ফন্ট সাইজ:
থিম:
শেষ নিঃশ্বাসেও তুমি

পর্ব 37

লেখক: Mafiya Queen

শেষ নিঃশ্বাসেও তুমি

লেখক: Mafiya Queen 👑

৩৭তম পর্ব: রক্তের সম্পর্কের আড়ালে

লকার থেকে পাওয়া কাগজটি টেবিলের ওপর রাখা।

মাহমুদ রহমান বারবার স্বাক্ষরটির দিকে তাকাচ্ছেন।

আরিয়ান বাবার পাশে এসে দাঁড়াল।

—বাবা, আপনি কি নিশ্চিত এটা আপনার বড় চাচার স্বাক্ষর?

মাহমুদ মাথা নাড়লেন।

—হ্যাঁ। তাঁর নাম ছিল আজহার রহমান। আমাদের পরিবারের ব্যবসার শুরুতে তাঁর অনেক অবদান ছিল। তবে তিনি মারা যাওয়ার আগে বেশ কয়েক বছর ব্যবসা থেকে দূরে ছিলেন।

নীরা প্রশ্ন করল,

—তিনি কি কামাল সাহেবের সঙ্গে কাজ করতেন?

—হ্যাঁ। পুরোনো চুক্তির অনেক সিদ্ধান্ত তাঁর অনুমতি ছাড়া নেওয়া যেত না।

ইমরান কাগজটি হাতে নিয়ে বলল,

—তাহলে এই স্বাক্ষরটি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু শুধু স্বাক্ষর দেখে বোঝা যাবে না, তিনি কী অনুমোদন করেছিলেন।

আরিয়ান বলল,

—আমাদের জানতে হবে, কাগজটি আসলে কীসের।

নীরা শান্ত গলায় বলল,

—আমি আর কোনো অনুমানের ওপর বিশ্বাস করতে চাই না। এবার প্রতিটি তথ্যের প্রমাণ চাই।

১. আজহার রহমানের পুরোনো বাড়ি

পরদিন মাহমুদ সবাইকে নিয়ে আজহার রহমানের পুরোনো বাড়িতে গেলেন।

বাড়িটি বহু বছর ধরে বন্ধ। সেখানে এখনো কিছু পুরোনো আসবাবপত্র ও নথিপত্র রাখা আছে।

মাহমুদ একটি আলমারি খুললেন।

—চাচা গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র এখানে রাখতেন।

ইমরান ও তানভীর ফাইলগুলো পরীক্ষা করতে শুরু করল।

কিছুক্ষণ পর তানভীর একটি পুরোনো ডায়েরি পেলেন।

ডায়েরির প্রথম পাতায় লেখা—

“আজহার রহমান — ব্যক্তিগত হিসাব ও স্মৃতি।”

মাহমুদ ডায়েরিটি হাতে নিয়ে বললেন,

—চাচা কখনো কাউকে তাঁর ব্যক্তিগত ডায়েরি পড়তে দিতেন না।

নীরা বলল,

—তাহলে হয়তো এখানেই কিছু উত্তর পাওয়া যাবে।

মাহমুদ ডায়েরিটি খুললেন।

প্রথম কয়েকটি পাতায় ব্যবসার হিসাব। এরপর একটি পাতায় লেখা—

“কামালকে আমি বিশ্বাস করেছিলাম। কিন্তু কিছুদিন ধরে হিসাবের মধ্যে অসংগতি দেখতে পাচ্ছি। মাহমুদকে বিষয়টি জানানো প্রয়োজন। রাশেদকে অযথা সন্দেহ করা হচ্ছে।”

ইমরান বলল,

—এখানে তো দেখা যাচ্ছে, তিনি রাশেদ সাহেবকে নির্দোষ মনে করতেন।

রাশেদ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

—তাহলে তিনি সত্যটা জানতেন?

মাহমুদ পরের পাতাটি উল্টালেন।

সেখানে লেখা ছিল—

“আজ একটি কাগজে স্বাক্ষর করতে বলা হয়েছিল। আমি স্বাক্ষর করেছি, কিন্তু পরে বুঝলাম, কাগজটির সঙ্গে আমাকে দেখানো মূল কাগজের মিল নেই।”

সবাই একে অন্যের দিকে তাকাল।

২. স্বাক্ষরের পেছনের গল্প

আরিয়ান বলল,

—বাবা, এই কথাটার মানে কী হতে পারে?

মাহমুদ উত্তর দিলেন,

—সম্ভবত চাচাকেও ভুল কাগজ দেখিয়ে স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছিল।

মিজানুর বললেন,

—এটা আমার সঙ্গেও ঘটেছিল। আমাকে বলা হয়েছিল, একটি কাগজ শুধু সংরক্ষণের জন্য। পরে বুঝেছিলাম, কাগজটি অন্য উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়েছে।

নীরা বলল,

—তাহলে একই পদ্ধতিতে অনেকের স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছিল?

