শেষ নিঃশ্বাসেও তুমি
লেখক: Mafiya Queen 👑
২৪তম পর্ব: সেই রাতের শেষ সাক্ষী
মিজানুর রহমানের ফোনের ওপাশ থেকে ভেসে আসা কথাগুলো তাঁর মাথার ভেতর ঘুরছিল।
“তানভীরের নিখোঁজ হওয়ার রাতে ইমরানও সেখানে ছিল।”
তিনি আর দেরি করলেন না। সঙ্গে সঙ্গে ইমরানকে ফোন করলেন।
—ইমরান সাহেব, আপনার সঙ্গে জরুরি কথা আছে।
—কী হয়েছে?
—তানভীর রহমানের নিখোঁজ হওয়ার রাত সম্পর্কে আপনি কী জানেন?
ওপাশে কয়েক মুহূর্ত নীরবতা।
তারপর ইমরান ধীরে বলল,
—এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সময় বোধহয় এসে গেছে।
পরদিন সকালে মাহমুদ রহমানের বাসায় সবাই জড়ো হলো।
মিজানুর তাঁর কাছে থাকা পুরোনো চিঠিটি টেবিলের ওপর রাখলেন।
ইমরান চিঠিটি হাতে নিয়ে পড়তে শুরু করল। কয়েকটি লাইন পড়ার পর তার মুখের ভাব বদলে গেল।
আরিয়ান জিজ্ঞেস করল,
—আপনি কি কিছু জানেন?
ইমরান দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
—হ্যাঁ। তানভীর সাহেব নিখোঁজ হওয়ার রাতের কিছু ঘটনা আমি জানি। কিন্তু এত বছর কাউকে বলিনি।
মাহমুদ অধৈর্য হয়ে বললেন,
—কেন বলোনি?
—কারণ সেদিন যা দেখেছিলাম, তার সবটুকু আমি নিজেও বুঝতে পারিনি। আর যাদের ওপর সন্দেহ হয়েছিল, তাদের বিরুদ্ধে প্রমাণও ছিল না।
নীরা সামনে এগিয়ে এল।
—আপনি অন্তত যা দেখেছেন, সেটুকু বলুন।
ইমরান বলতে শুরু করল।
“আঠারো বছর আগে, চুক্তি নিয়ে বিরোধ শুরু হওয়ার পর তানভীর সাহেব আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, কোম্পানির হিসাবের মধ্যে বড় ধরনের অসংগতি রয়েছে। কিছু কাগজে এমন মানুষের স্বাক্ষর ব্যবহার করা হয়েছে, যারা সেগুলো সম্পর্কে কিছুই জানতেন না।
সেদিন রাতে তিনি আমাকে একটি ফাইল দেওয়ার কথা বলেছিলেন। আমি নির্ধারিত জায়গায় পৌঁছানোর আগেই সেখানে কয়েকজনকে দেখতে পাই।
তানভীর সাহেব খুব চিন্তিত ছিলেন। তিনি আমাকে বলেছিলেন, ফাইলটি যেন কোনোভাবেই কামালের হাতে না যায়।
কিন্তু কিছুক্ষণ পর পরিস্থিতি বদলে যায়। তানভীর সাহেব সেখান থেকে চলে যান। যাওয়ার আগে শুধু বলেছিলেন, ‘আমি যদি ফিরে না আসি, তাহলে সত্যিটা একদিন মাহমুদের কাছে পৌঁছে দিও।’”
ইমরান থামল।
মাহমুদ জিজ্ঞেস করলেন,
—তারপর?
—পরদিন সকালে দুর্ঘটনার খবর পাই। সবাই বলল তানভীর মারা গেছেন। কিন্তু আমি তাঁর মরদেহ দেখিনি। এরপর আমার নিজের ওপরও চাপ আসতে থাকে। কিছুদিনের মধ্যে আমার সঙ্গেও দুর্ঘটনা ঘটে। তারপর দীর্ঘ সময় আমি স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারিনি।
রাশেদ ধীরে বললেন,
—তুমি কি মনে করো, তানভীর বেঁচে আছেন?
ইমরান মাথা নাড়ল।
—আমি নিশ্চিত নই। তবে তাঁর লেখা চিঠি যদি সত্যিই এত বছর পর পাওয়া যায়, তাহলে বিষয়টি নতুন করে তদন্ত করা প্রয়োজন।
মাহমুদ চিঠিটি হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন।
—তানভীর আমার চাচাতো ভাই ছিল। আমরা একসঙ্গে বড় হয়েছি। অথচ তার নিখোঁজ হওয়ার পর আমি আর কোনো খোঁজ করিনি। সবাই বলেছিল সে নেই। আমিও বিশ্বাস করে নিয়েছিলাম।
আরিয়ান বাবার পাশে এসে দাঁড়াল।
—বাবা, তখন আপনারও অনেক সমস্যা ছিল। এখন নিজেকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। বরং যা জানা সম্ভব, তা খুঁজে বের করি।
মাহমুদ ছেলের দিকে তাকালেন।
—তুমি ঠিক বলেছ। এবার আর কোনো সত্য চাপা থাকবে না।
নীরা বলল,
—চিঠিতে লেখা আছে, তানভীর শেষ চুক্তিতে স্বাক্ষর করেননি। তাহলে যে কাগজে তাঁর স্বাক্ষর দেখা গেছে, সেটি জালও হতে পারে।
ইমরান সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—সেটা যাচাই করতে হবে। শুধু হাতের লেখা দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না। পুরোনো নথির বিশেষজ্ঞ দিয়ে স্বাক্ষর পরীক্ষা করাতে হবে।
আরিয়ান ফাইলটি নিজের কাছে রাখল।
—আমি আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলব। প্রতিটি কাগজের সত্যতা যাচাই করা হবে।
দুপুরে নীরা অফিসে ফিরে এল। তার মাথায় অনেক প্রশ্ন ঘুরছিল।
মেহের কাছে এসে বলল,
—কী হয়েছে? আজ তোমাকে খুব চিন্তিত লাগছে।
নীরা সবকিছু খুলে বলল না। শুধু জানাল, পুরোনো একটি পারিবারিক ঘটনা নিয়ে নতুন তথ্য পাওয়া গেছে।
মেহের বলল,
—নিজের কাজের পাশাপাশি এত কিছু সামলানো কঠিন হচ্ছে না?
নীরা মৃদু হেসে বলল,
—কঠিন হচ্ছে। কিন্তু বাবার নামের সঙ্গে যে অন্যায় জড়িয়ে আছে, সেটা পরিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত শান্তি পাব না।
মেহের তার কাঁধে হাত রেখে বলল,
—তুমি একা নও। প্রয়োজন হলে আমাকে বলবে।
নীরা মাথা নেড়ে আবার কাজে মন দিল।
সন্ধ্যায় তৃষা বাবার ঘরে ঢুকল।
মিজানুর তখন পুরোনো কাগজগুলো গুছিয়ে রাখছিলেন।
তৃষা জিজ্ঞেস করল,
—বাবা, তুমি কি তানভীর রহমানকে চিনতে?
—চিনতাম। তিনি আমাদের ব্যবসার গুরুত্বপূর্ণ একজন মানুষ ছিলেন।
—তাহলে তাঁর মৃত্যুর ব্যাপারে তুমি এত দিন কিছু বলোনি কেন?
মিজানুর কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,
—কারণ আমি নিজেও নিশ্চিত ছিলাম না তিনি মারা গেছেন, নাকি কোথাও চলে গেছেন।
তৃষা অবাক হয়ে গেল।
—তুমি কি মনে করো তিনি এখনো বেঁচে আছেন?
মিজানুর মেয়ের দিকে তাকালেন।
—আজ বিকেলে যে ফোন এসেছিল, তার কণ্ঠ শুনে আমার মনে হয়েছে, কেউ তানভীরের বিষয়ে অনেক কিছু জানে।
—কে ফোন করেছিল?
—নিজের পরিচয় দেয়নি। কিন্তু সে আমার কাছে থাকা চিঠির কথাও জানত।
তৃষা চিন্তিত হয়ে বলল,
—তাহলে আমাদের সাবধান থাকা উচিত।
মিজানুর মেয়ের হাত ধরে বললেন,
—তুমি আর এই বিষয়ে একা কোথাও যাবে না। যা জানার, সবাই মিলে জানবে।
রাত প্রায় দশটা।
আরিয়ান নিজের কেবিনে বসে পুরোনো নথিগুলো দেখছিল। নীরা তখনও অফিসে ছিল। কাজ শেষ করে সে আরিয়ানের কেবিনের সামনে এসে দাঁড়াল।
—এখনো বাসায় যাওনি?
আরিয়ান মাথা তুলে বলল,
—কিছু কাগজ যাচাই করছি।
নীরা টেবিলের ওপর রাখা ছবিটির দিকে তাকাল। ছবিতে মাহমুদ, রাশেদ, কামাল, ইমরান এবং তানভীর একসঙ্গে দাঁড়িয়ে আছেন।
নীরা ছবিটি হাতে নিয়ে বলল,
—এই ছবিটা তানভীর সাহেব নিখোঁজ হওয়ার আগে তোলা?
—হ্যাঁ।
নীরা ছবির পেছনটা উল্টে দেখল। সেখানে ছোট করে লেখা—
“শেষ বৈঠক—সবাই উপস্থিত।”
নীরা অবাক হয়ে বলল,
—সবাই উপস্থিত ছিল, অথচ পরদিন একজন নিখোঁজ হয়ে গেলেন। কেউ কি জানত, সেদিনের বৈঠকেই শেষবার সবাই একসঙ্গে দেখা করবে?
আরিয়ান ছবিটি হাতে নিল।
—সম্ভবত কেউ জানত না। কিন্তু এই ছবির পেছনে আরেকটি বিষয় আছে।
—কী?
আরিয়ান ছবির এক কোণে আঙুল রাখল।
সেখানে একজনের হাত দেখা যাচ্ছে। ছবিতে মুখ নেই, শুধু হাতের কবজিতে একটি বিশেষ নকশার ঘড়ি।
নীরা ঘড়িটি দেখে থমকে গেল।
—এই ঘড়িটা...
আরিয়ান তাকাল।
—চেনো?
নীরা ধীরে বলল,
—এমন ঘড়ি আমি আগে দেখেছি। বাবার পুরোনো ছবিতেও ছিল।
আরিয়ান অবাক হয়ে ছবিটি আবার দেখল।
—তোমার বাবার?
নীরা মাথা নাড়ল।
—হ্যাঁ। কিন্তু ছবির হাতটা বাবার কি না, আমি নিশ্চিত নই।
ঠিক তখনই আরিয়ানের ফোনে একটি নতুন ইমেইল এল।
প্রেরকের নাম নেই। শুধু একটি ছবি সংযুক্ত।
ছবিটি খুলতেই দুজনের চোখ স্থির হয়ে গেল।
সেখানে একজন বয়স্ক মানুষ জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। মুখের বেশির ভাগ অংশ ছায়ায় ঢাকা।
ছবির নিচে লেখা—
“তানভীর রহমানকে খুঁজছেন? তাহলে আগামী শুক্রবার পুরোনো রহমান বাড়িতে আসুন। একা নয়, তবে কাউকে সঙ্গে আনার আগে ভেবে নেবেন—আপনাদের মধ্যে সবাই সত্যের পক্ষে নেই।”
নীরা ধীরে আরিয়ানের দিকে তাকাল।
—এটা কি সত্যিই তানভীর সাহেব?
আরিয়ান উত্তর দিল না।
সে শুধু ছবিটির দিকে তাকিয়ে রইল।
কারণ ছবির মানুষটির হাতে থাকা ঘড়িটি সেই পুরোনো ছবির ঘড়ির সঙ্গে হুবহু মিলে যাচ্ছে।
চলবে…