শেষ নিঃশ্বাসেও তুমি
লেখক: Mafiya Queen 👑
৩৪তম পর্ব: পরিবারের অজানা অধ্যায়
সামিরার শেষ কথাগুলো নীরার কানে বারবার বাজছিল।
“সেই মানুষটির সঙ্গে তোমার জন্মের রাতের ঘটনারও সম্পর্ক আছে।”
নীরা নাসিরের দিকে তাকাল।
—মামা, এবার আর কিছু লুকাবে না। কে সেই মানুষ?
নাসির মাথা নিচু করে বসে রইলেন।
কিছুক্ষণ পর তিনি বললেন,
—মানুষটি আমার নিজের ছেলে।
ঘরের সবাই স্তব্ধ হয়ে গেল।
নীরা অবাক হয়ে বলল,
—তোমার ছেলে? কিন্তু খালা তো কখনো বলেনি তোমার কোনো ছেলে আছে!
নাসিরের চোখ ভিজে উঠল।
—কারণ আমার ছেলেকে আমি নিজেই নিজের জীবন থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছিলাম।
মাহমুদ অবাক হয়ে বললেন,
—আপনার ছেলে কোথায়?
নাসির উত্তর দিলেন,
—তার নাম আরিফ। আঠারো বছর আগে সে খুব ছোট ছিল। তার মা মারা যাওয়ার পর আমি তাকে নিয়ে একা হয়ে পড়েছিলাম। তখনই পুরোনো ব্যবসার ঝামেলা শুরু হয়।
আরিয়ান জিজ্ঞেস করল,
—ব্যবসার ঘটনার সঙ্গে আপনার ছেলের সম্পর্ক কী?
নাসির দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—আরিফ একদিন জহিরের অফিসে কিছু কাগজ দেখতে পেয়েছিল। সে বুঝতে পারেনি সেগুলো কতটা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু কাগজের মধ্যে মাহমুদ সাহেবের নাম দেখে আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল। আমি ভয় পেয়ে তাকে বলেছিলাম, এসব বিষয়ে কাউকে কিছু না বলতে।
ইমরান বলল,
—তাহলে জহির কি আরিফকে ব্যবহার করেছিল?
—আমি নিশ্চিত নই। তবে কিছুদিন পর আরিফ নিখোঁজ হয়ে যায়। আমি ভেবেছিলাম, তাকে কেউ নিয়ে গেছে। অনেক খোঁজ করেও পাইনি।
নীরা ধীরে বলল,
—তুমি কি এজন্য পরিবার ছেড়ে চলে গিয়েছিলে?
নাসির মাথা নাড়লেন।
—হ্যাঁ। আমি ভেবেছিলাম, আমার কারণে তোমাদের পরিবারও বিপদে পড়তে পারে।
১. সামিরার ফিরে আসা
পরদিন সকালে সামিরা নাসিরের বাসায় এলেন।
নীরাকে দেখে বললেন,
—তুই নিশ্চয়ই অনেক প্রশ্ন নিয়ে বসে আছিস।
নীরা বলল,
—হ্যাঁ খালা। আমি শুধু সত্যটা জানতে চাই।
সামিরা নাসিরের পাশে বসলেন।
—আরিফ হারিয়ে যাওয়ার পর নাসির আমাকে একটা চিঠি দিয়েছিল। সেখানে লিখেছিল, যদি কখনো তার খোঁজ পাওয়া যায়, যেন তাকে জানানো হয় যে তার বাবা তাকে কখনো ভুলে যায়নি।
নাসির চোখ মুছলেন।
—আমি জানতাম না, আর কোনো দিন তাকে দেখতে পাব কি না।
নীরা খালার হাত ধরল।
—তাহলে এত দিন তুমি আমাকে কেন বলোনি?
—কারণ তোর জন্মের রাতের ঘটনাটির সঙ্গে আরিফের নাম জড়িয়ে পড়েছিল। আমি ভয় পেয়েছিলাম, তুই অযথা কষ্ট পাবি।
আরিয়ান বলল,
—আরিফ কি নীরার জন্মের রাতে হাসপাতালে ছিল?
সামিরা উত্তর দিলেন,
—আমি তাকে হাসপাতালের করিডরে দেখেছিলাম। কিন্তু সে সেখানে কেন এসেছিল, তা জানতাম না।
নাসির দ্রুত বললেন,
—তুমি আগে আমাকে এটা বলোনি কেন?
—কারণ তখন আমি নিশ্চিত ছিলাম না। শুধু মনে হয়েছিল, ছেলেটি আরিফের মতো দেখতে।
নীরা অবাক হয়ে বলল,
—তাহলে আরিফ হয়তো সেই রাতের কিছু জানে!
২. হারিয়ে যাওয়া ছেলের খোঁজ
আরিয়ান রাফিকে ফোন করল।
—রাফি, নাসির সাহেবের ছেলে আরিফের পুরোনো কোনো তথ্য পাওয়া যায় কি না খোঁজ নাও। তবে সবকিছু বৈধভাবে যাচাই করবে।
রাফি বলল,
—ঠিক আছে, স্যার।
ইমরান পুরোনো কাগজগুলো আবার পরীক্ষা করতে লাগল।
একটি ফাইলের ভেতরে ছোট্ট একটি কাগজ পাওয়া গেল।
সেখানে লেখা—
“আরিফ — নথি পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব।”
ইমরান কাগজটি নাসিরের সামনে রাখল।
—এটা কি আপনার ছেলের নাম?
নাসির কাগজটি দেখে কেঁপে উঠলেন।
—হ্যাঁ। এটা আরিফের হাতের লেখা।
মাহমুদ বললেন,
—তাহলে সে শুধু কাগজ দেখেনি, কোনো নথি পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্বও পেয়েছিল?
নাসির বললেন,
—আমি জানতাম না।
তানভীর কাগজটি হাতে নিয়ে বললেন,
—এখানে একটি তারিখও আছে। তারিখটি নীরার জন্মের আগের দিন।
নীরা বলল,
—তাহলে আরিফ কি হাসপাতালের নথি নিয়ে কিছু জানত?
কেউ উত্তর দিতে পারল না।
৩. অচেনা পরিচিত কণ্ঠ
সেদিন বিকেলে নীরা একা বারান্দায় বসেছিল।
হঠাৎ তার ফোনে একটি কল এল।
অপরিচিত নম্বর।
—হ্যালো?
ওপাশ থেকে একজন পুরুষ বলল,
—আপনি কি নীরা রহমান?
—জি। আপনি কে?
—আমার নাম আরিফ।
নীরার বুক ধক করে উঠল।
—আপনি কি নাসির মামার ছেলে?
ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর লোকটি বলল,
—আপনি আমার বাবাকে দেখেছেন?
—হ্যাঁ। তিনি আপনাকে অনেক বছর ধরে খুঁজছেন।
আরিফের কণ্ঠ ভারী হয়ে গেল।
—আমি জানি। কিন্তু এত বছর ফিরে আসিনি, কারণ আমি কিছু সত্য জানতে চেয়েছিলাম।
নীরা দ্রুত বলল,
—আপনি কি আমার জন্মের রাতের ঘটনা জানেন?
আরিফ দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
—আমি সেদিন হাসপাতালে ছিলাম। তবে আমি কোনো রেজিস্টার পরিবর্তন করিনি। আমাকে একটি খাম পৌঁছে দিতে বলা হয়েছিল।
—কাকে?
—জহির উদ্দিনকে।
নীরা অবাক হয়ে গেল।
—খামের মধ্যে কী ছিল?
আরিফ বলল,
—আমি খাম খুলিনি। কিন্তু বাইরে একটি নাম লেখা ছিল।
নীরা জিজ্ঞেস করল,
—কোন নাম?
আরিফ ধীরে বলল,
—সামিরা রহমান।
নীরা আর কোনো কথা বলতে পারল না।
৪. বাবার সামনে ছেলে
পরদিন নাসিরের বাড়িতে আরিফ এল।
দরজা খুলতেই নাসির ছেলেকে দেখে স্থির হয়ে গেলেন।
—আরিফ!
আরিফ কিছুক্ষণ বাবার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর ধীরে বলল,
—বাবা।
নাসির ছেলেকে কাছে টেনে নিলেন।
দীর্ঘ আঠারো বছরের অপেক্ষা যেন এক মুহূর্তে ভেঙে পড়ল।
কিছুক্ষণ পর আরিফ সবাইকে বলল,
—আমি তখন ছোট ছিলাম। জহির আমাকে বলেছিল, একটি খাম তার কাছে পৌঁছে দিতে। আমি শুধু দায়িত্ব পালন করেছিলাম। কিন্তু পরে বুঝতে পারি, ওই খামের কারণে অনেক বড় ঘটনা ঘটেছে।
ইমরান প্রশ্ন করল,
—তুমি কি জানো, খামে কী ছিল?
—না। তবে খাম দেওয়ার আগে জহির বলেছিল, কাগজটি যেন অন্য কারও হাতে না যায়।
আরিয়ান বলল,
—তুমি কি জহিরকে আবার দেখেছিলে?
আরিফ মাথা নাড়ল।
—হ্যাঁ। কয়েক বছর আগে। সে আমাকে একটি কথা বলেছিল।
নীরা জিজ্ঞেস করল,
—কী কথা?
আরিফ উত্তর দিল,
—সে বলেছিল, “যে কাগজের জন্য এত বছর সবাই একে অন্যকে সন্দেহ করেছে, সেই কাগজে আসল সত্য লেখা নেই।”
মাহমুদ অবাক হয়ে বললেন,
—মানে?
আরিফ বলল,
—জহির বলেছিল, আসল নির্দেশপত্র কখনো তৈরি করা হয়নি। সবাইকে দেখানো কাগজটি ছিল একটি নকল কপি।
মিজানুর বললেন,
—তাহলে আসল নির্দেশ কোথায়?
আরিফ পকেট থেকে একটি ছোট কাগজ বের করল।
—জহির আমাকে এটা দিয়েছিল। বলেছিল, একদিন প্রয়োজন হলে নাসিরকে দিতে।
নাসির কাগজটি খুললেন।
সেখানে লেখা ছিল—
“আসল নির্দেশপত্র কোনো সরকারি নথিতে নেই। সেটি রাখা হয়েছিল এমন একজনের কাছে, যিনি নিজের পরিচয় প্রকাশ করতে চাননি।”
নীরা প্রশ্ন করল,
—সেই মানুষটি কে?
আরিফ মাথা নাড়ল।
—আমি জানি না। তবে জহির বলেছিল, মানুষটি এখনো বেঁচে আছে।
৫. নতুন সূত্র
রাতের দিকে সবাই যখন আলোচনা করছিল, তখন সামিরা হঠাৎ একটি কথা মনে করলেন।
—একটু দাঁড়াও। আঠারো বছর আগে জহির আমাকে যে খামটি দিয়েছিল, তার কথা মনে আছে?
নীরা বলল,
—যেটা হারিয়ে গিয়েছিল?
—হ্যাঁ। কিন্তু খামের ভেতরে কী ছিল, সেটা আমি জানতাম না। তবে খামের বাইরে একটি ছোট চিহ্ন ছিল।
আরিফ জিজ্ঞেস করল,
—কী চিহ্ন?
সামিরা বললেন,
—একটি নীল রঙের গোল সিল। মাঝখানে লেখা ছিল ‘R.H.’
মাহমুদ চমকে উঠলেন।
—R.H. মানে Royal Holdings?
মিজানুর বললেন,
—হতে পারে। তবে তখন কোম্পানির নাম ছিল রহমান অ্যান্ড কোম্পানি।
ইমরান বলল,
—তাহলে সিলটি কোম্পানির পুরোনো অফিসের হতে পারে।
আরিয়ান বলল,
—আমাদের পুরোনো অফিসের আর্কাইভে খোঁজ নিতে হবে।
নীরা জানালার বাইরে তাকাল।
এত দিন ধরে যে রহস্যের উত্তর খুঁজছিল, সেটি যেন আরও কাছে চলে এসেছে।
কিন্তু এবার তার মনে নতুন প্রশ্ন।
জহির কেন আরিফকে খামটি দিয়েছিল?
কেন সামিরার নাম লেখা ছিল?
আর সেই অজানা মানুষটি কে, যার কাছে আসল নির্দেশপত্র রাখা হয়েছিল?
ঠিক তখনই আরিফের ফোনে একটি পুরোনো ইমেইল এল।
ইমেইলটির প্রেরকের নাম দেখে সে চমকে উঠল।
জহির উদ্দিন।
ইমেইলের তারিখ পাঁচ দিন আগের।
ভেতরে মাত্র একটি বাক্য—
“আরিফ, তোমার বাবাকে বলো, নাসির যা জানে তার চেয়েও বেশি কিছু লুকিয়ে রেখেছে।”
আরিফ ধীরে বাবার দিকে তাকাল।
নাসিরের মুখ মুহূর্তেই ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
চলবে…