ফন্ট সাইজ:
থিম:
আমার আলাদিন (দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ)

পর্ব 4

লেখক: জাবিন ফোরকান

#আমার_আলাদিন
#পরিচ্ছেদ২
#জাবিন_ফোরকান
#পর্বসংখ্যা৪

অরণ্যর গাড়ির ভেতরে চেপে বসার প্রথম কয়েক মিনিট কাটল সম্পূর্ণ নীরবতায়। ইরাম ফাঁপা চোখে সামনে চেয়ে আছে। অরণ্যও বিশেষ কিছু বলার লক্ষণ দেখাচ্ছে না। তাই বিরক্ত হয়ে ইরাম নিজে থেকেই বলল,

“কী বলবেন জলদি বলুন। আমি অকর্মণ্য নই।”

অরণ্য এবার ঘাড় ঘুরিয়ে ইরামের দিকে তাকাল। তার চোখে বহুদিন বাদে কুটিলতার বদলে বাস্তবতার দেখা মিলল। সে বলল,

“এসব বাদ দেয়া যায়না? কেন নিজের জীবনটাকে শুধু শুধু কঠিন করছো?”

ইরামের কপালে দ্বিধার ভাঁজ ফুটল। স্থির চেয়ে রইল সে অরণ্যর দিকে। অরণ্য চুলে হাত বুলিয়ে একটা নিঃশ্বাস ফেলে পুনরায় বলল,

“ইযান তোমার আর আমার ছেলে। তুমি যত চেষ্টাই করো না কেন রক্তের সম্পর্ক বদলে যাবেনা। এত লড়াই, এত যুদ্ধ, কোর্ট কাচারির চক্কর কাটার কী দরকার যখন তুমি ছেলেকে নিয়ে আরামে দিনযাপন করতে পারো? ফিরে এসো, কবিতা। আমি তোমাকে আবার বিয়ে করব।”

ইরাম শান্ত হয়ে বসে থাকল। অতীব শান্ত। এতখানি শান্তির মাঝে অদ্ভুত ক্রোধ লুকায়িত। ঠিক যেন সুপ্ত আগ্নেয়গিরি। ফিক করে হেসে উঠল ইরাম। সিটে মাথা ঠেকিয়ে হাসতে লাগল যেন অরণ্য কী এক মজার কথা বলেছে তাকে! অরণ্য বিভ্রান্ত হলো। চোখ সরু করে ইরামকে দেখে গেল। ইরাম হাসতে হাসতে বলল,

“হাহাহা! অরণ্য! সবথেকে মজাদার ব্যাপার কী জানেন? একটা সময় আমি মনে করতাম, আমি আপনাকে ভালোবাসি! কথাটা মনে পড়লেই আমার হাসি পেয়ে যায় আজকাল, হাহাহা!”

অরণ্যর ভ্রু কুঁচকে গেল। স্টিয়ারিংয়ে শক্তভাবে হাত চেপে বসল। ইরাম হাসি থামিয়ে তার ক্রুব্ধ মুখের দিকে তাকিয়ে জানাল,

“আপনার মতন বীভৎস একটা মানুষকে ভালোবাসা তো দূরের কথা, দু দন্ড পাশে বসে সহ্য করাও যায়না! এইযে, আমার গা গুলাতে শুরু করেছে। বমি করে দিতে পারি যেকোনো মুহূর্তে!”

“ইরাম!”

অরণ্যর একটা হাত তেড়ে গেল ইরামের গলা চেপে ধরার উদ্দেশ্যে। তবে মাঝপথেই তা পাকড়াও করল রমণী। তার চোখমুখ থেকে বিনোদনটুকু বিদায় নিয়ে ভর করেছে দৃঢ়তা। অরণ্য চোখ তুলে তাকাল। চাইলে জবরদস্তি করে সে ইরামের শক্তিকে হারিয়ে দিতে পারে। কিন্তু এই রমণীর বাঁধনে যে প্রতিবাদী দৃঢ়তা বিদ্যমান, তা অরণ্যকে শারীরিকভাবে না পারলেও মানসিকভাবে দূর্বল করল। ইরাম দ্বিধাহীন গলায় বলে গেল,

“আমি আপনাকে ভালোবেসে নয়, আপনার যত্নের প্রতি বিভোর হয়ে বিয়ে করেছিলাম। জীবনে প্রথম একজন মানুষ আমাকে মায়াদয়া দেখাচ্ছিল। সারাজীবন অন্যের জন্য খাটতে খাটতে আমার কখনো নিজের জন্য খাটা হয়নি। আমি অন্যের রাস্তা তৈরি করেছি। কেউ আমার রাস্তা তৈরি করে দেয়নি। এরপর একদিন আপনি আসলেন। আর জীবনটাকে সহজ মনে হতে লাগল। হয়ত সেটাকেই আমি ভালোবাসা ধরে নিয়েছিলাম। আপনার প্রতি স্বামী হিসাবে আমার যেটুকু দূর্বলতা ছিল, সেটাও সেদিন সেই হাসপাতালের কেবিনে মরে গেছে! তাই আপনার দুনিয়ায় ফেরার কোনো প্রশ্নই আসেনা! না আমি সেই নরকে ফিরব আর না তো আমার সন্তানকে সেই তান্ডবের ভেতর দিয়ে যেতে দেব যার মধ্য দিয়ে আমি গিয়েছি।”

অরণ্যর হাতটা ঝটকা দিয়ে সরিয়ে দিল ইরাম, অতি অবহেলায়। অরণ্য একনাগাড়ে চেয়ে দেখল ইরামকে, নিষ্পলক। তারপর হঠাৎ সে স্টিয়ারিংয়ে ঘুষি মেরে বসল। হর্ণের বোতামে চাপ লেগে তারস্বরে হর্ণ বাজতে লাগল। অরণ্য পরোয়াই করলনা। হর্ণের আওয়াজ ছাপিয়ে চেঁচিয়ে উঠল,

“ইউ সাউন্ড লাইক ওনলি আই অ্যাম দ্যা ব্যাড গাই হেয়ার!”

ইরামের চোখের দিকে তাকিয়ে রক্তলাল চোখে অরণ্য বলল,

“আই চিটেড অন ইউ? ইয়েস! বাট, ইউ চিটেড অন মি ফার্স্ট!”

অরণ্যর গাড়িতে ওঠার পর থেকে এই প্রথম স্তব্ধ হলো ইরাম। প্রসারিত দৃষ্টিতে অরণ্যকে দেখে গেল যে এই মুহূর্তে সিটে হেলান দিয়ে হাঁপাচ্ছে। ইরামের ঠোঁটজোড়া ফাঁক হলো। বিস্ময় নিয়ে সে শুধাল,

“কী বললেন আপনি?”

অরণ্য চাপা ক্ষোভ আর বিষাদ নিয়ে ইরামের দিকে চেয়ে বলল,

“তুমি নিজেই ভেবে দেখো। কার সাথে শুয়েছ।”

কথাটা বলতে অরণ্যর খানিকটা দেরি হলেও ইরামের ঠাটিয়ে তার গাল বরাবর চড় বসাতে দেরি হলোনা। থাপ্পড়ের জোরে অরণ্যর মাথাটা একদিকে হেলে পড়ল। ফর্সা গালে আঙুলে দাগ বসে গেল তৎক্ষণাৎ। ইরাম ভয়ানক রাগে ফুঁসছে রীতিমত। ভদ্রতা, শালীনতা বিদায় নিল তার ভেতর থেকে। পাল্টা চেঁচিয়ে সে বলল,

“লজ্জা করেনা নিজেকে জাস্টিফাই করতে পার্টনারের গায়ে অযৌক্তিক কলংক লাগাতে? অবশ্য আপনি নির্লজ্জ! শুধু নির্লজ্জই নয়, একটা আস্ত জানোয়ার!”

অরণ্য রাগ করলনা। বরং মুচকি হাসল। যেন চড় খেয়ে বেশ মজা পেয়েছে। জিভ বের করে শুকনো ঠোঁটে বুলিয়ে ইরামের দিকে তাকাল সে।

“ভুল কী বলেছি? ওই ডি জের সাথে শোওনি? এতটা সাধু না ওই ছেলে, মহা ধড়িবাজ। তোমায় অস্পর্শ রেখেছে?”

ইরামের রাগের পারদ চড়চড় করে উঠল। সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছে তার। অরণ্যর কলার আঁকড়ে ধরল সে। এক ঝটকায় কাছে টেনে চোখে চোখ মেলাল। দাঁতে দাঁত ঘষে হুমকি দিল,

“আমার সম্পর্কে বললে থাপ্পড় পর্যন্তই সীমাবদ্ধ। কিন্তু আমার ছেলে বা স্বামীকে নিয়ে বললে, সোজা জান নিয়ে টানাটানি লেগে যাবে! কারো কারো জন্য নারী খু*নী হতেও দ্বিধা করেনা, আন্ডারস্ট্যান্ড?”

অরণ্যর চোখে এক ভিন্ন ধরনের অনুভূতি ফুটল। শ্রদ্ধাবোধ হয়ত। যে ইরাম বিড়ালছানার মতো তার গা ঘেঁষে গুটিশুটি দিয়ে থাকত, রাগ ঝাড়লে ভয় পেয়ে এক কোণায় জড়সড় হয়ে যেত, সেই ইরাম এখন তার কলারও নির্দ্বিধায় চেপে ধরে। যাহ, ইরাম সত্যিই বদলে গিয়েছে। ভীষণ বদলে গিয়েছে।

“ইদানিং আমি তোমায় চিনতে পারিনা কবিতা।”

কলার ছেড়ে দূরে সরে নিজের হাত ঝাড়ল ইরাম। যেন মাত্রই অপরিষ্কার কিছু ছুঁয়ে ছিল।

“আর আমি আপনাকে চিনতে দেরি করে ফেলেছি।”

বসলনা ইরাম। গাড়ির দরজা খুলে ফেলে বাইরে পা রাখল। অরণ্য বাঁধা দিলনা। নিষ্পলক চেয়ে দেখল সাবেক স্ত্রীকে। ইরাম যখন দরজা আটকে হাঁটা দিতে শুরু করল, তখন অরণ্য পিছন থেকে ডেকে বলল,

“এটাই তোমার শেষ সুযোগ ছিল ইরাম। খেলতেই যখন চাও, তখন আমি তোমার সঙ্গে ভালোভাবেই খেলব। ভীষণ নোংরা এক খেলা!”

চশমা বের করে চোখে দিয়ে সূক্ষ্ম হাসল অরণ্য। স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে এগিয়ে গেল গাড়ি নিয়ে। ইরাম ঠাঁয় দাঁড়িয়ে রইল সেখানে। নোংরা? নোংরামির আর কিছু বাকি আছে? যদিও মুখে সে বলেছে অরণ্যকে চিনতে দেরি করে ফেলেছে। তবে আদৌ সে পুরোপুরি অরণ্যকে চিনেছে? লোকটা আর কী কী করতে সক্ষম? কত দূর সে যাবে নিজের পুরুষালী গৌরব রক্ষায়? ইরাম হতবাক হয়ে উপলব্ধি করল, প্রকৃত অরণ্যকে হয়ত সে চেনেই না! যত যাই হয়ে যাক না কেন, নিজেকে যতই শক্ত দেখাক না কেন, অরণ্যর একটা কথা সে কিছুতেই ভুলতে পারছেনা এবং কোনোদিন পারবেও না।

—ইউ চিটেড অন মি ফার্স্ট!

অতীতের ভয়ংকর স্মৃতিগুলো ভেসে উঠল ইরামের চোখের পাতায়। অরণ্য অত্যন্ত যত্নবান স্বামী ছিল। তার বাচনভঙ্গি, আগলে রাখার দক্ষতা সবটাই ছিল মধুময়। সেসব কী শুধু অভিনয়? এত সূক্ষ্ম অভিনয় মানুষ আদৌ করতে পারে? কী হলো অরণ্যর? একদিন হঠাৎ করে সে বদলে গেল কীভাবে? নাকি অরণ্য এমনি ছিল শুধু ইরামের সামনে নিজেকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করত? তার মনে পড়ল, কত হাজারবার সে অরণ্যর পায়ে পড়েছিল, জিজ্ঞেস করেছিল কী হয়েছে, কেন বদলে গিয়েছে তার স্বামী? কিন্তু অরণ্য কোনোদিন তাকে জবাব দেয়নি। শুধু অধিকার খাটিয়ে গিয়েছে শেষ দিন অবধি। জীবনে প্রথমবার ইরামের মনে হলো, সে তার সাবেক স্বামীর সম্পর্কে বিশেষ ধারণা রাখেনা, শুধু তার ক্রুরতা ছাড়া।

“আপু?”

পিছন থেকে ডাক ভেসে আসায় ইরাম চিন্তার জগৎ থেকে বেরিয়ে আসতে বাধ্য হলো। মাথা ঘুরিয়ে তাকাতেই দেখল ইহানকে। ইযান মামার কাঁধে মাথা রেখে ঘুমিয়ে গেছে। ভাগ্নেকে সাবধানে আগলে রেখে ইহান বোনের সন্নিকটে ঘেঁষে অরণ্যর চলে যাওয়া পথের দিকে তাকাল। ক্ষোভ চেপে বলল,

“ওই কুলাঙ্গারটা তোমাকে কী বলেছে?”

ইরাম দীর্ঘশ্বাস ফেলে জানাল,

“কিছু না। শুধু ঘেউঘেউ করে চলে গিয়েছে। চল বাসায় ফিরি, অনেক দেরি হয়ে গেল।”

ফুটপাথ দিয়ে হাঁটতে লাগল ইরাম। ইহান কিছুক্ষণ নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে থেকে ইরামের পিছু নিল। সে নিশ্চিত, কিছু একটা হয়েছে। বোনকে এতটা অন্যমনস্ক হয়ে ভাবনায় ডুবে যেতে সে খুব কম দেখেছে।

***

সারাদিন উপোসের ক্লান্তি শেষে সোফায় শরীর এলিয়ে দিতেই চোখজুড়ে ঘুম নেমে আসে রাগিণীর। কখন সন্ধ্যারাত পেরিয়ে গভীর রাত হলো তিনি টেরও পাননি। স্বামী এসে চুপচাপ গায়ে চাদর জড়িয়ে দিয়ে গিয়েছেন এটুকু ঠিকই বুঝেছেন। ঘুমের মাঝেই মুচকি মুচকি হেসেছেন। তার সেই মিষ্টি ঘুম ভাঙল পায়ের পাতায় নরম ছোঁয়ায়। কেউ তার পায়ে চুমু খাচ্ছে বুঝি। তারপরই শীতল ধাতুর স্পর্শ। পায়ে সযত্নে কিছু পরিয়ে দেয়া হচ্ছে। আর তর সইলনা রাগিণীর। চোখ মেললেন। ঘুম কেটে যেতেই মাথা তুলে তাকিয়ে দেখলেন পায়ের কাছে বসে তার সন্তান। পরম মায়ায় তার পায়ে সোনার নূপুর পরিয়ে দিচ্ছে। তাকে তাকাতে দেখে মৃদু হাসল সে। বলল,

“শুভ জন্মদিন, আমার মা।”

রাগিণীর চোখ পড়ল রুমের ডিজিটাল ঘড়ির দিকে। বারোটা এক বাজে। অনুভূতির উত্তাল জোয়ারে উদ্ভাসিত হলো মাতৃহৃদয়। সোফায় উঠে বসলেন তিনি। তার নড়চড়ের কারণে হাতের শাখাপলা মৃদু ঝংকার তুলল। অশ্রুসজল নয়নে সন্তানের মুখটা চেপে ধরলেন তিনি। অস্ফুট স্বরে বললেন,

“অনু, আমার অনু।”

অনুরাগের ঠোঁটে মায়াবী হাসি খেলে গেল। মায়ের বুকে এলিয়ে দিল সে নিজেকে। রাগিণী ছেলেকে বুকে ধরে রাখলেন পরম মমতায়। চোখ বুঁজে এলো তার পরিপূর্ণতায়। একমাত্র ছেলেকে তিনি প্রাণাধিক ভালোবাসেন। বিশেষ করে ছোটবেলার টাইফয়েডের ভয়ানক অসুস্থতার পর থেকে তার মাতৃহৃদয় আরও আকুল হয়েছে। এ তার বড় সাধের সন্তান! ভগবান তার সহস্র রজনীর প্রার্থনার আশীর্বাদস্বরূপ সে যাত্রায় সন্তানকে যমের দুয়ার থেকে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। এমনটাই বিশ্বাস রাগিণীর। তাই অনুরাগের প্রতি টানটাও অনেক বেশি তার। ছেলের কপালে চুমু দিয়ে শেষমেষ নিজের পায়ের দিকে তাকালেন তিনি। কথায় কথায় বছরখানেক আগে স্বামী, অর্থাৎ অনুরাগের বাবাকে তিনি গয়নাগাটি গড়ানো নিয়ে খোঁটা দিয়েছিলেন। একজোড়া সোনার নূপুর চাই তার। কিছুদিন আগেই সীতাহার গড়িয়ে দিয়েছেন বলে সে যাত্রায় হেসে এড়িয়ে গিয়েছিলেন স্বামী তার। অথচ ছেলে মনে রেখেছে! চোখে জল এসে গেল তার। ছুঁয়ে দিলেন নূপুর দুটো।

“কী সুন্দর!”

“তোমার পছন্দ হয়েছে মা?”

“খুব!”

“তোমাকে একদম দেবীর মতন লাগছে মা।”

একজন মায়ের কাছে এর থেকে বড় প্রশংসা আর হয়না। রাগিণী অনুরাগের হাতজোড়া শক্তভাবে ধরলেন। আবেগে আপ্লুত হয়ে যাওয়ার কারণে শব্দ গুছিয়ে উঠতে পারছেন না। অনুরাগ সোফার কাছে পা নামিয়ে বসল। মায়ের কোলে মাথা রাখল। সেই পেতে দেয়া মাথায় স্নেহের হাত বুলিয়ে দিতে লাগলেন রাগিণী। অদূরে রুমের দরজায় দাঁড়িয়ে মা ছেলের আবেগঘন মুহূর্ত দেখে অনুরাগের বাবা আর হস্তক্ষেপ করতে চাইলেন না। তিনিও এসেছিলেন স্ত্রীকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাতে। সেটা পরে করা যাবে, একান্তে। আপাতত ছেলে সময় কাটাক। এই ভেবে তিনি বেডরুমে চলে গেলেন।

“বল। সকালে কী কী খাবি?”

মায়ের প্রশ্নে মুচকি হাসল অনুরাগ। বলল,

“তুমি রান্নাঘরের ধারেকাছেও যাবেনা। আমি আর বাবা মিলে কালকের স্পেশাল মেন্যু অলরেডি সাজিয়ে রেখেছি।”

রাগিণী অবাক হলেন। ছেলের পিঠে আলতো চাপড় দিয়ে হেসে বললেন,

“তুই আর তোর বাবা! দুজন একই জাতের! এবার ঘরে লাল টুকটুকে একটা বউ এনে যদি আমার দলটা ভারী করা যায়!”

হঠাৎ করেই জমে গেল অনুরাগ। রাগিণীর মুখ থেকে দৃষ্টি সরিয়ে পুনরায় তার কোলে মাথা গুঁজে পড়ে রইল। ছেলের হঠাৎ নীরবতায় রাগিণী কিছুটা সন্দিহান হলেন।

“কী হয়েছে অনু?”

“কিছু না।”

“আমি তোকে জন্ম দিয়েছি নাকি তুই আমাকে?”

“আমি কীভাবে জানব? ডিউটির ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করে কনফার্ম হতে হবে!”

“একটা দেব ধরে কানমলা! সাইবানের সাথে থেকে থেকে দিনদিন তোর মোটা মাথাতেও চিকন বুদ্ধি ঢুকেছে।”

একটু থামলেন রাগিণী। তার হাস্যরসাত্মক কন্ঠ নমনীয় হয়ে এলো। অনুরাগের মাথার চুলে বিলি কেটে দিতে দিতে তিনি বললেন,

“সাইবানকে মিস করছিস?”

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল অনুরাগ। গুঙিয়ে উঠল,

“হুম।”

“আমিও। গতবছরও আমার জন্মদিনে কোথা থেকে ভূত সেজে এলো ভয় দেখাতে! আমি তো রাম রাম করে আরেকটু হলে শ্মশানযাত্রী হয়ে যেতাম! অত্ত বড় ধারী ছেলে তারপরও দুষ্টুমি যায়নি। হাহাহা!”

রাগিণীর হাসিটা ঠিক প্রাণোচ্ছ্বল লাগলনা। আক্ষেপ নিয়ে তিনি আবারও বললেন,

“চিন্তা করিস না। ভালো মানুষের সাথে ভালো কিছুই হয়। শুধু একটু ধৈর্য্য ধরতে হয়, এই যা।”

অনুরাগ কিছু বললনা। চুপ করে মায়ের কথা শুনে গেল। রাগিণী সঠিক। তার সাইবানের কথা মনে পড়ছে। বিদেশে চলে যাওয়ার পর অনুরাগের সঙ্গেও কোনোপ্রকার যোগাযোগ রাখেনি ছেলেটা। বন্ধুমহলের কেউই জানেনা সে কোন দেশে আছে। কী করছে। শুধু ইনস্টাগ্রামে কালেভদ্রে পোস্ট বা স্টোরি দেখা যায়। তাও গানের কাজ বা শো সংক্রান্ত। সেখানে অনুরাগ, নীরব আর আফনান বেশ কয়েকবার কমেন্ট করেছে। রিপ্লাই পায়নি। ফোন নাম্বারটাগুলোও বন্ধ। এক কথায়, নিজেকে পুরোপুরি সরিয়ে নিয়েছে সাইবান। অনুরাগদের আড্ডার আসর আর জমে ওঠেনা। সেখানে হাসি ঠাট্টা করার মতন কেউ থাকেনা। তারা প্রত্যেকে বড় হয়েছে অনেক বছর আগেই। কিন্তু এত বছর যাবত তাদের জগতে কোনো জটিলতার ছায়া পড়েনি। কৌশরসুলভ উত্তেজনায় ভরপুর ছিল সবসময়। যে মানুষটার জন্য তারা প্রত্যেকে হাসিখুশিতে বাঁচত, সেই মানুষটার মুখ থেকেই যখন হাসি মুছে গেছে তখন তারা আর কীভাবে খুশি থাকবে?

তবে আজকের মন খারাপের কারণ শুধু সাইবান নয়। মন মানতে নারাজ হলেও অনুরাগের মস্তিষ্ক ঠিকই জানে এমন হতাশার উৎস। কিন্তু সে স্বীকার করবেনা। না মনের কাছে, না মস্তিষ্কের কাছে। মায়ের নরম আঙুলের ছোঁয়ায় আবেশে চোখ বুঁজে এলো অনুরাগের। সেই অবস্থাতেই হঠাৎ সে জিজ্ঞেস করে বসল,

“মা? অর্থবিত্তের স্ট্যাটাস কি সুন্দর মনেরও ঊর্ধ্বে?”

এমন দর্শনসুলভ প্রশ্নে রাগিণী থমকালেন। ভ্রু কুঁচকে তাকালেন ছেলের দিকে। অনুরাগ চোখ বুঁজেই আছে। চেহারাটা শান্ত দেখাচ্ছে। কিন্তু প্রশ্নটা এমন বেমানান কেন? রাগিণী পুনরায় নিজের বিলি কাটায় ফিরে গেলেন। নিজের মতো করে উত্তর দিলেন,

“অবশ্যই না। টাকা পয়সা, শ্রেনী গোত্রের থেকেও মনটা বড়। কিন্তু কী বল তো অনু? আমরা সমাজে বাস করি। আর প্রত্যেকটা সমাজের কিছু নিয়মকানুন থাকে। সেই নিয়মের ব্যত্যয় ঘটলে জীবন জটিল হয়ে যায়। নিয়মের ভেতরে যদি আমরা শান্তি খুঁজে পাই, তবে নিয়ম ভাঙা কি খুব প্রয়োজন?”

অনুরাগ শুধু শুনল। মুখ ফুটে তার আর বলা হলো না, সমাজের নিয়মগুলো খুব নিষ্ঠুর।

***

আজ জানুয়ারির ১০ তারিখ।

বেশ ভোরে ঘুম থেকে উঠে গিয়েছে ইরাম। ইযান ঘুমে থাকতে থাকতে সব প্রস্তুত করে ফেলেছে। রান্নাবান্না মোটামুটি শেষ। ইহান আসার সময়ে মিলাদের মিষ্টি, খেজুর কিনে নিয়ে আসবে। তাকে সাহায্য করতে রাত জেগে কাজ করেছে রাবিয়াও। মেয়েটা কয়েক ঘণ্টা আগে মাত্র ঘুমিয়েছে। সবকিছু ঠিকঠাক নিশ্চিত হয়ে ইরাম একটা পরোটা চায়ে ডুবিয়ে খেয়ে নিল। বাচ্চার ঘুমের সময়টাই বাঙালি মায়েদের কাজের সময়। ইযান এখনো উঠেনি। হাতে কিছুটা ফ্রি সময় আছে। ভোরের প্রকৃতিটা বেশ স্নিগ্ধ। এই সময়ে গোটা শহর ঘুমিয়ে থাকে। ইরাম চুপিচুপি বারান্দায় চলে গেল। ফোনে ভলিউম কমিয়ে একটা গান ছাড়ল। তার শরীর দুলে উঠল তালে তালে। আজকাল সময় পেলেই সে নাচটা ঝালিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে। এমন নয় যে কত্থক নিয়ে প্রোফেশনাল হবে সে। তবে শখের মাঝে যে শান্তি আছে সেটা তাকে অলস সময়যাপন দিতে পারেনা। মুদ্রাগুলো ঠিকঠাক করে নাচতে লাগল সে। ভোরের শীতল বায়ু ঝাঁপটা দিয়ে গেল গায়ে। সমস্ত শরীর শিরশির করে উঠল তার। এই শিহরণে ভেতরকার সকল অনুভূতি সীমাহীন হলো। আবেশে চোখ বুঁজে ফেলল ইরাম। গানের সুর, নাচের মুদ্রা তাকে সমুদ্রের ঢেউয়ে ভাসিয়ে নেয়া নৌকার মতো করে ভাসিয়ে নিল অতীতে।

৮ বছর অতীত:-

আলিশান বাড়িটার গেটের সামনে দাঁড়িয়ে ইতস্তত করছে তরুণী ইরাম। নেমপ্লেটে চকচকে অক্ষরে খচিত সামিয়া মুন্সী আর আহমদের নাম। দ্বিধাগ্রস্থ ইরাম। বারবার ওড়নার খুট চেপে ধরে কামড়াচ্ছে। ভেতরে যাবে কী? এত বছর পর এই বাড়িতে পা দেয়া উচিত হবে? কিন্তু, না গিয়েও তো থাকা যাচ্ছেনা। দুইদিন আগে যেভাবে সাইবানকে সে তাড়িয়ে দিল, এরপর থেকে কোনোমতেই শান্তি পাচ্ছেনা। ছেলেটার তো কোনো দোষ ছিলনা! সে তো একটু ভরসার খোঁজে ইরামের কাছে এসেছিল! আর ইরাম নিজের জীবনের চিন্তায় তার দিকে একনজর তাকালনা! কতটা কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে ছেলেটা! তার যে দ্বিতীয়বারও মেডিকেলে চান্স হয়নি সেটা জানিয়েছে রাহাত। ভীষণ অপরাধবোধ ইরামকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে। শেষমেষ সকল দ্বিধাবোধ ঝেড়ে ফেলল সে। দীর্ঘশ্বাস টেনে গেট ঠেলে ঢুকে পড়ল ভেতরে। দারোয়ান পরিচিত হওয়ায় ইরামকে বাঁধা দিলনা। সদর দরজা খোলাই তাই কলিং বেলের দরকার পড়লনা। ইরাম পায়ে পায়ে প্রবেশ করল। তাকাল এদিক সেদিক। মুন্সীবাড়ির তুলনায় সামিয়া আর আহমদের বাড়ি বেশ অভিজাত। এই কয়েক বছরে চাকচিক্য বেড়েছে বহুগুণে। সবকিছুই নতুন নতুন লাগল ইরামের কাছে। শেষ যেবার এসেছিল বাড়িটা অন্যরকম ছিল। এদিক সেদিক তাকিয়েও কাউকে দেখতে পেলনা ইরাম। গলা খাঁকারি দিল। তারপর ডাকল,

“আলাদিন? আলাদিন আছো? ইরাম আপু এসেছি।”

ধীর পদক্ষেপে চারিদিকে তাকাতে তাকাতে এগোতে লাগল ইরাম, বলল,

“আমি সরি আলাদিন। প্লীজ, আমাকে মাফ করে দাও। কোথায় তুমি? আলাদিন?”

“পরের বাড়িতে এসে হাকডাক করা বাইজিগিরির লক্ষণ!”

গুরুগম্ভীর কন্ঠটা ইরামকে জমিয়ে দিল। ঝট করে মাথা তুলে তাকাল সে। দুই তলার রেলিংয়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন আহমদ। পরনে সিল্ক রোব, মাথার চুল উষ্কখুষ্ক। ঘুমাচ্ছিলেন হয়ত। ইরামের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন তিনি। একটা ঢোক গিলল ইরাম। আহমদের দিকে চেয়ে বলল,

“খালু। আলাদিনকে একটু ডেকে দেবেন?”

“আমার ছেলের সাথে তোমার কী কাজ?”

“আমি ওর সাথে একটু দেখা করেই চলে যাব। প্লীজ।”

আহমদ উত্তর করলেন না। ধীরপায়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে আসলেন। ইরামের মুখোমুখি দাঁড়ালেন। তার সামনে ইরামের নিজেকে বেশ ছোট মনে হলো। চোখ নত করে ফেলল সে। আহমদের ছায়া তাকে গ্রাস করে ফেলেছে পুরোপুরি। কিছুক্ষণ চুপচাপ ইরামকে দেখলেন আহমদ। অতঃপর বললেন,

“ওই বাড়ির সঙ্গে আমাদের আর কোনো সম্পর্ক নেই। তুমি আসতে পারো।”

ইরাম ঝট করে মাথা তুলে তাকাল। আকুল হয়ে আর্জি জানাল,

“জানি। শুধু একবার আলাদিনকে দেখেই আমি চলে যাব। প্রমিজ। প্লীজ খালু, ও সেদিন আমার কাছে গিয়েছিল। ও খুব কাঁদছিল। এমন একটা গুরুতর সময়ে ওর পাশে কারো থাকা দরকার।”

“সেই চিন্তা তোমাকে করতে হবেনা। পরের বাড়ির মেয়ে, পরের বাড়ির চিন্তাই করো। এই পরিবারে তোমার জায়গা কোনোদিন ছিলনা, আর কোনোদিন হবেও না!”

পরের বাড়ির মেয়ে— বাক্যটা ইরামের বুকে তীরের মতো বিঁধল। তার এতটা কষ্ট হতো না যদি সে না জানতো যে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটা আসলে তার খালু নয়, বরং জন্মদাতা! আহমদ জানেন না ইরাম জানে, আরও কয়েক বছর আগে থেকেই। কিন্তু, তিনি নিশ্চয়ই এটুকু জানেন ইরাম তার সন্তান? তারপরও কী অবলীলায় বলে দিলেন, পরের বাড়ির মেয়ে! এই পরিবারে তার কোনো জায়গা নেই! খালু মানুষটার প্রতি কোনোকালে ইরামের বিশেষ টান ছিলনা। তিনি ছিলেন স্রেফ সামিয়ার স্বামী হয়ে। কিন্তু সত্যটা গোপনে জেনে ফেলার পর আহমদকে ইরাম ভিন্ন চোখে দেখে ফেলে। না চাইতেও পিতার আদর খুঁজে ফেরে। রইজুল কিবরিয়া চলে যাওয়ার পর থেকে এই মমতার লোভ আরও তীব্র হয়েছে। পরিহাসের হাসি ফুটল ইরামের ঠোঁটে। নাহ্, ঠিকই তো। পরের বাড়ির মেয়ে সে! তার হাসিটা খেয়াল করে আহমদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফুটল। ইরাম মাথা নেড়ে বলল,

“ঠিক আছে, খালু। আলাদিনকে বলবেন, আমি এসেছিলাম। এটুকু অন্তত করা যায়, তাইনা?”

বলে ইরাম উল্টো ঘুরে চলে আসছিল। কিন্তু পিছন থেকে আহমদের কন্ঠ ভেসে এলো তার কানে,

“না যায়না। আর শোনো, সাইবানের থেকে দূরে থাকবে। ও ছোট মানুষ, এমন কান্ডকারখানা করবেই। তুমি তো বড়, বোঝদার। যেখানে পরিবারের মিল নেই সেখানে আলগা সম্পর্কের কোনো কারণ দেখিনা।”

একপল থামল ইরাম। মাথা ঘুরিয়ে ছলছলে চোখে আহমদকে দেখল। প্রথমবারের মতন রাগের বদলে আহমদ বিস্মিত হলেন। ইরাম কী কাঁদছে? সেটা বোঝার সুযোগ তার হলোনা। এর আগেই ইরাম বলল,

“মেয়ে বিয়ে করে শ্বশুরবাড়ি চলে গেলেও বাবা মা তাকে পরের বাড়ির মেয়ে ভাবেনা। সেখানে, আপনি তো জলজ্যান্ত ভাগ্নিকেই পর করে দিলেন! চিন্তা নেই খালু, আমি আপনার উপদেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করব।”

দাঁড়ালনা ইরাম আর। দ্রুত হেঁটে বেরিয়ে গেল। একবারও আর পিছন ফিরে তাকালনা। সেই শেষ। এরপর আর কখনো সামিয়ার বাড়ির ধারেকাছেও ঘেঁষেনি সে। তার আলাদিন আর কখনো জানতে পারেনি, সেদিন সে গিয়েছিল। সত্যিই ইরাম আলাদিনকে একটুখানি ভরসা দিতে গিয়েছিল, তার পাশে থাকতে চেয়েছিল। কিন্তু ক্রুর ভাগ্যের হয়ত সেটা সহ্য হয়নি।

বর্তমান:

নাচতে নাচতে কখন বদ্ধ চোখের পাতা বেয়ে অশ্রু গড়াতে লাগল ইরাম টেরটুকুও পায়নি। হিমেল হাওয়ায় গাল দুটো বরফশীতল অনুভূত হতেই চোখ মেলে তাকাল সে। ঝাপসা দেখল। গিট বাঁধা ওড়না খুলে দ্রুত চোখ মুছে নিল। নাহ্। কাঁদবেনা সে। তার নীরব অশ্রুর মূল্য কেউ কোনোদিন দেয়নি। দেবেও না।

গোসল করে পোশাক বদলে নিল ইরাম। একটা ঢোলা আকাশি কামিজ পড়ল। হালকা একটু সাজগোজও করল। বিছানায় নড়চড় শুরু করেছে ইযান। তারপরই হঠাৎ চোখ পিটপিট করে তাকাল। তার ছোট্ট শরীরটা ঝটকা দিয়ে উঠে বসল। প্রসারিত দৃষ্টিতে তাকাল রুমের চারদিকে। ইরাম সঙ্গে সঙ্গে হাততালি দিয়ে সুর করে গেয়ে উঠল,

“হ্যাপি বার্থডে আব্বু! হ্যাপি বার্থডে ডিয়ার ইযান, হ্যাপি বার্থডে টু ইউ!”

ইযান হতভম্ব হয়ে গিয়েছে। কারণ পুরো বিছানাজুড়ে বেলুনের ছড়াছড়ি। সবচেয়ে বড় বেলুনটার দড়ি বেঁধে রাখা আলমারির সঙ্গে। সেটা উড়ছে সিলিংয়ের কাছে। যাতে বড় বড় করে লিখা “1” সংখ্যাটা। বিছানার এক কোণে বেশ কতক সফট টয় আর খেলনা গাড়ির সম্ভার। তার উপরেই ছোট্ট একটা হাতে বানানো কেক। ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে থাকল ইযান। পরক্ষণেই ভীষণ উত্তেজিত হয়ে হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে গিয়ে কেকটায় মোক্ষম এক ঘুষি বসাল।

“আম…মা!”

ছেলের কান্ড দেখে খিলখিল করে হাসতে লাগল ইরাম। কেক খেতে গিয়ে পুরো মুখ, জামা ভরিয়ে ফেলেছে। ইরাম আলমারি থেকে বড় বেলুনটা খুলে ইযানের হাতে ধরিয়ে দিল। তারপর নিজের কোলে টেনে অসংখ্য চুমু খেল।

“আব্বু! আমার কুচুপু! কেক খাবে তুমি? হুম?”

খানিকটা কেক নিয়ে ইযানের জিভে ছুঁইয়ে দিল ইরাম। তার আঙুল চেটেপুটে বুভুক্ষের মতো খেতে লাগল ইযান। এমন সময়েই রুমের ভেতর টর্নেডোর বেগে দৌঁড়ে এলো রাবিয়া। ঘুম থেকে জেগে কোনোমতে জামা পাল্টেই ছুটেছে।

“খেয়েছে? লুব্বাটা আমার কেক খেয়ে নিল নাকি সব?”

ইযানের সঙ্গে কেক নিয়ে হাস্যকর কাড়াকাড়ি পড়ে গেল রাবিয়ার। তারস্বরে চেঁচাচ্ছে ইযান। বিপরীতে রাবিয়া কেক গিলতে গিলতে ভ্রু দোলাচ্ছে।

“সবুর সবুর। এত্ত বড় একটা টেডি বিয়ার দিলাম, এর বিনিময়ে কেক উসুল করতে হবে তো নাকি?”

ইযানের জন্মদিনের সকালটা খুনসুঁটিতেই কেটে গেল। দুপুর গড়াতেই কাজে ব্যস্ত হলো ইরাম। বাদ জোহর মিলাদ, এরপর দুপুরের খাওয়ার দাওয়াত সকলের। আশেপাশের বাসার কয়েকজন বাচ্চাকাচ্চা ইতিমধ্যে তৈরি হয়ে চলে এসেছে খেলার জন্য। ইহানও পৌঁছাল মিষ্টি নিয়ে। সে আর রাবিয়া মিলে বাচ্চাদের সামাল দিচ্ছে। ইযান নতুন পাঞ্জাবি পরে লাট সাহেবের মতন পুতুলের মাঝখানে খেলতে বসেছে। নিজের জন্মদিনে বেজায় খুশি সে। রান্নাঘরে খাবার গরম করতে করতে ইরাম আড়চোখে ছেলেকে দেখল। ছোট্ট শরীরে পাঞ্জাবি মানিয়েছে অসাধারণ! কী আদুরে লাগছে! ইচ্ছা হচ্ছে শুধু তাকিয়ে থাকতে। সন্তানকে একটু হলেও সুখী করতে পেরেছে সে। এর চেয়ে বড় স্বার্থকতা আর আছে? বহুদিন বাদে নিজেকে খানিকটা পরিপূর্ণ মনে হচ্ছে তার। কিন্ত, কোথাও যেন বড়সড় এক শূন্যতা রয়ে গিয়েছে। পায়েস নাড়তে নাড়তে ইরাম নতুন ব্যাধিতে আক্রান্ত হলো। অভাবের ব্যাধি। ওই প্রফুল্ল যুবকের অভাব, যে নিজের হাসি দিয়ে ইরামের হাজারও দুঃখের দিন সুখের রঙে রাঙিয়ে দিতে পারদর্শী। আচ্ছা, সে কী জানেনা আজ ইযানের জন্মদিন? সে কি ইরাম আর তার পোটলাকে মিস করে?

“পোড়া পায়েস টেস্ট করে দেখিনি কোনোদিন। গন্ধে মনে হচ্ছে, বেশ ভালোই হবে!”

পরিচিত কন্ঠটা কানে যেতেই ইরাম চমকে উঠল। ঝট করে তাকাতেই তার দৃষ্টি মিলল মানুষটার সঙ্গে। চশমার আড়াল থেকে উজ্জ্বল চোখে চেয়ে আছে কায়সান। দুই হাতে ইয়া বড় বড় দুই প্যাকেট। মনে হচ্ছে তাতে মিষ্টি আর নাস্তা আছে। চটজলদি চুলা বন্ধ করে দিল ইরাম। পায়েসের নিচে খানিকটা লেগে গেছে পাতিলের সাথে। সেটারই গন্ধ বেরিয়েছে। হাত মুছে কায়সানের দিকে তাকাল সে।

“এসব কী?”

“খাবার। আর কী?”

“মেহমানরা খাবে। বেঁচে থাকলে পরে তুমি আর রাবিয়া খাবে। সিম্পল।”

প্যাকেটগুলো রান্নাঘরে থাকা ফ্রিজে একে একে ঢুকিয়ে রাখতে লাগল কায়সান। ইরাম মৃদু হেসে বলল,

“দাওয়াতে আসার জন্য থ্যাংক ইউ। তার চাইতেও আরও বড় থ্যাংক ইউ অপ্রয়োজনীয় হলেও এতকিছু করার জন্য।”

কায়সান প্যান্টের পকেটে হাত ঢুকিয়ে ইরামের দিকে তাকাল। তার চেহারায় মোলায়েম আবেগ ভাসল। ওই আবেগের অর্থ ইরামের আগে জানা না থাকলেও এখন সে জানে। তাই কায়সানের চোখের দিকে সে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারলনা। বিব্রতবোধ হলো। বুঝতে পারে কায়সান সুস্থ হেসে জানাল,

“চিল। আমার সবথেকে ভালো বন্ধুর পাশে থাকতে পারছি, একসঙ্গে সুখ দুঃখ ভাগ করে নিতে পারছি এর চাইতে বেশিকিছু আমার কোনোদিন চাইনা ইরাম।”

কায়সানের কথায় ইরাম মুগ্ধ না হয়ে পারলনা। সে ভেবেছিল, নাবোধক জবাবের পর হয়ত তাদের বন্ধুত্বসুলভ সম্পর্কে ভাটা পড়বে। কিন্তু কায়সান একটুও বদলায়নি। সে তেমনি আছে যেমনটা আগে ছিল। ইরাম অস্বস্তিতে পড়ে এমন কোনো কথাও সে আর কখনো বলেনি। এই নীরব সম্মানটুকু অগাধ মূল্যবান।

জোহরের নামাজ শেষ হতেই বিল্ডিংয়ের কয়েকজন মুরুব্বি এবং পুরুষ এলেন। তাদের মেহমানদারির দায়িত্ব নিয়েছে ইহান আর কায়সান। ড্রয়িং রুমের আসবাব সরিয়ে পাটি বিছিয়ে মিলাদ আর খাবারের আসনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। হুজুর এখনো এসে পৌঁছাননি। তারই অপেক্ষা। ইয়ান মামার কোলে বসে পুরোদস্তুর ব্যস্ত কায়সানের শার্ট ধরে কামড়া কামড়ি করতে। ইরাম রান্নাঘরে পোলাওটা গরম করে নিচ্ছিল। এমন সময়ে তার মনে পড়ল, কিশমিশ ফুরিয়ে গিয়েছে। পোলাওয়ে ছড়িয়ে দেবে ভেবেছিল। রাবিয়া প্লেট ধুয়ে রাখছে খেয়াল করে ইরাম নিজে থেকেই বলল,

“রাবিয়া, পোলাওটা খেয়ালে রেখো। আঁচ কমিয়ে দিয়েছি। আমি নিচের দোকান থেকে এক দৌড়ে কিশমিশ নিয়ে আসছি।”

“কেন? তুমি যাবে কেন? ওই অকর্মণ্য লম্পুটাকে পাঠাও!”
ঝাঁঝাল জবাবে ইরাম ভ্রু তুলল। তারপর হাসি চেপে বলল,

“আমার ভাই অতটাও অকর্মণ্য নয় যতটা তুমি মনে করো। তাছাড়া, ইয়ান খেলছে ওদের সাথে। থাকুক। আমি আসছি এক্ষুণি।”

ওড়না মাথায় তুলে সুন্দর করে ঘোমটা দিয়ে ইরাম দ্রুত চলে গেল বাইরে। পাঁচ মিনিটের মাথাতেই গলির মুখে থাকা দোকান থেকে কিশমিশ কিনে পুনরায় বিল্ডিংয়ের দিকে হাঁটা দিল সে। এমন সময়ে তার একদম পাশ ঘেঁষে একটা চকচকে কালো প্রাইভেট কার গলির ভেতরে ঢুকে গেল। চাপা হওয়া সত্ত্বেও গাড়ি ঢোকানোর ব্যাপারটা ইরামের পছন্দ হলোনা। অজান্তেই ভ্রু কুঁচকে ফেলল সে। গাড়িটা যাওয়ার সময় ঝাঁপটায় ইরামের মাথার ওড়নার ঘোমটা খুলে গিয়েছে। শীতকালের নরম রোদে তার উজ্জ্বল শ্যামলা মুখে মোহনীয় আলোর ঝলকানি খেলে গেল তাতে। পুনরায় ঘোমটা তুলে ইরাম বিল্ডিংয়ের কাছে চলে এলো। গাড়িটাও সেখানেই থেমেছে। ইরাম যে মুহূর্তে ভেতরে ঢোকার জন্য পা বাড়াল, ওই মুহূর্তেই গাড়ির দরজা খুলে গেল। না চাইতেও চোখ পড়ল সেই দৃশ্যে। ইরাম সেখানেই বরফখন্ডে পরিণত হলো।

প্রথমে দেখা গেল পলিশড বুট পরনে পা। ধীরে ধীরে কোমর এবং সবশেষে মাথা। লম্বাটে এক অবয়ব। সুগঠিত শারীরিক গঠন। কালো ডিজাইনার স্যুট পরনে যার বোতামগুলো মাঝখানে নয় বরং একপাশে। বুকের বাম পাশে ছোট্ট একটা সোনালী ব্রুচ। স্যুটের গলার দিকটায় পরিপাটি করে বাঁধা চকচকে কালো টাই। প্রশস্ত কাঁধে ছড়িয়ে পড়েছে মসৃণ কাপড়। দুই হাত ফরমাল প্যান্টের পকেটে গুঁজে রাখা। ইরামের ডাগর ডাগর চোখ দুটো তার অবয়ব থেকে আস্তে আস্তে উঠে এলো মুখে। উজ্জ্বল ফর্সা ত্বকে স্বর্ণাভ সূর্যের প্রতিফলন। ক্লিন শেভড তীক্ষ্ণ চিবুক। চোখে সানগ্লাস। সবথেকে নজরকাড়া ব্যাপার তার মাথা থেকে ঘাড় পেরিয়ে নিচে নেমে যাওয়া ইঞ্চিখানেক লম্বাটে চুলের গোছা। সেগুলো পিছনদিকে একসঙ্গে গুটিয়ে নগণ্য এক ঝুঁটি করে রাখা। অগোছালো কিছু কেশগুচ্ছ লুটিয়ে পড়ে আছে কপালে কিংবা সানগ্লাসের উপরে। ইরাম নিজের দৃষ্টি ফেরাতে পারলনা। মনে হলো, সে স্বপ্ন দেখছে। দমকা হাওয়া খেয়ে গেল। সেই হাওয়ায় তার চুলের গোছা খানিক এলোমেলো হলো। ইরামের ওড়নার ঘোমটা লুটিয়ে পড়ল কাঁধে। তবে নজর হটলনা। সানগ্লাসের আড়ালে থাকা গভীর কালো চোখজোড়া নিবদ্ধ ইরামের পানে। ধীরে ধীরে সেই সানগ্লাস খুলে ছাউনিহীন নিগূঢ় নয়নে সে আপাদমস্তক দেখল ইরামকে। তার কণ্ঠনিঃসৃত গভীর আওয়াজ ইরামের সমস্ত সত্তায় দোলা দিয়ে গেল,

“ভালো আছেন, পোটলার আম্মু?”

— চলবে —

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 4 শেষ করেছেন।

আগের পর্ব উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন