ফন্ট সাইজ:
থিম:
এক মুঠো চাঁদের আলো

১০ম পর্ব

লেখক: নুসরাত ফারিয়া

আধারের বেহায়া নজর গিয়ে আটকায় রমণীর ভেজা সাদা কোমরের দিকে। শাড়ির আঁচল সরে গিয়ে উঁকি দিচ্ছে মেদহীন পেটের কিছু অংশ। বৃষ্টির পানি মেয়েটার সর্বাঙ্গে ছুয়ে দিচ্ছে, সাথে ভেজা নারীদেহের সৌন্দর্যও কয়েকগুণ ফুটে উঠেছে। বেসামাল প্রকৃতির সাথে তাল মিলিয়ে গানের ছন্দে নৃত্য করা রমণীকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করে চলেছে আধার খান। নাচের তালে করা বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গীমার নিখুঁত কারুকাজ গেঁথে গিয়েছে ওই বিস্ময়কর চাহনিতে! যেখান থেকে চাইলেও অবাধ্য নজর সরিয়ে নিতে পারছে না। বরংচ বারবার ব্যর্থ হচ্ছে।

-“স....স্যার আপনি!”

নাচের একপর্যায়ে এসে আলো হঠাৎই থেমে যায়। কারণ তার ভেজা আঁখি জোড়া অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটার দিকে নিবদ্ধ হয়! এতেই মেয়েটা ভুত দেখার মতো চমকে ওঠে।

-“ইয়েস আই অ্যাম!”

ভাবলেশহীন ভাবে জবাব দেয় আধার। আলো কোমর থেকে গুঁজে রাখা আঁচল খুলে ঠিকঠাক হয়ে এগিয়ে এসে জানতে চাইল,

-“কখন এলেন? আজ তো আপনার ওখানে থাকার কথা ছিল! তাহলে?”

-“তোমাকে কৈফিয়ত দিতে আমি বাধ্য নই!”

আলো ভ্রু কুঁচকে তাকায়। আধার একটু সময় নিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,

-“রাত-বিরেতে এমন পেত্নীর মতো নাচছিলে কেন? এটা কোনো ঝোপঝাড় নয়! এতই যখন নাচার শখ, তাহলে বাঁশবাগানে গিয়ে নৃত্য করো। তখন পেলেও পেতে পারো নিজের মতো কিছু সাঙ্গপাঙ্গ!”

আলো দু'হাত কোমরে রেখে ঝাঁঝাল কণ্ঠে বলল,

-“এ্যাই! আমাকে দেখে আপনার পেত্নী মনে হয়?”

-“পেত্নী না হলেও শাঁকচুন্নি মনে হয়।”

-“আমি শাঁকচুন্নি হলে এতদিনে আপনার ঘাড় মটকিয়ে কালা ভুনা করে খেতাম।”

-“রাক্ষসীরা খাই খাই ছাড়া আর কিছুই করতে পারে না। উমমম....আকাম-কুকাম করতেও বেশ পারদর্শিতা!”

রাগে আলোর শরীর জ্বলে উঠলো। তার রাগান্বিত লালচে চেহারা দেখে আনমনে হাসলো আধার। পরক্ষণে নিচ থেকে ফোন তুলে চলে যেতে যেতে বলে উঠলো,

-“ভেজা শরীরে একদম রুমে আসবেন না মিস. কালো!”

আলো একহাতে নিজের কপাল চেপে ধরল। এই লোকটার সমস্যা কী? একেই তো তার সুন্দর নামটার বারোটা বাজিয়ে দিয়েছে। তারওপর তুমি থেকে আবার হুটহাট আপনিতে চলে যায়। এই লোকটা ভবিষ্যতে গিরগিটিকেও হার মানাবে ড্যাম শিওর!

দোলনা থেকে নিজের ফোনটা নিয়ে শাড়ির কুঁচি ধরে ছুটে যায় আলো। অনেকটাই রাত হয়ে এসেছে। এখনো যদি এই অবস্থায় থাকে, তাহলে সকালে নির্ঘাত জ্বর আসবে। তাই সে স্যারের নিষেধাজ্ঞাকে অমান্য করে জলদি রুমের ভেতর ঢুকে গেল।

-“আমার কথা না শোনার কারণ?”

আধার ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে থেকে একটা একটা করে শার্টের বোতাম খুলতে খুলতে গম্ভীর মুখে জানতে চাইল। আলো বিরক্তিকর কণ্ঠে বলল,

-“কেন শুনব আপনার কথা হুহ্? ভুলে যাবেন না, এটা শুধু আপনার একার রুম নয়। আমারো রুম!”

-“বুঝলাম! এখন চেঞ্জ করে এসে ফ্লোর পরিষ্কার করো।”

-“কেন?”

-“অযথা শুকনো কার্পেট, ফ্লোর ভিজিয়ে দিলে। এইজন্যই তখন রুমে আসতে বারণ করেছিলাম!”

আলোর চোয়াল ঝুলে পড়ল। ফ্লোর ভিজে যাওয়ার ভয়ে কি-না সে সারারাত এইভাবে থাকত? এই লোকটার বুকের ভেতর আদৌ হৃদয় আছে তো? নাকি সেটাও নেই। আসলেই মানুষটার মধ্যে একটুও মায়াদয়া নেই। যদি থাকত, তাহলে এমন কথা বলার আগে দু'বার ভেবে নিত। আলো ফোঁস করে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে নিজের পোশাক নিয়ে দ্রুত ওয়াশরুমের ভেতর চলে গেল। কিছুক্ষণ পর মাথায় তোয়ালে পেঁচিয়ে বেরিয়ে এসে ফ্লোর মুছে দিল। আধারও ফ্রেশ হয়ে আসে।

-“ডিনার করেছেন?”

আলো দাঁড়িয়ে থেকে ভেজা চুলগুলো টাওয়াল দিয়ে মুছতে মুছতে জিজ্ঞেস করল। আধার একপলক তাকিয়ে ছোট্ট করে বলল, -“উঁহু!”

-“ডাইনিংয়ে আসুন! আমি খাবার গরম করে দিচ্ছি।”

-“খিদে নেই।”

আলো বাক্যটা শুনেও না শোনার ভান করে রুম থেকে বেরিয়ে গেল। বেশ কিছুক্ষণ পর খাবারের প্লেট নিয়ে ভেতরে এল। আধার সোফায় বসে থেকে ল্যাপটপে একটা ইমেইল চেক করছিল। তখন আলো সামনে থাকা কাঁচের টি-টেবিলের ওপর প্লেট রেখে ধীর কণ্ঠে বলল,

-“কাজ শেষ হলে খেয়ে নিবেন। নয়তো খাবার নষ্ট হবে!”

-“বললাম তো খিদে নেই। তবুও আমার কথা শুনো না কেন?”

-“কারণ আমি আপনার সব কথা শুনতে বাধ্য নই।”

একথা বলে আলো চুপচাপ বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ল। আধার কিছুক্ষণ থম মে'রে বসে থেকে নিজের কাজে মন দিল। কিন্তু বেশিক্ষণ টিকতে পারল না। খাবারের সুঘ্রাণ এসে বারবার নাকে সুড়সুড়ি দিচ্ছে। আধার একপর্যায়ে হাল ছেড়ে দিয়ে কোল থেকে ল্যাপটপ সরিয়ে পাশে রাখল। উঠে গিয়ে ওয়াশরুম থেকে হাত ধুয়ে এসে পানির গ্লাস নিয়ে বসে পড়ল। উপর থেকে প্লেট সরাতেই দেখতে পেল—ধোঁয়া ওঠা গরম ভুনাখিচুড়ির সাথে বেগুন ভাজা, শুটকি ভর্তা, মুরগীর কষা মাংস ও দুটো ইলিশ মাছ ভাজা!

-“তুমি খেয়েছো?”

আধার স্যারের কথা শুনে আলো কম্ফোর্টারের ভেতর থেকে মাথা বের করে বলল, -“না খেলে কি খাইয়ে দিবেন?”

আধার কপাল কুঁচকে তাকায়। আলো ফিক করে হেঁসে দিয়ে বলল, -“মজা করছি। আমি আপনার আগেই খেয়ে নিয়েছি। এখন আপনি খেয়ে আমাকে উদ্ধার করুন!”

আধার আর কিছু না বলে চুপচাপ খেতে শুরু করল। আলো মুচকি হেঁসে জানতে চাইল, -“মজা হয়েছে?”

আধার খেতে খেতে ছোট্ট করে জবাব দিল, -“হুম।”

আলো আবারো হাসলো। তবে কিছু না বলে চোখদুটো বন্ধ করে ঘুমের দেশে হারিয়ে গেল!

খুব ভোরবেলায় ফোনের ককর্শ আওয়াজে ঘুম ভেঙে গেল আধারের। চরম বিরক্তিতে বালিশের মাঝ থেকে মুখ তুলে আশেপাশে তাকায়! আলো তার পিঠের ওপর দুই ঠ্যাং তুলে রেখে উল্টো দিক হয়ে বেঘোরে ঘুমাচ্ছে। এতে একটুও অবাক হয় না আধার। কারণ এখন সে এসবে অভ্যস্ত হয়ে গেছে।

আধার ঘুমু ঘুমু চোখে বালিশের নিচ থেকে বেজে চলা ফোনটা বের করল। সে ভেবেছিল নিজের ফোন, কিন্তু এখন দেখছে এটা আলোর ফোন। আধার ভ্রু কুঁচকে স্ক্রিনের দিকে তাকায়। একটি নাম্বার ভেসে উঠেছে, কিন্তু সেভ করা নেই। আধার কল রিসিভ না করে রেখে দিল। তার আবার অন্যের ফোন ধরার কোনো অভ্যেস নেই। কিন্তু বারবার কল আসাতে বিরক্তও বটে। ওইদিকে আলোও একটু নড়েচড়ে উঠে ঘুমিয়ে গেল। তার অর্ধেক শরীরই বিছানার বাহিরে ঝুলছে৷ আধার তপ্ত শ্বাস ফেলে হাত বাড়িয়ে মেয়েটাকে টেনে নিয়ে এসে ঠিক করে শুয়ে দিল। এই মেয়েটা আবার পুরো বিছানাতে ঘূর্ণিপাকের মতো ঘুরে বেড়ায়। মুখের সাথে হাত-পাও একদম লাগামছাড়া। তার এসব ভাবনার মাঝে আবারো ফোনটা বেজে উঠলো। আধার ভাবল—হয়তো জরুরী ফোনকল। নাহলে কি এই অসময়ে এতবার কেউ কল দেয়? তাই সে সহসাই কলটা রিসিভ করে কানে ধরে কিছু বলতে যাবে তার আগেই শুনতে পেল, এক পুরুষালী কণ্ঠস্বরে বলা কিছু অপ্রত্যাশিত বাক্য—

-“হাই সুইটহার্ট৷ কেমন আছো? নিশ্চয়ই খুব ভালো আছো? নাহলে কি আমাকে এত সহজে ভুলে যেতে? উমমম...তুমি নতুন কাউকে পেয়ে আমাকে ভুলে গেলেও কিন্তু আমি আজও তোমায় ভুলতে পারিনি। বিশেষ করে আমাদের একসঙ্গে কাটানো প্রতিটা মূহুর্তগুলো তোমাকে ভুলতে দেয় না। তাই তো আজ আবারো তোমাকে ডিস্টার্ব করলাম। তুমি কিছু মনে করো না ওকে! আমি শুধু তোমার ওই মিষ্টি কণ্ঠস্বরটা একটু হলেও শুনতে চাই। আর এর জন্য আমি বেহায়া, নির্লজ্জ সবকিছু হতে রাজি। এই? তুমি চুপ করে আছো কেন? কথা বলো রিক্তা!”

এক মূহুর্তের জন্য আধার স্তব্ধ হয়ে যায়। সে ঘাড় ঘুরিয়ে অবিশ্বাস চোখে ঘুমন্ত মেয়েটার মাসুম চেহারার দিকে তাকায়। ওইদিকে ফোনের ওইপাশে থাকা ছেলেটা কি বলছে না বলছে সেদিকে তার কোনো হুঁশ-জ্ঞান নেই। তার মাথায় শুধু এখন একটা কথায় ঘুরপাক খাচ্ছে—মেয়েটার এক্স বয়ফ্রেন্ড রয়েছে!

-----------------------------------

ভোরের দিকে আলোর ঘুম ভাঙে। প্রতিদিন এই সময়টাতে উঠে অভ্যেস হয়ে গেছে। সে আড়মোড়া ভেঙে হামি তুলে উঠে বসে পাশে তাকায়। আজ আধার স্যারকে নিজের পাশে ঘুমন্ত অবস্থায় দেখতে না পেয়ে আলোর মন কিছুটা আপসেট হলো। খোলা চুলগুলো হাত খোপা করে ওয়াশরুমে চলে গেল ফ্রেশ হতে। দশমিনিট পর চেঞ্জ করে এসে চার রাকাত নামাজ আদায় করে রুম থেকে বেরিয়ে গেল।

সাত সকালে কলিং বেলের শব্দ পেয়ে আলোর কপাল কুঁচকে গেল। ভাবল—হয়তো শেফালি চাচি এসেছেন। কারণ উনি এখনো আসেন নি! তাই জলদি ভেজা হাত ওড়নায় মুছতে মুছতে রান্নাঘর থেকে ছুটে এসে দরজা খুলে দিল এবং ভরকে গেল। কারণ একজন ডেলিভারি বয় একটি বিশাল ফুলের বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সে কিছু জিজ্ঞাসা করতে যাবে তখনই ছেলেটা নিজেই মুখ খুললো!

-“আলো রহমান রিক্তার নামে এই পার্সেলটি এসেছে। আপনি যদি কাইন্ডলি উনাকে একটু ডেকে দিতেন!”

আলোর কপাল কুঁচকে গেল। তার নামে পার্সেল এসেছে মানে? সে তো কিছু অর্ডার করেনি। তাহলে? নিজের মনের ভেতর চলা প্রশ্নগুলোকে দমন করতে না পেরে ধীর কণ্ঠে বলল,

-“আমি-ই আলো রহমান রিক্তা। কিন্তু আমি তো এই বুকেটা অর্ডার করিনি।”

-“আপনার কোনো একজন শুভাকাঙ্ক্ষী সারপ্রাইজ গিফট দিয়েছে ম্যাম!”

আলো ঠোঁট কামড়ে ভাবতে লাগল তার আবার শুভাকাঙ্ক্ষী কে? বাবার বাড়িতে থাকলে সে পাক্কা জানতে পারত এটা তার বন্ধুমহলের কারোর কাজ। কারণ তারা মাঝেমধ্যেই হুটহাট কিছু না কিছু সারপ্রাইজ দিত। কিন্তু এখন তো সেটাও সম্ভব নয়! তার শশুর বাড়ির ঠিকানা এখনো বন্ধুমহলের কেউ-ই জানে না। তাহলে এই গিফটা কে পাঠাতে পারে? আলো ভালো করে ফুলগুলোর দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ চুপ থেকে পর মূহুর্তে মুচকি হাসলো। তার প্রিয় ফুল হচ্ছে দোলনচাঁপা! আর এইগুলোই আজ এসেছে। এটা নিশ্চয়ই তার পাগল বোনটার কাজ হবে। মেয়েটা কলেজ থেকে ফেরার পথে দোলনচাঁপা ফুল দেখলেই তার জন্য একটা হলেও নিয়ে আসবে। এমনটা ছোট বেলা থেকেই করে ছায়া! এখন হয়তো তারা দু'বোনে একে অপরের থেকে দূরে আসে, তবে তাদের ভালোবাসা আজও আগের মতোই রয়ে গেছে।

আলো আর কিছু না বলে হাসিমুখে ফুলের বুকেটা নিয়ে নিলো। সকাল সকাল সারপ্রাইজ গিফট ওরফে প্রিয় ফুল পেয়ে মূহুর্তেই মনটা ফুরফুরে হয়ে গেল। গতকাল রাতে মেয়েটার কথা রাখার জন্য হয়তো আজ এইগুলো পাঠিয়েছে বড় আপুকে খুশি করার জন্য। ডেলিভারি ম্যান চলে যেতেই আলো বুকেটা দু'হাতে ধরে রুমে নিয়ে গেল।

❝নতুন দিনের নতুন সকালের অনেক শুভেচ্ছা আমার ময়না পাখি। আশা করছি আজকের এই দিনটা আমার কাছে যতটা খুশির, ঠিক তারচেয়ে বেশী তোমার কাছেও। আফটার অল আজকের এই তারিখেই আমরা একে অপরের ভালোবাসায় আঁটকে ছিলাম। তুমি নিশ্চয়ই ভুলে যাওনি? আমি জানি, তুমি আজও আমাকে ততটাই মিস করো যতটা আগে করতে। কিন্তু তুমি এখন পরিস্থিতির স্বীকার! যাইহোক, হ্যাপি টু ইয়ার লাভ অ্যানিভার্সারি জান। তোমার এই দিনটা সুখের হোক। আই হোপ, আমার তরফ থেকে পাঠানো ছোট্ট গিফটা তোমার খুব পছন্দ হয়েছে!❞

রঙিন কাগজের মাঝে লেখা ছোট্ট চিরকুটটা পড়ে আধারের দুই ভ্রুয়ের মাঝে চারটে ভাজ পড়ল। সে তো গিয়েছিল দাদাজানকে নিয়ে আসতে। তাহমিনা খান আরো কিছুদিন থাকবেন উনার বাপের বাড়িতে। আধার যখন ফিরে এল, তখন দরজার চৌকাঠের কাছে পড়ে থাকা লাল পেপার দেখে থেমে যায়। কৌতূহল বশত ওটা হাতে তুলে নিয়ে ভাজ খুলে একবার নজর বুলিয়ে নেয়। তখনই উপরোক্ত বাক্যগুলো চোখের সামনে জ্বলজ্বল করে ওঠে।

-“কিসের কাগজ এইডা দাদুভাই?”

সোবহান খানের কথা শুনে আধার চিরকুটটা প্যান্টের পকেটে রেখে শান্ত গলায় বলল, -“তেমন কিছু না দাদাজান। তুমি এসো!”

সোবহান খান তেমন মাথা না ঘামিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলেন। আধার আশেপাশে না তাকিয়ে সোজা দোতলায় উঠে গেল। রুমে ঢুকতেই তার পা জোড়া শ্লথ হয়ে যায়।

আলো সোফায় বসে থেকে চোখ বুজে কোলে রাখা দোলনচাঁপার সুবাস নিচ্ছে প্রাণ ভরে। ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসির রেখাও উঁকি দিচ্ছে। মেয়েটা কিছুক্ষণ ফুলের মিষ্টি ঘ্রাণ নিয়ে আলতো করে চোখ মেলে তাকায়। মুচকি হেঁসে নরম হাতে ফুলগুলো ছুঁয়ে দিল। একটা ফুল নিজের কানের পাশেও গুঁজে রেখেছে। আলো একসময় খেয়াল করল আধার স্যার এসেছে। তাই সে উঠে কাছে গিয়ে দু'হাতে ফুলগুলো সামনে মেলিয়ে ধরে জানতে চাইল,

-“ফুলগুলো সুন্দর না স্যার?”

আধার ছোট্ট করে জবাব দিল, -“হু!”

আলো একগাল হেঁসে বলল, -“উমম...দেখতে হবে না কে পাঠিয়েছে।”

-“কে পাঠিয়েছে?”

-“স্পেশাল কেউ। বলব না আপনাকে।”

আলো মুখ ভেংচি কেটে সামনে থেকে সরে গেল। টি-টেবিলের ওপর ফুলদানিতে সুন্দর করে সাজিয়ে রাখল। আধার কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে চুপচাপ আলমারি খুলে নিজের পোশাক নিয়ে ওয়াশরুমে চলে যায়। আলো ফুরফুরে মনে চটজলদি সকালের নাস্তা তৈরি করে নিলো। ততক্ষণে শেফালি চাচিও চলে এসেছেন।

-“দাদুভাই? হঠাৎ করে না খেয়ে কোথায় যাচ্ছো? এসো আগে নাস্তা করে নাও।”

আধার স্যুটবুট পড়ে রেডি হয়ে বেরিয়ে যাচ্ছিল। তখন ডাইনিং টেবিল থেকে সোবহান খান নাতির উদ্দেশ্যে কথাগুলো বলে। আধার পিছনে ফিরে শান্ত গলায় বলল,

-“বাড়ির খাবার খেতে খেতে বোর হয়ে গেছি দাদাজান। এখব আর ইচ্ছে করে না খেতে। আমি বরং বাহিরে খেয়ে নিবো, তুমি চিন্তা করো না। এখন আসছি!”

নাতির কথা শুনে সোবহান খান থমথমে মুখে নাতবউয়ের দিকে তাকায়। মেয়েটা কেমন করে ফ্যালফ্যাল চোখে মানুষটার গম্ভীর মুখের দিকে চেয়ে আছে। হয়তো একটু আগের বলা অপ্রত্যাশিত বাক্যগুলো বোঝার চেষ্টা করছে।

-------------------------------------

আজ পুরো দিনটা অদ্ভুত কাটলো আলোর কাছে। তবে সে অত পাত্তা দিল না। মাঝরাতে হঠাৎ পেটের ব্যথায় ঘুম ভেঙে গেল মেয়েটার। চোখমুখ কুঁচকে পেট খামচে ধরে উঠে বসল। তার পাশেই আধার স্যার উদোম পিঠে উবুড় হয়ে বালিশের মাঝে মুখ গুঁজে পুরুষালী ভঙ্গিতে ঘুমাচ্ছে। আলো ঘুমু ঘুমু চোখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে ওয়াশরুমে চলে গেল। একটু পর বেরিয়ে এসে আলমারি খুলে কিছু একটা খুঁজতে লাগল। কিন্তু পেল না তার কাঙ্ক্ষিত জিনিসটা। আলো চিন্তিত হয়ে নিজের কপাল চেপে ধরল। ঘাড় ঘুরিয়ে দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে—আড়াইটা বাজে। এখন সে কি করবে? এইদিকে পেটের ব্যথাটা ক্রমশই বেড়ে চলেছে।

আলো ভাবল স্যারকে ডেকে তার সমস্যার কথা বলবে। কিন্তু পরক্ষণে আবার সিদ্ধান্তটা চেঞ্জ করে নিল। মানুষটাকে বলে কি হবে? এত রাতে কি সামান্য তার জন্য ফার্মেসীতে যাবে? উঁহু, মোটেও না। উল্টো দেখা যাবে এটা নিয়েও তাকে কথা শুনিয়ে দিয়েছে। তাই সে মুখে কুলুপ এঁটে থাকল। সময়ের সাথে সাথে আলোর অবস্থা খারাপ হয়। সে এই অসহনীয় পেটের ব্যথা একটুও সহ্য করতে পারে না। ফলস্বরূপ একহাতে পেট ও অন্য হাতে মুখ চেপে ধরে ওয়াশরুমের দরজার সামনেই হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। এবং নীরবে কেঁদে দিল।

ঘুমের ঘোরে মেয়েলি কণ্ঠে মৃদুস্বরে গোঙানির আওয়াজ পাওয়া মাত্রই চোখের ঘুম ছুটে গেল আধারের। সে তড়াক করে মাথা তুলে বামপাশে তাকায়৷ ড্রিম লাইটের আবছা আলোয় দেখা যাচ্ছে অদূরে বসে থাকা মেয়েটি কাঁদছে। আধার কপাল কুঁচকে উঠে গেল।

-“কাঁদছো কেন?”

স্যারের কণ্ঠস্বর শুনে আলো মাথা তুলে উপরে তাকায়। আধার দু'হাত বুকে ভাজ করে গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে আছে। আলো কান্না থামিয়ে নাক টেনে বলল,

-“প-পেট খুব ব্যথা করছে।”

আধার ভ্রু উঁচিয়ে জিজ্ঞেস করল, -“কেন?”

আলো মাথা নিচু করে নিল। আধার তীক্ষ্ণ চোখে মেয়েটাকে পর্যবেক্ষণ করে নেয়। তারপর কিছু একটা ভেবে তপ্ত শ্বাস ফেলে ধীর কণ্ঠে বলল, -“কী লাগবে বলো।”

-“প....প্যাড অর পেইন কিলার।”

আধার আর দাঁড়ায় না। বিছানা থেকে টিশার্ট নিয়ে সোজা রুম থেকে বেরিয়ে যায়। মনে মনে খুব করে চাইল এত রাতে যেন একটা হলেও ফার্মেসীর দোকান খোলা থাকে।

বেশ কিছুক্ষণ পর আধার ফিরে এল। আলোর সামনে জিনিসপত্র রেখে বলল, -“নাও।”

আলো সামনে তাকাতেই আহাম্মক বনে গেল। এই বেকুব লোকটা পুরো দোকানের প্যাড তুলে এনেছে। সে হা করে স্যারের দিকে তাকায়। মেয়েটাকে এইভাবে নিজের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে আধার চোখমুখ কুঁচকে বিরক্তিতে বলল, -“হোয়াট?”

-“এইগুলো কয়বছরের জন্য নিয়ে এসেছেন? আর আমি এতগুলো কি করব?”

-“আই ডোন্ট নো!”

বলেই আধার বড় বড় পা ফেলে রুম থেকে বেরিয়ে গেল। আলো কিছুক্ষণ থম মে'রে বসে থেকে ওয়াশরুমে চলে যায়।

-“এত রাতে স্যুপ কোথায় পেলেন স্যার?”

আলো ফ্রেশ হয়ে এসে বিছানায় আধশোয়া হয়ে বসে থেকে ব্যথা হজম করছিল। তখন খেয়াল করে আধার স্যার একটা ট্রে নিয়ে প্রবেশ করছে। পাশে থাকা টি-টেবিলের ওপর ট্রে রাখতেই দেখতে পেল, ধোঁয়া ওঠা গরম গরম চিকেন স্যুপ ও হট ব্যাগ। এটা দেখে বেশ অবাক হয়ে উপরোক্ত বাক্যটি জিজ্ঞেস করে। আধার সামনে বসতে বসতে জবাব দিল,

-“তোমার এক্স বয়ফ্রেন্ডের রেস্টুরেন্ট থেকে নিয়ে এসেছি।”

আলো সরু চোখে তাকায়। মনে মনে বিরবির করে বলল,

-“এক্স কেন? একটা যদি বয়ফ্রেন্ডের "ব" থাকত, তাহলে আপনার দেমাগ সহ্য না করে কবেই পালিয়ে যেতাম। বাট আফসোস! এই আমিটার কপালে আপনার মতো খট্টাশ, বদমাইশকেই জুটতে হলো। এখন না পারছি গিলতে আর না পারছি উগলে ফেলতে! পুরো জীবনটাই আমার লস্ট প্রজেক্ট।”

-“হা করো।”

স্যারের কথা শুনে আলো ড্যাবড্যাব করে চায়। মানুষটা তার

তলপেটে হট ব্যাগ রেখে মুখের সামনে চামুচে করে স্যুপ ধরে আছে।

-“ঔষধ খেতে যত লেট করবে, তত কষ্ট পাবে মিস. কালো।”

আলোর একটা প্রশ্ন জিজ্ঞেস করতে খুব ইচ্ছে করল—"আমার কষ্টে আপনার কী স্যার? আমি কে হই?”

তবে জিজ্ঞেস করতে পারল না। কারণ সেই অধিকার যে তার নেই। আলো কথা না বাড়িয়ে দু'হাতে হট ব্যাগ পেটে চেপে ধরে ভদ্র মেয়ের মতো স্বামীর হাতে স্যুপ খেয়ে নিল। পুরোটা শেষ করে একগাল হেঁসে বলল,

-“আপনার হাতের রান্না মাশাআল্লাহ স্যার।”

আধার কিছু না বলে মেয়েটাকে পেইন কিলার খাইয়ে দিল। তারপর সবকিছু গুছিয়ে রেখে রুমের আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়ল। অন্যদিকে বেচারি একা একা হাসফাস করতে লাগল। কারণ তার কিছুই ভালো লাগছে না। সবকিছু অসহ্য লাগছে। এই সময় নিজের বাড়িতে থাকলে সে এতক্ষণে মায়ের নয়তো বাবার বুকে মাথা রেখে নিশ্চিন্তে ঘুমাত। কিন্তু এখন সেটাও পারবে না। আলো কিছুক্ষণ ছটফটিয়ে স্যারের দিকে আড়চোখে তাকায়। লোকটা কী আরামে ঘুমাচ্ছে। অথচ সে ব্যথায় ম'রছে। হঠাৎই আলোর মাথায় একটা বুদ্ধি এল। সে মনে মনে হেঁসে চোখ বুজে কিছু সময় ঘুমিয়ে থাকার ভান করল। তারপর পাশে উল্টে গিয়ে সোজা স্যারের বুকে মাথা রেখে মটকা মে'রে পড়ে রইল।

ধীরে ধীরে অনেকটা সময় অতিবাহিত হয়ে যাওয়ার পরেও স্যারের কোনো রিয়াকশন না পেয়ে আলো শব্দ করে শ্বাস ছাড়ল। যাক বাবা, লোকটা ঘুমিয়ে গেছে। নাহলে তাকে দূরে ঠেলে দিত। আলো আনমনে হেঁসে স্যারের লোমহীন বুকের মাঝে একটু নাক ঘষাঘষি করল। এই মানুষটার শরীরের ঘ্রাণ মারাত্মক! সবসময় তাকে আকৃষ্ট করে এবং চুম্বকের মতো কাছে টানে। তাই তো ঘুমের ঘোরেও এই পঁচা বরটার সাথে লেপ্টে থাকে। এতে তার একটুও অস্বস্তি হয় না বরং ভালোই লাগে। যেগুলো জেগে থাকা অবস্থায় করতে পারে না, সেগুলো তার ঘুম করে দেয় হা হা হা।

আলো আজ একটু বেলা করেই ঘুম থেকে উঠলো। শরীর ভালো না থাকায় ভার্সিটিতে যাবে না ঠিক করল। ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে এসে বেলকনির দিকে পা বাড়ায়। আধার স্যার ভার্সিটির জন্য তৈরি হয়ে ওখানে দাঁড়িয়ে থেকে কারোর সাথে ফোনে কথা বলছে। সে মূলত রাতের জন্য ধন্যবাদ দিতে চায়। মানুষটা তার জন্য এতকিছু করল! অথচ সে বিনিময়ে কিছুই বলেনি। উনার তো এই ছোট্ট ধন্যবাদ-টা প্রাপ্য।

-“যতদ্রুত সম্ভব আপনি ডিভোর্স পেপার রেডি করুন। আমি এদিকের ব্যাপারটা ম্যানেজ করে নিবো।”

আধারের বলা বাক্যগুলো আলোর কর্ণধারে পৌঁছাতেই মস্তিষ্ক হঠাৎই থেমে গেল। সে অবিশ্বাস চোখে স্যারের পিঠের দিকে তাকিয়ে রইল। তারমানে মানুষটা তাকে ডিভোর্স দিতে চায়? কিন্তু কেন?

প্রশ্নটা নিজেকে জিজ্ঞেস করতেই থমকে গেল আলো৷ সে তো এটার উত্তর জানে! এই মানুষটা তাকে পছন্দ করে না, আর না ভালোবাসে। বিয়েও করতে চায়নি। তাহলে কেন এই অনাকাঙ্ক্ষিত সংসারের মাঝে থাকতে চাইবে? সেও তো ওই লোকটাকে একটুও পছন্দ করে না৷ প্রথম প্রথম ভেবেছিল ডিভোর্স দিবে নয়তো পালিয়ে যাবে৷ কিন্তু পরিবারের কথা ভেবে এমন করার দুঃসাহস হয়নি। তারপর....তারপর সে তো সবকিছুতে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছে। এই অনাকাঙ্ক্ষিত সংসারকে এক মূহুর্তের জন্য নিজের সংসার ভেবে বউয়ের দ্বায়িত্ব পালন করে এসেছে। অথচ বোকা মেয়ে! সে যেগুলোকে আঁকড়ে ধরতে চেয়েছে সেগুলো তো কোনো কালেই তার ছিল না। একদিন না একদিন এমনটা হওয়ারই কথা ছিল। তবুও তার স্যারের মুখে ডিভোর্সের কথা শুনে এত খারাপ লাগছে কেন? তার তো খুশি হওয়ার কথা ছিল! অথচ অজানা ব্যথায় বুকটা পুড়ছে তার।

আলো তাচ্ছিল্য হেঁসে ওখান থেকে সরে গেল। আড়ালে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে অস্ফুটস্বরে বলে উঠলো,

-“অবশেষে আমাদের বিনি সুতার সংসারটা এখানেই সমাপ্ত হলো! বেস্ট অফ লাক স্যার। আপনার আগামী দিনগুলো খুব সুন্দর হোক এবং আলোয় ভরে উঠুক। আর আমি-নামক এই অন্ধকারের কালো ছায়া চিরতরে মুছে যাক আপনার জীবনের পাতা থেকে!”

#চলবে

আসসালামু আলাইকুম। আপনারা অনেকেই জানেন আমার পরীক্ষা চলতেছে। তাই দেরি হয়ে গেল। আর কিছুদিন অনিয়মিত হবে। তারপর থেকে আবার আগের মতো নিয়মিত হওয়ার চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ। ততদিন না-হয় একটু কষ্ট করে ধৈর্য্য ধরে পড়ুন। হ্যাপি রিডিং🫶🫶

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১০ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন