জান্নাতের ছায়া
লেখিকা : জান্নাতুল নাঈমা
পর্ব ৭
_____
শীতের চাদরে মুড়ে গেছে পুরো শহর। ডিসেম্বরের শেষ প্রান্তে এসে ঠান্ডার তীব্রতা যেন একটু বেশিই অনুভূত হচ্ছে। সকালের দিকে চারপাশ ঘন কুয়াশায় ঢাকা থাকে, আর গাছের পাতা থেকে টপটপ করে জমতে থাকা শিশিরবিন্দু পড়ার শব্দ শোনা যায়।
এমন এক কনকনে ঠান্ডার সকালে সাদিক ও ফাতেমার ছোট ফ্ল্যাটটির ভেতরটা বেশ উষ্ণ ও স্নিগ্ধ। প্রতিদিনের অভ্যাসের মতো আজও শেষ প্রহরে ঘুম থেকে উঠে তাহাজ্জুদের নামায আদায় করেছেন তাঁরা।
রাতের সেই নিস্তব্ধতায় রবের দরবারে করা দীর্ঘ মোনাজাত ও চোখের পানি তাদের সারা দিনের জন্য এক অলৌকিক মানসিক শক্তি জুগিয়ে দেয়।
তবে আজকের সকালটা অন্য দশটি দিনের মতো স্বাভাবিক ছিল না। গত কয়েকদিন ধরে অতিরিক্ত কাজের চাপ এবং শীতের হাওয়া লাগার কারণে সাদিকের শরীরটা বেশ কিছুদিন ধরে একটু খারাপ যাচ্ছিল।
আজ সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর থেকেই তাঁর সারা শরীরে হালকা জ্বর জ্বর ভাব এবং সর্দি-কাশির তীব্রতা অনুভব হচ্ছিল। কপালে হাত দিয়ে ফাতেমা বুঝতে পারলেন সাদিকের তাপমাত্রা বেশ খানিকটা চড়া।
সাদিক যখন বিছানায় একটু শোয়ার চেষ্টা করছিলেন, ফাতেমা তখন বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে দ্রুত রান্নাঘরে গেলেন। তিনি সুন্নতি তরিকায় বার্লি বা যবের সুস্বাদু স্যুপ এবং হালকা গরম আদা-মধু চা প্রস্তুত করলেন।
সাদিকের এই সামান্য অসুস্থতা ফাতেমার মনে গভীর মায়া ও উদ্বেগের সৃষ্টি করেছিল, কিন্তু তাঁর চেহারায় কোনো ভীতি বা হাহাকার ছিল না; বরং এক শান্ত ও ধৈর্যশীল মনোভাব নিয়ে তিনি সাদিকের সেবা করার জন্য প্রস্তুত হলেন।
➤সেবায় ও ভালোবাসায় পরম যত্নের ছায়া
ফাতেমা গরম চায়ের কাপ ও স্যুপের বাটি নিয়ে এসে সাদিকের বিছানার পাশে বসলেন। অত্যন্ত মমতার সাথে সাদিকের কপালে হাত বুলিয়ে নরম সুরে বললেন, "আপনার শরীর তো বেশ গরম হয়ে আছে, সাদিক! আজ আর অফিস যাওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। আমি এখনই ম্যানেজারের কাছে ফোন করে আপনার অসুস্থতার কথা জানিয়ে দিচ্ছি। আপনি আজ সম্পূর্ণ বিশ্রাম নিন।"
সাদিক মৃদু হেসে ফাতেমার দিকে তাকালেন। অসুস্থতার কারণে তাঁর মুখটা কিছুটা ফ্যাকাশে হলেও চোখে এক অদ্ভুত তৃপ্তির দীপ্তি ছিল। তিনি দুর্বল কণ্ঠে বললেন, "অফিস তো ছুটি নেওয়াই লাগবে, ফাতেমা। কিন্তু তোমাকে এভাবে সকালবেলা কষ্ট দেওয়ার জন্য আমার খারাপ লাগছে। তুমি সবসময় আমার প্রতি এত খেয়াল রাখো যে, আমি অসুস্থ হলেও যেন মনে হয় আমি পৃথিবীর সবচেয়ে ভাগ্যবান মানুষ।"
ফাতেমা মৃদু হেসে সাদিকের হাতে গরম চায়ের কাপটি ধরিয়ে দিয়ে বললেন, "এসব কী বলছেন আপনি? স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক তো কেবল সুখের দিনে একসাথে হাসার জন্য নয়, বরং একে অপরের বিপদে, সুখে-দুঃখে ছায়ার মতো পাশে থাকার জন্যই তো আল্লাহ আমাদের জীবনসঙ্গী হিসেবে কবুল করেছেন। আপনি চায়ে চুমুক দিন, আমি গরম পানির ভাপ নেওয়ার ব্যবস্থা করছি।"
সারাদিন ফাতেমা পরম যত্নে সাদিকের সেবা করলেন। ঘরের কাজগুলো দ্রুত সেরে তিনি সাদিকের মাথার কাছে বসে কোরআন তিলাওয়াত করতে লাগলেন। কোরআনের সুমধুর তেলাওয়াত যেন সাদিকের অসুস্থ শরীর ও ক্লান্ত মনকে এক জাদুকরী প্রশান্তিতে ভরে দিল।
দুনিয়ার বড় বড় চিকিৎসকের ওষুধ বা দামি অ্যান্টিবায়োটিক যা করতে পারত না, ফাতেমার সেই নিঃস্বার্থ ভালোবাসা ও আল্লাহর কালামের বরকত যেন তার চেয়েও দ্রুত সাদিককে সুস্থতার পথে নিয়ে এল।
➤জীবনের নশ্বরতা ও পরকালের চিরন্তন ভাবনা
সন্ধ্যা নামতেই শীতের আকাশটা আরও বেশি অন্ধকার হয়ে এল।বাইরে তখন শীতল বাতাস বইছে, আর জান্নাতের সুশীতল বাতাসের মতো ফুরফুরে এক আমেজ তৈরি হয়েছে ঘরে। সাদিক এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সুস্থ বোধ করছেন।
এশার নামাযের পর তারা দুজনে মিলে বসার ঘরের ছোট সোফায় বসলেন। সাদিকের গায়ে জড়ানো ছিল একটি পশমি চাদর, আর ফাতেমা তাঁর পাশে বসে একটি ইসলামিক বইয়ের পাতা ওলাটাচ্ছিলেন।
সারাদিনের এই অসুস্থতা এবং বিছানায় শুয়ে কাটানো সময়টি সাদিককে গভীর এক চিন্তার খোরাক জুগিয়েছিল। তিনি জানালার বাইরে কুয়াশাচ্ছন্ন রাতের আকাশের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফাতেমাকে বললেন,
"ফাতেমা, আজ সারা দিন বিছানায় শুয়ে শুয়ে একটা কথা বারবার আমার মনে হচ্ছিল—মানুষ কত অহংকার করে, কত কিছুর পেছনে ছুটে বেড়ায়, অথচ মানুষের জীবনটা কত না ঠুনকো! এই তো সেদিন সুস্থ সবল ছিলাম, আর আজ সামান্য জ্বর-সর্দিতেই শরীর ভেঙে পড়ল। মানুষ যদি একটু গভীরভাবে চিন্তা করে, তবে সে বুঝতে পারবে এই দুনিয়ায় আমাদের অবস্থান কত ক্ষণস্থায়ী।"
ফাতেমা বই থেকে চোখ তুলে অত্যন্ত প্রজ্ঞার সাথে বললেন, "ঠিক বলেছেন, সাদিক। মানুষ যখন সুস্বাস্থ্যের অধিকারী থাকে, তখন সে ভুলে যায় যে এই শক্তি বা যুবাবস্থা চিরকালের জন্য নয়। দুনিয়ার এই সাময়িক জীবনটাকে মানুষ চিরস্থায়ী ঘর বানিয়ে নেয়, অথচ আমাদের আসল ঠিকানা তো অন্য কোথাও। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বারবার আমাদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, দুনিয়ার জীবন হলো কেবল খেলাধুলা ও ধোঁকার বস্তু, আর পরকালের জীবনই হলো আসল ও চিরস্থায়ী।"
সাদিক ফাতেমার কথার সাথে মাথা নেড়ে সম্মতি জানিয়ে বললেন, "হ্যাঁ, ফাতেমা। আমরা যদি আমাদের প্রতিটি দিনকে জীবনের শেষ দিন মনে করে আল্লাহর ইবাদতে ও সৎকাজে কাটাতে পারি, তবে মৃত্যুর ভয় আর কাউকে স্পর্শ করবে না। আমার কেবল একটাই ভয় হয়—আমরা দুনিয়ায় যে কটি দিন বেঁচে আছি, তা কি আমাদের রবের সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য যথেষ্ট হচ্ছে?"
ফাতেমা পরম স্নেহে সাদিকের হাতটি নিজের হাতের ভেতর শক্ত করে ধরে বললেন, "যে মানুষটি প্রতিদিন হালাল রিযিকের জন্য ঘাম ঝরায়, সততার পথ থেকে একচুলও সরে দাঁড়ায় না এবং শেষ রাতে তাহাজ্জুদে দাঁড়িয়ে রবের দরবারে চোখের পানি ফেলে, তার ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই, ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ তো অত্যন্ত দয়ালু। তিনি আমাদের নিখুঁত হওয়ার চান না, তিনি চান আমরা যেন তাঁর দিকে ফিরে আসার ক্রমাগত চেষ্টা চালিয়ে যাই।"
➤সাদাকাহ ও সদকায়ে জারিয়ার গুরুত্ব
কথায় কথায় রাতের খাবার সময় হয়ে এল। আজকের খাবারটা ছিল খুব সাধারণ—গরম ভাতের সাথে মসুর ডাল আর ডিম ভাজা। কিন্তু ফাতেমা অত্যন্ত যত্নের সাথে খাবার পরিবেশন করলেন। খাওয়ার সময় তারা আলোচনা করলেন সদকায়ে জারিয়া (এমন দান যা মৃত্যুর পরও জারি থাকে) নিয়ে।
সাদিক খেতে খেতে বললেন, "জানো ফাতেমা, অসুস্থতার এই সময়ে আমার মনে হচ্ছিল, আমরা তো বড় কোনো ধন-সম্পদ বা অট্টালিকা রেখে যেতে পারব না। তবে আমরা মৃত্যুর পর সমাজে কী রেখে যাব? এমন কিছু কি করা উচিত নয়, যা আমাদের অবর্তমানেও মানুষের উপকারে আসে এবং আমাদের জন্য সদকায়ে জারিয়া হয়?"
ফাতেমার চোখ দুটো এই কথা শুনে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। তিনি অত্যন্ত আগ্রহের সাথে বললেন, "আপনার এই চিন্তাটাই তো আমার মনের কথা! আমাদের কাছে হয়তো কোটি টাকা নেই, কিন্তু আমরা তো আমাদের জমানো সামান্য কিছু টাকা দিয়ে কোনো এতিমখানায় একটি কোরআন শরিফ কিনে দিতে পারি, কোনো গরিব শিশুকে পড়াশোনার সামান্য খরচ জুগিয়ে দিতে পারি, কিংবা রাস্তার ধারে একটি ছোট নলকূপ বসানোর জন্য সাধ্যমতো চেষ্টা করতে পারি। নবীজি (সা.) শিখিয়েছেন, মানুষের মৃত্যুর পর তিনটি জিনিস ছাড়া সব আমল বন্ধ হয়ে যায়—সদকায়ে জারিয়া, এমন ইলম বা জ্ঞান যা দ্বারা উপকৃত হওয়া যায়, এবং নেক সন্তান যে তার জন্য দোয়া করে।"
সাদিক মুগ্ধ হয়ে ফাতেমার কথা শুনলেন। একজন নারী কীভাবে এত সুন্দর ও দূরদর্শী চিন্তা করতে পারেন, তা ভেবে তাঁর বুকটা গর্বে ভরে উঠল। তিনি বুঝতে পারলেন, ফাতেমা কেবল তাঁর দুনিয়াবি স্ত্রী নন, বরং তিনি হলেন তাঁর আখিরাতের মুক্তির প্রধান উসিলা।
➤রাতের গভীরতা ও জান্নাতের সুউচ্চ মাকামের ফিকির
রাত গভীর হলো। ঘড়ির কাঁটা যখন আবার সেই পরিচিত শেষ প্রহরে এসে পৌঁছাল—ঠিক রাত তিনটে—দুজনের ঘুম ভেঙে গেল। দিনের সেই অসুস্থতা কাটিয়ে সাদিক এখন সম্পূর্ণ চাঙ্গা অনুভব করছিলেন। কোনো জাগানোর অ্যালার্ম ছাড়াই তাদের অবচেতন মন রবের সাথে সাক্ষাতের জন্য উন্মুখ হয়ে থাকত।
দুজনে নীরবে অজু সেরে যখন তাহাজ্জুদের জায়নামাজে দাঁড়ালেন, তখন শীতের সেই ঠান্ডা বাতাস আর রাতের নিস্তব্ধতা মিলে এক অলৌকিক আধ্যাত্মিক পরিবেশের সৃষ্টি করল।
সাদিক যখন সিজদায় লুটিয়ে পড়ে ফিসফিস করে আল্লাহর দরবারে দোয়া করছিলেন, তখন তাঁর চোখের পানি গড়িয়ে পড়ছিল জায়নামাজে। তিনি দোয়া করছিলেন, "হে আমাদের রব, আমাদের জীবনকে আপনার সন্তুষ্টির ওপর পরিচালনা করুন এবং আমাদের মৃত্যুর পর আমাদের আমলনামা সদকায়ে জারিয়া দ্বারা সমৃদ্ধ করে দিন।"
ফাতেমাও পাশের জায়নামাজে সিজদা অবস্থায় রবের দরবারে হাত তুলে গভীর আকুতি নিয়ে আমীন বলছিলেন। তাঁদের এই গোপন ইবাদত, এই কান্নাকাটি এবং রবের প্রতি এই গভীর আত্মসমর্পণ প্রমাণ করছিল যে, দুনিয়ার শত অসুস্থতা, ঝড়-ঝাপটা বা মোহের কোনো ঝড়ই তাদের এই পবিত্র বন্ধনকে একচুলও টলাতে পারবে না।
তাদের এই সাদামাটা ছোট্ট বাসাটি যেন দুনিয়ার বুকে সত্যিই এক টুকরো জান্নাতের সুশীতল ছায়া হয়ে প্রস্ফুটিত হচ্ছিল।
ভোরের প্রথম আলোর রেখা যখন পূর্ব আকাশে ফুটতে শুরু করল, সাদিক ও ফাতেমা জায়নামাজ গুছিয়ে রেখে একে অপরের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন।
তাঁদের এই পথচলা ছিল দুনিয়ার মোহমুক্ত, পরকালের পাথেয় সমৃদ্ধ এবং জান্নাতের সুউচ্চ মাকামের দিকে ধাবমান এক অবিরাম কাফেলা।
চলবে....