ভোরের মৃদু আলো এসে চোখে-মুখে পড়তেই বিরক্তি নিয়ে ঝট করে চোখ বন্ধ করে নিল উজান। দুই হাত দিয়ে শক্ত করে মাথাটা চেপে ধরল সে। মাথাটা ভীষণ ব্যথা করছে। ঠিক তখনই শরীরের ওপর কেমন যেন একটা অতিরিক্ত ভার অনুভব করল উজান। চোখ মেলে সামনে তাকাতেই সে চমকে উঠল‚ তার হৃৎস্পন্দন যেন এক সেকেন্ডের জন্য থমকে গেল! সামনে এ কী দৃশ্য। মৌ তাকে নিজের বুকের সাথে লেপ্টে ধরে দু-হাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে পরম শান্তিতে ঘুমাচ্ছে। সোফার এক চিলতে জায়গাতেই মেয়েটা কখন যে এসে তার ওপর এভাবে ঘুমিয়ে আছে উজান টেরই পায়নি। রাগে উজানে’র ফর্সা মুখ মুহূর্তের মধ্যে লাল হয়ে গেল। সে বিদ্যুৎ গতিতে মৌ’কে নিজের ওপর থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়ে সোফা থেকে উঠে দাঁড়াল।
হুট করে ঘুমের ঘোরে এমন অতর্কিত ধাক্কা পাওয়ায় ঘুমন্ত মৌ’য়ের পুরো ব্যাপারটা বুঝতে বেশ খানিকটা বেগ পেতে হলো। সোফা থেকে সটান মেঝেতে পড়ে গিয়ে ব্যথায় কুঁকড়ে উঠল সে। শাড়ির আঁচলটা একপাশে লুটিয়ে পড়েছে। মৌ নিজের কোমরটা চেপে ধরে ঠোঁট ফুলিয়ে উজানে’র রাগান্বিত মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। ভোর হতে না হতেই লোকটার কাছ থেকে এমন অমানবিক আচরণ পেতে হবে‚ তা সে স্বপ্নেও কল্পনা করেনি। মৌ কোনো রকমে টাল সামলে সোজা হয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করল তবে চোখ থেকে এখনো ঘুমের রেশ কাটেনি। তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় সে আবারও মাথা ঘুরে পড়ে যেতে নিলে উজান এবার নিজের অজান্তেই বিদ্যুৎ গতিতে এগিয়ে গিয়ে তার কোমর ধরে তাকে সামলে নিল। পরক্ষণেই নিজের হাত সরিয়ে নিয়ে বরাবরের মতো বাজখাঁই মেজাজে চেঁচিয়ে উঠল।
“এই বেয়াদব মেয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াও। আর তুমি কোন সাহসে মাঝরাতে আমার বুকের ওপর এসে শুয়েছিলে হ্যাঁ? কাল রাতেই তোমাকে কড়া ওয়ার্নিং দিয়েছিলাম না যে ভুলেও আমাকে টাচ করবে না?”
উজানের এমন ধমকের চোটে মৌ’য়ের চোখের সব ঘুম এক নিমেষে কর্পূরের মতো উড়ে গেল। সে নিজের শাড়িটা টেনেটুনে কোনোমতে জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখে একরাশ নির্বাক দৃষ্টি। সোফা থেকে আচমকা শক্ত মেঝেতে ফেলে দেওয়ার কারণে তার কোমরে বেশ চোট লেগেছে‚ প্রচন্ড ব্যথা করছে। কিন্তু সেই শারীরিক ব্যথা সে মুখ চেপে সহ্য করে নিলেও। সাতসকালে উজানে’র এমন নির্মম ব্যবহার তার মনটাকে তছনছ করে দিল। সে অভিমানী মুখ করে কাঁদো কাঁদো গলায় বলল‚
"এমন করে সবসময় কেন বকেন বলুন তো? আমি কি ইচ্ছে করে আপনার সোফায় এসেছিলাম নাকি? রাতে বাইরে প্রচণ্ড জোরে মেঘ ডাকছিল আর বিদ্যুৎ চমকাচ্ছিল। আমি খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। তাছাড়া আমাদের তো এখন বিয়ে হয়েছে আর আমি তো আপনাকে সত্যি সত্যি অনেক ভালোবাসি। সেই হিসেবে নিজের বরকে একটু জড়িয়ে ধরে ঘুমাতেই পারি‚ তাই না? এতে এত মহাভারত অশুদ্ধ কী হলো?
উজান তর্জনী উঁচিয়ে গর্জে উঠল‚ “জাস্ট শাট আপ। বিয়ে হয়ে গিয়েছে মানেই যা ইচ্ছে তাই করবে? লিসেন টু মি কেয়ারফুলি‚ নেক্সট টাইম একদম আমার ধারেকাছে আসার চেষ্টা করবে না। আমি ঘৃণা করি তোমার মতো মেয়েদের। যাদের কাছে ভালোবাসা মানে সস্তা একটা খেলা। যখন ইচ্ছে হলো ইমোজি পাঠালাম‚ আর যখন ইচ্ছে হলো ভেঙে গুঁড়িয়ে দিলাম। আই হেট লাভ অ্যান্ড আই হেট ইউ। তোমাকে আমি কোনোদিন বউ হিসেবে মানি না আর না কোনোদিন মানবো। বুঝতে পেরেছো?
এই বলেই রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে দ্রুত রুম ছেড়ে বেরিয়ে গেল উজান। তার চলে যাওয়ার দরজার দিকে মৌ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। তার চোখের কোণটা অশ্রুতে ভরে উঠেছে। মৌ মনে মনে নিজেকেই প্রশ্ন করল। উজান তাকে বউ হিসেবে মানছে না সেটা বুঝল। উজান তার ২৭৫ নম্বর ক্রাশ সেটাও সত্য। কিন্তু তার মানে কি এই যে মৌ উজান’কে সত্যি সত্যি ভালোবাসে না? যদি মনে ভালোবাসা নাই থাকত‚ তবে গত দুটো বছর ধরে উজানে’র পাশে অন্য কোনো মেয়েকে দেখলে মৌ’য়ের বুকে কেন এত তীব্র হিংসা হতো? কেন সে অন্য মেয়েদের সহ্য করতে পারত না? কেন দিনে শত শত মেসেজ করে নিজেকে এভাবে উজানে’র সামনে পাগল প্রমাণ করত? কেন 'ভালোবাসি ভালোবাসি' বলে মুখে ফেনা তুলে ফেলত? এসব কি শুধুই একটা পুঁচকে মেয়ের সাময়িক মোহ নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে খাঁটি গভীর কোনো ভালোবাসা?
মৌ চুপ করে কিছুক্ষণ রুমের মাঝখানে দাঁড়িয়ে রইল। বাপের বাড়িতে সে বড্ড আদরে‚ রাজকন্যার মতো মানুষ হয়েছে। তাই খুব ছোটখাটো কড়া কথাও তার মনের ভেতর তিরের মতো এসে বিঁধে। তাকে ভেতর থেকে রক্তাক্ত করে দেয়। অথচ পাথরের মতো শক্ত এই উজান চৌধুরী তার সেই নরম ছোট্ট মনটা একটুও বুঝতে পারল না। মৌ নিজের চোখের পানিটা হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে মুছে নিল। তারপর জোর করে মুখে একরাশ হাসি ঝুলিয়ে নিজের জামা নিয়ে ওয়াশরুমের ভেতর ঢুকে পড়ল।
প্রায় আধা ঘণ্টা পর ওয়াশরুমের দরজা খুলে সে বাইরে বেরিয়ে এলো। শাওয়ার নেওয়ার পর তার ভেজা চুলগুলো থেকে টুপটুপ করে পানি ঝরে মেঝেতে পড়ছে। সে ড্রেসিং টেবিলের সামনে এসে দাঁড়িয়ে নিজের চুল আঁচড়ানোর জন্য চিরুনিটা হাতে নিল কিন্তু কিছুতেই তা গুছিয়ে উঠতে পারল না। চুলগুলো তার কোমর অবধি ছড়ানো‚ ঘন কালো কৃষ্ণচূড়ার মতো লম্বা। লম্বা চুল মৌ’য়ের নিজের খুব একটা পছন্দ নয়‚ আর সে নিজে কখনো নিজের চুল বাঁধতেও পারে না। বাপের বাড়িতে তার চুলের সব রকম যত্ন মেহের আর তার ফুপাতো ভাই সাব্বির নিয়ে থাকে। সাব্বির, মেহের আর মৌ একই কলেজে পড়াশোনা করে। যেখানে সাব্বির মাস্টার্স ফাইনাল ইয়ারের স্টুডেন্ট। অভিভাবকের মতো এই দুই পিচ্চি বোনকে সবসময় চোখে চোখে আগলে রাখাই সাব্বিরে’র প্রধান কাজ।
মৌ নিজের অবাধ্য চুল কিছুতেই ঠিক করতে না পেরে চিরুনিটা ছুড়ে ফেলে বিছানায় ধপাস করে বসে পড়ল। ঠিক এর কিছুক্ষণ পরেই উজান গম্ভীর মুখে রুমে ঢুকল। মৌ’কে ওভাবে চুপচাপ শান্ত হয়ে বিছানায় বসে থাকতে দেখে উজানে’র জোড়া ভ্রু কুঁচকে গেল। মেয়েটার তো একটুও শান্ত হয়ে বসে থাকার কথা নয়! যে মেয়ে শ্বশুরবাড়িতে পা দিতে না আসতেই মাঝরাতে এত বড় তুলকালাম কাণ্ড ঘটিয়ে বসে থাকে‚ সে অন্তত এতটা শান্ত থাকার পাত্রী নয়।
উজান মৌ’য়ের দিকে আর মনোযোগ না দিয়ে নিজের মতো করে রেডি হতে লাগল। একটা অফ-হোয়াইট শার্ট পরে সে বাইরে যাওয়ার জন্য একদম প্রস্তুত। হঠাৎ করেই মৌ বিছানা থেকে উঠে সোজা উজানে’র সামনে গিয়ে গাল ফুলিয়ে দাঁড়াল। তবে এবার আর উজান রেগে গেল না বরং তার চোখ-মুখের শান্ত রূপ দেখে বেশ শীতল ও নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করল‚
কী চাই তোমার?
মৌ চোখের পলক না ফেলে বলল‚ "আমার তো জীবনভর শুধু আপনাকেই চাই। তবে এখন শুধু আমার এই ভেজা চুলগুলো একটু আঁচড়ে দেবেন প্লিজ? আমি নিজে চুল আঁচড়াতে পারি না।
উজানে’র চোখ জোড়া কপালে উঠল‚ “হোয়াটটট? এত বড় হয়েছ অথচ এখনো নিজের চুল আঁচড়াতে পারো না?
মৌ মুখটা একটু বাঁকিয়ে নিলো। "কই বড় হলাম? আপনিই তো আমায় সবসময় পুঁচকে আর বিড়ালের বাচ্চা ভাবেন। তাহলে আমার চুলগুলো একটু ঠিক করে দিন না প্লিজ? আমি মেহেরে’র কাছেই যেতাম, তবে আমার মিষ্টি বোনটা এখন একটু আরাম করে ঘুমাচ্ছে। তাই ডাকতে ইচ্ছে হলো না। আর জানেন‚ আমার বোনটা গত পাঁচটা বছর ধরে একটা রাতও ঠিক করে ঘুমাতে পারে না। ঘুমাতে গেলেই সেই কালো‚ অন্ধকার দিনটার কথা ওর বারবার মনে পড়ে যায়। তখন ও ভেতরে ভেতরে বড্ড কষ্ট পায় কিন্তু বাইরে কাউকে নিজের কষ্টটা বুঝতে দেয় না। সেই অভিশপ্ত অন্ধকার দিনটার জন্যই মেহের একাধারে নিজের বাবাকে হারাল আর তার কিছুদিন পরই নিজের মা-কেও হারিয়ে পুরোপুরি একা হয়ে গেল। আমার জানুটা আগে এমন চুপচাপ ছিল না জানেন? ও আগে কত দুষ্টুমি করত‚ সারাক্ষণ হাসত! কিন্তু সময়ের সাথে সাথে ওর জীবনের সব আনন্দ বদলে গিয়েছে। আমার সেই পুরনো জানুটা আর আগের মতো নেই..।
কথাগুলো বলতে বলতে মৌ’য়ের চোখ বেয়ে আপনা-আপনিই দু-ফোঁটা নোনা জল গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ল। মৌ’য়ের কথা শুনে উজানে’র মনটা কেমন যেন খচখচ করে উঠল। সে নিজেও বিয়ে বাড়ি থেকে লক্ষ্য করেছে‚ মেহের মেয়েটা ভীষণ চুপচাপ স্বভাবের। কারও সাথে খুব একটা কথা বলে না‚ সবসময় একটা দূরত্ব বজায় রাখে। তাকে আর ইফাত’কে দেখলে তো মেয়েটা সোজা দশ হাত দূর দিয়ে হেঁটে চলে যায়। কিন্তু কেন এমন করে তা উজান নিজেও জানত না। বিয়ের দিন যখন সবাই আলো আর বাজনার মাঝে আনন্দ করছিল্ তখন মেহেরকে সে ছাদের এক কোণায় একা একা বসে হাঁটুতে মুখ গুঁজে নিঃশব্দে কান্না করতে দেখেছিল। উজান তখন মেহেরে’র কাছে গিয়ে কান্নার কারণ জিজ্ঞেস করলেও মেহের তাকে এড়িয়ে গিয়ে একটা কথাও বলেনি।
হঠাৎ উজান কৌতূহল সামলাতে না পেরে নিচু গলায় জিজ্ঞেস করল‚ “কী এমন হয়েছিল মেহেরে’র লাইফে?
উজানে’র প্রশ্নে মৌ’য়ের এবার ঘোর কাটল। সে বুঝতে পারল আবেগের বশে সে মেহেরে’র গোপন কষ্টের কথা মুখ ফস্কে বলে ফেলেছে। সে উজানে’র দিকে এক পলক তাকিয়ে তড়িঘড়ি করে মাথা নাড়িয়ে বলল‚ "না মানে কিছু না।
উজান বুঝতে পারল মৌ সেই অন্ধকার দিনের কথা আর বিস্তারিত বলতে চায় না তাই সে আর জোরাজুরি করল না। তবে সে আলতো করে মৌ’য়ের হাত ধরে তাকে ড্রেসিং টেবিলের সামনে এনে দাঁড় করাল। টেবিল থেকে হেয়ার ড্রায়ারটা হাতে নিয়ে সে পরম যত্নে মৌ’য়ের ভেজা চুলগুলো শুকিয়ে দিতে লাগল। মৃদু বাতাসে মৌ’য়ের অবাধ্য লম্বা চুল গুলো বারবার উড়ে এসে উজানে’র মুখে আছড়ে পড়ছিল। অথচ আশ্চর্য বিষয় উজানে’র এখন আর বিন্দুমাত্র বিরক্তি লাগছিল না! বরং তার হৃদয়ের গভীর কোণে কেমন যেন এক অদ্ভুত‚ অচেনা অনুভূতির সৃষ্টি হতে লাগল। এই অনুভূতিটা তার জীবনের অন্য বসন্তের মধ্যে সম্পূর্ণ ভিন্ন‚ একদম নতুন।
চুল শুকানো শেষ হলে উজান চিরুনি দিয়ে অত্যন্ত যত্ন সহকারে মৌ’য়ের মাথায় একটি সুন্দর খোঁপা করে দিল এবং আয়নায় মৌ’য়ের প্রতিচ্ছবির দিকে তাকিয়ে অবচেতনভাবেই মনে মনে একটু মুচকি হাসল। বরের হাতের সেই কোমল স্পর্শ আর আয়নায় তার মুচকি হাসি দেখে মৌ’য়ের বুকটা ধক করে উঠল। সে ভীষণ লজ্জা পেয়ে নিজের লাল হয়ে যাওয়া মুখটা লুকিয়ে দ্রুত পা ফেলে কক্ষ ত্যাগ করে নিচে চলে গেল। আর উজান মৌ’য়ের লজ্জামাখা হাসি দেখে শব্দ করে হাসলো।
—————
————————
সিঁড়ি বেয়ে নিজের অফ-হোয়াইট শার্টের হাতা দুটো কনুই অবধি ফোল্ড করতে করতে নিচে নেমে আসছে উজান। ড্রয়িং রুমে সোফায় বসা মৌ তার দিকে তাকিয়ে নিজের এক হাত দিয়ে মুখ চেপে মিটিমিটি হাসছে। ডাইনিং টেবিলে তখন শাশুড়ি মৌসুমী চৌধুরী পরম আদরে মৌ আর মেহের’কে নিজ হাতে খাবার তুলে খাইয়ে দিচ্ছেন। আজ যেহেতু চাঁদ রাত আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা পরেই খুশির ঈদ‚ তাই মেহের আজ বিকেলেই নিজের ফুঁপির বাসায় চলে যেতে চেয়েছিল। কিন্তু এই চৌধুরী বাড়ির কেউ তাকে একা একাকী সেই বাসায় ফিরে যেতে দেয়নি। বাড়ির কর্তা আরিফুল চৌধুরী মনে মনে সিদ্ধান্তই নিয়ে রেখেছেন মেহের’কে আর ওর ফুপির বাসায় রেখে কষ্ট দিয়ে পড়াশোনা করাবেন না। এখন থেকে ও এই বাড়িতেই সবার সাথে থাকবে। যেহেতু আরিফুল চৌধুরীদের দুই ভাইয়ের কোনো কন্যাসন্তান নেই তাই ঘরের বউমা তুবা, মৌ আর মেহেরে’র প্রতি তারা এক অন্যরকম পিতৃত্বের টান অনুভব করেন। বাড়ির বড় বউ তুবা একপাশে বসে আগামীকালের ঈদের সকল জিনিসপত্র গুছিয়ে রাখছে।
ঠিক তখনই সিঁড়ির দিকে তাকিয়ে মৌ চট করে শাশুড়ি মৌসুমী চৌধুরীর হাতে একটা আলতো খোঁচা দিল উজান’কে কিছু বলার জন্য। মৌসুমী চৌধুরী মৌ’য়ের মনের ভাব বুঝতে পেরে মুচকি হেসে উজানকে উদ্দেশ্য করে ডেকে উঠলেন‚ "উজান বাবা সকাল সকাল রেডি হয়ে কোথায় যাচ্ছিস?
উজান ঘাড় বাঁকিয়ে ডাইনিং টেবিলের দিকে তাকাল। মৌ’কে ওভাবে চোরের মতো মুখ টিপে হাসতে দেখে তার মগজে প্রচন্ড রাগ চড়ে গেল কিন্তু মায়ের সামনে সে নিজের রাগ প্রকাশ না করে শান্ত গলায় বলল„
“একটু ভার্সিটি যাচ্ছি আম্মু। কোনো দরকার ছিল?
"দরকার থাকবে না কেন? আজ বাদে কাল ঈদ‚ ঘরের মেয়েদের ঈদের শপিং করিয়ে দিতে হবে না? তুই গিয়ে ওদের সাথে করে শপিংমল থেকে ঘুরিয়ে নিয়ে আয়।
উজান নিজের বিরক্তি চেপে বলল‚ “সেটা আমাকে বলছ কেন আম্মু? তুমি‚ তুবা ভাবি আছে। তোমরা সবাই মিলে গিয়ে শপিং করে এসো। আমার অনেক কাজ।
মৌসুমী চৌধুরী এবার একটু কড়া গলায় বললেন‚ "আমরা গিয়ে করে আসব মানে কী? চুপচাপ ঘন্টাখানেকের মধ্যে ভার্সিটির কাজ শেষ করে বাসায় চলে আসবি। তারপর তোরা সবাই মিলে একসাথে শপিংয়ে বের হবি। ব্যস‚ এটাই আমার শেষ কথা।
“সিরিয়াসলি আম্মু?
উজান এবার মায়ের ওপর কিছুটা ক্ষোভ উগড়ে দিয়ে বলল„ “একটা আস্ত আপদকে এমনিতেই তোমরা জোর করে আমার ঘাড়ে তুলে দিয়েছ। এখন আবারও নতুন করে উটকো ঝামেলার জন্য ফোর্স করছ? আমি আগেই পরিষ্কার বলে দিচ্ছি‚ এইসব শপিং-টপিংয়ের ফালতু ঝামেলার মধ্যে আমি একদমই নেই। আর আজ রাতে বাসায় ফিরতে আমার বেশ দেরি হবে। ফ্রেন্ড সার্কেলের সাথে আমাদের ঈদের আগের রাতের একটা বিশেষ গেট-টুগেদার পার্টি আছে।
মৌসুমী চৌধুরী অবাক হয়ে বললেন‚ "ঘরে নতুন বিয়ে করা বউ রেখে তুই মাঝরাত পর্যন্ত বাইরে বন্ধুদের সাথে পার্টি করবি?
“আম্মু প্লিজ স্টপ। আমি তোমাদের আর কতবার বলব যে‚ না আমি এই জোরপূর্বক বিয়েটাকে মানি আর না এই ইডিয়ট মেয়েটাকে নিজের বউ বলে স্বীকার করি!
এই বলেই উজান আর এক মুহূর্ত সেখানে না দাঁড়িয়ে গটগট করে সদর দরজার দিকে এগিয়ে যেতে লাগল। তার যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে মৌ ডাইনিং চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে পেছন থেকে গলা ফাটিয়ে চিৎকার দিয়ে উঠল।
"ক্রাশ বর শপিংয়ে না যান ভালো কথা কিন্তু বিকেলে আসার সময় আমার জন্য মেহেদী নিয়ে আসবেন। আমি কিন্তু বিয়ের দিন হাতে মেহেদী ছোঁয়াতেও পারিনি। তবে আজ রাতে অবশ্যই দেবো। আপনি যদি নিজ হাতে মেহেদী এনে না দেন তাহলে আমি কিন্তু এই ঈদে হাত খালি রাখব কিচ্ছু দেবো না।
উজান দরজার কাছে গিয়ে এক পলকের জন্যও মৌ’য়ের দিকে ফিরে তাকাল না। শুধু যাওয়ার আগে তাচ্ছিল্যের সুরে বলল‚ “যা ইচ্ছে করো‚ আই ডোন্ট কেয়ার!
"সত্যি সত্যি বলছি‚ এনে না দিলে আমি কিন্তু হাতে মেহেদীই ছোঁয়াবো না।
মৌ পেছন থেকে পা দাপাল। কিন্তু উজান ততক্ষণে ধুপধাপ পা ফেলে দেউড়ি পার হয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল। উজানে’র এমন বেখায়ালি দেখে মৌ এবার শাশুড়ির সামনে গিয়ে রসগোল্লার মতো গাল ফুলিয়ে বসে পড়ল। অভিমানী সুরে বলল‚
"শাশুড়ি আম্মা আমি আগেই আপনাদের ডিক্লেয়ার দিয়ে রাখছি। আপনার ওই খিটখিটে ছেলে যদি আজ বিকেলে আমার জন্য মেহেদী কিনে না আনে‚ তবে আমি কাল ঈদের দিনে কোনো নতুন জামাকাপড় পরব না হুহ!
মৌ-ও আর সেখানে দাঁড়াল না। রাগ করে এক দৌড়ে দোতলার দিকে চলে গেল। মৌসুমী চৌধুরী একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে হতাশ চোখে মেহেরে’র দিকে তাকালেন। ছেলেটা কেন যে এমন অবুঝের মতো ব্যবহার করছে। মেহেরও চিন্তিত মুখে দৌড়ে মৌ’য়ের পিছু নিল।
দেখতে দেখতে দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলো‚ আর বিকেল গড়িয়ে ঘুটঘুটে রাত নামল তবুও উজান বাসায় ফিরল না। এদিকে মৌ নিজের রুমের দরজা ভেতর থেকে লক করে চরম মুড অফ করে বিছানায় বসে রইল। শাশুড়ি মৌসুমী চৌধুরী দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে কত অনুনয়-বিনয় করলেন কিন্তু মৌ জেদের বশে দরজা তো খুলেইনি ‚উল্টো এক ফোঁটা পানিও মুখে তোলেনি। মৌ আজ সারাদিনে নিজের রাগ আর অভিমান চেপে রাখতে না পেরে শাশুড়ির ফোন থেকে উজান’কে কম করে হলেও পঞ্চাশবারের ওপর কল করেছিল। উজান প্রথমবার রিসিভ করে মৌ’য়ের গলার আওয়াজ পেয়েই কেটে দিয়েছিল আর তারপর থেকে ফোনটা পকেটে পুরে রেখেছিল। একবারের জন্যও রিসিভ করেনি। মৌ মেঝেতেই উপুড় হয়ে কাঁদতে কাঁদতে একসময় ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ল।
রাত যখন প্রায় দু'টো তখন উজান অত্যন্ত ক্লান্ত শরীর নিয়ে ধীরপায়ে বাসায় ফিরল। কিন্তু সে ড্রয়িং রুমে প্রবেশ করতেই সোফা থেকে বাজখাঁই মেজাজে উঠে দাঁড়িয়ে সিংহের মতো গর্জে উঠলেন আরিফুল চৌধুরী। বাবার এমন রুদ্ররূপ দেখে উজানে’র পায়ের নখ থেকে মাথার চুল অবধি কেঁপে উঠল। আরিফুল চৌধুরী দাঁতে দাঁত চেপে বললেন‚
"বেয়াদব ছেলে আমি কি তোকে এই শিক্ষা দিয়েছি? যেখানে আজ পর্যন্ত এই বাড়ির কোনো মেয়ে বা বউকে সামান্য কথার আঘাত পর্যন্ত দেওয়া হয়নি। সেখানে তুই আমাদের ঘরের নতুন বউমাকে সারাদিন এভাবে কাঁদিয়েছিস? নিজেকে কী মনে করিস তুই হ্যাঁ? একজন সামান্য ভুল নারী তোর জীবন থেকে চলে গিয়েছে বলে তুই প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য এভাবে আরেকটা নিষ্পাপ মেয়ের জীবন বিষিয়ে তুলবি? মেয়েটার বাবার হাত ধরে আমি নিজে কথা দিয়ে এসেছিলাম যে ওকে আমি নিজের মেয়ের মতো রাজমোহিনী করে রাখব। কখনো কোনো কষ্ট পেতে দেবো না। অথচ তুই আমার সেই আদরের বউমার চোখে আজ ঈদের আগের রাতে অশ্রু ঝরালি?
“ড্যাড...
"একদম চুপ কর তুই। একটা সামান্য মেহেদী এনে দিলে তোর কী এমন মহাভারত অশুদ্ধ হতো হ্যাঁ? সারাদিন মেয়েটার ওই ফ্যাকাশে আর ক্রন্দনরত মুখের দিকে আমি তাকাতে পারিনি। সারাদিন কারো সাথে একটা কথাও বলেনি‚ এমনকি রাতে এক লোকমা ভাতও পেটে দেয়নি ও।
বাবার মুখ থেকে মৌয়ের সারাদিন না খেয়ে থাকার কথাটি শোনা মাত্রই উজানে’র বুকের ভেতরটা কেমন যেন তোলপাড় করে উঠল। নিজের অজান্তেই তার নিজের প্রতি এক তীব্র রাগ ও অপরাধবোধ জন্ম নিল। সে মনে মনে যতই মেয়েটাকে নিজের স্ত্রী হিসেবে অস্বীকার করুক না কেন কিন্তু দিনশেষে সমাজের আইন আর ধর্মের বাঁধনে এই মেয়েটি তারই বিবাহিতা স্ত্রী। উজান আর এক সেকেন্ডও সেখানে দাঁড়িয়ে কথা না বাড়িয়ে দ্রুত পা ফেলে আবারও বাসা থেকে বের হয়ে রাতের অন্ধকারের মাঝে গাড়ি স্টার্ট দিয়ে বেরিয়ে গেল। আরিফুল চৌধুরী রাগান্বিত চোখে ছেলের যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
প্রায় ঘণ্টাখানেক পর উজান যখন ফিরে এলো তখন তার একহাতে গুনে গুনে দশটা ব্র্যান্ডের মেহেদীর আর অন্যহাতে ঈদ উপলক্ষে একটি চমৎকার শাড়ি। মেয়েদের শাড়ি বা ড্রেসের ব্যাপারে উজানে’র বিন্দুমাত্র ধারণা নেই‚ তাই মলে গিয়ে নিজের চোখে যে শাড়িটা সবচেয়ে উজ্জ্বল আর সুন্দর লেগেছে সেটাই সে মৌ’য়ের জন্য নিয়ে এসেছে। ধীরপায়ে মৌ’য়ের রুমে লকটা নিজের চাবির ডুপ্লিকেট সেট দিয়ে খুলে ভেতরে ঢুকল উজান। রুমে ঢুকে জিরো ওয়াটের আবছা নীল আলোয় সে দেখতে পেল‚ মৌ অবোধ বাচ্চাদের মতো ঠোঁট দুটো উল্টে, কমফোর্টর ছাড়া রুমের শক্ত ঠান্ডা মেঝেতেই গুটিশুটি মেরে ঘুমিয়ে আছে। কান্না করার কারণে তার চোখের পাতা আর মুখটা বেশ ফুলে গিয়েছে। মৌ’য়ের সেই ফোলা ফ্যাকাশে মুখটা দেখা মাত্রই উজানে’র বুকের ভেতরটা এক অদ্ভুত মোচড় দিয়ে উঠল। তার নিজের ওপরই নিজের ঘৃণা হতে লাগল।
সে অন্য একজনের ওপর থাকা পুরনো ক্ষোভ ও ঘৃণা উগড়ে দিতে গিয়ে একটা ছোট্ট‚ অবুঝ মেয়ের প্রতি কতটা কঠোর আর নিষ্ঠুর হয়ে যাচ্ছে। একজনের করা ভুলের শাস্তি সে অন্যায়ভাবে আরেকজন নিষ্পাপ মেয়ের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে। উজান শাড়ির প্যাকেটটা নির্দিষ্ট স্থানে রেখে অত্যন্ত আলতো পায়ে মৌ’য়ের সামনে গিয়ে বসল। সে পরম মমতায় দুই হাত দিয়ে মৌ’কে পাঁজা কোলে তুলে নিল। মৌ ঘুমের ঘোরেই উজানে’র চেনা গায়ের পারফিউমের সুবাস পেয়ে তার বুকে নিজের মুখটা আরেকটু গুঁজে দিল। উজান তাকে সাবধানে এনে নরম বিছানার মাঝখানে শুইয়ে দিয়ে গায়ে কমফোর্টারটা জড়িয়ে দিল। এই গভীর ঘুমে নিমগ্ন মৌ’কে আর জাগাতে ইচ্ছে করল না উজানের। কিন্তু তার হঠাৎ মনে হলো কাল সকাল হলেই ঈদের দিন‚ এই আনন্দের দিনে সব মেয়ের হাত মেহেদীর রঙে রঙিন থাকবে অথচ তার নিজের জিদ্দি ব্যবহারের জন্য মৌ’য়ের এই ছোট্ট হাত দুটো খালি পড়ে থাকবে। এটা ভেবে উজানে’র নিজের ভেতরেই কেমন যেন একটা খটকা লাগল। মেয়েটার মলিন মুখের দিকে তাকালে স্পষ্ট বোঝা যায়‚ তার অবুঝ মনে কতটা গভীর অভিমান জমা হয়ে আছে।
উজান বিছানার পাশে বসে কিছুক্ষণ গম্ভীর হয়ে ভাবল। কীভাবে এই ঘুমন্ত মেয়েটার অভিমান ভাঙানো যায় এবং তার হাত দুটো রাঙিয়ে দেওয়া যায়? হঠাৎ করেই তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে মুচকি হাসি ফুটে উঠল। সে নিজের পকেট থেকে ফোনটা বের করে গুগলে কয়েকটা সুন্দর ও সহজ মেহেদীর ডিজাইন দেখে নিল। তারপর একটি মেহেদী হাতে নিয়ে অত্যন্ত নিখুঁত ও সাবধানী মনোযোগ দিয়ে মৌ’য়ের ফর্সা নরম হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে মেহেদী পরাতে লাগল। মেহেদীর ঠান্ডা ছোঁয়া লাগতেই মৌ ঘুমের ঘোরে বারবার নিজের হাতটা নড়েচড়ে সরিয়ে নিতে চাইল। তাতে অতিষ্ঠ হয়ে উজান মৌ’য়ের হাতটা আরেকটু শক্ত করে চেপে ধরে কপালে ভাজ ফেলে ফিসফিসিয়ে বকল।
“পুঁচকে মেয়ে একটা। ঘুমের ঘোরেও একটু শান্ত হয়ে থাকতে পারে না। বিকেলে মেহেদী কিনে দিইনি বলে কত অভিমান। আর এখন উজান চৌধুরী নিজের জীবনে প্রথমবার কোনো নারীর হাত নিজ দায়িত্বে এত যত্ন করে মেহেদী দিয়ে রাঙিয়ে দিচ্ছে। তবুও এই বিড়ালের বাচ্চার শান্তভাবে ঘুমানোর নাম নেই হুহ!
মৌ ঘুমের ঘোরে আবারও দু-একবার নড়েচড়ে উঠল। তবুও উজান তার নরম হাতটা নিজের শক্ত পেশিবহুল হাতের মুঠোয় আগলে রেখে শেষ রাত অবধি অত্যন্ত নিখুঁতভাবে মেহেদী দিয়ে পুরো হাত ভরিয়ে দিল। যদিও ডিজাইনটা প্রফেশনাল মেহেদী ডিজাইনারদের মতো অতটা নিখুঁত হয়নি কিন্তু একজন গম্ভীর প্রফেসরের প্রথম হাতের ছোঁয়ায় তৈরি সেই নকশাটি দেখতে মোটেও খুব একটা মন্দ লাগছিল না। জানালার বাইরে তখন ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে‚ আর উজান মৌ’য়ের মেহেদী রাঙা হাতটার দিকে তাকিয়ে এক অদ্ভুত তৃপ্তির হাসি হাসল।
To be
continued…
[ভুল হলে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন]
#প্রফেসর_উজান_চৌধুরী
#লেখনীতে_বন্যা_সিকদার
#ঈদ_স্পেশাল
দূর মসজিদ থেকে ভেসে আসা নামাজের মিষ্টি মধুর ধ্বনি কানে আসতেই আড়মোড়া ভেঙে বিছানায় উঠে বসল মৌ। প্রতিদিন নিয়ম করে ফজরের সালাত আদায় করা তার বহুদিনের পুরোনো অভ্যাস‚ তবে বিয়ের হুলস্থুল আর ঝামেলার কারণে গত দুটো দিন ভোরে ঠিকমতো ওঠা হয়নি। কিন্তু আজ ঈদের পবিত্র সকালে ঠিক সময়েই তার ঘুমটা ভেঙেছে। ঘুম ভাঙতেই নিজেকে নরম ও আরামদায়ক বিছানায় আবিষ্কার করে তীব্র অবাক হলো মৌ। তার স্পষ্ট মনে আছে‚ কাল রাতে উজানে’র ওপর চরম অভিমান করে সে মেঝেতেই গুটিশুটি মেরে ঘুমিয়ে পড়েছিল। তাহলে বিছানায় সে এলো কীভাবে? তবে তার চেয়েও বড় চমক অপেক্ষা করছিল যখন সে ডানপাশে ঘুরে তাকাল। বিছানার ঠিক পাশেই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে শুয়ে আছে উজান! শুধু শুয়েই নেই‚ সে মৌ’য়ের ওড়নার আঁচলটা নিজের এক হাতের মুঠোয় শক্ত করে চেপে ধরে রেখেছে। দৃশ্যটা দেখা মাত্রই মৌ’য়ের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বিজয়ী ও মিষ্টি হাসি ফুটে উঠল। তবে পরক্ষণেই নিজের দুই হাতের দিকে তাকাতেই তার চোখ দুটো চড়কগাছ হয়ে গেল! এ কী? তার দুই হাত কনুই অবধি অপরূপ সুন্দর মেহেদীর লালচে রঙে রাঙানো! হাতের তালু আর পিঠের নিখুঁত নকশা দেখলেই বোঝা যায় ‚ কেউ একজন পরম মমতা আর অত্যন্ত যত্ন সহকারে সারা রাত জেগে এই ছবি এঁকেছে।
বিছানার পাশে তাকাতেই দেখল বেশ কয়েকটি মেহেদী ছড়ানো-ছিটানো পড়ে আছে। কিছু সময় একদম চুপ করে গভীর ভাবনায় ডুব দিল মৌ। মনে মনে ভাবল এই গভীর রাতে দরজা বন্ধ রুমে কে তাকে এত সুন্দর করে মেহেদী পরিয়ে দিল? একবার তার অবুঝ মনে উজান চৌধুরীর নামটা ভেসে উঠলেও সে নিজেই নিজের মাথা নাড়িয়ে উড়িয়ে দিল‚ এটা অসম্ভব! যে লোক তাকে দু-চোখে দেখতে পারে না‚ সে মাঝরাতে তাকে কোলে তুলে বিছানায় শোয়াবে আর হাত ধরে মেহেদী দেবে? অবাস্তব। আপাতত এই রহস্যময় চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে দিয়ে সালাত আদায় করার জন্য বিছানা থেকে নামল সে। ওজু শেষ করে অত্যন্ত শান্ত মনে নামাজ আদায় করে নিল মৌ।
নামাজ শেষ করে জায়নামাজ গুছিয়ে রাখলো।
ঠিক তখনই ড্রেসিং টেবিলের সামনে একটা প্যাকেট দেখে কৌতূহলী বশত সেটা হাতে নিল এবং খুলে দেখলো। সাথে সাথে চমকে তাকালো মৌ। সেখানে একটা মেরুন রঙের শাড়ি‚ সাথে ম্যাচিং চুরিও৷ মূহুর্তেই মৌ’য়ের ঠোঁটের কোণে অদ্ভুত হাসি ফুটে উঠলো। মানুষটা তাহলে তার জন্য মেহেদীর সাথে শাড়িও কিনে এনেছে। সে মুচকি হেসে প্যাকেটা সেখানেই রেখে গুটি গুটি পায়ে উজানে’র পাশে শুয়ে পরলো।
লোকটা সেদিন রাতে দেমাক নিয়ে বলেছিল বিছানায় শুধু মৌ ঘুমাবে আর উজান ঘুমাবে সোফায়। তাহলে আজ নিজের আইন ভেঙে মহাশয় নিজেই কেন বিছানায় এসে কুণ্ডলী পাকিয়ে ঘুমোচ্ছেন? হয়তো ভুল করে ঘুমের ঘোরে উঠে এসেছেন। তবে মৌ মনে মনে চাইল না যে উজান কষ্ট করে ওই ছোট সোফাটায় গিয়ে ঘুমাক। তার মায়ায় ব্যাকুল হয়ে মৌ বিছানার ওপর উজান’কে দেখার জন্য এতটা ঝুঁকে পড়ল যে তার ভেজা চুলের সুবাস আর মুখের উষ্ণ ভারী নিশ্বাসগুলো সটান গিয়ে উজানে’র মুখে আছড়ে পড়তে লাগল। ঠিক তখনই ঘটল চরম অনাকাঙ্ক্ষিত সেই ঘটনা! উজান চোখ না মেলেই ঘুমের ঘোরেই আচমকা এক ঝটকায় মৌ’য়ের কোমর ধরে তাকে নিজের শক্ত বুকের মাঝে টেনে নিল।
আকস্মিক এই হামলায় মৌ’য়ের জান প্রায় কবজ হওয়ার দশা! মুহূর্তের মধ্যে উজান নিজের নাক ডুবিয়ে দিল মৌ’য়ের গলার নরম ভাঁজে। ঠোঁট ছোঁলাল তার মসৃণ মখমল ত্বকে‚ আলতো করে এঁকে দিল গভীর এক ভালোবাসার চুম্বন!
শরীরের ভেতর এক তীব্র ও অদ্ভুত অবশ করা শিহরণ বয়ে গেল মৌ’য়ের। বুকের ভেতরের হৃৎপিণ্ডটা যেন বিদ্যুৎ গতিতে লাফাচ্ছে‚ কান পাতলে স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে সেই ধকধক শব্দ। পুরো শরীর থরথর করে কাঁপতে লাগল তার। কিন্তু সেই সুখকর অনুভূতির রেশ কাটতে না কাটতেই উজানে’র মুখ থেকে অবিন্যস্ত ও কাঁপা কাঁপা গলায় কানের কাছে ভেসে এলো এক নির্মম সত্য।
“আই লাভ ইউ শিরিন। আমি তোমাকে অনেক অনেক বেশি ভালোবাসি। প্লিজ আর একটাবার ফিরে এসো আমার লাইফে। ট্রাস্ট মি‚ আমি আর একটুও ভুল বুঝব না তোমায়। তুমি ছাড়া শূন্য আমি।
কথাগুলো যেন তীক্ষ্ণ তিরের মতো এসে সরাসরি মৌ’য়ের ছোট্ট কোমল বুকে বিঁধল। মুহূর্তের মধ্যে মেয়েটার সাজানো ভালোবাসার পৃথিবী আর কাঁচের মতো নরম হৃদয়টা চুরমার হয়ে ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল! এতক্ষণে মৌ’য়ের মগজে আলো ঢুকল। এখন সে স্পষ্ট বুঝতে পারছে যে উজান চৌধুরী কেন 'ভালোবাসা' শব্দটাকে এত তীব্রভাবে ঘৃণা করে‚ কেন তার মনে মেয়েদের প্রতি এত ক্ষোভ। তবে মৌ-ও এত সহজে ছেড়ে দেওয়ার পাত্রী নয়। সে বড্ড জেদি আর একরোখা মেয়ে। হোক না উজানে’র হৃদয়ে পুরোনো কোনো ক্ষতের দাগ‚ মৌ নিজের পবিত্র ভালোবাসা দিয়ে আবারও নতুন করে উজানে’র বুকে নিজের নাম লিখে ছাড়বে!
ঠিক তখনই উজানে’র ঘুমের ঘোর কাটল এবং সে চোখ মেলে তাকাল। কিন্তু চোখের সামনে মৌ’কে নিজের বাহুবন্ধনে ওভাবে লেপ্টে থাকতে দেখে সে এক ধাক্কায় ছিটকে উঠল। হকচকিয়ে বিছানা থেকে দ্রুত নেমে দাঁড়িয়ে গেলো।
“তু তু তু তুমি আবারও কোন সাহসে আমার আমার কাছে এসেছো?
মৌ নিজের বুকের ভেতরের কান্না আর ভাঙচুর লুকিয়ে রেখে তড়িৎ গতিতে বিছানায় উঠে বসল। মুখটা কুঁচকে দেমাকের সাথে বলল‚ "বাহ্ বাহ্ যত দোষ নন্দ ঘোষ। এখন আমি একটুও আপনার কাছে যাইনি প্রফেসর সাহেব বরং আপনিই নিজে মাঝরাতে সোফা ছেড়ে আমার বিছানায় এসেছেন। আর একটু আগে আপনিই আমাকে জোর করে নিজের বুকের ভেতর টেনে নিয়েছেন হুহ।
“হোয়াটট? উজান চৌধুরীর চরিত্র এতটাও সস্তা বা বাজে নয় যে‚ সে যাকে তাকে মাঝরাতে বুকে টেনে নেবে।
মৌ বিছানা থেকে নেমে দাঁড়িয়ে উজানে’র সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। "ওহ্ তাই নাকি? বউকে মুখে স্বীকার করে না অথচ সেই বউয়ের জন্য মাঝরাতে মল ওলটপালট করে শাড়ি কিনে নিয়ে আসে। আবার সারা রাত জেগে নিজের হাতে এত যত্ন করে মেহেদীর নকশাও এঁকে দেয়! এমনকি শেষ রাতে জড়িয়ে ধরে টুপটুপ করে চুমুও খায়। সে আবার এসেছে এখানে নিজের চরিত্র নিয়ে বড় বড় লেকচার দিতে? ঢং‚ এই খিটখিটে স্বভাবের জন্যই মনে হয় ওই শিরিন ডাইনি আপনাকে ছেড়ে চলে গিয়েছে।
শিরিনে’র নামটা মৌ’য়ের মুখে শোনা মাত্রই উজান যেন পায়ের নিচে মাটি খুঁজে পেল না। পুরো শরীর শক্ত হয়ে গেল তার। শিরিনে’র ব্যাপারে এই চৌধুরী বাড়ির লোকজন ছাড়া বাইরের কেউ তেমন কিছু জানে না। বাড়ির লোকও শুধু এতটুকুই জানত যে উজানে’র অতীতে একটা গভীর প্রেম ছিল কিন্তু সেই মেয়ের নাম‚ পরিচয় বা ইতিহাস কেউ জানত না। তাহলে এই পুঁচকে মেয়েটা কীভাবে জানল?
সে অত্যন্ত কাঁপা কাঁপা ও ভীত গলায় জিজ্ঞেস করল‚
“শ শ শ শিরিনে’র ব্যাপারে তুমি কীভাবে জানলে?
মৌ দুই হাত বুকের কাছে গুটিয়ে বেশ ভাব নিয়ে বলল‚ "যাহ্ বাবা একটু আগে নিজেই তো আমাকে ঘুমের ঘোরে জড়িয়ে ধরে সেই ডাইনিকে দশবার 'আই লাভ ইউ' বলে মুখে ফেনা তুলে ফেললেন। এখন আবার আমাকেই উল্টো জিজ্ঞেস করছেন আমি কীভাবে জানলাম?
কথাটা শুনে উজান শুকনো ঢুক গিলল। নিজের ওপর তীব্র রাগ আর ক্ষোভ হতে লাগল তার। ঘুমের ঘোরে সে নিজের অজান্তেই এসব কী আবোলতাবোল বকে ফেলেছে! শিরিন’কে সে মন থেকে যতই মুছে ফেলতে চায়‚ সে ততই জেকে বসে। কাল বিকেলে দূর থেকে হুট করে মেয়েটাকে অন্য একজনের সাথে দেখার পর থেকেই মগজে যেন নতুন করে পুরোনো ক্ষতটা চাড়া দিয়ে উঠেছে। ঠিক তখনই মৌ বাঘিনীর মতো পা ফেলে উজানে’র একেবারে গায়ের কাছে এসে দাঁড়াল। তারপর উজানে’র মুখের দিকে ঝুঁকে পড়ে চোখ দুটো সরু করে অত্যন্ত মারমুখী ও ফিসফিসানি গলায় স্পষ্ট ভাষায় হুঁশিয়ারি দিল।
"শুনুন প্রফেসর সাহেব। বিয়ের আগে আপনার লাইফে কোন পেত্নী‚ ডাইনি বা চামচিকি ছিল‚ তা নিয়ে আমার বিন্দুমাত্র ইন্টারেস্ট নেই। বাট‚ এখন যেহেতু আপনি আমার বিবাহিত ক্রাস বর সো আজ থেকে যদি আমি ছাড়া অন্য কোনো মেয়ের দিকে চোখ তুলে তাকিয়েছেন কিংবা ওই পুরোনো পেত্নীকে আবারও নিজের ঘাড়ে তোলার চেষ্টা করেছেন। তবে আমি আপনাকে একদম আল্লাহর নামে কুরবানি দিয়ে দেবো হুহ!
এই বলেই মৌ উজানে’র মুখের ওপর এক বিশ্রী ভেংচি কেটে দরজার দিকে চলে গেল। উজান যেন পাথরের মূর্তির মতো একদম আহাম্মক বনে দাঁড়িয়ে রইল। মেয়েটার কথার তেজ দেখে মনে হচ্ছে‚ সুযোগ পেলে সে উজান’কে সত্যি সত্যি জ্যান্ত জবাই করে কুরবানি দিয়ে দেবে। উজান যখন নিজের স্তব্ধতা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে‚ ঠিক তখনই মৌ কোথা থেকে যেন দমকা হাওয়ার মতো আবার দৌড়ে ফিরে এলো। উজান কিছু বুঝে ওঠার আগেই সে পায়ের পাতায় ভর দিয়ে উঁচিয়ে উঠে উজানে’র ডান গালে ঠোঁট চেপে এক জোরালো মিষ্টি চুম্বন এঁকে দিল। তারপর উজানে’র কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে আওড়াল„
“ভালোবাসি আমার খিটখিটে প্রফেসর সাহেব! শুভ ঈদ মোবারক!
কথাটা বলেই আর এক সেকেন্ডও সেখানে দাঁড়াল না মৌ‚ খিলখিল করে হাসতে হাসতে এক দৌড়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেল। উজান রাগে গজগজ করে উঠল‚ “অসভ্য মেয়ে একটা। লাজ-লজ্জা বলতে কিছু নেই তার ডিকশনারিতে। ইডিয়েট একটা‚ সুযোগ পায় মেরে তক্তা বানিয়ে ফেলবো একদম।
•
•
🖤🌸
মেরুন রঙের সেই চমৎকার জমকালো শাড়িটা পরিধান করে ছোট্ট ছোট্ট পা ফেলে ড্রয়িং রুমে হাজির হয়েছে মৌ। বেনারসি শাড়িতে তাকে আজ সত্যিই কোনো পরীর মতো লাগছে। বাড়ির পুরুষ মানুষ আরিফুল চৌধুরী‚ আকবর চৌধুরী‚ ইফাত‚ আরিয়ান এবং উজান সহ সবাই ঈদের নামাজ শেষ করে এইমাত্র মাত্র বাসায় ফিরেছে। সবার পরনে নতুন পাঞ্জাবি-পায়জামা। মৌ ড্রয়িং রুমে ঢুকেই বিন্দুমাত্র লজ্জা না পেয়ে সবার আগে দৌড়ে গিয়ে শ্বশুর আরিফুল চৌধুরী থেকে শুরু করে একে একে সবাইকে নিচু হয়ে সালাম করল এবং অত্যন্ত আদায় করে সবার কাছ থেকে মোটা অঙ্কের চকচকে কড়কড়ে সালামি লুফে নিল।
এবার সে সোজা গিয়ে দাঁড়াল উজানে’র সামনে। উজান তখন নিজের দুই জোড়া ভ্রু কুঁচকে মৌ’য়ের এই মেরুন শাড়ি পরা রূপের দিকে তাকিয়ে অবচেতন ভাবেই মনে মনে একটু মুচকি হাসল। ঠিক তখনই মৌ তার সামনে নিজের ডান হাতটা পেতে বেশ কায়দা করে বলে উঠল‚
"ঈদের সালামি দিন।
উজান সালামির কথা শুনে কোনো পাত্তা না দিয়ে বেশ আরাম করে গিয়ে সোফাটায় পা ছড়িয়ে বসল। মৌ-ও ছাড়ার পাত্রী নয়‚ সে-ও ঠিক ছায়ার মতো সোফার পাশে গিয়ে তপ্ত দৃষ্টিতে চেয়ে রইল। উজান এক পায়ের ওপর আরেক পা তুলে তার গম্ভীর ও কর্কশ স্বরে সংক্ষেপে আওড়াল‚ “কত?
মৌ খুশিতে একেবারে গদগদ হয়ে চোখ দুটো বড় বড় করে দুই হাত নেড়ে উত্তর দিল‚ "৩৪ হাজার।
মৌয়ের মুখে এই আকাশচুম্বী অঙ্কের কথা শোনা মাত্রই উজানে’র চোখ জোড়া কপালে ওঠার উপক্রম হলো। সে সোফা থেকে প্রায় লাফিয়ে উঠে আকাশ কাঁপিয়ে চিৎকার দিয়ে উঠল।
“হোয়াটটট? টাকা কি ঘোড়ার পেছন দিয়ে বের হয় যে চাইলেই দিয়ে দেবো?
উজানে’র এমন কিপটেমি মার্কা চিৎকার শুনে মৌ আর নিজের মুখ সামলাতে পারল না। সে নিজের কোমর দুই হাত দিয়ে ধরে তড়িৎ গতিতে উত্তর দিল।
"না আপনার নিজের পেছন দিয়ে বের হয়।
কথাটা মুখ থেকে বের হওয়া মাত্রই মৌ’য়ের নিজের হুশ ফিরল। সে দ্রুত নিজের দু-হাত দিয়ে নিজের মুখটা শক্ত করে চেপে ধরল। মনে মনে নিজেকেই গালি দিল‚ ধুর ছাই। এই পোড়া মুখটা কি এক সেকেন্ডও চুপচাপ থাকতে পারে না? বাড়ির সবার সামনে এই নোংরা কথাটা না বললে কি পেটের ভাত হজম হতো না তার? এদিকে মৌ’য়ের এমন অভাবনীয় ও মারাত্মক ভাষার উত্তর শুনে ড্রয়িং রুমে উপস্থিত সবাই "হো হো" করে হাসির রোল পড়ে গেল। ইফাত আর আরিয়ান তো হাসতে হাসতে সোফা থেকে মেঝেতেই গড়িয়ে পড়ার দশা। বাড়ির সবার সামনে নিজের বউয়ের মুখে এমন অবাস্তব কথা শুনে উজানে’র ফর্সা মুখ এবার রাগে একেবারে বেগুনি হয়ে গেল। সে রাগী চোখে মৌ’য়ের দিকে তাকাতেই মৌ চোরের মতো মুখ লুকিয়ে শাশুড়ীর পেছনে গিয়ে আশ্রয় নিল।
সবার হাসির রোল দেখে উজান নিজের মায়ের দিকে তাকিয়ে রাগে-ক্ষোভে একেবারে বাঘের মতো গর্জন করে উঠল‚ “দেখেছ আম্মু? তোমাদের এই পরম আদরের ফাজিল বউমা কেমন ভাষায় কথা বলছে? এরপরেও কি তোমাদের মনে হয় যে এই বেয়াদব মেয়ের সাথে আমার একটুও ভালো ব্যবহার করা উচিত? আমার তো এখন মন চাইছে যে ওকে আমি...
উজান রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে যেই না মৌ’য়ের দিকে এক পা দু-পা করে এগিয়ে যেতে চাইল। ঠিক তখনই তার সামনে এসে দাঁড়ালো ইফাত।
"আরে হোপ শালা। ঘরে এমন রূপবতী বউ থাকতে বিন্দুমাত্র কদর করিস না‚ সারাক্ষণ শুধু রাগ দেখাস। তোর যদি এতই অপছন্দ হয়, তবে মৌ’কে আমাকে দিয়ে দে। আমার নিজের বাপ তো আর জীবনেও আমাকে নিজে থেকে এভাবে ধরে-বেঁধে বিয়ে করিয়ে দেবে না। তাই তোরটাই আমাকে দে।
ইফাতের এমন রসাত্মক আর ধেষ্টামো মার্কা কথা শোনা মাত্রই উজান নিজের দাঁতে দাঁত চেপে এগিয়ে গেল। সে আচমকা ইফাতে’র পিঠের ওপর সজোরে এক মোক্ষম কিল বসিয়ে দিল। “শালা তোকে আমি রাতে দেখে নেব।
ইফাত পিঠে কিল খেয়েও বিন্দুমাত্র দমল না বরং মুখ কুঁচকে আরও জোরে হেসে উঠল। "ঘরে এত সুন্দর নতুন বউ রেখে তুই মাঝরাতে আমার রুমে আমার কাছে আসবি? সিরিয়াসলি? নাকি তোর মধ্যে ভেজাল আছে‚ হ্যাঁ?
কথাটা বলেই ইফাত আর এক সেকেন্ডও সেখানে দাঁড়াল না। উজানে’র পরবর্তী মার থেকে বাঁচতে এক লাফে ড্রয়িং রুমের অন্য প্রান্তে দৌড়ে গিয়ে সবার পেছনে সরে দাঁড়াল। উজান এবার রাগে একদম বোম হয়ে গেল। এই বাড়িতে এক মুহূর্ত থাকা মানেই নিজের সম্মান ধূলিসাৎ হওয়া। সে তীব্র ক্ষোভ নিয়ে যেই না ড্রয়িং রুম পার হয়ে সদর দরজার দিকে চলে যেতে চাইল‚ ঠিক তখনই মৌ একদম চিলের মতো ডানা মেলে উজানে’র যাওয়ার পথ আটকে সোজা সামনে দাঁড়িয়ে পড়ল। সে নিজের ডান হাতটা উজানে’র সামনে পেতে বলে‚
"সালামিটা দিয়ে যান।
উজান নিজের ক্ষিপ্ত ও তপ্ত দৃষ্টি দিয়ে মৌ’য়ের দিকে তাকাল। যেন চাউনি দিয়েই মেয়েটাকে পুড়িয়ে ছাই করে দেবে। তবুও মৌ’য়ের সেদিকে বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ নেই। সে নিজের বড় বড় হরিণী চোখ দুটো মেলে একদম নিষ্পাপ বাচ্চার মতো ফ্যালফ্যাল করে উজানে’র মুখের দিকে তাকিয়ে হাত বাড়িয়েই রইল। মৌ’য়ের এমন নাছোড়বান্দা রূপ দেখে উজানে’র ঠোঁটের কোণে এবার এক চরম বাঁকা ও রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল। সে অত্যন্ত ধীরস্থিরভাবে নিজের প্যান্টে। পকেটে হাত ঢুকিয়ে কিছু একটা খুঁজল। তারপর অত্যন্ত ভাব নিয়ে পকেট থেকে একটি 'দুই টাকার নোট' বের করে মৌ’য়ের হাতের মুঠোয় শক্ত করে গুঁজে দিল। নোটটা গুঁজে দিয়েই উজান খানিকটা নিচু হয়ে মৌ’য়ের কানের একদম কাছে মুখ এনে ফিসফিসানি স্বরে আওড়াল—
“লিসেন পুঁচকে মেয়ে। উজান চৌধুরী তার বাপের জন্মেও কোনোদিন এত বড় অঙ্কের টাকা কাউকে ফ্রিতে সালামি দেয়নি। কিন্তু আজ তোমাকে দিল। এবার নিশ্চয়ই বুঝতে পারছো তুমি কতটা স্পেশাল?
মৌ নিজের হাতের ওই দুই টাকার নোটটার দিকে একবার তাকাল‚ আর একবার উজানে’র দেমাকী মুখের দিকে তাকাল। তার খুশিতে ডগমগ করা মুখটা মুহূর্তের মধ্যে তপ্ত হয়ে উঠল। সে রাগে রি রি করে উঠে বলল‚ "কী বললেন? খাটাশ লোক একটা। আপনি কি এই দুই টাকা আমাকে ভিক্ষা দিচ্ছেন?
উজান নিজের কলারটা একটু সোজা করে বলল‚ “লাইক সিরিয়াসলি? এটা তোমার কাছে ভিক্ষা মনে হচ্ছে? তুমি আমার আম্মুর অতি আদরের নতুন বউমা তাই তোমাকেই স্পেশালি দিলাম। অন্য কেউ হলে তো আজ এক আনাও পেত না।
উজানে’র এমন চরম কিপটেমি সহ্য করতে না পেরে মৌ’য়ের মাথার সমস্ত রক্ত এক নিমেষে চড়ে গেল। সে আর নিজের রাগ সামলাতে পারল না। উজান কিছু বুঝে ওঠার আগেই মৌ নিজের হাতের আঙুল দিয়ে উজানে’র শক্ত পেশিবহুল হাতের ওপর শরীরের সমস্ত শক্তি খাঁটিয়ে এক মারাত্মক চিমটি কেটে দিল। উজান ব্যথায় ককিয়ে ওঠার আগেই মৌ রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে পা দাপাতে
দাপাতে হনহন করে সিঁড়ি বেয়ে উপরে চলে গেল।