ইমরান বলল,

—সম্ভবত। কেউ পুরো কাগজ না পড়ে স্বাক্ষর করেছে, আর কেউ স্বাক্ষর ব্যবহার করে অন্য নথি তৈরি করেছে। কিন্তু কে এই কাজগুলো সমন্বয় করেছিল, সেটাই আসল প্রশ্ন।

তানভীর ডায়েরির শেষের দিকে একটি ভাঁজ করা কাগজ পেলেন।

কাগজটি খুলতেই দেখা গেল, সেখানে তিনটি নাম লেখা—

১. কামাল আহমেদ
২. জহির উদ্দিন
৩. মাহবুব আলম

নিচে লেখা—

“তিনজনের বক্তব্য এক নয়। সত্য জানতে হলে মূল চুক্তি ও হাসপাতালের নথি পাশাপাশি দেখতে হবে।”

আরিয়ান বলল,

—চাচা হয়তো তিনজনের ভূমিকা সম্পর্কে কিছু জানতেন।

৩. পুরোনো চিঠি

ডায়েরির ভেতরে আরও একটি চিঠি পাওয়া গেল।

চিঠিটি মাহমুদের উদ্দেশে লেখা।

মাহমুদ পড়তে শুরু করলেন।

“মাহমুদ,

তুমি আমার ওপর রাগ করলেও একটি কথা মনে রেখো। আমি কখনো চাইনি তোমার নাম ব্যবহার করে কেউ কোনো অন্যায় করুক।

কামাল যে হিসাব পরিবর্তন করছে, তা আমি বুঝতে পেরেছি। কিন্তু তাকে সাহায্য করছে এমন একজন, যার সঙ্গে আমাদের পরিবারের পুরোনো সম্পর্ক রয়েছে।

আমি নামটি জানি, কিন্তু প্রমাণ ছাড়া কাউকে অভিযুক্ত করতে চাই না।

তুমি যদি এই চিঠি পাও, তাহলে আমার ব্যক্তিগত নথির বাক্সটি খুঁজে দেখো।”

চিঠির শেষে কোনো স্বাক্ষর নেই।

মাহমুদ বললেন,

—চাচা আমাকে এই চিঠি কখনো দেননি। তাহলে এটা এখানে এল কীভাবে?

নীরা বলল,

—হয়তো তিনি কাউকে দিয়ে পাঠাতে চেয়েছিলেন, কিন্তু পারেননি।

আরিয়ান বলল,

—আমাদের সেই ব্যক্তিগত নথির বাক্সটি খুঁজতে হবে।

৪. নীরার সিদ্ধান্ত

সবাই যখন নথি খুঁজছিল, নীরা বাড়ির পুরোনো বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল।

আরিয়ান তার কাছে এসে বলল,

—কী ভাবছ?

নীরা বলল,

—একটা বিষয় বুঝতে পারছি না। এত মানুষ এত বছর ধরে সত্য জানত, কিন্তু কেউ পুরোটা বলেনি কেন?

আরিয়ান বলল,

—ভয়, ভুল সিদ্ধান্ত আর নিজেদের স্বার্থ—সব মিলিয়ে হয়তো কেউ সাহস পায়নি।

—কিন্তু আমার পরিবারকে এত বছর সন্দেহের মধ্যে থাকতে হয়েছে।

আরিয়ান কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

—আমি জানি। আর আমি চাই না, এই রহস্যের কারণে তোমার পরিবারের সঙ্গে আমার পরিবারের সম্পর্ক আরও খারাপ হোক।

নীরা তাকাল।

—তুমি কি মনে করো, সত্য জানার পর আমাদের সম্পর্ক বদলে যাবে?

আরিয়ান শান্তভাবে বলল,

—সত্য যদি সম্পর্ক বদলে দেয়, তাহলে সেই সম্পর্কের ভিতটা আগে থেকেই দুর্বল ছিল। আমি চাই, আমরা সত্য জেনেই সিদ্ধান্ত নিই।

নীরা আর কিছু বলল না।

তার মনে হলো, আরিয়ান অন্তত এখন আর কিছু আড়াল করতে চাইছে না।

৫. বাক্সের ভেতরের প্রমাণ

বিকেলের দিকে বাড়ির পুরোনো স্টোররুমে একটি ছোট লোহার বাক্স পাওয়া গেল।

বাক্সটি খুলে দেখা গেল, ভেতরে কয়েকটি চুক্তিপত্র এবং একটি পুরোনো অডিও ক্যাসেট।

ক্যাসেটের গায়ে লেখা—

“আজহার রহমান — শেষ বক্তব্য।”

মাহমুদ অবাক হয়ে বললেন,

—চাচা কি নিজের কোনো বক্তব্য রেকর্ড করেছিলেন?

তানভীর বললেন,

—হতে পারে। তবে ক্যাসেটটি শোনার আগে এর সত্যতা যাচাই করা দরকার।

আরিয়ান ক্যাসেটটি সংরক্ষণের জন্য আলাদা করে রাখল।

ঠিক তখন ইমরান একটি চুক্তিপত্র তুলে বলল,

—এখানে দেখুন! এই কাগজে কামালের স্বাক্ষর আছে। আর তার নিচে একজন সাক্ষীর স্বাক্ষর।

মাহমুদ কাগজটি হাতে নিলেন।

সাক্ষীর নাম দেখে তাঁর চোখ বড় হয়ে গেল।

“নাসির উদ্দিন।”

নাসির কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।

নীরা তাঁর দিকে তাকিয়ে বলল,

—মামা, আপনি এই চুক্তির সাক্ষী ছিলেন?

নাসির ধীরে উত্তর দিলেন,

—হ্যাঁ। কিন্তু এই চুক্তির বিষয়বস্তু আমাকে যেভাবে বুঝিয়ে বলা হয়েছিল, আসল কাগজে তা লেখা ছিল না।

আরিয়ান প্রশ্ন করল,

—তাহলে আপনি কি জানতেন, আপনার স্বাক্ষর অন্যভাবে ব্যবহার করা হতে পারে?

নাসির বললেন,

—সন্দেহ হয়েছিল। কিন্তু তখন আমি বুঝতে পারিনি, বিষয়টি এত দূর গড়াবে।

মিজানুর বললেন,

—এখন আমাদের কাছে কয়েকজনের স্বাক্ষর, চিঠি এবং ডায়েরি আছে। এগুলো মিলিয়ে দেখতে হবে।

৬. ক্যাসেটের শেষ কথা

সন্ধ্যায় সবাই ক্যাসেটটি নিয়ে মাহমুদের বাড়িতে ফিরল।

একজন বিশেষজ্ঞের মাধ্যমে ক্যাসেটটির শব্দ সংরক্ষণ করে শোনার ব্যবস্থা করা হলো।

কিছুক্ষণ পর পুরোনো কণ্ঠ ভেসে এল।

“আমি আজহার রহমান।

যদি কেউ এই রেকর্ড শুনে থাকো, তাহলে বুঝবে, আমি আমার জীবনের শেষ দিকে এসে কিছু সত্য লিখে যেতে চাই।

কামাল যে ভুল করেছে, তার দায় সে এড়াতে পারবে না। কিন্তু তাকে এই পথে নিয়ে গেছে অন্য একজন।

আমি সেই মানুষটির নাম জানি।

কিন্তু তার নাম প্রকাশ করার আগে একটি প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন।

কেন নাসির উদ্দিনকে আঠারো বছর আগে পরিবার ছেড়ে চলে যেতে হয়েছিল?

কারণ নাসির শুধু একটি ব্যবসার কাগজ দেখেনি। সে এমন একটি চিঠি পড়েছিল, যেখানে লেখা ছিল—”

হঠাৎ শব্দ থেমে গেল।

ক্যাসেটের বাকি অংশে শুধু অস্পষ্ট আওয়াজ।

সবাই হতাশ হয়ে পড়ল।

বিশেষজ্ঞ জানালেন, ক্যাসেটের ওই অংশটি ক্ষতিগ্রস্ত। সেটি উদ্ধার করা সম্ভব কি না, তা পরীক্ষা করতে হবে।

নীরা নাসিরের দিকে তাকাল।

—মামা, তুমি কি সেই চিঠি পড়েছিলে?

নাসিরের চোখে অস্বস্তি ফুটে উঠল।

তিনি ধীরে বললেন,

—হ্যাঁ। আমি চিঠিটি পড়েছিলাম।

—তাহলে চিঠিতে কী লেখা ছিল?

নাসির উত্তর দেওয়ার আগেই মাহমুদ বললেন,

—নাসির, এবার আর চুপ থেকো না।

নাসির কিছুক্ষণ নীরব থেকে বললেন,

—চিঠিতে লেখা ছিল, আমার নিজের পরিবারের একজন মানুষই কামালকে সাহায্য করেছিল।

নীরা বিস্মিত হয়ে গেল।

—তোমার পরিবারের কে?

নাসিরের চোখ এবার সামিরার দিকে গেল।

সামিরা এতক্ষণ চুপচাপ বসেছিলেন।

তিনি ধীরে উঠে দাঁড়ালেন।

—নাসির, এবার সত্যটা আমাকেও জানতে হবে।

নাসির মাথা নিচু করে বললেন,

—সেই নামটি হলো—

ঠিক তখন ক্যাসেটের বিশেষজ্ঞ আবার ডাকলেন।

তিনি বললেন, ক্যাসেটের শেষ অংশে একটি শব্দ উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।

সবাই তাঁর দিকে তাকাল।

তিনি প্লে বাটন চাপলেন।

পুরোনো কণ্ঠটি আবার শোনা গেল।

“যে মানুষটিকে তোমরা এত দিন মৃত ভেবেছ, সে-ই জানে আসল নির্দেশদাতার নাম।”

ঘরের সবাই একে অন্যের দিকে তাকাল।

তানভীর ধীরে বললেন,

—কিন্তু আমাদের তো জানা আছে, আমি বেঁচে আছি। তাহলে চাচা আর কার কথা বলেছিলেন?

নাসিরের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

তিনি ফিসফিস করে বললেন,

—একজন নয়... আমাদের ধারণার বাইরে আরও একজন মানুষ এত দিন জীবিত ছিল।

চলবে…

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 37 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন