শেষ নিঃশ্বাসেও তুমি
লেখক: Mafiya Queen 👑
২৯তম পর্ব: স্বাক্ষরের আড়ালে
নীরার হাতে ধরা ছোট কাগজটি দেখে ঘরের সবাই নীরব হয়ে গেল।
কাগজের নিচে স্পষ্ট লেখা—
মাহমুদ রহমান।
নীরা একবার স্বাক্ষরটির দিকে তাকাল, তারপর মাহমুদের দিকে।
—আঙ্কেল, এই স্বাক্ষর কি আপনার?
মাহমুদ কাগজটি হাতে নিয়ে ভালোভাবে পরীক্ষা করলেন। তাঁর মুখের রং বদলে গেল।
—স্বাক্ষরটা দেখতে আমার মতো। কিন্তু আমি এমন কোনো নির্দেশ দিইনি।
নাসির বললেন,
—আমি যখন কাগজটি পেয়েছিলাম, তখনও ভেবেছিলাম স্বাক্ষরটি আপনার। কিন্তু সেদিন আপনাকে কিছু জিজ্ঞেস করার সুযোগ হয়নি।
মাহমুদ দৃঢ় গলায় বললেন,
—আমি নিজের স্বাক্ষর চিনি। এটা আমার আসল স্বাক্ষর নয়।
আরিয়ান বাবার পাশে এসে দাঁড়াল।
—তাহলে আমাদের স্বাক্ষরটি পরীক্ষা করাতে হবে।
নীরা বলল,
—শুধু সন্দেহ করে কাউকে দোষী করা যাবে না। আমরা এবার প্রমাণ ছাড়া কোনো সিদ্ধান্ত নেব না।
রাশেদ মেয়ের কথায় সম্মতি জানালেন।
—ঠিক বলেছিস। এত বছর ধরে ভুল বোঝাবুঝির কারণেই আমাদের পরিবারগুলো আলাদা হয়ে গেছে।
পরদিন সকালে আরিয়ান পুরোনো কাগজগুলো নিয়ে একজন নথি ও স্বাক্ষর বিশেষজ্ঞের সঙ্গে যোগাযোগ করল।
বিশেষজ্ঞকে তিনটি কাগজ দেওয়া হলো—
১. মাহমুদের পুরোনো আসল স্বাক্ষর। ২. হাসপাতালের নির্দেশপত্রে থাকা স্বাক্ষর। ৩. পুরোনো ব্যবসায়িক চুক্তিতে থাকা স্বাক্ষর।
তিনি কাগজগুলো পরীক্ষা করে জানালেন, ফলাফল পেতে কিছুটা সময় লাগবে।
এদিকে নীরা অফিসে গিয়ে কাজে মন দেওয়ার চেষ্টা করছিল। কিন্তু বারবার তার মনে পড়ছিল আগের রাতের ঘটনা।
মেহের কাছে এসে বলল,
—কী হয়েছে? আজ তোমাকে একদম চুপচাপ লাগছে।
নীরা বলল,
—পুরোনো একটা কাগজ নিয়ে অনেক প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
মেহের মৃদু হেসে বলল,
—তোমার জীবনে রহস্যের শেষ নেই দেখছি!
নীরা একটু হেসে বলল,
—আমিও চাই রহস্যগুলো একদিন শেষ হোক।
দুপুরে মাহমুদ নিজেই নীরার বাসায় এলেন।
রাশেদ তাঁকে বসতে বললেন।
মাহমুদ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,
—রাশেদ, একটা কথা স্বীকার করতে চাই। অতীতে আমি অনেক ভুল করেছি। তোমার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছিল, আর আমি সত্য যাচাই না করেই তোমাকে সন্দেহ করেছিলাম।
রাশেদ শান্তভাবে বললেন,
—সেই সময় আমরা সবাই ভুল করেছি। কিন্তু এখন অন্তত সত্য জানার চেষ্টা করছি।
মাহমুদ নীরার দিকে তাকালেন।
—মা, তোমার জন্মের সময় আমি হাসপাতালে গিয়েছিলাম। তোমার মাকে দেখতে। কিন্তু কোনো রেজিস্টার পরিবর্তনের নির্দেশ দিইনি। আমার স্বাক্ষর কেউ ব্যবহার করে থাকলে তার কারণ খুঁজে বের করব।
নীরা বলল,
—আমি আপনাকে দোষী ভাবছি না, আঙ্কেল। শুধু জানতে চাই, কে আপনার নাম ব্যবহার করেছে।
মাহমুদ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—সেদিন হাসপাতালের কাগজপত্র নিয়ে তানভীরের সঙ্গে আমার কথা হয়েছিল। সে আমাকে বলেছিল, কিছু নথিতে ভুল আছে। আমি বিষয়টি ঠিক করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু পরে কীভাবে সবকিছু বদলে গেল, বুঝতে পারিনি।
নীরা অবাক হলো।
—তাহলে তানভীর চাচা জানতেন?
মাহমুদ মাথা নেড়ে বললেন,
—হ্যাঁ। তবে তিনি পুরো ঘটনা জানতেন কি না, সেটাও আমার জানা নেই।
সন্ধ্যায় তানভীর, ইমরান এবং নাসির একসঙ্গে বসলেন।
নাসির বললেন,
—আমার কাছে যে কাগজটি ছিল, সেটি আমাকে একজন দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, মাহমুদ সাহেবের স্বাক্ষরেই নির্দেশটি এসেছে।
ইমরান প্রশ্ন করল,
—আপনি কি সেই মানুষটিকে চিনতেন?
—হ্যাঁ। কিন্তু তখন তাঁর কথা প্রকাশ করলে অনেক সমস্যা হতো।
তানভীর এবার বললেন,
—নাসির, এত বছর পরও কি তুমি তাঁর নাম বলতে ভয় পাচ্ছ?
নাসির মাথা নিচু করলেন।
—ভয় নয়। আমি চাই না, প্রমাণ ছাড়া কারও জীবন নষ্ট হোক।
ইমরান বলল,
—তাহলে অন্তত বলুন, তিনি কি রহমান পরিবারের সদস্য ছিলেন?
নাসির উত্তর দিলেন,
—না। তিনি পরিবারের বাইরের মানুষ ছিলেন। তবে দুই পরিবারের সঙ্গেই তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল।
তানভীর কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,
—আমারও একজনের ওপর সন্দেহ আছে। কিন্তু নিশ্চিত না হয়ে নাম বলতে চাই না।
রাত আটটার দিকে আরিয়ানের ফোনে বিশেষজ্ঞের প্রতিবেদন এল।
সে দ্রুত সবাইকে জানাল।
পরদিন সকালে মাহমুদ, রাশেদ, নীরা, আরিয়ান, ইমরান এবং নাসির আবার একত্র হলো।
আরিয়ান প্রতিবেদনটি টেবিলে রাখল।
—স্বাক্ষর পরীক্ষা করা হয়েছে। ফলাফল অনুযায়ী, হাসপাতালের নির্দেশপত্রে থাকা স্বাক্ষরটি মাহমুদ বাবার স্বাক্ষরের সঙ্গে মেলে না।
মাহমুদ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন।
রাশেদ বললেন,
—তাহলে কেউ তাঁর স্বাক্ষর নকল করেছে।
বিশেষজ্ঞের প্রতিবেদনে আরও একটি বিষয় উল্লেখ ছিল। হাসপাতালের কাগজে থাকা স্বাক্ষরটি পুরোনো ব্যবসায়িক চুক্তির একটি স্বাক্ষরের সঙ্গে কিছুটা মিল রয়েছে। তবে শুধু এই মিল দিয়ে কোনো ব্যক্তিকে শনাক্ত করা সম্ভব নয়।
নীরা বলল,
—তাহলে আমাদের কাছে এখনো চূড়ান্ত প্রমাণ নেই।
আরিয়ান মাথা নেড়ে বলল,
—ঠিক। কিন্তু আমরা অন্তত নিশ্চিত হয়েছি, স্বাক্ষরটি মাহমুদ বাবার নয়।
ঠিক তখনই নাসির নিজের ব্যাগ থেকে একটি পুরোনো ডায়েরি বের করলেন।
—এটা আমি এত বছর ধরে নিজের কাছে রেখেছিলাম। আজ মনে হচ্ছে, তোমাদের দেখানো উচিত।
তিনি ডায়েরিটি খুলে একটি পাতায় আঙুল রাখলেন।
সেখানে লেখা ছিল—
“হাসপাতালের নির্দেশপত্র তৈরি হওয়ার আগের দিন আমি একজনের সঙ্গে দেখা করেছিলাম। তিনি আমাকে বলেছিলেন, মাহমুদের নাম ব্যবহার করে একটি কাগজ তৈরি করা হবে। আমি তখন বুঝতে পারিনি, বিষয়টি এত বড় হয়ে যাবে।”
নীরা দ্রুত জিজ্ঞেস করল,
—কে লিখেছেন?
নাসির বললেন,
—আমি নিজেই লিখেছিলাম। কিন্তু যার কথা বলেছি, তাঁর নাম লিখিনি।
ইমরান অবাক হয়ে বলল,
—আপনি জানতেন কেউ মাহমুদের নাম ব্যবহার করবে, তবু কাউকে জানাননি?
নাসির মাথা নিচু করলেন।
—আমি ভুল করেছিলাম। তখন ভয় পেয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, চুপ থাকলেই সব ঠিক হয়ে যাবে।
মাহমুদ কষ্টের গলায় বললেন,
—তোমার নীরবতার কারণে কত কিছু বদলে গেল, নাসির!
নাসির কোনো উত্তর দিলেন না।
সবাই চলে যাওয়ার পর নীরা বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল। আরিয়ান তার পাশে এসে দাঁড়াল।
—আজ অনেকটা এগোনো গেল।
নীরা বলল,
—হ্যাঁ। কিন্তু একটা প্রশ্ন থেকেই গেল। নাসির মামা যদি আগে থেকেই জানতেন কেউ মাহমুদের নাম ব্যবহার করবে, তাহলে তিনি এত দিন চুপ ছিলেন কেন?
আরিয়ান বলল,
—মানুষ অনেক সময় ভয় পেয়ে ভুল সিদ্ধান্ত নেয়। তবে তাঁর নীরবতার কারণও আমাদের জানতে হবে।
নীরা কিছুক্ষণ আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল।
—আমি চাই, এই রহস্যের শেষ হোক। আর চাই, আমাদের পরিবারগুলো আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরুক।
আরিয়ান শান্ত গলায় বলল,
—একদিন নিশ্চয়ই সবকিছু পরিষ্কার হবে।
সেই রাতেই নাসির নিজের ঘরে বসে ডায়েরির বাকি পাতাগুলো পড়ছিলেন।
হঠাৎ একটি পুরোনো খাম বেরিয়ে এল। খামের ভেতরে একটি চিঠি।
চিঠির প্রথম লাইন পড়েই তাঁর হাত কেঁপে উঠল।
লেখা ছিল—
“নাসির, তুমি যদি কখনো সত্য প্রকাশ করতে চাও, তাহলে আগে জেনে রেখো—মাহমুদকে ফাঁসানোর পরিকল্পনা শুধু ব্যবসার জন্য ছিল না। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে তোমার নিজের পরিবারের একটি পুরোনো ঘটনা।”
নাসির তাড়াতাড়ি চিঠিটি ভাঁজ করে ফেললেন।
ঠিক তখন দরজায় নক হলো।
—কে?
বাইরে থেকে উত্তর এল,
—আমি, আপনার পুরোনো পরিচিত।
নাসির দরজা খুললেন।
সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটিকে দেখে তিনি কয়েক মুহূর্ত কথা বলতে পারলেন না।
লোকটি মৃদু হেসে বলল,
—অনেক দিন পর দেখা হলো, নাসির সাহেব। মনে আছে, আঠারো বছর আগে আপনাকে কী বলেছিলাম?
নাসিরের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
কারণ এই মানুষটির নামই তিনি এত বছর ধরে নিজের ডায়েরিতে লিখতে ভয় পেয়েছিলেন।
লোকটি ছিল মিজানুর রহমান!
কিন্তু মিজানুর তো এত দিন নীরাদের সাহায্য করছিলেন!
তাহলে তিনি কি সত্যিই সাহায্য করছিলেন, নাকি অন্য কোনো উদ্দেশ্যে সবার কাছাকাছি এসেছিলেন?
চলবে…