#আনাস্তাসিয়া
#লেখিকা_সামিয়া
#পর্ব:৪
সকাল ৭ টায়।
গতো কয়েকদিন ভাড়ি তুষারপাত হলেও আজ জেন একটু সূর্যের দেখা মিলেছে। সূর্যের আলো কাঁচের দেওয়ালের পর্দার ফাঁক দিয়ে ভেত করে এসে পরলো আদ্রিয়ানের মুখে। মুখের উপর সূর্যের আলো পড়ায় তার ঘুমে ব্যাঘাত ঘটে, যার ফলে বিরক্তিতে নাক মুখ কুঁচকে ফেলে। সূর্যের আলো তাঁর ঘুমের ব্যাঘাত ঘটানোর ফলে সে বিরক্তিতে আর মরা ভেঙে উঠে বসে। কিছু ক্ষণ বসে বসে ঝিমুতে থাকার পর চোখ খুলে পাশে তাকায়। পাশে তাকাতেই দেখে আনাস্তাসিয়া বিছানায় নেই তার পাশে ফাঁকা পড়ে আছে। আনাস্তাসিয়াকে বিছানায় না দেখতে পেয়ে পুরো রুমে চোখ বুলায়, না নেই। তার পর সে ধীরে ধীরে বিছানা থেকে উঠে বেলকনির দিকে যেতে থাকে। বেলকনির দিকে যাওয়ার সময় তার পা থমকে যায়। বেলকনির বাম দিকে একটি কক্ষের দিকে তাকাতেই দেখল আনাস্তাসিয়া পাঞ্চিং ব্যাগে লাফিয়ে লাফিয়ে পাঞ্চ করছে আর কিক করছে। আদ্রিয়ান ধীর পায়ে সামনে এগিয়ে গেল, দরজায় হেলান দিয়ে দুই হাত আড়াআড়ি ভাবে বুকে ভাঁজ করে দাঁড়িয়ে চারিদিক একবার পর্যবেক্ষণ করলো। কক্ষটি সাধারণ একটি জিম, চারিদিকে সকল আধুনিক শরীর চর্চার যন্ত্রপাতি ট্রেডমিল, এলিপটিক্যাল, স্টেশনারি বাইক,রোয়িং মেশিন,ডাম্বেল ও বারবেল,ওজন প্লেট ও বেঞ্চ,পাওয়ার র্যাক ও স্কোয়াট র্যাক,কেবল মেশিন ও পুলি,লেগ প্রেস মেশিন, জিম বল ও এক্সারসাইজ বল,রেসিস্ট্যান্স ব্যান্ড,পাঞ্চিং ব্যাগ,ইয়োগা ম্যাট দিয়ে সাজানো।
আদ্রিয়ান এবার আনাস্তাসিয়ার দিকে তাকালো। তার পরনে ছাই রঙা স্ক্রিন টাইট প্যান্ট সাদা শার্ট টিশার্ট যা কোমর ছুঁই ছুঁই। দুই হাতে কালো হ্যান্ড র্যাপ আর পায়ে এয়ার জর্ডান ১৩ স্নিকার। তার চোয়াল শক্ত আর মুখে ফুটে রয়েছে গম্ভীরতা। সে পাঞ্চিং ব্যাগে এমন ভাবে পাঞ্চ আর কিক করছে যেন সে কোন শত্রুকে মারছে। আদ্রিয়ান বেশ কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থাকলো।
__" আহারে বেচারার উপর এভাবে এভাবে অত্যাচার করছো কেন বৌঔঔ"?
আদ্রিয়ান সমবেদনা দেখিয়ে কথাটি বলে। আচমকা কোন পুরুষালী কন্ঠ পেয়ে থেমে গেল আনাস্তাসিয়া। ঘার ঘুরিয়ে দরজার দিকে তাকাতেই দেখল, আদ্রিয়ান দেওয়ালে হেলান দিয়ে দুই হাত বুকে ভাঁজ করে দাঁড়িয়ে তার দিকেই তাকিয়ে আছে। আনাস্তাসিয়া তাকাতেই আদ্রিয়ান চোখ টিপ মেরে ফ্লাইং কিস ছুড়ে দিয়ে বাঁকা হাসলো। তা দেখে আনাস্তাসিয়া থতমত খেয়ে গেল। তার পর বিরক্তি তে বিরবির করে বলে,
__" uncivilized.
অতঃপর কঠিন কন্ঠে বলে,
__" আপনি এখানে কি করছেন"?
আদ্রিয়ান এবার তার দিকে এগোতে এগোতে বলে,
__" ঘুম থেকে উঠে দেখি আমার রাগি বউটা পাশে নেই, তাই তাকে খুঁজতে খুঁজতে এখানে এসে পরেছি"।
তার পর আনাস্তাসিয়ার কাছে এসে তার কোমর নিজের এক হাত দিয়ে পেঁচিয়ে ধরে তাকে কাছে টানতে টানতে বলে,
__" আর পর দেখি আমার রাগি বউটা বেচারা পাঞ্চিং ব্যাগের উপর অত্যাচার করছে।
বাক্যটি শেষ করার সাথে সাথে আনাস্তাসিয়াকে তার সাথে একেবারে মিশিয়ে শক্ত করে চেপে ধরল। আনাস্তাসিয়া এক মুহুর্তের জন্য যেন নিস্তব্ধ হয়ে গেল। তার নাকে ভেসে আসতে লাগলো সেই চিরাচরিত নেশা রুদ্র পারফিউমের মিষ্টি ঘ্রাণ। পারফিউমের ঘ্রাণ নাকে যেতেই মাতাল হয়ে গেল সে। অতঃপর জোরে একটি দূর্ঘ নিঃশ্বাস টেনে তার শরীরে ঘ্রাণ নিজের ভেতর টেনে নিল। নিঃশ্বাস টানতেই যেন সম্পুর্ন নেশা তার মাথা থেকে শুরু করে পুরো শরীরে ছড়িয়ে গেল। সে যেন কোন এক ঘোরে ডুবে গেল। সে ঘোর লাগা দৃষ্টিতে উপরে তাকালো। উপরে তাকাতেই যেন তার নেশা দ্বিগুণ হয়ে গেল। আদ্রিয়ানে গলার অ্যাডামস অ্যাপল টার দিকে তাকিয়ে কয়েকটা শুকনো ঢোঁক গিল্ল। তার হৃদস্পন্দন দ্রুত বাড়তে লাগলো, উঁচু অ্যাডামস অ্যাপল টার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তা কামড়ে খেয়ে ফেলতে ইচ্ছে করল। তাঁকে যেন কোন এক নিষিদ্ধ আসক্তিতে টানছে। আনাস্তাসিয়াকে তার দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে আদ্রিয়ান বাঁকা হাসলো। তার পর আস্তে করে আনাস্তাসিয়ার দিকে ঝুঁকে তার কানের লতিতে ঠোঁট ছুঁইয়ে হাস্কি সরে ফিসফিস করে বলে,
__" Baby will eat me.
আদ্রিয়ান ঠোঁট ছোঁয়ানোর সাথে সাথে তার শরীরে বিদ্যুৎ খেলে যায়। আদ্রিয়ানের কথা কানে আসতেই তার শরীর শিউরে উঠে। তার ঘোর কাটতেই সে ছোটার জন্য মচরামুচরি করতে থাকে কিন্তু শক্ত পুরুষালী বন্ধনে আবদ্ধ থাকায় ছাড়া পায় না। অনাস্তাসিয়াকে মচরামুচরি করতে দেখে আরো শক্ত করে চেপে ধরে। আনাস্তাসিয়া নিজের সর্বশক্তি দিয়ে ছাড়া পাওয়া চেষ্টা করতে করতে ঝাঁজ মেশান কন্ঠে বলে,
__" see i have no interest in eating you".
আদ্রিয়ান বাঁকা হেসে বলল,
__" ও রিয়েলি,তাহলে ও ভাবে দেখছিলে কেন"?
আনাস্তাসিয়া ধরা পড়ে যাওয়ায় কিছু ক্ষণ চুপ করে রইলো। তারপর এদিকে ওদিকে চোখ ঘুরিয়ে আমতা আমতা করে বলে,
__" ক...ক...কই না তো, আমি কেন আপনাকে দেখতে যাব"?
__" মুরগীর মত কক কক করছো কেন? দেখতে চাইলে সরাসরি দেখ। চাইলে সব খুলেও.....
বলেই আদ্রিয়ানের মুখে ডেভিল স্মাইল ফুটে উঠল। কথাটি শুনে আনাস্তাসিয়ার শরীরের রক্ত যেন ঠান্ডা হয়ে গেল। তার কান দুটো লজ্জায় গরম হয়ে গেছে। এতো পুরুষ মানুষকে সে উলঙ্গ অবস্থায় দেখে তাদের খুন করেছে তবুও যেন আদ্রিয়ানের কথাটি শুনে তার কেমন যেন অস্বস্তি হচ্ছে। সে তার সর্বশক্তি দিয়ে আদ্রিয়ানকে ধাক্কা দিয়ে দূরে সরিয়ে দিল। আদ্রিয়ান অন্যমনস্ক থাকায় দু'পা পিছিয়ে যায়। আনাস্তাসিয়া তার থেকে ছাড়া পেয়ে দরজার দিকে পা বাড়াতে বাড়াতে বলে,
__" আমার আপনার প্রতি কোন ইন্টারেস নেই বুঝেছেন"।
আনাস্তাসিয়া সেখান থেকে বেরিয়ে সোজা ওয়াশরুমে চলে যায়।আনাস্তাসিয়া চলে যেতেই আদ্রিয়ান ডেভিল স্মাইল দিয়ে বিরবির করে বলে,
__" সে তো দেখেই বোঝা যাচ্ছে ব্লাড রোজ। শিকার ফাঁদে পা দিয়েছে"।
কথাটি বলে সেও চলে গেল।
_______________>>>>>>>>>>>>_____________
শহরের শেষ প্রান্তে অবস্থিত দালান বাড়িটির বাড়িটির ভেতরে টানটান উত্তেজনা। ড্রয়িংরুমের চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে ভাংগা ফুলদানির টুকরো। সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে তিন জন লোক, তাদের মধ্যে দু'জন মধ্যবয়স্ক আর একটি যুবক। যুবকটির উজ্জ্বল শ্যামলা গায়ের রঙে গালে ছোট ছোট চাপদাড়ি। ঘাড় ছুঁই ছুঁই কালো লম্বা চুল গুলো এক পাশে বেগ ব্যাশ করে সেট করা। পরনে কালো ফর্মাল শার্ট প্যান্ট,হাতে ব্যান্ডের ওয়াচ পায়ে ব্লেক ফর্মাল শু।তার আর কেওনা আশরাফ শেখ, হাসিবুল শেখ আর শিশির শেখ। আশরাফ শেখ কে ভাঙচুর করতে দেখে হাসিবুল শেখ চিন্তিত কন্ঠে বললেন,
__" শান্ত হ বড়দা এভাবে উত্তেজিত হলে তর পেশার ফল করবে।
আশরাফ শেখ রাগে চিৎকার করে বলে,
__" তুই আমাকে শান্ত হতে বলছিস? ওই সন অফ আ বিচ রোমানের মেয়ে মাদার ফাকারটা আমার সব শেষ করে দিচ্ছে আর আমরা এখানে বসে বসে আঙ্গুল চুষছি।
__" আহা বড়দা এভাবে উত্তেজিত হলে শরীর খারাপ করবে তো। তুমি শান্ত হতে বসে আগে পানি খাও"।
আশরাফ শেখ তার ভাইয়ের কথায় আরো রেগে গেলেন। হাসিবুল শেখ পানির গ্লাস এগিয়ে দিতেই তা নিয়ে জোড়ে আছার দিয়ে ভেঙ্গে ফেললেন। গ্লাসটা ফ্লোরে পরে টুকরো টুকরো হয়ে চারিদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পরলো। তার এমন কান্ডে হাসিবুল শেখ একটু ভয় পেয়ে দুই পা পিছিয়ে গেলেন। আশরাফ শেখের রাগ তিলতিল করে বাড়তে থাকে সে আরো জোরে চেঁচিয়ে বলে,
__" বাল খাব তোর। তুই জানিস ওই আনাস্তাসিয়া আমার কত বড় ক্ষতি করেছে।ওর জন্য আমাদের পাঁচশত কোটি টাকার ডিল হাতছাড়া হয়ে গেছে। আর তুই আমকে শান্ত হতে বলছিস। এভাবে একটা একটা করে কতগুলো ডিল হাতছাড়া হয়েছে তুই জানিস।
হাসিবুল শেখ আর কোন কথা বলতে পারলেন না। এতো চিৎকার চেঁচামেচির ফলে তার শরীর খারাপ হতে লাগলো তাই সে সোফায় বসে পরলো। শিশির এতোক্ষণ চুপচাপ আশরাফ শেখ এর কর্মকান্ড দেখছিল। এটা তার জন্য নতুন কিছু নয় প্রতি বারি এরকম হয়ে থাকে। আনাস্তাসিয়ার সাথে না পেরে চিৎকার চেঁচামেচি করে ভাংচুর করে আর তারপর শরীর খারাপ হয়।এসব দেখতে দেখতে সে হাঁপিয়ে গেছে। কি দরকার শত্রুকে বাঁচিয়ে রেখে একেবারে মেরে ফেললেই তো হয়। পরমুহূর্তে মনে পরলো মারার তো বহু বারি চেষ্টা করেছে পারেনি। কি করে পারবে কোথায় সে আর কোথায় এই বুড়। অতঃপর নিজের ভাবনা চিন্তা থেকে বেরিয়ে বল,
__" কাকু মুনি আপনি চিন্তা করবেন না আমি দেখছি কি করা যায়"।
আশরাফ শেখ এবার একটু শান্ত হয়ে শিশিরের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলে,
__" হ্যাঁ বাবা তুমিই এখন আমার একমাত্র ভরসা। আমার ছেলেটা তো আর তার বাপের কথা চিন্তা করে না।
__" কাকু মুনি আদ্রিয়ান কিছু একটা প্ল্যান করছে মনে হয়।
শিশিরের কথায় তার ভ্রু কুঁচকে এলো শুরু চোখে তার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে।
__" মানে"?
__" মানে আদ্রিয়ান এখন আনাস্তাসিয়ার কাছে আছে, তাঁর সাথে অভিনয় করছে। তার মাথায় কিছু তো
একটা চলছে যা আমরা জানি না।
__" ওয়াট আদ্রিয়ান ওই মেয়েটার কাছে কি করছে, তুমি জানো সে কতো ভয়ঙ্কর? আমার ছেলেকে মেরে ফেলতে সে এক সেকেন্ড ও ভাববে না"।
__" কাকু মুনি তুমি বেশি টেনশন করো না। আদ্রিয়ান কোন কিছু না ভেবে করে না। নির্ঘাত তার কোন প্ল্যান আছে। আর তুমি ভেবে দেখ ও আমাদের কাজ সহজ করে দিচ্ছে। আমাদের হয়ে ও প্রতিশোধ নিবে। আমরা যা পারিনি সে তা ঠিকি পারবে"।
শিশিরের কথায় তিনি একটু চিন্তা করে দেখলেন। ঠিকি তো বলছে তারা পারছেনা তো তার ছেলে তো পারবে। তাদের হয়ে না হয় তার ছেলে প্রতিশোধ নিবে। তার ছেলে এমনিতেও তার কথা শুনে না। নিজের পাপের সাম্রাজ্য বাঁচাতে না হয় ছেলে কেই মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিবে।তাতে তার একটু কষ্ট না হয় হবে, ওই একটু কষ্ট না হয় সহ্য করে নিল ক্ষতি কি তাতে। আর এমনিতেও যেদিন সে সত্যিটা জানবে সেদিন তাঁর ছেলে নিজের হাতে হয়তো ওই মেয়েটার কাছে তাকে তুলে দেবে।তাতো আর সে হতে দিতে পারে না, কাঁটা দিয়ে না হয় কাঁটা তুললো তাতে তারি তো লাভ। কোথায় ছেলে হয়ে বাপের সাম্রাজ্য বড় করবে তার ব্যবসায় সাহায্য করবে তার সাথে ব্যবসার হাল ধরবে তা না, তার বদলে পথের কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পুরো মায়ের মতো হয়েছে একে বারে, মা ও যেমন তার ছেলে ও সেরকম। তাই তো তাঁকে মৃত্যুর হাতে তুলে দিয়েছিল, এই ছেলেও বেশি বাড়াবাড়ি করলে তাঁকেও মেরে ফেলতে দু'বার ভাববে না। সে তাঁর ভাবনা চিন্তা থেকে বেরিয়ে এসে শিশিরকে উদ্দেশ্য করে বলে,
__" এই কাজ তুমি করেছো তাই না"?
কথাটি শুনে শীশীর বাঁকা হাসলো। ঠোঁটে হাঁসি ঝুলিয়ে রেখে বলে,
__" ইয়েস কাকু মুনি আমিই করেছি। আমিই আদ্রিয়ান এর কন্টেইনারে আগুন ধরিয়ে দিয়েছি। আর বলেছি আনাস্তাসিয়া এসব করেছে আপনার সাথে শত্রুতার কারণে। যেহেতু আদ্রিয়ান আপনার ছেলে তাই সে তাঁকেও ছাড়বে না"।
__" দ্যাস মাই বয়। তুমি আমার ছেলে না হলেও তুমি আমার ছেলে থেকে ও অনেক বেশি আমার কাছে। তাই তো আমি তোমাকে বিশ্বাস করে আমার ব্যবসার সব দায়িত্ব তোমার হাতে তুলে দিয়েছি"।
__" থ্যাংক ইউ কাকু মুনি আমার উপর এতো বিশ্বাস করার জন্য।
তার পর আর কেউ কোন কথা না বলে যে যার কাজে চলে গেল। আশরাফ শেখ একজন সার্ভেন্টকে ডেকে সব পরিষ্কার করতে বলে নিজের রুমে চলে যায়। এতো চিৎকার চেঁচামেচি করার ফলে তার শরীরটা এখন বেশ খারাপ লাগছে। এখন রুমে গিয়ে বিশ্রাম নিতে বলে।
_______________>>>>>>>>>>>>>____________
পুরো ড্রয়িংরুম জুড়ে নিস্তব্ধতা বিরাজমান।বাইরে তুষারপাত হচ্ছে যার ফলে শীতল বাতাস বইছে চারি পাশে তবুও ড্রয়িংরুমে আবহাওয়া ভারি হয়ে আছে। ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে কোলে ল্যাপটপে মনযোগ দিয়ে গম্ভীর মুখে কাজ করছে আনাস্তাসিয়া। তার পরনে ব্যাগি প্যান্ট আর সাদা টিশার্ট আর পায়ে সাদা স্নিকার ও হাতে ওয়াচ। লম্বা চুল গুলো উঁচু করে খোঁপা বাঁধা আর চোখে পাওয়ারের চশমা। তার সামনের টেবিলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখা ইনপটেন্ট ফাইল আর কাগজ পত্র। সে কোন দিকে না তাকিয়ে মনযোগ সহকারে নিজের কাজ করে যাচ্ছে। বহুদিনের কাজ পেন্টিং ছিল এতো ঝামেলা মাঝে করা হয় নি তাই আজ করতে বসেছে। তাছাড়া নতুন প্রজেক্ট শুরু হয়েছে তার ও কাজ বাঁকে রয়েছে। এতো কাজের চাপে মাথাটা পুরো হ্যাং হয়ে গেছে। হঠাৎ তার সামনে কেউ একজন ড্রিংকের গ্লাস ধরলো। তার দেখে তার ঠোঁটে হাঁসি ফুটে উঠল। সে জানে তার সামনে গ্লাস ধরা ব্যাক্তিটি কে হতে পারে। তাই সে ল্যাপটপ কোল থেকে নামিয়ে টেবিলের উপর রাখে। অতঃপর গ্লাসটি নিয়ে তার দিকে তাকাতে তাকাতে বলে,
__" তুমি কি করে জানলে আমার স্ট্রবেরি পিঙ্ক রাশিয়ান খেতে মন চাইছিল"?
স্ট্রবেরি পিঙ্ক রাশিয়ান মূলত ঐতিহ্যবাহী 'হোয়াইট রাশিয়ান' ককটেলের একটি ক্রিমি ও ফ্রুটি বা স্ট্রবেরি ফ্লেভারের সংস্করণ।স্ট্রবেরি হোয়াইট রাশিয়ান তৈরির উপকরণ:ভদকা: ১.৫ আউন্স (ভ্যানিলা ফ্লেভারের হলে আরও ভালো হয়)কফি লিকার (Kahlúa): ১ আউন্সস্ট্রবেরি মিল্ক: ২ আউন্স (অথবা স্ট্রবেরি পিউরি ও ফ্রেশ দুধের মিশ্রণ)হেভি ক্রিম বা দুধ: আধা আউন্সবরফ কুচিতৈরির ধাপ:১. প্রথমে একটি গ্লাসে বরফ কুচি দিন।২. এরপর গ্লাসে একে একে ভদকা, কফি লিকার এবং স্ট্রবেরি মিল্ক ঢেলে দিন।৩. সবশেষে উপর থেকে হেভি ক্রিম বা দুধ ঢেলে আলতো করে নেড়ে নিন।৪. পরিবেশনের সময় স্ট্রবেরি সিরাপ বা ফ্রেশ স্ট্রবেরি দিয়ে সাজিয়ে নিতে পারেন।
__" আমি জানবো না তো কে জানবে। ছোট থেকে তোকে পেলে পুলে নিজের হাতে বড় করছি। তোর নিঃশ্বাস নেওয়া থেকে শুরু করে তার মনের ভেতর কি আছে সবি আমার জানা আছে। আর তুই বলছিস আমি কি করে জানলাম। নে এবার খেয়ে বল কেমন হয়েছে"।
__" তুমি বানিয়েছ তো সেটা ওয়ার্ডের সবচেয়ে বেস্ট পিঙ্ক রাশিয়ান হবে আমার জন্য।
__" হয়েছে হয়েছে আর প্রশংসা করতে হবে না, এবার খা"।
আনাস্তাসিয়া গ্লাসে চুমুক দিতেই আদ্রিয়ান সিঁড়ির কাছে আসে থেমে গেল। সে আনাস্তাসিয়া আর আমান এর দিকে চোখ মুখ শক্ত করে তাকিয়ে রইল। আনাস্তাসিয়া পুরো গ্লাসের ড্রিংকস শেষ করতে করতে বলে,
__" উম সো টেস্টি"।
আমান মুচকি হেসে বোনের মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। আনাস্তাসিয়া গ্লাস টেবিলের উপর রাখতেই আমান তার কোলের উপর দুই পা রেখে লম্বা লম্বি ভাবে শুয়ে বললো,
__" এবার পা দুটো টিপে দে তো তর জন্য কিচেনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এসব বানাতে গিয়ে পা দুটো ব্যাথা হয়ে গেছে"।
আনাস্তাসিয়া সুরু চোখে আমানের দিকে তাকালো, তারপর ভ্রু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করে,
__" আমি কি বলেছিলাম আমার জন্য এসব বানিয়ে আনো হুম"।
__" না, কিন্তু আমার ও তো একটা দায়িত্ব আছে তাই না, এখন কথা না বাড়িয়ে পা টিপে দে তো দেখি "।
আনাস্তাসিয়া আর কথা না বাড়িয়ে এক হাত দিয়ে ল্যাপটপ নিয়ে কাজ করে অপর হাতে পা টিপতে থাকে। আমান বোনের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে চোখ বন্ধ করে শুয়ে পরে। তার বোনটা বাইরে থেকে কঠোর ও বড় হলেও ভেতরে সেই নরম বাচ্চা স্বভাবটা রয়ে গেছে। মাঝেমাঝে দুঃখ হয় আবার ভয়ও হয়। দুঃখ হয় এই কারনে যে সে তার নরম মনের বোনটাকে এই ধ্বংসের খেলায় মেতে যেতে দেখে ও আটকাতে পারছে না। আর ভয় হয় তাকে হারিয়ে ফেলার, যদি তার বোনের কিছু হয়ে যায় তাহলে সে কি করে বাঁচবে। বাবা মার মৃত্যুর পর এই বোনি তার সব বেঁচে থাকার একমাত্র কারণ। যদি সে না থাকতো তাহলে কবেই এই দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করে পরপারে পা দিত। সে চায় তার বোন ভালো থাকুক কিন্তু ভালো কি সে রাখতে পেরেছে? হয়তো না, হ্যাঁ সে পারেনি। এর থেকে ও আরো বেটার লাইফ ডিজার্ভ করে। সে চায় সে ছাড়াও তার বোনকে অন্যকেও ভালোবাসুক। এতোটাই ভালোবাসুক যাতে তাদের অতীত ভুলে একটি সুন্দর নতুন জীবনের শুরু করতে পারে। আর পেছন ফিরে যাতে না দেখে হয় তার বোনকে। সেদিন সে তার সব দায়িত্ব সেই লোকটার কাঁধে দিয়ে নিশ্চিন্ত হতে পারবে। মরে গেলেও তার তখন কোন আফসোস থাকবে না। এমন কেউ কি আসবে তার বোনের জীবনে, জানেনা সে। তার ভাবনা চিন্তার মধ্যেই আনাস্তাসিয়া বলে উঠল,
__" আচ্ছা তোমার কখনো গলা ব্যাথা করে না"?
আমার আনাস্তাসিয়ার কথা শুনে চোখ খুলে মাথা উঁচু করে ভ্রু কুঁচকে বলে,
__" কেন"?
আনাস্তাসিয়া মৃলিন হেসে বলে,
__" না মানে তাহলে গলাটা ও টিপে দিতাম আর কি"।
__" তুই যদি আমার গলা টিপতে পারিস তাহলে আমার জান ও হাজির। কিন্তু তুই পারবি না তাই বলে লাভ নেই"।
__" তাও ঠিক"।
আমান তার পা ভালো করে আনাস্তাসিয়ার কোলে তুলে দিয়ে, পুনরায় শুয়ে চোখ বন্ধ করতে করতে বলে,
__" নে এবার ভালো করে পা টিপ, এর পরে মাথার চুল টেনে ম্যাসাজ করে দিবি।
আনাস্তাসিয়া এবার একটু বিরক্তি প্রকাশ করে বলে,
__" তোমার ডিমান্ড দিনদিন একটু বেশিই হাই হয়ে যাচ্ছে না।
আদ্রিয়ানের এসব দেখে রাগ উঠে গেল, রাগে তার হাত মুষ্টিবদ্ধ হয়ে এলো। সে আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলো না সোজা উপরে চলে গেল। অতঃপর আমান বললো,
__" তা হাই হবে না ঐসব লোক্লাস ডিমান্ড সব ছোটলোকি কার বার, আর আমি তো বিলিয়নার"।
আনাস্তাসিয়া এবার আমান এর পায়ে চিমটি কেটে বলে,
__" তাহলে আমার বিলিয়নার ভাই এসব ডিমান্ড এর জন্য বিয়ে করে, বউ নিয়ে এসে তাকে দিয়ে করান।
আমি আর পারবো না, সাথে আমার ও একটা ভাবি হয়ে যাবে"।
আনাস্তাসিয়া চিপটি কাটতেই আমান "আউচ" বলে মৃদু আর্তনাদ করে উঠলো। তার পর একটু রাগ মেশানো কন্ঠে বলে,
__" আনাস্তাসিয়া তুই কিন্তু দিন দিন বেয়াদব হয়ে যাচ্ছিস। এসব কি ব্যবহার বড় ভাইয়ের সাথে"।
__" সরি ভাইয়া"।
কথাটি বলেই মুখ গোমড়া করে বসে রইল সে। আনাস্তাসিয়াকে মন খারাপ করে বসে থাকতে দেখে আমান উঠে এসে তাকে জড়িয়ে ধরে বুকে আগলে নিয়ে বলে,
__" ধুর বোকা আমি তো মজা করছিলাম"।
__" হ্যাঁ হ্যাঁ সব আদর নিজের বোন কেই দেও। আমি তো তোমাদের কেউ না তাই আমাকে কেউ আদর ও করে না আর ভালো ও বাসে না"।
হঠাৎ কারো অভিমানী কন্ঠ ভেসে আসতেই তারা দুজন সামনে তাকালো। সামনে তাকাতেই তাঁরা মুচকি হেসে বলে,
__" ও লেনি ড্রামা করো নাতো কাম হেয়ার"।
লেনি মুখে হাসি ফুটিয়ে তাদের জড়িয়ে ধরল। তার পর আমান তাঁদের মাথায় হাত বুলিয়ে স্নেহের চুমু এঁকে দিল। কিছু ক্ষণ পর তারা একে অপরকে ছাড়তেই আমান এর ফোন বেজে উঠে। পকেট থেকে ফোন বের করে স্ক্রিনে তাকাতেই ভ্রু কুঁচকে যায়। তার পর ফোন রিসিভ করে কথা বলতে বলতে বাইরে চলে যায়। আনাস্তাসিয়া আর লেনি নিজেদের কাজে মন দেয়।
________________>>>>>>>>>>>>____________
আদ্রিয়ান তখন উপরে এসে ডান দিকের করিডোর দিয়ে সোজা একটি রুমে চলে যায়। রুমটি বেশ অন্ধকার ও গা ছমছমে পরিবেশ। সে রুমে ঢুকেই জোরে দরজা লাগিয়ে দেয়। অতঃপর রাগে তার শরীরের সর্বশক্তি দিয়ে দেওয়ালে পাঞ্চ মারে। এ ভাবেই না থেমে একাধারে পাঞ্চ মারতে থাকে, এর ফলে তার হাতের আঙ্গুলের চারপাশ ফেটে রক্ত বের হতে থাকে তবুও সে থামেনা। তার উন্মাদনা যেন তিলতিল করে বাড়ছে। সে এবার প্রচন্ড রাগে গর্জে উঠল,
__"I will kill him."
তার পর একটু শান্ত হয়ে জোরে জোরে শ্বাস নিয়ে হাঁসফাঁস করে বলে,
__"Why can't I stand anyone else with you, Blood Rose"?
অতঃপর পুনরায় গর্জে উঠে দেওয়ালে জোরে জোরে পাঞ্চ মারতে মারতে বলে,
__"Why am I feeling this way? I don't love you, Blood Rose. So why, why, why?"
তার গর্জনে রুমের প্রতিটি দেওয়াল কেঁপে উঠে। তার মুখে ফুটে উঠেছে এক হিংস্রতা, নীলাভ চোখ দুটোর সাদা অংশে রক্ত জমে লাল বন্য ধারন করেছে। তাঁকে দেখতে এতোটাই হিংস্র লাগছে যে কেউ দেখলেই ভয় পেয়ে যাবে। তার এমন অনুভুতি কারণ সে নিজেও জানে না। কেন হচ্ছে এরোকম তার সাথে, সে তো এখানে প্রতিশোধ নিতে এসেছিল। সে তো তাকে ভালোবাসে না, তাহলে কেন তার সাথে অন্য কাউকে সহ্য করতে পারে না। কেন, এই কেনর জবাব কি তার কাছে আছে, না নেই। সে জানে না তার এরকম অদ্ভুত অনুভূতির কারন। তার ২৯ বছরের জীবনে কখনো এরকম অনুভুতি হয় নি, তাহলে এই মেয়ের জন্য তার কেন এমন হচ্ছে।জানা নেই তার।
প্রেম বা ভালোবাসা কোনো পূর্বপরিকল্পনা বা হিসাব-নিকাশ মেনে আসে না। এটি হঠাৎ ও অচেতনে মনের গভীরে তৈরি হয়।শুরুতেই মানুষ নিজের এই পরিবর্তন বা আবেগ ধরতে পারে না; অনুভূতিটি গভীরভাবে তাকে আচ্ছন্ন করার পরেই সে তা উপলব্ধি করতে পারে। ভালোবাসা পূর্বপরিকল্পিত নয়,মানুষের মন কোনো নিয়ম বা ছক মেনে কাজ করে না। কার প্রতি, কখন এবং কেন মায়া জন্মাবে—তা আগে থেকে ঠিক করা যায় না।এটি কোনো ব্যবসায়িক চুক্তির মতো নয় যে দেখে-শুনে, লাভ-ক্ষতি বিচার করে করা হবে।মনের অজান্তেই বিশেষ মানুষটির উপস্থিতি, হাসি বা কথাগুলো ভালো লাগতে শুরু করে।এই ভালোলাগা কখন যে গভীর ভালোবাসায় বা আসক্তিতে রূপ নেয়, তা মস্তিষ্ক তাৎক্ষণিকভাবে হিসাব করতে পারে না। ভালোবাসার শুরুটা হয় খুবই সূক্ষ্মভাবে, যাকে প্রাথমিক পর্যায়ে স্রেফ ‘ভালোলাগা’ বা ‘বন্ধুত্ব’ বলে ভুল হয়।ওই সময়ে মানুষটি বুঝতে পারে না যে, সে আসলে প্রেমে পড়েছে বা মানুষটির প্রতি তার আবেগ কতটা তীব্র।যখন মনের অজান্তেই সেই মানুষটির সুখ-দুঃখ নিজের মনে প্রভাব ফেলতে শুরু করে এবং তার অনুপস্থিতি কষ্ট দেয়, তখন মানুষ নিজের ভেতরের পরিবর্তনটি আবিষ্কার করতে পারে।ঠিক তখনই সে বুঝতে পারে যে, অগোচরেই সে গভীরভাবে কাউকে ভালোবেসে ফেলে।
আদ্রিয়ান ও ঠিক এই একি অবস্থাতেই আছে। সে তার অন্তরের অনুভুতিকে বুঝে উঠতে পারছে না। তার মাথায় এখন একটাই চিন্তা আনাস্তাসিয়ার ধ্বংস। যে করেয় হক সে এই খেলার শেষ দেখেয় ছাড়বে। মস্তিষ্ক নিয়ন্ত্রণ শীল হলেও মন কি নিয়ন্ত্রণ শীল? একদমি না। মনের উপর কারোর নিয়ন্ত্রণ নেই। সে তার কাজ করে যাবে। আদ্রিয়ান কি আদেও পারবে তার প্রতিশোধ নিতে? নাকি মনের ভেতর তৈরি হওয়া অজানা অনুভূতি ফলে সৃষ্টি হবে এক অসীম ভালোবাসার।
হঠাৎ আদ্রিয়ান এর ফোন বেজে উঠল।সে নিজেকে শান্ত করে প্যান্টের পকেট থেকে ফোন বের করে স্ক্রিনে তাকাতেই চোখ মুখ শক্ত হয়ে এলো। ফোন রিসিভ করে ঝাঁঝালো কন্ঠে দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
__" ওয়াট হ্যাপেন্ড, আপনি আবার আমাকে কল করেছেন কেন"?
অপর পাশ থেকে কি বললো তা শোনা গেল না। অতঃপর আদ্রিয়ান একি ভঙ্গিতে বলে,
__" I don't give explanations to anyone, Mr. Ashraf Sheikh".
.........
__" চেঁচাবেন না, আমি আপনার টাকায় খাই ও না পরি ও না। তাই গলার আওয়াজ নিচে মাইন্ড ইট"।
..........
__" আমি যথেষ্ট ভদ্র ভাবে কথা বলছি আপনার সাথে, এর থেকে বেশী ভদ্রতা আপনি ডিজার্ভ করেন না"। আর কি বললেন বাবা, বাবা হওয়ার যোগ্যতা আপনার নেই।
..........
__" আনাস্তাসিয়া যতই পাওয়ার ফুল আর ভয়ঙ্কর হক না কেন। আই ডোন্ট কেয়ার, সে আমার কোন ক্ষতি করতে পারবেনা। আর আপনার এই মিথ্যা কেয়ার করার ড্রামা স্টপ করুন মি: আশরাফ শেখ।
............
__" আমি যাই প্লেন করে থাকি না কেন আপনাকে বলতে আমি বাধ্য নই। আর সে আমার শত্রু নয় আপনার শত্রু। তাই আমার ব্যাপারে মাথা না ঘামিয়ে নিজের ব্যাপারে ঘামান। যদি কোন দিন জানতে পারি এর পেছনে আপনার হাত আছে, সেদিন আমি নিজে আনাস্তাসিয়ার হাতে আপনাকে তুলে দেব মাইন্ড ইট।
...........
__" চিৎকার করবেন না, আমি আপনার হাতের পুতুল না। ফারদার আমাকে কল করবেন না।
বলেই কল কেটে দিয়ে দেওয়ালে আবার ও জোড়ে পাঞ্চ মেরে, নিজেকে শান্ত করে কিছু ক্ষণ পর রুমের দরজা খুলে রুম থেকে বেরিয়ে যায়। আদ্রিয়ান সোজা বেডরুমে গিয়ে দরজা বন্ধ করে পিছনে ঘুরতেই দেখে আনাস্তাসিয়া কাউচে বসে ল্যাপটপ হাতে মন দিয়ে কাজ করছে। আদ্রিয়ান কোন শব্দ না করে ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে গেল। তার পর তার পাশে গিয়ে কোন কথা না বলে তার দিকে তাকিয়ে রইল কিছু ক্ষণ। আনাস্তাসিয়া কাজের ফাঁকে একবার আর চোখে চাইল আদ্রিয়ান এর দিকে। তার পর পুনরায় মন দিয়ে নিজের কাজ করতে লাগলো। আদ্রিয়ান কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে একটি দির্ঘ শ্বাস ছেড়ে বলে,
__" বৌ তোমাকে একটা প্রশ্ন করি"?
আদ্রিয়ান এর কথা আনাস্তাসিয়া ভ্রু কুঁচকে তাঁর দিকে চোখ ছোট ছোট করে তাকালো। কিছু ক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর দুই ভ্রু উঁচু করে নিচে নামাল। আনাস্তাসিয়া ইশারায় "কি" বলায় আদ্রিয়ান কিছু ক্ষণ চুপ থেকে জিজ্ঞেস করে,
__" তুমি কি আমানকে ভালোবাসো"?
আনাস্তাসিয়া ভ্রু দুটো আরো কুঁচকে এলো। সে আদ্রিয়ানের প্রশ্নের মানে বুঝতে পারলো না। সে তার ভাইয়াকে ভালোবাসে কি না এটা আবার কেমন প্রশ্ন। অফকোর্স সে তার ভাইয়াকে ভালোবাসে। ভালোবাসবে না কেন তার ভাইয়া ছাড়া আর এই দুনিয়াতে তার আছেয় বা কে। মম ড্যাড এর মৃত্যুর পর সেই তো তাকে মম ড্যাড এর ভালোবাসা দিয়ে বড় করেছে। হয়তো তার ভাইয়া না থাকলে আজ সেও থাকতো না, কবেই মরে যেত। তাই এরকম প্রশ্নের কোন মানেই হয়না। সে তার ভাইয়ার জন্য চোখ বন্ধ করে যেখানে নিজের জীবন দিয়ে দিতে পারে সেখানে এই ভালোবাসা নামক শব্দটা তো তুচ্ছ একটা জিনিস।সে যেমন তার ভাইয়ার জন্য সব করতে পারে তার ভাইয়া ও তার জন্য সব করতে পারে। তাই সে আদ্রিয়ান এর প্রশ্নে গা ছাড়া একটি ভাব নিয়ে পুনরায় তাঁর কাজে মনোযোগ দিতে দিতে বলে,
__" হুম"?
বেস এইটুকুই আনাস্তাসিয়ার এই দুটি বাক্য যেন তিরের মতো গিয়ে বিধলো আদ্রিয়ান এর বুকে। এই দুটি বাক্য কানে আসতেই আদ্রিয়ান এর বুকের বাম পাশে মোচড় দিয়ে উঠলো। কেন জানিনা তার বুকে যন্ত্রণা হচ্ছে। সে তো আনাস্তাসিয়াকে ভালোবাসে না তাহলে কেন তার সাথে এমন হচ্ছে। সে যাকে মন চায় তাকে ভালোবাসুক তার তাতে কি? তার তো কিছু যায় আসার কথা না? তাহলে তার বুকে কষ্ট হচ্ছে কেন? এই কেনর উত্তর কি আদেও কারো কাছে আছে যানা নেই তার। আর এই বোকা আনাস্তাসিয়া সে তো বুঝতেই পারলো না তাকে আসলে কোন ভালোবাসার কথা জিজ্ঞেস করা হয়েছে। বুঝবেই বা কি করে সেতো কখনো এই অস্ত্র শস্ত্র বিজনেস তার অন্ধকার জগত, মারামারি খুন করা ছাড়া আর কিছু নিয়ে কখনো ভাবেনি। ভাবার প্রয়োজন বোধ ও করেনি কখনো। কারণ পাপিষ্ঠ দের কক্ষনো ভালোবাসতে নেই। আদেও কি পাপিষ্ঠ দের ভালোবাসতে নেই জানা নেই তার। তাই তো সে আদ্রিয়ান এর প্রশ্নের আসল মানে বুঝতে পারেনি। আর আদ্রিয়ান সে তো জানেয় না তার প্রশ্নের আসল মানে এই মেয়েটা বুঝেই নি। সে তার বুকের অজানা বেথা নিয়ে আর এক মুহূর্তও সেখানে না বসে থেকে চলে গেল সে। কোথায় গেল সে জানা নেই তার, আনাস্তাসিয়া একবার আদ্রিয়ান এর যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকল। বুঝল না সে আদ্রিয়ানের কি হলো সে এভাবে চলে গেল কেন তাই সে ভাবান্তর হিন ভাবে তাকিয়ে থেকে কাজে মনোযোগ দিল।
_______________>>>>>>>>>>>>_____________
পুরো শহর জুড়ে তখন নিস্তব্ধতা। ঘড়ির কাঁটা তখন রাত বারোটার কাঁটায় ছুঁই ছুঁই।পুরো ভবন জুড়ে নিস্তব্ধতা ছড়িয়ে আছে। এই নিস্তব্ধতার মধ্যে করিডোর দিয়ে কারোর হাঁটার ঠক ঠক শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। তার পথচলন ভারী যার ফলে চারপাশের আবহাওয়া আরো ভারী হয়ে আসছে। করিডোর জুড়ে চারপাশে অন্ধকার ছেয়ে আছে। এই অন্ধকার পথ দিয়ে চলে যাচ্ছে আনাস্তাসিয়া। চলতে চলতে হঠাৎ তার পা থমকে গেল, তার সামনে দিয়ে মনে হলো কোনো ছাড়া চলে গেল। সে ভ্রু কুঁচকে নিঃশব্দে ধীরে ধীরে সেই ছায়া যেখান দিয়ে গিয়েছে সে দিকে এগিয়ে গেল। এগোতে এগোতে সে তার অফিস রুমের সামনে আসতেই দেখলো, আর অফিস রুমের দরজা খুলে রাখা। সে দরজার কাছে এসে সামনে পা বাড়াতেই দেখতে পেল একজন কালো হুডি পড়া লোক তার ড্রেসটপের কাছে কিছু ফাইল ঘাঁটাঘাঁটি করছে আর কিছু খুঁজছে। তার আর এক মুহূর্ত সময় লাগলো না বুঝতে যে কোন শত্রু তার বাড়িতে ঢুকে ইনফরমেশন খুঁজছে। সে আর এক মুহূর্ত দেরি না করে লোকটির দিকে এগিয়ে গিয়ে তার উপর ঝাপিয়ে পড়ে। হঠাৎ আক্রমণে লোকটা কিছুটা ঘাবড়ে গেল। অতঃপর নিজেকে সামলে লোকটি আনাস্তাসিয়ার সাথে হাতা হাতি শুরু করে দিল। আনাস্তাসিয়া লোকটির চেহারা দেখার জন্য মার্ক্স খুলতে চাইলে লোকটি পুঁতি রদ করতে থাকে। এর ফলে তাদের মধ্যে হাতাহাতি হতে থাকে। হাতাহাতি মধ্যে আনাস্তাসিয়া লোকটিকে নিজের সর্বশক্তি দিয়ে আঘাত করতে থাকে তবুও লোকটির যেন কিছু হলো না। পুরুষালী শক্তির সাথে তার পেরে উঠা অসম্ভব হয়ে পরছে। লোকটি তার থেকে লম্বা আর সুঠামদেহী হওয়ায় পেরে উঠছে না সে। একপর্যায়ে লোকটি তাঁকে জোরে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়। হঠাৎ ধাক্কা দেওয়ায় সে ছিটকে দূরে সরে যায়, নিজেকে সামলাতে না পেরে ফ্লোরে মুখ থুবড়ে পড়ে। ঠিক সেই সময় কারোর পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়। পায়ের আওয়াজে লোকটি ঘাবড়ে যায় তার পর কোন দিকে না তাকিয়ে সেখান থেকে দ্রুত চলে যায়। আমান দরজার কাছে আসতেই কার ছাড়া চলে যেতে দেখে সে দ্রুত অফিস রুমের ভেতরে আসে। ভেতরে আসতেই সে থমকে যায়, আনাস্তাসিয়া ফ্লোরে পরে আছে তার কপাল ফেটে রক্ত বের হচ্ছে। আমান দ্রুত গিয়ে তাঁকে তুলতে তুলতে জিজ্ঞেস করে,
__" কি হয়েছে এভাবে পড়লি কি করে"?
__" ভবনে কেও ঢুকে পরেছে"।
__" ওয়াট"?
__" হুঁ"।
আমান আর এক মুহূর্ত দেরি না করে দৌড়ে বেরিয়ে গেল। পুরো ভবন তন্নতন্ন করে খুঁজেও কাওকে পেল না। তাই সে আবার আনাস্তাসিয়ার কাছে ফিরে আসলো।
__" পুরো ভবন তন্নতন্ন করে খুঁজেছি কিন্তু কাওকে পাইনি"।
__" সিসিটিভি ফুটেজ চেক করো এখুনি"।
তখনি কোথায় থেকে আদ্রিয়ান দৌড়ে এসে
আনাস্তাসিয়াকে জড়িয়ে ধরে বিচলিত কন্ঠে জিজ্ঞেস করে,
__" বৌ তোমার কি হয়েছে এভাবে আঘাত লাগলো কি করে"?
আনাস্তাসিয়া তার কথার পাত্তা না দিয়ে তাকে ছাড়িয়ে নিল। তার পর ল্যাপটপে পুরো ভবনের সিসিটিভি ফুটেজ চেক করতে লাগলো। আদ্রিয়ান চুপচাপ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সব দেখতে লাগলো। আনাস্তাসিয়া পুরো ভবনের সিসিটিভি ফুটেজ চেক করেও যখন কিছু পেল না, তখন ল্যাপটপ জোরে আছার মেরে ফ্লোরে ছুড়ে মারলো। তার পর চিৎকার করে বলে,
__" ফাঁ**কিং বিচ।The bastard is too smart; he didn't leave any evidence."
একটু থেমে তার পর বাঁকা হেসে আবার বলে,
__"But I will find him.
এসব দেখে আদ্রিয়ান এর ঠোঁটে এক চিলতে বাঁকা হাসি ফুটে উঠে। অতঃপর কাওকে বুঝতে না দিয়ে পুনরায় মুখ আগের মত করে ফার্স্ট এইড বক্স নিয়ে এসে আনাস্তাসিয়ার হাত ধরে টেনে পাশে রাখা ডিভানে বসিয়ে দেয়। তার পর তার সামনে বসে ফার্স্ট এইড বক্স খুলে তার থেকে স্যাভলন আর তুলা বের করে। আনাস্তাসিয়া কোন বাক্য ব্যায় না করে আদ্রিয়ান এর কাজ দেখতে থাকে। আদ্রিয়ান তুলায় স্যাভলন লাগিয়ে আলতো করে তার কপালের ক্ষত স্থানে ফু দিয়ে লাগিয়ে দিতে থাকে। আমান আর এক মুহূর্ত সেখানে থাকেনা সে বেরিয়ে যায়। আনাস্তাসিয়ার ক্ষত স্থানে স্যাভলন লাগতেই সে চোখ মুখ খিচে বন্ধ করে ব্যাথা সহ্য করে। আদ্রিয়ান তার ক্ষতে মলম লাগিয়ে ওয়ান টাইম ব্র্যান্ডেজ লাগিয়ে দেয়। আনাস্তাসিয়া চোখ খুলে তার দিকে তাকিয়ে দেখতে থাকে। সে নিজের অজান্তেই এই ছেলেটার মায়ায় পরে গেছে। এই ছেলেটার কাছে আসলেই তাঁর হৃদ স্পন্দন বেড়ে যায়। অদ্ভুত এক অনুভূতি হয় যার কারণ তার জানা নেই।
_____________>>>>>>>>>>>>>______________
সময় প্রবাহমান, সময় নিজের গতিতে চলে, তাঁকে কেউ ধরে রাখতে পারে না। সেদিন এর পর কেটে গেছে একটা মাস, বদলেছে অনেক কিছু। ভবনের চারিদিকে নিরাপত্তা ও গার্ড এর সংখ্যা বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। নতুন করে আরো সিসিটিভি ক্যামেরা লাগানো হয়েছে। সেদিন সেই ঘটনার পর দিনি আনাস্তাসিয়াদের একটি মিশনে রাশিয়ার বাহিরে যেতে হয়েছে। শুধু ভবনে রয়েছে কিছু গার্ড আর আদ্রিয়ান। আদ্রিয়ান এই সুযোগে পুরো ভবন তন্নতন্ন করে খুঁজেছে কিন্তু কিছু পায় নি। কিছু কিছু যায়গায় লোক আর পাসওয়ার্ড সিস্টেম যা সাধারণত মানুষ দ্বারা খোলা সম্ভব না, সেগুলো ও খোলার চেষ্টা করেছে পারেনি।সে দিনের সেই ঘটনাও আদ্রিয়ানি ঘটিয়েছিল কিন্তু আনাস্তাসিয়া এসে যাওয়ার কারনে কিছু করতে পারে নি।এই এক মাসে সে ভবনের বাহিরে যেতে পারেনি আনাস্তাসিয়া গার্ডের বারন করে দিয়েছে তাকে বাহিরে যেতে দিতে। তাই সে বাসায় বসে তার অফিসের কাজ করেছে। এই এক মাসে সে নিজের মধ্যে অদ্ভুত কিছু লক্ষ্য করেছে। কারোর শূন্য তা, আনাস্তাসিয়া না থাকার কারণে তার বুকে বা পাশে অজানা এক ব্যাথারা হানা দিতে। বার বার তার চিন্তা মাথার মধ্যে ঘুরপাক খেত। মাঝেমাঝে তাঁকে দেখার তিব্র আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি হতো, তবুও সে তার কাছে যেতে পারতো না দেখতে পারতো না। তার এই অনুভূতির এই ইচ্ছা কারন সে জানে না।
( চলবে....)