উপন্যাস: অচেনা মায়া
লিখিকা: সানজিদা আক্তার মোনালিসা
আমার নাম মেহেনাজ।
ছোটবেলা থেকেই আমি বড় হয়েছি ঢাকা শহরে। যদিও পুরোপুরি ঢাকা শহরের প্রাণকেন্দ্রে নয়, বরং শহরের একেবারে শেষ প্রান্তে।
আমার শৈশবটা আর দশটা সাধারণ শিশুর মতো ছিল না। ছোটবেলা থেকেই কঠিন শাসনের মধ্যে বড় হয়েছি। পরিবারের একমাত্র সন্তান হওয়ায় আমার প্রতি পরিবারের সবারই ছিল আলাদা নজর। কী করছি, কোথায় যাচ্ছি, কার সঙ্গে মিশছি—সবকিছুতেই ছিল নিয়মের বেড়াজাল।
তবে এত কিছুর মাঝেও আমার একটা নিজস্ব পৃথিবী ছিল। সেই পৃথিবীর নাম আমার নানুবাড়ি। আমার নানুবাড়ি রাজশাহীর পুঠিয়া রাজবাড়ীর কাছাকাছি।
ক্লাস নাইনের বার্ষিক পরীক্ষা প্রায় শেষের দিকে। পরীক্ষা শেষে সিদ্ধান্ত হলো, এবার নানুবাড়ি যাব। তখনো জানতাম না, এই সফরটা আমার জীবনের সবচেয়ে অদ্ভুত অধ্যায় হয়ে থাকবে।
রাজশাহীতে পৌঁছে পুরোনো স্থাপনা, নিরিবিলি রাস্তা আর পুঠিয়া রাজবাড়ীর ঐতিহাসিক সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ হয়ে গেলাম। কিন্তু সেই মায়ার আড়ালে যে গভীর রহস্য লুকিয়ে আছে, তা বুঝতে আমার বেশ কিছুদিন সময় লেগেছিল।
সেখানেই আমার দেখা হয়েছিল এমন একজনের সঙ্গে, যে দেখতে মানুষের মতো হলেও আদতে মানুষ ছিল না। সে ছিল এক জিন। আর সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, আমি যখন তার প্রেমে পড়ে গেলাম, তখনো জানতাম না তার আসল পরিচয়!
নানুবাড়িতে আসার পর বেশ কয়েকটা দিন কেটে গেল। প্রতিদিনের মতো সকালবেলা ঘুম থেকে ওঠা, নানুর সঙ্গে গল্প করা, দুপুরে খাওয়াদাওয়া আর বিকেলবেলা এদিক-সেদিক ঘুরে বেড়ানো—সব মিলিয়ে বেশ ভালোই কাটছিল সময়টা।
সেদিন বিকেলেও আমি বাড়ির বাইরে বের হয়েছিলাম। দূরে পুঠিয়া রাজবাড়ীর পুরোনো স্থাপনাগুলো দেখা যাচ্ছিল। হাঁটতে হাঁটতে কখন যে একটু দূরে চলে এসেছিলাম, খেয়ালই করিনি।
হঠাৎ পেছন থেকে কারও কণ্ঠস্বর ভেসে এল—
—এই যে, শুনছেন?
আমি পেছনে ফিরে তাকালাম। একজন অচেনা যুবক দাঁড়িয়ে আছে। পরনে কালো শার্ট, চুলগুলো সামান্য এলোমেলো। মুখে অদ্ভুত এক গম্ভীর ভাব। চোখ দুটো যেন কেমন গভীর।
আমি বললাম,
—আমাকে বলছেন?
ছেলেটি মৃদু হেসে বলল,
—এখানে আপনি ছাড়া আর কাউকে দেখতে পাচ্ছি না।
—কী হয়েছে?
—এত সন্ধ্যায় একা একা এখানে ঘুরছেন কেন?
—আপনার কী?
ছেলেটি মুচকি হেসে বলল,
—কিছু না। শুধু বললাম, জায়গাটা কিন্তু আপনার ধারণার মতো নিরাপদ নয়।
আমি চলে আসতে চাইলে সে আবার বলল,
—আপনার নামটা জানা হলো না!
—মেহেনাজ।
—বাহ! সুন্দর নাম।
আমি বাড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করলাম। কিছুদূর যাওয়ার পর পেছনে ফিরে তাকিয়ে দেখি ছেলেটি আর সেখানে নেই।
সেদিন রাতে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বাইরে তাকাতেই বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। দূরে অন্ধকারের মধ্যে সেই ছেলেটিকেই দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম। সে আমার দিকেই তাকিয়ে ছিল। আর তার ঠোঁটে লেগে ছিল এক অদ্ভুত হাসি।
আমি তখনো জানতাম না, এই অচেনা যুবকের সঙ্গে আমার পরিচয়টা কোনো সাধারণ পরিচয় ছিল না।অচেনা মায়া
সেদিন রাতে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছেলেটিকে দেখার পর থেকে কেমন যেন অস্বস্তি হচ্ছিল।
কে এই ছেলেটা? আর আমাকে এভাবে দেখছিলই বা কেন?
অনেকক্ষণ এসব ভাবতে ভাবতেই ঘুমিয়ে পড়লাম।
পরদিন সকাল।
নানুর ডাকে ঘুম ভাঙল।
—মেহেনাজ, ও মেহেনাজ! আর কত ঘুমাবি? সকাল হয়েছে।
আমি চোখ কচলাতে কচলাতে বললাম,
—উফফ নানু! আর একটু ঘুমাতে দাও না।
—সারাদিন শুধু ঘুম আর ঘুম। ওঠ, নাশতা করবি না?
অগত্যা বিছানা ছেড়ে উঠতেই হলো।
নাশতা শেষ করে বাড়ির উঠানে বসে ফোন দেখছিলাম। হঠাৎ আমার ছোট মামাতো ভাই এসে বলল,
—আপু, বাইরে একজন তোমাকে খুঁজছে।
আমি অবাক হয়ে বললাম,
—আমাকে? কে?
—জানি না। নাম বলেছে ঈশান।
ঈশান!
নামটা শুনেই গতকালের ছেলেটির কথা মনে পড়ে গেল।
আমি দ্রুত বাইরে বেরিয়ে এলাম।
বাড়ির গেটের পাশে ছেলেটি দাঁড়িয়ে আছে। আজও পরনে কালো পোশাক। আমাকে দেখেই মুচকি হাসল।
—সুপ্রভাত, মেহেনাজ।
আমি ভ্রু কুঁচকে বললাম,
—আপনি এখানে কী করছেন?
—তোমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছি।
—কিন্তু আমার সঙ্গে আপনার কী দরকার?
ঈশান কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,
—সব প্রশ্নের উত্তর কি প্রথম দেখাতেই দিতে হয়?
আমি বিরক্ত হয়ে বললাম,
—আপনার কথা বলার ধরনটা বেশ অদ্ভুত।
সে হেসে বলল,
—তুমি এখনো আমার অদ্ভুত দিকটা দেখোনি।
কথাটা বলে সে চলে যেতে উদ্যত হলো।
আমি পেছন থেকে ডাকলাম,
—এই যে! আপনার নাম ঈশান, তাই না?
সে পেছনে ফিরে তাকাল।
—হ্যাঁ। মনে রেখেছ তাহলে?
—মনে রাখার মতো কিছু বলেননি।
ঈশান মৃদু হাসল।
—সময় হলে অনেক কিছুই মনে থাকবে, মেহেনাজ।
কথাটা বলে সে চলে গেল।
আমি কিছুক্ষণ গেটের দিকে তাকিয়ে রইলাম।
এরপর কয়েকদিন ঈশানের সঙ্গে আমার দেখা হয়নি। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে প্রতিদিনই মনে হতো, কেউ যেন দূর থেকে আমাকে লক্ষ্য করছে।
একদিন বিকেলে নানুর সঙ্গে বসে গল্প করছিলাম।
হঠাৎ নানুকে জিজ্ঞেস করলাম,
—আচ্ছা নানু, এই এলাকায় ঈশান নামে কাউকে চেনো?
নানু আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,
—ঈশান? কার কথা বলছিস?
—একটা ছেলে। কালো শার্ট পরে। দেখতে বেশ লম্বা।
নানু কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,
—না তো মা। এই নামে তো কাউকে চিনি না।
আমি আর কথা বাড়ালাম না।
কিন্তু নানুর মুখের ভাবটা কেমন যেন বদলে গিয়েছিল।
সেদিন রাতেও ঘুম আসছিল না। জানালার পর্দা সরিয়ে বাইরে তাকাতেই চমকে উঠলাম। বাড়ির সামনের বড় গাছটার নিচে ঈশান দাঁড়িয়ে আছে।
আমাকে দেখেই সে হাতের ইশারায় বাইরে আসতে বলল।
আমি কিছুক্ষণ দ্বিধায় রইলাম। তারপর জানালাটা বন্ধ করে বিছানায় ফিরে এলাম।
ঠিক তখনই ফোনে একটা মেসেজ এল। অচেনা নম্বর।
মেসেজে লেখা—
'ভয় পেয়েছ, মেহেনাজ?'
আমি অবাক হয়ে ফোনের দিকে তাকিয়ে রইলাম। আরেকটা মেসেজ এল।
'ভয় পেয়ো না। আমি তোমার কোনো ক্ষতি করব না।'
আমি কাঁপা হাতে লিখলাম—
'আপনি কে? আমার নম্বর পেলেন কোথায়?'
কিছুক্ষণ পর উত্তর এল—
'আমি ঈশান। আর তোমার সম্পর্কে যতটুকু জানার প্রয়োজন, ততটুকু আমি জানি।'
আমার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।
কিন্তু সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপারটা ঘটল তার পরেই।
আমি জানালার দিকে তাকিয়ে দেখলাম, গাছের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা ঈশান আর নেই।
অথচ আমার ফোনে তখনো তার মেসেজ আসছে।
সেদিন প্রথমবারের মতো মনে হলো, ঈশান হয়তো সাধারণ কোনো মানুষ নয়।
কিন্তু সে আসলে কে?
সেই প্রশ্নের উত্তর তখনো আমার অজানা ছিল।
চলবে..!!