ফন্ট সাইজ:
থিম:
এক মুঠো চাঁদের আলো

৪৭তম পর্ব

লেখক: নুসরাত ফারিয়া

রাতের শহরের দৃশ্য অদ্ভুত সুন্দর ও মোহনীয়। ব্যস্ত রাস্তার দু'ধারে ল্যাম্প পোস্টের আলোয় সবকিছু পরিষ্কার ও রঙিন। ফুটপাতে হরেকরকমের খাবারের দোকান বসেছে। ভাজাপোড়া দোকানে একটু বেশিই ভিড়! সেই ভিড়ের মাঝ থেকে রাত বেরিয়ে এল। হাতে প্লেট, আর প্লেট ভরতি মাশরুম চপ, শিক কাবাব, ফিস ফ্রাই সহ আরো অনেক কিছুই রয়েছে।

ঈশিতা বাইকের সাথে হেলান দিয়ে ছেলেটার কর্মকাণ্ড দেখছিল। তার মনে হয় না, এর আগে কখনো রাস্তার পাশে ভিড় ঠেলেঠুলে কিছু নিয়েছে রাত। ছেলেটা হয়তো এর আশেপাশেও আসেনি, কিন্তু এখন তার জন্য মাঝেমধ্যেই মাঝপথে বাইক থামিয়ে আড্ডা দেয় ও এসব খায়। আজও সেটার ব্যতিক্রম হলো না।

-“নিন, ম্যাম! আপনার ফাস্টফুড।”

ঈশিতা মুচকি হেঁসে প্লেট নিয়ে বলল, -“থ্যাংঙ্কিউউ।”

রাত হেঁসে মেয়েটার পাশে বাইকের সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়াল। ঈশিতা কাবাব খেতে খেতে জিজ্ঞেস করল,

-“তুমি খাবে না?”

-“উঁহু!”

-“কেন?”

-“এইগুলো খেতে ভালো লাগে না।”

-“তাহলে কি খাবে?”

রাত ঘাড় কাত করে মেয়েটার ঠোঁটের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, -“আমি আজ পর্যন্ত কাউকে কিস করিনি।”

-“কেন?”

-“ইচ্ছে করেনি কখনো।”

-“বিয়ের পর বউকে চুমু খেও। এখন চপ খাও!”

বলেই ঈশিতা মাশরুমের চপ রাতের মুখের সামনে ধরল। রাত চুপচাপ মাথা নিচু করে মুখে তুলে নিল। হাতে নরম ঠোঁটের স্পর্শ পেয়ে ঈশিতা কিছুক্ষণ থম মে'রে থাকল। তার শরীরে অদ্ভুত শিহরন বয়ে গেল। সে আশেপাশে তাকিয়ে কয়েকবার চোখের পল্লব ঝাপটিয়ে নিল। অজানা অনুভূতিকে দমিয়ে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলল,

-“বাড়ি যাবো।”

রাতের কপাল কুঁচকে গেল।

-“এত তাড়াতাড়ি?”

-“হুম।”

-“শরীর খারাপ লাগছে? ডক্টরের কাছে নিয়ে যাবো?”

ঈশিতা হঠাৎই রেগেমেগে চিল্লিয়ে উঠল,

-“না, আমার কিচ্ছু হয়নি! কিন্তু তোমার সাথে থাকতে ভালো লাগছে না আমার। আমি বিরক্ত তোমার প্যাচাল পারাতে। এখন কেন জানি মনে হচ্ছে, তোমার সাথে বন্ধুত্ব করাটাই সবথেকে বড় ভুল হয়েছে আমার। কারণ তুমি একটা বাজে ছেলে!”

আশেপাশের সবাই তাদের দিকে তাকায়। রাত মেয়েটার রাগান্বিত চেহারার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে, চুপচাপ বিল মিটিয়ে একটা রিকশা ডাকল। তারপর ভাড়া দিয়ে মেয়েটাকে নিয়ে যেতে বলে, সে বাইক নিয়ে চলে গেল। আর ঈশিতা হতভম্বের মতো শুধু চেয়ে চেয়ে দেখল। আচ্ছা, লোকটা কি রাগ করল?

★

রাত বাজে বারোটা! খান বাড়ির ড্রয়িংরুমের পিনপতন নীরবতা ভাঙল, এক জোরালো পদাঘাতের শব্দে। নেশায় বুদ হয়ে, এলোমেলো পায়ে টলতে টলতে ভেতরে প্রবেশ করল—আবরার খান রাত। ডান হাতে একখানা মদের বোতল ও বামহাতে অফিসব্যাগ! শরীর থেকে কোট খুলে ছুঁড়ে মা'রল একদিকে। আধখাওয়া বোতলে চুমুক দিতে দিতে তার রক্তিম চোখের দৃষ্টি গিয়ে পড়ে সিঁড়ির ওপর। ওখানে মেয়েটা পানির জগ হাতে থম মে'রে দাঁড়িয়ে আছে।

আলো জানত, রাত আগে নেশা করত। কিন্তু কখনো সে এমন মাতাল অবস্থায় দেখেনি। সবসময় পরিপাটি, গুছিয়ে থাকা যুবককে আজ দেখতে ছন্নছাড়া লাগছে। মেরুন রাখা ইন করা শার্ট কুঁচকে, ভিজে, এলোমেলো হয়ে আছে। বুকের কাছে তিনটে বোতাম খোলা, মাথার বড় বড় চুলগুলো কপালের চারদিকে লেপ্টে আছে। দেখে কোনো পাগলের থেকে কম লাগছে না। ওই র'ক্তবর্ণ তীক্ষ্ণ চোখে চোখ পড়তেই আলো ভয়ে শুকনো ঢোক গিললো। ছেলেটা তার সাথে কখনো খারাপ ব্যবহার করেনি, আর না বাজে নজরে তাকিয়েছে। তবুও স্বামীর বলা কথাগুলো শুনে সে মনে মনে রাতকে ভয় পায়। তাই তো ছেলেটাকে এই অবস্থায় দেখে পিছনে ঘুরে দৌড় দিতেই শুনতে পেল,

-“আমি খুব খারাপ, তাই না বোম্বাই মরিচ?”

আলো থেমে গিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,

-“ভালো মানুষরা কখনো নেশা করে না।”

রাত হেলতে দুলতে হাতের কাঁচের বোতলটা টেবিলের ওপর রেখে, সোফার সাথে হেলান দিয়ে মেঝেতে হাত-পা ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসল।

-“ছেড়ে দিয়েছিলাম, সবকিছু ছেড়ে দিয়েছিলাম।”

-“তাহলে আবার কেন এমন করছেন?”

রাত দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে নিজের বুকের মাঝে হাত রেখে অস্ফুটস্বরে বলল, -“এখানে খুব ব্যথা হচ্ছিল তাই।”

বিষয়টা অন্যরকম লাগল আলোর কাছে। সে একবুক সাহস নিয়ে আস্তেধীরে নেমে এসে রাতের সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়াল।

-“কেন ব্যথা করছে? আপনার ভাইয়াকে ডাকব?”

রাত দুইদিকে মাথা নাড়িয়ে বলল, -“উঁহু, এই ব্যথার চিকিৎসা ভাইয়ের কাছে নেই।”

একটু থেমে রমণীর চোখে চোখ রেখে জানতে চাইল,

-“আমি কি খুবই খারাপ?”

-“আমি আপনার বিষয়ে যতটুকু জেনেছি তাতে বোঝা যায় আপনি প্লেবয় ছিলেন! কিন্তু...জোর করে তো কিছু করেননি, আর না কোনো মেয়েকে ধোঁকা দিয়েছেন। আপনি বিদেশে থাকাকালীন এসব করেছেন। আর ওখানে এইগুলো খুবই নরমাল ব্যাপার! তবে এখানে আপনারাও দোষ আছে। আপনি খোলা খাবারে মুখ না দিয়ে নিজের জীবনে ফোকাস করতেন! আপনার সাথে তো আপনার ভাইয়াও ছিল। কই, উনার তো এমন ব্যাড রিপোর্ট নেই! আপনাদের শরীরে একই বংশের র'ক্ত বইছে, কিন্তু দু'জনের মধ্যে আকাশপাতাল তফাৎ।

আপনি অতীত ভুলে নিজেকে শুধরে নেওয়ার চেষ্টা করছেন, এমনকি ভালো পথেও চলে এসেছেন। আর এটাই বা ক'জন পুরুষ করে? আপনি জানেন? আপনার এই পরিবর্তনে আপনার ভাই কতটা খুশি হয়েছে? উনি প্রায়শই বলেন, 'আমার ছোট ভাই ভালো হয়ে গেছে'! তাহলে এখন বুঝুন, আপনি খারাপ নাকি ভালো। অতীত কমবেশি সবারই থাকে। সবকিছু ভুলে, নিজেকে শুধরে নিয়ে ভালোর পথে এসেছেন। এটাই অনেক ভাইয়া!”

মেয়েটার কথাগুলো শুনল রাত। বিপরীতে শুধু বলল,

-“আমাদের শরীরে একই র'ক্ত হলেও শিক্ষা আলাদা। ছোট বেলা থেকে অন্যের টাকা-পয়সা কীভাবে উড়াতে হয়, সেটাই শিখে এসেছি। আমি আমার ভাইয়াকে একটুআধটু ঈর্ষা করতাম। আমাকে এমনভাবেই শিক্ষা দেওয়া হয়েছিল, যেখানে নিজের স্বার্থ ছাড়া আর কিছুই বুঝতাম না। বাট...আমি নিজের ভুল বুঝতে পেরেছি। আই রিয়েলি চেঞ্জড মাই ব্যাড হ্যাবিটস!”

আলো আড়ালে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। জীবনে ভালো মানুষ হতে গেলে সর্বপ্রথম সুশিক্ষার প্রয়োজন। নয়তো এমন স্বার্থপরই তৈরি হবে ব্যক্তি!

-“আ...আপনি হাজার চেষ্টা করেও একজনের চোখে ভালো হতে পারলাম না, বোম্বাই মরিচ! পারলাম না...।”

বিরবির করতে করতে রাত ঘুমে ঢলে পড়ল। আলো পানির জগ রেখে রাতের কাছে আসতে চাইলে, টের পেল সিঁড়ি বেয়ে কেউ নামছে। মেয়েটা চকিতে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়। স্বামীকে গম্ভীর মুখে আসতে দেখে আলো সরে যায়।

-“তুমি এখানে?”

-“পা...পানি নিতে এসেছিলাম।”

আধার আর কিছু না বলে রাতকে পর্যবেক্ষণ করে নিয়ে কাছে এল। ছোট ভাইকে ধরে সাবধানে দোতলায় নিয়ে যেতে লাগল। আলো সেদিকে একপলক তাকিয়ে জগ নিয়ে রান্নাঘরের দিকে চলে গেল।

রাতকে রুমে নিয়ে এসে বিছানায় শুয়ে দিল। পরনের শার্ট, পায়ের বুট, মোজা খুলে দিয়ে গায়ে চাদর টেনে দিল। এসি অন করে, ড্রিম লাইট জ্বা'লিয়ে দেয়। আধার কপাল কুঁচকে ভাইয়ের লালচে চেহারার দিকে তাকিয়ে থেকে আনমনে আওরাল,

-“কিছু তো একটা হয়েছে...!”

পড়ন্ত দুপুর বেলায়, রোদ্দুর মাঝে বাস স্ট্যান্ডে বিরক্তিতে চোখমুখ কুঁচকে দাঁড়িয়ে আছে ছায়া। পরনে নীল টপস ও সাদা স্কার্ট! রোদের কারণে উজ্জ্বল শ্যাম বর্ণের মুখটা রক্তিম হয়ে উঠেছে। বারবার ওড়না দিয়ে কপালের ঘাম মুছছে। পাঁচ মিনিট দেরি করে আসার ফলে বাস মিস করেছে। পরবর্তী বাস কখন আসবে, সেটাও জানে না। মেয়েটা বিরক্তে হাত ঘড়ির দিকে তাকায়। দুটো বেজে যাচ্ছে, অথচ সে রোদে মধ্যে দাঁড়িয়ে থেকে কাইল্লা ভুত হচ্ছে। ছায়া আর কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে সামনের পথ ধরে হাঁটতে শুরু করল। কোনো রিকশা বা অটোতে করে যাবে।

ছায়া রাস্তা পার হওয়ার সময় খেয়াল করল, তার সামনে এসে একটা কার থেমেছে৷ ভরদুপুর বেলা এমন নির্জন পথে কালো রঙের গাড়ি দেখে, মেয়েটা ভয় পেয়ে পিছিয়ে যায়। ছোটবেলায় শুনেছে, এমন কালো গাড়িতে করেই বাচ্চাদের ধরে নিয়ে যায় রাস্তা থেকে। কিন্তু, সে তো বাচ্চা নয় তাহলে? আরে ধুর, সে এসব কি ভাবছে? বাচ্চা না হলেও তো একটা মেয়ে! আর আজকাল মেয়েরা কোথাও নিরাপত্তা নয়।

মেয়েটার আকাশপাতাল ভাবনার মাঝেই ডোরের কাঁচ নেমে গেল। ছায়া কাঁধে ঝুলানো ব্যাগ চেপে ধরে দৌড় দিতে চেয়েও কিছু একটা খেয়াল করে দিল না৷ বরংচ চোখদুটো বড়বড় করে বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল যুবকের পানে।

-“কোথায় যাচ্ছেন, মিস?”

রাস্তার মধ্যে মানুষটার দেখা পাওয়া অপ্রত্যাশিত ছিল ছায়ার। সে চোখের পল্লব ঝাপটিয়ে ধীর কণ্ঠে বলল,

-“ব...বাড়িতে।”

-“পায়ে হেঁটে হেঁটে?”

-“তাহলে কি উড়ে উড়ে যাবো?”

মৃন্ময় হেঁসে বলল, -“গাড়িতে উঠুন, আমি আপনাকে পৌঁছে দিচ্ছি।”

-“আপনার সময়ের মূল অনেক। অহেতুক আমার জন্য সেটা নষ্ট করেন না।”

-“বন্ধুর শালী সাহেবার জন্য এইটুকু করায় যায়। আর আমরা এখন বেয়াই, বেয়াইন! সো...কাম।”

একথা বলে মৃন্ময় নিজেই পাশের ডোর খুলে দিল। ছায়া আর আপত্তি করল না। চুপচাপ উঠে বসল। মেয়েটা সিট বেল্ট লাগিয়ে নিতেই মৃন্ময় গাড়ি স্টার্ট দিল এবং ঠিকানা জিজ্ঞেস করল।

ছায়া গুটিশুটি হয়ে বসে থেকে, ক্ষণে ক্ষণে আড়চোখে পাশে বসে থাকা সুদর্শন যুবকের দিকে তাকাচ্ছে৷ লোকটা ঠোঁট কামড়ে একহাতে মনোযোগ সহকারে ড্রাইভ করছে।

ধীরে ধীরে সময় অতিবাহিত হয়ে যায়। কাঙ্ক্ষিত স্থানে এসে মৃন্ময়ের গাড়ি থামে এবং ছায়া ধন্যবাদ দিয়ে নেমে পড়ল। মেয়েটা চলে যেতে চাইলে মৃন্ময় পিছন থেকে ডেকে ওঠে।

ছায়া ফিরে এলে, মৃন্ময় একটা কার্ড বাড়িয়ে দিল। সেটা দেখে জিজ্ঞেস করল,

-“এটা কিসের কার্ড?”

-“আমার বিয়ের।”

ছায়া চমকে উঠল।

-“কীহহহহ.....!”

মৃন্ময় মেয়েটার রিয়াকশন দেখে নিঃশব্দে হেঁসে বলল,

-“রিলাক্স, মিস! আই'ম জাস্ট কিডিং।”

তবুও ছায়া স্বস্তি পেল না। ও চট করে কার্ড নিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল। মৃন্ময় একহাতে মাথার চুলগুলো ব্যাকব্রাশ করতে করতে বলল,

-“সামনে আমার একটা অনুষ্ঠান রয়েছে। উমম...বলতে পারেন সকল ভক্তদের সাথে দেখা করব, অটোগ্রাফ দিবো। ওইদিন আপনার আপুর বলা কথাগুলো শুনে সিদ্ধান্ত নিই, সবার সাথে মিট করব। আপনাকে আমি পার্সোনালি ইনভাইট করলাম। আই হোপ, আপনি আসবেন। আপনার দুলাভাই, আপুও আসবে। আর হ্যাঁ, আপনার ছোট বোন মায়াকেও নিয়ে আসবেন!”

ছায়া একগাল হেঁসে মাথা নাড়িয়ে বলল, -“ঠিক আছে।”

মৃন্ময় চোখে সানগ্লাস পরে, গাড়ি স্টার্ট দিতে দিতে বলল,

-“খুব শীঘ্রই আমাদের আবারো দেখা হচ্ছে...! টেক কেয়ার অব ইউ।”

ছায়া হাত নাড়িয়ে বলল, -“বাই...গায়ক সাহেব। সাবধানে যাবেন, আর আপনিও নিজের খেয়াল রাখবেন।”

---------------------------------

আজ রাত অফিসে যায়নি, সারাদিন ঘুমিয়ে পার করেছে। সন্ধ্যা বেলা উঠে গোসল করে বেরিয়ে এল। আলো রান্নাঘরে টুকটাক কাজ করছিল। আর শেফালি চাচি মটরশুঁটি বাছছেন। দেবরকে দেখে আলো ফ্রিজ থেকে খাবার বের করে ওভেনে গরম করতে দিল। সবকিছু গরম করে ডাইনিং রেখে বলল,

-“আসুন, ভাইয়া।”

রাত চুপচাপ এসে চেয়ার টেনে নিয়ে বসল। আলো প্লেটে খাবার বেড়ে দিল। সোবহান খান বাহিরে গিয়েছিলেন। ফেরার পথে নাতবউয়ের জন্য এটাসেটা নিয়ে আসেন। মেয়েটা আবার বাহিরের খাবার খেতে খুব পছন্দ করে। তাই আজকেও নিয়ে এলেন। দাদাজানকে দেখে আলো হাসিমুখে এগিয়ে আসে ড্রয়িংরুমে।

-“আজকে কি নিয়ে এসেছো দাদাজান?”

সোবহান খান জিনিসের টোপলা দিয়ে বললেন,

-“ফুচকা, চটপটি, মাংসের পেঁয়াজু আর সমুচা।”

জিনিসের নাম শুনে আলোর চোখদুটো চিকচিক করে উঠল। সে কিছু বলতে যাবে, তার আগেই শুনতে পেল—

-“এসব হাবিজাবি রাস্তার খাবার নিয়ে এসে, তুমি আমার বউয়ের পেট খারাপ করাচ্ছো দাদাজান।”

আধার দোতলা থেকে নেমে এসে গম্ভীর কণ্ঠে কথাগুলো বলে। সেগুলো শুনে আলো প্রতিবাদী কণ্ঠে বলল,

-“মোটেও আমার পেট খারাপ হয় না।”

-“এবার যদি বমি করো, তাহলে ঘাড় ধরে রুম থেকে বের করে দিবো।”

আলো ঠোঁট উল্টে দাদাজানের দিকে তাকায়। সোবহান খান বড় নাতির উদ্দেশ্যে গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,

-“আমার নাতবউকে বের করে দিলে, তোমাকেও এ বাড়ি থেকে বের করে দিবো।”

আধার থমথমে মুখে বলল, -“তুমি আস্ত একটা গিরগিটি!”

আলো ফিক করে হেঁসে দিয়ে ওখান থেকে চলে গেল। গরম গরম কফি বানিয়ে নিয়ে এসে স্বামীকে দিল, তারপর সে ফুচকা রেডি করতে শুরু করল।

-“কোনো সমস্যা হয়েছে?”

আধার রাতের পাশের চেয়ারে বসতে বসতে জিজ্ঞেস করল। রাত খেতে খেতে জবাব দিল,

-“উঁহু, সব ঠিক আছে।”

আধার আর কিছু বলল না। শুধু নিজের বউয়ের দিকে তাকিয়ে রইল।

★

ডিনার করার পর আলো স্বামীর কাছে বায়না করে, আজ রিকশায় করে ঘুরবে এবং রাতের শহর দেখবে। আধার সোজাসাপ্টা না করে দেয়, কারণ তার ভার্সিটির জরুরী কাজ আছে। এবং এটাও বলে, অন্য কোনো সময় নিয়ে যাবে। কিন্তু...আলো তো আলোই! সে জেদ ধরে বসে আছে। আজ যাবে মানে যাবেই। এমনকি শাড়ি পরে, সেজেগুজে তৈরি হয়ে বসে আছে। মেয়েটা যখন দেখল, এতেও কাজ হচ্ছে না তখন কান্নাকাটি শুরু করে দিল। তার কুমিরের কান্নার কাছে আধার আত্মসমর্পণ করে, বউকে নিয়ে ঘুরতে বেড়িয়েছে। নয়তো তাকে শান্তিতে থাকতে দিবে না মেয়েটা৷ আজকাল একটু বেশিই জেদ, ত্যাড়ামি করছে।

রাতের আঁধারের নিস্তব্ধতার মাঝে নির্জন পথ দিয়ে, স্বামীর হাতে হাত রেখে হাঁটছে আলো। অন্য হাতে একগুচ্ছ গোলাপ! একটু আগেই রিকশায় করে দুজন মিলে শহর ঘুরেছে। আপাতত এখন হেঁটে হেঁটেই বাড়িতে ফিরছে।

-“খুশি হয়েছো?”

আলো একগাল হেঁসে মাথা নাড়িয়ে বলল,

-“খুউউউউব!”

আধার মুচকি হেঁসে হাত ছেড়ে দিয়ে, শাড়ি ভেদ করে কোমর চেপে ধরে নিজের সঙ্গে মিশিয়ে নিয়ে বলল,

-“এতদূর পথ, হেঁটে যেতে পারবে?”

-“এখনই তো পা ব্যথা করছে।”

-“তাহলে রিকশায় উঠলে না কেন?”

-“আপনার সাথে হাঁটব তাই।”

-“ঠিক আছে, চলো!”

মাঝপথে এসে আলো কোমর চেপে ধরে থেমে যায়। তার পা জোড়া আর চলছে না। মনে মনে নিজেকেই ইচ্ছে মতো বকাবকি করল। শুধু শুধু জেদ করে!

-“জুতা খুলো।”

স্বামীর কথা শুনে আলো চোখদুটো বড়বড় করে তাকায়। সেটা দেখে আধার বিরক্তিতে বলল,

-“এমন ভাবে তাকিয়ে আছো যেন তোমাকে আমি শাড়ি খুলতে বলেছি!”

আলো কিছু না বলে হিল জোড়া খুলে দিল। সে বুঝতে পারছে না, এই লোকটা তার জুতা নিয়ে কি করবে? ভাবনার মাঝেই সে নিজেকে শূন্যে অনুভব করল। আলো চমকে উঠে দু'হাতে স্বামীর গলা আঁকড়ে ধরে বিস্ময়ে তাকায়।

-“এটা কি করেছেন আপনি?”

আধার একহাতে মেয়েটার জুতা নিয়ে, অন্য হাতে পাঁজা কোলে তুলে নিয়ে সামনে হাঁটতে থাকে। এবং বলে,

-“মুখ বন্ধ করে থাকো, নয়তো আছাড় মা'রব।”

-“লোকে দেখলে কি ভাববে?”

-“কে কে ভাবল, না ভাবল—আই ডোন্ট কেয়ার। আমি অন্যের বউকে নয়, নিজের বউকে নিয়ে যাচ্ছি।”

আলো কিছু না বলে কাঁধে মাথা রেখে, মানুষটার মুখের দিকে তাকায়। তখনই তার মনে সূক্ষ্ম ইচ্ছে জাগল। সে আশেপাশে নজর বুলিয়ে নিয়ে, মাথা উঁচু করে টপাটপ দুটো চুমু বসিয়ে দিল স্বামীর বাম গালে।

হঠাৎই আধারের পা জোড়া শ্লথ হয়ে গেল৷ সে চোখ রাঙিয়ে মেয়েটার দিকে তাকাতেই, খিলখিল করে হেঁসে উঠল।

-“জান....!”

আলো তর্জনী আঙুল দিয়ে স্বামীর গালে আঁকিবুঁকি করতে করতে আদুরে কণ্ঠে ডাকে। এই প্রথম বউয়ের মুখ থেকে এই বাক্য শুনে আধারের হৃদয় কাপলো। সে শুকনো ঢোক গিলে গম্ভীর কণ্ঠে বলার চেষ্টা করল,

-“মাঝরাস্তায় আমাকে সিডিউস করার একদম চেষ্টা করবে না! চুপচাপ ভদ্র মেয়ের মতো....।”

আধার সম্পূর্ণ কথা শেষ করতে পারল না। কারণ পাঁজি মেয়েটা তার ঠোঁটে চুমু দিয়েছে। আধার চোখ বুজে জোরে জোরে শ্বাস নিয়ে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করল। সে জানে, এই মেয়েটা ইচ্ছে করে তাকে জ্বা'লাচ্ছে! কারণ তারা এখন বাহিরে, আর সে চাইলেও কিছু করতে পারবে না। তাই তো অসভ্য মেয়েটা সুযোগের ফয়দা তুলছে।

-“ভালোবাসি।”

ছোট্ট একটা বাক্য, অথচ সেই বাক্য শোনা মাত্রই আধারের হৃদয় থমকে গেল। সে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে অস্ফুটস্বরে বিরবির করল,

-“কি বললে? আবার বলো!”

আলো প্রাণখোলা হাসি দিল। তারপর প্রিয় মানুষটিকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে কানের কাছে মুখ নিয়ে, ফিসফিসিয়ে বলল,

-“লাভ ইউ! আই রিয়েলি লাভ ইউ সো মাচ....মি. খান।”

#চলবে

আপনাদের পছন্দের জুটিকে নিয়ে পড়ুন এক রোমান্টিক ভিন্ন প্লটের গল্প। যেখানে সকল চরিত্র রয়েছে এবং সবার প্রেম কাহিনী উল্লেখ করা আছে।

🍁ই-বই "আঁধার আলো"

https://link.boitoi.com.bd/cZBak

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৪৭তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন