কিছু গল্পের সমাপ্তি সুন্দর
লেখিকা: মারজান আক্তার মির্হা
পর্ব – ০৩
মুখোশের আড়ালে
সময় কখনো কারও জন্য অপেক্ষা করে না। মানুষ ভালো থাকুক কিংবা খারাপ, সময় তার নিজের গতিতে চলতেই থাকে। আর এই চলার পথে কখন যে কিছু মানুষ আমাদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে, তা আমরা নিজেরাও বুঝতে পারি না।
মেহরিনের নতুন প্রতিষ্ঠানে আসার প্রায় এক মাস হয়ে গেছে। প্রথম দিনের সেই অস্বস্তি এখন অনেকটাই কেটে গেছে। পরিচিত মুখগুলোও ধীরে ধীরে আপন হয়ে উঠছে। বিশেষ করে সুমাইয়ার সঙ্গে তার বন্ধুত্বটা বেশ ভালো জায়গায় পৌঁছেছে।
প্রতিদিন সকালে প্রতিষ্ঠানে গিয়ে দুজন একসঙ্গে বসে। ক্লাসের ফাঁকে গল্প করে, টিফিন ভাগাভাগি করে খায়। কখনো পড়াশোনা নিয়ে আলোচনা হয়, আবার কখনো একেবারেই সাধারণ বিষয় নিয়ে হাসাহাসি চলে।
মেহরিনের কাছে এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলো বেশ ভালো লাগত।
তবে সবকিছু যে আগের মতো স্বাভাবিক ছিল, তা নয়। খাদিজার আচরণ দিন দিন অদ্ভুত হয়ে উঠছিল। কখনো সামনে ভালোভাবে কথা বলত, আবার কখনো অন্যদের কাছে মেহরিন সম্পর্কে নানা মন্তব্য করত।
মেহরিন এসব বিষয় এড়িয়ে চলার চেষ্টা করত। কিন্তু সবকিছু এড়িয়ে চলা কি এত সহজ?
একদিন সকালে ক্লাসে গিয়ে দেখল, সুমাইয়া তার জায়গায় বসে নেই। সে অন্য একটি মেয়ের সঙ্গে কথা বলছে। মেহরিন কাছে গিয়ে বলল,
—কী ব্যাপার? আজ এখানে বসেছিস কেন?
সুমাইয়া একটু অপ্রস্তুত হয়ে বলল,
—এমনিই। তুই বস, আমি আসছি।
মেহরিন নিজের জায়গায় বসে পড়ল। কিন্তু কেন জানি সুমাইয়ার আচরণটা একটু অন্যরকম মনে হলো।
কিছুক্ষণ পর ক্লাস শুরু হয়ে গেল। পুরো সময়টাতে সুমাইয়া আর তার সঙ্গে তেমন কথা বলল না।
মেহরিন ভাবল, হয়তো কোনো কারণে তার মন খারাপ। তাই আর কিছু জিজ্ঞেস করল না।
টিফিনের সময় সুমাইয়া নিজে থেকেই কাছে এল।
—মেহরিন, একটা কথা বলব?
—হ্যাঁ, বল।
—তুই কি আমার ওপর কোনো কারণে রাগ করেছিস?
মেহরিন অবাক হয়ে বলল,
—আমি কেন রাগ করব? তুই কি কিছু করেছিস?
সুমাইয়া একটু চুপ করে থেকে বলল,
—না, আসলে কিছু মানুষ বলছে, তুই নাকি আমার সঙ্গে শুধু নিজের প্রয়োজনেই মিশিস।
কথাটা শুনে মেহরিন কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
—মানুষ কী বলল, সেটা দিয়ে আমাদের বন্ধুত্বের মূল্য নির্ধারণ করবি?
সুমাইয়া মাথা নিচু করে বলল,
—আমি জানি না। তবে কথাগুলো শুনে একটু খারাপ লেগেছে।
মেহরিন তার দিকে তাকিয়ে বলল,
—দেখ, আমাদের বন্ধুত্ব যদি সত্যিই ভালো হয়, তাহলে অন্য কারও কথা শুনে সেটা নষ্ট করার কোনো মানে নেই। আর আমার কোনো আচরণে তোর খারাপ লাগলে সরাসরি আমাকে বলবি। অন্য কারও কাছ থেকে আমার কথা শুনে সিদ্ধান্ত নিবি না।
সুমাইয়া এবার একটু হাসল।
—আচ্ছা, আর এমন হবে না।
মেহরিনও হেসে বলল,
—তাহলে চল, টিফিন খাই। এত কথা বলে তো খাবারই শেষ হয়ে যাবে!
দুজন আবার আগের মতো গল্প করতে লাগল।
কিন্তু মেহরিনের মনে একটা প্রশ্ন থেকে গেল। কে তাদের বন্ধুত্ব নিয়ে এমন কথা বলছে?
সে কাউকে সন্দেহ করতে চাইল না। কারণ অকারণে কাউকে দোষারোপ করা তার স্বভাব ছিল না।
এদিকে খাদিজা যেন সবকিছু খুব মনোযোগ দিয়ে লক্ষ্য করছিল।
কয়েক দিন পর একটি ঘটনা ঘটল, যা মেহরিনকে বেশ অবাক করেছিল।
সেদিন শিক্ষিকা সবাইকে একটি দলীয় কাজ করতে বললেন। প্রত্যেককে কয়েকজন করে ভাগ করে দেওয়া হলো। মেহরিনের দলে ছিল সুমাইয়া, খাদিজা এবং আরও দুজন মেয়ে।
কাজটি ছিল একটি নির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর সুন্দরভাবে লিখে উপস্থাপন করা। সবাইকে নিজেদের দায়িত্ব ভাগ করে নিতে বলা হলো।
মেহরিন বলল,
—আমরা যদি কাজগুলো ভাগ করে নিই, তাহলে সহজ হবে। একজন তথ্য লিখবে, একজন বিষয়গুলো গুছিয়ে দেবে, আরেকজন সুন্দর করে উপস্থাপনার প্রস্তুতি নেবে।
খাদিজা সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—সবকিছু কি তুই ঠিক করে দিবি? আমরা কি কিছুই বুঝি না?
মেহরিন একটু থেমে বলল,
—না, আমি শুধু একটা প্রস্তাব দিলাম। তোমাদের অন্য কোনো পরিকল্পনা থাকলে বলো।
খাদিজা মুখ ফিরিয়ে নিল।
সুমাইয়া পরিবেশটা স্বাভাবিক করার জন্য বলল,
—আচ্ছা, ঝগড়া না করে কাজ শুরু করি। সময় কিন্তু বেশি নেই।
শেষ পর্যন্ত সবাই নিজেদের কাজ ভাগ করে নিল।
মেহরিন নিজের দায়িত্ব অনুযায়ী কাজ শেষ করল। বাড়িতে গিয়েও কিছু তথ্য সংগ্রহ করল, লেখাগুলো সুন্দরভাবে সাজাল। পরদিন সবকিছু নিয়ে প্রতিষ্ঠানে এল।
কিন্তু ক্লাসে গিয়ে জানতে পারল, খাদিজা নাকি শিক্ষিকাকে বলেছে, মেহরিন একাই সব সিদ্ধান্ত নেয় এবং অন্যদের কাজ করতে দেয় না।
মেহরিন কথাটা শুনে খুব অবাক হলো।
সে শিক্ষিকার কাছে গিয়ে বিষয়টি পরিষ্কার করার চেষ্টা করল। শিক্ষিকা দুজনের কথা শুনে বললেন,
—তোমরা একসঙ্গে কাজ করতে শিখবে। একজনের মতামত আরেকজনকে সম্মান করতে হবে। পড়াশোনার পাশাপাশি এগুলো শেখাও জরুরি।
মেহরিন মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।
সেদিন বাড়ি ফেরার পর তার মনটা কিছুটা খারাপ ছিল। সে বুঝতে পারছিল না, কেন ছোট ছোট বিষয়কে এত বড় করে দেখা হচ্ছে।
মা তাকে দেখে জিজ্ঞেস করলেন,
—কী হয়েছে? আজ এত চুপচাপ কেন?
মেহরিন বলল,
—কিছু না মা। প্রতিষ্ঠানে একটু সমস্যা হয়েছে।
—কী ধরনের সমস্যা?
মেহরিন পুরো ঘটনাটা মাকে খুলে বলল।
মা মনোযোগ দিয়ে সব শুনলেন। তারপর বললেন,
—দেখ মা, সব জায়গায় সব ধরনের মানুষ থাকবে। কারও সঙ্গে মতের অমিল হলেই তাকে খারাপ ভাবতে নেই। তবে নিজের সম্মানটাও বজায় রাখতে হবে। কাউকে কষ্ট দিবি না, আবার কাউকে নিজের শান্তি নষ্ট করার সুযোগও দিবি না।
মায়ের কথাগুলো শুনে মেহরিনের মনটা কিছুটা হালকা হলো।
সে বুঝতে পারল, সব সমস্যার সমাধান অন্যদের পরিবর্তন করার মধ্যে নেই। অনেক সময় নিজের প্রতিক্রিয়াটাও বদলাতে হয়।
এরপর কয়েক দিন সবকিছু মোটামুটি স্বাভাবিক ছিল।
একদিন বিকেলে সুমাইয়া তাকে ফোন করল।
—মেহরিন, কী করছিস?
—পড়তে বসেছিলাম। বল, কী হয়েছে?
—কাল একটু আগে আসবি? তোকে একটা কথা বলার আছে।
—কী কথা?
—ফোনে বলা যাবে না। কাল বলব।
মেহরিন একটু অবাক হলেও আর কিছু জিজ্ঞেস করল না।
পরদিন সে যথাসময়ে প্রতিষ্ঠানে পৌঁছাল। সুমাইয়া আগে থেকেই অপেক্ষা করছিল।
দুজন নিরিবিলি জায়গায় দাঁড়ালে সুমাইয়া বলল,
—তোর সঙ্গে একটা বিষয় নিয়ে কথা বলতে চাই।
—বল।
সুমাইয়া একটু ইতস্তত করে বলল,
—খাদিজা আমার কাছে তোর সম্পর্কে কিছু কথা বলেছে।
মেহরিন শান্তভাবে বলল,
—কী বলেছে?
—বলেছে, তুই নাকি আমার সঙ্গে বন্ধুত্ব করিস শুধু নিজের সুবিধার জন্য। আর তুই নাকি অন্যদের সামনে আমাকে ছোট করিস।
মেহরিন এবার সত্যিই অবাক হলো।
—আমি তো কখনো এমন কিছু করিনি। তুই কি আমার কোনো আচরণে কষ্ট পেয়েছিস?
সুমাইয়া মাথা নাড়ল।
—না। তাই তোকে সরাসরি জিজ্ঞেস করতে চেয়েছি।
মেহরিন কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল,
—তাহলে একটা কাজ কর। ভবিষ্যতে কেউ আমার সম্পর্কে কিছু বললে আগে আমার কাছে জানতে চাইবি। আমিও তোর সম্পর্কে কিছু শুনলে তোর সঙ্গে কথা বলব। এতে ভুল বোঝাবুঝি হবে না।
সুমাইয়া বলল,
—ঠিক আছে। আমি আসলে চাই না, আমাদের বন্ধুত্ব নষ্ট হোক।
মেহরিন হেসে বলল,
—আমিও চাই না।
কথা শেষ করে দুজন ক্লাসে চলে গেল।
সেদিন মেহরিন একটা বিষয় বুঝল—বন্ধুত্ব শুধু একসঙ্গে হাসাহাসি করার নাম নয়। বন্ধুত্বের আসল পরীক্ষা হয় তখন, যখন অন্য কেউ ভুল বোঝানোর চেষ্টা করে।
যে সম্পর্কের মধ্যে বিশ্বাস থাকে, সেখানে প্রশ্ন করার সাহসও থাকে। আর যেখানে বিশ্বাস নেই, সেখানে ছোট্ট একটা কথাও বড় দূরত্ব তৈরি করতে পারে।
দিনগুলো আবার নিজের গতিতে চলতে লাগল।
তবে মেহরিনের জীবনে আরেকটি পরিবর্তন আসছিল। সে আগের চেয়ে অনেক বেশি নিজের কাজে মনোযোগী হয়ে উঠছিল। অযথা কারও কথায় মন খারাপ করত না। পড়াশোনার পাশাপাশি নিজের ডায়েরিতে প্রতিদিনের কিছু ঘটনা লিখে রাখত।
এক রাতে ডায়েরি খুলে লিখল—
'আজ বুঝলাম, কাউকে বিশ্বাস করা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি সেই বিশ্বাসের মর্যাদা রাখাও জরুরি। সবাইকে বন্ধু ভাবা যায় না। আবার একজন মানুষের ভুলের কারণে পৃথিবীর সব মানুষকে অবিশ্বাস করাও ঠিক নয়। সময়ের সঙ্গে মানুষকে চিনতে হয়।'
লেখা শেষ করে কলমটা রেখে দিল।
ঠিক তখনই ফোনে একটি মেসেজ এল।
সুমাইয়া লিখেছে,
'কাল কিন্তু একসঙ্গে বসব। তোর সঙ্গে একটা নতুন পরিকল্পনা আছে!'
মেহরিন হেসে উত্তর দিল,
'ঠিক আছে। তবে পরিকল্পনাটা যেন পড়াশোনার ক্ষতি না করে!'
সুমাইয়া সঙ্গে সঙ্গে লিখল,
'আরে না! এবার অন্যরকম কিছু হবে।'
মেহরিন আর উত্তর দিল না। ফোনটা পাশে রেখে ঘুমানোর প্রস্তুতি নিল।
কিন্তু পরদিন কী ঘটতে চলেছে, তা সে কল্পনাও করতে পারেনি।
কারণ কিছু ঘটনা আমাদের জীবনে আসে খুব সাধারণভাবে। প্রথমে সেগুলোকে গুরুত্ব দিই না। পরে বুঝতে পারি, সেই ছোট্ট ঘটনাই আমাদের জীবনের বড় কোনো পরিবর্তনের শুরু ছিল।
মেহরিনের জীবনেও হয়তো তেমন কিছু অপেক্ষা করছিল।
তবে একটা বিষয় সে তখনো জানত না—যাদের সে নিজের জীবনের কাছের মানুষ ভাবতে শুরু করেছে, তাদের মধ্য থেকেই একদিন এমন একজনের আসল পরিচয় সামনে আসবে, যা তাকে নতুন করে মানুষ চিনতে শেখাবে।
চলবে...
কখনো কখনো সম্পর্ক ভাঙে কোনো বড় ঘটনার কারণে নয়, বরং ছোট ছোট মিথ্যা আর ভুল বোঝাবুঝির কারণে।