#আমার_আলাদিন (২)
#পরিচ্ছেদ_২
#জাবিন_ফোরকান
পর্ব - ২
__আহমদ, আমার একটা কথা রাখবে?
__অবশ্যই। বলো, কী চাও তুমি? "
__আমি চাই, আমাদের মেয়ে হলে ওকে যেন লামিয়াকে দিয়ে দেয়া হয়। ও হবে রইজুল কিবরিয়া আর লামিয়া মুন্সির মেয়ে।
আধো চেতনা আধো চেতনার মাঝে ঝুলছেন সামিয়া। শরীর কেমন শিথিল হয়ে আছে। কানে গমগম করে বেজে চলেছে সুদূর অতীতের আহ্বান। আধখোলা চোখের দৃষ্টি ঘোলাটে। !"
বুকের ভেতর হাতুড়ি পেটাচ্ছে কিছু একটা। শ্বাস টেনে তুলতে কষ্ট হচ্ছে। অথচ কাউকে ডাকতে পারছেন না তিনি। ইচ্ছাও হচ্ছে না। ক্ষতি কী যদি এভাবেই নীরবে চলে যাওয়া যায়?
" আম্মাজান! আম্মাজান!"
সুগন্ধার তীক্ষ্ণ স্বর নীরবতায় চির ধরিয়ে দিল। সামিয়া শরীর নাড়াতে পারলেন না। সুগন্ধা তাকে উঠিয়ে বালিশে হেলান দিইয়ে রাখল। ছুটে গিয়ে পানির গ্লাস নিয়ে এলো। ঠোঁটের সামনে ধরে পান করাতে লাগল। সামিয়ার শরীরে ঘাম দিয়েছে, বুক ওঠানামা করছে শ্বাসকষ্টে। সুগন্ধার হাত কাঁপল। চোখে অশ্রু জমল,
"আমি এখনি অ্যাম্বুলেন্স কল করতেসি!"
অথচ সে পারলনা। সামিয়া চুপচাপ পানিটুকু পান করে সুগন্ধার হাত ধরে করলেন,
" আমি ..... ঠিক আছি .... সুগন্ধা।"
" প্যাঁচাল পাইরেন না আম্মাজান! কিভাবে ঘাম দিতাছে! আপনার শরীর খারাপ,আমি হাসপাতালে নিয়া যাই। চলেন, দোহাই লাগে।"
"ডাক্তার তুই নাকি আমি?"
সামিয়া দুর্বলভাবে ধমকালেন। তাতে সুগন্ধা চুপসে গেল। ওড়না তুলে সামিয়ার মুখ মুছিয়ে দিতে লাগল নিঃশব্দে। কিছুক্ষন বাদে সামিয়া শান্ত হলেন,
শরীর অনেকখানি শীতল হলো। চোখ বুঁজলেন তিনি।
"যা। ঘুমা। আমি ঠিক আছি , চিন্তা করিস না।"
সুগন্ধা জানে, সামিয়া ঠিক নেই। তার চুল এলোমেলো, পরনের নাইটগাউন কুঁচকে আছে। বয়সের বলিরেখা স্পষ্টভাবে দেখা দিয়েছে চোখেমুখে যা আগে ছিলনা। মানুষ আস্তে আস্তে একটু একটু করে ভাঙে। সামিয়া তার জ্বলন্ত প্রমাণ। সুগন্ধার সহ্য হলোনা এই দৃশ্য। সে উঠে চলে এলো বিছানা ছেড়ে। সামিয়ার বেডরুম থেকে বেরিয়ে করিডোর ধরে হাঁটতে লাগল আনমনে। আজ থেকে মাস তিনেক আগেও আনন্দ, হাসি, উচ্ছলতায় প্রাণবন্ত ছিল এই বাড়ি। অথচ এখন নিস্তব্ধ, গুমোট এবং ক্লান্তিকর। ভারী বাতাসে একাকিত্ব আর অপরাধবোধের দীর্ঘশ্বাস। কেন যেন গায়ে কাঁটা দিল সুগন্ধার । ভয়ে নয়, তীব্র বিষাদের অনুভূতিতে। প্রাণহীন পুতুলের মতো হেঁটে হেঁটে সে অন্ধকারাচ্ছন্ন লিভিং রুমে এলো। ধপাস করে সোফায় বসে সিলিংয়ের দিকে চেয়ে রইল। নিশাচর কুকুরদের ঘেউ ঘেউ কানে আসছে। সুগন্ধা কতক্ষণ ওভাবে বসে থাকল হিসাব রইলনা। শেষমেষ সে নিজের ফোনটা হাতে তুলল। একটা নাম্বার ডায়াল করল মুখস্তভাবে। জানেনা এটা কাজ করে নাকি বিদেশে নাম্বার বদলে ফেলা হয়েছে। তবুও সে ফোন করল। ওপাশে রিং হতেই সুগন্ধার বুকের ধুকপুকানি বাড়ল। পনেরো সেকেন্ডের অপেক্ষা মনে হলো বছরের সমান। অবশেষে রিসিভ হলো। অথচ ওপাশ থেকে গাঢ় নীরবতা ছাড়া কোনো শব্দ ভেসে এলোনা। সুগন্ধাও প্রথমটায় হতচকিত হয়ে থাকায় কিছু বলতে পারলনা। এই ব্যক্তির সঙ্গে সে ভালোভাবে কথা বলেছে কিনা সন্দেহ। তাদের সম্পর্কটা অদ্ভুত, যাকে কোনো ব্যাখায় ফেলা যায়না। স্টিলের থালার মতো একসাথে বাড়ি খেলেই দুজন ঝনঝন করে বাজতে থাকত। কিন্তু আজ, দুজনের শব্দই বিলীন।
"২৫ টা বছর যেই বাড়িতে বড় হইলেন, সেই বাড়ির মায়া কাটানো এতই সহজ? ২৫ টা বছর যেই মানুষটা বুঝতেই দিলনা আপন পরের পার্থক্য, তার জন্য অবহেলা? আপনে আসলেই পাষাণ!"
ওপ্রান্ত থেকে কোনো জবাব এলোনা। না কোনো শব্দ। শুধু নৈঃশব্দ। সুগন্ধা সোফায় হেলান দিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। জিভে শুকিয়ে আসা ঠোঁটে ভিজিয়ে নিল।
"আম্মাজানের অবস্থা ভালো না। যদি ওই মহিলার জন্য করুণা হয় তয় দেখা দিয়েন। আর যদি ২৫ বছরের একরত্তি অর্থ না থাকে তয় থাকেন যেইহানে আসেন। তবে মনে রাইখেন, আফসোস বড় খারাপ জিনিস।"
ফোন কেটে দিল সুগন্ধা। ওপাশের মানুষটাকে কিছু বলার সুযোগ দিলনা। সে জানে, মানুষটা কিছু বলবে না। সুগন্ধা চোখের উপর হাত রেখে বসে রইল , যদি সামিয়ার রুম থেকে অস্বাভাবিক কোনো শব্দ শোনা যায়! এভাবেই একটা সময় সে ক্লান্তির ঘুমে তলিয়ে গেল।
______________________________________________________________
মুড়ির টিনের মতো লোকাল বাস চলছে টিমেতালে। বাদুড়ঝোলা হয়ে যাচ্ছে অসংখ্য যাত্রী। ভেতরে মানুষে ঠাসাঠাসি। এই শীতেও অতিরিক্ত মানুষের চাপে বাসের সিটে বসে থাকা ইরামের মনে হচ্ছে গরম চুলায় বসে আছে সে। তরকারির মতন টগবগ করে ফুটছে। নিজের অস্বস্তির অবশ্য কোনো পরোয়া নেই, তবে বুকে বাঁধা বেবি ক্যারিয়ারে থাকা ইযানকে নিয়েই তার যত চিন্তা। ঘেমে যাচ্ছে ছেলেটা তার। ক্ষণে ক্ষণে রুমাল দিয়ে ইযানের মাথায় চুমু দিয়ে ইরাম ফিসফিস করল,
"এইতো বাবাটা,আর একটু। আমরা বাসার কাছে এসে পড়েছি প্রায়।"
"আম! বা!"
ইযান ইরামের বুকে মাথা গুঁজে রইল। লোকাল বাসের মহিলার সিটের শেষ প্রান্তে বসেছে ইরাম। রাবিয়া বসার জায়গা না থাকার তার পাশেই দাঁড়িয়ে আছে। আসছে ১০ ই জানুয়ারি ইযানের প্রথম জন্মদিন। ছেলের সব প্রথমকে ঘিরে অনন্য সব পরিকল্পনা ইরামের। অভাবে আছে, কষ্টে আছে, কোর্ট কাচারির চক্কর কাটছে তো কী হয়েছে? তাই বলে কি ইযানের সকল পাওনা শেষ হয়ে যাবে? ছেলেকে যে জীবনটা দেয়ার জন্য ইরাম স্বার্থপরতার যুদ্ধে নেমেছিল, সেই জীবনটা সে একা হাতে টানবে। হয়ত সর্বোচ্চটা দেয়া যাবেনা তবে ইযানের জন্য সে নিজের ভাগটা উৎসর্গ করতেও প্রস্তুত। ইযানের জন্মদিন ঘিরে ছোটখাটো একটা আয়োজন করেছে ইরাম। মিলাদ মাহফিল আর প্রতিবেশীদের দাওয়াতের পরিকল্পনা আছে তার। এজন্যই আজ সকাল সকাল চলে গিয়েছিল কারওয়ান বাজার। রাবিয়ারও কোচিং ছুটি হয়েছিল একই সময়ে। তাই দুজন মিলে প্রয়োজনীয় বাজার করে এখন বাসায় ফিরছে। বাস হঠাৎ ব্রেক কষায় জড়তার টানে একটা ধাক্কা খেল ইরাম। নিজের আগে চেপে ধরল ইযানকে। মনে মনে ক্ষুব্ধ হলো সে। ড্রাইভারকে কিশোর দেখাচ্ছে। এই দেশে আইনকানুন আর কখনো ঠিক হবে বলে মনে হয়না। অবশ্য, যেখানে দারিদ্র্যর হার এত বেশি, সেখানে আইন প্রতিষ্ঠা করাটা কষ্টকর।
"এক্সকিউজ মি। আপনি একটু সরে দাঁড়ান প্লীজ।"
ইরামের ভাবনায় ছেদ পড়ল রাবিয়ার কণ্ঠে। মাথা তুলে তাকাতেই সে দেখল রাবিয়ার ভ্রু কুঁচকে আছে ক্ষোভে। তার পিছনেই দাঁড়ানো এক লম্বাদেহী পুরুষ। মধ্যবয়স্ক মনে হচ্ছে। কেমন যেন একটা আগ্রাসী ভাব চোখেমুখে। রাবিয়ার দিকে কটমট করে তাকালেন সেই লোক।
"এই মেয়ে, আমি আর যাব কোথায়? বাস দেখেছ কেমন ভর্তি? নড়ার জায়গা আছে?"
"বাসে উঠেছেন কেন? মেয়েদের গায়ে পড়তে?"
"তুমি উঠেছ কেন? এত সমস্যা হলে আলাদা গাড়ি ভাড়া করে যেতে পারোনা? বাস তোমার বাপের সম্পত্তি না। বাসে উঠবে তো পুরুষ মানুষের ডলা খাবে।"
এরপর রাবিয়া সমস্ত আগ্রহ হারিয়ে ফেলল। শুধুমাত্র পাবলিক জায়গা বলে সে কোনো হম্বিতম্বি করলনা। বরং সরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করল। কিন্তু সবার মতো কোনো জায়গা অবশিষ্ট নেই। বাস চালু হতেই ইচ্ছাকৃত ভাবে পিছনের লোকটা রাবিয়ার ঘাড়ের উপর হুমড়ি খেয়ে পড়ল,
"আহারে! ড্রাইভার সাবধানে চালা!"
ঝাঁঝালো কণ্ঠে বললেও তার ঠোঁটের অজেয় হাসিটা ইরামের দৃষ্টি এড়ালনা না। কিছুই বললনা সে। চুপচাপ নিজের জায়গায় বসে রইল। ইযানের পিঠে তার হাত চেপে বসল শক্ত হয়ে। বাস অনেকটা দূর এগিয়ে গিয়েছে। ভিন্ন দিকে চেয়ে রইলেও ইরাম আড়চোখে ঠিকই রাবিয়ার খেয়াল রাখছে। মেয়েটার চোখে মুখে অস্বস্তি স্পষ্ট। গাড়ির গতির বাহানায় পিছনের লোকটার হাত ঠিক কোন কোন জায়গায় ছুঁয়ে দেয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে ইরাম স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে। এবার আর সহ্য করা সম্ভব হলোনা। ইরাম মাথা কাত করে ডাকল,
"এইযে,মিস্টার। একটু শুনুন।"
মধ্যবয়স্ক লোকটা অবাক হলো। মাথা ঝুঁকিয়ে ইরামের দিকে তাকাল। ইরাম ঠোঁটে মিষ্টি হাসি মেখে নিজের পাটের ব্যাগের চেইন খুলল। সেটাকে উন্মুক্ত করে লোকটাকে দেখাল। প্রথমে সে বুঝতে পারলনা ইরাম কী বলতে চাইছে।
"কী সমস্যা? আপনি....!"
লোকটার কথা মাঝপথেই বন্ধ হয়ে গেল যখন সে ইরামের ব্যাগের জিনিসপত্রের ভেতরে চকচকে, ধারালো কিছু একটা দেখতে পেলো। আনমনে ঢোক গিলল সে। ছু*রি! ইরাম ঠোঁটে তখনো হাসি ধরে রেখেছে। গাড়ির ভাঙাচোরা ইঞ্জিনের কর্কশ শব্দ আর রাস্তার যানবাহনের হর্ণের কারণে আশেপাশের কারো এদিকে বিশেষ মনোযোগ নেই। ইরাম ব্যাগের চেইন বন্ধ করতে করতে হাসিমাখা কণ্ঠে বলল,
"লোকাল বাস আপনার আমার কারোরই বাপের সম্পত্তি না। যেহেতু ডলা দিতেই বাসে উঠেন , তাহলে বিনিময়ে খোঁচা খাওয়ার প্রস্তুতিটাও নিশ্চয়ই রাখেন?"
লোকটা ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল। ইরাম খিলখিল করে হাসল, যেন কী এক বিনোদন চলছে তার সামনে। অথচ তার ঠোঁট থেকে বেরোল,
" হরমজাদা।"
ইরামের উন্মাদপ্রায় আচরণে লোকটা যথেষ্ট ঘাবড়াল। শিরদাঁড়া টানটান করে সোজা হয়ে দাঁড়াল। অজান্তেই ভিড়ের মাঝে ঢুকে গিয়ে রাবিয়ার কাছ থেকে বহু দূরে সরে গেল। অপরদিকে ইরাম কিছুই হয়নি এমন ভঙ্গিতে ইযানের পিঠ চাপড়ে দিতে লাগল। বাড়ির সামনের গলিতে বাস নামিয়ে দিতেই রাবিয়া কাঁধের ব্যাগ টেনে মুখ টিপে হাসতে হাসতে ইরামের পাশে হাঁটতে লাগল। ইরাম বাজারের ব্যাগ হাতবদল করে শুধাল,
"তোমার এত হাসি পাচ্ছে কেন হঠাৎ?"
" হারামজাদাও যে কেউ এত সুন্দর করে বলতে পারে, জানা ছিলনা। হেহেহে! আমি ছেলে হলে দূর থেকে এই দৃশ্য দেখলে নির্ঘাত তোমার প্রেমে পড়ে যেতাম ইরাম আপু! হাহাহা!"
ইরাম চোখ ওল্টাল,
"তুমি কারো জায়গামতো লাথি দেয়ার সাহস রাখলে আমাকে আর হাসাহাসির নাটক করতে হতনা, তোমার ছেলে ভার্সনের আমার প্রেমে পড়াও হতনা।"
রাবিয়া এরপরও হাসতে লাগল। ইরাম কৌতুহলী নজরে দেখতে লাগল তাদেরকে। এই রমণী দুজনের হঠাৎ কী হয়েছে সে বুঝতে পারছেনা। রমণী জাতটাই আজব! তাইনা?
হাঁটতে হাঁটতে তারা বিল্ডিংয়ের কাছে পৌঁছে গেল। তবে ঢোকার আগেই সিঁড়িঘর থেকে ভেসে আসা কিছু শব্দ তাদের থমকাতে বাধ্য করল।
"জন্মদিনের দাওয়াত পেয়েছেন নাকি ভাবি?"
"কার? ওই ডিভোর্সীর বাচ্চার?"
"তিনতলার রাবিয়ার বাসার সাবলেট যে। হ্যাঁ ডিভোর্সী মেয়ে। আবার আছে একটা বাচ্চা! কত নোলা ভাবা যায়? আমি তো যাবনা, আমার ছোট ছেলেমেয়ে দুটো অবশ্য যেতে চাইছে। ওদেরই পাঠিয়ে দেব।"
" কেমন কেমন মানুষকে যে আজকাল ভাড়া দেয় বুঝিনা। সরকার না কত সাবধান করে, দেখেশুনে যাচাই করতে?"
" হ্যাঁ। আমিও শুনছি। আবার কোর্টে কিসের যেন কেইস লড়ে! ভাবা যায়? মেয়ে মানুষের কত ঝাল! চিন্তাটা কর একবার!"
" আমি তো শুনেছি এখনের স্বামীটাও তালাক দিয়েছে। সব পুরুষমানুষের দোষ নাকি? একটাও বিয়ে টেকাতে পারেনা। ঘাবলা শুধু পুরুষেই? মনে তো হয়না। বাচ্চাসহ মাকে পুরুষ কখনো ছাড়তে চায়?"
ইরাম অবাক হলো না। সিঁড়িঘরে বিল্ডিংয়ের মহিলাদের আড্ডা বসেছে। প্রায় বসে। সেখানে দুনিয়ার সকল কাহিনি, গুজবের আলাপচারিতা হয়। সেই আলাপের নাম সমালোচনা। আরও ভালো শব্দে বলতে গেলে গিবতচর্চা। আর এই চর্চার বিষয়বস্তু হিসাবে লিস্টের শীর্ষস্থান দখল করে আছে ইরামের সে বহুদিন ধরেই। তাই আজকাল আর গায়ে লাগেনা। রাবিয়া হাত মুঠো করে ফেলল শক্তভাবে। হিসিয়ে উঠল,
" নিমকহারামের দল! আসলে আসলে আসবি না আসলে না আসবি। আজগুবি গল্পের আসর বসানোর কী আছে? দাঁড়াও আজকে ওদের হচ্ছে।"
অথচ ইরাম রাবিয়ার কব্জি চেপে ধরে আটকে ফেলল। ইশারায় মাথা নাড়ল। রাবিয়া চুপ হলেও তার ভ্রু থেকে বিতৃষ্ণার ভাজ গেলনা। ইরাম পা চালালো, ইচ্ছাকৃত শব্দ করে। তাদের পদশব্দ টের পেয়েই সিঁড়িঘরের আলাপ স্থগিত হলো। ইরাম গায়ের ওড়নাটা ঠিক করে মাথায় তুলে সিঁড়ঘরে প্রবেশ করল। তার চেহারা একদম শান্ত। অনুসরণে চোখ দিয়েই ঘায়েল করার ক্ষমতা রাবিয়া। সিঁড়ির মাথায় বসে আছে দুজন মহিলা। একজন বয়স্ক বৃদ্ধা চেয়ারে, তার চেয়ারের পিছন তরুণী এক মেয়ে। ইরামের চাইতেও বয়সে ছোট হবে সে। সকলকে উদ্দেশ্য করেই মৃদু হাসল ইরাম,
"আসসালামু আলাইকুম। ভালো আছেন ভাবিরা?"
"ওয়া আলাইকুমুস সালাম।বাজারে গিয়েছিলেন নাকি?"
একজন মহিলা বেশ হাস্যরসাত্মকভাবে বলল। যেন মাত্রই ইরামকে নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল না। ইরামও মাথা নাড়ল,
"হ্যাঁ। কিছুটা বাজার লাগতো। নিজেই করে আনলাম। আমি আবার ফালতু বসে গল্প করার সময় পাই না।"
তার জবাবে মুহূর্তের জন্য পিনপতন নীরবতা নেমে এলো সিঁড়িঘরে। ইরামের ঠোঁটজুড়ে মোলায়েম হাসি। মহিলা দুজন একে অপরের দিকে তাকাল। আরেকজন বলল,
"জি জি, তা তো অবশ্যই। একা হাতে বাচ্চা, সংসার সব সামলানো কী আর চাট্টিখানি কথা? আমাদের বাসায় তো তাও আপনার ভাইয়ারা আছে। আপনি তো একাই কষ্ট করছেন। যাক, ধৈর্য্য ধরেছেন যখন দেখবেন খোদা আপনাকে অনেক পুরস্কার দেবে।"
ইরাম সিঁড়ি বেয়ে উঠতে উঠতে পিছনে ফিরে তাকাল। মাথা দুলিয়ে জানাল,
" জি। দোয়ার জন্য ধন্যবাদ। আর হ্যাঁ, ভাবি, মনসুর ভাইকে বলবেন আপনি বাচ্চাকে স্কুলে দিতে গেলে আমার বাসায় নাস্তা দিতে আসার কোনো দরকার নেই ওনার। আমি নিজেই নাস্তা বানাই। আর হ্যাঁ, দাওয়াত ভুলবেন না, নিজে না আসুন মিলাদে বাচ্চাদের পাঠিয়ে দেবেন। আসি তাহলে."
দাঁড়ালনা ইরাম। সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেল। পিছনে পিছনে রাবিয়া উঠল,মাথা কাত করে থ হয়ে থাকা রমণীদের উদ্দেশ্যে বলল,
" তেল লাগলে আমাকে বলবেন সবাই। আমি কিনে এনে দেব।"
অবাক হলো সকলে। একজন না পারতে শুধিয়ে বসল,
" কিসের তেল?"
বিরাট হাসল রাবিয়া। দুহাত পিছনে বেঁধে উত্তর করল,
" নিজের চরকায় দেয়ার তেল। আপনাদের চরকাগুলো জং ধরে গেছে মনে হয়, এইজন্যই ফাও বসে পরের চরকায় নজর দেন।"
রাবিয়া আর দাঁড়াল না। থপথপ পা ফেলে উপরে উঠে চলে গেল। পিছনে রেখে গেল হতভম্ব হয়ে থাকা একদল মানুষ এবং পিনপতন নীরবতা। রাবিয়া যখন বাসার দরজার কাছে পৌঁছাল তখন ইরামকে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে অবাক হলো।
" আপু? কী হয়েছে তু......"
" হুশ।"
ইরাম রাবিয়ার মুখে হাত চাপল। মাথা নাড়ল ডানে বামে। রাবিয়ার চোখে প্রশ্ন ঝুলছে। ইরাম একনজর দরজায় কান পেতে ফিসফিস কণ্ঠে জানাল,
"ভেতরে কেউ আছে।"
রাবিয়ার চক্ষু ছানাবড়া হলো। ইরামের হাতের চাপে গমগম করে কিছু একটা বলল সে, যার অর্থ বোঝা গেলনা। ইরাম হাত সরিয়ে নিতেই সেও পাল্টা ফিসফিস করল,
"কিঃ! কিন্তু কিভাবে? দরজা তো বাইরে থেকেতালা দেয়া!"
" আমি কিছু একটা ভাঙার আওয়াজ শুনেছি।"
" ওটা বিড়াল হতে পারে।"
"কোনো জানালা খোলা রেখে যাইনি। তাছাড়া বিড়াল এত উপরে উঠবে কীভাবে?"
রাবিয়াকে এবার শঙ্কিত দেখাল। " আমি কাউকে ডেকে আনছি। তুমি এখানেই থাকো।"
ইরাম ব্যাগ থেকে ছু * রিটা বের করে নিয়ে ইযানকে রাবিয়ার কোলে দিল। " নিচতলার হারুন ভাইয়াকে ডাকবে।"
" তুমি খবরদার ভেতরে ঢুকোনা!"
ইরাম জবাবে কিছু বললনা। রাবিয়া ইযানকে নিয়ে চলে যেতেই সে দরজার দিকে ফিরল। চাবিটা আগেই বের করে রেখেছে। তালায় ঢুকিয়ে অতি সাবধানে খুলে ফেলল সে। ছু * রির হাতল শক্তভাবে চেপে ধরে রাখল। দরজা নিঃশব্দে খুলতেই ভেতরের ডাইনিং টেবিলে সামনে একটা ভাঙা গ্লাস দেখা গেল। চোর নাকি? ইরাম পায়ে পায়ে এগোল। যদি কোনো বিপদ থেকে থাকে, তাহলে সেটা অন্য কারো ঘাড়ে চাপুক সে চায়না। শক্ত ঢোক গলাধঃকরণ করল ইরাম, বুক ধুকপুক করছে তার। সতর্ক চোঁখজোড়া এদিক সেদিক তাকাল। তারপরই দেখা পেল সে। তার বেডরুমের ভেতরে,এক ছায়ামূর্তি! ইরাম ভালোভাবে দেখার সুযোগটাও পেলনা। বিড়ালের মতন নীরব আর ক্ষিপ্র কালো ছায়ামূর্তি তার খোলা বারান্দায় ছুটে গেল। ইরাম তড়িঘড়ি করে হাতের ছু * রি ছুঁড়ে দিলেও সেটা ঝনঝন করে ফ্লোরে পরে গেল। ছায়ামূর্তি লাগিয়ে বারান্দার রেলিং টপকে নিচে ঝাঁপিয়ে পড়ল। দৌঁড়ে রুমে ঢুকল ইরাম। দেখল তার আলমারি খোলা। কাপড়চোপড় এলোমেলো। সেটা পরীক্ষা করার সুযোগ নেই। ছুটে গিয়ে সে ফ্লোর থেকে ছু * রি তুলে রেলিং ধরে নিচে তাকাল। আশ্চর্য্য! কাউকে দেখা যাচ্ছেনা। এইমাত্র কি চোখের ভ্রম হলো? অবশ্যই না। স্পষ্ট দেখেছে ইরাম ওই ছায়ামূর্তিকে। আগাগোড়া কালো পোশাকে মোড়ানো। চেহারা ঢাকা ছিল নাকি সেটা দেখারও সুযোগ হয়নি। উল্টো ঘুরে ছুটল সে। পিছনে ততক্ষণে রাবিয়া হারুনকে নিয়ে চলে এসেছে। সঙ্গে বিল্ডিংয়ের আরও দুজন ছেলে। সকলের হাতে লাঠিসোঁটা।
"নিচে গিয়েছে! জলদি!"
চিৎকার দিয়ে ইরাম সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে গেল। বাকিরাও ছুটল পিছু পিছু। ইরাম দৌঁড়ে বিল্ডিংয়ের বাইরে বেরোল। তাকাল এদিক সেদিক। ঝকঝকে রোদের আলোয় সরু গলি সম্পূর্ণ ফাঁকা দেখাল। ছেলেগুলো অবশ্য দৌঁড়ে গিয়ে অনেকদূর পর্যন্ত দেখে এলো। কিন্তু কাউকে পেলনা। হারুন ইরামের সাথেই দাঁড়িয়ে রইল,
"চোর নাকি?"
"জানিনা। আলমারির কাপড়চোপড় এলোমেলো করে রেখেছে।"
"গিয়ে দেখুন কোনো জিনিস খোয়া গেছে কিনা।"
ইরাম দ্রুত মাথা নেড়ে বাসায় ফিরে এলো। রাবিয়া ইযানকে নিয়ে বিছানায় বসে আছে। দ্রুত হাত চালিয়ে ইরাম আলমারি খুঁজতে লাগল। মায়ের বিচলন টের পেয়ে ইযান শব্দ করে উঠল,
"আম.... মা! আম......!"
"হ্যাঁ আব্বু। আম্মু এখানেই আছে। কাজ করছে। তুমি রাবিয়া খালামণির সাথে খেলা করো। এইযে, আম্মু।"
ছেলের দিকে চেয়ে হেসে আশ্বাস দিয়ে ইরাম কাজ জারি রাখল। নাহ্, কিছু খোঁয়া যায়নি। বিয়ের সময়ে পাওয়া গয়নাগাটিগুলো সুরক্ষিত আছে। চোর চুরি করার সময় পায়নি হয়ত। নাকি, ওটা চোর ছিলনা? অন্যকিছু? সেটা অবশ্য কারো কাছে খোলাসা করলনা ইরাম। মুহূর্তেই বিল্ডিংয়ে ছড়িয়ে পড়ল ইরাম আর রাবিয়ার বাসায় চোর ঢুকেছিল। কিন্তু চুরি করতে পারেনি। সেই নিয়ে রাতে বাড়িওয়ালার সাথে ভাড়াটিয়াদের একদফা মিটিং হয়ে গেল। চুরি রোধের ব্যবস্থা হিসাবে বিল্ডিংয়ের সামনের গেটে তালা দেয়া হলো। দেশটা দিন দিন রসাতলে যাচ্ছে।
________________________________________________________________
কলকল নদীর শব্দ। পাড়ে আছড়ে পড়েছে ঢেউ। দূরে পাখি ডাকছে কিচিরমিচির করে। আকাশজুড়ে শেষ বিকালের কমলা ছায়া। খোলা জানালার পর্দাগুলো নদীর ঢেউয়ের সাথে তাল মিলিয়ে দোল খাচ্ছে। শীতল বায়ু আসন্ন রাত্রির প্রভাব বিলিয়ে দিচ্ছে আবহাওয়ায়। অথচ জানালার ধারে ল্যাপটপের সামনে উদাম গায়ে বসেও ঠান্ডা গায়ে লাগছেনা তার। ঘাড়ের নিচ অবধি লম্বা মসৃণ চুলগুলো বাতাসের ঝাপটায় বারবার কপালে এসে পড়ছে। হাত তুলে লম্বাটে আঙ্গুলে দিয়ে বেশ কয়েকবার সরালেও শেষমেষ ড্রয়ার খুলে একটা হেয়ারব্যান্ড বের করে নিল সে।
দুহাতে আঙ্গুল চালিয়ে চুলগুলো মুঠো পাকাতেই তার বাহুর মাংসপেশীগুলো ফুলেফেঁপে উঠল। ঠোঁটে ব্যান্ডটা কামড়ে ধরে চুল গুছিয়ে ব্যান্ড নিয়ে বেঁধে ফেলল পিছনে। কপালে এক গোছা ছোট কেশগুচ্ছ ছড়িয়ে রইল পাহাড়ের গায়ে লেগে থাকা সবুজাভ শৈবালের মতন। ল্যাপটপের কী বোর্ড চাপতে চাপতে একপাশে রাখা চায়ের কাপে চুমুক দিল সে। তখনি দরজায় মৃদু করাঘাত।
"স্যার? এস্টেট ডিলটা ফাইনাল করতে আপনার সাইন লাগত।"
"কাম ইন।"
একজন স্যুট পরিহিত ভদ্রলোক প্রবেশ করল। টেবিলের কাছে গিয়ে হাতের লাল ফাইল রেখে দিল। প্রায় মিনিট দশেক সতর্কভাবে নজর বোলানোর পর কলম তুলে নিল। বাইরের স্রোতের ধ্বনি বাড়ল।তার সঙ্গে পাল্লা দিয়েছে হারহীম করা বাতাস। মসৃণ ত্বকে সেই ঠাণ্ডা হুলের মতন বিধলেও কোনো প্রতিক্রিয়া হলোনা তার মাঝে।
"বাবা অ্যাপ্রুভ করেছে?"
তার প্রশ্নে ভদ্রলোক মাথা দোলালো।
"উনি বলেছেন, আপনার কথাই শেষ কথা।"
কলমটা কাগজে ছোঁয়াল সে। কালো কালিতে সাদা কাগজে পরিপূর্ণ হলো প্যাঁচানো অক্ষরে।
সাইবান আলাদিন
ম্যানেজিং ডিরেক্টর, হেক্সাগন কর্প।
ফাইলটা বন্ধ করে ভদ্রলোকের হাতে ফিরিয়ে দিয়ে সে বলল,
"বাবাকে জানিয়ে দেবেন, আজ রাতে ফিরবনা আমি। শো আছে।"
"জি,স্যার।"
ভদ্রলোক সায় জানিয়ে ফাইল নিয়ে চলে গেল। চেয়ারে হেলান দিয়ে চায়ের কাপ হাতে নিল সে, চুমুক দিতে দিতে জানালা দিয়ে বাইরের নদীর দিকে চেয়ে রইল। পরক্ষণে ল্যাপটপের স্ক্রিনে ভাসা ক্যালেন্ডারে চোখ পড়ল তার। আজ জানুয়ারির ৬ তারিখ।
চলবে.................