ফন্ট সাইজ:
থিম:
শেষ নিঃশ্বাসেও তুমি

পর্ব 71

লেখক: Mafiya Queen

শেষ নিঃশ্বাসেও তুমি

লেখক: Mafiya Queen 👑

৭১তম পর্ব: মোস্তাফিজুরের শেষ চিঠি

রাফির কথা শোনার পর নীরা আরিয়ানকে বলল,

—মোস্তাফিজুর রহমান হঠাৎ অফিসে আসা বন্ধ করলেন কেন?

আরিয়ান উত্তর দিল,

—সেটা জানতেই আমাদের তাঁর খোঁজ করতে হবে।

নীরা বলল,

—কিন্তু তিনি যদি এত বছর আগেই দায়িত্ব ছেড়ে দিয়ে থাকেন, তাহলে তাঁর কাছে এখনো কোনো নথি থাকার সম্ভাবনা আছে?

—সম্ভাবনা আছে। আর না থাকলেও তিনি হয়তো এমন কিছু জানেন, যা কোনো রেজিস্টারে লেখা নেই।

১. পুরোনো ঠিকানা

রাফি মোস্তাফিজুর রহমানের পুরোনো ঠিকানা সংগ্রহ করেছিল। তবে সেখানে গিয়ে জানা গেল, তিনি কয়েক বছর আগে বাসা পরিবর্তন করেছেন।

অনেক খোঁজাখুঁজির পর তাঁর ছেলের সঙ্গে যোগাযোগ হলো।

ছেলে জানালেন, তাঁর বাবা এখন ঢাকার বাইরে থাকেন। বয়সের কারণে খুব বেশি মানুষের সঙ্গে দেখা করেন না।

আরিয়ান নিজের পরিচয় দিয়ে পুরোনো ট্রাস্টের বিষয়টি জানাল।

ওপাশ থেকে কিছুক্ষণ নীরবতা।

তারপর মোস্তাফিজুরের ছেলে বললেন,

—বাবা ওই পুরোনো কাগজপত্রের কথা এখনো মনে রেখেছেন। আপনাদের সঙ্গে দেখা করতে রাজি হয়েছেন।

নীরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।

২. নিরীক্ষকের বক্তব্য

পরদিন তাঁরা মোস্তাফিজুর রহমানের সঙ্গে দেখা করতে গেলেন।

তিনি তাঁদের বসতে দিয়ে বললেন,

—আপনারা নিশ্চয়ই C-14-এর ব্যাপারে এসেছেন?

আরিয়ান অবাক হয়ে বলল,

—আপনি জানেন?

মোস্তাফিজুর মৃদু হাসলেন।

—কিছু ঘটনা মানুষ ভুলে যেতে চাইলেও ভুলতে পারে না।

নীরা বলল,

—আপনার নাম ২০০৮ সালের দায়িত্ব যাচাইয়ের তালিকায় পাওয়া গেছে। সেখানে M.R. লেখা আছে।

মোস্তাফিজুর মাথা নাড়লেন।

—হ্যাঁ, সেটা আমার নাম। তখন আমি বাইরের নিরীক্ষক হিসেবে কাজ করতাম। আমার দায়িত্ব ছিল নথির হিসাব ও গ্রহণের প্রক্রিয়া যাচাই করা।

আরিয়ান জিজ্ঞেস করল,

—আপনি কি মাহমুদ রহমানের স্বাক্ষর নিয়ে কোনো সমস্যা পেয়েছিলেন?

—পেয়েছিলাম। তবে সমস্যাটা শুধু স্বাক্ষরের ছিল না। নথির দায়িত্ব পরিবর্তনের অনুমোদনও অসম্পূর্ণ ছিল।

৩. কেন তিনি চলে গিয়েছিলেন?

নীরা প্রশ্ন করল,

—তাহলে আপনি হঠাৎ কাজ বন্ধ করলেন কেন?

মোস্তাফিজুর কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।

—আমি একটি লিখিত আপত্তি জমা দিয়েছিলাম। সেখানে বলেছিলাম, অনুমোদন ছাড়া কোনো ব্যক্তির নামে দায়িত্ব পরিবর্তন দেখানো যাবে না। কয়েক দিন পর আমাকে জানানো হয়, আমার নিরীক্ষার কাজ আর প্রয়োজন নেই।

আরিয়ান বলল,

—আপনাকে কি কেউ সরাসরি বাধা দিয়েছিল?

—কেউ সরাসরি হুমকি দেয়নি। তবে আমাকে বলা হয়েছিল, পুরোনো নথি নিয়ে বেশি প্রশ্ন না করাই ভালো।

নীরা ধীরে বলল,

—আপনি কি তখনই বুঝেছিলেন, কোনো অনিয়ম হচ্ছে?

—সন্দেহ হয়েছিল। কিন্তু সন্দেহ আর প্রমাণ এক জিনিস নয়।

৪. সেই আপত্তিপত্র

মোস্তাফিজুর পাশের ঘর থেকে একটি ফাইল নিয়ে এলেন।

—আমি জানতাম, একদিন হয়তো এই কাগজগুলোর প্রয়োজন হবে।

ফাইল থেকে তিনি একটি চিঠি বের করলেন।

চিঠির তারিখ ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০০৮।

সেখানে লেখা—

“C-14 নথির দ্বিতীয় সাক্ষীর পরিচয় যাচাই অসম্পূর্ণ। T-03 দায়িত্ব হস্তান্তরের ক্ষেত্রেও প্রয়োজনীয় অনুমোদন পাওয়া যায়নি। অতএব, সংশ্লিষ্ট নথি চূড়ান্ত বলে গণ্য করা যাবে না।”

নীরা বলল,

—আপনি কি এই চিঠি ট্রাস্ট বোর্ডে জমা দিয়েছিলেন?

—হ্যাঁ। একটি কপি বোর্ডে, আরেকটি নিজের কাছে রেখেছিলাম।

আরিয়ান চিঠির নিচের অংশ দেখল।

সেখানে গ্রহণকারীর স্বাক্ষর ছিল।

কিন্তু নামের জায়গায় শুধু লেখা—

“Received by: S.R.”

নীরা বলল,

—আবার S.R.!

মোস্তাফিজুর মাথা নাড়লেন।

—আমি চিঠিটি সালেহ রহমানের দপ্তরে জমা দিয়েছিলাম। তবে তিনি নিজে গ্রহণ করেছিলেন কি না, তা বলতে পারব না।

৫. একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য

আরিয়ান বলল,

—আপনি কি জানতেন, ১৮ সেপ্টেম্বরের প্যাকেটটি জহির উদ্দিনের কাছে পাঠানো হয়েছিল?

—পরে জেনেছিলাম। কিন্তু তখন আমার আপত্তিপত্র জমা দেওয়া হয়ে গেছে।

নীরা জিজ্ঞেস করল,

—আপনার আপত্তির পরও প্যাকেট পাঠানো হলো কেন?

মোস্তাফিজুর বললেন,

—এটাই আমারও প্রশ্ন ছিল। আমার আপত্তিতে স্পষ্ট লেখা ছিল, পরিচয় যাচাই শেষ না হওয়া পর্যন্ত দ্বিতীয় কপি নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না।

আরিয়ান কাগজটি আবার পড়ল।

—তাহলে প্যাকেট পাঠানো আর নথি অনুমোদন—দুটি আলাদা ঘটনা।

—ঠিক বলেছেন। প্যাকেট পাঠানো মানেই নথি বৈধ হয়ে যায় না।

নীরা বলল,

—তাহলে এত বছর ধরে সবাই কেন এই দুই বিষয়কে একসঙ্গে ধরে রেখেছে?

মোস্তাফিজুর উত্তর দিলেন,

—কারণ কেউ হয়তো পুরো রেকর্ড একসঙ্গে দেখেনি। অথবা দেখেও পার্থক্যটা গুরুত্ব দেয়নি।

৬. শেষ চিঠির কথা

বিদায়ের আগে মোস্তাফিজুর বললেন,

—আপনাদের আরেকটি কথা জানানো প্রয়োজন।

নীরা ফিরে তাকাল।

—কী কথা?

—আমি কাজ ছেড়ে দেওয়ার কয়েক সপ্তাহ আগে একটি চিঠি পেয়েছিলাম। সেখানে লেখা ছিল, আমার কাছে থাকা নিরীক্ষার কপি যেন নষ্ট না করি।

আরিয়ান অবাক হলো।

—কে পাঠিয়েছিল?

—প্রেরকের নাম ছিল না। তবে খামের ওপর একটি কোড লেখা ছিল—M.A. Locker 06.

নীরা ও আরিয়ান একে অপরের দিকে তাকাল।

মাহবুব আলমের Locker 06!

নীরা বলল,

—আপনি কি চিঠিটি রেখেছেন?

মোস্তাফিজুর উত্তর দিলেন,

—চিঠিটি আছে। তবে এত দিন আমি বুঝতে পারিনি, M.A. বলতে কাকে বোঝানো হয়েছে।

তিনি একটি ছোট খাম এগিয়ে দিলেন।

নীরা খামটি হাতে নিয়ে দেখল, ভেতরে মাত্র একটি লাইন লেখা—

“যদি মূল নথি হারিয়ে যায়, তবে তারিখগুলো মিলিয়ে দেখবেন। সত্য কখনো শুধু একটি কাগজে থাকে না।”

নীরা ধীরে বলল,

—মাহবুব সাহেব আমাদের শুধু কাগজ রেখে যাননি। তিনি যেন পুরো ঘটনার একটা পথও দেখিয়ে গেছেন।

আরিয়ান উত্তর দিল,

—হয়তো তিনি জানতেন, একদিন কেউ এই হিসাব মিলিয়ে দেখবে।

৭. তারিখের অমিল

গাড়িতে ফেরার পর রাফি তাঁদের পাঠানো কাগজগুলো একসঙ্গে সাজাল।

সে বলল,

—স্যার, একটা অদ্ভুত বিষয় পেয়েছি।

আরিয়ান জিজ্ঞেস করল,

—কী?

—C-14-এর দ্বিতীয় কপি পাঠানো হয়েছে ১৮ সেপ্টেম্বর। কিন্তু মোস্তাফিজুর সাহেবের আপত্তিপত্র জমা হয়েছে ১৯ সেপ্টেম্বর। অর্থাৎ আপত্তিপত্রের আগেই প্যাকেট পাঠানো হয়েছিল।

নীরা বলল,

—তাহলে ১৭ সেপ্টেম্বরের নির্দেশে পরিচয় যাচাইয়ের কথা থাকলেও ১৮ সেপ্টেম্বর প্যাকেট পাঠানো হলো।

রাফি বলল,

—হ্যাঁ। আর ১৯ সেপ্টেম্বর আপত্তি জমা পড়ার পরও রেজিস্টারে কোনো স্থগিতাদেশের চূড়ান্ত নোট পাওয়া যায়নি।

আরিয়ান গম্ভীর হয়ে গেল।

—আমাদের জানতে হবে, আপত্তিপত্র পাওয়ার পর বোর্ড কী সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।

ঠিক তখনই নীরার ফোনে নাসিমা বেগমের কল এল।

তিনি উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বললেন,

—নীরা, তোমাদের একটা কথা বলা দরকার। পুরোনো নথির মধ্যে আমি আরেকটি কাগজ পেয়েছি। আগে কখনো খেয়াল করিনি।

—কী কাগজ, খালা?

নাসিমা ধীরে বললেন,

—ওটা ১৯ সেপ্টেম্বরের বোর্ড মিটিংয়ের কার্যবিবরণী। সেখানে C-14 নিয়ে একটি সিদ্ধান্ত লেখা আছে।

নীরা দ্রুত জানতে চাইল,

—কী সিদ্ধান্ত?

নাসিমা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,

—সিদ্ধান্তে লেখা আছে, C-14 ফাইলের দায়িত্ব আপাতত একজনের কাছেই থাকবে। কিন্তু সেই ব্যক্তির নামের জায়গাটা কেটে দেওয়া হয়েছে।

নীরার বুক ধক করে উঠল।

আরিয়ান ফোনের স্পিকার চালু করে বলল,

—খালা, কাগজটা ভালো করে দেখবেন। নামের কোনো অংশ বোঝা যায় কি না, আমাদের জানাবেন।

নাসিমা বললেন,

—একটা অক্ষর বোঝা যাচ্ছে।

—কোন অক্ষর?

নাসিমার কণ্ঠ আরও নিচু হলো।

—নামের প্রথম অক্ষর “জে”।

নীরা স্থির হয়ে বসে রইল।

জে দিয়ে নাম শুরু—জহির? জয়ন্ত? নাকি অন্য কেউ?

এবার প্রশ্ন শুধু কে প্যাকেট পাঠিয়েছিল, তা নয়।

প্রশ্ন হলো, ১৯ সেপ্টেম্বরের পর C-14-এর দায়িত্ব কার হাতে ছিল?

চলবে…

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 71 শেষ করেছেন।

আগের পর্ব উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন