_হঠাৎ_ঝড়ের_আগমন
#_মাইরা_অহনা_মিম
সূচনা পর্ব—০১
(অনুমতি ব্যতীত এই উপন্যাসের কোনো অংশ কপি করা নিষেধ। উপন্যাসের সকল চরিত্র ও ঘটনা সম্পূর্ণ কাল্পনিক।)
"এই অর্পিতা! স্কুলে যেতে দেরি হচ্ছে তো!"
বলতে বলতে অর্পিতার ঘরে প্রবেশ করলেন রুখসানা বেগম।
"হুম, আমি রেডি। আয়ান ভাইয়া কি চলে গেছে?"
"না, তোর জন্য অপেক্ষা করছে। তুই তাড়াতাড়ি আয়।"
কথাটা বলেই রুখসানা বেগম ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।কিছুক্ষণ পর অর্পিতা আর আয়ান এসে খাবার টেবিলে বসল।
"আম্মু, তাড়াতাড়ি খাবার দাও।"
"এই তো দিচ্ছি। একটু সবুর কর।"
নাশতা শেষ করে দুজন রুখসানা বেগমের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। যাওয়ার আগে অর্পিতা আবার পেছন ফিরে ডাকল—
"মামণি!"
রুখসানা বেগম ফিরে তাকালেন।
"হুম, বল। কিছু লাগবে?"
"না, আসলে আজ মাহার বাসায় যাব। তাই ফিরতে একটু দেরি হবে।"
"ঠিক আছে। তবে তাড়াতাড়ি ফেরার চেষ্টা করিস।"
"ওকে, মামণি!"
কথাটা বলেই অর্পিতা অন্য দিকে হাঁটতে থাকে।
পিছন থেকে সামনে এসে আয়ান বলল—
"অর্পি, তুই তাহলে যা। আমিও গেলাম।"
"ঠিক আছে। আর আজ--।"
"শুনেছি। এবার তুই যা।"
"আচ্ছা!"
আয়ান চলে যেতেই অর্পিতা স্কুলের গেট পেরিয়ে ভেতরে ঢুকল। কিন্তু কয়েক পা এগোতেই কারও সঙ্গে সজোরে ধাক্কা লেগে সে মাটিতে পড়ে গেল।
ছেলেটি বিরক্তিতে 'চ্' শব্দ করে একবার তার দিকে তাকাল। তারপর এমন ভাব করল, যেন কিছুই হয়নি। অর্পিতাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই চলে যেতে উদ্যত হলো।
এবার অর্পিতার মাথায় যেন আগুন জ্বলে উঠল।
"এই যে, শুনছেন! চোখ কি হাতে নিয়ে ঘুরেন নাকি? আর একটা সরি তো বলা যায়! যত্তসব অসভ্য লোক!"
ছেলেটি থমকে দাঁড়াল। তারপর পেছন ফিরে অর্পিতার দিকে তাকাল। কয়েক মুহূর্ত তার দিকে তাকিয়ে থেকে ঠোঁট কামড়ে মুচকি হাসল। তবে সেই হাসি সবার আড়ালেই রয়ে গেল।
"তোমার চোখ কোথায় থাকে?"
কথাটা বলেই আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে চলে গেল সে।অর্পিতা রাগে গজগজ করতে করতে উঠে দাঁড়াল। তারপর নিজেই নিজেকে বকতে বকতে ক্লাসরুমের দিকে এগিয়ে গেল।ক্লাসরুমের সামনে পৌঁছাতেই তার মেজাজ আবার বিগড়ে গেল।
মনে মনে—
"এই অসভ্য লোকটা এখানে কেন? কোন বানরের গার্জিয়ান কে জানে!"
ঠিক তখনই একটা মেয়ে এসে তাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরল। মেয়েটিকে অর্পিতা খুব ভালো করেই চেনে। সে আর কেউ নয়, তার প্রাণের বান্ধবী মাহা।
"কিরে অর্পি, এত দেরি করলি কেন?"
"আরে, আর বলিস না!"
কথাটা বলেই অর্পিতা ক্লাসরুমের ভেতরে তাকিয়ে বলল—
"জানিস তো, আমাদের সমাজে অন্ধ মানুষের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। তাই আরকি, আজ একটু দেরি হয়ে গেল!"
অর্পিতার কথা শুনে মাহা কিছুই বুঝতে পারল না। সে আরও কিছু জিজ্ঞেস করতে যাবে, ঠিক তখনই তাদের সামনে এসে দাঁড়াল সেই ছেলেটি।
"আমি মনে করি, সেই অন্ধত্বের প্রথম পুরস্কারটা তুমিই পাবে।"
"শালা! আমাকে ফেলে দিয়ে এখন আবার আমাকেই অপমান করা হচ্ছে! তোকে আমি দেখে নেব!"
"কখন দেখবেন, মিস? বলুন, আমি সময়মতো এসে যাব।"
অর্পিতা কিছু বলতে যাবে, তার আগেই মাহা দুজনকে থামিয়ে দিল।
"আরে, তোমরা কী শুরু করেছ? এবার থামো তো! হচ্ছেটা কী?"
"তুই তোর বেস্ট ফ্রেন্ডকে জিজ্ঞেস কর কী হয়েছে। তার আগে বাসায় চল।"
অর্পিতা মনে মনে ভাবল—
"কিরে ভাই! এই সাদা কুমিরটা আবার মাহার কী হয়? নইলে ওকে বাসায় যেতে বলছে কেন?"
হঠাৎ ছেলেটির মাহার হাত ধরে থাকা চোখে পড়তেই অর্পিতা রেগে উঠল।
"এই যে, আপনি ওর হাত ধরেছেন কেন? হাত ছাড়ুন বলছি!"
মাহা এবার হেসে বলল—
"আরে অর্পি, উনি আমার ভাই! মাহির ভাইয়া আমাদের নিতে এসেছেন।"
"কিহ!"
"কী হয়েছে? চিৎকার করছিস কেন?"
অর্পিতা কিছু বলার আগেই মাহিরের ফোন বেজে উঠল।
"এই, তুই কখন গেছিস? আসার কোনো নামই নেই! ওদের নিয়ে তাড়াতাড়ি আয়।"
"আসছি, আপু। তুই ফোন রাখ।"
"ওকে, তাড়াতাড়ি আয়।"
কল কেটে মাহির মাহা আর অর্পিতাকে তাড়াতাড়ি গাড়ির কাছে আসতে বলে নিজে এগিয়ে গেল।তারা গেটের কাছে পৌঁছাতেই সেখানে এসে হাজির হলো আকাশ।
"কিরে, মাহির ভাই! ক্লাস করবি না?"
"না। তোরা চলে যাচ্ছিস, তাই আমরাও চলে যাব।"
"তাহলে আমরাও তোমাদের বাসায় চলি।"
এরপর মাহিরের দিকে তাকিয়ে আকাশ হাসিমুখে বলল—
"আরে, মাহির ভাই! কেমন আছো? কত দিন পর দেখলাম তোমাকে! উম, তুমি কিন্তু অনেক সুন্দর হয়েছ!"
"আচ্ছা, এবার যাওয়া যাক।"
"ওকে!"
সবাই গাড়িতে উঠে বসল। গাড়ির ভেতর গল্প আর হাসি-ঠাট্টায় মেতে উঠল সবাই। শুধু অর্পিতাই চুপচাপ বসে রইল।কিছুক্ষণ পর আকাশ তার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল—
"এই অর্পি, কী হয়েছে তোর? মন খারাপ?"
"না, এমনি।"
"তাহলে আজ এত চুপ কেন?"
"আরে, বললাম তো এমনি!"
এরপর আবার সবাই নিজেদের গল্পে মেতে উঠল। কথার ফাঁকে কখন যে গাড়ি গন্তব্যে পৌঁছে গেল, কেউ খেয়ালই করল না।
এক এক করে সবাই গাড়ি থেকে নামল। অর্পিতা নামতেই ছোট্ট একটা ছেলে দৌড়ে এসে তাকে জড়িয়ে ধরল।
অর্পিতাও হাসিমুখে ছেলেটিকে বুকে জড়িয়ে নিল। ঠিক তখনই মোহনা এসে দুজনকে একসঙ্গে জড়িয়ে ধরল।
"কেমন আছো, আপু?"
"ভালো আছি। তুই কেমন আছিস?"
"ভালো আছি, আপু।"
এদিকে গাড়ি পার্কিং করে মাহির এসে দাঁড়াতেই ছোট্ট ছেলেটা আনন্দে চিৎকার করে উঠল—
"মামাআআ!"
মাহিরের মুখে হাসি ফুটে উঠল।
"এই যে, এসো পাপ্পা!"
বলে সে ছেলেটিকে কোলে তুলে নিল। তারপর অর্পিতার দিকে তাকিয়ে দুষ্টুমি করে বলল—
"শাঁকচুন্নিদের সঙ্গে থাকতে নেই, বুঝেছ?"
মাহিরের কথা শুনে অর্পিতা রাগে ফেটে পড়ার উপক্রম হলো। কিন্তু কিছু বলল না। মনে মনে শুধু তাকে এক হাত দেখে নেওয়ার প্রতিজ্ঞা করল।
ঠিক তখনই সেখানে এসে উপস্থিত হলেন মাহার আম্মু, আয়েশা বেগম।
"তোরা কি এখানেই দিন কাটাবি, নাকি ভেতরেও আসবি?"
অর্পিতা এগিয়ে গিয়ে হাসিমুখে বলল—
"কেমন আছো, মামণি?"
"আলহামদুলিল্লাহ, ভালো আছি। তুই কেমন আছিস, মা?"
"আলহামদুলিল্লাহ, আমিও ভালো আছি।"
"তুই তো আমাদের ভুলেই গেছিস!"
"কী বলো, মামণি! তোমাদের ভুলে যাওয়া যায় নাকি?"
অর্পিতার নিজের মা নেই। তাই সে নিজের ছোট আম্মু আর মাহার আম্মু—দুজনকেই মামণি বলে ডাকে।
সবাই হাসিমুখে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করল।
সেদিন মাহার বাবাও বাড়িতে ছিলেন। অর্পিতা ভেতরে ঢুকেই তাঁকে সালাম দিল।
"কেমন আছো, চাচ্চু?"
মোহন শিকদার সালামের উত্তর দিয়ে হেসে বললেন—
"এই তো ভালো, মামণি। তুমি কেমন আছো?"
"ভালো আছি।"
কিছুক্ষণ পর আয়েশা বেগম বললেন—
"মাহা, অর্পিতা, তোরা ফ্রেশ হয়ে আয়। তাড়াতাড়ি আসবি, কেমন?"
"ওকে!"
দুজন নিজেদের ঘরের দিকে চলে গেল।
রাতের আড্ডা
রাতের খাবার শেষে মাহির, আবির আর রাজ বসার ঘরের সোফায় বসে গল্প করছিল। এমন সময় মাহা সেখানে এসে হাজির হলো।
"চলো ভাইয়া, সবাই ছাদে যাই!"
মাহির প্রথমে যেতে রাজি হলো না।
"তোরা যা। আমার যেতে ইচ্ছে করছে না।"
"আরে ইয়ার, চল না! ছোট মানুষ বলেছে, না গেলে মন খারাপ করবে।"
আবিরের কথা শুনে অর্পিতা ভ্রু কুঁচকে বলল—
"ছোট মানুষ কে, ভাইকয়া? আমরা এবার এসএসসি পরীক্ষা দেব। সো, আমরা আর ছোট নেই!"
আবির কিছু একটা বলতে গিয়েও থেমে গেল। অন্যদিকে মোহনা হেসে বলল—
"আরে, আয় তো! এত কথা বলতে হবে না।"
অবশেষে সবাই ছাদে চলে গেল।
ছাদের খোলা পরিবেশে শুরু হলো জমজমাট আড্ডা। কেউ গল্প করছে, কেউ হাসাহাসি করছে, আবার কেউ অন্যদের কথায় তাল মেলাচ্ছে।
কিন্তু সবার অগোচরে মাহিরের দৃষ্টি বারবার আটকে যাচ্ছিল একটি নির্দিষ্ট মুখে।
অর্পিতা!
মেয়েটি তখন সবার সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই কথা বলছিল। অথচ মাহিরের চোখে সে যেন অন্য রকম।
কেন এমন হচ্ছে, তা মাহির নিজেও জানে না।
শুধু এটুকু জানে, মেয়েটিকে দেখলে তার দৃষ্টি সহজে ফেরানো যায় না।
পরদিন সকাল
ভোর পাঁচটা।
অর্পিতার ঘুম ভেঙে গেল। বিছানা থেকে উঠে সে পাশে শুয়ে থাকা মাহাকে ডাকতে শুরু করল।
"মাহা! এই মাহা, ওঠ। সকাল হয়ে গেছে। নামাজ পড়বি না?"
"উমম... একটু পরে উঠব।"
"এখন ওঠ, তাড়াতাড়ি কর!"
মাহা আর কোনো বিরোধিতা না করে উঠে বসল। আগের রাতে দেরি করে ঘুমানোর কারণে এখনো তার চোখে ঘুম লেগে আছে।
অর্পিতা আবার তাড়া দিতেই সে বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ল।
দুজন অজু করে নামাজে দাঁড়াল।
নামাজ শেষে তারা ছাদে চলে গেল একটু হাঁটাহাঁটি করার জন্য।
ছাদের দরজা ঠেলে বাইরে পা রাখতেই একঝলক শীতল বাতাস এসে তাদের মুখ ছুঁয়ে গেল।
অর্পিতা চোখ বন্ধ করে বুকভরে শ্বাস নিল। ভোরের নির্মল বাতাস যেন তার মনটাকেও সতেজ করে দিল।
কিছুক্ষণ পর দুজন ছাদের এক পাশে গিয়ে দাঁড়াল।
সেখানে আগে থেকেই উপস্থিত ছিল মাহির, আবির, রাজ আর আকাশ। তারা নিজেদের মতো দাঁড়িয়ে গল্প করছিল।
মাহির একবার অর্পিতার দিকে তাকাল। বেগুনি রঙের সালোয়ার-কামিজ পরা মেয়েটিকে ভোরের আলোয় অদ্ভুত স্নিগ্ধ লাগছিল।
মাহিরের দৃষ্টি আরেকবার তার দিকে আটকে গেল।
সে মনে মনে ভাবল—
"কতটা স্নিগ্ধ লাগছে মেয়েটাকে!"
মাহিরের এমন দৃষ্টি রাজের চোখ এড়াল না।
সে মুচকি হেসে বলল—
"বলে দিলেই হয়, মাহির।"
"কী বলে দেব?"
"আরে, বুঝিস না এমন ভাব করিস কেন? মেয়েটাকে ভালো লাগলে বলে দে।"
"আমাদের দেখা হয়েছে মাত্র দুবার।"
"দেখা-পরিচয় দুদিনের হলেই বা কী? তুই ওকে—"
রাজের কথা শেষ হওয়ার আগেই মাহির থামিয়ে দিল।
"আরে, এসব বাদ দে তো! সময় হলে বলে দেব।"
"হ্যাঁ, সময় হলে! দেখি, সেই সময় কবে আসে।"
"আচ্ছা, বাদ দে না রাজ।"
"আচ্ছা, দিলাম।"
ঠিক তখনই আয়েশা বেগম ছাদে এসে উপস্থিত হলেন।
"মাহা! অর্পি! তোরা এখানে কী করছিস? তোদের খুঁজতে খুঁজতে আমি হয়রান!"
"জি, আম্মু। বলো, কিছু বলবে?"
"নাশতা করতে আয়। আর অর্পির বাড়ি থেকে ফোন এসেছিল। আমি বলেছি, ওকে স্কুলে পাঠিয়ে দেব। তোরা তাড়াতাড়ি নিচে আয়।"
কথাটা বলেই তিনি নিচে চলে গেলেন।
মাহা আর অর্পিতাও তাঁর পেছন পেছন নিচে নামল।
আর মাহির?
সে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল অর্পিতার চলে যাওয়ার পথে।
তার দৃষ্টি যেন মেয়েটির সঙ্গেই হারিয়ে গেল।
সকালের নাশতা
ডাইনিং টেবিলে সবার জন্য খাবার সাজিয়ে রাখছিলেন আয়েশা বেগম। এমন সময় ওপর থেকে তৈরি হয়ে নিচে নেমে এলেন মোহন শিকদার।
তিনি চেয়ারে বসতে বসতে বললেন—
"আয়েশা, খাবার দাও। আজ অফিসে একটু কাজ আছে। তাড়াতাড়ি যেতে হবে।"
"গুড মর্নিং, বাবা!"
"গুড মর্নিং, আম্মাজানেরা!"
এরপর অর্পিতার দিকে তাকিয়ে বললেন—
"অর্পি মামণি, তুমি কি আজ স্কুল থেকে এখানে আসবে?"
"না, চাচ্চু। আজ বাড়ি চলে যাব।"
"ঠিক আছে। তবে আবার এই বাড়িতে আসবে। একবার গেলে তো আমাদের ভুলেই যাও!"
"না, চাচ্চু। ভুলে যাব না। আমি আবার আসব।"
"মনে থাকে যেন!"
কথাটা বলে তিনি উঠে দাঁড়ালেন।
"আচ্ছা, আমি অফিসে যাচ্ছি।"
"সাবধানে যেও!"
"ওকে!"
বাড়ি থেকে বের হওয়ার আগে তিনি মোহনার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন—
"আমার দাদুভাই এখনো ঘুম থেকে ওঠেনি?"
"না, বাবা। একটু পর উঠিয়ে দেব।"
"ঠিক আছে।"
মোহন শিকদার চলে যেতেই মোহনা নিজের ঘরের দিকে এগিয়ে গেল।
ঘরে ঢুকে বিছানায় ঘুমিয়ে থাকা ছোট্ট ছেলেটির পাশে বসে মৃদু স্বরে ডাকল—
"রায়ান, বাবা! ওঠো এবার।"
মায়ের ডাকে রায়ান পিটপিট করে চোখ খুলল। সামনে মাকে দেখেই খিলখিল করে হেসে উঠল সে।
এটাই ছিল তার নিত্যদিনের অভ্যাস। ঘুম ভাঙার পর চোখ খুলে মাকে দেখবে, তারপর মিষ্টি করে হেসে উঠবে।
"ঘুম কেমন হয়েছে আমার বাবার?"
"ভালো হয়েছে! আচ্ছা, নূর খালামণি আর মাহা খালামণি কি চলে গেছে?"
"না, এখনো যায়নি। যাবে।"
ঠিক তখনই মোহনার ফোন বেজে উঠল।
ফোনের স্ক্রিনে ভেসে উঠল—রাফসান আহমেদ।
রাফসান আর মোহনার বিয়েটা ছিল ভালোবাসার বিয়ে।
মোহনা ফোন রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে রাফসানের কণ্ঠ ভেসে এল।
"মাহা আর অর্পিতা কি স্কুলে গেছে?"
"হুম, বের হয়েছে।"
"ওহ, আচ্ছা।"
কথাটা বলেই রাফসান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর যেন পুরোনো কোনো স্মৃতি মনের পর্দায় ভেসে উঠল।
ফ্ল্যাশব্যাকত
বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে দাঁড়িয়ে মাহিরের জন্য অপেক্ষা করছিল মোহনা।
ঠিক সেই সময় তিনটি বাইক দ্রুতগতিতে রাস্তা দিয়ে চলে গেল। বাইক গুলোর মধ্যে একটি ছিল রাফসানের।
হঠাৎ অসাবধানতাবশত মাহিরের সঙ্গে রাফসানের বাইকের ধাক্কা লাগল।
মাহিরের পায়ে খুব বেশি আঘাত না লাগলেও ব্যথা পেয়েছিল সে।
রাফসান সঙ্গে সঙ্গে বাইক থেকে নেমে এল। মাহিরের পায়ের দিকে তাকিয়ে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলল—
"সরি! আই অ্যাম রিয়েলি সরি। অ্যাকচুয়ালি, আমি খেয়াল করিনি।"
রাফসানের কথা শেষ হওয়ার আগেই মোহনা রেগে আগুন হয়ে উঠল।
"মানে কী? বাইক চালানোর সময় চোখ কি হাতে নিয়ে ঘুরেন নাকি? খেয়াল করেননি মানে? আমার ভাইকে মেরেই ফেলতেন!"
কথা বলতে বলতে মোহনা কান্নাকাটি শুরু করে দিল।
রাফসান আর কোনো কথা না বাড়িয়ে মাহিরকে নিয়ে হাসপাতালে চলে গেল।
মোহনার কান্না যেন থামতেই চাইছিল না।
একসময় মেয়েটির চোখের দিকে তাকাল রাফসান।
আর ঠিক সেই মুহূর্তেই অদ্ভুত এক অনুভূতি তাকে ঘিরে ধরল।
মনে হলো, চারপাশের সবকিছু যেন এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেছে।
নিজের অজান্তেই তার হাত চলে গেল বুকের বাঁ পাশে।
"আজব! মেয়েটার চোখে কি জাদু আছে নাকি?"
রাফসান কিছুক্ষণের জন্য অন্যমনস্ক হয়ে মোহনার দিকে তাকিয়ে রইল।
তার কাঁধে হালকা ধাক্কা লাগতেই সম্বিত ফিরে পেল সে।
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা তার বন্ধু ও কাজিন রায়হান মুচকি হেসে বলল—
"কিরে মামা, কোথায় হারিয়ে গেলি?"
"ক-কই? কোথাও না তো! এমনি।"
রায়হান চোখ ছোট করে তার দিকে তাকাল।
"কিরে, ডাল মে কুছ কালা হ্যায়!"
কথাটা বলেই সে শয়তানি হাসি দিল।
কিন্তু রাফসানের সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। তার দৃষ্টি তখনো বারবার মোহনার দিকে চলে যাচ্ছিল।
কিছুক্ষণ পর মাহির এসে মোহনাকে শান্ত করার চেষ্টা করল।
"আরে, কুল আপু! কুল! আমার কিছু হয়নি তো। দেখো, আমি একদম ঠিক আছি।"
মাহিরের হাত ধরে মোহনা উঠে দাঁড়াল। তারপর রাফসানের দিকে তাকিয়ে বলল—
"নেক্সট টাইম বাইক দেখে-শুনে চালাবেন। আমি দেখে কিছু বলিনি। অন্য কেউ হলে আপনাকে মার্ডার কেসের আসামি বানিয়ে দিত!"
কথাটা বলেই মোহনা মাহিরের হাত ধরে সামনে এগিয়ে গেল।
কিন্তু এক পা যেতেই মাহির ব্যথায় 'আহ্' বলে বসে পড়ল।
এবার মোহনার কান্না যেন আবার ফিরে আসার উপক্রম হলো।
"আল্লাহ! আমার সুস্থ ভাইটাকে শেষ পর্যন্ত কী বানিয়ে দিল!"
মাহিরকে এ অবস্থায় দেখে রাফসান আর রায়হান দুজন মিলে তাকে বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিল।
বাড়িতে পৌঁছাতেই ছেলের এই অবস্থা দেখে ছুটে এলেন আয়েশা বেগম।
"কী হয়েছে আমার ছেলের? তোরা ওকে ধরে রেখেছিস কেন? মোহনা মা, তোর ভাইয়ের কী হয়েছে?"
"মা, তুমি শান্ত হও, প্লিজ! ওর একটা অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে। তবে তেমন কিছু হয়নি।"
মোহনা মাকে নানা কথা বলে সান্ত্বনা দিতে লাগল।
রাফসান অবাক হয়ে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে রইল।
এই সেই মেয়ে, যে কিছুক্ষণ আগেও কান্নাকাটি করে একাকার করে ফেলছিল! অথচ এখন কী সুন্দর করে নিজের মাকে সামলাচ্ছে।
মেয়েটির প্রতিটি আচরণ যেন রাফসানের কৌতূহল আরও বাড়িয়ে দিচ্ছিল।এভাবেই মোহনা আর রাফসানের পরিচয়ের শুরু।
তিন দিন পর
তিন দিন পর মোহনা আবার ভার্সিটিতে এল।
এদিকে রাফসান আগের দিনই সেই বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে যোগ দিয়েছে।
মোহনা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছে শুনেই রাফসান সেখানে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হলো।তার বন্ধু রায়হান আর হৃদয়ও একই বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগ দিয়েছে। আজ ছিল তাদের প্রথম দিনের ক্লাস।বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছে রাফসান মাঠের এক পাশে মোহনাকে কয়েকজন মেয়ের সঙ্গে বসে থাকতে দেখল। তারা কী যেন নিয়ে ব্যস্ত ছিল।
রাফসান কিছুক্ষণ দূর থেকে তাকিয়ে থেকে ভেতরে চলে গেল।
আজ তার প্রথম ক্লাস।
আর সেই ক্লাসটি অনার্স প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের, অর্থাৎ মোহনাদের।ক্লাস শেষে মোহনা বাইরে বেরিয়ে গেটের সামনে দাঁড়াল। সে মাহিরের জন্য অপেক্ষা করছিল।ঠিক তখনই পেছন থেকে একটি কণ্ঠ ভেসে এল—
"মিস, এক মিনিট!"
মোহনা পেছনে ফিরে তাকাল।
"জি, স্যার?"
"তোমার এসেটা পড়ছিলাম। এখানে একটা লাইন বুঝতে পারিনি। দুই মিনিট সময় হবে?"
মোহনা মনে মনে বিরক্ত হয়ে ভাবল—
"ধুর! আবার কী হলো!"
তবে মুখে কিছু প্রকাশ না করে বলল—
"জি, স্যার।"
ঠিক তখনই বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিসের ফোনে মাহিরের কল এল।
"আপু, আমি চলে এসেছি। তুই এসে পড়। আজ আমাদের একটু তাড়াতাড়ি ক্লাস শেষ হয়েছে।"
কথাটা বলেই মাহির ফোন কেটে দিল।এদিকে রাফসান মোহনাকে জিজ্ঞেস করল—
"এই সময়ে রিকশা পাবে?"
"স্যার, দেখি পাই কি না।"
"ওহ, আচ্ছা। আমিও ওই দিকেই যাব। চলো, একসঙ্গে যাই?"
মোহনা একটু অবাক হয়ে তাকাল।
"স্যার, আপনি?"
রাফসান হেসে বলল—
"ভয় পেয়ো না। জাস্ট রাস্তা পর্যন্ত। শিক্ষক হিসেবে একটা দায়িত্ব আছে না?"
মোহনা মনে মনে ভাবতে লাগল, যাবে কি যাবে না।
শেষ পর্যন্ত সে রাজি হয়ে রাফসানের সঙ্গে এগিয়ে গেল।কিছুক্ষণ পর রাফসান মুচকি হেসে বলল—
"আমাকে কি ড্রাইভার বানানোর ইচ্ছে আছে নাকি, মিস?"
"না, স্যার!"
মোহনার উত্তর শুনে রাফসান হেসে ফেলল।
দুই মাস পর
মোহনার শরীরটা বেশ খারাপ। জ্বর উঠেছে ১০৩ ডিগ্রি। অসুস্থতার কারণে সেদিন সে বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে পারেনি।পরদিন কিছুটা সুস্থ বোধ করায় বিশ্ববিদ্যালয়ে গেল সে।ক্লাসে ঢুকেই নিজের টেবিলের ওপর ছোট্ট একটি কাগজে মোড়ানো প্যাকেট দেখতে পেল।
কৌতূহল নিয়ে প্যাকেটটি খুলতেই ভেতরে চোখে পড়ল নাপা, স্যালাইন আর একটি ছোট্ট চিরকুট।
চিরকুটে লেখা—
"ক্লাসের নোট লাগলে বলো।
— রা. স্যা."
মোহনা চিরকুটটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল।
'রা. স্যা.'—মানে রাফসান স্যার।
সে বুঝতে পারল, প্যাকেটটা কে রেখে গেছে।
কারণ বিভাগের আর কেউ তাকে এভাবে তুমি করে বলে না।মোহনার ঠোঁটের কোণে অজান্তেই হাসি ফুটে উঠল।ওষুধ খেয়ে জ্বর ভালো হয়েছিল কি না, সেটা তখনও জানা নেই।তবে চিরকুটটা পড়ে তার মনটা যে ভালো হয়ে গিয়েছিল, তা অস্বীকার করার উপায় নেই।কিছু কিছু যত্ন থাকে, যার প্রকাশ খুব ছোট্ট।অথচ সেই ছোট্ট যত্নই কখনো কখনো মনের ভেতর অজানা অনুভূতির জন্ম দেয়।
চলবে...!