#আমৃত্যু_ভালোবাসি_তোকে
#সিজন_৩
#ফারজানা_মনি
#পর্ব:৩ ও ৪
#গল্পপ্যাক্ট_মাহবুবা
বন্যা তৃধার কান টেনে ধরে বলল:
সেটা কি তোমার এখন মনে পরেছে?
তৃধা হালকা চিৎকার দিয়ে বলল:
আওওওও.... ব্যাথা পাচ্ছি মামমাম..
বন্যা কান টা আরেকটু জোরে টান
দিয়ে বলল: ব্যথা পাওয়ার জন্যই দিয়েছি।
এবার মেঘ বন্যার হাতে চিমটি কেটে বলল:
এই বেবি আমার মেয়েকে ছাড় বলছি।
ভাইয়া আসলে আজকে তোর নামে
নালিশ দিব। বন্যা তৃধার কান ছেড়ে
বলল: কয়েকদিন যাক তারপরে বুঝবি,
ও কি জিনিস!
ওর কথা শুনে সবাই হেসে দিল।
এবার আহিয়া এগিয়ে এসে তৃধার হাতে
গিফট বক্সটা দিল। তৃধা তো মহাখুশি।
হাসি হাসি মুখ নিয়ে জিজ্ঞাসা করল:
এই গিফট বক্সে কি আছে আপু?
আহিয়া বলল: এখন তো বলবো না
রুমে গিয়ে খুলে দেখ।
তৃধা খুশিতে অধৈর্য্য ভঙ্গিতে বলল:
ঠিক আছে আপু। আমি এক দৌড়ে
যাব আরেক দৌড়ে আবার আসবো।
মাঝখানে শুধু বই খাতা গুলো রেখে
গিফট টা দেখব।
আহিয়া হেসে বলল: ঠিক আছে যা..
সাবধানে যাস দৌড়ে পড়িস না।
তৃধা এ বছরের উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী
অষ্টাদশী কন্যা। আবির, মেঘ, আহিয়ান ,
আহিয়া , আদি ও মিম যাওয়ার পর বাড়িটা
অনেক শূন্য হয়ে গিয়েছিল। ছোট সদস্যদের
মধ্যে একমাত্র রয়ে গিয়েছিল তানভীর বন্যা
ও তাদের একমাত্র আদরের মেয়ে তৃধা।
তৃধা সারাক্ষণ পুরো বাড়ি মাতিয়ে রাখে।
আলী আহমেদ খান, মোজাম্মেল খান
ইকবাল খান ও তাদের কর্তিদের এই
বুড়ো বয়সে একমাত্র খুশির কারণ এই
তৃধা। তাছাড়া তানভীরের আদরের রাজকন্যা।
তৃধার জন্মের পর তানভীর ও বন্যা দ্বিতীয়
সন্তানের কথা কখনো মাথায় আনেনি।
তৃধার এত দুষ্টুমির জন্য বন্যা অনেক সময়
শাসন করতে চাইলেও ওর দাদা দাদির জন্য
পারেনা। ওনাদের একটাই কথা.. এই বয়সে
মেয়ে একটু চঞ্চল থাকবেই। এতে দোষের
কিছু নেই। তাছাড়া তৃধা তো বাহিরে কারো
সাথে এত দুষ্টুমি করে না, লেখাপড়াও করে
গার্লস কলেজে। তাহলে সমস্যা কি?
বন্যা প্রতিবার ওনাদের যুক্তি শুনে হতাশ হয়।
তবে একটা কথা সত্যি, খান বাড়ির সম্মান নষ্ট
হবে এমন কোন কাজ তৃধা কখনো ই করেনি।
বিকেলের স্নিগ্ধ বাতাস শনশন করে ব্যালকনি
দিয়ে রুমে ঢুকছে। তৃধা নিজের রুমের দরজা
টি ধাক্কা দিতেই লক্ষ করল ভেতরে অন্ধকার।
ব্যালকনি দিয়ে আবছা আলো প্রবেশ করছে ।
সেই আদো আলোতে সবকিছু কিছুটা স্পষ্ট।
তৃধা গিফট পেয়ে এতটাই খুশি যে রুমের লাইট
অন না করে ই বেলকনির দিকে গেল। তাছাড়া
গিফট পেতে কার না ভালো লাগে.. ব্যালকনিতে
ছোট্ট একটা দোলনা রাখা। যার আশেপাশে
ছোট ছোট ফুল গাছ।
তৃধা দোলনায় বসে বক্সের রঙিন রেপিং
পেপারগুলো ছিড়তে লাগলো। দেখল গিফট
বক্সে রয়েছে, পাঁচটা গোল গাউন। প্রতিটার
কালার এতই সুন্দর। তৃধা তো এই ড্রেসগুলো
পড়ার লোভ সামলাতেই পারছে না। বক্সের
একপাশে চোখ যেতেই লক্ষ্য করল...
অনেকগুলো কসমেটিক, জুয়েলারি সেট
এবং অনেকগুলো বিদেশি চকলেট। তৃধা
খুশিতে নিজেকে আর আটকে রাখতে
না পেরে সেখান থেকে একটা লাল ড্রেস
হাতে নিল তারপর মুখে একটা চকলেট
পুরে দিয়ে ঢুকে গেল ওয়াশরুমে। প্রথমে
ভেবেছিল আগের ড্রেসটা পাল্টে নতুন
ড্রেসটা ট্রায়াল করে দেখবে। পরে ভাবলো,
কোচিং থেকে এসে নিজের গায়ে কেমন
জানি ধুলো ধুলো লাগছে। তাই তৃধা শাওয়ার
নেয়ার সিদ্ধান্ত নিল।
দীর্ঘ একটা শাওয়ার নিয়ে বাহিরে এসে যখন
আয়নার সামনে দাঁড়ালো তখন লক্ষ্য করল
আয়নায় তো তাকে দেখা যাচ্ছে না। সে দুই
মিনিট ভাবল, তারপর নিজের মাথায় নিজেই
একটা চাটি মেরে বলল: ইশ তৃধা.. তুই কি
বলদ.. রুমের লাইটটা না জ্বালালে নিজেকে
দেখতে পাবি কি করে? বলতে বলতেই এগিয়ে
গিয়ে রুমের লাইট অন করল। হঠাৎ চোখ
গেল বিছানায় কেউ খালি গায়ে উপর হয়ে
শুয়ে আছে। তৃধা খানিকটা ভয় পেলেও
সামনে এগিয়ে গেল। চোখে মুখে লাইটের
আলো লাগায় যুবকটি হালকা নড়ে চড়ে ওঠে।
আস্তে আস্তে বিরক্তিকন্ঠে বিড়বিড় করে বলে:
উফফ আহিয়া.. লাইট টা অফ করে কি বলবি
বলে যা.. আহিয়ানের কন্ঠ শুনে তৃধার তো
চোখ কপালে ওঠার উপক্রম। মনে মনে বলল:
এই রক্তচোষা বাদর আমার রুমে কি করে?
তারপর মনে মনে আরো কিছু ভেবে শয়তানি
হাসলো। আর বলল: বিদেশি বাঁদর একটা..
দুপুরে তো আপনার চোখ আর ঠোট অনেক
চলেছিল তাই না। wait এটা বন্ধ করার
ব্যবস্থা করছি। বলেই তৃধা এগিয়ে গেল
ড্রেসিং টেবিলের সামনে। সেখান থেকে
একটা কাজল, একটা মেকআপ বক্স ও
একটা লাল টুকটুকে লিপস্টিক বের করল।
লিপস্টিকটা হাতে নিয়ে নিজের ঠোঁটে
একটু লাগাতে লাগাতে বলল: আজ
আপনার মুখটাকে এত সুন্দর করে
সাজাবো যাতে আমাকে দেখলে আপনার
মুখটা আর না চলে মিস্টার মেহেবুব খান
আহিয়ান। তৃধা পা টিপে টিপে এগিয়ে
গেল বিছানার দিকে। আস্তে আস্তে
বিছানায় উঠে বসলো। তারপর আহিয়ানের
মুখটা হালকা করে ধরে নিজের দিকে ঘুরিয়ে
যেই না মেকআপ টা ছুয়াবে ঠিক তখনই
আহিয়ান তৃধাকে ঘুরিয়ে বিছানায় শুয়ে
দিয়ে নিজে ওর উপর উপুড় হয়ে গেল।
আকস্মিক ঘটনায় তৃধা খানিকটা ভয় পেয়ে
গেছে। ভয়ে চোখ খিচে বন্ধ করে আছে।
আহিয়ান দেখলো ভয়ে মেয়েটার লাল
টুকটুকে ওষ্ঠাধর তীর তীর করে কাঁপছে।
চোখে মুখে এখনো সদ্য গোসলের পানির
ছিটে বিকেলের নরম আলোয় ঝলমল
করছে। ভেজা চুলগুলো এলোমেলো হয়ে
পড়ে আছে বিছানাসহ মেয়েটার চোখে
মুখে। লাল ড্রেসটাতে দুধে আলতা গায়ের
রংয়ের তৃধাকে একদম লাল পরী লাগছে।
আহিয়ান বিড়বিড় করে বলল:
আকাশ থেকে নেমে আসা লাল পরী। একজন আরেকজনের নিঃশ্বাস উপলব্ধি করতে পারছে
তারা এখন এতটাই কাছে।
এর মাঝেই হঠাৎ তৃধা চোখ খুলে বলল:
আহিয়ান ভাই...
প্লিজ আমাকে এবারের মতো ছেড়ে দিন।
আর জীবনেও এমন করবো না.. পিংকি
প্রমিস। আহিয়ান এবার নিজেও থতমত
খেয়ে গেল। এ পাগলি মেয়েটা কে এভাবে
দেখার কিছু নেই। কথাটা মনে মনে বলেই
সে তৃধাকে ছেড়ে দিল।
তারপর একটু গলা খাকারী দিয়ে গম্ভীর
কন্ঠে তৃধার উদ্দেশ্যে বলল : তোর এখানে
কি চাই? সেই ছোটবেলা থেকেই দেখছি,
আমাকে ডিস্টার্ব না করলে কি তোর ভালো
লাগে না?
তৃধা বিছানা থেকে নেমে দাঁড়িয়ে বলল:
আমি আপনাকে কিভাবে ডিস্টার্ব করলাম
বরং আপনিই তো আমার বিছানায় এসে
ঘুমিয়ে আছেন। আহিয়ান এবার নিজের
ভুল বুঝতে পেরে কথা এড়িয়ে ধমক দিয়ে
বলল: সর সামনে থেকে.. অন্য রুমে চলে
যাচ্ছি। আহিয়ান দরজার সামনে যেতেই
তৃধা ডেকে বলল: আহিয়ান ভাই...
আহিয়ান পিছনে ঘুরে আস্তে করে বলল:
হুম...
তৃধা টুকটুকে লাল গাউন টাকে হাতে ধরে
ঘুরাতে ঘুরাতে বলল: আমাকে কেমন লাগছে?
আহিয়ান এক নজর তৃধার মুখের দিকে
তাকিয়ে বলল: একদম সাদা মুলা থেকে লাল
মুলার মতো লাগছে।
তৃধা চোখ গোল করে তাকিয়ে বলল:
কিহ!!!
আহিয়ান আর কিছু না বলে বড় বড় পা
ফেলে রুম থেকে বেরিয়ে গেল। আর তৃধা
রাগে জিদ্দে হনহন করে ঢুকলো ড্রেস
চেঞ্জ এর জন্য ওয়াশরুমে।
বিকেল ছয়টা বাজে। আলী আহমেদ
খানের গাড়ি ও তানভীরের বাইকের
শব্দ একসাথে পাওয়া যাচ্ছে। তানভীর
অফিস ছুটির পর একটা জরুরী প্রয়োজনে
আব্বু চাচ্চুদের অফিসে গিয়েছিল। সেখান
থেকে একেবারে ওনাদের নিয়েই ফিরেছে।
বাড়িতে ঢুকতে ঢুকতে খান বাড়ির পুরুষরা
ব্যবসায়িক আলোচনায় ব্যস্ত। তানভীর
কলিং বেল বাজাতে গিয়ে লক্ষ্য করলো:
দরজা খোলাই আছে। দরজা এভাবে
খোলা দেখে তার মনে একটু সন্দেহ জাগলো।
এগিয়ে গেল ভিতরে। সারা বাড়ি অন্ধকার
দেখে সে একটু থমকে দাঁড়ালো। ইতিমধ্যেই
তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে আলি আহমেদ
খান, মোজাম্মেল খান ও ইকবাল খান।
আলী আহমেদ খান একটু গম্ভীর কণ্ঠ
বললেন: বাড়ির লোক সব কই? এই
অসময়ে সারা বাড়ির লাইট অফ কেন?
তানভীর একটু আশ্বাস দিয়ে বলল : আমি
দেখছি বড় আব্বু। বলেই তানভীর এগিয়ে
গেল লাইটের সুইচের দিকে। লাইট অন......
এক মুহূর্তেই .....
______সারপ্রাইজ______
সকলে অবাক হয়ে সেদিকে তাকালেন।
দেখলেন.. আবির,মেঘ, আহিয়ান, আহিয়া,
তৃধা, আদি, রাই ও আদিবা দাঁড়িয়ে। তানভীর
তো খুশিতে ছুটে গেল আবিরের দিকে।
জাপটে ধরে বলল: কেমন আছো ভাইয়া..
আবিরও এতদিন পরে ভাইকে দেখে খুশিতে
জড়িয়ে ধরে বলল :ভালো আছি, তুই কেমন
আছিস..
তানভীর: তোমাকে ছাড়া ভালো
ছিলাম না এত বছর। কিন্তু এখন বিন্দাস
আছি। পাশ থেকে মেঘ কাঁদো কাঁদো মুখ
নিয়ে বলল: ভাইয়া তো আমায় ভুলেই গেছে।
এবার তানভীর মেঘের কাছে গিয়ে কাধ
জড়িয়ে ধরে বলল:
আমি কি আমার মিষ্টি বোনটাকে ভুলতে পারি?
মেঘ তো এবার কেদেই দিল। বলল: কেমন
আছো ভাইয়া.. তানভীর তার আহ্লাদী বোনের
চোখের পানি মুছে দিয়ে বলল: ভালো আছি বনু। তুই কেমন আছিস?
এতদিন ভালো ছিলাম না তোমাদের ছাড়া।
এখন ভালো আছি। অন্যদিকে আলী আহমেদ
খান , মোজাম্মেল খান ও ইকবাল খান এখনো
স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তারা যেন নিজের
চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না। আহিয়ান
ও আহিয়া এগিয়ে গেল সেদিকে। ওনাদের
সালাম করে দোয়া নিলো। আবির এগিয়ে
গিয়ে বাবাকে সালাম করে বুকে জড়িয়ে
ধরল। আলী আহমেদ খান এত বছর পর
ছেলেকে কাছে পেয়ে হয়তো কিছুটা
আবেগী হয়ে উঠলেন। আবিরের কপালে
চুমু দিয়ে বলল: এই বৃদ্ধ বাবা মাকে ছেড়ে
আর যাস না বাপ। শেষ বয়সে তোদের
সবাইকে নিয়ে একসাথে থাকতে চাই।
আবির বাবাকে আরেকবার জড়িয়ে ধরে
বলল; যাব না আব্বু.. আর কোথাও যাবো
না তোমাদের ছেড়ে। এদিকে মেঘ , আদি
ও রাই এসে বাড়ির তিন কর্তা কে সালাম
করলো। আদি ইকবাল খানকে জড়িয়ে
ধরে বলল: আব্বু.. আমি লন্ডনের
চাকরিটা থেকে রিজাইন নিয়েছি। এখন থেকে
তোমাদের সাথে দেশেই থাকবো। তোমাদের
ব্যবসা সামলাবো ভাইয়ার সাথে। ইকবাল
খানের চোখ খুশিতে চকচক করে উঠলো।
বলল সত্যি বলছিস বাবা,, তোরা সত্যিই
কেউ আর যাচ্ছিস না? আদি মাথা ঝাঁকিয়ে
বলল: জ্বী আব্বু.. মেঘতো নিজের আব্বুকে
জড়িয়ে ধরে সে কি কান্না.. ওর কান্নায় মুহূর্তেই
হাসিখুশি পরিবেশটা ভারি হয়ে উঠল। আদিবা
ছুটে এসে আলী আহমেদ খানের কোলে উঠলো।
কোলে থেকেই বারবার বলছে : বড় দাদু..
আমার বড় আম্মু কাদছে.. তুমি কি মেরেছো?
আলি আহমেদ খান হেসে দিয়ে বলল: না ছোট
বউ, মেঘ আমার অনেক আদরের মেয়ে
আমি কি তাকে মারতে পারি?
আদিবা খিলখিলিয়ে হেসে বলল: মেঘ না
আম্মু বল আম্মু.. আদিবার মুখের মিষ্টি বুলি
শুনে মেঘ সহ সকলেই হেসে দিল। মেঘ কান্না
মুছে আদিবার গালে চুমু দিল।
সন্ধ্যার পর্দা তখন ধীরে ধীরে নেমে আসছে।
আকাশের বুকে লালচে আভা মিলিয়ে গিয়ে
একধরনের নীলচে অন্ধকার নামছে চারপাশে।
রাস্তার বাতিগুলো একে একে জ্বলে উঠছে,
বাতাসে হালকা শীতলতা। শহরের ব্যস্ততার
ভেতরেও একটা শান্ত, নিস্তরঙ্গ আমেজ জমে
আছে। কাছেই একটা দোকান থেকে ভাজা
সমুচার গন্ধ নাকে লাগছে।
চিরচেনা সেই ছোট্ট চায়ের দোকানটা যেন
সন্ধ্যার জমায়েতের আসর বসেছে আজ
বহু বছর পর। বাঁশের বেঞ্চ, কাঠের টেবিল,
আর কাচের গ্লাসে ধোঁয়া ওঠা চা—
সবকিছুতেই একরকম পরিচিত আর আপন
গন্ধ।সেই দোকানের এক কোণে পাশাপাশি
বসে আছে আবির, তানভীর, রাকিব, রাসেল
ও মোবারক । সামনে রাখা ধোঁয়া ওঠা চায়ের
কাপ, টেবিলের উপর কয়েকটা বিস্কুটের প্লেট।
আড্ডার ফাঁকে ফাঁকে চায়ের ধোঁয়া উড়ে
যাচ্ছে বাতাসে।
—"এই যে, এতদিন পর আবার সবাই একসাথে,
মজাই লাগছে!" মোবারক হাসতে হাসতে বলল।
চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে আবির উত্তর দিল : এতগুলো বছর ধরে তোদের সাথে চায়ের
দোকানের এই আড্ডাটাকে অনেক মিস করেছি
দোস্ত..রাকিব হঠাৎই বলে উঠল, " আবির
কে ছাড়া তো চায়ের দোকানের আড্ডা আগে
কখনোই জমতো না । তাইতো গত ১০-১২
বছরে এখানে এসে আমাদের একবারও
আড্ডা দেওয়া হয়নি"তানভীর হাসতে হাসতে
টেবিলে চাপড় মারল, "ঠিকই বলেছো,
ভাইয়াকে ছাড়া কি চায়ের আড্ডা জমে?
তবে এখন থেকে আড্ডা হবে আগের মত..
প্রতি শুক্রবার।"
আবির বলল: থাম এবার তোরা, সব হবে।
এবার রাসেল আবির কে উদ্দেশ্য করে বলল:
তোর মতো ছেলে সত্যিই আজকালকার
জমানায় পাওয়া যায় না। আমাদের পাঁচ বন্ধুর
মধ্যে তুই সবচেয়ে বেশি দায়িত্বশীল। তোর
জায়গায় আমি হলে বিদেশের মাটিতে থেকে
কখনো দেশের বিজনেস সামলাতে পারতাম না।
তুই একা হাতে পরিবার, ব্যবসা ,ছেলে মেয়ের
ভবিষ্যৎ সব সামলে নিয়েছিস।
আবির রাসেলের কাঁধে হাত রেখে বলল:
হইছে বাপ আর গ্যাস দিস না, বেশি ফুইলা
গেলে ফুইটা যামু।
আবিরের এমন ব্যঙ্গ করা কথা শুনে.. তানভীর,
রাকিব, রাসেল মোবারক একসাথে হেসে দিল।
রাকিব বলল: অফিসে কবে যাওয়ার চিন্তাভাবনা করেছিস..আবির মুখ স্বাভাবিক রেখে বলল:
ভাবছি আগামীকাল থেকেই যাব।
এবার রাকিব আবারও বলল: প্রয়োজন নেই..
কয়েকটা দিন বাড়িতে থাক পরিবারকে সময়
দে। তারপর আসিস।
পাশ থেকে তানভীর বলল: ভাইয়া এত
তাড়াহুড়া কেন করছ? দেশে যখন এসেছ
নিজের অফিসে নিজে তো যাবেই। কয়েকটা দিন বাড়িতে রেস্ট করো।
ওরা তো ঠিকই বলছে, কয়েকটা দিন বাড়িতে
থাক। রাসেলের কথায় রাকিব, তানভীর ও
মোবারক সায় জানালো।
আবির কিছুক্ষণ ভেবে দুষ্টু হেসে বলল: বাড়িতে
থাকলে আমি একা থাকবো কেন, তোদের
সবাইকেও থাকতে হবে।
ওর এমন অদ্ভুত কথা শুনে বাকিরা সবাই
আশ্চর্য কন্ঠে বলল: কিহহহহহ!
আবির হেসে হেসে বললো: কিহ না জ্বি.. সবার পরিবারকে নিয়ে একটা reunion করলে
কেমন হয়? পাহাড় বা সমুদ্রে? এক সপ্তাহের
জন্য..তানভীর বলল: reunion !!! মানে
পুনর্মিলনী!! wow that's a good idea!!
মোবারকও আবির তানভীরের সাথে সায় দিল।
রাকিব ও রাসেল চুপ করে বসে আছে।
ওদের দিকে তাকিয়ে আবির বলল: কিরে
তোদের আবার কি হলো?
রাকিব বলল: তোরা যা দোস্ত..
আবির ভ্রু কুচকে বলল: কেনো?
রাসেল বলল: আমরা দুইজন যদি চলে যাই
এক সপ্তাহের জন্য তাহলে অফিসের কি হবে?
অফিস কে সামলাবে?
আবির খানিকটা হেসে বলল: ওটা নিয়ে
তোদের ভাবতে হবে না.. আমি সব ম্যানেজ
করে নিব। তোরা শুধু প্রস্তুতি নে..
এবার রাকিব আর রাসেল একসাথে হুররে
বলে চিৎকার দিয়ে আবিরকে জড়িয়ে ধরল।
তানভীর আর মোবারক এসে ওদের
তিনজনকে জড়িয়ে ধরল। ওদের পাঁচ জনের
এত খুশি দেখে দোকানের আরো লোকেরা চা
খেতে খেতে ওদেরকেই দেখছে। হয়তো তারা
বোঝার চেষ্টা করছে এই মধ্য বয়সে এসেও
পাঁচ বন্ধুর এতটা খুশির কারণ।
ওদের হাসি-মজায় দোকানটা যেন আরও
উজ্জ্বল হয়ে উঠল। দোকানদার মাঝেমাঝেই
এগিয়ে এসে কাপ ভরে দিচ্ছে, পাশেই অন্য
গ্রাহকেরা বসে খুঁটিনাটি গল্প করছে। বাইরে
হালকা হাওয়া বইছে, দোকানের পাশে ঝুলে
থাকা লণ্ঠনের আলোয় ৫ বন্ধুর মুখ স্পষ্ট ভেসে
উঠছে।অবশেষে সিদ্ধান্ত হলো আগামী দুইদিন
পর তারা সবাই সাজেক যাবে। এই দুই দিনের
মধ্যে সবাই সবকিছু গুছিয়ে যার যার অফিস
থেকে এক সপ্তাহের ছুটির ব্যবস্থা করে নেবে।
সন্ধ্যার সেই আবহে তাদের আড্ডা যেন এক
টুকরো জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ—চেনা,
সহজ, অথচ ভীষণ আপন।
হ্যালো.. হ্যালো.. তামিম আমার কথা শুনতে
পাচ্ছিস..বলতে বলতে মেঘ সোফা থেকে উঠে
এক পাশে গিয়ে দাঁড়ালো।
সেই মুহূর্তে বাড়িতে ঢুকলো আবির ও তানভীর।
আবির মেঘের দিকে এগিয়ে গিয়ে বলল:
তোমাকে কতবার বলেছি সিমটা চেঞ্জ করে
দেই, কিন্তু তুমি কোন কথা শুনতেই চাও না।
এই সিমটা তো অনেক নেট ডিস্টার্ব করে।
মেঘ মুখটা একটু গম্ভীর করে বলল: করুক
তাও আমি এটাই ব্যবহার করব।
আবির মৃদু হেসে বলল: তা মহারানী, কার
সাথে কথা বলা হচ্ছিল?
মেঘ একটু কাঁদো কাঁদো মুখ নিয়ে বলল:
আহিয়ার আব্বু, তামিমের সাথে কথা
বলছিলাম। আমরা যে দেশে ফিরেছি সেটাই
ওকে জানালাম।
এবার আবির বলল: ও আচ্ছা।
ওদের কথার মাঝেই তৃধার কণ্ঠ শোনা
যাচ্ছে জোরে জোরে। তানভীর আসার পর
থেকেই তৃধা অভিমানী কন্ঠে তার পাপাকে
বলছে: পাপা তুমি সবাইকে পেয়ে আজকে
আমাকে ভুলে গেছো?
তানভীর বলল: আমি কি আমার মামমাম
কে ভুলে যেতে পারি?
তৃধা মুখ গম্ভীর করে সোফার এক কোণে
বসে বলল: ভুলেই গেছো তাতো আমি
প্রমাণ পাচ্ছি। তানভীর তার আহলাদি
মেয়েকে বোঝানোর ভঙ্গিতে বলল: তুমি
এখনো কিছুই প্রমাণ পাও নি মামমাম।
তৃধা তার পাপার দিকে একটু তাকিয়ে বলল:
প্রমাণ পে...
পুরো কথা শেষ করার আগেই তৃধার চোখ
বড় বড় হয়ে গেল। দেখলো তানভীরের
হাতে তিনটা কিটক্যাট চকলেট।
তানভীর একটা এগিয়ে দিল মেয়ের দিকে।
আর দুইটা এগিয়ে দিল আহিয়া ও আদিবার
দিকে। তৃধা খুশিতে তার পাপাকে জড়িয়ে
ধরে বলল: I love you papa.. I love
you so much.. you are the best
papa in this world..
বাবা মেয়ের কান্ড দেখে উপস্থিত সকলেই
হেসে দিল। আহিয়ান সিঁড়ি দিয়ে নামছিল।
তৃধার এমন আহ্লাদী কন্ঠ শুনে একা একাই
বিরক্ত ভঙ্গিতে বিড়বিড় করল: যত ঢং!!
বন্যা আর মেঘ সবাইকে রাতের খাবার
খাওয়ার জন্য ডেকে গেল।
একে একে খাবার টেবিলে উপস্থিত হলো
খান বাড়ির ছোট বড় সকল সদস্য। বহু
বছর পর পুরো পরিবার আজ একসাথে
খেতে বসেছে। আলি আহমেদ খান বললেন:
মৃত্যুর আগে সবাই একসাথে.. এই দিনটাই
তো দেখার আমার শেষ ইচ্ছে ছিল। এই বুড়ো
বয়সে আমার আর কি চাওয়া থাকতে পারে।
আলী আহমেদ খানের পাশেই বসেছে আহিয়ান,
সেই ছোটবেলার মতো। আহিয়ান বড় দাদুর
হাতে হাত রেখে আশ্বাস দিয়ে বলল: কে
বলেছে তুমি বুড়ো হয়ে গেছো? তুমি তো
এখনো young man..
এবার তৃধা এসে পেছন থেকে আলী
আহমেদ খানের গলা জড়িয়ে ধরে বলল:
yes দাদু, তুমি তো এখনো অনেক হ্যান্ডসাম।
নিজেকে বুড়ো কেন বলছো?
আলী আহমেদ খান হাসলো। ইকবাল খান
পাশ থেকে বলল: ভাইজান, আজ এত
খুশির দিনে এসব কেন বলছেন? আবির
সবার মনোযোগ ঘোরানোর জন্য বলল:
তোমাদের সবার জন্য একটা সারপ্রাইজ
আছে। ইকবাল খান আবিরের দিকে
তাকিয়ে বলল: বাড়ি ফিরেছি পর থেকে
তো শুধু সারপ্রাইজ আর সারপ্রাইজ ই
পাচ্ছি। এখন আবার কি সারপ্রাইজ দিবি?
সারপ্রাইজের কথা শুনে তো আহিয়া ও
তৃধা ভীষণ এক্সাইটেড। আহিয়া উঠে
এসে আবির কে বলল: পাপা তাড়াতাড়ি
বলো না কি সারপ্রাইজ.. ওর দেখাদেখি
তৃধাও এসে আবিরকে বলতে লাগলো:
ও.. বড় পাপা.. তাড়াতাড়ি বলে ফেলো
না.. আমার যে আর তর সইছে না।
আহিয়ান এক নজর সেদিকে তাকিয়ে
বিড়বিড় করে বলল: ridiculous
আলী আহমেদ খান পাশে বসে থাকায়
খুব সহজেই আহিয়ানের কথাটা শুনতে
পেল। মুচকি হেসে আবারো মনোযোগ
দিল আবিরের কথার দিকে। আবির
আহিয়া ও তৃধার উদ্দেশ্যে বলল: আরে
আম্মুরা.. আমি তোমাদের অবশ্যই বলব
এবং এখনই, তোমরা গিয়ে বসো আমি
বলতেছি। ওর কথা শুনে খুশিতে দুইজন
গিয়ে চেয়ারে বসলো।
আবির বাবার উদ্দেশ্যে বলল: আব্বু, অনেক
বছর বাইরে ছিলাম। পুরনো বন্ধু ও
আত্মীয়-স্বজন তাদের কারো সাথেই তেমন
একটা কথা হয় না। ভাবছি সবাই একসাথে
কোথাও বেড়াতে যাই। তাহলে একসাথে
সবার একটা রিইউনিয়ন হবে। ছেলেমেয়েরাও
একটু আনন্দ করতে পারবে। আমাদের পুরনো
বন্ধুবান্ধবদের সাথে আমাদের সম্পর্ক
এখনো কতটা মজবুত এবং কতটা বিশ্বাসের
তা দেখে আমাদের ছেলেমেয়েরা অনেক
কিছু শিখবে।
আবিরের পুরো কথা শুনে মোজাম্মেল খান
বললেন: কোথায় বেড়াতে যাবে? আবির
মৃদু হেসে বলল: আমরা সব বন্ধুরা মিলে
ঠিক করেছি, পুরো ফ্যামিলি নিয়ে সাজেক
ভ্যালি ঘুরতে যাবো সাত দিনের জন্য। পাশ
থেকে হঠাৎ তৃধা চিৎকার দিয়ে বলল:
সাজেক ভ্যালি!!
মানে মেঘের রাজ্য?? wow 😳..
আহিয়ান এবার বিরক্ত হয়ে তৃধা কে
একটা ধমক দিয়ে বলল: shut up idiot..
বড়দের কথার মাঝখানে বাচালগিরি করা
বন্ধ রাখ..আবির ছেলের দিকে তাকিয়ে
একটু চোখ রাঙানি দিল। মুহূর্তেই আহিয়ান
মাথা নিচু করে খাওয়া শুরু করলো।
চলবে....