে গম্ভীর দৃষ্টি।
মেহের মনে মনে বলল,
আল্লাহ, লোকটা কি হাসতে ভুলে গেছে?
আরহাম তার দিকে তাকিয়ে বলল,
— তুমি কি সব সময় এত কথা বলো?
মেহের মিষ্টি হেসে উত্তর দিল,
— না। আপনার মতো মানুষ সামনে থাকলে একটু বেশি বলতে হয়।
— কেন?
— নীরবতা ভাঙার জন্য!
রায়ান মুখ চেপে হাসল।
আরহাম ভ্রু কুঁচকে বলল,
— তুমি নিজেকে খুব চালাক মনে করো?
মেহেরও পিছিয়ে গেল না।
— মনে করি না, জানি!
— অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস ভালো না।
— আর অতিরিক্ত রাগও ভালো না।
চারপাশে হাসির শব্দ ছড়িয়ে পড়ল।
আরহাম কিছুক্ষণ মেহেরের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,
— তোমার সঙ্গে কথা বলাই ভুল।
মেহের সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল,
— তাহলে কথা বলেন কেন?
আরহাম থেমে গেল।
রায়ান ফিসফিস করে বলল,
— ভাই, এই রাউন্ডে আপনি হেরে গেছেন!
আরহাম তার দিকে তাকাতেই রায়ান মুখ বন্ধ করে ফেলল।
মেহের বিজয়ীর হাসি দিয়ে পাশ কাটিয়ে চলে গেল।
কিন্তু আরহাম কেন যেন মেয়েটার চলে যাওয়ার দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইল।
━━━━━━━━━━━━━━━━━━
বিকেলে বাড়ির সবাই যখন গল্পে ব্যস্ত, মেহের তখন বাগানে দাঁড়িয়ে গোলাপ দেখছিল।
একটি গোলাপের দিকে হাত বাড়াতেই পেছন থেকে আরহামের কণ্ঠ শোনা গেল,
— ফুলটা ছিড়ো না।
মেহের ঘুরে তাকাল।
— কেন? আপনার অনুমতি নিতে হবে?
— ফুলগুলো যত্ন করে লাগানো হয়েছে।
মেহের হাত সরিয়ে নিল।
— আচ্ছা, ছিড়ব না। খুশি?
আরহাম তার দিকে তাকিয়ে বলল,
— তুমি সব সময় আমার সঙ্গে ঝগড়া করো কেন?
মেহের একটু অবাক হলো।
— আপনি সব সময় এমন গম্ভীর হয়ে থাকেন কেন?
আরহাম দৃষ্টি সরিয়ে নিল।
— সবাইকে নিজের সব কথা বলতে হয় না।
মেহেরের মুখের হাসি একটু নরম হয়ে এল।
— ঠিক বলেছেন। তবে সব সময় রাগ দেখালে মানুষ আপনাকে ভুল বুঝতে পারে।
আরহাম কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
— তুমি আমাকে বোঝার এত চেষ্টা করছ কেন?
মেহের সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল,
— ভুল বুঝবেন না! আমি আপনার মন বোঝার চেষ্টা করছি না। শুধু আপনার রাগের কারণটা জানতে ইচ্ছা হলো।
আরহামের ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ হাসি ফুটে উঠল।
— আমার রাগের কারণ জানতে চাইলে অনেক সময় লাগবে।
মেহেরও মুচকি হাসল।
— সমস্যা নেই। আপনার রাগ কমানোর জন্য আমি তো আর চাকরি নিতে আসিনি!
কথাটা বলেই সে চলে গেল।
আরহাম বাগানে দাঁড়িয়ে রইল।
মেয়েটা ভীষণ জেদি।
কথায় কথায় তাকে হারিয়ে দেয়।
তবু মেয়েটার সঙ্গে কথা বলতে তার একেবারে খারাপ লাগে না।
এই ভাবনাটা মাথায় আসতেই আরহাম বিরক্ত হয়ে গেল।
অদ্ভুত মেয়ে!
অন্যদিকে মেহের বাড়ির ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে বিড়বিড় করল,
অহংকারী মানুষ একটা!
কিন্তু তার ঠোঁটের কোণেও তখন অজান্তে হাসি লেগে ছিল।
দুজনের কেউই জানত না, এই ছোট ছোট ঝগড়াগুলো একদিন তাদের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর স্মৃতি হয়ে উঠবে।
কারণ কিছু ভালোবাসা প্রথম দেখাতেই জন্ম নেয় না।
কিছু ভালোবাসা জন্ম নেয় প্রতিদিনের খুনসুটিতে, ছোট ছোট যত্নে, অভিমানে আর একে অপরকে বুঝতে শেখার মধ্য দিয়ে।
চলবে... 🖤🌷
— প্রথম পর্ব সমাপ্ত —