ফন্ট সাইজ:
থিম:
এক মুঠো চাঁদের আলো

৫২তম পর্ব

লেখক: নুসরাত ফারিয়া

সুস্থ হওয়ার কিছুদিন পর আজ বাপের বাড়িতে এসেছে আলো। আধার রেখে গিয়েছে এবং সাবধানে থাকতে বলেছে। ভার্সিটিতে ক্লাস থাকার জন্য সে থাকতে পারেনি, তবে ভার্সিটি শেষে রাতে আসবে। আলো আসার পর থেকে খেয়াল করেছে, ওর ছোট বোন কিছুটা পাল্টেছে। তার সাথেও ভালো করে কথা বলছে না, সারাক্ষণ নিজেকে রুম বন্দী করে রাখছে। হুট করে হাসিখুশি থাকা মেয়েটার কি হলো সেটা জানতে মায়াকে চেপে ধরে। কারণ এরা দুজন একে অপরের সাথে সবকিছু শেয়ার করে। নিশ্চয়ই ছায়ার এমন পরিবর্তনের কারণ মায়া জানে। কয়েক দিন আগে মৃন্ময়ের রাখা ইভেন্টের শেষে কি কি হয়েছিল এবং দেখেছে, সবকিছু মায়া বলে দেয় বড় আপুকে। সবটা শুনে আলো কিছুক্ষণের জন্য থম মে'রে ছিল। পরপরই ছোট বোনের কাছে ছুটে যায়।

-“ছায়া?”

ছায়া মনম'রা হয়ে ছাঁদের একপাশে চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিল। তখন বড় বোনের ডাক শুনে ঘাড় ঘুরিয়ে পাশে তাকায়। আলো বোনের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে ধীর কণ্ঠে বলল,

-“আমরা যেটা খুব করে চাই, সেটা সবসময় পাই না। এক জীবনে যদি সবকিছুই পেয়ে যাই, তাহলে আর আফসোস কিসের থাকবে?”

বোনের কথার মানে বুঝতে একটুও অসুবিধা হলো না ছায়ার। মেয়েটা কিছুক্ষণ চুপ থেকে হঠাৎই আপুকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল এবং বলল,

-“কেন, কেন আপু? কেন হলো এমন? আমি কি খুব বেশি কিছু চেয়েছি? শুধু আমার গায়ক সাহেব কে চেয়েছিলাম। কিন্তু...কিন্তু উনি আমারে না, অন্য কাউকে চায়। যে মেয়ে অতীতে উনাকে ধোঁকা দিয়েছে, উনি সেই মেয়েকেই চান। ভালোবাসা এত নিষ্ঠুর কেন আপু? জানো? আমার না অনেক কষ্ট হচ্ছে। বুকের ভেতর অসহনীয় যন্ত্রণা করছে। তোমার বোন এই ব্যথা কীভাবে সইবে আপু? কীভাবে?”

আলো বোনকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে চোখদুটো বুজে নিল। সে কি বলে সান্ত্বনা দিবে মেয়েটাকে? তার যদি সাধ্য থাকত, তাহলে এক্ষুনি ছুটে গিয়ে মৃন্ময়কে এনে দিত। কিন্তু, তার যে এই ক্ষমতা নেই। তবে এই কষ্টের থেকে বোনকে বের করার একটা উপায় রয়েছে। আলো কিছু একটা ভেবে নিজেকে সামলিয়ে বোনের মাথায় হাত রেখে বলল,

-“কষ্ট পাস না বোন! জীবন কারোর জন্য থেমে থাকে না। আমাদের ভাগ্যে যা নেই, তা আমরা হাজার চাইলেও পাবো না।”

ছায়া কিছু বলল না, শুধু আপুকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকল।

মৃন্ময় একটা কফিশপে এসেছে। মূলত একজনের সাথে দেখা করতে। ওর পরণে কালো হুডি, জিন্স, মাথায় ক্যাপ, মুখে মাক্স! সেলিব্রিটি হলে এই এক জ্বালা, যেখানে সেখানে যাওয়া যায় না। সে একটা ফাঁকা জায়গা দেখে বসল। কিছুক্ষণ পর সেখানে তিশা হাজির হয়। আজ মেয়েকে নিয়ে আসেনি, বাড়িতে ন্যানির কাছে রেখে এসেছে। পরনে মৃন্ময়ের পছন্দের রঙের নীল জর্জেট শাড়ি৷ সে হেলেদুলে মৃন্ময়ের সামনে গিয়ে বসল।

-“এখানে না এসে আমার বাড়িতে আসতে পারতে।”

মৃন্ময় শান্ত গলায় জবাব দিল, -“আমি যেখানে সেখানে কম্ফোর্ট ফিল করি না। যাইহোক, কি খাবে বলো?”

-“কিছু খেতে ইচ্ছে করছে না। তোমাকে দেখে মন, পেট দুটোই ভরে গেছে।”

-“রায়া কেমন আছে?”

-“ভালো, তোমাকে পাপা হিসেবে পেলে আরো ভালো থাকবে। তা আমরা কবে বিয়ে করছি, রাজ?”

মৃন্ময় প্যান্টের পকেট থেকে একটা চেক বের করে টেবিলের ওপর রেখে বলল, -“মেয়েকে মানুষ করতে তোমার যত টাকা প্রয়োজন, সেটার এমাউন্ট এখানে লিখে ব্যাংক থেকে তুলে নিও৷ আমি সাইন করে দিয়েছি।”

তিশা অবাক কণ্ঠে শুধাল, -“মানে?”

-“মানে এই যে, আমি তোমার জীবনে ফিরছি না। তুমি আমার অতীত ছিলে, কিন্তু বর্তমান ও ভবিষ্যৎ অন্য কেউ। আমি শুধু রায়ার জন্য সময় চেয়েছিলাম, মেয়েটাকে পৃথিবীর সব সুখ এনে দিতে পারলেও পিতার সুখ দিতে পারব না। তুমি চাইলে অন্য কাউকে বিয়ে করতে পারো, যে তোমাকে এবং তোমার সন্তানকে ভালোবাসবে।”

-“কিন্তু....আমি তোমাকে চাই রাজ!”

-“আমি কোনো বেইমানকে চাই না তিশা।”

মৃন্ময়ের সোজাসাপ্টা জবাব শুনে তিশা অসহায় কণ্ঠে বলল, -“অতীত ভুলে আবার নতুন করে জীবন শুরু করা যায় না?”

-“না যায় না, অন্তত আমার পক্ষে সম্ভব নয়।”

-“তুমি যতই আমার সামনে নিজের আত্মসম্মান দেখাতে চাও না কেন, তবুও আমি জানি তুমি আজও আমাকে ভালোবাসো।”

-“যদি তাই হতো, তাহলে ওইদিনই তোমার কাছে ছুটে যেতাম, যেদিন তোমার সো কোল্ড স্বামী তোমাকে ছেড়ে গিয়েছিল। আমি আমার অতীত ভুলে জীবনে এগিয়ে গেয়েছি, আর এখন এই মৃন্ময়ের জীবনে অতীতের কোনো চিহ্ন নেই। আমার পুরো অস্তিত্ব জুড়ে তুমিও নেই। তুমি শুধুই ছিলে আমার খারাপ অতীত মাত্র৷ এ নতুন জীবনে তোমার কোনো ঠাঁই নেই, তিশা৷ অতীতে যেভাবে আমাকে ভুলে গিয়েছিলে, এখনো সেভাবে ভুলে যাও। কারণ এখন আমি তোমার রাজ নই, শুধু গায়ক মৃন্ময় আহমেদ ওরফে এমএ!”

-“এতটা না পরিবর্তন হলেও পারতে রাজ..!”

মৃন্ময় তাচ্ছিল্যের সুরে আওরাল, -“এই তুমিই আমাকে বদলাতে বাধ্য করেছিলে।”

তিশা চেক বইয়ের পাতার দিকে তাকিয়ে থেকে বিরবির করে বলল, -“শেষ বারের মতো তোমার প্রথম ভালোবাসা কে একটা সুযোগ দেওয়া যায় না?”

মৃন্ময় চেয়ার ছেড়ে উঠতে উঠতে বলল, -“মৃন্ময় কাউকে সেকেন্ড চান্স দেয় না!”

-“তাহলে বিয়ে করছো না কেন?”

মৃন্ময় চলে যেতে চেয়েও থেমে গেল। পিছনে ঘাড় ঘুরিয়ে তিশার চোখের দিকে তাকিয়ে ধীর কণ্ঠে বলে উঠল,

-“আগামী সপ্তাহে আমার বিয়ে৷ তোমার দাওয়াত রইল। অবশ্যই আসবে কিন্তু! সঠিক সময়ে বিয়ের কার্ড পৌঁছে যাবে তোমার বাড়িতে।”

★

আলো দুপুরের দিকে গোসল করে ড্রয়িংরুমে এসে দেখল টেবিলের ওপর একটা বিয়ের কার্ড রাখা রয়েছে। এটা দেখে কপাল কুঁচকে গেল। গলা উঁচিয়ে মায়ের উদ্দেশ্যে জিজ্ঞেস করল,

-“এটা কার বিয়ের কার্ড, মা?”

আলেয়া রহমান ডাইনিং টেবিলের ওপর খাবার সাজিয়ে রাখতে রাখতে বললেন, -“মাহিনের।”

নামটা শুনে আলোর হাত থেকে তোয়ালে পড়ে গেল নিচে। সে ছুটে এসে কার্ড টা খুলে ভালো করে দেখতে লাগল। বরের নামের জায়গায় 'মাহিন' লেখা এবং বউয়ের নামের জায়গায় 'তানিয়া' লেখা। তাদের আগামী মাসে বিয়ে! আলো পুরো কার্ড পড়তে পারল না, এক দৌড়ে নিজের রুমের ভেতর চলে গেল। তারপর ফোন খুঁজে বের করে সোজা মাহিন ভাইয়াকে কল দিল।

-“কেমন আছিস ছোট্ট কবুতর?”

মামাতো ভাইয়ের কথা শুনে আলো অস্থির গলায় শুধাল,

-“তুমি...তুমি বিয়ে করছো?”

-“হ্যাঁ!”

-“কিন্তু কেন? তুমি না অন্য কাউকে চাইতে? তাহলে?”

ফোনের অপর প্রান্তের ব্যক্তি নিশ্চুপ। আলো আবারো বলে ওঠে, -“তুমি চাইলে, আমি এ বিষয়ে মা-বাবার সাথে কথা বলব ভাইয়া। তবুও প্লিজ এই বিয়েটা করো না!”

মাহহিন দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, -“আমি মা কে ছায়ার কথা বলেছিলাম, কিন্তু মা চায় না ওকে।”

আলো অবাক কণ্ঠে শুধাল, -“কেন? কোনো সমস্যা?”

-“মেঘ মা'রা যাবার পর মা আর চাচ্ছে না রহমান পরিবারের কেউ এ বাড়ির বউ হয়ে আসুক।”

আলো কিছুক্ষণ চুপ থেকে ধীর কণ্ঠে বিরবির করল, -“তারমানে মামি মনে মনে এটা মানে? আমাদের জন্যই উনি উনার স্বামী, মেয়েকে হারিয়েছে? যেখানে আমরাও আমাদের পরিবারের একমাত্র ছেলেকে হারিয়েছি। কই, আমরা তো তোমার বোনকে বা তোমার পরিবারকে দোষারোপ করিনি? তোমার হুট করে আমাদের সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছিলে, তবুও আমরা কিছু মনে করিনি। কিন্তু এখন বুঝতে পারছি এর পিছনের আসল কারণ।”

একটু থেমে পুনরায় আওরাল, -“এখন বলো, তুমি কি চাও?”

-“আমার জীবনে মা বলতে আর কেউ নেই। বাবাকে হারিয়েছি, কিন্তু মাকে হারাতে পারব না আলো৷ তাই আমি আমার মায়ের ইচ্ছেটাকেই মেনে নিয়েছি।”

আলোর কেন জানি খুব কান্না পেল। তার ভাই, বোনের

ভাগ্য এত খারাপ কেন? একজন নিজের ভালোবাসার মানুষটিকে পেয়েও হারিয়ে ফেলল, সাথে নিজের প্রাণও। আরেকজন একতরফা ভালোবেসে প্রতিনিয়ত কষ্ট পাচ্ছে। তার কাছে একটা শেষ উপায় ছিল, বোনের কষ্ট কমানোর জন্য। কিন্তু এখন সেটাও আর নেই। সে কোনোমতে কান্না গিলে খেয়ে ধরা গলায় বলল,

-“নতুর জীবনের অনেক অনেক শুভেচ্ছা ভাইয়া। দোয়া করি, আগামী জীবন তোমাদের সুখের হোক! আচ্ছা, ভালো থেকো। আল্লাহ হাফেজ।”

একথা বলে লাইন কেটে দিয়ে ফোনটা বিছানার ওপর ছুঁড়ে মা'রল। দু'হাতে মাথার ভেজা চুল খামচে ধরে নিরবে কেঁদে দিল। তার বোন কি কখনো সুখের মুখ দেখবে না? কেউ কি তাকে একটুও ভালোবাসবে না? মেয়েটার ভাগ্যে কি ভালোবাসা বলে কিছু নেই? তার মতো যদি ওর বোনটাও প্রিয় মানুষটিকে পেত, তাহলে কতোই না ভালো হতো। অন্তত জীবনে ভালোবাসা না পাওয়ার আফসোস থাকত না। তার ভাই-বোনদের ভাগ্য এত নিষ্ঠুর না হলেও পারত!

মৃন্ময় সন্ধ্যা বেলা বাড়িতে ফিরে মায়ের দিকে তাকিয়ে বলে উঠল,

-“পাত্রী দেখা শুরু করো, এক সপ্তাহের মধ্যে বিয়ে করব।”

ছেলের কথা শুনে মারুফা আহমেদ চমকে উঠলেন। তিনি কিছু বলতে যাবেন তার আগেই মিরা ভিডিও কলের ওই পাশ থেকে বলল, -“সতিই তুমি বিয়ে করবে ভাইয়া?”

মৃন্ময় ল্যাপটপের সামনে বসতে বসতে বলল, -“হুম, সত্যিই।”

-“আমার পছন্দের একজন রয়েছে ভাইয়া। তবে একটু বয়স কম এই!”

-“ক্লাস টেনের হলেও চলবে, বাট...ফিডার খাওয়া বাচ্চা না হলেই হবে।”

মিরা শব্দ করে হেঁসে উঠে বলল, -“আরেহ না না, এত ছোট না। এই উনিশ, বিশ বছর। মজার ব্যাপার হলো ওই পুঁচকে তোমাকে হেব্বি ভালোবাসে।”

মৃন্ময় এক ভ্রু উঁচিয়ে জিজ্ঞেস করল, -“তুই কীভাবে জানলি?”

-“কেউ একজন বলেছে আমায়। ধরে নাও, তোমার কাছের মানুষ।”

মৃন্ময়ের মাথা ব্যথা করছে, তাই সে অত ভাবল না। শটকার্টে শুধু মায়ের উদ্দেশ্যে এইটুকু বলল, -“তোমাদের যাকে পছন্দ হয় তার সাথেই আমার বিয়ে ঠিক করো৷ আর সেটা এই সপ্তাহের মধ্যেই! নয়তো সারাজীবন কুমার থেকে যাবো বলে দিলাম।”

-----------------------------------------

রাত দশটার দিকে আধার শ্বশুর বাড়িতে এল। গাড়ি পার্ক করে ডোর খুলে ভেতরের দিকে যেতেই দেখতে পেল, মতিউর রহমান একজন ডক্টরের সাথে বাইরে আসছেন। এসময়ে ডাক্তারকে দেখে আধারের কপাল কুঁচকে গেল। কারোর কিছু হয়েছে নাকি? প্রশ্নটা মনের মাঝে উঁকি দিতেই সে বড় বড় পা ফেলে তাদের সামনে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করল,

-“সব ঠিক আছে আব্বু?”

মতিউর রহমান ডাক্তারকে বিদায় দিয়ে জামাইয়ের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বললেন, -“বড় মেয়েটা হঠাৎই জ্ঞান হারিয়েছিল, তাই ডাক্তারকে ডেকেছিলাম। তুমি ভেতরে এসো!”

বউ জ্ঞান হারিয়েছে জানতে পেরে আধার হাঁটতে হাঁটতে অস্থির গলায় জানতে চাইল, -“ডাক্তার কি বললেন? ও সুস্থ আছে তো?”

-“কিছুটা।”

আধার থেমে গিয়ে অবাক কণ্ঠে শুধাল, -“কিছুটা মানে? ওর কি হয়েছে?”

-“ভেতরে চলো, তারপর বলছি।”

শ্বশুরের থমথমে মুখ দেখে আধার বেশ চিন্তিত হয়। সে শ্বশুরকে রেখেই তড়িঘড়ি করে ছুটে চলে যায় ভেতরে। আলো বিছানায় আধশোয়া অবস্থায় শুয়ে ছিল। কেঁদেকুটে চেহারার বারোটা বাজিয়েছে। অর্ধাঙ্গিনীর এমন নাজেহাল অবস্থা দেখে আধারের বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল। সে ছুটে এসে মেয়েটাকে জড়িয়ে ধরে, মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলল,

-“কি হয়েছে? তোমার এই অবস্থা কেন?”

রুমের ভেতর সবাই উপস্থিত ছিল। হুট করে এইভাবে জড়িয়ে ধরার ফলে আলো কিছুটা লজ্জা পেল। তড়িঘড়ি করে স্বামীর বুক থেকে মাথা তুলে ধীর কণ্ঠে বলল,

-“কিছু হয়নি, ছাড়ুন আমাকে।”

-“কিছু না হলে ডাক্তার কেন এসেছিল? তুমি আমার থেকে কিছু লুকানোর চেষ্টা করছো?”

পাশ থেকে ছায়া বলে উঠল, -“এটা লুকিয়ে রাখা যায় না ভাইয়া। তিন-চার মাস পর এমনিই বেরিয়ে আসবে।”

আধার বুঝতে না পেরে জিজ্ঞেস করল, -“মানে? কি বেরিয়ে আসবে?”

ছায়া কিছু বলতে যাবে তখনই আলো চোখ রাঙায়। ওইদিকে আধার অধৈর্য্য হয়ে আবারো জিজ্ঞেস করল,

-“কি হয়েছে আমাকে বলবে কেউ? শুধু শুধু হার্টবিট বাড়িয়ে দেওয়ার কোনো মানেই হয় না।”

আলেয়া রহমান ও নীলিমা রহমান ঠোঁট টিপে হেঁসে রুম থেকে বেরিয়ে গেলেন। উনার পিছু পিছু ছায়া, মায়াও চলে যায়। সবাইকে চলে যেতে দেখে আধার চোখমুখ কুঁচকে বলল, -“কিছু না বলে সবাই চলে যাচ্ছে কেন? আশ্চর্য!”

আলো শুকনো ঢোক গিলে ফিসফিস করে বলল, -“সবটা বলব আপনাকে, তবে রাগারাগি করতে পারবেন না।”

-“দোষ করলে অবশ্যই রাগারাগি করব।”

-“আমার শুধু দোষ নেই, আপনারও আছে।”

-“আমি আবার কি করলাম?”

-“সবকিছু তো আপনিই করেছেন।”

-“ত্যাড়ামি না করে পরিষ্কার করে বলো, কি হয়েছে?”

-“আপনি যেটা চাননি, ওটাই হয়েছে। অবশ্য এর পিছনে আমারই হাতপা রয়েছে। কারণ আমি তাকে খুব করে চেয়েছি।”

আধারের মেজাজ খারাপ হলো। এই মেয়েটা সবসময় কথা ঘুরিয়ে পেচিয়ে বলে কেন?

-“কাকে চেয়েছো? নিজের প্রেমিক কে?”

আলো দুইদিকে মাথা নাড়িয়ে বলল, -“না। আমাদের দুজনের ভালোবাসার ফল কে চেয়েছি।”

-“তা কি ফল পেলে? আর ফল-টা টক না মিষ্টি?”

স্বামীর এহেন কথা শুনে আলো দাঁত কিড়মিড় করে বলল,

-“মজা করছেন আপনি?”

-“হ্যাঁ।”

আলো রেগেমেগে স্বামীকে দূরে ঠেলে চিল্লিয়ে উঠল,

-“আপনি আপনার মজা নিয়েই থাকুন, আমার কাছে আসতে হবে না। চলে যান এখান থেকে।”

-“ঠিক আছে।”

একথা বলে আধার উঠে দরজার দিকে যেতে লাগল। আর আলো ছলছল চোখে তাকিয়ে রইল। সে তো এমনি বলল কথাটা। তাই বলে লোকটা চলে যাবে? এমনিতেই সে দ্বিধায় পড়ে আছে৷ খবরটা পেলে মানুষটা কেমন রিয়াক্ট করে কে জানে। তার এসব ভাবনার মাঝেই দরজা লাগানোর শব্দ পেয়ে, চট করে সামনে তাকায়।

আধার ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে শার্টের বোতাম খুলতে খুলতে এগিয়ে আসতে আসতে হিসহিসিয়ে বলল, -“তুমি যতবার আমাকে দূরে যেতে বলবে, ঠিক ততবারই তোমার আরো কাছে আসব আমি।”

আলো ভয় পেয়ে খানিক পিছিয়ে গিয়ে কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, -“এখন এসব করা কিন্তু ঠিক নয়, স্যার।”

আধার শার্ট খুলে এগিয়ে এসে, অর্ধাঙ্গিনীর পা চেপে ধরে এক ঝটকায় কাছে নিয়ে এল।

-“কেন? তোমার পিরিয়ড হয়েছে?”

আধার ঝুঁকে মেয়েটার ঠোঁটের কোণে চুমু খেয়ে ফিসফিসিয়ে জিজ্ঞেস করল। আলো চোখ বুজে ঘাড় কাত করে বিরবির করল, -“ওটার থেকেও অনেক বড় কিছু হয়েছে।”

আধার গলার ভাঁজে মুখ ডুবিয়ে জানতে চাইল, -“কি?”

আলো নিশ্বাস আঁটকে রেখে বলে উঠল,

-“আ...আমি প্রেগন্যান্ট!”

অর্ধাঙ্গিনীর বলা ছোট বাক্যটা কর্ণপাত হতেই আধারের হৃদয় থমকে গেল। সে তড়াক করে মাথা তুলে অবিশ্বাস্য কণ্ঠে শুধাল, -“কি বললে তুমি?”

আলো পিটপিট করে তাকিয়ে ধীর কণ্ঠে আওরাল,

-“আপনি বাবা হতে চলেছেন, মি. খান। আপনার অংশ, আপনার র'ক্ত, আমাদের দুজনের ভালোবাসার পূর্ণতার ফল, খুব শীঘ্রই পৃথিবীতে আসতে চলেছে।”

#এক_মুঠো_চাঁদের_আলো

#লেখনীতে_নুসরাত_ফারিয়া

#পর্ব_৫২ (শেষ পর্বের দ্বিতীয় খন্ড)

অর্ধাঙ্গিনীর মুখ থেকে অপ্রত্যাশিত কিছু বাক্য শোনা মাত্রই আধারের পুরো দুনিয়া থমকে যায়। সে ফ্যালফ্যাল করে মেয়েটার উদরের মাঝে তাকিয়ে রয়৷ তারপর আস্তেধীরে জামা সরিয়ে কোমল পেট ছুঁয়ে দিল এবং বলল,

-“আমার সন্তান! এখানে আমার অংশ রয়েছে। এখন থেকে আমাকেও কেউ পাপা বলে ডাকবে?”

আলো মুচকি হেঁসে দু'হাতে স্বামীর গলা জড়িয়ে ধরে বলল,

-“হ্যাঁ, এখন থেকে আমার মতো আরেকজনও আপনাকে জ্বালাবে। এবং সারাক্ষণ পাপা পাপা বলে পিছু ছুটবে।”

একটু থেমে পুনরায় বলল, -“আপনি খুশি হয়েছেন?”

প্রতিত্তোরে আধার মাথা নুইয়ে অর্ধাঙ্গিনীর নগ্ন পেটের মাঝে মুখ ডুবিয়ে অজস্র ভেজা চুমুতে ভরিয়ে দিল।

-“পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর উপহারটা দিয়েছো আমাকে। আমি হয়তো কিছুটা সময় চেয়েছিলাম, কিন্তু...এখন মনে হচ্ছে সবচেয়ে বড় ভুল করেছি। এই সুখটা আরো আগে পাওয়ার দরকার ছিল।”

আলো নিঃশব্দে হাসল। আধার আবারো ফিসফিসিয়ে বলল, -“আমি আজ অনেক খুশি জান, অনেক। যেটা তোমাকে মুখে বলে বোঝাতে পারব না।”

আলো স্বামীকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বিরবির করে বলে ওঠে, -“আপনার সুখেই আমার সুখ!”

দীর্ঘ এক সুন্দর রাত পেরিয়ে নতুন সকালের আগমন ঘটে। রহমান পরিবারের সবাই ভীষণ খুশি। এত বছর পর পরিবারে ছোটো নতুন সদস্য আসতে চলেছে, এটা ভাবতেই মনের মাঝে প্রশান্তির সুখ বয়ে যাচ্ছে। সকল দুঃখের মাঝে এক টুকরো সুখের দেখা আবারো মিলেছে৷ সকাল থেকেই দুই জা মিলে আলোর পছন্দ মতো রান্না করতে শুরু করেছে। মতিউর রহমান ও মাহবুব রহমান গিয়েছেন বাজারে৷ ওখান থেকে মিষ্টি এনে মসজিদে ও পাড়াপ্রতিবেশিদের দিয়েছে। ছায়া, মায়া একটু পরপরই আপুর কাছে গিয়ে ঘুরঘুর করছে। কিন্তু...দুলাভাই থাকার কারণে বেশি যেতে পারছে না। মানুষটাও বউকে ছাড়া নড়ছে না। সবার আনন্দ দেখে আলো অনেক খুশি হয়েছে। এবং বোনদের কান্ড দেখে খিলখিল করে হেসেছে। আর মা, চাচির হাতের মজার রান্না খেয়ে বমি করে ভাসিয়েছে। তবে এতকিছুর মধ্যেও সে সুখ অনুভব করছে। মাতৃত্বের প্রথম অনুভূতি বুঝি এমনই হয়।

বাপের বাড়িতে কিছুদিন থেকে নিজের সংসারে ফিরে এসেছে আলো। তার মা হওয়ার কথা শুনে সোবহান খান খুশিতে কেঁদে দিয়েছেন। তিনি একসময় আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন, এ জীবনে আর নাতির সন্তানের মুখ দেখতে পারবে না। কিন্তু উপরওয়ালার উনার ইচ্ছেটা পূরণ করেছেন। খবরটা পাওয়া মাত্রই নামাজ পড়ে সৃষ্টিকর্তার নিকট লাখো শুকরিয়া আদায় করেন। এবং বলেন, তার নাতির সংসার যেন সুখে-শান্তিতে ভরে ওঠে।

আলো ভয়ে ভয়ে তার শ্বাশুড়ি মাকেও খুশির খবরটা দেয়। এক মূহুর্তের জন্য ভেবেছিল, এই বুঝি জিজ্ঞেস করেন—এটা কার সন্তান! কিন্তু তাকে অবাকের চরম পর্যায়ে পৌঁছে দিয়ে তাহমিনা খান এই প্রথম মেয়েটাকে দোয়া দেন। কারণ তিনি একটু হলেও এ বাড়ির বংশধরকে পেয়ে খুশি হয়েছেন। হয়তো নিজের এক পা হারিয়ে, বিছানায় পড়ে নিজের ভুল বুঝতে পেরেছেন। মানুষের অহংকার সারাজীবন থাকে না। একদিন না একদিন অহংকারের পতন ঘটবেই। সেটা হোক আগে কিংবা পরে।

পড়ন্ত দুপুর বেলায় শাড়ি পরে, সেজেগুজে একটা ক্যাফেতে এসেছে ছায়া। মূলত ওর হবু বরের সাথে দেখা করতে এবং কথা বলতে। হুট করে কই থেকে মতিউর রহমান একটা সম্বোধন ধরে এনেছেন। সে শুরুতে এসবের আশেপাশেও ছিল না। এবং সাফসাফ জানিয়ে দিয়েছে, সে এখন বিয়ে করবে না। কিন্তু তার মা জননী আজ ধরে বেঁধে নিজ হাতে সাজিয়ে পাঠিয়ে দিয়েছে ছেলের সাথে দেখা করতে। মায়াকেও নিয়ে আসতে চেয়েছিল, কিন্তু মেয়েটা আবার নাচতে নাচতে বান্ধবীর বাড়িতে গেছে। সে বিরক্তিতে চোখমুখ কুঁচকে ক্যাফের সামনে এসে দাঁড়ায়। বাড়িতে দেখা করার বদলে লাট সাহেব বাইরে দেখা করার প্রস্তাব রেখেছেন। একদৃষ্টে ভালোই হয়েছে। সে সোজাসাপ্টা না করে দিবে। দরকার হলে নিজেকে পাগল প্রমাণ করে হলেও সে আজ বিয়েটা ভাঙবে। নয়তো সেও আলোর বোন ছায়া নয়!

-“আরে কে বাল! চোখে দেখেন না?”

ছায়া একহাতে নিজের কপাল চেপে ধরে খেঁকিয়ে উঠল। এমনিতেই সকাল থেকে মনমেজাজ ভালো নেই, তারপর একজন এসে তার সুন্দর কপালটা ফাটিয়ে দিল।

হুডি, মাক্স পরিহিত যুবকটি কাঁচের ভারী দরজাটা বন্ধ করে বলল, -“আলোর ছায়া যে! তা আপনি এখানে কি করছেন?”

অনাকাঙ্ক্ষিত জায়গায় অপ্রত্যাশিত কণ্ঠস্বর শুনে ছায়া চমকে উঠল। তড়িৎগতিতে মাথা তুলে সামনে দাঁড়ানো যুবকের দিকে তাকায়৷ ভালো করে আপাদমস্তক পর্যবেক্ষণ করে নিয়ে অস্ফুটস্বরে জিজ্ঞেস করল,

-“আপনি এখানে কি করছেন?”

মৃন্ময়ের গরম লেগেছে অনেক। তাই সে ভেতরের দিকে ইশারা করে বলল, -“কোথাও একটা বসে কথা বলি?”

অন্য সময় হলে মেয়েটা নাচতে নাচতে চলে যেত। কিন্তু আজ কেন জানি মানুষটার কাছাকাছি যেতে ইচ্ছে করল না। কারণ এই লোকটা এখন অন্য কারোর ব্যক্তিগত পুরুষ। আর সে এমন মেয়ে নয় যে, অন্যের ভালোবাসা জেনেও নজর দিবে। তাই সে নিজের আবেগ কে সামলিয়ে ধীর কণ্ঠে বলল,

-“আপনি গিয়ে বসুন। আমি একজনের জন্য ওয়েট করছি।”

মৃন্ময় কপাল কুঁচকে জিজ্ঞেস করল, -“কার জন্য?”

ছায়া আড়ালে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে ওঠে, -“আমার হবু স্বামীর জন্য।”

-“ওয়াও! আপনি অপেক্ষা করছেন আপনার হবু বরের জন্য, আর আমি গরমে ম'রছি আমার হবু বউয়ের জন্য। বাই দ্য ওয়ে...কংগ্রাচুলেশনস।”

ছায়া মলিন হেঁসে বলল, -“আপনাকেও নতুন জীবনের অনেক শুভেচ্ছা।”

মৃন্ময় আর দাঁড়ায় না। দরজা ঠেলে ভেতরে চলে যায়। গরমে তার জান টা যাচ্ছে। ওইদিকে ওই মেয়েটারও আসার খবর নেই। এমন লেট লতিফাকে সে কিছুতেই বিয়ে করবে না। আজ আসুক শুধু! তারপর সময়ের মূল বুঝিয়ে দিবে। অন্যদিকে, ছায়া পায়চারি করছে আর অচেনা লোকটাকে ইচ্ছে মতো গালিগালাজ করছে। তার ভুল হয়ে গেছে নিজের ফোনটা ফেলে এসে। লোকটার একটা ছবিও দেখেনি। আলেয়া রহমান বারবার দেখাতে চেয়েছিলেন, কিন্তু সে রাগে-দুঃখে মুখটাও দেখেনি। যাকে সে চায় না, তাকে দেখে কি করবে? এইদিকে গরমে ঘেমে যাচ্ছে। সে আর বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না৷ বাধ্য হয়ে ক্যাফের ভেতরে প্রবেশ করে মৃন্ময়ের সামনের টেবিলে বসল।

-“কই ওই কচ্ছপের ছাও? ওই কচ্ছপের জন্য আধঘন্টা ধরে অপেক্ষা করছি, তবুও দেখা নেই। দেখ...আমার ধৈর্য্যের পরীক্ষা নিস না। আমি কিন্তু চলে যাবো।”

মৃন্ময় দাঁতে দাঁত চেপে কথাগুলো বলে। ফোনের অপর প্রান্ত থেকে মিরা কি বলল বোঝা গেল না। তবে মৃন্ময় ভ্রু চুলকিয়ে বিরবির করল,

-“তাড়াতাড়ি ছবি পাঠা, নয়তো ওই মেয়ের মুখের নকশা পাল্টে দিবো। একটা কচ্ছপ কোথাকার!”

বলেই খট করে লাইন কেটে দিল। ছায়া কফি খেতে খেতে সবটাই শুনল। হঠাৎই সে জিজ্ঞেস করল,

-“আপনি তো আপনার প্রেমিকাকে চেনেন, তাহলে ছবি চাচ্ছেন কেন?”

মৃন্ময় মুখের মাক্স ঠিক করে বলল, -“আমার কোনো প্রেমিকা নেই। আই অ্যাম সিঙ্গেল। তবে একসপ্তাহ পর বিবাহিত হয়ে যাবো।”

-“মিথ্যে কেন বলছেন? ওইদিন আমি, মায়া সব দেখেছি এবং শুনেছিও।”

মৃন্ময় কিছু বলতে যাবে তখনই ওইদিনের কিছু দৃশ্য চোখের সামনে ভেসে উঠল। এত ঝামেলার মধ্যে সে ওটা ভুলেই গেছিল। তাই সে কপাল কুঁচকে জানতে চাইল,

-“তুমি ওইদিন কেঁদেছিল কেন?”

ছায়া একপলক তাকিয়ে বলল, -“চোখে বিষাক্ত পোকা পড়েছিল তাই।”

প্রতিত্তোরে মৃন্ময় কিছু বলার আগেই ফোনে নোটিফিকেশন এল। সে লক খুলে সোজা হোয়াটসঅ্যাপে ঢুকলো। মিরা ছবি পাঠিয়েছে। তাও বিশটার মতো। অথচ সে একটা চেয়েছিল। এতগুলো ছবি কেন দিয়েছে বুঝতে পারল না। তবে রাগে দাঁত কিড়মিড় করল। শুধু শুধু তার গ্যালারি ভরে গেল ওই কচ্ছপের ছবি দিয়ে। মৃন্ময় একরাশ বিরক্তিতে মিরার আইডিতে ঢুকে ছবিগুলো দেখতেই থমকে গেল। সে অবিশ্বাস চোখে প্রতিটা ছবি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল। তারপর থমথমে মুখে সামনে বসা শাড়ি পরিহিত রমণীর দিকে তাকাল।

-“মেয়ে পছন্দ হয়নি? উপ্স সরি...মেয়ে নয়, আপনার হবু কচ্ছপকে পছন্দ হয়নি?”

ছায়ার কথা শুনে মৃন্ময় কোনো জবাব দিল না। সে মাক্সের আড়ালে ঠোঁট কামড়ে কিছু একটা হিসাব মেলানোর চেষ্টা করছে৷ কিছুক্ষণ চুপ থেকে ধীর কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,

-“তুমি তোমার হবু বরকে দেখেছো?”

-“ওই পাগলকে দেখলে এখানে একা বসে থাকতাম?”

মৃন্ময় আনমনে বিরবির করল, -“পাগল আমি?”

-“আরে আপনাকে বলি নাই তো। আমি ওই সেকেন্ড কচ্ছপকে বললাম। যাইহোক, আমাকে একটা সাহায্য করবেন?”

-“কি সাহায্য?”

-“ওই লোকটা যখন আসবে, তখন আমি আপনাকে আমার বয়ফ্রেন্ড হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিবো৷ আপনি শুধু একটু নাটক করবেন। আসলে আমি এই বিয়েটা ভাঙতে চাই।”

-“কেন? বিয়ে করলে কি সমস্যা?”

-“এখন বিয়ে করতে চাই না।”

-“বাট....আমি চাই।”

মৃন্ময়ের কথা শুনে ছায়া কফির মগে চুমুক দিতে দিতে বলল, -“তো করুন না, কে আপনাকে বাঁধা দিয়েছে।”

-“তুমি!”

ছায়ার কপাল কুঁচকে গেল। সে আবার কি করল? মৃন্ময় তপ্ত শ্বাস ফেলে উঠে এসে সোজা ছায়ার পাশের চেয়ারে বসল। হঠাৎ করে মানুষটাকে নিজের এত কাছে দেখে ছায়া ভরকে গেল। সে কিছু বলতে যাবে তার আগেই মৃন্ময় নিজের ফোনটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল,

-“আমার ফিউচার ওয়াইফ!”

ছায়ার ভেতরে কষ্ট হলেও সে বাইরে নিজেকে শক্ত রাখল। যেন কিছু হয়নি তার। অথচ ভেতরে ভেতরে শেষ হয়ে যাচ্ছে। সে জোরে শ্বাস নিয়ে ফোনের দিকে তাকায়৷ এবং সঙ্গে সঙ্গে চোখদুটো বড়বড় হয়ে গেল। সে ভুল দেখছে ভেবে কয়েকবার চোখের পল্লব ঝাপটিয়ে ফোনটা কেঁড়ে নিল। তারপর এক এক করে নিজের ছবি দেখতে লাগল। তারমানে সে আজ যার সাথে দেখা করতে এসেছিল, সেই ব্যক্তি সয়ং মৃন্ময় আহমেদ? অবিশ্বাস্য!

-“আমি কখনো ভাবতে পারিনি, ওই কচ্ছপটা তুমি হবে।”

-“আমিও!”

ছায়া আনমনে বলে৷ মৃন্ময় কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

-“আমাকে বিয়ে করতে তোমার কোনো অসুবিধা আছে?”

-“আপনার তো গার্লফ্রেন্ড আছে।”

-“ওটা আমার অতীত ছিল।”

অতঃপর মৃন্ময় সবকিছু খুলে বলে দেয় ছায়াকে। কারণ সে চায় না, কোনো সম্পর্ক মিথ্যে দিয়ে শুরু হোক। সবটা শুনে ছায়া বলল,

-“বুঝলাম। কিন্তু...আপনি তো মন থেকে বিয়ে করছেন না। নিশ্চয়ই জেদের বশে করতে চাচ্ছেন, রাইট?”

-“নিজের এলোমেলো জীবনটা আবারো নতুন করে শুরু করতে চাচ্ছি শুধু৷ এতগুলো বছর তো একাই পার করলাম, এখন না-হয় বাকী জীবনটা তোমার সাথে পার করব।”

-“আমিই কেন?”

-“আমার পরিবার চেয়েছে তোমাকে। আর....!”

-“আর?”

মৃন্ময় মেয়েটার চোখের দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে,

-“আমি নাহয় নিজের প্রথম ভালোবাসা পাইনি। তবে আমি চাই, তুমি তোমার প্রথম ভালোবাসা পাও!”

মানুষটার কথা শুনে ছায়া চমকে উঠল। মৃন্ময় আনমনে হেঁসে ধীর কণ্ঠে বলল, -“আই নো ছায়া! তুমি আমাকে ভালোবাসো।”

ছায়া চোখের পানি আড়াল করার জন্য মুখ ঘুরিয়ে নিল। কি থেকে কি হয়ে গেল, ঠিক বুঝতে পারছে না।

-“বিয়ে করবে আমায়, ছায়া? আমি কথা দিচ্ছি, তোমাকে কখনো নিরাশ করব না। পৃথিবীর পারফেক্ট স্বামী হতে না পারলেও তোমার মনের মতো হওয়ার চেষ্টা করব। তুমি হয়তো আমার প্রথম ভালোবাসা নও, কিন্তু....তুমিই হবে আমার শেষ ভালোবাসা। এবং আমার একমাত্র অর্ধাঙ্গিনী! তোমার গায়ক সাহেবের একটু সময় প্রয়োজন হলেও সে সারাজীবন শুধু তোমারই থেকে যাবে। আমাকে কি দ্বিতীয় বার ভালোবাসার সুযোগ দিবে? এবার অন্য মেয়েকে নয়, বরং নিজের বউকে ভালোবাসতে চাই। তুমি কি আমার নতুন জীবনের সাথী হবে? সারাজীবনের জন্য মৃন্ময়ের ছায়া হয়ে পাশে থাকবে?”

অজানা কারণে ছায়ার হাতপা কাঁপছে। সে ঠোঁট কামড়ে কান্না আটকিয়ে রাখার বৃথা চেষ্টা করছে। মৃন্ময় চাতক পাখির ন্যায় মেয়েটার জবাবের আশায় বসে আছে। ছায়া আড়ালে চোখের পানি মুছে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,

-“বাড়িতে যাবো, ড্রপ করে দিন।”

মৃন্ময় কিছু না বলে উঠে দাঁড়ায়। তারপর বাইরে এসে গাড়ির ডোর খুলে দিল। ছায়া চুপচাপ ভেতরে বসল। মৃন্ময় ড্রাইভিং সিটে বসে, পাশে ঝুঁকে এসে মেয়েটার সিট বেল্ট বেঁধে দিল। তারপর গাড়ি স্টার্ট করে রওনা দিল!

কাঙ্ক্ষিত জায়গায় এসে পৌঁছাতেই ছায়া নেমে পড়ল। এত সময়ের মধ্যে তারা কেউই কারোর সাথে কথা বলেনি। মৃন্ময় মেয়েটাকে চলে যেতে দেখে বলে উঠল,

-“আমি এখনো উত্তর পেলাম না।”

ছায়া পিছনে ফিরে ধীর কণ্ঠে বলল, -“আপনার জীবনে খুব শীঘ্রই কচ্ছপ আসতে চলেছে। তার জন্য নিজেকে রেডি রাখুন।”

মৃন্ময় ঠোঁট কামড়ে হেঁসে সিটে শরীরটা এলিয়ে দিয়ে আওড়ায়,

-“পাগলকে সারাজীবন সামলে রাখার জন্য, তুমিও নিজেকে প্রস্তুত রেখো।”

ছায়া মনে মনে হাসলেও বাহিরে ভাব নিয়ে বলল, -“বেশি বাড়াবাড়ি করলে, পাবনায় রেখো আসব হুহ্।”

-“পাবনাতে নয়, আপনার হৃদয়ের মাঝে থাকতে চাই।”

-“আমার হৃদয়ে আপনি বহু বছর আগে থেকেই রয়েছেন, গায়ক সাহেব। এখন শুধু আপনার মনে একটু ঠাঁই পেলেই হবে।”

-“আজ, এই মূহুর্ত থেকে আমার পুরো জীবনে তোমাকে ঠাঁই দিলাম। মৃন্ময়ের অস্তিত্ব জুড়ে শুধু তুমিই থাকবে।”

ছায়ার ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল। অবশেষে সে নিজের ভালোবাসার মানুষটিকে নিজের করে পেতে চলেছে। এর থেকে সুখের কিইবা আছে? এক জীবনে প্রিয় মানুষটাকে পেলেই তার যথেষ্ট। আর ভালোবাসা না পাওয়ার আফসোস রইল না। বরং তার এতদিনের একতরফা ভালোবাসা পূর্ণতা পাওয়ার পথে....

#চলবে

নিরামিষ ব্যাডা ও মিস. কালো কে নিয়ে পড়ুন এক রোমান্টিক ভিন্ন প্লটের গল্প। যেখানে সকল চরিত্রদের প্রেম কাহিনী উল্লেখ করা রয়েছে।

🍁ই-বই "আঁধার আলো"

https://link.boitoi.com.bd/cZBak

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৫২তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন