🌙 অচেনা মায়া
লিখিকা: সানজিদা আক্তার মোনালিসা
ঈশানকে হঠাৎ আমার ঘরের ভেতরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আমি কয়েক মুহূর্ত কোনো কথা বলতে পারলাম না।
কিছুক্ষণ আগেও তো তাকে বাড়ির সামনের গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছি!
তাহলে সে এখানে এল কীভাবে?
আমার বুকের ভেতরটা কাঁপছিল।
আমি ধীরে ধীরে বললাম—
—তুমি... তুমি এখানে কীভাবে এলে?
ঈশান কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর শান্ত গলায় বলল—
—তোমার সব প্রশ্নের উত্তর এখনই দিলে তুমি হয়তো আমাকে বিশ্বাস করবে না।
আমি রাগে বললাম—
—তাহলে আমাকে এসব রহস্যের মধ্যে রাখছ কেন?
ঈশানের মুখের হাসিটা মিলিয়ে গেল।
—আমি চাইনি তুমি ভয় পাও।
আমি কিছু বলার আগেই নানু ঘরে ঢুকলেন।
ঈশানকে দেখেই তার মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
—তুমি এখানে কেন এসেছ?
ঈশান নানুর দিকে তাকিয়ে বলল—
—আমি মেহেনাজের কোনো ক্ষতি করতে আসিনি।
নানু কঠিন গলায় বললেন—
—তুমি এখান থেকে চলে যাও।
আমি অবাক হয়ে দুজনের দিকে তাকিয়ে রইলাম।
—তোমরা দুজন একে অপরকে চেনো?
কেউ কোনো উত্তর দিল না।
আমি আবার বললাম—
—কেউ আমাকে সত্যিটা বলবে?
নানু আমার হাত ধরে বললেন—
—মেহেনাজ, তুই ঈশানের কাছ থেকে দূরে থাক।
আমি সঙ্গে সঙ্গে হাত ছাড়িয়ে নিলাম।
—কিন্তু কেন?
নানু এবার কাঁপা গলায় বললেন—
—কারণ ও আমাদের মতো নয়।
ঘরের ভেতর হঠাৎ যেন নিস্তব্ধতা নেমে এল।
আমি ঈশানের দিকে তাকালাম।
সে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে।
আমার মনে হাজারো প্রশ্ন।
—আমাদের মতো নয় মানে?
ঈশান ধীরে ধীরে মাথা তুলল।
তার চোখে আজ এক অদ্ভুত বিষণ্ণতা।
সে বলল—
—আমি তোমাকে মিথ্যা বলতে চাইনি, মেহেনাজ।
আমার বুকটা ধক করে উঠল।
—তাহলে সত্যিটা বলো।
ঈশান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল—
—সত্যিটা জানার পর তুমি হয়তো আমাকে আর দেখতে চাইবে না।
আমি বললাম—
—সেটা পরে দেখা যাবে। আগে বলো।
ঠিক তখনই নানু চিৎকার করে বললেন—
—না, ঈশান!
কিন্তু ঈশান আর থামল না।
সে আমার দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে বলল—
—আমি মানুষ নই, মেহেনাজ।
আমার চারপাশটা যেন হঠাৎ থেমে গেল।
আমি বিশ্বাস করতে পারছিলাম না।
—কী বলছ তুমি?
ঈশান চোখ নামিয়ে বলল—
—আমি একজন জিন।
কথাটা শুনে আমার হাত থেকে ফোনটা পড়ে গেল।
আমি এক পা পিছিয়ে গেলাম।
এতদিন যার সঙ্গে কথা বলেছি...
যাকে নিয়ে ভেবেছি...
যার উপস্থিতি আমার কাছে অদ্ভুত হলেও পরিচিত হয়ে উঠছিল...
সে একজন জিন?
আমি কাঁপা গলায় বললাম—
—না... এটা সত্যি হতে পারে না।
ঈশান আমার দিকে এগোতে চাইল।
আমি সঙ্গে সঙ্গে বললাম—
—আমার কাছে আসবে না!
ঈশান থেমে গেল।
তার চোখে কষ্টের ছাপ দেখা গেল।
সে ধীরে বলল—
—আমি জানতাম, তুমি এমনটাই বলবে।
আমার চোখের সামনে সবকিছু কেমন ঝাপসা লাগছিল।
নানু আমাকে নিজের কাছে টেনে নিলেন।
আর ঈশান শেষবার আমার দিকে তাকিয়ে বলল—
—তোমাকে ভয় দেখানোর জন্য আমি কখনো আসিনি, মেহেনাজ। শুধু তোমাকে দেখতে চেয়েছিলাম।
কথাটা বলেই সে ধীরে ধীরে দরজার দিকে এগিয়ে গেল।
আমি কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইলাম।
কিন্তু সে দরজা দিয়ে বের হওয়ার আগেই—
হঠাৎ ঘরের আলো নিভে গেল।
এক মুহূর্তের জন্য চারপাশ অন্ধকার হয়ে গেল।
আলো ফিরে আসার পর দেখি—
ঈশান আর সেখানে নেই।
শুধু জানালার পাশে বাতাসে পর্দাটা নড়ছে।
সেদিন রাতে আমি বুঝতে পারলাম—
আমার জীবনে যে রহস্যের শুরু হয়েছিল, তার চেয়েও ভয়ংকর সত্য আমার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।
━━━━━━━━━━━━━━━━━━
ঈশানের সত্যিটা জানার পর থেকে আমি ঘর থেকে বের হতে চাইছিলাম না।
বারবার তার কথাগুলো মনে পড়ছিল।
“আমি মানুষ নই, মেহেনাজ।”
কথাটা যেন আমার মাথার ভেতর বারবার ঘুরছিল।
একদিকে ভয় লাগছিল।
অন্যদিকে অদ্ভুতভাবে ঈশানের জন্য মনটাও খারাপ হচ্ছিল।
আমি নিজেই বুঝতে পারছিলাম না, কেন এমন হচ্ছে।
যদি সে সত্যিই খারাপ হতো, তাহলে এতদিন আমাকে কোনো ক্ষতি করল না কেন?
কেন সে বারবার আমাকে সাবধান করেছে?
কেন আমার জন্য তার চোখে এত কষ্ট ছিল?
সারারাত এসব ভাবতে ভাবতেই কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, বুঝতে পারিনি।
পরদিন সকালে নানু আমার ঘরে এলেন।
আমাকে চুপচাপ বসে থাকতে দেখে বললেন—
—এখন তো বুঝলি, আমি তোকে কেন ওর থেকে দূরে থাকতে বলেছিলাম?
আমি নানুর দিকে তাকিয়ে বললাম—
—নানু, ঈশান কি সত্যিই খারাপ?
নানু কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর বললেন—
—সব জিন খারাপ হয় না, মা। কিন্তু তাদের জগৎ আর আমাদের জগৎ এক নয়।
আমি বললাম—
—তুমি ঈশানকে আগে থেকে কীভাবে চেনো?
নানুর মুখটা আবার গম্ভীর হয়ে গেল।
—ওর গল্প অনেক পুরোনো।
—কত পুরোনো?
নানু দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—তুই এখনো সব জানার জন্য প্রস্তুত না।
আমি বিরক্ত হয়ে বললাম—
—আবার সেই একই কথা!
নানু আর কিছু বললেন না।
সেদিন বিকেল পর্যন্ত ঈশানের কোনো খবর পেলাম না।
অদ্ভুতভাবে আমি বারবার জানালার দিকে তাকাচ্ছিলাম।
যে ছেলেটাকে কিছুদিন আগেও দেখে আমি বিরক্ত হতাম, আজ তাকে দেখতে না পেয়ে কেন যেন মনটা খারাপ লাগছিল।
হঠাৎ ফোনটা বেজে উঠল।
অচেনা নম্বর।
আমি কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে ফোনটা ধরলাম।
—হ্যালো?
ওপাশ থেকে কোনো কথা নেই।
তারপর খুব আস্তে ঈশানের কণ্ঠ শুনলাম—
—ভয় পেয়েছ?
আমি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলাম।
তারপর বললাম—
—তুমি আমাকে সত্যিটা আগে বলোনি কেন?
ঈশান শান্ত গলায় বলল—
—কারণ তোমাকে হারানোর ভয় ছিল।
আমার বুকটা কেমন যেন করে উঠল।
—তুমি কোথায়?
—তোমার কাছ থেকে অনেক দূরে।
—তুমি কি আর আসবে না?
প্রশ্নটা মুখ থেকে বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমি নিজেই অবাক হয়ে গেলাম।
ঈশান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল—
—তুমি কি চাও আমি আসি?
আমি কোনো উত্তর দিতে পারলাম না।
কিছুক্ষণ নীরবতার পর ঈশান বলল—
—দেখেছ? তুমি নিজেও জানো না, তুমি আমাকে ভয় পাও নাকি আমার উপস্থিতিটাকে মিস করো।
ফোনটা কেটে গেল।
আমি অনেকক্ষণ ফোনের দিকে তাকিয়ে রইলাম।
সন্ধ্যার দিকে বাইরে হালকা বাতাস বইছিল।
আমি জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলাম।
হঠাৎ চোখ পড়ল সেই বড় গাছটার দিকে।
গাছটার নিচে কেউ দাঁড়িয়ে আছে।
ঈশান।
আমার সঙ্গে চোখাচোখি হতেই সে অন্যদিকে ঘুরে হাঁটতে শুরু করল।
আমি আর নিজেকে থামাতে পারলাম না।
দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে বাড়ির বাইরে চলে এলাম।
—ঈশান!
সে থেমে গেল।
ধীরে ধীরে আমার দিকে ফিরে তাকাল।
আমি তার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম।
কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ।
তারপর আমি বললাম—
—আমি এখনো তোমাকে পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারছি না।
ঈশান মাথা নিচু করল।
—আমি জানি।
—কিন্তু আমি তোমাকে ঘৃণাও করতে পারছি না।
ঈশান ধীরে ধীরে আমার দিকে তাকাল।
তার চোখে প্রথমবারের মতো একটু আশা দেখা গেল।
সে বলল—
—আমি শুধু এতটুকুই চাই, মেহেনাজ। আমাকে একটা সুযোগ দাও।
আমি কোনো উত্তর দিলাম না।
ঠিক তখনই দূরে কোথাও অদ্ভুত একটা শব্দ হলো।
ঈশানের মুখের ভাব মুহূর্তেই বদলে গেল।
সে চারপাশে তাকিয়ে বলল—
—তোমাকে এখনই বাড়ি যেতে হবে।
আমি অবাক হয়ে বললাম—
—কেন?
ঈশান এবার কঠিন গলায় বলল—
—কারণ আমি একা নই।
আমার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
আমি চারপাশে তাকালাম।
কিন্তু কাউকে দেখতে পেলাম না।
ঈশান নিচু গলায় বলল—
—তোমার সঙ্গে আমার দেখা হওয়ার খবর অন্যরাও জেনে গেছে।
—অন্যরা কারা?
ঈশান আমার দিকে তাকিয়ে বলল—
—যাদের সম্পর্কে তুমি এখনো কিছুই জানো না।
হঠাৎ বাতাসটা যেন আরও ঠান্ডা হয়ে গেল।
ঈশান আমার হাতের দিকে তাকিয়ে বলল—
—মেহেনাজ, যা-ই হোক, আজকের পর থেকে রাতে একা কোথাও যাবে না।
আমি অবাক হয়ে বললাম—
—তুমি আমাকে আবার দেখতে আসবে?
ঈশান মৃদু হাসল।
—যদি তোমার কোনো বিপদ হয়, আমি আসব।
কথাটা বলেই সে ধীরে ধীরে অন্ধকারের দিকে চলে গেল।
আমি দাঁড়িয়ে রইলাম।
সেদিন প্রথমবার আমার মনে হলো—
ঈশানকে আমি হয়তো এখনো পুরোপুরি বুঝতে পারিনি।
কিন্তু একটা বিষয় বুঝতে শুরু করেছি—
আমার ভয়ের সঙ্গে সঙ্গে, ঈশানের জন্য আমার মনে অন্যরকম একটা অনুভূতিও জন্ম নিতে শুরু করেছে।
চলবে... ❤️