ফন্ট সাইজ:
থিম:
এক মুঠো চাঁদের আলো

৬ষ্ঠ পর্ব

লেখক: নুসরাত ফারিয়া

-“একি আপু? আপনি কাঁদছেন কেন?”

আলো এসেছিল ওয়াশরুমে শাড়ি ঠিক করতে। তখন দেখল, জ্যোতি মুখ চেপে ধরে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। হঠাৎ করে মেয়েটাকে কাঁদতে দেখে আলো হকচকিয়ে যায়। তড়িঘড়ি করে এগিয়ে এসে বিচিলিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে। জ্যোতি কান্না থামিয়ে, চোখের পানি মুছে ধীর কণ্ঠে বলল,

-“কেন কাঁদছি, সেটা তোমার না জানলেও চলবে।”

-“আমরা যদি কারোর সাথে মনের কষ্ট শেয়ার করি, তাহলে মনটাও হালকা হয়! আমি আপনার ছোট বোনের মতো আপু। আপনি চাইলে আমাকে বলতে পারেন।”

জ্যোতি নাক টেনে বলল, -“আমার কষ্টের কারণটা তুমিই আলো।”

একথা শুনে আলো হতভম্ব হয়ে গেল। অবাক কণ্ঠে বলল,

-“আমি? আমি কি করেছি?”

-“তুমি যদি আমাদের মাঝে না আসতে, তাহলে আমি আমার ভালোবাসার মানুষটিকে পেয়ে যেতাম।”

আলো চমকে উঠলো। এই মেয়েটা কিসব বলছে? সে আবার এদের মধ্যে কখন, কীভাবে এল?

জ্যোতি পাশে ফিরে আলোর বিস্মিত চেহারার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, -“আমি ও আধার ভাই একে অপরকে খুব ভালোবাসি। আমাদের তো বিয়েটাও ঠিক হয়েছিল। কিন্তু মাঝখান থেকে হুট করে দাদাজান আপত্তি করে এই বিয়ে নিয়ে। উনার হয়তো আমাকে পছন্দ ছিল না, তাই তিনি এমনটা করেছেন। আধার ভাই উনাকে বারবার রিকোয়েস্ট করেছিল আমি বর্তিত অন্য কারোর সাথে যেন বিয়ে না দেয়। কিন্তু দাদাজান উল্টো অসুস্থতার সুযোগ নিয়ে ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল করে। আর আধার ভাইও এক পর্যায়ে এসে একপ্রকার বাধ্য হয়েই এই বিয়েতে রাজি হয়ে যায়। কিন্তু উনার একটুও মত ছিল না। তারজন্য বিয়ের আগে সামান্য হবু বউয়ের মুখটাও দেখার প্রয়োজন মনে করেননি। এমনকি উনি এখনো আমাকেই চান! আর আমিও উনাকে চাই। কিন্তু দাদাজানের জন্য উনার হাতপা বাঁধা। এখন তুমিই বলো! আমি কি করব?”

কথাগুলো শুনে আলোর পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে গেল। তারমানে জ্যোতি আপু আধার স্যারের গার্লফ্রেন্ড? ও মাই গড! সে এতদিন জানত, হয়তো আধার স্যার সিঙ্গেল। কিন্তু এখন এসব কি শুনছে? তাহলে কি এটার জন্যই তাকে মেনে নেয়নি? অবশ্য দুজনেই তো একে অপরকে পছন্দ করে না। তবুও সে এটা কখনো ভাবতে পারেনি, আধার স্যারের ভালোবাসার মানুষ জ্যোতি আপু!

-“আই নো, তুমি এসব কিছুই জানো না। আর আমি এটাও জানি তুমিও উনাকে তেমন পছন্দ করো না। তাহলে কেন রয়েছো এই অনাকাঙ্ক্ষিত সম্পর্কের মধ্যে? আধার ভাই তোমাকে নয়, উনি আমাকে ভালোবাসে! আমি উনার একমাত্র ভালোবাসার মানুষ। এই দেখো! আমার হাতে উনার দেওয়া রিং, আমাদের ভালোবাসার স্মৃতি।”

জ্যোতি বাম হাত মেলে দেখায়। আলো শূন্য চোখে তাকিয়ে দেখল, হাতের অনামিকা আঙ্গুলের মাঝে একটি ডায়মন্ডের রিং চকচক করছে। এটা দেখে কি তার খারাপ লাগছে? উমম...হয়তো। তবে সেটা শুধুই জ্যোতি আপু ও আধার স্যারের জন্য। দুটো মানুষ একে অপরকে ভালোবেসেও পেল না? মাঝখান থেকে তাদের বিচ্ছেদের কারণ তাকে হতে হলো? কিন্তু! এখানে তারই বা দোষ কোথায়? সে তো এসব কিছুই জানত না। যদি জানত, তাহলে কখনোই এই বিয়েটা করত না। কেন জানি নিজের ওপর ভীষণ রাগ হলো মেয়েটার। সে যদি তাড়াহুড়ো না করত, তাহলে এই দিনটা দেখতে হত না। সে নাহয় কিছু জানত না, কিন্তু দাদাজান? ওই মানুষটা তো সব জানে। তাহলে কেন এমন করল? শুধু কী তাকে নাতবউ করার জন্য?

এত্ত এত্ত প্রশ্নের মধ্যে আলোর মাথাটা ফেটে যাচ্ছে। সে কোনোমতে নিজেকে সামলিয়ে ধীর কণ্ঠে বলল,

-“আমি আপনাকে কি বলব বুঝতে পারছি না। এমন কিছু ঘটে রয়েছে সেটা আমার ধারণারও বাইরে ছিল। তবে আপনি নিশ্চিন্তে থাকুন। আধার স্যার খুব তাড়াতাড়ি আপনার হবে৷ কারণ আমি কখনোই চাইব না, আমার জন্য দুটো মানুষের ভালোবাসা অপরিপূর্ণ থাক!”

জ্যোতির ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠলো। সে চট করে আলোকে জড়িয়ে ধরে বিরবির করে বলল, -“তোমাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ আলো। আমার বিশ্বাস ছিল, তুমি আমাদের সম্পর্ক মেনে নিবে। দিনশেষে তুমিও একজন মেয়ে। সেখানে আমার কষ্ট কীভাবে না বুঝতে বলো? সবচেয়ে বড় কথা, আধার ভাই তোমাকে না। আমাকে ভালোবাসে। যাকে বলে নিঃস্বার্থ ভালোবাসা!”

অজান্তেই আলোর বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। ভাবলেশহীন ভাবে বলল, -“দোয়া করি, আপনাদের দুজনের ভালোবাসা যেন পূর্ণতা পায়!”

--------------------------------

আধার রাতে তিথিকে চট্টগ্রামে রেখে সকালে ফিরে এসেছে। বোনের যাবতীয় যা যা প্রয়োজন সবকিছু কিনে দিয়েছে৷ বাড়িতে ফিরে রুমে প্রবেশ করতেই কপাল কুঁচকে গেল। বিছানায় এলোমেলো ভাবে আলো শুয়ে আছে। লম্বা লম্বা খোলা চুলগুলো চাদরের সাথে লেপ্টে রয়েছে। মেয়েটা বালিশের পাশে মাথা রেখে অস্ফুটস্বরে গোঙাচ্ছে। মাঝেমধ্যে মাথা এদিকওদিক করতে করতে কিছু বিরবির করে বলছে। ফর্সা চেহারা মলিন ও রক্তিম হয়ে আছে। আধার এগিয়ে এসে কিছু একটা ভেবে আলোর কপালে হাত রাখতেই চমকে উঠলো। জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে মেয়েটার শরীর! রাতেই তো সুস্থ দেখে গিয়েছিল, তাহলে হঠাৎ করে এত জ্বর আসার কি মানে ঠিক বুঝতে পারল না।

আধার সরে আসার সময় তার নজর গেল মেয়েটার বাম গালের দিকে। ফর্সা গালে চার আঙ্গুলের আবছা দাগ ফুটে আছে। এটা দেখে কপালের মাঝে চারটে ভাজ পড়ল। ভালো করে লক্ষ্য করে দেখে, মেয়েটা অজানা ব্যথায় ছটফট করছে। সে আর দূরে সরে গেল না৷ বরং কাছে এসে হালকা ঝুঁকে, এক গালে হাত রেখে আস্তে করে ডেকে উঠলো,

-“এই? আমার কথা শুনতে পাচ্ছো?”

স্যারের ডাকে আলো পিটপিট করে তাকায়। চোখের সামনে খুব চেনা একখানা সুন্দর চেহারা ভেসে উঠতেই তার লালচে চোখজোড়া ছলছল করে উঠলো। আধার আলোকে তোলার চেষ্টা করলে মেয়েটি অস্ফুটস্বরে বলল,

-“ব-ব্যথা! কোমরে অ-অনেক ব্যথা।”

-“কোমরে কি হয়েছে?”

আলো কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, -“রাতে পড়ে গেছি সিড়ি থেকে।”

একথা শুনে আধার চট করে আলোর শরীর থেকে কম্ফোর্টার সরিয়ে পায়ের দিকে তাকিয়ে দেখে, ডান পায়ের হাঁটুতে ব্যান্ডেজ করা। সে ফোঁস করে তপ্ত শ্বাস ফেলে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,

-“সবসময় অঘটন না ঘটালে চলে না তোমার?”

আলো কিছু না বলে আধো আধো চোখে চেয়ে থাকল। আধার কিছুক্ষণ চুপ থেকে হুট করেই মেয়েটাকে পাঁজা কোলে তুলে নিলো। তারপর ওয়াশরুমে চলে গেল!

নিজে ও আলোকে ফ্রেশ করিয়ে বেরিয়ে এল। নরম বিছানায় সাবধানে আধশোয়া করে শুয়ে দিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে যায়। ফিরে এল কয়েক মিনিটের পর। হাতে খাবারের প্লেট! আলোকে নিজ হাতে নাস্তা করিয়ে জ্বরের ঔষধ খাইয়ে দিল। তারপর মেয়েটার বাম গালে মলম লাগিয়ে দিয়ে কপালে জলপট্টি দিতে থাকল।

-“আপনি নিশ্চয়ই ভীষণ টায়ার্ড! আমার সেবা না করে একটু রেস্ট নিন। আমি ঠিক আছি।”

আলো বিরবির করে কথাগুলো বলে। আধার চুপচাপ নিজের কাজ করতে করতে ধীর কণ্ঠে বলল, -“তোমার বাবাকে কথা দিয়েছিলাম, তার মেয়ের খেয়াল রাখব! ধরে নাও, আমি আমার নিজের দ্বায়িত্ব ও কতব্য পালন করছি।”

-“আ-আমাকে খুব ঘৃ'ণা করেন তাই না স্যার?”

-“উমমম....ঘৃ'ণা নয়! জাস্ট তোমাকে পছন্দ করি না।”

আলো ফিচেল হেঁসে বলল, -“আমিও আপনাকে পছন্দ করি না। বিশেষ করে আপনার রুড বিহেভিয়ারকে! মাঝেমধ্যে ইচ্ছে করে এক ধাক্কায় আপনাকে ভার্সিটির ছাঁদ থেকে ফেলে দিই। তাহলে হয়তো একটু ভালো লাগত!”

-“আমাকে ফেলতে গিয়ে নিজেই কোমর ভেঙ্গে নিয়ে বসে আছো মিস...কালো।”

নামটা শুনে আলো চোখমুখ কুঁচকে বলল, -“আমি দেখতে যথেষ্ট সুন্দর স্যার! তবুও আপনি বারবার আমাকে কালো, কালো বলেন কেন?”

-“আধার মানে অন্ধকার, আর অন্ধকার মানেই কালো। এবং আলো-কালো পারফেক্ট জুটি। তাই এই নামটা তোমার সাথে একদম মিলে যায়।”

স্যারের লজিক ঠিক বুঝতে পারল না আলো। এ কেমন ব্যাখা? সব মাথার ওপর দিয়ে গেল। তবে সে বেশি মাথা না ঘামিয়ে চোখদুটো বুঝে বিরবির করে বলল,

-“বদদোয়া দিলাম, আপনার কপালে কখনো সুন্দরী বউ জুটবে না।”

-------------------------------------

ধীরে ধীরে সময় অতিবাহিত হয়ে যায়। আলো ঘুমিয়ে যাবার কিছুক্ষণ পর আধার রুমের লাইট নিভিয়ে বাহিরে গেল।

-“রাতে এখানে কী হয়েছে দাদাজান?”

সোবহান খান বাগানে এসে হাঁটাহাঁটি করছিলেন আর গম্ভীর মুখে কিছু একটা ভাবছিলেন। তখন আধার এসে উপরোক্ত প্রশ্নটি করে।

-“নাতবউ ঠিক আছে?”

-“হু! জ্বর এসেছিল। ঔষধ খেয়ে ঘুমিয়েছে।”

সোবহান খান আড়ালে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। কিছু বলতে গিয়েও থেমে যান। আধার পুনরায় বলল,

-“মেয়েটার গায়ে হাত কে তুলেছে?”

সোবহান খান চুপ করে থেকে ধীর কণ্ঠে বললেন, -“জ্যোতি!”

আধারের কপাল কুঁচকে গেল।

-“কেন?”

-“ভার্সিটি থেকে ফেরার পর খেয়াল করেছিলাম নাতবউয়ের মন খারাপ। সবসময় অন্যমনষ্ক হয়ে কি যেন ভাবছিল। আমার সাথেও খুব একটা কথা বলেনি। জিজ্ঞেস করার পর জানায়, সে আমার ওপর ভীষণ অভিমান করে আছে। আর এই বাড়ি ছেড়েও চলে যেতে চাচ্ছিল। ভেবেছিলাম তুমি কিছু বলেছো, তাই এমন করছে। তিথিকে নিয়ে তুমি চলে যাওয়ার পর খেতেও আসেনি মেয়েটা। বুঝলাম বিষয়টা খুব জটিল। তাই আমি নিজেই গেলাম কথা বলার জন্য। রুমে না পেয়ে ছাঁদে খোঁজ করলাম। মেয়েটা মনম'রা হয়ে একা একা অন্ধকারের মধ্যে দাঁড়িয়ে ছিল। অনেক জোরাজোরি করার পর শুধু আমাকে বলেছিল, "সবকিছু জেনেশুনেও দুটো ভালোবাসার মানুষকে আলাদা করে দিয়ে, মাঝখানে আমাকে না নিয়ে এলেও পারতে দাদাজান!"

এটা শোনার পর আশ্চর্য হয়ে যাই। মূল কারণ জিজ্ঞেস করার বলে বলে, জ্যোতি ও তুমি একে অপরকে ভালোবাসো। ওই মেয়েটা নাকি তোমার গার্লফ্রেন্ড! তোমাদের এনগেজমেন্ট থেকে শুরু করে বিয়েও ঠিক হয়েছিল। কিন্তু মাঝখান থেকে আমি বেঁকে বসি, আর তোমাকে আমার অসুস্থতার দোহাই দিয়ে আলোর সাথে বিয়ে দিই। এসব শুনে এক মূহুর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে যাই। হ্যাঁ মানছি, তোমার ও জ্যোতির বিয়ের কথা চলছিল। কিন্তু সেটা একান্তই ছোট বউমা ও তার বোনের সিদ্ধান্ত ছিল। তুমি এটা জানার পর সাফসাফ জানিয়ে দিয়েছিলে, জ্যোতিকে বিয়ে করতে পারবে না। তখন এটা নিয়ে ছোট বউমা ঝামেলা করলেও পরবর্তীতে শান্ত হয়। আর এই বিয়ের ব্যাপারটা বছরখানেক আগে শেষ হয়েছিল। কিন্তু হঠাৎ করে গতকাল রাতে নাতবউয়ের মুখে ওমন কথা শুনে চমকে উঠি।”

অতঃপর সোবহান খান আধারকে সবকিছু বলে দিল, ভার্সিটিতে থাকাকালীন জ্যোতি আলোকে ঠিক কী কী বলে ব্রেনওয়াশ করেছিল। সবকিছু শুনে বিস্মিত হয়ে গেল আধার। তার জীবনে কখনোই কোনো নারী ছিল না। আর না সে ভালোবাসায় বিশ্বাসী। বলতে গেলে সে ভালোবাসা নামক শব্দকে ভয় পায়! এর পিছনে তার অতীত জড়িয়ে আছে। আধার শব্দ করে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল।

-“সবটা শোনার পর তোমার ও জ্যোতির বিষয়ে পরিষ্কার করে বলি। একই সাথে জ্যোতির ওপর ভীষণ রাগ হচ্ছিল। মেয়েটা ইচ্ছে করে নাতবউকে মিথ্যে কথা বলেছে। যেন তোমাকে ছেড়ে চলে যায়। আর বেকুব মেয়েটাও ওই শয়তান মেয়ের কথা শুনে বিশ্বাস করে নিয়েছে। তারপর আর কী! নাতবউয়ের সমস্ত ভুল ধারণা ভেঙে দিলাম। মেয়েটা আসল সত্য জেনে প্রচুর অবাক হয়। সেসময় জ্যোতি বাড়িতে ছিল না, বাহিরে গিয়েছিল ঘোরাঘুরি করতে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে মেয়েটাকে নিয়ে খাওয়াদাওয়া করে রুমে গেলাম। হঠাৎই মাঝরাতে আলো ও জ্যোতির চিৎকার, চেঁচামেচির আওয়াজে আমি ও ছোট বউমা রুম থেকে বের হই। দোতলায় সিঁড়ির কাছে দাঁড়িয়ে থেকে দুজন মিলে ঝগড়া করছিল......

ফ্ল্যাশব্যাক—

আজ বাহির থেকে অনেকটা রাত করেই ফিরে আসে জ্যোতি। অনেকদিন পর এখানকার বন্ধুমহলের সাথে আড্ডা দিয়েছে। আধার বাড়িতে থাকাকালীন সে রাতে বের হতে পারে না। কারণ মানুষটা এসব মোটেও পছন্দ করে না। যত ঘোরাঘুরি করার সব দিনে, কিন্তু রাতের বেলা একা একা বের হওয়াটা পছন্দ করে না। তিথিকেও কখনো একা ছাড়েনি। মানুষটার চোখে ভালো মেয়ে হয়ে থাকার সর্বদা চেষ্টা করে এসেছে। এমনকি ওই লোকটার জন্যই নিজের লাইফস্টাইল পাল্টে একদম ভদ্র মেয়েতে রুপান্তরিত হয়েছে। অথচ মানুষটা তার দিকে ফিরেও তাকায় না।

এসব ভেবে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল জ্যোতি। চুপচাপ সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠার সময় খেয়াল করল, আলো দু'হাত বুকে ভাজ করে গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে আছে।

-“তুমি এখানে?”

জ্যোতির কথার প্রতিত্তোরে আলো বলল, -“কেন? আমার জায়গায় আধার স্যারকে বুঝি আশা করেছিলেন?”

-“ইউ আর রাইট! আমি আমার প্রিয় মানুষটিকেই মিস করছিলাম।”

আলো তাচ্ছিল্যের সুরে বলল, -“হয়েছে আপু। আর মিথ্যে নাটক করতে হবে না। আমি সবকিছু জেনে গিয়েছি।”

-“ম-মানে?”

-“মানে এটাই যে, আধার স্যার আপনাকে মোটেও ভালোবাসে না। শুধু আপনাকে কেন? উনি কোনো মেয়েকেই লাভ করেন না। আপনি উনাকে পাওয়ার জন্য মিথ্যে কথা বলেছেন আমাকে। সবকিছু শুনে আমি যেন উনার জীবন থেকে চলে যাই। তখন আপনি আসতেন রাইট? বাট আফসোস! সেটা আর হচ্ছে না। আধার স্যার না চাওয়া অবধি আমি এই বাড়ি থেকে এক পা-ও নড়বো না। আর না আপনাকে উনার লাইফে আসতে দিবো। আফটার অল, আপনি কেমন সেটা আমি এ টু জেড...জেনে গিয়েছি!”

আলোর কথা শুনে জ্যোতি কিছুটা চমকে উঠলেও পরক্ষণে নিজেকে সামলিয়ে নিয়ে বলল, -“দ্যাটস গ্রেট! ভালোই হয়েছে সবকিছু জেনে গিয়েছো। এখন চুপচাপ আধারের জীবন থেকে সরে যাও। আমি তাকে ভালোবাসি।”

-“উনি তো আর আপনাকে ভালোবাসে না।”

-“সো হোয়াট? আমার একার ভালোবাসাই যথেষ্ট। শুধু আমাদের মাঝখান থেকে চলে যাও।”

-“আমি চলে গেলেই কী আধার স্যার আপনাকে বিয়ে করবে? উমমম....মনে হয় না। উনার যদি আপনাকে বিয়ে করারই হত, তাহলে প্রথমেই করতেন।”

-“সেটা আমরা বুঝে নিবো। তোমাকে এত মাথা ঘামাতে হবে না।”

-“শুধু মাথা না? এই আলো পুরোটাই ঢুকে গেছে মাঝখানে। না চাইতেও মাইনকার চিপায় ফেঁসে গেছি। সেখানে আমি না ঘামলে, আর কে ঘামবে বলুন তো?”

-“কী চাও তুমি?”

-“আমাকে আমার মতো থাকতে দিন।”

-“মানে তুমি বলতে চাচ্ছো, আধারকে ছাড়বে না?”

-“আমি কেন ছাড়ব আশ্চর্য! আমাকে দেখে কী আপনার বারোভা'তারি মনে হয়? উনার দরকার হলে উনি ছাড়ুক আমায়। আপনার আধার ভাইয়ের প্রতি বিন্দুমাত্রও ইন্টারেস্ট নেই। শ্লার রসকষহীন, কাঠখোট্টা একটা বদলোক!”

-“মুখে সামলে কথা বলো আলো।”

জ্যোতি ধমকে উঠলো। আলো ভ্রু কুঁচকে ঝাঁঝাল কণ্ঠে বলল, -“আমি আমার স্বামীকে হাজারবার বকবো, তাতে আপনার কী? কে হোন আপনি হুহ্? এতই যদি ভালোবাসা, দরদ উতলে পড়ছে, তাহলে উনার কাছে গিয়ে ড্রামা করুন। আমাকে এসবের মধ্যে একটুও জড়াবেন না। এই আপনার জন্য, শুধুমাত্র আপনার জন্য চিন্তা করতে করতে দু'কেজি ওজন কমে গেছে আমার। যেখানে আমি সবাইকে ডিপ্রেশনে ফেলি, সেখানে আপনার কথা শুনে আমি নিজেই ডিপ্রেশনে চলে গিয়েছি। শুধু শুধু দাদাজানের ওপর রাগ করেছি। সাথে স্যারের চৌদ্দ গুষ্ঠিও ধুয়ে দিয়েছি। দুপুরে ঠিকমতো খাবার খাইনি। এমনকি রাতেও গলা দিয়ে খাবার নামছিল না। মাথা ব্যথায় পাগল হয়ে যাচ্ছিলাম। একদিকে আমি ম'রছি আপনাদের জ্বালায় আর আপনি বাহিরে ফিল্ডিং মা'রছিলেন। বাহ্, আপু বাহ্! এক কথায় চমৎকার অভিনয় করেছেন। এতদিন জানতাম শুধু আমিই নাটকবাজ! এখন দেখছি, আমার থেকেও দুকাঠি ওপরে আপনি।”

কথাগুলো শুনে রেগে গেল জ্যোতি। চিল্লিয়ে বলল,

-“আমি তোকে লাস্ট বার বলছি, আমার আধারের জীবন থেকে সরে যা। নয়তো....”

-“নয়তো কী হ্যাঁ? কী করবেন?”

-“মে'রে ফেলব তোকে।”

একথা শুনে আলো শব্দ করে হেঁসে দিল। তারপর দাঁতে দাঁত চেপে বলে উঠলো, -“যাবো না সরে, আমিও দেখি আপনি কি করেন।”

বলা শেষ হতেই আলোর বাম গালে থাপ্পড় এসে পড়ল।

-“ইউ ফা'কিং!”

ব্যস! জ্যোতির গালি শুনে মূহুর্তেই সব ধৈর্য্যের বাঁধ ভেঙে গেল আলোর। সে রক্তিম চোখে তাকিয়ে সপাটে চড় বসিয়ে দিল জ্যোতির গালে। আর যাইহোক, তার গায়ে আজ পর্যন্ত কেউ-ই হাত তুলেনি। সেখান একজন বাহিরের মেয়ে হয়ে কি-না বিনাদোষে মা'রল তাকে! তাহলে সে কীভাবে ছেড়ে দিত? দিনশেষে সেও ভালো মেয়ে নয়! দশটা মা'র খেলেও পাঁচটা ফিরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।

অন্যদিকে জ্যোতি মা'র খেয়ে হতভম্ব হয়ে গেছে। সে একটুও আশা করেনি আলো তাকে এইভাবে পাল্টা আঘাত করবে। তবে রাগে, অপমানে শরীর জ্বলে যাচ্ছে। কতবড় সাহস, জ্যোতি তালুকদারের গায়ে হাত তুলেছে!

-“নিজের সীমার মধ্যে থাকার চেষ্টা করুন। আমার সাথে একদম লাগতে আসবেন না। নয়তো আমার খারাপ রূপটা দেখাতে বাধ্য হব!”

গা জ্বলে উঠলো জ্যোতির। আলো নিজের গাল নেড়ে রাগান্বিত দৃষ্টি নিক্ষেপ করে সিঁড়ি বেয়ে নামতে চাইল। উদ্দেশ্য ছিল রান্নাঘরে গিয়ে নিজের নরম গালে বরফ ঘষাঘষি করবে। গালটা ভীষণ জ্বলছে! হয়তোবা সুন্দর গালে আঙ্গুলের ছাপ বসে গিয়েছে।

আলো সিঁড়ির ধাপে পা রাখতেই জ্যোতি চট করে ল্যাং মা'রল। হুট করে, একদম হুট করে ঘটনাটি ঘটে যায়। ফলস্বরূপ অনাকাঙ্ক্ষিত ধাক্কায় নিজের ব্যালেন্স সামলাতে না পেরে হুড়মুড়িয়ে সিঁড়ি বেয়ে গড়িয়ে নিচে পড়ে গেল আলো৷ কোমরে ও পায়ে অনেকটাই ব্যথা পায়, এমনকি ভয়ে সেন্সলেসও হয়ে যায়। সোবহান খান ও তাহমিনা খান তখনই মেয়েটাকে নিয়ে হাসপাতালে গিয়েছিল। প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে মাঝরাতে ফিরে এসেছে। কারণ আলো হাসপাতালে থাকতে মোটেও পছন্দ করে না। তীব্র ফিনাইলের গন্ধে দমটা বন্ধ হয়ে যায়।

সোবহান খান জ্যোতির কাজে এতটাই রেগে গিয়েছিলেন যে, ওই রাতের বেলাতেই মেয়েটাকে বের করে দেন। সাথে কিছু কড়া কথাও শুনিয়ে দেয়। তাহমিনা খান জ্যোতির পক্ষে ছিল, এটা নিয়েও ঝামেলা হয়। এতে সোবহান খান আরো রেগে যান। ছোট বউমাকেও কিছু কথা শুনিয়ে দেন। পরিস্থিতি অস্বাভাবিক দেখে চুপ করে যায় তাহমিনা খান। বাড়ির গাড়ি ও ড্রাইভার দিয়ে জ্যোতিকে তার কাজিনের বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়।

বর্তমান.....

সবকিছু শুনে কিছুক্ষণের জন্য স্থির হয়ে রইল আধার। চোখেমুখে বিস্ময়ের ছাপ সুস্পষ্ট! চেহারা দেখে বোঝা মুসকিল, মনের ভেতর কী চলছে। কিছু সময় থম মে'রে দাঁড়িয়ে থেকে উল্টো ঘুরে বাড়ির ভেতর যেতে যেতে গম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠলো,

-“তোমার ছোট বউমার বোনের বড় মেয়েকে যেন এই বাড়িতে আর কোনোদিন না দেখি দাদাজান! অন্যথায় পরের থাপ্পড়টা কিন্তু আমার হাত থেকেই পড়বে।”

#চলবে

আমার লেখা সকল রোমান্টিক ইবুক পড়ুন বইটই এ—

🍁ই-বই "অন্তরের অন্তস্তলে তুই"

https://link.boitoi.com.bd/dyytb

🍁ই-বই "অন্তরের অন্তস্তলে তুই (সিজন ২)"

https://link.boitoi.com.bd/diOjb

🍁ই-বই "এক টুকরো নিক্কি-ইথান"

https://link.boitoi.com.bd/MTxuG

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৬ষ্ঠ পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন