### অপূর্ণ ছায়া
### পর্ব ১২: যে সত্যি কেউ জানে না
লেখিকা: আরফা আইরিশা
রাত তখন প্রায় দেড়টা।
খান বাড়ির বাগানে দাঁড়িয়ে থাকা জাহিদ খান এখনো রাশেদের দেওয়া ছবিটার দিকে তাকিয়ে আছেন। ছবির পেছনে লেখা কথাগুলো তাঁর মাথায় ঘুরছে।
“যে রাতে একজন মারা গিয়েছিল, সেদিন আরেকজনকে মৃত ঘোষণা করা হয়েছিল।”
রাশেদ চলে যাওয়ার আগে বলে গেছে, এবার আর কোনো সত্যি চাপা থাকবে না।
জাহিদ দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের ঘরে ফিরে এলেন।
কিন্তু ঘরে ঢুকেই থমকে গেলেন।
টেবিলের ওপর রাখা ছবিটা নেই!
তিনি দ্রুত চারপাশে খুঁজতে লাগলেন। ঠিক তখনই ফোনে একটা মেসেজ এল।
“ছবিটা আমার কাছে। সত্যিটা জানতে চাইলে কাল পুরোনো কবরস্থানে আসবেন। একা।”
জাহিদের মুখ কঠিন হয়ে গেল।
— আবার শুরু করলে, রাশেদ?
### পরদিন সকাল
মুনের ঘরে তখন তৃষা আর মিমের আড্ডা চলছে।
তৃষা বিছানায় শুয়ে ফোন ঘাঁটতে ঘাঁটতে বলল,
— মুন, তোর কী হয়েছে বল তো? কয়েক দিন ধরে এমন চুপচাপ কেন?
মিম সঙ্গে সঙ্গে বলল,
— প্রেমে পড়েছে মনে হয়!
মুন বিরক্ত হয়ে তাকাল।
— তোরা দুজন কি সকালবেলা ঝগড়া না করলে খেতে পারিস না?
তৃষা হাসল।
— আচ্ছা, নামটা বল। আমরা কাউকে বলব না।
মুন বালিশটা তুলে তৃষার দিকে ছুড়ে দিল।
— বের হ!
মিম হেসে বলল,
— নাম না বললেও সমস্যা নেই। তবে সমুদ্র ভাইয়ার সামনে গেলেই তোর মুখের অবস্থা দেখে সব বোঝা যায়।
মুন এবার সত্যিই লজ্জা পেয়ে গেল।
— মিম!
ঠিক তখনই দরজায় সমুদ্র এসে দাঁড়াল।
— কী বোঝা যায়?
তৃষা আর মিম একে অপরের দিকে তাকিয়ে হাসি চেপে রাখল।
মুন দ্রুত বলল,
— কিছু না!
সমুদ্র ভ্রু তুলে বলল,
— আচ্ছা, তাহলে তোমাদের গোপন সভা চলুক। মুন, বাবা তোমাকে নিচে ডাকছেন।
মুনের মুখের হাসি মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল।
— বাবা?
— হ্যাঁ। মনে হচ্ছে জরুরি কিছু।
### আদনানের ঘর
মুন ঘরে ঢুকতেই আদনান খান তাকে পাশে বসতে বললেন।
— মা, তোর সঙ্গে কিছু কথা ছিল।
মুন বাবার হাত ধরে বলল,
— বলো বাবা।
আদনান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,
— তুই কি আমাকে কিছু জিজ্ঞেস করতে চাস?
মুনের বুক ধক করে উঠল।
— কী বলতে চাইছ?
— কয়েক দিন ধরে তোর আচরণ বদলে গেছে। আমি বুঝতে পারছি, তোর মনে অনেক প্রশ্ন।
মুন আর নিজেকে সামলাতে পারল না।
— বাবা, আমি কি সত্যিই তোমার মেয়ে?
আদনান স্তব্ধ হয়ে গেলেন।
কয়েক মুহূর্ত পর তিনি মেয়ের হাত শক্ত করে ধরে বললেন,
— তুই আমার মেয়ে, মুন। এই কথাটা নিয়ে কখনো সন্দেহ করবি না।
— তাহলে আমার মায়ের ডায়েরিতে এত রহস্য কেন? রাশেদ কেন বারবার আমার কথা বলছে? আর সবাই কেন আমার জন্মের আগের ঘটনা লুকাচ্ছে?
আদনান চোখ নামিয়ে ফেললেন।
— কিছু ঘটনা আছে, যেগুলো আমি তোকে কষ্ট দিতে চাইনি বলে বলিনি।
মুনের চোখ ভিজে উঠল।
— সত্যি লুকিয়ে রাখলে কি কষ্ট কমে, বাবা?
আদনান কোনো উত্তর দিতে পারলেন না।
### পুরোনো কবরস্থান
দুপুরের দিকে জাহিদ খান একাই পুরোনো কবরস্থানে পৌঁছালেন।
সেখানে রাশেদ দাঁড়িয়ে ছিল। তার হাতে সেই হারিয়ে যাওয়া ছবিটি।
জাহিদ এগিয়ে গিয়ে বললেন,
— এবার কী চাও?
রাশেদ ছবিটা তাঁর হাতে দিয়ে বলল,
— ছবির মানুষটাকে চিনতে পারছেন?
জাহিদ ছবির দিকে তাকালেন। ছবিতে তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটির মুখ এবার পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে।
তিনি ফিসফিস করে বললেন,
— অসম্ভব!
রাশেদ শান্ত গলায় বলল,
— অসম্ভব বলে কিছু নেই, জাহিদ। যে মানুষটাকে আপনারা মৃত ভেবেছিলেন, সে এখনো বেঁচে আছে।
জাহিদ ছবিটা নামিয়ে বললেন,
— সে কোথায়?
রাশেদ একটু হেসে বলল,
— আপনার বাড়িতেই। আপনারা শুধু চিনতে পারছেন না।
জাহিদের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
— তুমি কি বলতে চাইছ, সে আমাদের পরিবারের মধ্যেই আছে?
রাশেদ উত্তর দিল না। শুধু বলল,
— মুনের কাছ থেকে সত্যিটা আর লুকিয়ে রাখতে পারবেন না।
### বিকেল
সমুদ্র নিজের ঘরে বসে পুরোনো ফাইল দেখছিল। হঠাৎ একটা কাগজের ভাঁজ খুলে গেল।
কাগজের ভেতরে ছোট্ট একটা চিরকুট।
তাতে লেখা—
“রাশেদকে বিশ্বাস করো না। সে যতটা সত্যি বলছে, তার চেয়ে বেশি মিথ্যা লুকিয়ে রেখেছে।”
সমুদ্র চিরকুটটা হাতে নিয়ে ভাবতে লাগল।
ঠিক তখনই দরজায় মুন এসে দাঁড়াল।
— কী করছ?
সমুদ্র দ্রুত কাগজটা সরিয়ে ফেলল।
মুন সেটা লক্ষ করল।
— কী লুকালে?
— কিছু না।
— সবাই আজকাল আমাকে এই একই কথা বলে কেন?
সমুদ্র দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
— মুন, সবকিছু জানার জন্য একটু সময় দরকার।
মুন কষ্টের হাসি দিয়ে বলল,
— সময় তো অনেক দিয়েছি। এবার উত্তর চাই।
সমুদ্র তার দিকে তাকিয়ে রইল।
ঠিক তখনই মুনের ফোনে অচেনা নম্বর থেকে কল এল।
সে রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে একটা কণ্ঠ বলল,
— মুন, তোমার মায়ের মৃত্যুর সত্যিটা জানতে চাইলে আজ রাত বারোটায় ছাদের ঘরে এসো।
মুন জিজ্ঞেস করল,
— আপনি কে?
লোকটি বলল,
— যে মানুষটাকে তোমার পরিবার মৃত বলে বিশ্বাস করে।
কল কেটে গেল।
মুনের হাত থেকে ফোনটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল।
সমুদ্র দ্রুত এগিয়ে এসে বলল,
— কী হয়েছে?
মুন কাঁপা গলায় বলল,
— সে বলেছে... সে বেঁচে আছে।
সমুদ্রের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
### রাত ১২টা
খান বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে।
মুন নিঃশব্দে সিঁড়ি বেয়ে ছাদের ঘরের দিকে এগিয়ে গেল। দরজাটা অল্প খোলা।
ভেতরে ঢুকতেই সে দেখল, একটা চেয়ারের ওপর মায়ের পুরোনো শাড়ি রাখা। পাশে একটি খাম।
মুন খামটা খুলল।
ভেতরে একটা চিঠি।
“মুন, তুমি যদি এই চিঠি পড়ে থাকো, তাহলে বুঝবে আমি আমার কথা রাখতে পারিনি। তোমার জন্মের আগে যে মানুষটিকে সবাই হারিয়ে ফেলেছিল, সে তোমার জীবনের সঙ্গে এমনভাবে জড়িয়ে আছে, যা তুমি কল্পনাও করতে পারবে না। তোমার বাবা সব জানেন। কিন্তু তাঁকে দোষ দেওয়ার আগে জেনে নিও, সেই রাতে তিনি কাকে বাঁচাতে গিয়েছিলেন।”
মুনের চোখ ঝাপসা হয়ে এল।
ঠিক তখনই পেছন থেকে দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ হলো।
সে ঘুরে দাঁড়াল।
অন্ধকারের মধ্যে একজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে।
মুন কাঁপা গলায় বলল,
— আপনি কে?
লোকটি ধীরে ধীরে সামনে এল।
তার মুখটা আলোয় স্পষ্ট হতেই মুনের চোখ বড় হয়ে গেল।
লোকটি মৃদু স্বরে বলল,
— অবশেষে দেখা হলো, মুন।
মুন পিছিয়ে গেল।
— আপনি...!
লোকটি বলল,
— হ্যাঁ। তোমার মায়ের মৃত্যুর রাতের সাক্ষী আমি। আর তোমার জন্মের আগের সত্যিটাও আমি জানি।
মুনের গলা শুকিয়ে গেল।
— তাহলে বলুন, আমার মা কীভাবে মারা গিয়েছিলেন?
লোকটি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
— তোমার মায়ের মৃত্যুটা শুধু দুর্ঘটনা ছিল না। আর সেই রাতে তোমার বাবা যাকে বাঁচিয়েছিলেন...
সে থেমে গেল।
ঠিক তখনই দরজার বাইরে থেকে জাহিদ খানের কণ্ঠ শোনা গেল—
— মুন! দরজা খোলো!
লোকটি মুনের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল,
— মনে রেখো, তোমার বাবা যদি ভেতরে ঢোকেন, তাহলে এই সত্যিটা আর কখনো জানতে পারবে না।
মুন দরজার দিকে তাকাল।
একদিকে বাবা, অন্যদিকে মায়ের মৃত্যুর রহস্য।
সে কী করবে?
চলবে...!!