ফন্ট সাইজ:
থিম:
মেঘাবির

পর্ব 1

লেখক: Jannatul Naima

মেঘাবির

লেখিকা : জান্নাতুল নাঈমা

পর্ব ১: নতুন ছাদের নিচের প্রথম পৃথিবী

____

বিকেলের নরম আলোটা যখন জানালার কাঁচ ভেদ করে ঘরের ভেতরে এসে পড়ল, তখন মনে হলো সময়টা যেন একটু থমকে গেছে। চারতলার এই ছোট ফ্ল্যাটটার বারান্দায় দাঁড়ালে চেনা শহরটাকে একটু অচেনা লাগে।

নিচে রিকশার টুংটাং শব্দ, দূরে কোনো এক বাসার ড্রইংরুম থেকে ভেসে আসা শব্দ,ব্যস্ত নগরীর গাড়ির হর্ন—সব মিলিয়ে একটা অদ্ভুত মিশ্র অনুভূতি।

বিয়ের কটা দিন যে কীভাবে কেটে গেছে, কেউ টের পায়নি। হৈচৈ, আত্মীয়স্বজনের ভিড়আর হরেক রকমের আনুষ্ঠানিকতা পেরিয়ে অবশেষে এই চার দেয়ালের ভেতরে এসে পৌঁছানো।

এখন এই ফ্ল্যাটে কেবল দুজন মানুষ—সাজ্জাদুল খান আবির আর মাহদিবা খান মেঘ।

চারপাশের এই নীরবতা মেঘের কাছে প্রথমে একটু অদ্ভুত ঠেকলেও এখন বেশ ভালোই লাগছে। নতুন সংসার, নতুন গোছগাছ—সবকিছু নিজের মতো করে সাজানোর এক অন্যরকম আনন্দ আছে।

ড্রয়িংরুমের কোণায় একটা বড় কাঠের ট্রাঙ্ক রাখা। তার ওপর স্তূপাকার করা কিছু ফাইলের খাতা আর কাপড়ের ব্যাগ।

মেঘ মেঝের ওপর হাঁটু গেড়ে বসে একটা একটা করে কাপড় বের করে আলমারির তাকে সাজাচ্ছিল। সকাল থেকে একটানা কাজ করতে করতে তার কোমরটা ব্যথায় কেমন যেন ধরে গেছে। কপালে জমে উঠেছে হালকা ঘামের ফোঁটা, যা জানালার ফুঁড়ে আসা রোদে চিকচিক করছে।

চুলগুলো একটা ক্লিপ দিয়ে কোনোমতে খোপা করে আটকে রাখা হলেও কিছু অবাধ্য লম্বা চুল বারবার তার কপালে এসে টিকটিক করছে। মেঘ ক্লান্ত দীর্ঘশ্বাস ফেলে ডান হাত দিয়ে কপাল থেকে ঘাম মুছল, তারপর আবার ব্যস্ত হয়ে পড়ল তার গোছগাছ নিয়ে।

নতুন এই সংসারে আসার পর থেকে মেঘের জীবনযাত্রায় এক বিশাল পরিবর্তন এসেছে। এতদিন সে ছিল একটা বড় পরিবারের আদুরে মেয়ে, যেখানে ভাই-বোনদের হইচই আর বাবা-মায়ের স্নেহের চাদরে সে ঢাকা ছিল।

আর আজ সে একজন পত্নী, একজন পূর্ণ দায়িত্বশীল মানুষ। এই চার দেয়ালের ভেতরে তার নিজের একটা পৃথিবী তৈরি হয়েছে, যার মূল চালিকাশক্তি হলো ওই মানুষটা—যাকে সে সবসময় সমীহ করে চলে, আবার যার নিঃশব্দ উপস্থিতিতে এক অদ্ভুত নিরাপত্তার ছায়াও অনুভব করে।

আবিরের সাথে তার এই পথচলাটা খুব বেশিদিনের নয়, কিন্তু এর গভীরতা যেন সমুদ্রের মতো অপার। মানুষটার সাথে কথা কম হয়, কিন্তু তার চোখের ভাষা বা উপস্থিতির ওজন অনেক বেশি।

ঠিক তখনই পেছনের ভারী কাঠের দরজাটা খোলার চাবি ঘোরার শব্দ হলো। ভারি পায়ে কেউ ভেতরে ঢুকল। মেঘ ঘাড় ফিরিয়ে তাকাতেই দেখল আবির দাঁড়িয়ে আছে।

পরনে তার অফিসের সেই চেনা সাদা শার্ট, যার ওপরের দুটো বোতাম খোলা, হাতের ঘড়িটা খোলা অবস্থায় একহাতে ধরা, টাইটা গলা থেকে সামান্য ঢিলে করা।

আবিরের চেহারায় কোনো ক্লান্তি নেই, আছে এক অদ্ভুত কাঠিন্য আর গাম্ভীর্য। মানুষটা বাইরে থেকে যতটা পাথরসম কঠিন, ভেতরে তার অনুভূতির সাগর কতটা গভীর, তা কেবল মেঘই জানে। সে খুব বেশি কথা বলে না, অপ্রয়োজনীয় হাসাহাসি তার ধাতে নেই। সোজাসাপ্টা কথা বলাটাই তার স্বভাব। যা ভাবে, ঠিক তাই মুখে বলে—কোনো রাখঢাক নেই, কোনো বানিয়ে বলার ভঙ্গি নেই।

তার এই সোজাসাপ্টা স্বভাবের কারণে অনেকেই তাকে কিছুটা ভয় পেলেও মেঘের কাছে মানুষটার এই রূপটাই সবচেয়ে বেশি বিশ্বস্ত মনে হয়।

আবির একদৃষ্টিতে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল দরজার সামনে। তার চোখ দুটো সোজা গিয়ে পড়ল মেঝেতে বসে থাকা মেঘের ওপর। তার চেহারায় এক চিলতে বিরক্তির রেখা ফুটে উঠল। সে ব্যাগটা একপাশে সোফায় রেখে ধীর পায়ে এগিয়ে এল মেঘের দিকে। তার হাঁটার ভঙ্গিতে একটা আলাদা আত্মবিশ্বাস আর দৃঢ়তা আছে। জুতোর মচমচ শব্দ ছাপিয়ে তার ভারী নিশ্বাসের শব্দ যেন ঘরের নীরবতাকে ভেঙে দিচ্ছিল।

কাছে এসে একদম সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে গম্ভীর গলায় আবির বলল, "তোর কি সারাদিন এই কাপড়চোপড় আর বাক্স-পেটরা নিয়ে পড়ে থাকার ভূত চেপেছে? জানি সকাল থেকে তুই একটানা কাজ করে যাচ্ছিস। একটু কি আরাম করার সময় হয় না তোর?এভাবে একটানা মেঝের ওপর বসে থাকলে শরীর ব্যথা করবে না?"

মেঘ একটু হকচকিয়ে গেল। আবিরের এই ধমকের সুরে কোনো রাগ থাকে না, থাকে এক অদ্ভুত শাসন আর অধিকারবোধ। সে হাত দুটো কাপড়ে মুছে সোজা হয়ে বসল।

আবিরের দিকে তাকিয়ে সম্মানসূচক সুরে একটু অপ্রস্তুত হয়ে সে বলল, "কাজগুলো তো আজকেই গুছিয়ে ফেলতে হবে, নইলে কাল আবার কাজের চাপে সমস্যা হবে। আর আপনি এইমাত্র অফিস থেকে এলেন, হাত-মুখ না ধুয়ে এভাবে দাঁড়িয়ে আছেন কেন? যান, ফ্রেশ হয়ে নিন গিয়ে। আমি চা বসিয়ে দিচ্ছি।"

আবির মেঘের কথার কোনো উত্তর দিল না। সে বিন্দুমাত্র নড়ল না। বরং মেঘের আরও এক পা কাছে এগিয়ে এল। তার সেই সোজা চাউনি মেঘের বুকটা একটু কাঁপিয়ে দিল। আবির হাত বাড়িয়ে মেঘের কপাল থেকে সেই অবাধ্য চুলগুলো আলতো করে সরিয়ে কানের পেছনে গুঁজে দিল।

তার ছোঁয়াটা ছিল ভীষণ নরম, অথচ ব্যক্তিত্বটা পাহাড়ের মতো শক্ত। পুরুষ মানুষের এমন কোমল অথচ গম্ভীর স্পর্শে মেঘের বুকটা কেঁপে উঠল।

আবির নিচু অথচ গম্ভীর গলায় বলল, "ঘরের এই সব কাজের কোনো শেষ নেই, স্পেরো। কিন্তু তোর এই ক্লান্ত মুখটা আমার সহ্য হয় না। আমি তোকে এই ঘরে এনেছি রান্নার বুয়া বানানোর জন্য বা দিনরাত খাটানোর জন্য নয়। নিজের শরীরের দিকে একটু নজর দিবি না তুই? সারাদিন এভাবে একটানা খাটলে শরীরটা তো খারাপ করবেই। আমার কথা কি তোর মাথায় ঢোকে না?"

আবিরের মুখে 'স্পেরো' ডাকটা শোনার সাথে সাথেই মেঘের ভেতর কেমন যেন একটা মিষ্টি উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়ল। চড়ুই পাখির মতো এই ছোট মানুষটাকে সে ভালোবেসে আবিরের জীবনে নিজের ছোট্ট একটা বাসা খুঁজে নিয়েছে।

আবির ভালোবেসে তাকে মাঝেমধ্যে এই নামে ডাকে। কিন্তু মুখে সে তা প্রকাশ হতে দিল না। সে একটু চোখ নামিয়ে মৃদু গলায় বলল, "সব কাজ যদি আমিই না গুছাই, তবে কে গুছিয়ে দেবে বলুন? আর আপনি সবসময় এমন হুকুমের সুরে কথা বলেন কেন? একটু নরম করে কি বলা যায় না?"

আবির একচুলও হাসল না। তার মুখাবয়ব আগের মতোই গম্ভীর রইল। সে তার ডান হাত দিয়ে মেঘের চিবুকটা আলতো করে উঁচুতে তুলে ধরল, যাতে মেঘ সরাসরি তার চোখের দিকে তাকাতে বাধ্য হয়। মানুষের চোখের ভাষা পড়তে না জানলেও আবিরের চোখের দিকে তাকালে মেঘের সব কৌতূহল নিমিষেই দূর হয়ে যায়।

ঘরের ভেতরের এই নিস্তব্ধতায়, পড়ন্ত বিকেলের ম্লান আলোয় আবির এমনভাবে তাকাল যে মেঘের গাল দুটো লজ্জায় লাল হয়ে উঠল। আবির কোনো রাখঢাক না রেখে একেবারে সোজাসাপ্টা সুরে বলে উঠল,

➤"হাসি বা লোকদেখানো রোমান্স করার মানুষ আমি নই, মেঘ। আমার জীবনে যা কিছু সবচেয়ে খাঁটি, তার পুরোটাই জুড়ে তুই আছিস। আজ বলছি, কালও বলব—আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে।"

আবিরের এই কথাগুলোর মধ্যে কোনো অতিরিক্ত সাজানো শব্দ ছিল না, কোনো কাব্যিক পদ্য ছিল না—ছিল এক আকাশ সমান সত্যতা। মানুষটা নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে জানে না, কিন্তু যা বলে তা পাথরখোদাই করা সত্যের মতো নিখাদ।

মেঘ আর নিজের চোখের কোণের আবেগ আটকে রাখতে পারল না। সে ধীরে ধীরে দাঁড়িয়ে গিয়ে সরাসরি নিজের মুখটা গুঁজে দিল আবিরের ওই প্রশস্ত শার্টের বুকে। আবিরও এক মুহূর্ত দেরি না করে তার দুই শক্তিশালী বাহু দিয়ে মেঘকে নিজের পুরো সত্তায় জড়িয়ে ধরল।

বাইরে তখন গোধূলির আলো মিলিয়ে আসছে। নতুন সংসারের প্রথম সন্ধ্যার এই নিস্তব্ধতায় আবিরের বুক থেকে ভেসে আসা ঘ্রাণ আর তার ভালোবাসার চাদরে ঢাকা পড়ে গেল মেঘের পুরো পৃথিবী।

কিছুক্ষণ সেভাবেই কেটে গেল। বাইরে থেকে ভেসে আসা শহরের কোলাহল যেন এই ঘরের ভেতরে এসে থমকে গিয়েছিল। আবিরের প্রশস্ত বুক থেকে নিজেকে সরিয়ে মেঘ যখন একটু সোজা হয়ে দাঁড়াল, তখন তার চোখের কোণ দুটো সামান্য ভেজা।

কৃতজ্ঞতা আর ভালোবাসার এমন এক অদ্ভুত মিশ্রণ সে এর আগে কখনো অনুভব করেনি। আবির নিজের পকেট থেকে পরিষ্কার রুমালটা বের করে মেঘের হাতে দিল, যদিও মুখে কোনো কথা বলল না। তার এই মৌন ভাষাটাই মেঘের কাছে সবচেয়ে বড় সান্ত্বনা।

আবির গম্ভীর গলায় বলল, "চা খাওয়ার সময় হয়েছে। সারাদিন তো কেবল খেটে গেলি, এবার একটু জিরিয়ে নে।"

মেঘ মাথা নিচু করে মৃদু হেসে বলল, "আমি বানিয়ে আনছি চা। আপনি ফ্রেশ হয়ে বসুন।"

কিন্তু আবির তাতে রাজি হলো না। সে নিজে গিয়ে রান্নাঘরের দিকে পা বাড়াল। মেঘ অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখল, মানুষটা বাইরে থেকে যতটা কাঠখোট্টা আর গম্ভীর, ভেতরে তার মনে মেঘের প্রতি যে কী পরিমাণ যত্ন ও টান লুকিয়ে আছে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

অল্প কিছুক্ষণ পরেই আবির হাতে দুই কাপ ধোঁয়া ওঠা চা নিয়ে ড্রয়িংরুমে ফিরে এল। এক কাপ মেঘের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে সে নিজে সোফার একপাশে বসল।

চায়ে চুমুক দিতে দিতে আবির ঘরের চারপাশটা একবার চোখ বুলিয়ে নিল। নতুন এই ফ্ল্যাটের প্রতিটি কোণায় তাদের দুজনের ছোঁয়া লেগে আছে। আবির শান্ত অথচ গভীর গলায় বলল,

"শুরুটা কঠিন মনে হতে পারে, মেঘ। কিন্তু বিশ্বাস কর, এই ছোট্ট দুনিয়াটা আমাদের নিজেদের। এখানে কার কী মতলব বা বাইরের দুনিয়া কী বলছে, তাতে আমাদের কিচ্ছু যায় আসে না। এই চার দেয়ালের ভেতরটা শুধু আমাদের দুজনের রাজত্ব।"

মেঘ আবিরের দিকে তাকিয়ে সম্মানের সাথে বলল, "আপনার সাথে থাকলে কোনো কিছু নিয়েই ভয় হয় না আমার। কেবল মনে হয়, এই শান্তি যেন কখনো নষ্ট না হয়।"

আবির চায়ের কাপটা টেবিলে রেখে সোজা হয়ে বসল। তার চোখের সেই চেনা তীব্র দৃষ্টি আবার ফিরে এল। সে মেঘের হাতটা নিজের শক্ত মুঠোয় তুলে নিল। মানুষের হাতের স্পর্শ কতটা দৃঢ় হতে পারে, তা আবিরের হাত ধরলে বোঝা যায়।

আবির একবুক দৃঢ়তা নিয়ে বলল, "ভয় পাওয়ার মতো কোনো সুযোগ আমি তোকে দেব না, স্পেরো। বাইরের পৃথিবীর ঝড়-ঝাপটা এই দরজার বাইরেই আটকে থাকবে। তোর দিকে কেউ যদি বাঁকা চোখে তাকানোর দুঃসাহসও করে, তার জবাব দেওয়ার দায়িত্ব আমার। তুই শুধু নিজের ভালো থাকার দায়িত্ব নিবি।"

রাতের অন্ধকার তখন পুরোপুরি নেমে এসেছে। বারান্দার গ্রিল গলে ভেতরে এসে পড়ছে রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের হলুদ আলো। আবিরের এই কথাগুলো মেঘের মনের সমস্ত সংশয় ধুয়েমুছে সাফ করে দিল।

সে বুঝতে পারল, এই মানুষটার ভালোবাসায় কোনো কৃত্রিমতা নেই, নেই কোনো লোকদেখানো আবেগ। যা আছে, তা পাথরখোদাই করা সত্য।

আবির আবার একবার মেঘের দিকে ঝুঁকে এল এবং তার কানের কাছে ফিসফিস করে সেই চিরপরিচিত অথচ প্রতিটি উচ্চারণে নতুন শোনানো প্রতিজ্ঞাটি করে বসল:

➤"দিন বদলাক,সময় গড়িয়ে যাক—আমার এই হাতের মুঠো তোর হাত থেকে কখনো আলগা হবে না। আজ বলছি, কালও বলব—ভালোবাসি তোকে আমার স্পেরো।"

বাইরের ঝিঁঝি পোকার ডাক আর ঘরের ভেতরের এই নিস্তব্ধ প্রেমময় পরিবেশ মিলিয়ে নতুন সংসারের প্রথম রাতটি তাদের জন্য এক পরম পাওয়া হয়ে রইল।

চলবে......

গল্পটি ভালো লাগলে প্লিজ like করে পাশে থেকো!😊💜

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 1 শেষ করেছেন।

উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন