🖤 উপন্যাস: তুই আমার মায়াবী নেশা
লেখিকা: ফারহানা আক্তার
প্রথম পর্ব
চৌধুরী বাড়ি
চৌধুরী বাড়ির একমাত্র ছেলে আরিয়ান চৌধুরী। বাবা রায়হান চৌধুরী এবং মা রাবেয়া চৌধুরী। বিশাল সম্পত্তি, সম্মান আর আভিজাত্যে ভরা তাদের পরিবার।
আরিয়ানের দুই চাচাতো বোন রয়েছে। পুরো পরিবার নিয়ে বেশ সুখেই দিন কাটছিল তাদের।
কিন্তু আজকের বিকেলটা যেন অন্য রকম।
ড্রয়িংরুমে দাঁড়িয়ে আছে আরিয়ান। রাগে তার চোখমুখ লাল হয়ে আছে। অন্যদিকে সোফায় বসে আছেন তার মা রাবেয়া চৌধুরী।
আরিয়ান রাগান্বিত কণ্ঠে বলে উঠল—
— আম্মু! আমি এই বিয়ে করব না। তুমি আমাকে জোর করতে পারো না। আমার যথেষ্ট বয়স হয়েছে। তুমি একটা পিচ্চি মেয়েকে আমার ঘাড়ে চাপিয়ে দিতে চাও? নো! আমি মানব না। এই বিয়ে করব না, করব না, করব না!
রাবেয়া চৌধুরী শান্ত গলায় বললেন—
— তুই একটু বেশিই কথা বলিস। তোকে বলছি না, ওই মেয়েকেই বিয়ে করতে হবে। তোর বাবা বিয়ে ঠিক করে এসেছে। এখন এখানে আমার কিছু করার নেই। আমাকে বললেও কিছু হবে না। কাল যেন রেডি হয়ে থাকিস।
— আম্মু!
— কোনো কথা না। যা, এখন এখান থেকে যা।
আরিয়ান রাগে নিজের চুলের মধ্যে হাত চালিয়ে দিল। তারপর সামনে থাকা টেবিলটিতে লাথি মারল।
— উফফ! আমার মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে!
মনে মনে বলতে লাগল—
আমার বাবা-মা দুজনেই কি পাগল হয়ে গেছে? একটা চৌদ্দ বছরের মেয়ের সঙ্গে আমার বিয়ে ঠিক করেছে! এটা কীভাবে সম্ভব? আমি এই বিয়ে কিছুতেই মেনে নেব না।
এদিকে রাবেয়া চৌধুরী ছেলের এমন আচরণ দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
কিছুক্ষণ পর
আরিয়ান নিজের ঘরে বসে আছে। মাথার মধ্যে হাজারটা চিন্তা ঘুরছে।
— না! এভাবে হবে না। আমাকে কিছু একটা করতেই হবে। আমি এই বিয়ে করব না। আগে একটু বাইরে যাই। মাথাটা ঠান্ডা করা দরকার।
বিকেলের দিকে আরিয়ান কালো বাইক নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ল।
নিরিবিলি রাস্তা ধরে বাইক নিয়ে এগিয়ে চলল সে। তার মনটা একদম ভালো নেই।
হঠাৎ—
একটি মেয়ে এসে তার বাইকের সামনে ধাক্কা খেল।
আরিয়ান তাড়াতাড়ি বাইক থামিয়ে রাগী চোখে মেয়েটির দিকে তাকাল।
— এই মেয়ে! চোখে দেখতে পাও না? ইডিয়ট! কানা নাকি? চোখ কি পকেটে রেখে হাঁটো?
মেয়েটিও রেগে গিয়ে বলল—
— আপনি দেখতে পারেন না? বাইক কীভাবে চালান? দেখেশুনে চালাতে পারেন না? এখন যদি আমার কোনো দুর্ঘটনা হয়ে যেত, তাহলে দায়ী কে হতো?
আরিয়ান রাগে দাঁত চেপে বলল—
— যত্তসব! কোথা থেকে যে আপদ এসে জোটে!
মেয়েটিও রাগে গজগজ করতে করতে সেখান থেকে চলে গেল।
আরিয়ান কিছুক্ষণ মেয়েটির চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল।
— অসহ্য! একদিনও শান্তিতে থাকতে পারি না!
রাত ৯টা | চৌধুরী বাড়ি
রাত প্রায় নয়টা বাজে। আরিয়ান এখনো বাড়ি ফেরেনি। সন্ধ্যা সাতটার দিকে বাইক নিয়ে বের হয়েছিল সে।
ড্রয়িংরুমে বসে আছেন রায়হান চৌধুরী। বারবার ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছেন তিনি। ছেলের জন্য বেশ চিন্তা হচ্ছে তাঁর।
রায়হান চৌধুরী বিরক্ত হয়ে বললেন—
— ছেলেটা এখনো বাড়ি ফিরল না কেন? সেই সাতটার সময় বের হয়েছে, এখন রাত নয়টা বাজে! কোথায় থাকে সে?
রাবেয়া চৌধুরী পাশ থেকে বললেন—
— তুমি একটু শান্ত হও। হয়তো বন্ধুদের সঙ্গে কোথাও আছে।
— আর কত শান্ত হব? দিন দিন ছ বেপরোয়া হয়ে যাচ্ছে। কোনো কথাই শুনতে চায় না। বিয়ের কথা বলতেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল! আজকে ওর সঙ্গে কথা বলতেই হবে।
রাবেয়া চৌধুরী দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন—
— আমিও তো বুঝতে পারছি না, কীভাবে ওকে বোঝাব।
রায়হান চৌধুরী গম্ভীর কণ্ঠে বললেন—
— ও বাড়িতে ফিরুক, তারপর কথা হবে। তবে একটা কথা, ওর ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আমাদের ভালোভাবে ভাবতে হবে।
এমন সময় বাড়ির প্রধান দরজার বাইরে বাইকের শব্দ শোনা গেল।
রাবেয়া চৌধুরী দরজার দিকে তাকিয়ে বললেন—
— মনে হচ্ছে আরিয়ান এসেছে!
রায়হান চৌধুরী সোফা থেকে উঠে দাঁড়ালেন।
— আজকে ছেলেটার সঙ্গে আমার কথা আছে!দরজা খুলে আরিয়ান ভেতরে প্রবেশ করল। হাতে বাইকের চাবি, মুখে বিরক্তির ছাপ।
রায়হান চৌধুরী গম্ভীর কণ্ঠে বললেন—
— এত রাতে কোথায় ছিলি তুই?
আরিয়ান স্বাভাবিকভাবে বলল—
— বাইরে ছিলাম। এখন কি সেটারও হিসাব দিতে হবে?
— আমার সঙ্গে মুখে মুখে কথা বলবি না। তোকে একটা কথা বলার আছে। এদিকে আয়।
আরিয়ান মনে মনে বিরক্ত হয়ে বলল—
আবার কী শুরু হলো! বাড়িতে ঢুকতেই শান্তি নেই!
এবার তুই বল, আরিয়ান বাবার কথা শুনবে নাকি আবার ঝগড়া করবে? 💗🖤
চৌধুরী বাড়ি | রাত ৯টা
আরিয়ান বিরক্ত মুখে বাবার সামনে এসে দাঁড়াল।
রায়হান চৌধুরী ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন—
— কাল তোর বিয়ে। আশা করি এবার আর কোনো ঝামেলা করবি না।
আরিয়ান অবাক হয়ে বাবার দিকে তাকাল।
— আব্বু! আবার সেই একই কথা? আমি তো আগেই বলেছি, এই বিয়ে আমি করব না!
— বিয়েটা আমি ঠিক করেছি। আর তুই আমার ছেলে। আমার সিদ্ধান্তের একটা মূল্য আছে।
— কিন্তু আব্বু, আমার জীবন নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার কি আমার নেই?
রায়হান চৌধুরী কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
রাবেয়া চৌধুরী মাঝখান থেকে বললেন—
— আরিয়ান, বাবার সঙ্গে এভাবে কথা বলিস না।
আরিয়ান মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল—
— আম্মু, প্লিজ! তোমরা দুজন মিলে আমাকে পাগল করে দিচ্ছ। আমি এখন বিয়ে করতে চাই না। আমার নিজের একটা জীবন আছে, স্বপ্ন আছে!
এই বলে আরিয়ান আর দাঁড়াল না। দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল।
রায়হান চৌধুরী ছেলের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
— ছেলেটাকে কীভাবে বোঝাব, সেটাই বুঝতে পারছি না।
রাবেয়া চৌধুরী নিচু গলায় বললেন—
— সময় হলেই সব ঠিক হয়ে যাবে।
অন্যদিকে, আরিয়ানের ঘর।
আরিয়ান বিছানায় বসে ফোনটা হাতে নিল। কিন্তু কিছুতেই তার মন বসছে না।
— উফফ! কাল আবার কী হতে যাচ্ছে! না, আমাকে কিছু একটা করতেই হবে!