শেষ নিঃশ্বাসেও তুমি
লেখক: Mafiya Queen 👑
৫৭তম পর্ব: বাড়ির ভেতর লুকানো R-21
আতিকুর রহমানের বাড়ি থেকে ফেরার পর নীরার মাথায় শুধু একটি কথাই ঘুরছিল—
R-21।
পুরোনো নথি গ্রহণ ও ফেরত দেওয়ার রেজিস্টার। সেখানে নাকি প্রতিটি কাগজের যাত্রাপথ লেখা থাকার কথা।
কিন্তু রেজিস্টারটি কোথায়?
গাড়িতে বসে নীরা আরিয়ানকে বলল,
—আমাদের জহির সাহেবকে আবার জিজ্ঞেস করা উচিত।
আরিয়ান বলল,
—জিজ্ঞেস করব। তবে আতিকুর সাহেব একটা কথা বলেছেন, রেজিস্টারের একটি পৃষ্ঠা রহমান পরিবারের বাড়িতে থাকতে পারে।
নীরা অবাক হলো।
—আমাদের বাড়িতে?
—তিনি নিশ্চিত নন। শুধু শুনেছিলেন, আজিজুর রহমান একবার একটি পৃষ্ঠা পরিবারের কাছে পাঠিয়েছিলেন।
নীরা জানালার বাইরে তাকাল।
—তাহলে বাবার পুরোনো কাগজগুলো আবার দেখতে হবে।
১. পুরোনো আলমারির খোঁজ
সেদিন সন্ধ্যায় নীরা বাবার ঘরে গেল।
রাশেদ রহমান পুরোনো একটি আলমারি পরিষ্কার করছিলেন।
নীরা বলল,
—বাবা, দাদার পুরোনো কাগজপত্র কি এখনো সব এই আলমারিতেই আছে?
রাশেদ বললেন,
—বেশিরভাগই আছে। কিছু কাগজ তোমার মা আলাদা করে রেখেছে। কেন?
নীরা R-21 রেজিস্টারের কথা জানাল।
রাশেদ কিছুক্ষণ ভাবলেন।
—তোমার দাদার মৃত্যুর পর অনেক কাগজ আমার কাছে এসেছিল। কিন্তু কোনটা কোথায় রেখেছি, সব মনে নেই।
তখন নীরার মা ঘরে এলেন।
—তোমরা কি সেই পুরোনো নথির কথা বলছ?
নীরা বলল,
—হ্যাঁ মা। তুমি কি কিছু মনে করতে পারছ?
মা বললেন,
—তোমার দাদা একবার একটা ছোট নীল ফাইল আমাকে রাখতে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, প্রয়োজন না হলে যেন না খুলি।
নীরা অবাক হয়ে বলল,
—সেটা কোথায়?
—পুরোনো কাঠের বাক্সে থাকার কথা।
২. নীল ফাইল
কিছুক্ষণ খোঁজাখুঁজির পর ঘরের এক কোণে রাখা কাঠের বাক্সটি বের করা হলো।
বাক্সের ভেতরে পুরোনো ছবি, কয়েকটি চিঠি এবং কাপড়ে মোড়ানো একটি নীল ফাইল পাওয়া গেল।
নীরা ফাইলটি হাতে নিল।
মলাটের এক পাশে ছোট করে লেখা—
R-21 — Selected Copy
আরিয়ানের চোখ আটকে গেল লেখাটির ওপর।
—এটাই কি সেই রেজিস্টারের পৃষ্ঠা?
নীরা সাবধানে ফাইলটি খুলল।
ভেতরে একটি মাত্র কাগজ।
কাগজটির ওপর কয়েকটি তারিখ, নথির নম্বর এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের নাম লেখা।
প্রথম অংশে ছিল—
নথি গ্রহণ: জহির উদ্দিন
প্রাথমিক যাচাই: মিজানুর রহমান
হিসাব পর্যবেক্ষণ: আতিকুর রহমান
এরপর নিচে একটি আলাদা ঘর।
সেখানে লেখা—
চূড়ান্ত সংরক্ষণ: T-03
নীরা বলল,
—এখানেও T-03!
আরিয়ান কাগজটি ভালো করে দেখল।
—কিন্তু এই পৃষ্ঠার নিচে আরও কিছু লেখা আছে।
৩. কেটে দেওয়া নাম
কাগজের নিচের অংশে একটি নাম লেখা ছিল, যার ওপর কালো কালি দিয়ে দাগ টানা।
নীরা কাগজটি আলোতে ধরে দেখার চেষ্টা করল।
নামটির কয়েকটি অক্ষর অস্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছিল।
“আব্দু...”
রাশেদ কাগজটি হাতে নিয়ে বললেন,
—এটা কি আবদুল করিম হতে পারে?
মাহমুদ, যিনি তখন তাঁদের সঙ্গে ছিলেন, বললেন,
—সম্ভব। কিন্তু আবদুল করিম তো হিসাব বিভাগের সাক্ষী ছিলেন। তাঁকে চূড়ান্ত সংরক্ষক হিসেবে কেন লেখা হবে?
ইমরান বলল,
—হয়তো তিনি সংরক্ষক ছিলেন না। নামটি অন্য কোনো দায়িত্বের ঘরে লেখা ছিল, যা কালি দিয়ে ঢেকে গেছে।
নীরা মাথা নাড়ল।
—আমাদের অনুমান নয়, মূল কাগজের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে হবে।
৪. মায়ের মনে পড়া কথা
নীরার মা এতক্ষণ চুপ করে ছিলেন।
হঠাৎ তিনি বললেন,
—একটা কথা মনে পড়েছে।
সবাই তাঁর দিকে তাকাল।
তিনি বললেন,
—তোমার দাদা একবার এই ফাইলটি রাখতে দিয়ে বলেছিলেন, “এটা যেন কখনো হারিয়ে না যায়। এটা কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ নয়, শুধু হিসাবের পথ দেখাবে।”
নীরা মায়ের হাত ধরল।
—তুমি কি জানো, দাদা কাকে ফাইলটি দিতে বলেছিলেন?
মা মাথা নাড়লেন।
—না। শুধু বলেছিলেন, প্রয়োজন হলে রাশেদকে দিতে।
রাশেদ অবাক হয়ে বললেন,
—আমাকে তো তুমি কখনো বলোনি!
মা শান্তভাবে উত্তর দিলেন,
—তখন তুমি অনেক চিন্তায় ছিলে। আর তোমার বাবা বলেছিলেন, সময় না হলে ফাইলটি খোলার দরকার নেই।
রাশেদ কিছুক্ষণ কাগজটির দিকে তাকিয়ে রইলেন।
—বাবা হয়তো বুঝেছিলেন, একদিন এই কাগজগুলোর প্রয়োজন হবে।
৫. জহিরের কাছে নতুন প্রশ্ন
আরিয়ান R-21-এর পৃষ্ঠাটির ছবি তুলে জহির উদ্দিনকে পাঠাল।
কিছুক্ষণ পর জহির ফোন করলেন।
—এই পৃষ্ঠাটি তোমরা কোথায় পেলে?
নীরা বলল,
—দাদার পুরোনো বাক্সে। আপনি কি এটাকে চিনতে পেরেছেন?
জহির বললেন,
—হ্যাঁ। এটি R-21 রেজিস্টারের একটি নির্বাচিত অনুলিপি। কিন্তু মূল রেজিস্টারে আরও কয়েকটি পৃষ্ঠা ছিল।
আরিয়ান জিজ্ঞেস করল,
—সেগুলো কোথায়?
—আমি জানি না। তবে এই পৃষ্ঠার একটি বিষয় ভুলভাবে বোঝা হচ্ছে।
নীরা বলল,
—কোন বিষয়?
জহির উত্তর দিলেন,
—T-03 মানেই কোনো একজন ব্যক্তির নাম নয়। এটি ছিল একটি দায়িত্বের কোড। সেই দায়িত্বের অধীনে থাকা ব্যক্তির পরিচয় আলাদা নথিতে সংরক্ষিত ছিল।
ইমরান বলল,
—তাহলে কেটে দেওয়া নামটি কী?
জহির কিছুক্ষণ নীরব থেকে বললেন,
—আমার মনে হয়, সেটি চূড়ান্ত সংরক্ষকের নাম নয়। সেটি ছিল নথি গ্রহণের সময় উপস্থিত অতিরিক্ত সাক্ষীর নাম।
৬. কাগজের পেছনের তারিখ
ফোন রাখার পর নীরা কাগজটি আবার পরীক্ষা করল।
এবার সে কাগজের পেছনে একটি তারিখ দেখতে পেল।
তারিখটি ছিল—
১৮ সেপ্টেম্বর, ২০০৮।
আর তার নিচে লেখা—
“মূল নথি পুনরায় যাচাইয়ের জন্য ফেরত পাঠানো হলো।”
আরিয়ান বলল,
—তার মানে নীল খামের কাগজটি একবার ফেরত গিয়েছিল।
মাহমুদ বললেন,
—হ্যাঁ। কিন্তু কার কাছে ফেরত গিয়েছিল, সেটা এখনো জানা নেই।
নীরা বলল,
—জহির সাহেবের কাছে জানতে হবে, তিনি কি ওই তারিখে কোনো নথি গ্রহণ করেছিলেন।
ঠিক তখনই রাফি ফোনে একটি বার্তা পেল।
সে আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে বলল,
—স্যার, জহির সাহেব একটা পুরোনো ইমেইল খুঁজে পেয়েছেন। সেখানে ১৮ সেপ্টেম্বরের নথি ফেরতের উল্লেখ আছে।
আরিয়ান বলল,
—ইমেইলটা পাঠাতে বলো।
কিছুক্ষণ পর ইমেইলটি এসে পৌঁছাল।
তার ভেতরে একটি সংক্ষিপ্ত বার্তা—
“R-21-এর মূল পৃষ্ঠা ফেরত পাঠানো হলো। সংযুক্ত নথির দ্বিতীয় সাক্ষীর স্বাক্ষর এখনো পাওয়া যায়নি। নতুন নির্দেশ না পাওয়া পর্যন্ত নথিটি চূড়ান্ত করা যাবে না।”
নিচে প্রেরকের নাম—
সামিরা বেগম।
৭. খালার কাছে শেষ প্রশ্ন
নীরা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর সামিরাকে ফোন করল।
—খালা, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০০৮ তারিখে আপনি কি R-21-এর একটি পৃষ্ঠা ফেরত পাঠিয়েছিলেন?
সামিরা অবাক হয়ে বললেন,
—তুমি সেই ইমেইলও খুঁজে পেয়েছ?
—হ্যাঁ। কিন্তু একটা কথা বুঝতে পারছি না। আপনি কেন কাগজটি ফেরত পাঠিয়েছিলেন?
সামিরা ধীরে উত্তর দিলেন,
—কারণ দ্বিতীয় সাক্ষীর স্বাক্ষর ছিল না। আমি অসম্পূর্ণ নথি নিজের কাছে রাখতে চাইনি।
নীরা জিজ্ঞেস করল,
—আপনি কি জানতেন, সেই দ্বিতীয় সাক্ষী কে?
সামিরা বললেন,
—নামটি জানতাম। কিন্তু তাঁকে কখনো সামনে থেকে দেখিনি।
নীরা দ্রুত বলল,
—নামটা কী?
সামিরা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,
—দ্বিতীয় সাক্ষীর নাম ছিল আবদুল করিম।
নীরা স্তব্ধ হয়ে গেল।
আবদুল করিম!
যিনি বহু বছর ধরে তাঁদের বিভিন্ন নথির সত্যতা যাচাই করতে সাহায্য করেছেন, তিনিই কি সেই দ্বিতীয় সাক্ষী?
কিন্তু তিনি এত দিন এই বিষয়টি বলেননি কেন?
নীরা ফোন রেখে আরিয়ানের দিকে তাকাল।
আরিয়ান ধীরে বলল,
—কাল আবদুল করিম সাহেবের সঙ্গে দেখা করতে হবে।
নীরা R-21-এর কাগজটি আবার হাতে নিল।
এবার রহস্যের সূত্র এসে পৌঁছেছে এমন একজনের কাছে, যিনি শুরু থেকেই তাঁদের পাশে ছিলেন।
কিন্তু তাঁর নীরবতার কারণ কী?
চলবে…