ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রফেসর উজান চৌধুরী

৮ম পর্ব

লেখক: বন্যা সিকদার

"এখনো বুঝলে না ছোট চাচ্চু? নতুন নতুন বিয়ে করেছে। রুমে একদম ব্র্যান্ড নিউ বউ এসেছে সো গলায় এমন মশা-মাছির কামড়ের দাগ তো একটু-আধটু থাকবেই। অথচ আমাদের সামনে জেন্টলম্যান সেজে এমন ভাব ধরে থাকে‚ যেন কত বড় সাধু পুরুষ।

“ভাইয়াআআআআ

ততক্ষনে আরিয়ান দৌড়ে তুবা’র কাছে চলে গেলো। একটুর জন্য প্রানটা বেরিয়ে যায়নি। হঠাৎ সবার দৃষ্টি গিয়ে আটকে গেল ড্রয়িং রুমের সিঁড়ির মুখে। ফরমাল শার্ট-প্যান্ট পরে ধীরপায়ে নিচে নেমে আসছে ইফাত। তাকে ওভাবে দেখে ড্রয়িং রুমের হাসির রোল এক নিমেষে স্তব্ধ হয়ে গেল‚ সবার চোখ যেন ছানাবড়া। যে ছেলে প্রতিদিন দুপুর বারোটা কিংবা একটার আগে ঘুম থেকে চোখই মেলে না‚ সেই কুঁড়ে ও ছন্নছাড়া ছেলেটা আজ সকাল আটটার মধ্যে নিজে থেকে ঘুম থেকে উঠে একদম রেডি হয়ে নিচে নামছে। এটা যেন কারো বিশ্বাসই হতে চাইছিল না। ইফাত অবশ্য কারো দিকে ফিরেও তাকাল না। সে সোজা ডাইনিং টেবিলের দিকে এগিয়ে গেল‚ যেখানে তার মা ইমরোজা চৌধুরী সকালের নাস্তা সার্ভ করছিলেন।

ইফাত টেবিলে গিয়ে কোনো কথা না বলে হঠাৎ করেই একটু নিচু হয়ে মায়ের পা ছুঁয়ে পরম শ্রদ্ধায় সালাম করল। তারপর পাশে দাঁড়ানো বড় আম্মা অর্থাৎ আরিয়ান-উজানে’র মা মৌসুমি চৌধুরীর পা ছুঁয়েও সালাম করল। আকস্মিক এই কাণ্ডে দুই মায়ের কেউই তড়িঘড়ি করে পিছিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেলেন না। ইমরোজা চৌধুরী ছেলের এমন অভাবনীয় পরিবর্তনে চোখ দুটো মুছলেন। তারপর পরম মমতায় ছেলেকে বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরে মুচকি হাসলেন।

"পাগল ছেলে আমার। ওভাবে হুট করে পা ছুঁয়ে সালাম করতে নেই আব্বা‚ এতে পাপ হয়।

ইফাত মায়ের বুক থেকে মাথা তুলে মায়ের দুই হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে অত্যন্ত নরম সুরে বলল‚ “কে বলেছে তোমায় এই ভুল কথা আম্মু? যে মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের বেহেশত লুকিয়ে থাকে‚ সেই পুণ্যময় পায়ে সালাম করা যদি পাপ হতো তবে আল্লাহ তায়ালা কখনোই মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের বেহেশত লিখে দিতেন না। তুমি আমার মা‚ আমার আম্মু‚ আমার জন্মদাত্রী জননী।

ছেলের মুখ থেকে এমন পরিণত ও সুন্দর কথা শুনে ইমরোজা চৌধুরীর চোখ দুটো আনন্দে কানায় কানায় ভরে উঠল। তিনি পরম আদরে ছেলের কপালে একটা স্নেহের চুমু খেয়ে মনে মনে হাসলেন। যাক‚ অবশেষে তার এই ছন্নছাড়া‚ অবাধ্য ছেলেটা তবে তার অন্ধকার ও দিশাহীন জীবন থেকে আলোর পথে বেরিয়ে আসতে পেরেছে। তিনি ইফাতে’র দিকে কিছুটা ঝুঁকে অত্যন্ত নিচু ও ফিসফিসানি স্বরে আওড়ালেন।

"তোর মনের ভেতরের সেই পবিত্র আশা আল্লাহ খুব জলদি পূরণ করুক আব্বা। আমি মা হয়ে আজ অন্তরের অন্তস্তল থেকে আল্লাহর কাছে এটাই চাই। তিনি নিশ্চয়ই একজন মায়ের আকুতি কখনো খালি হাতে ফিরিয়ে দেবেন না।

ইফাত মায়ের কথার অন্তর্নিহিত অর্থ বুঝতে পেরে এক মায়াবী মৃদু হাসল। সে মেহেরে’র দেওয়া সেই রূপান্তরের কথা মনে করে মনে মনে এক নতুন শক্তি পেল। এরপর সে বড় আম্মার সাথেও মিষ্টি করে কুশল বিনিময় করে সোজা এসে আরিয়ানে’র সামনে দাঁড়াল। তারপর নিজের চপল ভাবটা সম্পূর্ণ লুকিয়ে মুখে এক রাশ গম্ভীরতা ফুটিয়ে আওড়াল„

“ভাইয়া তাড়াতাড়ি চল লেট হয়ে যাবে।

আরিয়ান মুখের পরোটা চিবানো বন্ধ করে নিজের জোড়া ভ্রু কুঁচকে বোকার মতো তাকাল। "যাবো মানে? কী বলছিস এসব?

“ভাইয়া প্লিজ অন্তত আজ একটু সিরিয়াস হও তো

"আরে আমি আবার কী করলাম? আর তুই এত সকাল সকাল কর্পোরেট লুক নিয়ে রেডি হয়ে বা কোথায় যাওয়ার জন্য আমায় তাড়া দিচ্ছিস শুনি?

“কোথায় আবার‚ আজ থেকে তোমার সাথে রোজ অফিসে যাবো। বয়স তো কম হলো না‚ এবার তো কিছু একটা করা উচিত তাই না?

"হোয়াটটটটটট?

ডাইনিং টেবিলের ওপাশ থেকে সোফা ছেড়ে এক সজোরে চিৎকার দিয়ে উঠলেন ইফাতে’র বাবা আকবর চৌধুরী। চায়ের কাপটা তার হাত থেকে পড়ে যাওয়ার উপক্রম হলো। যে ছেলে নিজের হাতে এক গ্লাস পানি পর্যন্ত গড়িয়ে খায় না‚ বাসার একটা ছোট কাজ করতে বললে সারা বাড়ি মাথায় তোলে। সেই ছন্নছাড়া ছেলে আজ থেকে রোজ সকালে অফিসে যাবে‚ এটা ভাবাও যেন এক মস্ত বড় অলৌকিক ঘটনা! ইফাত একরাশ বিরক্তিমাখা দৃষ্টি নিয়ে তার বাবার দিকে তাকাল। এই বাড়িতে কোনো ভালো কাজ করতে গেলেও বিপদ। যখন সে সারাদিন বন্ধুদের সাথে টইটই করে ঘুরে বেড়াত‚ কোনো কাজ করত না‚ তখন সবাই তাকে বকাঝকা করত। আর আজ যখন সে নিজের পায়ে দাঁড়াতে চাচ্ছে তখনই সবাই তাকে নিয়ে রসিকতা করছে।

“ড্যাড তুমি আসলে কী বলতে চাও বলো তো? যখন তুমি নিজে থেকে আমায় বারবার অফিসে যাওয়ার জন্য জোর করতে‚ তখন আমি যাইনি‚ সেটা আমার ভুল ছিল। কিন্তু আজ যখন আমি নিজে থেকে দায়িত্ব নিয়ে অফিসে যেতে চাচ্ছি‚ তখনো তোমাদের এত প্রবলেম? আর হ্যাঁ‚ ভাইয়া শোনো আজই অফিসে গিয়ে আমার মাসিক স্যালারি কত হবে তা ফিক্সড করে দেবে। আমি আর আজ থেকে বাপ-ভাইয়ের পকেটের ফ্রিতে দেওয়া টাকায় এক আনাও চলব না। অফিসে বাকি সব কর্মচারীদের যেমন যোগ্যতা অনুযায়ী স্যালারি দাও‚ আমাকেও ঠিক তেমনটাই দেবে বুঝলে?

আকবর চৌধুরী ছেলের এই রুদ্র ও পরিণত রূপ দেখে সম্পূর্ণ চমকে গেলেন। ছেলের মুখের ওপর এমন গম্ভীর ও দায়িত্বশীল কথা তিনি এতো বছরেও শোনেননি। তবে ছেলের এই জেদ দেখে তার মনের ভেতরে এক বিশাল আনন্দের বন্যা বয়ে গেল। মনে মনে ভাবলেন‚ দেরি করে হলেও ছেলেটা অবশেষে নিজের ভবিষ্যৎ আর জীবনের মূল্য বুঝতে পেরেছে।

এদিকে উজান সোফা থেকে উঠে দাঁড়াল। সে ইফাতে’র দিকে এগিয়ে গিয়ে তার কাঁধে একটা আলতো চাপ দিয়ে মৃদু হেসে বলল‚ “বেস্ট অফ লাক দোস্ত! তোর এই নতুন শুরুর জন্য অনেক শুভকামনা রইল। আচ্ছা আমি এবার আসি‚ লেট হয়ে যাচ্ছে।

উজান সদর দরজার কাছাকাছি যেতেই ঠিক তখনই কোথা থেকে মৌ তড়িৎ গতিতে চিলের মতো ছুটে এসে পেছন থেকে উজান’কে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। বেচারা উজান আকস্মিক এই অতর্কিত আক্রমণে তীব্র ভয়ে আর আতঙ্কে এক লাফে প্রায় দুই হাত দূরে সরে গেল। পরক্ষণেই পেছনে তাকিয়ে মৌ’কে ওভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তার বুক থেকে এক মস্ত বড় ভয়ের খাঁচা নেমে গেল। সে নিজের বিরক্তিমাখা চোখ দুটো বড় বড় করে রাগান্বিত কণ্ঠে চেঁচিয়ে উঠল„

“এই ইডিয়ট মেয়ে সকাল সকাল আমাকে এভাবে হার্ট অ্যাটাক করিয়ে মার্ডার করতো চাও? আর বাসার সবার সামনে ওভাবে জড়িয়ে ধরলে কেন? লজ্জা-শরমের মাথা কি একদম চিবিয়ে খেয়ে ফেলেছো?

মৌ উজানে’র ওই রাগী ধমক শুনে বিন্দুমাত্র দমল না বরং নিজের ওড়নাটা আঙুলে জড়াতে জড়াতে বলে‚ "সব সময় শুধু শুধু আমার ওপর এমন চিল্লাইবেন না তো। আমি কি ইচ্ছে করে সবার সামনে আপনাকে ওভাবে জড়িয়ে ধরেছি নাকি? আর একটু প্লিজ আমার সাথে রুমে চলুন।

“এই মেয়ে তোমার প্রবলেম কী? একটু আগে আমার সাথে অত বড় ঝগড়া করলে আর এখন আবার কোন আক্কেলে আমায় রুমে যেতে বলছো?

"রুমে আরশোলা ঢুকেছে। প্লিজ চলুন না আমার সাথে? আমার বড্ড ভয় করছে।

“সামান্য একটা আরশোলা দেখে তোমার এত ভয়? আর আমি এখন কোনোমতেই তোমার সাথে উপরে যেতে পারব না। আমার ভার্সিটিতে প্রথম ক্লাস আছে। তোমার ভয় লাগলে তুমি অন্য কোথাও গিয়ে চুপচাপ বসে থাকো।

"প্লিজ প্রফেসর সাহেব। একটিবারের জন্য চলুন না‚ প্লিজ প্লিজ প্লিজ।

মৌ এবার উজানে’র শার্টের হাতা ধরে একদম ঝুলে পড়ল। উজান ডাইনিং টেবিলের দিকে এক পলক তাকলো। তারপর সে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে মৌ’য়ের পিছু পিছু আবার দোতলার রুমের দিকে পা বাড়াল। উজান রুমে প্রবেশ করা মাত্রই মৌ তড়িঘড়ি করে পেছনের দরজাটা লক করে দিল এবং উজান কিছু বুঝে ওঠার আগেই তাকে সজোরে এক ধাক্কা দিয়ে বিছানার ওপর ফেলে দিল। উজান বিছানায় আছড়ে পড়ার সাথে সাথেই মৌ নিজে এক লাফে এসে উজানে’র চওড়া বুকের ওপর পুরোপুরি শুয়ে পড়ল।

মৌয়ের এমন আকস্মিক ও মারাত্মক কাণ্ডে উজান একদম স্তব্ধ ও আহাম্মক হয়ে রইল। সে মৌ’কে নিজের গায়ের ওপর থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করল কিন্তু সরাতে পারল না। মৌ নিজের ছোট ছোট দু-হাত দিয়ে উজানে’র শার্ট এমনভাবে আঁকড়ে ধরে রেখেছে যেন কোনোভাবেই তাকে ছাড়বে না। উজান এবার দাঁতে দাঁত পিষে চেঁচিয়ে উঠল‚

“এই ফাজিল মেয়ে তুমি না নিচে বললে রুমে আরশোলা ঢুকেছে? কিন্তু এখন তো দেখছি তুমি রুমে এনে আমার সাথেই চরম ফাজলামো করছো এক্ষুনি নামো আমার ওপর থেকে।

মৌ উজানে’র ধমক শুনে এবার নিজের মুখটা একটু ওপরে তুলল। তার ঠোঁটের কোণে তখন এক মায়াবী ও চপল মুচকি হাসি। সে কোনো কথা না বলে অত্যন্ত পরম মমতায় উজানে’র ধারালো চিবুকের ওপর আলতো করে নিজের উষ্ণ ঠোঁট দুটো ছুঁইয়ে দিল। উজান একদম বিস্ময়কর ও স্তম্ভিত দৃষ্টিতে মৌ’য়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তার মগজ যেন কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে। এই মেয়েটা দিন দিন কতটা অভদ্র আর বেহায়া হয়ে যাচ্ছে। কোনো বারণ বা ধমক সে কানেই তোলে না। উজান নিজের চোখ দুটো রাঙিয়ে কঠোরভাবে তাকাল তবুও মৌ’য়ের মধ্যে সেই নিয়ে বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ বা ভয় দেখা গেল না। সে উজানে’র কানের লতির কাছে নিজের ঠোঁট দুটো ঠেকিয়ে তপ্ত নিশ্বাস ফেলে অত্যন্ত ফিসফিসানি স্বরে আওরায়‚

"ভালোবাসি...ভীষণ ভালোবাসি আমার প্রফেসর সাহেব।

মৌ’য়ের মুখ থেকে ওই 'ভালোবাসি' শব্দটা শোনা মাত্রই উজানে’র মুখের রং পাল্টে গেলো। সে তীব্র এক ঝটকায়‚ তড়িৎ গতিতে মৌ’কে নিজের বুকের ওপর থেকে ধাক্কা দিয়ে পাশে ফেলে দিল। উজান এত জোরে ঝটকা দিয়েছিল যে মৌ সামলাতে না পেরে বিছানা থেকে ছিটকে সোজা শক্ত মেঝের ওপর আছড়ে পড়ল। আর মেঝের কোণে আঘাত লাগা মাত্রই ব্যথায় কোঁকানি দিয়ে গুঙিয়ে উঠল সে।

মৌয়ের ওই যন্ত্রণাকাতর কণ্ঠস্বর শোনা মাত্রই উজানে’র ভেতরের সমস্ত রাগ আর জেদ কর্পূরের মতো উড়ে গেল। সে তীব্র এক অনুশোচনা বুকে নিয়ে তড়িঘড়ি করে বিছানা থেকে নেমে মেঝের ওপর মৌ’য়ের সামনে হাঁটু গেড়ে বসল। নিজের দুই হাত দিয়ে মৌ’য়ের গাল দুটো ছুঁয়ে আকুল স্বরে বলে উঠল।

“আই অ্যাম রিয়েলি সরি পিচ্চি। আমি সত্যিই বুঝতে পারিনি যে আমার ধাক্কাটা এত জোরে লাগবে। অনেক বেশি লেগেছে‚ তাই না? কোথায় লেগেছে আমায় দেখাও?

এই বলেই উজান আর কোনো কথা না বাড়িয়ে মৌ’কে নিজের পাজা কোলে তুলে নিল এবং বিছানার ওপর সাবধানে বসিয়ে দিল। উজান অত্যন্ত উদগ্রীব ও ব্যাকুল হয়ে মৌ’য়ের হাত-পা ভালো করে পরীক্ষা করতে লাগল। মেয়েটা কোথাও বড় কোনো আঘাত পেয়েছে কিনা। ঠিক তখনই তার তীক্ষ্ণ চোখ দুটো আটকে গেল মৌ’য়ের ডান পায়ের গোড়ালির ওপর। সেখানে একটা বড়সড় নীলচে কালশিটে দাগ পড়ে আছে‚ যা দেখে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে কোনো জায়গায় মারাত্মক হোঁচট খাওয়ার কারণে এমনটা হয়েছে। উজান এবার অত্যন্ত রাগান্বিত ও উদ্বিগ্ন কণ্ঠে আওড়াল‚

“স্টুপিড গার্ল একটা। এখানে কীভাবে এত বড় কালশিটে দাগ ফেলে ব্যথা পেলে‚ হ্যাঁ?

"ওটা কালকে দুপুরে দৌড়াতে গিয়ে পা মচকে গিয়েছিল।

উজান আর এক সেকেন্ডও দেরি না করে রুম থেকে ফার্স্ট এইডের বক্সটা এনে বিছানায় বসল। সে নিজের ঠান্ডা হাত দিয়ে মৌ’য়ের সেই আঘাতপ্রাপ্ত লাল-নীল হয়ে যাওয়া জায়গায় মলম নিয়ে অত্যন্ত আলতো হাতে মালিশ করে দিতে লাগল। মালিশ করার মাঝেই তার ভেতরের রাগটা আবারও উগড়ে উঠে।

“আস্ত একটা ফাজিল তুমি। নিজের হাত-পায়ের কোনো ব্যালেন্স নেই তোমার? সারাদিন পুরো বাসা জুড়ে বানরের মতো এত দৌড়াদৌড়ি কেন করো শুনি? একটু সোজাভাবে‚ শান্ত হয়ে চললে কি মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যায়? এই জন্যই তো কালকে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছিলে। তুমি জানো তোমার যদি কোনো বড় ক্ষতি হয়ে যায় তবে আমার.....

উজান কথা বলতে বলতে মাঝপথেই হঠাৎ থেমে গেল। "আমার কিছু হলে আপনার কী হতো প্রফেসর সাহেব?

মৌ উজানে’র চোখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্নটা করল। মৌয়ে’র এই সরাসরি প্রশ্নে উজান নিজের ভেতরের ব্যাকুলতা টের পেয়ে চট করে স্বাভাবিক হলো। তারপর তোতলা তোতলা স্বরে বলল‚ “আ আ আমার আবার কী হবে? আমার কিচ্ছু হবে না। তুমি আমার কে হও যে তোমার কিছু হলে আমার দুনিয়া উল্টে যাবে‚ হ্যাঁ? তাছাড়া তোমার যদি কোনো ক্ষতি হয়‚ তবে আম্মু আর ড্যাড মিলে আমাকেই এই চৌধুরী বাড়ি থেকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দেবে। সবাই ভাববে আমি ইচ্ছে করে তোমায় আঘাত করেছি। দেখি পা-টা সোজা করো তো‚ এখন হাঁটতে কোনো প্রবলেম হচ্ছে না তো তোমার?

মৌ এবার এক অদ্ভুত ও গভীর অবাক দৃষ্টিতে উজানে’র এই রূপের দিকে তাকিয়ে রইল। মনে মনে ভাবল এই অদ্ভুত মানুষটা মুখে সারাদিন দাবি করে যে সে মৌ’কে একটুও ভালোবাসে না অথচ তার প্রতি উজানে’র এই যত্ন আর কেয়ারিং তো অন্য কথা বলে। মৌ যদি কোনোদিন রাগ করে না খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ে‚ তবে এই উজান মাঝরাতে তাকে ঘুম থেকে তুলে নিজের হাতে লোকমা খাইয়ে দেয়। মৌ উজানে’র বুকে না জরিয়ে ঘুম আসে না বলে। সে রোজ রাতে শত কাজ থাকলেও জলদি বাসায় ফিরে মৌ’কে নিজে থেকে বুকে টেনে নিয়ে ঘুমায়। মৌ’য়ের জামাকাপড় থেকে শুরু করে তার প্রয়োজনীয় প্রতিটা ছোটখাটো জিনিস সে মুখে চাওয়ার আগেই উজান অলৌকিকভাবে তার চোখের সামনে এনে হাজির করে তবুও এই মানুষটা নাকি মৌকে ভালোবাসে না। এটা কি আদৌ কোনো সুস্থ মানুষের পক্ষে সম্ভব? হয়তো সম্ভব‚ কিংবা হয়তো এক মস্ত বড় মিথ্যা অহংকার। মৌ এবার অত্যন্ত নরম স্বরে ডাকল‚

"প্রয়োফেসর সাহেব?

উজান ফার্স্ট এইডের বক্সটা গুছিয়ে বলল‚ “হুম বলো?

"আপনি তো আমায় একটুও ভালোবাসেন না‚ তাহলে কেন আমার এত যত্ন করেন? আমি মরে গেলেও তো আপনার জীবনে কোনো ফারাক পড়ার কথা না। কিন্তু আমি একটুখানি আঘাত পেলেই আপনি কেমন পাগল পাগল হয়ে যান। এরপরেও কি বলবেন আপনি আমায় সত্যি সত্যি ভালোবাসেন না?

মৌ’য়ের এই অকাট্য ও তীক্ষ্ণ প্রশ্নে উজান এক মুহূর্তের জন্য পুরো থমকে গেল। মেয়েটা বয়সে ছোট আর চপল হলে কী হবে‚ মাঝেমধ্যে এমন কিছু কথা বলে যা সরাসরি বুকে গিয়ে আঘাত করে। উজান বিছানা থেকে উঠে মৌ’য়ের একদম পাশে গিয়ে বসল। মৌ এক দৃষ্টিতে তার চোখের ভেতরের ভাষা পড়ার চেষ্টা করছিল। উজান নিজের ভেতরের এক তীব্র তপ্ত দীর্ঘশ্বাস ফেলে। মাথাটা সামান্য উঁচুর দিকে তুলে অত্যন্ত দৃঢ় গলায় উত্তর দিল।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৮ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন