ফন্ট সাইজ:
থিম:
ডাক্টার ইশতিহার

৪র্থ পর্ব

লেখক: অনামিকা আহমেদ

গল্প :ডাক্টার_ইশতিহার

লেখিকা : অনামিকা_আহমেদ

পর্ব :৪

রূপের পুরো শরীর এক মুহূর্তের জন্য পাথর হয়ে যায়। নিজের চোখে না দেখলেও তার ঠিক পেছনে দাঁড়ানো ইশতিহার এর রাগের তেজ সে ভালোই উপলব্ধি করছে। এই মুহূর্তে ইশতিহার যে তাদের দুজনকে রক্তব*র্ণ চোখ দিয়ে গিলে খাচ্ছে রূপ সেটা জানে। তাই ঝামেলা বাঁধার আগেই রূপ তাড়াহুড়া করে লোকটাকে নিজের থেকে আলাদা করে একটু পিছিয়ে যায়। এসময় ইশতিহার এর শক্ত বুকের সাথে ধাক্কা লাগলে রূপ মুখ উঠিয়ে তার দিকে চায়। দেখে তার সন্দেহই সত্য, ইশতিহার মারাত্ম*ক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সামনে দাঁড়ানো তার মামাতো ভাই রুপমের দিকে।

রূপের গলা শুকিয়ে আসে ভয়ে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সে একবার ঢোক গিলে গলাটা ভিজিয়ে মিছেমিছি হেসে বলে,

" রুপম ভাইয়া আপনি কখন এলেন? আর কেমন আছেন?"

রুপম ও ইশতিহার এর দিকে চেয়ে ছিল, অদ্ভুত দৃষ্টিতে। রূপের কথা কানে আসতেই সে মুখ ঘুরিয়ে প্রফুল্ল চোখে রূপের দিকে চেয়ে বলে,

" এইতো অনেকক্ষণ হলো এসেছি, ভেবেছিলাম দরজা খুলতেই প্রথম মুখ টা দেখব, কিন্তু তা আর হলো কই? তুই কি ইশতিহার এর সাথে বাইরে কোথাও গিয়েছিলি রূপ?"

রূপ কি করবে সেটা বুঝতে না পেরে মাথা ঝাঁকিয়ে উত্তর দেয়। রুপমের চোখ দুটো সরু হয়ে আসে, সেই সাথে উবে যায় তার মুখের হাসি। ভালই বোঝা যাচ্ছে রুপম বিষয়টাকে ভালো ভাবে নেয়নি। বুকের ওপর দুহাত ভাঁজ করে সে জিজ্ঞাসু কন্ঠে বলে,

" কোথায়?"

এবার রূপ কিছু বলার আগেই ইশতিহার বলে উঠে,

"এর কৈফিয়ত কি আপনাকে দিতে হবে রুপম ভাই? দেখুন আপনি মেহমান, মেহমানের মতো থাকুন, আমি চাই না আপনি যেচে রূপের বিষয়ে নক গলান।"

রুপম ইশতিহার এর কথার পাল্টা জবাব দিতেই যাবে ঠিক তখনই সেখানে সুলেখা এসে পড়ে। দরজায় রূপ কে দেখতে পেয়ে তিনি ছুটে তার কাছে গিয়ে রূপের কান মলে দিয়ে বলে,

" আমাকে না বলে কোথায় ঘুরে বেড়ানো হচ্ছিল। জানিস কতটা চিন্তায় পরে গেছিলাম আমি, তার ওপর মোবাইলটাও ফেলে গেছিলি। ইশতিহার, ওকে তুই কোথায় পেয়েছিস বাবা?"

ইশতিহার মায়ের করা প্রশ্নের পরোয়া না করে রুপম কে এক প্রকার ধাক্কা দিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে চলে যায়। তবে চোখের একবারে আড়ালে যাওয়ার আগে পেছন ফিরে রূপের দিকে তাকিয়ে ইশারায় তাকে নিজের রুমে ডেকে নেয়। কথামত রূপ মাথা নিচু করে ইশতিহার এর পেছনে পেছনে যেতে নিলে সুলেখা তার পথ আটকায়।

" কিরে কথার জবাব না দিয়েই চলে যাচ্ছিস?"

রূপ মাথা তোলে না। বড় চাচী কে কিছু না জানিয়ে যে কাজ ঘটিয়ে এসেছে তারপর আর সুলেখার সাথে চোখাচোখির সাহস তার নেই।

" হাসপাতালে।"

" হাসপাতালে? কেনো? শরীর খারাপ করলো নাকি রূপ? কই আমাকে তো কিছু বললি না তুই।"

" বলার মতো কিছু হয়নি চাচী। আমি যাই, ইশতিহার ভাইয়া ডাকছে।"

" ডাকুক সে, ডাকলেই যেতে হবে না। রুপম এতদিন পর এসেছে ওর সাথে গল্প কর। আমি দেখি নাস্তার কি ব্যবস্থা হলো।"

এই বলে সুলেখা রান্নাঘরের দিকে পা বাড়ালে রূপ ও চলে যেতে নেয়। কিন্তু তার আগেই রুপম তার সামনে দাঁড়িয়ে তার পথ আটকে বলে,

" আবারও ইশতিহার এর রুমে যাওয়ার পায়তারা করছিস? আমি বুঝি তোর কেও না রূপ? আমার থেকে কি তোর ইশতিহার ভাই বেশি ইম্পর্ট্যান্ট?"

" না ভাইয়া, তা কেনো হবে?"

" তাহলে আমার সাথে আয়।"

এই বলে রুপম রূপের হাত টেনে ড্রয়িং রুমে তাকে নিয়ে যায়।

__________________

বেশ অনেক্ষণ হয়ে গেলেও রূপ রুমে না আসায় ইশতিহার এর মেজাজ চড়ে যায়। সেই কখন সে শাওয়ার নিয়ে বিছানায় বসে আছে রূপের শরীরের একটু উষ্ণতা পাওয়ার জন্য। কিন্তু তার তো আসার খবরই নেই।

ইশতিহার দাঁতে দাঁত চেপে গায়ে একটা শার্ট জড়িয়ে রুমের বাইরে এসে। তার রুমের সামনের বারান্দা দিয়ে নিচে ড্রয়িং রুম ভালো করেই দেখা যায়। তাই নিচে আসার সময় ইশতিহার দেখে রূপ রুপমের পাশে বসে কিছু একটা নিয়ে হাসাহাসি করছে। সে গল্প গুজবে এতটাই বিভোর যে উপর থেকে কেও তাকে বাজ পাখির দৃষ্টিতে দেখে যাচ্ছে রূপ সেটা খেয়াল ও করছে না। ইশতিহার এর চোয়াল শক্ত হয়ে আসে। ইচ্ছে করে এক্ষুনি গিয়ে রূপ কে কোলে তুলে আছাড় মারতে।

" পরপুরুষের সাথে গায়ে পড়ে হাসা হচ্ছে? দাড়া বান্দির বাচ্চা, দেখ তোর অবস্থা আজকে কি করি আমি।"

রাতের খাওয়ার সময় হলে একে একে বাড়ির সবাই ডাইনিং রুমে এসে। আজ সবার আগে ইশতিহার কে নামতে দেখে সুলেখা অবাক হয়। অন্যদিন গুলোতে দশ বার ডেকে পাঠানোর পর তবেই ইশতিহার এর দেখা মিলে, তবে আজ কি এমন হলো যে ইশতিহার সবার আগে হাজিরা দিতে এসে গেছে? সুলেখা অবাক চোখে তাকিয়ে থাকে নিজের ছেলের দিকে। পরে ব্যাপারটা বুঝতে পেরে মুচকি হেসে প্লেট আনতে চলে যায়।

সুলেখার পাশের চেয়ারে বসেছে রূপ। রূপের বা পাশের চেয়ারটা তখনও খালি। ইশতিহার সেই চেয়ারে বসে পড়ে আগেই কোথা থেকে রুপম ছেলেটা এসে রূপের পাশে বসে যায়। রূপের পাশে রুপম কে ভালই মানিয়েছে, ঠিক তাদের নামের মত। এমনকি ইশতিহার কেও রূপের পাশে এতটা মানাতো না। তার একটাই কারণ ইশতিহার রুপমের মতো অতটা ফর্সা নয়, সে শ্যামলা গড়নের ছেলে।

ইশতিহার এবার আর সহ্য করতে পারে না। সে হঠাৎই রূপের সামনে দাঁড়িয়ে বাজখাঁই কন্ঠে বলে,

" এক্ষুনি আমার রুমে ডিনার নিয়ে আয়। আর হ্যাঁ নিজেরটাও সাথে নিয়ে আসবি। তুই আজকে আমার সাথে ডিনার করবি। "

এই বলে ধুমধাম পায়ের শব্দ করে ইশতিহার চলে যায়। ইশতিহার এর এমন অগ্নি৷ মূর্তি দেখে রূপের অন্তরাত্মা কেঁপে উঠে। সে তাড়াতাড়ি করে চেয়ার থেকে উঠে প্লেটে খাবার সাজিয়ে ইশতিহার এর পেছনে পেছনে দৌড় দেয়। রুপম তাকে কয়েকবার ডাকে, কিন্তু রূপ সেটা কানেও তোলে না।

________________

ইশতিহার এর রুমে থেকে একের পর এক ভাঙচুরের শব্দ আসছে। ঘরটা সাউন্ডপ্রুফ হওয়ায় বাড়ির অন্যরা কিছু শুনতে না পেলেও রূপের কানে ঠিকই আসছে। কারণ সে এই মুহূর্তে দরজায় কান পেতে দাঁড়িয়ে আছে ভেতরের পরিস্থিতি বোঝার জন্য।

" বাইরে দাঁড়িয়ে থেকে কি প্রমাণ করতে চাস। ভেতরে এ জলদি।"

ইশতিহার এর এমন এক চিৎকার কানে কানে আসার সাথে সাথে রূপ কাপতে কাপতে রুমে ঢুকে যায়। চোখ দুটো ততক্ষণে আবারো ভিজে গেছে। রূপ কে সামনে পেয়ে ইশতিহার বিছানা থেকে উঠে এক ঝটকায় তার হাতের ট্রে টা মেঝেতে ছুঁড়ে মারে। সারা মেঝে জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে খাবার। রূপ তড়িঘড়ি করে মেঝের ওপর বসে সে সব পরিষ্কার করতে করতে বলে,

" এ কি করলেন আপনি? দানা জিনিস এভাবে নষ্ট করতে নেই, পা৷ প হবে যে।"

ইশতিহার রূপের এক হাত ধরে টেনে তুলে তাকে নিজের বাহুডোরে আবদ্ধ করে বলে,

" আর স্বামী ছাড়া অন্য পুরুষের গায়ে ঢলাঢলি করলে কি পাপ হয় না? আমার তো মনে হয় এই পাপ আরও বেশি জ৷ ঘন্য।"

কথাটা শুনতেই রূপের চোখ অভিমানে ভরে উঠে।

" কি বলতে চান? আমি যেচে উনার সাথে উনার সাথে কথা বলেছি? আপনি তো নিজেই দেখেছেন উনি সবসময় আমার সাথে কথা বলার চেষ্টা করেন। কতবার একজন কে ইগনোর করা যায়?"

" অন্যকে ইগনোর করতে কষ্ট লাগে, অথচ নিজের স্বামী কে অপেক্ষা করাতে তোর খারাপ লাগে না?"

" না লাগলে এলাম কেনো খাবার নিয়ে? সেগুলোও তো মাটিতে ফেলে নষ্ট করলেন। জানেন নিচে সকলে আমার দিকে কি দৃষ্টি তে তাকিয়েছিল?"

এই বলে রূপ একবার নাক টানে। রূপের চোখে পানি দেখে এবারের মতো ইশতিহার এর রাগ পরে যায়। সে নিজ হাতে রূপের চোখের পানি মুছিয়ে দিয়ে বলে,

" জানিস তোকে যখন ওই ছেলেটার সাথে দেখেছি প্রতি মুহূর্তে আমার শুধু মনে হয়েছে ওই শুয়ো*রের বাচ্চার কলিজাটা বের করে নিতে। আমি তোর পাশে আমি নিজেকে ছাড়া অন্য কাউকে কল্পনা করতে পারব না রূপ। এর চেয়ে আমার মৃ৷ ত্যু শ্রেয়। "

এই বলে ইশতিহার রূপের গলার ভাজে মুখ ডুবিয়ে দেয়। শিহরণে রূপের চোখ বুজে আসে। ইশতিহার এর চোখ দুটো থেকে রাগের চিহ্ন মুছে গিয়ে আদিম লাল৷ সা জায়গা করে নেয়। ক্ষিপ্র গতিতে রূপের বুকের ওপর থেকে ওড়না টা সরিয়ে ছুঁড়ে মারতেই সে ইশতিহার কে বাঁধা দিয়ে বলে,

" কি করছে এসব?"

" কিছুক্ষন আগে আমাদের বিয়ে হয়েছে রূপ, সেই হিসেবে আজ আমাদের বাসর রাত। বাসর রাতে যা করা উচিত সেটাই করছি। দায়িত্ব পালন করছি তোর তো খুশি হওয়া উচিত যে তোর স্বামীর সব অবস্থাতেই মুড চলে আসে। টা না করে বাঁধা দিচ্ছিস?"

রূপ ইশতিহার এর কানের কাছে এসে নিচু কন্ঠে বলে,

" কিন্তু আমি যে অন্ত৷ সত্ত্বা, বাচ্চার কিছু হলে?"

" সেসব আমার ওপর ছেড়ে দে। ডাক্তারি কেনো পড়েছি যদি কাজেই না লাগে। কাছে আয়, এত দূরে দাঁড়িয়ে আছিস কেনো আমার থেকে। এমনিতেই অনেক সময় নষ্ট হয়ে গেছে, আর এক মুহুর্ত বাজে ভাবে খরচ করতে চাই না। পুরোটা সময় তোর মাঝে কাটাতে চাই।"

চলবে.......................

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৪র্থ পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন