ফন্ট সাইজ:
থিম:
মায়াবী জিনকন্যা

পর্ব 1

লেখক: আমেনা আক্তার আরমিন

মায়াবী জিনকন্যা

লেখিকা: আমেনা আক্তার আরমিন

পৃথিবীতে এমন কিছু রহস্য আছে, যেগুলোর ব্যাখ্যা মানুষের জানা নেই। কিছু ঘটনা চোখের সামনে ঘটলেও মানুষ বিশ্বাস করতে চায় না। আর কিছু মানুষ আছে, যাদের দেখলে মনে হয় তারা বুঝি এই পৃথিবীর কেউ নয়।

তেমনই একজন মেয়ে—নূর।

শহরের কোলাহল থেকে অনেক দূরে, পাহাড় আর সবুজে ঘেরা একটি পুরোনো বাড়িতে তার বসবাস। বাড়িটিতে লোকজন খুব একটা যাতায়াত করে না। আশপাশের মানুষ শুধু জানে, সেখানে এক সুন্দরী মেয়ে থাকে। তবে কেউ জানে না, মেয়েটির সৌন্দর্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক অজানা রহস্য।

নূর মানুষ নয়।

সে এক জিনকন্যা।

অন্যদিকে, আরহাম। মধ্যবিত্ত পরিবারের সাধারণ একটি ছেলে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে। স্বভাবে একটু চঞ্চল, কথায় কথায় মজা করতে ভালোবাসে। রহস্য-টহস্যে তার একদম বিশ্বাস নেই।

তার ধারণা, পৃথিবীতে যা কিছু ঘটে, সবকিছুর পেছনেই কোনো না কোনো যুক্তি আছে।

কিন্তু সে জানত না, খুব শিগগিরই এমন একজনের সঙ্গে তার দেখা হবে, যে তার সব যুক্তি ভুল প্রমাণ করে দেবে।

সকাল ১০টা, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস।

— আরহাম! এই আরহাম!

বন্ধু রাফির চিৎকারে আরহাম পেছনে ফিরে তাকাল।

— কী হয়েছে? সকাল সকাল গলা ফাটাচ্ছিস কেন?

রাফি কাছে এসে বলল,

— দোস্ত, আজ আমাদের নতুন একটা প্রজেক্টের কাজ দেওয়া হবে। তুই কিছু জানিস?

— জানি।

— কী জানিস?

— জানি যে আমার জীবনটা শেষ। এত পড়াশোনা আমার দ্বারা হবে না।

রাফি বিরক্ত হয়ে মাথায় হাত দিল।

ঠিক তখনই তাদের পাশ দিয়ে একটি মেয়ে হেঁটে গেল।

রাফি ফিসফিস করে বলল,

— দোস্ত, মেয়েটাকে দেখেছিস?

— না, চোখ বাসায় রেখে এসেছি।

— তোর সঙ্গে কথা বলাই ভুল!

দুজনের হাসির মধ্য দিয়েই সকালটা কেটে গেল।

কিন্তু সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরার পথে আরহামের জীবনে ঘটল অদ্ভুত এক ঘটনা।

সন্ধ্যা ৭টা।

বাইরে তখন হালকা বৃষ্টি হচ্ছে। আরহাম রাস্তার পাশে একটি চায়ের দোকানে দাঁড়িয়ে চা খাচ্ছিল।

হঠাৎ তার চোখ গেল রাস্তার ওপাশে।

একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

সাদা পোশাক, খোলা চুল আর হাতে সাদা রঙের একটি ফুল।

অদ্ভুত ব্যাপার হলো, বৃষ্টি পড়লেও মেয়েটির গায়ে এক ফোঁটা পানিও লাগছে না।

আরহাম চোখ কুঁচকে তাকাল।

মেয়েটি এবার তার দিকে তাকিয়ে হাসল।

কেন জানি আরহামের মনে হলো, এই হাসিটা সে আগে কোথাও দেখেছে।

মেয়েটি রাস্তা পার হয়ে তার সামনে এসে দাঁড়াল।

— আপনি কি আরহাম?

আরহাম অবাক হয়ে বলল,

— জি। কিন্তু আপনি আমাকে চেনেন?

মেয়েটি মৃদু হেসে বলল,

— চিনি না। তবে আপনার সঙ্গে আমার দেখা হওয়ার কথা ছিল।

— মানে?

মেয়েটি কোনো উত্তর দিল না। শুধু হাতে থাকা সাদা ফুলটি আরহামের দিকে এগিয়ে দিল।

— এটা আপনার কাছে রাখবেন?

আরহাম ফুলটি হাতে নিয়ে বলল,

— কিন্তু কেন?

মেয়েটি একটু ঝুঁকে তার কানের কাছে ফিসফিস করে বলল,

— কারণ আমাদের গল্পটা আজ থেকেই শুরু হলো।

কথাটি বলেই মেয়েটি চলে গেল।

আরহাম কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

তারপর ফুলটির দিকে তাকিয়ে দেখল, সাদা ফুলের মাঝখানে ছোট্ট একটি নীল রঙের পাথর বসানো।

অবাক হয়ে পাথরটি হাতে নিতেই সেটি হালকা নীল আলো ছড়াতে শুরু করল।

আরহাম দ্রুত হাত সরিয়ে নিল।

— এ আবার কী!

ঠিক তখনই তার ফোনে অচেনা নম্বর থেকে একটি মেসেজ এল।

'ফুলটি হারিয়ে ফেলবেন না, আরহাম। ওটার সঙ্গে আপনার ভাগ্য জড়িয়ে আছে।'

আরহাম চারদিকে তাকাল।

মেয়েটি কোথাও নেই।

শুধু বৃষ্টিভেজা রাস্তায় পড়ে আছে কয়েকটি সাদা ফুলের পাপড়ি।

আর সেই পাপড়িগুলোর ওপর লেখা একটি নাম—

নূর।

সারারাত আরহামের চোখে ঘুম নেই। বিছানায় শুয়ে বারবার সেই সাদা ফুলটির দিকে তাকাচ্ছে সে। ফুলের মাঝখানে বসানো নীল পাথরটি এখনো হালকা আলো ছড়াচ্ছে।

আরহাম বিরক্ত হয়ে বিড়বিড় করল,

— মেয়েটা কি পাগল নাকি? দেখা হলো পাঁচ মিনিট, এর মধ্যেই ভাগ্য জড়িয়ে ফেলল!

ফুলটি টেবিলের ওপর রেখে সে ঘুমানোর চেষ্টা করল।

কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই ঘরের মধ্যে অদ্ভুত একটা সুগন্ধ ছড়িয়ে পড়ল। আরহাম চোখ খুলে দেখল, ফুলটির চারপাশে নীল আলো ঘুরছে।

সে বিছানা থেকে উঠে ফুলটির কাছে গেল।

হঠাৎ পেছন থেকে একটি মেয়েলি কণ্ঠ ভেসে এল,

— ওটা স্পর্শ করবেন না!

আরহাম চমকে পেছনে তাকাল।

সামনেই দাঁড়িয়ে আছে সেই মেয়েটি!

সাদা পোশাক, কোমর ছাড়ানো কালো চুল আর সেই মায়াবী চোখ।

আরহাম কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থেকে বলল,

— আপনি! আমার ঘরে কীভাবে এলেন?

মেয়েটি শান্তভাবে বলল,

— দরজা দিয়ে আসিনি।

আরহাম অবাক হয়ে বলল,

— তাহলে কি জানালা দিয়ে এসেছেন?

— না।

— তাহলে?

মেয়েটি মুচকি হেসে বলল,

— সবকিছু জানার এত আগ্রহ ভালো নয়, আরহাম।

আরহাম বিরক্ত হয়ে বলল,

— দেখুন, আপনি কে আমি জানি না। কিন্তু এভাবে মাঝরাতে মানুষের ঘরে আসাটা মোটেও স্বাভাবিক নয়।

মেয়েটি এবার একটু গম্ভীর হয়ে গেল।

— আমি মানুষ নই।

আরহাম কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।

তারপর বলল,

— বাহ! তাহলে আপনি কি এলিয়েন?

মেয়েটি বিরক্ত হয়ে চোখ বন্ধ করল।

— তোমাদের মানুষের সমস্যা একটাই। কোনো অস্বাভাবিক কিছু দেখলেই হাসাহাসি করো।

— তাহলে সত্যিটা বলুন।

মেয়েটি ধীরে ধীরে বলল,

— আমার নাম নূর। আমি জিনদের রাজ্যের রাজকন্যা।

আরহাম কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর হেসে উঠল।

— হাহাহা! বেশ ভালো অভিনয় করেন তো!

নূর কোনো উত্তর দিল না। শুধু হাত বাড়িয়ে টেবিলের ওপর রাখা ফুলটির দিকে তাকাল।

সঙ্গে সঙ্গে ফুলটি শূন্যে ভেসে উঠল।

আরহামের হাসি মুহূর্তেই বন্ধ হয়ে গেল।

সে অবাক হয়ে একবার ফুলের দিকে, আরেকবার নূরের দিকে তাকাল।

— এ... এটা কীভাবে করলেন?

নূর শান্ত গলায় বলল,

— এবার কি বিশ্বাস হলো?

আরহাম ঢোক গিলে বলল,

— আচ্ছা, আপনি সত্যিই জিন?

— হ্যাঁ।

— তাহলে আপনি কি মানুষ খেয়ে ফেলেন?

নূর এবার বিরক্ত হয়ে বলল,

— তোমার মাথায় কি শুধু আজেবাজে চিন্তাই আসে?

আরহাম চুপ করে গেল।

কিছুক্ষণ পর নূর বলল,

— তোমার সঙ্গে আমার দেখা হওয়ার পেছনে একটা কারণ আছে।

— কী কারণ?

— সেটা এখন বলা যাবে না।

— কেন?

— সময় হলে নিজেই জানতে পারবে।

কথাটি বলে নূর জানালার দিকে এগিয়ে গেল।

আরহাম তাড়াতাড়ি বলল,

— এই যে! দাঁড়ান। আবার কখন দেখা হবে?

নূর পেছনে ফিরে মিষ্টি করে হাসল।

— খুব শিগগিরই।

তারপর মুহূর্তের মধ্যেই সে অদৃশ্য হয়ে গেল।

আরহাম হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

এদিকে অন্য এক জগতে...

জিনদের রাজপ্রাসাদে ভয়ংকর এক অস্থিরতা চলছে।

রাজকন্যা নূরের মানুষের জগতে যাওয়ার খবর পৌঁছে গেছে জিনরাজের কানে।

জিনরাজ রাগে গর্জে উঠলেন।

— নূরকে এখনই আমার সামনে হাজির করো!

একজন প্রহরী মাথা নিচু করে বলল,

— মহারাজ, রাজকন্যা এখনো ফিরে আসেননি।

জিনরাজের চোখে উদ্বেগ ফুটে উঠল।

— সে কি সেই ছেলেটির সঙ্গে দেখা করেছে?

প্রহরী মাথা নাড়ল।

জিনরাজ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,

— তাহলে বিপদ শুরু হয়ে গেছে।

কারণ বহু বছর আগে করা একটি ভবিষ্যদ্বাণী আজ সত্যি হওয়ার পথে।

সেই ভবিষ্যদ্বাণীতে বলা হয়েছিল—

একদিন জিনরাজ্যের রাজকন্যা একজন মানুষের প্রেমে পড়বে। আর সেই ভালোবাসা বদলে দেবে দুই জগতের ভাগ্য।

অন্যদিকে, আরহামের ফোনে ঠিক তখনই একটি নতুন মেসেজ এল।

'কাল বিকেল পাঁচটায় পুরোনো বটগাছটার কাছে এসো। তোমাকে একটা সত্যি কথা বলার আছে। — নূর'

মেসেজটি পড়ে আরহাম মুচকি হাসল।

— দেখি, জিনকন্যা মহারানির আবার কী নাটক শুরু হয়!

কিন্তু সে জানত না, আগামীকাল তার জীবনে এমন কিছু ঘটতে চলেছে, যার পর আর কোনোদিন সে নিজেকে আগের মতো ভাবতে পারবে না।

চলবে...

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 1 শেষ করেছেন।

উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন