(পর্ব নতুন করে সংশোধন করা হয়েছে)
*
*
*
সময়ের স্রোতের সাথে বয়ে চলেছে সবার জীবন। আজ রহিত ও মেঘলার মৃ ত্যুর একবছর পূর্ণ হলো। শুধু তিন দিনের তফাৎ। এমনই একটা সময়ে দুজন নর-নারী এ পৃথিবী ছেড়ে ওই দূর আকাশের বাসিন্দা হয়েছে। সময় কখনো থেমে থাকে না, আর না কারোর জীবন আঁটকে থাকে। সময়ের সাথে সাথে সবাই নিজ নিজ স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছে। তবে মনের গহীনে এখনো ছেলে-মেয়ে দুটো জীবিত আছে। হয়তো সারাজীবন থাকবে।
আজ দাদা-নাতি মিলে সেলুনে এসেছে। মূলত সোবহান খানই বড় নাতিকে টেনেটুনে নিয়ে এলেন। ছেলেটা দিন দিন অগোছালো হয়ে যাচ্ছে। চুল, দাঁড়ি বড় বড় হয়ে গেছে। অথচ ছেলেটার কাটার নাম নেই! আধার চুপচাপ ভদ্র ছেলের মতো চুল, দাঁড়ি কেটে নিল। আয়নায় নিজেকে দেখতে দেখতে দাদাজানের উদ্দেশ্যে বলল,
-“এখন শান্তি হয়েছে তোমার?”
সোবহান খান পাশের চেয়ারে বসে ছিলেন। নাতিকে দেখতে দেখতে বললেন,
-“মাত্র এক বছরেই নিজের এই হাল করেছো! আর বাকীগুলো বছরে কী করবে? তখন তো তোমাকে খুঁজেই পাওয়া যাবে না।”
-“খু্ঁজে না পেলে, হারিকেন দিয়ে খুঁজে নিও।”
-“তা আজও কী হাসপাতালে থাকবে?”
-“এর আগে বাড়িতে থেকেছি?”
-“হাসপাতালে থাকলে তুমি ঘুমাতে চাও না। নার্সরা আমাকে বলেছে, তুমি বেশিরভাগই রাত জেগে বসে থাকো।”
-“ঘুমাতে ভালো লাগে না, তাই ঘুমাই না।”
-“তোমার কষ্টটা বুঝতে পারছি, দাদুভাই! কিন্তু...তুমি যদি নিজের খেয়াল না রাখো, তাহলে কীভাবে চলবে বলো তো? নিজে অসুস্থ হয়ে পড়লে, নিজের বউয়ের সেবা করবে কীভাবে?”
-“ঠিক আছে, নিজের খেয়াল রাখার চেষ্টা করব। এখন জ্ঞান না দিয়ে চলো। তোমাকে বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে আমি আমার বউয়ের কাছে যাবো।”
-“বাড়িতে গিয়ে আগে গোসল করবে, খাওয়াদাওয়া করবে, তারপর বউয়ের কাছে যাবে। এর আগে নয়!”
আধার বিল পে করে, সেলুন থেকে বেরিয়ে আসতে আসতে বিরবির করে বলল,
-“আগে যখন বউয়ের কাছে যেতাম না, তখন আমাকে বলতে বউয়ের কাছে যেতে। আর এখন যখন বউয়ের কাছে যেতে চাচ্ছি, তখন এই বুড়ো তুমিটাই আমাকে বাঁধা দিচ্ছো। দিজ ইজ নট ফেয়ার, দাদাজান!”
সোবহান খান হেঁসে নাতির কাঁধ চাপড়িয়ে বললেন,
-“এইজন্যই বলে—সময় থাকতে প্রিয় মানুষটিকে মূল দিতে শেখো।”
আধার আর কিছু না বলে দাদাজানকে নিয়ে গাড়িতে উঠে পড়ল। গাড়ি স্টার্ট দিতে যাবে, তখনই তার নজরে এল একটা কসমেটিকের দোকান। যেখানে ছোট থেকে বড় অনেকগুলো পুতুল রয়েছে৷ সাথে আরো অনেক কিছু আছে।
-“একটু ওয়েট করো দাদাজান, আমি আসছি।”
আধার গাড়ি থেকে নেমে সোজা দোকানের ভেতর ঢুকে গেল। একটু সময় নিয়ে একটা পান্ডা, ডোরেমান, বাঁদর ও আকাশি রঙা একটা বড় পুতুল নিল। টাকা দিয়ে দোকান থেকে বেরিয়ে গাড়ির ব্যাক সিটের ওপর রেখে দিয়ে, ড্রাইভিং সিটে বসল।
-“এখনো বাপই হতে পারলে না, এর আগেই খেলনা নিতে শুরু করেছো?”
দাদাজানের কথা শুনে আধার ড্রাইভ করতে করতে বলল,
-“ওগুলো আমার বেবিদের জন্য নয়, আমার বউয়ের জন্য।”
দাদাজান মনে মনে হাসলেন। তারপর হেয়ালি কণ্ঠে বললেন,
-“আমি আবার কাকে কি বলছি? তুমি তো আগেই বলে দিয়েছো, আমাকে তোমার সন্তানদের মুখ দেখাবে না। আর না নিজে বাচ্চা পয়দা করবে! সারাজীবন এই সিঙ্গেলদের মতোই থাকো। শুধু শুধু মেয়েটাকে তোমার মতো নিরামিষের সাথে বিয়ে দিয়ে জীবনটা নষ্ট করেছি। আমার নাতবউ ফিরে এলে, তাকে সুন্দর দেখে একটা রাজপুত্রের সাথে বিয়ে দিবো। তখন তুমি থাইকো, দেবদাস হয়ে!”
আধারের কিছু একটা বলতে ইচ্ছে করছিল। কিন্তু বলল না! শুধু বিরবির করে এইটুকু বলল,
-“আমার বউকে সুস্থ হয়ে ফিরতে দাও। তারপর খান বাড়িতে বাচ্চা দিয়ে ভরিয়ে দিবো৷ তখন আমিও দেখব, তুমি এই বুইড়া বয়সে কত বাচ্চাদের পালতে পারো।”
সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। আধার বাড়ি থেকে গোসল নিয়ে হাসপাতালের উদ্দেশ্যে বেরিয়েছে। সোবহান খান খাবার খেতে বললেও সে খায়নি। কোনোমতে নিজেকে ঠিকঠাক করে বউয়ের কাছে ছুটেছে। সে প্রতিদিনই যাওয়ার পথে একগুচ্ছ করে হরেকরকমের ফুল নিয়ে যায়। আজও সেটার ব্যতিক্রম হলো না। সে ফুল হাতে নিয়ে কেবিনের দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করতেই থমকে গেল। কারণ আলোর চোখদুটো খোলা!
আধার ঠোঁট কামড়ে এলোমেলো পায়ে এগিয়ে এল। লেডি ডক্টর আলোকে চেক-আপ করছেন! আর নার্সকে কি যেন বলছেন। তাকে দেখে ভদ্রমহিলা মুচকি হেঁসে বললেন,
-“ফাইনালি আপনার ওয়াইফের জ্ঞান ফিরেছে। এখন উনার সুস্থ হওয়ার অপেক্ষায়।”
আধার এখনো একটা ঘোরের মধ্যে রয়েছে। সে বিশ্বাসই করতে পারছে না, তার আলো কোমা থেকে ফিরে এসেছে। সে কয়েকবার চোখের পল্লব ঝাপটিয়ে ফুলগুলো টি-টেবিলের ওপর রেখে বেডের পাশে বসল। আলোর একহাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,
-“অনুভব করতে পারছো আমায়?”
আলোর মুখে কথা নেই। সে শুধু তাকিয়ে আছে। আধার অধৈর্য্যের মতো ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করল,
-“ও কথা বলছে না কেন?”
-“রিল্যাক্স মিস্টার খান। আপনার ওয়াইফের জ্ঞান ফিরে এলেও উনি এখন পুরোপুরি সুস্থ নয়। কথা বলা থেকে শুরু করে নড়াচড়া, হাঁটাচলা সবকিছু করতে সময় লাগবে। এবং এটাও জানতে হবে উনার স্মৃতিশক্তি ঠিক আছে কি-না। তারজন্য সময় প্রয়োজন!”
ডাক্তারের বলা কথাগুলো আধার বুঝল। এবং মনে মনে খুব করে চাইল মেয়েটা যেন নিজের স্মৃতি ভুলে না যায়। নয়তো সে আরো ভেঙে পড়বে। ডাক্তার নার্সকে ঔষধের কিছু নাম বলে সেখান থেকে চলে যায়। কিছুক্ষণ পর নার্সও বেরিয়ে গেল। আধার আরো কাছে এগিয়ে এসে আলোর মলিন চেহারার ঠোঁট ছুঁয়ে দিয়ে বিরবির করে বলল,
-“জলদি সুস্থ হয়ে আমার কাছে ফিরে এসো জান। আমি আর এই দূরত্ব সইতে পারছি না!”
------------------------------------
কেটেছে আরো ছয় মাস! আলো কোমা থেকে ফিরে আসার পর পরিবারের সবাই স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়েন। এবং ওইদিন রাতেই সবাই মিলে মেয়েটাকে দেখতে এসেছিল। তারপর থেকে নানান চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে মেয়েটাকে শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ করার জন্য।
আলোকে হাসপাতাল থেকে রিলিজ দিয়ে একটি রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টারে পাঠানো হয়েছিল। সেখানে
বিশেষজ্ঞ ফিজিওথেরাপিস্টের অধীনে রেখে নিয়মিত ব্যায়াম পেশির শক্তি ও ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করা হয়েছে। এবং অকুপেশনাল থেরাপি, স্পিচ থেরাপিও দেওয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে ধৈর্য ও পুষ্টির দরকার ছিল! যা সম্পূর্ণভাবে আলোকে দিয়ে সুস্থ করা হয়েছে। সে আপাতত এখন মোটামুটি সুস্থ। তবে কোমা থেকে বেরোনোর পর স্মৃতিশক্তি হারায়নি মেয়েটা।
আধার ভার্সিটি শেষে সন্ধ্যার দিকে রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টারে আসে। এবং এখানে এসে জানতে পারে আলোকে নিয়ে তার পরিবার চলে গিয়েছে। এটা শোনার পর কিছুক্ষণের জন্য স্তব্ধ হয়ে যায়। সে অনেক আগে থেকেই খেয়াল করেছিল, মেয়েটা আজকাল তার কাছে থাকতে চায় না। সবসময় দূরত্ব বজায় রেখে চলে। আলো অসুস্থ হওয়ায় সে কোনোরকম চাপ দেয়নি, বরং মেয়েটা যেভাবে থাকতে চেয়েছে সে ওইভাবেই থাকতে দিয়েছে। নিজের কষ্ট হলেও একটু বুঝতে দেয়নি। মনকে কোনোমতে বুঝিয়ে সুঝিয়ে শান্ত করে রেখেছে। সে এসব ভেবে আড়ালে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বেরিয়ে যেতেই নার্স বলে উঠল,
একটু থেমে মুচকি হেঁসে পুনরায় বলল,
-“ম্যাম অনেক ভাগ্যবতী, আপনাকে নিজের জীবনসঙ্গী হিসেবে পেয়ে। আপনি যতটা কষ্ট করেছেন, তেমন কষ্ট হয়তো আর কেউ করতে পারত না। আপনি সত্যিই একজন বেস্ট হাসব্যান্ড! দোয়া করি, আপনারা সারাজীবন এইভাবেই একে অপরের পাশে থাকুন।”
আধার দাঁড়ায় না। রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে আনমনে বলে উঠল,
-“আপনি ভুল! আমি বেস্ট হাসব্যান্ড নই। আমি খুব, খুউউব খারাপ হাসব্যান্ড। যাকে কখনোই ভালোবাসা যায় না, বরং দূরে সরে যাওয়ার চেষ্টা করে। ঠিক আজ যেমনটা হয়েছে।”
এতদিন পর নিজ বাড়িতে ফিরে আলো কিছুক্ষণের জন্য স্তব্ধ হয়ে ছিল। তার জীবন থেকে যে এইভাবে দেড় বছর চলে যাবে, সেটা কখনোই কল্পনাও করেনি। সাথে এটাও ভাবতে পারেনি, তাদের মাঝে আর রহিত, মেঘলা নেই।
বাড়িতে পা রাখতে না রাখতেই আলোর সর্বপ্রথম চোখ যায় বাগানে থাকা দুটো কবরের দিকে৷ এবং মূহুর্তেই ছুটে এসে কবর জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে। এমনটা কেন হলো? এমন হওয়ার তো কথা ছিল না? তাদের দুজনের তো সুখে, শান্তিতে সংসার করার কথা ছিল! তাহলে কেন আজ তারা এইভাবে দূর আকাশে পালিয়ে গেল? তার মতোই না-হয় কোমায় যেত, তবুও কেন তাদেরকে ছেড়ে সারাজীবনের জন্য চলে গেল? তাদের ভালোবাসা পূর্ণতা পেয়েও অপূর্ণই রয়ে গেল! মেয়েটার কত স্বপ্ন ছিল, প্রিয় মানুষটির সাথে ছোট্ট একটা সংসার করার। অথচ তাদের নিয়তি অন্য কিছুই ছিল। তাদের দুজনের পথচলা এতটুকুতেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেল।
কাঁদতে কাঁদতে আলোর শরীর খারাপ হয়ে যায়। সে অতিরিক্ত মানসিক চাপ নিতে না পেরে জ্ঞান হারিয়ে ফেললো ওখানেই। এতে সবাই ভীষণ ভয় পেয়ে যায়, তড়িঘড়ি করে মেয়েটাকে ভেতরে নিয়ে গিয়ে মতিউর রহমান ডাক্তারকে কল দেন। তারপর ডাক্তার এসে চেক-আপ করে একটা ইনজেকশন ও স্যালাইন দিয়ে যান।
আলোর জ্ঞান ফিরে আসার পর নিজের পেটের ওপর দুটো খরগোশকে দেখে চমকে ওঠে। ভালো করে তাকিয়ে দেখে, এরা আর কেউ নয়! বরং তারই টুনা, টুনি। আলোর চোখদুটো ছলছল করে উঠল। সে কোনমতে উঠে বসে একহাতে জড়িয়ে ধরে আদর করে দেয়। এতদিনে অনেকটাই বড় হয়ে গেছে, সাথে গোলুমোলুও!
-“এরা এখানে কীভাবে এল?”
আলো ছোট বোনের উদ্দেশ্যে জিজ্ঞেস করল। ছায়া ধীর কণ্ঠে বলল,
-“তোমার শশুর বাড়িতে তো এদেরকে দেখার মতো কেউ নেই। দুলাভাই সারাদিন ভার্সিটিতে থাকে এবং সন্ধ্যা হলে তোমার কাছে যেত, তারপর ওখানেই সারারাত থাকত। তাই তোমার শখের জিনিসগুলোর দেখাশোনা করার জন্য আমাকে দেয়। কারণ উনি চাননি, তোমার প্রিয় জিনিসের কিছু হোক। এদেরকে আমি দেখলেও সব খরচ তোমার বরই দিয়েছে। সাথে আমারগুলোর জন্যও!”
আলো কিছু বলল না। ছায়া বিছানায় হামাগুড়ি দিয়ে উঠে এসে আপুকে জড়িয়ে ধরে বুকের মাঝে মুখ গুঁজে, কান্নারত কণ্ঠে বলল,
-“তোমাকে খুব মিস করেছি আপু। খুউউউব!”
আলোর চোখদুটো ছলছল করে উঠল। সে বোনকে জড়িয়ে ধরে আদর করে দিল। তখন খেয়াল করল, দরজায় মায়া দাঁড়িয়ে আছে। আলো হেঁসে একহাত বাড়িয়ে ধরে, কাছে আসতে ইশারা করল। মায়া ছুটে এসে বোনের বুকের মাঝে ঝাপিয়ে পড়ল। আলো দুজনের মাথায় চুমু খেয়ে ধীর কণ্ঠে বলল,
-“কষ্ট পাস না বোন আমার। ভাইয়া, আপু যেখানেই থাক, তারা ভালো আছে। আর আমাদেরকে ওই দূর আকাশ থেকে দেখছে। তোরা যদি কষ্টে থাকিস, তাহলে তারাও কষ্ট পাবে। আমরা এই দুনিয়ায় কেউই চিরস্থায়ী নই! আজ হোক বা কাল, আমাদের সবাইকেই ওই আকাশের বুকে যেতে হবে। শুধু আগে আর পরে!”
🌸
আলোর মনটা ভালো নেই। সে হালকাপাতলা খাবার খেয়ে বাগানে এসে বসেছে। পশ্চিমের দিকে সূর্যটা হেলে পড়েছে। হয়তো আর কিছুক্ষণের মধ্যেই আঁধার নেমে আসবে। মেয়েটা অপলক নয়নে দুটো পাশাপাশি থাকা কবরের দিকে তাকিয়ে আছে। ঠিক তখনই খেয়াল করল, গেইট দিয়ে একটা গাড়ি প্রবেশ করছে। গাড়িটা চিনতে একটুও অসুবিধা হলো না আলোর।
আধার গাড়ি থেকে নেমে সোজা আলোর কাছে এসে পাশে বসল। তবুও মেয়েটা কিছু বলল না। তাদের মাঝের নীরবতা ভেঙে একসময় আধারই বলে উঠল,
-“আমাকে না বলে এখানে আসার কারণ?”
-“ইচ্ছে করছিল, তাই এসেছি।”
-“ঠিক আছে, এখন চলো। আমি তোমাকে নিতে এসেছি।”
-“এখানে থাকব কিছুদিন।”
-“আপনি বড়োই নিষ্ঠুর, মিসেস খান! এতগুলো মাস জ্বালিয়েও আপনার শান্তি হয়নি।”
আলো কিছু না বলে দোনলা থেকে নেমে যাওয়ার সময় অনুভব করল, লোকটা তার বিনুনি চেপে ধরেছে। একই সাথে একটি বাক্য শুনতে পেল,
-“জান....?”
আলোর হৃদয় থমকালো! সে ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে তাকাতেই আধার চোখে চোখ রেখে বলে উঠল,
-“এবার যদি আমাকে ছেড়ে যাওয়ার একটুও চেষ্টা করো, তাহলে আই সোয়ার মিসেস খান! আমি ম'রে যাবো!”
আলো নিজেকে আর ধরে রাখতে পারল না। মূহুর্তেই ছুটে এসে স্বামীর বুকের মাঝে ঝাপিয়ে পড়ল এবং দু'হাতে জড়িয়ে ধরে গলায় মুখ গুঁজে ফুপিয়ে কেঁদে উঠল। আধার যেন এতক্ষণ এটারই অপেক্ষায় ছিল। সে নিজেও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল প্রিয়তমাকে। গলায় মুখ ডুবিয়ে প্রাণভরে শ্বাস নেওয়ার সময় শুনতে পেল,
-“স...সরি! আমি আপনাকে ইচ্ছে করে কষ্ট দিতে চাইনি। এই আমার জন্য আপনি এতগুলো দিন অনেক কষ্ট করেছেন। তাই আপনাকে আর কষ্ট দিতে চাইনি!”
-“হুঁশশশ....আমার একটুও কষ্ট হয়নি। আর নিজের বউয়ের সেবা করতে কিসের কষ্ট হুহ্?”
আলো কিছু না বলল না। সে আসলে দ্বিধায় পড়ে গেছিল, কি করবে না করবে। কোনোকিছু খুঁজে পাচ্ছিল না। মন এক কথা বলছিল ও ব্রেন এক কথা বলছিল। তাই তো সে ইচ্ছে করেই দূরত্ব বাড়িয়েছিল। কিন্তু....মানুষটার কাছে সে আবারো হেরে গেল। পারল না নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখতে। এসব আকাশ পাতাল ভাবার সময় অনুভব করল লোকটা তাকে পাঁজা কোলে তুলে নিয়ে গাড়ির ভেতর এসেছে। ব্যাক সিটে বসে আধার ডোর লাগিয়ে আলোর উদ্দেশ্যে বলল,
-“তুমি চাইলে এখন আমার সব কষ্ট মূহুর্তেই দূর করতে পারো।”
আলো কান্না থামিয়ে চোখমুখ মুছে, মাথা সোজা করে জানতে চাইল,
-“কীভাবে?”
আধার বৃদ্ধা আঙুল দিয়ে আলোর ঠোঁট ছুঁয়ে অস্ফুটস্বরে বলল,
-“তোমার বেয়াদব ঠোঁট জোড়া দিয়ে আমাকে ছুঁয়ে।”
আলো হাসল। অতঃপর এগিয়ে এসে স্বামীর পুরো চেহারায় ঠোঁট ছুঁয়ে দিল। ঠোঁটে চুমু খেয়ে সরে আসতে চাইলে, অনুভব করল লোকটা তার ঠোঁট জোড়া নিজের দখলে নিয়ে নিয়েছে৷ আলোর চোখদুটো বিস্ময়ে বড় বড় হয়ে যায়। সে ছটফট করলে, আধার একহাতে তার ঘাড় ও অন্য হাতে কোমর চেপে ধরে ঘনিষ্ঠ করে সফটলি চুম্বন করতে থাকল। আলো বাঙের মতো তিড়িংবিড়িং করতে করতে একসময় হাল ছেড়ে দিয়ে চুপ হয়ে গেল এবং আবেশে চোখদুটো বুঁজে নিয়ে মানুষটার মাথার পিছনের চুলগুলো শক্ত করে খামচে ধরল।
দীর্ঘ এক চুম্বনের পর আধার ঠোঁট ছেড়ে দিয়ে কপালে কপাল ঠেকিয়ে জোরে জোরে শ্বাসপ্রশ্বাস নিতে থাকল। আলো তো নাকমুখ দিয়ে নিশ্বাস নিচ্ছে! তার মনে হচ্ছিল, এই বুঝি এক্ষুনি দমটা আঁটকে যাবে। বেশ কিছুক্ষণ পর নিজেকে সামলিয়ে নিয়ে আলো কিছু বলার জন্য মুখ খুলতে যাবে, তখনই আধার আবারো রক্তিম ঠোঁটের মাঝে হামলে পড়ল। এবার আলো কিল-ঘুষি যা যা পারছে, সবকিছু মা'রতে মা'রতে লোকটাকে সরানোর চেষ্টা করল। কিন্তু আধার উল্টো তার হাতদুটো ধরে পিছনে নিয়ে গিয়ে
আলতো করে চেপে ধরল। এবং হুঁশ জ্ঞান হারিয়ে ঠোঁটের মাঝে মত্ত হলো।
আলো যখন অনুভব করল, অসভ্য লোকটা তার জামার জিপার খুলে ফেলেছে, তখন চমকে উঠে ঠোঁটে কামড় বসিয়ে দিল৷ আধার বিরক্তিতে ঠোঁট ছেড়ে জিজ্ঞেস করল,
-“কী সমস্যা? এইভাবে ইঁদুরের মতো কামড়াকামড়ি করছো কেন?”
আলো ঠোঁট মুছে জোরে জোরে শ্বাস নিতে নিতে হিসহিসিয়ে বলল,
-“আ...আপনি! আপনি আমার জামার জিপার খুলছেন কেন?”
-“তোমাকে আদর করব তাই।”
একথা শুনে আলো আঁতকে উঠে তড়িঘড়ি করে বলল,
-“আপনার অসভ্য আদর চাই না! আমাকে ছাড়ুন।”
আলো ছটফট করতে করতে কোল থেকে নামতে চাইল। সে এগুলোর জন্য এখন মোটেও প্রস্তুত নয়! আর এই অসভ্য লোকটার মতিগতিও ভালো লাগছে না। নিশ্চয়ই নেশা-টেশা করে এসেছে।
আধার আলোর দু'হাত নিজের কাঁধের ওপর তুলে দিয়ে, গ্রীবাদেশে মুখ ডুবিয়ে চুমু খেতে খেতে ফিসফিসিয়ে বলল,
-“একটু....একটু আদর করব। প্লিজ জান, বাঁধা দিও না!”
বাঁধা দেওয়া মানে? লজ্জা, ভয়ে, আতঙ্কে এবং অতিরিক্ত টেনশনে মূহুর্তেই জ্ঞান হারিয়ে ফেললো আলো। সঙ্গে সঙ্গে আধারের মুডের বারোটা বেজে গেল। সে থমথমে মুখে অচেতন মেয়েটার লালচে চেহারার দিকে তাকিয়ে থেকে অস্ফুটস্বরে বলে উঠল,
-“এ কোন পাগলের পাল্লায় পড়লাম রে বাবা!”
#চলবে
নোট: আগের পর্বে কিছু কাহিনী ভুল ছিল। আমি সেটা এই পর্বে ঠিক করে দিয়েছি। আমি খেয়াল রাখব, এমন ভুল যেন আর দ্বিতীয় বার রিপিট না হয়। এবং আমার গল্প সাজিয়ে গুছিয়ে লেখার জন্য সময় দিতে হবে। আমি আর তাড়াহুড়ো করে গল্প লিখতে পারব না, সামনে আমার পরীক্ষা। তাই আমার সময়ের প্রয়োজন। আশা করছি আমার দিকটাও আপনারা বুঝবেন। আর হ্যাঁ, এই পর্বে রেসপন্স করবেন প্লিজ। আগামীকাল নতুন পর্ব দেওয়ার চেষ্টা করব।❤️
আপনাদের প্রিয় জুটিদের নিয়ে পড়ুন এক ভিন্ন রোমান্টিক গল্প! এবং আধার স্যার নতুন রূপে। যেখানে সব চরিত্র আছে আর সবকিছু হ্যাপি, হ্যাপি।🫶
গল্পটি পড়ুন বইটই এ—
❤️🔥ই-বই "আঁধার আলো"
https://link.boitoi.com.bd/cZBak