ফন্ট সাইজ:
থিম:
অবশেষে তুমি..

পর্ব 4

লেখক: আইরিশা / Irisha

অবশেষে তুমি
পর্ব ৪: অভিমানের আড়ালে
লেখিকা: আরফা আইরিশা
সকালে খানবাড়িতে বেশ হইচই চলছে। তবে এই হইচইয়ের মূল কারণ হলো সামির খান।
ছেলেটা ডাইনিং টেবিলে বসে এক হাতে পরোটা আর অন্য হাতে ফোন নিয়ে ব্যস্ত। মাঝে মাঝে ফোনের দিকে তাকিয়ে হাসছে, আবার পরক্ষণেই মুখ গম্ভীর করে ফেলছে।
সামনে বসে থাকা ইহান ব্যাপারটা লক্ষ করছিল।
— কী হয়েছে তোর? কখনো হাসছিস, কখনো কাঁদার মতো মুখ করছিস কেন?
সামির ফোনটা বুকের কাছে লুকিয়ে বলল, — কিছু হয়নি।
ইহান ভ্রু কুঁচকে বলল, — তোর মুখে যখন ‘কিছু হয়নি’ শুনি, তখনই বুঝি বিরাট কিছু হয়েছে।
সামির গম্ভীর মুখে বলল, — ভাইয়া, তুমি বড় মানুষ। তোমার এসব ছোটখাটো ব্যাপার বোঝার কথা না।
— ও আচ্ছা! তাহলে তুই বল, ছোট মানুষ।
সামির কিছু বলার আগেই আয়ান এসে তার পাশের চেয়ারে বসল।
— কী নিয়ে আলোচনা হচ্ছে?
ইহান হেসে বলল, — আমাদের ছোট সাহেবের প্রেমের অসুখ হয়েছে মনে হয়।
সামিরের মুখ থেকে পরোটা পড়ে যাওয়ার উপক্রম হলো।
— ভাইয়া! তুমি এসব কী বলছ?
আয়ানের চোখ চকচক করে উঠল।
— প্রেম? কার সঙ্গে? নাম কী? ছবি আছে?
সামির উঠে দাঁড়াল।
— তোমরা দুজন মিলে একটা মানুষের জীবন অতিষ্ঠ করে দিয়েছ!
ইহান শান্তভাবে বলল, — নামটা বললেই তো ঝামেলা শেষ।
সামির রেগে বলল, — নাম বলব না!
ঠিক তখনই আয়রা ডাইনিং রুমে ঢুকল।
— কী হয়েছে? এত চিৎকার কেন?
আয়ান সঙ্গে সঙ্গে বলল, — সামির প্রেমে পড়েছে!
আয়রা অবাক হয়ে সামিরের দিকে তাকাল।
— সত্যি?
সামির অসহায় মুখে বলল, — আপু, তুমিও শুরু কোরো না!
আয়রা হাসি চেপে বলল, — আচ্ছা, বলব না। তবে মেয়েটা কে?
সামির দুহাতে মাথা চেপে ধরল।
— হে আল্লাহ! এই বাড়িতে আমার কোনো সম্মান নেই!
ইহান হেসে বলল, — সম্মান থাকবে কীভাবে? তুই নিজেই তো রহস্য উপন্যাসের প্রধান চরিত্র হয়ে ঘুরছিস!
সবাই হেসে উঠল।
শুধু সামির মুখ গোমড়া করে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল।
যাওয়ার আগে বিড়বিড় করে বলল, — একদিন আমিও বিয়ে করব। তখন তোমাদের কাউকে দাওয়াত দেব না!
আয়ান পেছন থেকে চিৎকার করে বলল, — আগে মেয়েটার নামটা তো বল!
অন্যদিকে ইনায়া নিজের ঘরে বসে বই পড়ছিল। কিন্তু বইয়ের পাতায় মন বসছিল না।
গতকাল রাতে ইহানের সঙ্গে তার কথা হয়েছে।
খুব সাধারণ কথা।
তবু সেই সাধারণ কথাগুলোই বারবার মনে পড়ছে।
ইহান তাকে জিজ্ঞেস করেছিল, সে ঠিকমতো খেয়েছে কি না। আবার ঘুমানোর আগে পড়াশোনা বেশি না করার উপদেশও দিয়েছে।
এত ছোট ছোট বিষয় একজন মানুষের কাছে এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে কীভাবে?
ইনায়া বই বন্ধ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
— ধুর! আমি এসব কী ভাবছি!
ঠিক তখনই দরজায় টোকা পড়ল।
— আপু, ভেতরে আসব?
আয়রা।
ইনায়া দ্রুত বই খুলে বসে বলল, — আয়, কী হয়েছে?
আয়রা ঘরে ঢুকে বিছানায় বসল।
— আপু, একটা কথা জিজ্ঞেস করব?
— কর।
— তুই কাউকে পছন্দ করিস?
ইনায়ার বুকের ভেতর ধক করে উঠল।
— হঠাৎ এই প্রশ্ন কেন?
আয়রা মুচকি হেসে বলল, — এমনি। তোর মুখ দেখে মনে হচ্ছে, তুই কারও কথা ভাবছিলি।
ইনায়া বইয়ের দিকে তাকিয়ে বলল, — তুই বেশি সিনেমা দেখিস।
— আচ্ছা, তাহলে একটা কথা বল। ইহান ভাইয়া যদি কাউকে পছন্দ করে, তোর কেমন লাগবে?
এবার ইনায়ার হাত থেকে বইটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল।
আয়রা সেটা দেখে চুপচাপ তার দিকে তাকিয়ে রইল।
ইনায়া নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, — ভালো লাগবে। ওর জীবন, ওর সিদ্ধান্ত।
আয়রা ধীরে মাথা নাড়ল।
— বুঝলাম।
— কী বুঝলি?
— কিছু না।
আয়রা উঠে দাঁড়িয়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। বেরিয়ে যাওয়ার আগে একবার পেছনে তাকিয়ে বলল,
— আপু, সব সময় নিজের অনুভূতি লুকিয়ে রাখলে কিন্তু একসময় মানুষ তোমাকে ভুল বুঝতে পারে।
ইনায়া চুপ করে রইল।
আয়রা চলে যাওয়ার পর সে জানালার দিকে তাকাল।
তার মনের কথাগুলো কি কোনো দিন ইহান বুঝতে পারবে?
নাকি তাদের সম্পর্ক সারাজীবন এই না-বলা কথার মধ্যেই আটকে থাকবে?
দুপুরে সবাই বসার ঘরে আড্ডা দিচ্ছিল।
রায়ান সোফায় বসে ফোন দেখছিল। সামির পাশের চেয়ারে বসে বারবার ফোনের স্ক্রিন পরীক্ষা করছে।
হঠাৎ সামিরের ফোনে একটা মেসেজ এল।
নুহা: আজ বিকেলে দেখা করতে পারবে?
মেসেজটা পড়েই সামিরের মুখে হাসি ফুটে উঠল।
কিন্তু সেই হাসি বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না।
কারণ ঠিক তখনই আয়রা তার পেছনে এসে দাঁড়াল।
— কার মেসেজ?
সামির চমকে ফোন লুকিয়ে ফেলল।
— কারও না!
আয়রা হাত বাড়িয়ে বলল, — ফোনটা দে।
— কেন?
— দেখতে চাই।
— আপু, এটা আমার ব্যক্তিগত জীবন!
আয়রা ভ্রু তুলে বলল, — ব্যক্তিগত জীবন? কাল পর্যন্ত যে নিজের মোজা খুঁজে পেত না, আজ তার ব্যক্তিগত জীবন হয়ে গেছে?
রায়ান পাশ থেকে হেসে উঠল।
— আয়রা, ছেলেটাকে শান্তিতে প্রেম করতে দে।
সামির অবাক হয়ে রায়ানের দিকে তাকাল।
— ভাইয়া, তুমিও জানো?
রায়ান হাসল।
— তুই যখন মেসেজ পড়ে দাঁত বের করে হাসিস, তখন না জানার উপায় আছে?
আয়রা এবার সামিরের পাশে বসে পড়ল।
— শোন, তোর একটা কাজ করতে হবে।
সামির সন্দেহের চোখে তাকাল।
— কী কাজ?
— ইহান ভাইয়ার সঙ্গে আমার একটু কথা বলিয়ে দিতে হবে।
সামিরের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
— কেন?
আয়রা শান্ত গলায় বলল, — কিছু কথা আছে, যেগুলো আমি ওকে বলতে চাই।
সামির কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল, — আপু, তুমি কি সত্যিই ইহান ভাইয়াকে পছন্দ করো?
আয়রা উত্তর দিল না।
শুধু মুখ ফিরিয়ে জানালার দিকে তাকাল।
সামির দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
— ঠিক আছে। আমি চেষ্টা করব।
আয়রা তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।
— ধন্যবাদ, ভাই।
কিন্তু সামিরের মনে তখন অন্য চিন্তা।
সে নুহাকে ভালোবাসে। আর নুহার কাছে পৌঁছানোর জন্য তাকে নিজের বোনের ভালোবাসার পথে সাহায্য করতে হচ্ছে।
জীবনটা এত জটিল কেন?
তার তো শুধু একটা মেয়েকে ভালো লাগার কথা ছিল!
বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরির সামনে দাঁড়িয়ে ছিল ইহান।
ইনায়া ফোন করে তাকে দেখা করতে বলেছিল। কিন্তু এখনো আসেনি।
ইহান ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করল,
— পাঁচ মিনিট দেরি। এই মেয়েটার সময়জ্ঞান একদিন আমাকে পাগল করে দেবে।
ঠিক তখনই পেছন থেকে কণ্ঠ ভেসে এল,
— কার সময়জ্ঞান আপনাকে পাগল করছে?
ইহান ঘুরে তাকাল।
ইনায়া দাঁড়িয়ে আছে।
ইহান মুচকি হেসে বলল, — একজনকে চিনি। খুব দেরি করে আসে।
ইনায়া মুখ বাঁকিয়ে বলল, — তা হলে তার সঙ্গে দেখা করা বন্ধ করে দিন।
— চেষ্টা করেছি। কিন্তু সে বারবার সামনে চলে আসে।
ইনায়া কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল।
কথাটার মানে কি অন্য কিছু?
নাকি সে অকারণে ভাবছে?
ইহান তার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, — কী হলো? চুপ করে গেলে কেন?
ইনায়া দ্রুত বলল, — কিছু না। একটা বই দরকার ছিল।
— কোন বই?
ইনায়া বইয়ের নাম বলল।
ইহান মাথা নেড়ে বলল, — চলো, খুঁজে দিই।
দুজন লাইব্রেরির ভেতরে ঢুকে পড়ল।
বই খুঁজতে গিয়ে ইনায়ার হাত একসঙ্গে ইহানের হাতের ওপর পড়ল।
দুজনেই থেমে গেল।
ইনায়া দ্রুত হাত সরিয়ে নিল।
— সরি!
ইহান কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, — সরি বলছ কেন?
ইনায়া অপ্রস্তুত হয়ে গেল।
— মানে... ভুল করে—
ইহান হেসে বলল, — হাত তো ভুল করেই পড়েছে। এত চিন্তা করার কী আছে?
ইনায়া মুখ নামিয়ে ফেলল।
তার হৃদস্পন্দন যেন নিজের নিয়ন্ত্রণে নেই।
আর ইহান?
সে বইটা হাতে নিয়ে স্বাভাবিকভাবে দাঁড়িয়ে থাকলেও নিজের অজান্তেই ইনায়ার মুখের দিকে বারবার তাকাচ্ছিল।
কিছু অনুভূতি এত নীরব হয় যে, মানুষ নিজেও বুঝতে পারে না কখন সেগুলো তার জীবনের অংশ হয়ে গেছে।
সন্ধ্যায় বাড়িতে ফিরে ইনায়া নিজের ঘরে ঢুকতেই ফোনে একটা মেসেজ পেল।
ইহান: বাসায় পৌঁছেছ?
ইনায়া হাসল।
ইনায়া: হ্যাঁ। তুমি?
ইহান: আমিও।
কিছুক্ষণ পর আরেকটি মেসেজ এল।
ইহান: আজ তোমাকে একটা কথা বলার ছিল।
ইনায়ার বুকের ভেতর ধক করে উঠল।
ইনায়া: কী কথা?
অনেকক্ষণ কোনো উত্তর এল না।
ইনায়া বারবার ফোনের দিকে তাকাতে লাগল।
অবশেষে মেসেজ এল।
ইহান: থাক, পরে বলব।
ইনায়ার মুখের হাসি ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল।
সে লিখল,
ইনায়া: ঠিক আছে।
ফোনটা পাশে রেখে সে জানালার দিকে তাকাল।
কী বলতে চেয়েছিল ইহান?
কেন শেষ মুহূর্তে থেমে গেল?
অন্যদিকে নিজের ঘরে বসে ইহানও ফোনের দিকে তাকিয়ে আছে।
সে সত্যিই ইনায়াকে একটা কথা বলতে চেয়েছিল।
কিন্তু কথাটা ছিল এমন, যা বলার সাহস সে এখনো জোগাড় করতে পারেনি।
“তোমাকে আমার অন্য সবার চেয়ে আলাদা লাগে, ইনায়া।”
কথাটা সে মনে মনে বলতে পারে।
কিন্তু ইনায়ার সামনে দাঁড়িয়ে বলতে পারে না।
হয়তো একদিন পারবে।
হয়তো সেই দিন আসতে এখনো অনেক দেরি।
রাত গভীর হলো।
ইনায়া ডায়েরি খুলে লিখল—
“কিছু মানুষকে নিজের মনের কথা বলতে ইচ্ছে করে। অথচ তাদের হারানোর ভয়ে সেই কথাগুলো বুকের ভেতরেই লুকিয়ে রাখি। জানি না, ইহান কখনো আমার অনুভূতি বুঝবে কি না। শুধু এটুকু জানি, ওর সঙ্গে কথা বললে আমার মনটা ভালো হয়ে যায়।”
অন্যদিকে ইহান নিজের ফোনে ইনায়ার পাঠানো শেষ মেসেজটা পড়ল।
ইনায়া: ঠিক আছে।
মাত্র দুটি শব্দ।
অথচ কেন যেন মনে হচ্ছে, মেয়েটা তার ওপর অভিমান করেছে।
ইহান দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফোনটা পাশে রাখল।
সে জানে না, তাদের এই নীরবতার শেষ কোথায়।
তবে এটুকু জানে, ইনায়ার সঙ্গে কথা না হলে তার দিনটা অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
আর সেই অসম্পূর্ণতার নামই হয়তো একদিন ভালোবাসা হয়ে উঠবে।
চলবে…!!

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 4 শেষ করেছেন।

আগের পর্ব উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন