অবশেষে তুমি
পর্ব ১২: ভালোবাসার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র
লেখিকা: আরফা আইরিশা
রাত ১২টা ১০ মিনিট।
ফারদিন খানের পুরোনো অফিসের ভেতরে দাঁড়িয়ে আছে ইহান। তার সামনে দাঁড়ানো মানুষটাকে দেখে সে এখনো বিশ্বাস করতে পারছে না যে লোকটা সত্যিই ফিরে এসেছে।
লোকটি ঠান্ডা গলায় বলল, — কী হলো, ইহান? আমাকে দেখে এত অবাক হচ্ছ কেন? নাকি তোমার পরিবার তোমাকে আমার কথা কখনো বলেনি?
ইহান নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, — আপনি এত বছর কোথায় ছিলেন?
লোকটি মৃদু হাসল।
— যে মানুষকে একটা পরিবার নিজেদের জীবন থেকে মুছে ফেলতে চায়, তার ফিরে আসার রাস্তা সহজ হয় না।
— আমার পরিবার আপনার সঙ্গে কী করেছে?
— তোমার পরিবার? নাকি তোমার বাবা?
ইহানের চোখ কঠিন হয়ে গেল।
— আমার বাবার নাম মুখে নেওয়ার আগে ভেবে কথা বলবেন।
লোকটি হেসে বলল, — বাবার প্রতি এত বিশ্বাস! ভালো। কিন্তু একটা কথা মনে রেখো, ইহান—যেদিন নিজের বাবার আসল চেহারা দেখবে, সেদিন এই বিশ্বাসটাই তোমার সবচেয়ে বড় কষ্টের কারণ হবে।
ইহান এক পা এগিয়ে গেল।
— ঘুরিয়ে কথা বলবেন না। আপনি কী চান?
লোকটি টেবিলের ওপর একটা পুরোনো ছবি রাখল। ছবিতে সাফওয়ান খান, ফারদিন খান এবং সেই লোকটি দাঁড়িয়ে আছে।
ছবির পেছনে লেখা—
“একটা ভুলের জন্য তিনটি জীবন বদলে গিয়েছিল।”
ইহান ছবিটা হাতে নিয়ে বলল, — এই ছবিটা কীসের?
লোকটি ধীরে ধীরে উত্তর দিল, — তোমার বাবাকে জিজ্ঞেস করো। আর একটা কথা, ইনায়াকে নিয়ে সাবধান থাকবে।
ইহান চমকে তাকাল।
— ইনায়ার সঙ্গে আপনার কী সম্পর্ক?
লোকটি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, — সম্পর্কটা তুমি ভাবতেও পারবে না।
ইহান আর কিছু বলার আগেই লোকটি ঘরের পেছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেল।
ইহান পিছু নিতে গিয়েও থেমে গেল। টেবিলের ওপর পড়ে থাকা কাগজটায় তার চোখ আটকে গেছে।
সেখানে লেখা—
“ইনায়া সত্যিটা জানলে তোমাকে আর কখনো ভালোবাসতে পারবে না।”
ইহান কাগজটা মুঠোয় চেপে ধরল।
— আমি সত্যিটা জানবই। কিন্তু ইনায়াকে কেউ আঘাত করতে পারবে না।
খান বাড়ি
সকালে ইনায়া ঘুম থেকে উঠে দেখল, ইহানের কোনো মেসেজ নেই। গত রাতের পর থেকে সে একবারও ফোন করেনি।
ইনায়া নিজের মনকে বোঝানোর চেষ্টা করল, হয়তো ইহান ব্যস্ত। কিন্তু মনের ভেতরের অস্বস্তিটা কিছুতেই কমছে না।
ঠিক তখনই আরিশা তার ঘরে ঢুকে বলল, — আপু, তুমি কি প্রেমে পড়েছ?
ইনায়া চমকে তাকাল।
— কী!
আরিশা বিছানায় বসে হাসল।
— আরে, এত চমকে যাচ্ছ কেন? তোমার মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে, কেউ একজন তোমার ঘুম হারাম করে দিয়েছে।
ইনায়া বালিশটা তুলে আরিশার দিকে ছুড়ে দিল।
— বের হও আমার ঘর থেকে!
আরিশা বালিশটা ধরে বলল, — আচ্ছা, যাচ্ছি। তবে একটা কথা বলে যাই—ইহান ভাইয়াকে নিয়ে এত চিন্তা কোরো না। বিয়ের আগে একটু ঝগড়াঝাঁটি থাকতেই পারে!
— আরিশা!
— আচ্ছা, আচ্ছা! আর বলব না। কিন্তু ভাবি ডাকটা কেমন সুন্দর শোনায়, তাই না?
আরিশা দৌড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
ইনায়া বালিশের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। রাগ হওয়ার কথা, অথচ তার নিজেরও হাসি পাচ্ছে।
কিন্তু হাসিটা বেশিক্ষণ থাকল না।
ফোনে একটা মেসেজ এল।
অচেনা নম্বর: ইহানকে নিয়ে বেশি স্বপ্ন দেখো না। এমন একটা সত্যি আছে, যেটা জানলে তুমি নিজেই ওর কাছ থেকে দূরে সরে যাবে।
ইনায়ার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
সে সঙ্গে সঙ্গে ইহানকে ফোন করল।
ফোন বন্ধ।
দ্বিতীয়বার চেষ্টা করল।
একই অবস্থা।
ইনায়া ফোনটা নামিয়ে ফিসফিস করে বলল, — ইহান, তুমি কী লুকাচ্ছ আমার কাছ থেকে?
ডাইনিং টেবিলে
সামির আজ বেশ সাজগোজ করে নাশতার টেবিলে এসেছে। চুল ঠিক করা, শার্ট ইস্ত্রি করা—সব মিলিয়ে তাকে দেখে মনে হচ্ছে, আজ কোনো বিশেষ দিন।
রোদ তার দিকে তাকিয়ে বলল, — কী ব্যাপার, ভাই? আজ কি প্রধানমন্ত্রী আসবে?
সামির বিরক্ত হয়ে বলল, — কেন?
আয়ান মুচকি হেসে বলল, — না, তোর চেহারা দেখে মনে হচ্ছে, আজ নুহার সামনে নিজের বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে বসবি।
সামির প্রায় কাশতে কাশতে বলল, — ভাইয়া! তোমরা একটু শান্তিতে থাকতে পারো না?
রোদ বলল, — পারি তো। কিন্তু তোকে দেখলে আমাদের শান্তি নষ্ট করার ইচ্ছা জাগে।
সবাই হেসে উঠল।
ইনায়া চুপচাপ বসে ছিল। সামির সেটা লক্ষ করে বলল, — আপু, কী হয়েছে? তোমাকে এমন লাগছে কেন?
— কিছু হয়নি।
আয়ান এবার গম্ভীর হয়ে বলল, — ইনায়া, আমাদের কাছে কিছু লুকাচ্ছিস?
ইনায়া একটু ইতস্তত করে বলল, — ইহান গত রাত থেকে আমার ফোন ধরছে না।
সামিরের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
— ইহান ভাইয়া ফোন ধরছে না?
— হ্যাঁ। আর একটা অচেনা নম্বর থেকে আমাকে মেসেজ করেছে।
আয়ান হাত বাড়িয়ে বলল, — মেসেজটা দেখাও।
ইনায়া ফোনটা এগিয়ে দিল। মেসেজ পড়ে আয়ানের মুখ কঠিন হয়ে গেল।
— এই নম্বরটা কে ব্যবহার করছে, সেটা বের করতে হবে।
রোদ বলল, — আর ইহান কোথায় আছে, সেটাও জানতে হবে।
সামির চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল।
— আমি ওকে ফোন দিচ্ছি।
ঠিক তখনই ইনায়ার ফোন বেজে উঠল।
ইহান!
ইনায়া সঙ্গে সঙ্গে কল রিসিভ করল।
— তুমি কোথায়? তোমার ফোন বন্ধ ছিল কেন?
ওপাশ থেকে ইহানের ক্লান্ত কণ্ঠ শোনা গেল।
— সরি, ইনায়া। একটা জরুরি কাজে আটকে গিয়েছিলাম।
— কী কাজ?
ইহান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, — সব কথা এখন বলা যাবে না।
ইনায়ার চোখ ভিজে উঠল।
— তুমি কি আমাকে বিশ্বাস করো না?
ইহান দ্রুত বলল, — ব্যাপারটা এমন নয়।
— তাহলে কেমন? তুমি কি ভুলে গেছ, তুমি নিজেই বলেছিলে আমরা একে অপরের কাছ থেকে কিছু লুকাব না?
ইহান নীরব হয়ে গেল।
ইনায়া কাঁপা গলায় বলল, — জানো, তোমার এই নীরবতাটা আমার সবচেয়ে বেশি কষ্ট দেয়।
কথাটা বলে সে কল কেটে দিল।
ইহান ফোনের দিকে তাকিয়ে রইল।
সে ইনায়াকে সব বলতে চায়। কিন্তু যদি সত্যিই সেই লোকটির কথাগুলো সত্যি হয়?
যদি সত্যিটা জানার পর ইনায়া তাকে ঘৃণা করে?
আয়ানের অজানা অতীত
দুপুরে আয়ান নিজের অফিসে বসে পুরোনো কাগজপত্র দেখছিল। গত কয়েক দিন ধরে পাওয়া চিঠিগুলো তাকে অস্থির করে তুলেছে।
বিশেষ করে সেই কথাটা—
“আয়রাকে রক্ষা করবে। ও যেন কখনো জানতে না পারে, সেদিন আসলে কী ঘটেছিল।”
আয়ান ড্রয়ার থেকে ছবিটা বের করল। ছোট্ট আয়রার পাশে দাঁড়ানো অচেনা মহিলার মুখটা ভালো করে দেখল সে।
হঠাৎ তার মনে পড়ল, ছোটবেলায় একবার আয়রা হারিয়ে গিয়েছিল। কয়েক ঘণ্টা পর তাকে পাওয়া গেলেও সেই দিনের কথা কেউ কখনো বিস্তারিত বলেনি।
আয়ান দ্রুত নিজের বাবাকে ফোন করল।
— বাবা, আয়রার ছোটবেলায় হারিয়ে যাওয়ার ঘটনাটা মনে আছে?
ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা।
— হঠাৎ এই কথা কেন?
— একটা ছবি পেয়েছি। ছবিতে আয়রা আর একজন অচেনা মহিলা আছে।
ফারদিন খান গম্ভীর হয়ে গেলেন।
— ছবিটা কার কাছে?
— আমার কাছে।
— আয়ান, ছবিটা কাউকে দেখাবি না। বিশেষ করে আয়রাকে না।
আয়ান অবাক হয়ে বলল, — কিন্তু কেন?
ফারদিনের কণ্ঠ ভারী হয়ে এল।
— কারণ ওই দিনের সত্যিটা জানলে আয়রার জীবন বদলে যেতে পারে।
কল কেটে গেল।
আয়ান চেয়ারে হেলান দিয়ে বসল।
এবার সে নিশ্চিত—আয়রার অতীতের সঙ্গে এমন কিছু জড়িয়ে আছে, যা তার পরিবার এত বছর ধরে লুকিয়ে রেখেছে।
কিন্তু আয়রাকে রক্ষা করতে গিয়ে সে কি সত্যিটাই হারিয়ে ফেলবে?
সন্ধ্যার দেখা
সন্ধ্যায় ইহান নিজেই ইনায়ার সঙ্গে দেখা করতে এল। ইনায়া বাগানে দাঁড়িয়ে ছিল। ইহানকে দেখে সে মুখ ঘুরিয়ে নিল।
ইহান ধীরে ধীরে তার পাশে এসে দাঁড়াল।
— আমার ওপর রাগ করেছ?
ইনায়া ঠান্ডা গলায় বলল, — না। রাগ করার অধিকারও তো থাকতে হয়।
কথাটা ইহানের বুকে বিঁধল।
— ইনায়া, আমার কথা শোনো।
— বলো।
ইহান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, — আমার পরিবার নিয়ে কিছু সমস্যা চলছে। আমি চাই না তুমি সেই সমস্যার মধ্যে জড়িয়ে পড়ো।
ইনায়া তার দিকে ফিরল।
— তুমি কি মনে করো, আমি এতটাই দুর্বল যে কোনো সমস্যার মুখোমুখি হতে পারব না?
— আমি তা বলিনি।
— তাহলে আমাকে দূরে সরিয়ে রাখছ কেন?
ইহান অসহায়ভাবে বলল, — কারণ আমি তোমাকে হারাতে চাই না।
ইনায়ার চোখে পানি জমল।
— আমাকে হারানোর ভয়ে যদি তুমি আমাকে নিজের কাছেই আসতে না দাও, তাহলে একদিন আমাকে এমনিতেই হারাবে, ইহান।
ইহান তার দিকে তাকিয়ে রইল।
তার খুব ইচ্ছে করছিল ইনায়ার হাত ধরে সব বলে দিতে। কিন্তু সেই মুহূর্তে তার ফোনে একটা মেসেজ এল।
“আজ রাত ১০টা। পুরোনো বাড়িতে এসো। এবার তোমাকে তোমার পরিবারের আসল ইতিহাস জানানো হবে। আর মনে রেখো, ইনায়াকে সঙ্গে আনলে ওর জীবন বিপদে পড়বে।”
ইহান মেসেজটা পড়ে ফোনটা পকেটে রাখল।
ইনায়া জিজ্ঞেস করল, — কী হয়েছে?
ইহান জোর করে হাসল।
— কিছু না।
ইনায়া চোখ মুছে বলল, — আবার মিথ্যা?
ইহান কোনো উত্তর দিল না।
ইনায়া চলে যাওয়ার আগে শুধু বলল, — আমি তোমাকে ভালোবাসি কি না, সেটা হয়তো এখনো মুখে বলিনি। কিন্তু তোমার ওপর বিশ্বাস রাখতে চাই। সেই বিশ্বাসটা ভেঙে দিয়ো না।
ইনায়া চলে গেল।
ইহান তার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল।
সে বুঝতে পারল, রহস্যটা শুধু অতীত নিয়ে নয়। কেউ ইচ্ছে করেই তাদের দুজনকে আলাদা করার চেষ্টা করছে।
রাত ১০টা
পুরোনো বাড়ির ভেতরে ঢুকতেই ইহান দেখল, টেবিলের ওপর একটা ল্যাপটপ খোলা। পাশে রাখা একটি ফাইল।
ফাইলের ওপর লেখা—
“খান পরিবারের গোপন চুক্তি।”
ইহান ফাইলটা খুলল। ভেতরে কয়েকটি কাগজ আর একটা পুরোনো ছবি।
ছবিতে তার বাবা সাফওয়ান খান, ফারদিন খান এবং সেই অচেনা মানুষটি দাঁড়িয়ে আছেন।
কিন্তু এবার ছবির পেছনে লেখা ছিল অন্য কথা—
“ইনায়াকে সত্যিটা জানতে দেওয়া যাবে না।”
ইহানের বুকের ভেতর ধক করে উঠল।
ইনায়ার নাম এই ফাইলে কেন?
ঠিক তখনই ঘরের অন্ধকার থেকে সেই পরিচিত কণ্ঠ ভেসে এল।
— অবশেষে বুঝতে পারছ, ইহান? এই রহস্যের সঙ্গে শুধু তোমার পরিবার জড়িত নয়।
ইহান ঘুরে দাঁড়াল।
— ইনায়ার কী হয়েছে? ওর নাম এখানে কেন?
লোকটি ধীরে ধীরে সামনে এল।
— কারণ ইনায়া এমন একটা সত্যির সঙ্গে জড়িত, যেটা তোমার বাবা এত বছর ধরে লুকিয়ে রেখেছেন।
ইহান রাগে বলল, — আপনি কী বলতে চাইছেন?
লোকটি টেবিলের ওপর আরেকটা ছবি রাখল।
ছবিটা দেখে ইহান স্তব্ধ হয়ে গেল।
ছবিতে ছোট্ট ইনায়া দাঁড়িয়ে আছে এক অচেনা মানুষের পাশে। আর সেই মানুষের মুখ—
তার নিজের বাবার পুরোনো ছবিতে থাকা মানুষটির মুখের সঙ্গে হুবহু মিলে যাচ্ছে।
ইহান ফিসফিস করে বলল, — এ কে?
লোকটি ঠান্ডা গলায় উত্তর দিল,
— এই মানুষটাই তোমার আর ইনায়ার জীবন আলাদা করে দেওয়ার আসল কারণ। আর সবচেয়ে বড় কথা...
সে একটু থেমে ইহানের চোখের দিকে তাকাল।
— ইনায়া নিজেও জানে না, তার অতীতের সঙ্গে তোমার পরিবারের কী সম্পর্ক।
ইহান ছবিটা শক্ত করে ধরে রইল।
তার মনে শুধু একটা প্রশ্ন—
ইনায়া কি সত্যিই তার পরিবারের লুকানো কোনো সত্যির অংশ?
আর সেই সত্যি জানার পর সে কি ইনায়াকে আগের মতো ভালোবাসতে পারবে?
চলবে...!!